প্রবন্ধ - ১

পুজোর স্মৃতি- প্রসঙ্গ শিলং
সুনন্দা ভট্টাচার্য
শিক্ষিকা, কোলকাতা

আশ্বিনের শারদ প্রাতে একরাশ ফুর্তি নিয়ে চোখ খুলতাম। আজ মহালয়া, সাতদিন পর দুর্গাপুজো। পাহাড়ি প্রকৃতি সেজে উঠেছে আপন সাজে, কুয়াশা কাটিয়ে জেগে ওঠা ঝকঝকে সকাল,চারদিকে পুজো পুজো গন্ধ, সেই অনাবিল আনন্দের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। বাবা বলতেন, "বারোয়ারি পুজো, এই পুজোয় বাড়ির পুজোর মতো আনন্দ নেই।" কিন্তু বাড়ির পুজো বলতে আমি জানতাম ফল নৈবেদ্য সাজিয়ে খিচুড়ি পায়েস ভোগ দিয়ে ঘরোয়া পূজো। সেই পূজোয় তেমন হই চই কোথায়? তাই আমার কাছে মতিনগর পাড়ার তথাকথিত বারোয়ারি পুজোই ছিল আমার বাড়ির পুজো, আমার প্রাণের পুজো।

 

মহালয়ার ভোরে সাত তাড়াতাড়ি উঠে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শুনতাম। কিছু কি বুঝতাম? কয়েকটা শব্দ ছাড়া প্রায় কিছুই বোধহয় বুঝতাম না। কিন্তু সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর মাঝে মাঝে সংগীতের অনুরণন ছুঁয়ে যেত অন্তরাত্মাকে। সর্বভূতে দেবীর উপস্থিতি আমরা সত্যিই যেন অনুভব করতাম । শুধু আমি কেন, চারপাশে সবাই মেতে উঠতো আনন্দে, আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতো সেই সরল আনন্দবিহবলতা।

 

মহালয়ার পর স্কুল যেতে আর ভাল লাগত না। পুজোর বাজার সারা হয়ে যেত প্রায় এক মাস আগে, টুকটাক কেনাকাটা চলত ষষ্ঠীর দিন পর্যন্ত। বাজার করতাম মায়ের সঙ্গে পুলিশ বাজার গিয়ে, শংকর বস্ত্রালয়, মোহিনী স্টোরস, শর্মা স্টোরস, এগুলোই প্রাধান্য পেত বেশি। জি এস রোড জুড়ে ছিল আরও অনেক ছোট বড় দোকান। সেগুলো থেকেও  চলত কেনাকাটা।পূজোর বাজার সেরে ফেরার পথে অবশ্যই কেনা হত দিল্লি রেস্টুরেন্টের জিলিপি, আর আর বি স্টোরস এর কুকিজ।  পুজোর তিন দিন অর্থাৎ সপ্তমী অষ্টমী নবমী, তিন দিনে তিনটি নতুন জামা আমার চাই। অভাবের সংসারে ও মা আমার জন্য ঠিক গুছিয়ে রাখতেন তিনটি নতুন জামা। কখনো বা নিজের হাতে সেলাই করে দিতেন। সেইসব জামায় থাকত মায়ের স্নেহের বিশেষ গন্ধ। সেবছর বাজারে নতুন এল পূজো স্পেশিয়েল সাউথ ইন্ডিয়ান সিল্ক শাড়ি। প্রায় সব বাড়িতে একটা করে কেনা হলো। আমরা তিন বোন । বাবার সীমিত ক্ষমতা। কুছ পরোয়া নেহি। বিন্নি সিল্ক শাড়ি নিয়ে মহা আনন্দে পূজো কাটালো দিদিরা। কারো মনে কোন ক্ষোভ ছিলনা। আরেকবার, আমি  ঠিক  শাড়ি পরার মত বড় হইনি তখন,  পুলিশ বাজারে একটা নতুন দোকান হলো, "শাড়ি প্যালেস"। কত সব বাহারি শাড়ি!আমার জন্য পিওর সিল্ক শাড়ি কিনে দিলেন মা।মনে হলো হাতে স্বর্গ পেয়েছি।  পুজোর আগে পাড়ার সবাই পুজোর বাজার দেখতে আসতো। রোজ একবার নতুন জামাকাপড় দেখানো হতো আবার সেগুলো ভাঁজ করে রাখা হতো।

 

সমস্ত কর্মকাণ্ডেই ছিল দারুণ আনন্দ। দিন গোনা চলত। আজ দ্বিতীয়া, কাল তৃতীয়া, তারপর চতুর্থী পঞ্চমী ,ষষ্ঠী ,সপ্তমী। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় পুজো প্যান্ডেলে যেতাম, বিস্ময় ভরা চোখে ষষ্ঠীর বোধন দেখতাম। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায়, পাড়ার মা মাসিমারা ক্ষীরের এবং নারকেলের সুস্বাদু সন্দেশ তৈরি করে আনতেন। দৃষ্টিনন্দন এবং যারপরনাই সুস্বাদু সেই সন্দেশ আমার স্মৃতিতে আজ ও উজ্জল। ষষ্ঠী পূজার পর প্যান্ডেলে উপস্থিত সবার মধ্যে বিতরণ করা হতো সেই সন্দেশ। ছোটদের কাছে ষষ্ঠী পুজোর বিশেষ আকর্ষণ ছিল সেই সান্ধ্যকালীন মিষ্টিমুখ।সপ্তমীতে চোখ খুলেই মনে পড়তো আহা আজ সপ্তমী, পৃথিবীর সমস্ত রকম আনন্দের অনুভূতি বোধ হয় ওই মনের মধ্যে জেগে উঠতো।

 

বহু বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, ঠিক মনে নেই কবে থেকে এমন আনন্দের অনুভূতি আর জাগে না। তবে আনুমানিক পঁয়ত্রিশ বছর তো হবেই। বড় সুন্দর জায়গা আমার জন্মস্থান। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের সঙ্গে একত্রে বাস করতাম আমরা। দুর্গাপূজা শুধু বাঙালির উৎসব কখনো মনে হয়নি। কখনো মনে হয়নি আমরা বাংলার বাইরে সুদূর মেঘালয়ে থাকি। পুজো মানে ঢ্যাঙ কুড় কুড়, পুজো মানে নতুন জামা, পুজো মানে খাওয়া দাওয়া, নাটক করা, বন্ধুদের সঙ্গে পটকা ফাটানো, গল্প করা, রাতে শীতে কাঁপতে কাঁপতে বেঞ্চে বসে অনুষ্ঠান দেখা, আরো কত কি।

 

বাড়িতেও ছোট্ট করে পুজোর আয়োজন হতো। মায়ের সঙ্গে হাত লাগাতে হত, ফল নৈবেদ্য তৈরি, ভোগের জন্য আনাজপাতি কাটা ইত্যাদি কাজে। পাড়ার প্যান্ডেলে একপাক ঘুরে এসে বাড়িতে সবাই মিলে অঞ্জলি দেওয়া আর খাওয়া দাওয়া। বাড়িতে ঘট পুজোর চল ছিল, আর তাই ভোগে দেওয়া হতো নানা রকম সুস্বাদু খাবার-দাবার। আমরা সব ভাইবোন একসঙ্গে মজা করে খেতাম। কখনো পূজোর প্যান্ডেলে প্রসাদ খেয়ে এলে ও বাড়িতে আমাদের খেতেই হত, নইলে বাবা-মা ভীষণ রাগ করতেন। বিকেলের দিকে ঠাকুর দেখার পালা। তবে যে দাদারা পাড়ার পুজোর দায়িত্বে থাকত, তারা পাড়ার প্যান্ডেল ছেড়ে কোথাও যেতে পারত না। বিকেলে যারা ঠাকুর দেখতে আসতো, তাদের সবাইকে দেওয়া হত বোদে আর ঝুরিভাজা। আমরা একসঙ্গে দলবেঁধে বেরোতাম। হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম ঠাকুর দেখতে। আমরা বলতাম পুজো দেখা। দেখতে হবে লাল ভিলা, গাড়িখানা ,হিন্দু মিশন, হরিসভা, জেইল রোডের পুজো। পথে আরো অনেক ছোট ছোট প্যান্ডেলে প্রসাদ খেতে খেতে যাওয়া। বড় পুজো গুলো সব একদিনে দেখা হবে না।লাল ভিলার আলোক সজ্জা, জেইলরোডের প্যান্ডেলের কারুকার্য ছিল বিশেষ আকর্ষণ। গাড়িখানা বা হিন্দু মিশনে নিয়ে যেতেন বাড়ির বড়রা। হিন্দু মিশনে হত সোনালী প্রতিমা। বাবার হাত ধরে গাড়িখানার ঠাকুর বিস্ময়ভরা চোখ নিয়ে দেখতাম।দেবী দুর্গা ত্রিশূলবিদ্ধ করছেন রক্তাক্ত মহিষাসুরকে, সিংহ বারবার হাঁ করছে আর মুখ বন্ধ করছে, অবাক বিস্ময়ে ভাবতাম কি করে সম্ভব!

 

এখন কলকাতায় কত চমৎকারই না দেখি, কিন্তু সেই উচ্ছাস আর কই? শিলংয়ের রামকৃষ্ণ মিশনের পুজোর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। অষ্টমীর  সকালে আয়োজন করা হতো কুমারী পূজোর। আমরা ভোর থেকে দেখতে যাবার প্রস্তুতি নিতাম। ভীড় হত খুব।দেবীর আসনে বসানো হতো হয়তো আমাদেরই পরিচিত কোন ছোট্ট মেয়েকে। সুসজ্জিতা দেবীরূপিনী কুমারীকে অপূর্ব সুন্দর দেখাতো। কেমন এক পবিত্র আনন্দে মন ভরে যেত।

 

শিলংয়ে সাধারণত আমরা সন্ধের পর খুব ঘোরাফেরা করতাম না। এটাই ছিল অলিখিত নিয়ম। কিন্তু দুর্গাপুজোর দিনগুলো ছিল এর ব্যতিক্রম। দুর্গাপূজার সময় আমরা বাড়ি ফিরতাম রাত আটটা নটায়। তারপর কোনরকমে নাকে মুখে গুঁজে একটু খেয়ে আবার পাড়ায় অনুষ্ঠান দেখতে যাওয়া। কখনো বা যেতে হতো চুপি চুপি বাবা শুয়ে পড়ার পর। রাতবিরেতে বাড়ির বাইরে থাকা বাবা মোটে পছন্দ করতেন না, সে হোক না পুজো! মায়ের স্নেহের আঁচল আমাদের আগলে রাখতো। সুযোগ করে দিতেন অনুষ্ঠান দেখতে যাবার। এখন মনে মনে ভাবি বাবা নিশ্চয়ই জানতেন আমরা অনুষ্ঠান দেখতে যাই। কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে একটা ঢাকঢাক-গুড়গুড় ছিল, তাই একটা রোমাঞ্চ ছিল। কিছু খাসিয়া ছেলে মেয়ে লেপ গায়ে দিয়ে  বেঞ্চে বসে নাটক দেখত। আমরা হাসাহাসি করতাম। অনুষ্ঠান মানে নিতান্তই ঘরোয়া কিছু নাচ গান আর নাটক। সাজপোশাকের তেমন চাকচিক্য ছিলনা, উৎকর্ষতার বিচারে হয়তো সে অনুষ্ঠান তেমন প্রাধান্য পাবে না, কিন্তু আমাদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অসীম। পূজোর অনেক আগে থেকে আমরা রীতিমত রিহার্সাল দিয়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতাম। মেঘের রাজ্যে পুজোর সময় প্রায়ই বৃষ্টি হতো। একবার মনে আছে কোন এক নাটকের দৃশ্যে নায়ক 'জল জল' বলে আর্তনাদ করছে, আর সেই সময় বৃষ্টি এসে জলে জলাকার করে দিলো স্টেজ। আমরা খুব হেসেছিলাম।

 

কিছুটা যখন বড় হলাম, তখন পুজোর সময় বাড়তি আকর্ষণ ছিল, ঠাকুর দেখার পর ভালো ভালো রেস্তোরায় খাওয়া-দাওয়া করা। ইসিই রেস্তোরায় চাইনিজ ছাড়া পুজো, ভাবা যেতনা। রিগেল রেস্টুরেন্টে প্রথম পেয়েছিলাম পেপার দোসার স্বাদ। হইহই করে পুজো কাটানোর পর বিজয়া দশমী। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বিরাট ট্রাক আসত। যারা ট্রাকে উঠে প্রতিমার সঙ্গে পোলো হিলস্ 'উমখ্রা রিভার' পর্যন্ত যেতে পারত তারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করত।

 

কিন্তু এই অনাবিল আনন্দে অচিরেই ছেদ পড়লো। স্পষ্ট মনে আছে সেই বিভীষিকাময় অষ্টমীর কথা। লাল ভিলার পুজোয় স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রোষ উপছে পড়ল। সামান্য কথা কাটাকাটি, রক্তারক্তি তে পরিণত হল। জনরোষের শিকার হলেন দুর্গা প্রতিমা। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হল, মা দুর্গার চিন্ময়ী মূর্তিকে। ঘটনার আকস্মিকতায়, স্থানীয় সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়লো। দুর্গাপুজোর আনন্দের সঙ্গে নতুন করে যোগ হলো উড়ে এসে জুড়ে বসা আতঙ্ক। সেই নির্মল আনন্দ আর থাকলো না। তারপর থেকে পুজো আসলেই ভয় পেতাম আমরা। আবার দেখতে হবে না তো সেই বিভীষিকাময় দিনগুলো? অনেক কিছুই আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে লাগলো। গুচ্ছের নিয়মকানুন সংক্রান্ত নির্দেশ জারি হল পুজো কমিটিগুলোর উপর। ওদিকে আমরাও ততদিনে মতিনগর ছেড়েছি। যে পাড়ায় উঠে এলাম, সেখানে পাড়ার পুজো বলে কিছু ছিল না। একটু-আধটু ঠাকুর দেখা ছাড়া পুজোর আনন্দ ও তেমন ছিল না। মনে আছে বিজয় দশমীর দিন, আমরা রাস্তার ধারে দাঁড়াতাম, শিলংয়ের কাছারিতে এজি অফিসের ঠিক উল্টো দিকে। ওই রাস্তা দিয়ে সব প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হতো। আমরা উৎসাহভরে দেখতাম। আমরা তখন লাসুমিয়ারের বাসিন্দা। পুজোর পর বিজয়া দশমীতে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বড়দের প্রনাম করতে যেতাম। আমাদের বাড়িতেও অনেকদিন ধরে সবাই আসতেন। বাড়িতে তৈরি মিষ্টি নোনতা খাবার দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করা হতো।

 

আরেকটা কথা না বললেই নয়, শিলংয়ে কিন্তু আয়োজন হতো জমজমাট বিজয়া সম্মেলনীর। কখনো বিভিন্ন পাড়ায়, কখনো স্টেট লাইব্রেরীতে, বিজয়া সম্মেলনী দেখেছি, সেই সব অনুষ্ঠান উঁচুমানের হত। অনেক গুণী বাঙালি সংগীতশিল্পীরা ছিলেন। তাদের অনুষ্ঠান দেখার  বিশেষ আকর্ষণ ছিল। সেই পাহাড়ি স্বর্গ ছেড়েছি আজ বহুবছর। স্মৃতিগুলো আজও তরতাজা। আমৃত্যু মনে থাকবে সেই স্বর্গে বাস করার স্মৃতি। শুনেছি এখন ও শিলংয়ে দুর্গাপুজো হয়। যারা আয়োজন করেন, তাদের জানাই কুর্নিশ। শত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। এবছর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত যোগ হয়েছে কোরোনা। শিলং এর দুর্গাপুজো কি রূপ নেয় সেটাই এখন দেখার। আশা করি মা দুর্গা সবাইকে আনন্দে রাখবেন।

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions