প্রবন্ধ - ১০

আসামে বাঙালি - এক অস্তিত্বহীন মানব প্রজাতি এবং সমাধানের পথ
নির্মলেন্দু রায়
প্রাবন্ধিক, তেজপুর

আসামে এই সময়ে বাঙালি এক অস্তিত্বহীন মানব প্রজাতি হয়ে আছে। আসামের শাসক গোষ্ঠী তথা বিরোধীপক্ষ, সকলের দৃষ্টিতেই বাঙালি একেবারেই গুরুত্বহীন। 1985 সালে যখন অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন সেই সময়ের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের মতামত গ্রহণের প্রয়োজনীতা অনুভব করে নি। অথচ, কোন কোন বাঙালি আসামে বসবাস করতে পারবে এবং কারা এই অধিকার হতে বঞ্চিত হবে, বাঙালির মতামত ব্যতিরেকে এই বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। সাম্প্রতিক কালে কেন্দ্রীয় সরকার অসম চুক্তির ছয় নম্বর দফা রূপায়ণের জন্য রিজার্ভ বেঞ্চ সহ ফুটবল টিমের মত এক বিশাল কমিটি গঠন করলেন। কিন্তু, মোট তের জনের সেই কমিটিতে একজনও বাঙালিকে নেওয়া হল না। তা হলে আসামে কি যথাযোগ্য কোন বাঙালি ব্যক্তি নেই! তা কেমন করে হয়! বর্তমান রাজ্য সরকারের অধীনে গণ্ডা গণ্ডা বাঙালি বিদ্বান ব্যক্তি রাজ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরামর্শদাতা রূপে রয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই ধীশক্তিতে অবহেলার পাত্র নন। রাজ্য প্রশাসনে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমন অনেক বাঙালি আসামে রয়েছেন। কিন্তু, তাদের কাউকেই ওই বিশেষ কমিটির সদস্য নিয়োগ করার জন্য উপযুক্ত বিবেচনা করা হল না। তার মানে আসাম রাজ্যের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কোন রাজনৈতিক জটিল অঙ্ক কষে ইচ্ছা করেই কোন বাঙালিকে ওই কমিটিতে নিয়োগ করেন নি। এই ক্ষেত্রে হয়তো কেন্দ্রীয় সরকার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে আচ্ছন্ন স্বদলীয় রাজ্য সরকারকে কোন গোপন আশঙ্কা থেকে দূরে রেখেছেন। কিন্ত, এই করতে গিয়ে বাঙালিদের চুড়ান্ত অবজ্ঞা করেছেন। বাঙালি এমনিতেই এই সময় বিপন্ন। আসামের মন্ত্রীসভায় বরাক উপত্যকা থেকে একজন মাত্র প্রতিনিধি ছাড়া আর কোন বাঙালি নেই। কোন এক দুর্বোধ্য কুটচালে গত লোকসভা নির্বাচনে শাসকীয় দল অনেক কষ্টেসৃষ্টে একজন মাত্র প্রার্থী দিয়েছিল এবং এই একমাত্র বাঙালি প্রার্থীর বিষয়টি আবার নিজেদের প্রার্থী লিস্ট প্রকাশের সময় প্রকাশ্যে প্রকট করা হয়েছিল। শুধু যে বর্তমান শাসকীয় দলই এমন তা নয়। ইতিপূর্বে যে দল পনের বছর ধরে রাজ্যের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল, সে দলও কিন্তু ব্যতিক্রম নয়। দেবেগৌডা নেতৃত্বাধীন পূর্বতন কেন্দ্রীয় সরকার সেই নব্বইয়ের দশকে লামডিং থেকে শিলচর পর্যন্ত রেলপথ মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রথমতঃ, সমকালীন অসম গণ পরিষদ নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার সেই প্রকল্প ঝুলিয়ে রাখল। তারপর, 2001 থেকে 2016 ইংরাজী পর্যন্ত এক নাগাড়ে সুদীর্ঘ পনের বছর রাজ্যের অতি শক্তিশালী কংগ্রেস সরকারও উত্তর কাছাড়ে ডিমাসা উগ্রপন্থীদের অন্তর্ঘাত জনিত আইন শৃঙ্খলার দোহাই দিয়ে সেই কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে লটকে রেখে দেয়। পরবর্তী অটল বিহারী বাজপায়ী সরকার শিলচর থেকে সুরাট গোল্ডেন চতুর্ভুজ সড়ক তৈরির সিদ্ধান্ত নিলে সেই সময়ের কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন যে, সুরাট থেকে চৈখোয়াঘাট না হয়ে শিলচর কেন! তিনি তৎক্ষণাৎ এমন ব্যবস্থা নিলেন যে ডিমাহাসাও জেলার ভেতর সেই বৃহৎ সড়ক প্রকল্প আজ অবধি লটকেই আছে। যাদুকরী মোদীকরিশ্মাও কোন কাজে আসছে না।

এসব হল শাসকীয় দল সমূহের কথা। অন্যান্য রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক দল ও সংগঠন সমূহ কিন্তু এর ব্যতিক্রম নয়। 1979 থেকে 1985 সাল পর্যন্ত অল অসম ছাত্র সংস্থার নেতৃত্বে যে গণ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল, সেই আন্দোলন গতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারিত্রিক দিক দিয়ে বাঙালি বিরোধী হয়ে উঠে। সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল 'বহিরাগত বহিষ্কার' শ্লোগান দিয়ে। আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিতে তারাই ছিলেন 'বহিরাগত" যারা আসাম রাজ্যের বাইরে থেকে এসে বসতি করেছেন। অর্থাৎ, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে যারাই আসামে এসেছেন, তারাই 'বহিরাগত'। এই সব চিহ্নিত 'বহিরাগত'দের একখানা বই লিখেছিলেন সেই সময়ের নবীন লেখিকা রীতা চৌধুরী। অসম সাহিত্য সভা নিজে উদ্যোগী হয়ে সেই বইখানাকে অতি গুরুত্ব সহকারে ছেপে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে। কিন্তু, 'বহিরাগত'দের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন অবশিষ্ট ভারতের কোন সমর্থন লাভ করতে ব্যর্থ হয়। তাই বাধ্য হয়েই আন্দোলনকারীগণ বহিরাগত বিরোধী আন্দোলনকে 'বিদেশি বিতাড়ন' আন্দোলনে রূপান্তরিত করেন। এভাবে আন্দোলনের চরিত্র রূপান্তরিত হতেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনকারীদের সমর্থনে দীড়িয়ে পড়েন। স্বর্গতঃ অটলবিহারী বাজপায়ীজী 'বিদেশি বিতাড়ন' আন্দোলনকারীদের সমর্থনে গুয়াহাটির জজফিল্ডে সভাও করেছেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমর্থন পেয়ে আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠে। কিন্তু, শীঘ্রই এই 'বিদেশি বিতাড়ন' আন্দোলনের বাঙালি বিরোধী চরিত্র প্রকট হয়। 1983 সালে আসাম রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালিদের উপর ভয়ানক আক্রমণ হয়। শিলাপাথার, গহপুর, ডবকা-কুক্কুটবস্তী, নেলী, খৈরাবাড়ী আদি প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, অগ্নিকাণ্ড, বসতভিটা ছারকার আদিতে রাজ্যের সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত হয়।

স্বাধীন দেশে বাঙালি আরো একবার ধন-প্রাণ হারিয়ে নিজেদের ভাগ্যকেই দোষারোপ করেই ক্ষান্ত হল। পরে বাঙালিদের উপেক্ষা করে 'অসম চুক্তি' স্বাক্ষরিত হলে তার প্রতিবাদে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান মিলে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। কালীপদ সেন, তারাপদ ভট্টাচার্য, গোলাম ওসমানী, মৌলানা আহমেদ আলীর নেতৃত্বে সেই দল ভূমিষ্ঠ হয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। 1985 সালের নির্বাচনে সেই দল অনায়াসে 17টি বিধানসভা সমষ্টিতে জয়লাভ করে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে উন্নীত হয়। অসমীয়া জাতীয়তাবাদের চরম বিজয় যাত্রার দিনে বাঙালিদের সম্মিলিত শক্তির 17 আসনে জয়লাভ সেদিন এক অন্য বার্তা বহন করেছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই সম্মিলিত বাঙালির সেই দল শাসনাধিষ্ট অসম গণ পরিষদ সরকারের বিরুদ্ধে বিধানসভায় 'অবিশ্বাস প্রস্তাব'ও পেশ করে সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়েছিল। কিন্তু, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে সেই সম্মিলিত বাঙালির দল ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। বাঙালির আর কোন শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। বাঙালি রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। বাঙালির এই দুর্বলতার সুযোগে বাঙালিদের উপর রাজনৈতিক নিপীড়ন আরম্ত হয়। এই নিপীড়নের প্রক্রিয়াতেই প্রায় বার লক্ষ বাঙালির নাম এন-আর-সি'তে সামিল করা হয় নি। এই লক্ষ লক্ষ বাঙালির ভাগ্যে কি আছে বলা মুশকিল। কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিক সংশোধনী আইন 2019 গ্রহণ করেছে যদিও এন-আর-সি ছুট বাঙালিদের জন্য এই আইন কোন কাজে আসে নি। তাছাড়া, আইন পাশের ছয় মাস পরেও সরকার আইনটি প্রয়োগের জন্য কোন বিধি প্রণয়ণ না করাতে এই আইনের হয়তো ইতিমধ্যেই অপমৃত্য ঘটেছে। তার মানে, সম্পূর্ণ ব্যাপারটাই একটি আই-ওয়াশ এক্সার্সাইজ ছিল! তার মানে বর্তমান শাসক গোষ্ঠী বাঙালিকে বঞ্চনার জন্য চির স্থায়ী ব্যবস্থা করে রেখেছে! এটাই বুঝি বাঙালির ভবিতব্য। স্বাধীনতা সংগ্রামের বেদীমূলে কলস কলস রক্তের প্রবাহ বইয়ে দিয়েছে বাঙালি। 1946 সালের 16 আগষ্ট থেকে পাইকারি হারে বলিদানের যেন লাইন লেগে যায়। কোজাগরী পূর্ণিমাতে নোয়াখালীর গণহত্যা সারা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অতি বীভৎস মাইল ফলক হয়ে রয়েছে। এরপরও নানা রাজনৈতিক চক্রান্তে বাঙালি পাইকারী হারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে আছে। 1960 সালের কথা মনে বাঙালির এখনও শিহরণ হয়। সত্তর দশ কেও আসামে বাঙালিদের দুর্দশা বজায় থাকে। সেই থেকেই বাঙালি ছিন্নমূল হয়ে রয়েছে এবং এই সুযোগে সকলেই বাঙালিদের অবমাননা করে চলেছে। আসাম রাজ্য সরকারের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের এক তরফা সিদ্ধান্তে কয়েক হাজার হাজার বাঙালি 'ঘোষিত বিদেশি' হয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলে আবদ্ধ হয়ে রয়েছেন। সুপ্রীম কোর্টের হস্তক্ষেপে কেউ কেউ জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেলেও তারা 'ঘোষিত বিদেশি' হয়েই আছেন।

সারা পৃথিবীব্যাপী করোনার করাল আগ্রাসনে মনুষ্য জাতির ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যেও আসামের বাঙালি আলাদাভাবে সন্ত্রস্ত রয়েছে। এই সময় আসামের বাঙালি যেন যুগপৎ পার্বত্য অঞ্চলের খাড়া চড়াইয়ের নীচে তথা অতল খাদের কিনারায় দাড়িয়ে আছে। আসামে বাঙালি আজ কোনভাবেই স্বস্তিতে নেই! একদিকে করোনার করাল গ্রাসে মৃত্যুর হাতছানি, অন্যদিকে দেশের নাগরিকত্ব হারিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী হয়ে ক্রমাগত অবহেলা আর অনাদরে মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাওয়া! এই দুই ফলা অস্ত্রে ফালা ফালা হয়ে বাঙালি আজ জর্জর। আসামের রাষ্ট্রযন্ত্র তথা কট্টর আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদীরা আসামে বসবাসকারী আপামর বাঙালিকেই সন্দেহজনক বিদেশি আখ্যায় ভূষিত করছে। তাই প্রতিজন বাঙালিকেই উপযুক্ত কাগজপত্র দেখিয়ে ভারতীয় নাগরিক বলে নিজেদের প্রমাণ করতে হয়। হোক না সে কয়েক প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাসরত! অন্য জাতি সমূহের বেলায় কিন্তু এই বাধ্যবাধকতা নেই! বাঙালি মাত্রেই সন্দেহজনক বিদেশি। তাই তো আসামের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী ৩০টি গোষ্ঠীর জোট বা ৭০টি গোষ্ঠীর অন্য জোট, কেউই বাঙালির কোন সংগঠনকে নিজেদের জোটে সামিল করে নি। অথচ, ১৮২৬ খৃষ্টাব্দে গোয়ালপাড়া অঞ্চলের পর্বতজোয়ার ইস্টেট নিবাসী একজন বাঙালি জয়শঙ্কর গুহ ইয়াণ্ডাবু সন্ধি স্বাক্ষরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন! আসামের সাংস্কৃতিক জগতের উচ্চাসন 'অসম সাহিত্য সভা' প্রতিষ্ঠা যজ্ঞে শ্রীহট্টরের পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ এবং গোয়ালপাড়ার প্রসন্ন কুমার ঘোষ নামক দুই জন বাঙালি ওতপ্রতঃ ভাবে জড়িত ছিলেন! আসামে ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রথম গবেষণা কেন্দ্র 'কামরূপ অনুসন্ধান সমিতি' পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদই গড়ে তুলেছিলেন! আসামের সুধী সমাজ এটা স্বীকার করে যে সাংস্কৃতিক জগতে শ্রীহট্টনন্দন হেমাঙ্গ বিশ্বাসই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন, যাতে, পল্লী অঞ্চলের প্রত্যন্তে নিতান্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যে লালিত পালিত 'বিহু' সংস্কৃতি শহরের আলো ঝলমল মঞ্চে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে! নাগরিক পঞ্জীতে নাম উঠাতে গিয়ে সকল বাঙালি মাত্রেই নিজেদের বাপ-ঠাকুরদাদার 'লিগ্যাসি ডাটা" খুঁজে বের করতে হয়েছে। তারপর আবার নানা রকম প্রমাণ-পত্র দিয়ে বাপ-ঠাকুরদাদার সঙ্গে 'লিঙ্কেজ' দেখাতে হয়েছে। তার পরেও আবার 'বংশবৃক্ষ' পরীক্ষা করা হয়েছে। এত সবের পরেও ৩০ জুলাই ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত খসড়া নাগরিক পঞ্জীতে মোট ৪০,০৭,৭০৮ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। তারপর আবার ৩০ জুন ২০১৯ তারিখে ১,০২,৪৬২ জন
মানুষের নাম খসড়া নাগরিক পঞ্জী থেকে কেটে দেওয়া হয়। সবশেষে ৩১ আগষ্ট ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত চুড়ান্ত খসড়া নাগরিক পঞ্জী থেকে ১৯,০৬,৬৫৭ জনের নামে বাদ পড়েছে। এই সকল পরিত্যক্ত লোকদের অধিকাংশই বাঙালি, যাদের অনেকের কাছেই যথাযথ নাগরিক হিসাবে উপযুক্ত কাগজ-পত্রও রয়েছে। অথচ মোগল আমলের 'ঢেকরি সরকার' তথা থানা-রাঙামাটি অঞ্চল শত শত বৎসর ধরে বাঙালির বাসভূঘি। সেই 'সরকার ঢেকরি' বৃটিশ আমলে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির উত্তর-পূর্ব রঙপুরে রূপান্তরিত হয়ে পরে ১৮৭৪ সালে গোয়ালপাড়া জেলা নামে আসামে সামিল হয়। সেই 'সরকার ঢেকরি' তথা গোয়ালপাড়ার বাঙালি আজ নাগরিক পঞ্জী থেকে ছাটাই হয়ে বিদেশি! গোয়ালপাড়ার সঙ্গে সেই ১৮৭৪ সাল থেকে কাছাড় ও শ্রীহট্ট জেলাও আসামে সামিল হয়। একই প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় থাকার ফলে সেই সময়ের শ্রীহট্ট জেলার মানুষ তখন নানা কারণে আসামের সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। আসামেরই একটি জেলা শ্রীহট্টের আদি নিবাসী হওয়া সত্বেও সেই সময় বা পরবর্তী সময়ে পেশাগত কারণে আসামের সর্বত্র ছড়িয়ে যাওয়া শ্রীহট্টমূলীয় বাঙালিদের 
আজ এক কথায় বিদেশী বলা হচ্ছে।
 

আজ রাজনৈতিক পাশার দানে শ্রীহট্টমূলীয় বাঙালিগণ বিদেশি! অথচ, একসময় আসামের সুধি সমাজ অন্যরকম ভাবতেন। সেই সময় বিনা যুদ্ধ-বিগ্রহে বা উদ্যমে শুধুমাত্র বিদেশি শাসকদের খেয়ালীপনায় ধনধান্য এবং রাজস্বসমৃদ্ধ বিশাল শ্রীহট্টভূমি আসামের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়াতে সমসাময়িক অসমীয়া বিদ্বানগণ খুবই উৎফুল্ল হয়েছিলেন। সাহিত্যরথী লম্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া ১৮৩৫ শক (১৯১৩ খৃঃ) ৪র্থ বছর ৬ষ্ঠ সংখ্যা সাময়িকী 'বাঁহী'তে লিখেছেন, 'শ্রীবেণুধর রাজখোয়া রচিত (নোটস অন দি সিলেটী ডায়লেক্ট” নামক) বইখানা পড়ে আমরা খুব আনন্দিত হয়েছি। ... আমাদের সিলেটী শিক্ষিত বন্ধুগণ এই বইখানা মনোযোগ দিয়ে পড়লে নিজেদের চিনতে পারবেন। তারা নিজস্ব পরিচয় ভূলে আজকাল বাঙালি হতে চাওয়াটা তাদের ইচ্ছাধীন বিষয় এবং সুবিধা-সংক্রান্ত ব্যাপার। কিন্তু আমরা তাদের এটা না বলে পারছি না যে তারা পুরুষানুক্রমে ষোলআনা অসমীয়া।' শ্রীহট্টের অধিবাসীদের অসমীয়া প্রমাণ করতে গিয়ে লম্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া জনৈক তারানাথ চক্রবর্তীর রচিত ও প্রকাশিত তখনকার দিনের আট আনা দামের 'বেউলা' নামের একখানা বই ঘাটাঘাটি করেছেন। ১৮৩৪ শক (১৯১২ খৃঃ) ৩য় বছর ৮ষ সংখ্যা 'বাহী' সাময়িকীতে তিনি লিখেছেন, 'বেহুলার উপাখ্যান যে অসমীয়ার এবং তার উৎপত্তি আসামে, এই কথাতে আমাদের কোন সন্দেহ নেই। চক্রবর্তী মহাশয় বলেছেন যে অসমীয়া কবি দুর্গাবর এবং মনকর এই আখ্যান প্রথমে পদ্যছন্দে রচনা করেন। তাদের পরে নারায়ণ দেব এই আখ্যানকে প্রাঞ্জল ভাষায় পরিবেশন করেন। নারায়ণ দেবকে শ্রীহট্রের লোক বলে ধরে নিয়ে তার রচিত পুঁথি এবং উপাখ্যানটির চরিত্রগুলো বাঙালি বলেই বাঙালিরা মনে করেন। নারায়ণ দেবের পুঁথির ভাষা যে বাংলা নয়, তা আমাদের বাঙালি বন্ধুগণ স্বীকার না করলেও আমরা কিন্তু তা না বলে পারব না। তার (নারায়ণ দেবের) জন্ম স্থান শ্রীহট্ট নয় বলেই আমাদের ধারণা। কিন্তু যদি শ্রীহট্ট হয়েই থাকে, তা হলে এটাই প্রমাণ হয় যে শ্রীহট্ট আগে আসাম বা কামরূপের অংশবিশেষ ছিল এবং এই অঞ্চলের ভাষা ছিল অসমীয়া । শ্রীহট্টীয়গণ নিজেদের পুরানো মাতৃভাষা অসমীয়া ভুলে গিয়ে সমৃদ্ধ বাংলা ভাষাকে নিজের বলে গ্রহণ করে খুব সুপুত্রের মত কীর্তি করেছেন বলে আমরা কি ভাবে বলি। শ্রীহট্ট যে অসমীয়া দেশ এবং সে জায়গার ভাষার কাঠামো এবং অন্তর্নিহিত চেতনা যে অসমীয়া (অবশ্য বিকৃতভাবে), এই কথার ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে। এই বিষয়ে সিলেটিরা যাই বলে থাকুন না কেন!' শ্রীহট্টীয়দের 'অসমীয়া পরিচয়' প্রাণ করতে গিয়ে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া “আবাহন' নামক সাময়িকীর ৬ষ্ঠ বছরের ৮ সংখ্যায় লিখেছেন, 'বিজ্ঞজনেরা বরাবর দেখিয়ে এসেছেন যে তুমি (শ্রীহট্টীয় মানুষ) আসামের পরিপার্শ্বে বসবাসকারী অসমীয়া ছিলে। এখন তুমি নিজেকে অসমীয়া বলতে চাইছ না! নিজেকে বাঙালি বলছ! বল! (এতে) অসমীয়াদের দুঃখ করার কিছু নেই। ধন্দের মধ্যে থাকা মানুষ ইচ্ছা অনুযায়ী এদিকেও থাকতে পারে, ওদিকেও থাকতে পারে। এটা তাদের বিশেষ সুবিধা। (তবে) তোমার ভাষার ছাচটি নিশ্চয় অসমীয়া, (এবং) অবশ্যই বিকৃত। শ্রীযুত রাজখোয়া মহাশয় নিজের বইতে অনেক দিন আগে এই তত্ব সাক্ষ্য-প্রমাণ সহকারে প্রতিপন্ন করে দেখিয়েছেন।' শ্রীহট্টীয়দের 'অসমীয়াত্ব' প্রমাণ করতে গিয়ে বেজবরুয়া মহাশয় ১৮৩৭ শকে 'বাহী' সাময়িকীর ৬ষ্ঠ বছরের ১১শ সংখ্যায় পুনরায় লিখেছেন, “আমাদের রাজখোয়া মহাশয় কিছু সময় আগে শ্রীহট্টের গায়ে (অস্তিত্বে!) সামান্য চুলকে দেওয়াতে উপরের বিদেশি নকল চামড়া উঠে গিয়ে শরীরের মূল অসমীয়া চামড়া প্রায় বেরিয়ে পড়েছিল। আমরা এখনও ভুলে যাই নি যে অসমীয়া-সিলেটি জগ্ননাথ মিশ্র গৌড়বঙ্গের সর্বস্বধন চৈতন্যদেবের পিতৃদেব।

আসামের জাতীয় জীবনে চিরকালীন নমস্য ব্যক্তিত্ব লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার দাবি অনুসারে আজ থেকে পাঁচ শত বছরের কিছু আগে নবদ্বীপ
এবং জগন্নাথপুরীর বিখ্যাত বৈষ্ণব সন্ম্যাসী শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ভারতী তথা সাংসারিক জীবনের বিশ্বম্ভর মিশ্র ওরফে নিমাই পণ্ডিতের পিতৃদেব জগন্নাথ মিশ্র অসমীয়া-সিলেটি ছিলেন। এই সেদিনও সর্বমান্য লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া এবং বেণূধর রাজখোয়াদেব শ্রীহট্ট জেলার সিলেটি মানুষদের অসমীয়া প্রতিপন্ন করতে নিজেদের জীবদ্দশায় সুতীক্ষ্ণ যুক্তিজাল বিস্তার করে সমসাময়িক পত্রপত্রিকাসমূহে শব্দবন্ধের প্রচণ্ড ঝড় তুলেছিলেন। সেদিনের পরিপ্রেক্ষিতে বোধ হয় এটাই ছিল অসমীয়া আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ। বিদেশি শাসকদের সৌজন্যে একেবারে বিনা প্রয়াসে প্রাপ্ত বিশাল ধনধান্যে ভরা শ্রীহট্ট ভূখণ্ডের উপর আসামের স্থায়ী অধিকার সাব্যস্ত করার জন্য অসমীয়া জাতীয়তাবাদের এই কৃত্রিম সম্প্রসারণ সেদিন নিতান্ত প্রয়োজন ছিল। এই সম্প্রসারণ অধিকার সাব্যস্ত করতে গিয়ে হাজার হাজার বছর আগেকার প্রাগেতিহাসিক কালের রাজা ভগদত্ত এবং পরবর্তী খুষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দশক ও সপ্তম শতাব্দীর প্রথম ভাগের রাজা ভাস্করবর্মণের শ্রীহট্ট ভূমির উপর অধিকারের দোহাই দেওয়া হয়। একদা অধিকারের সুত্রে যদি কোন ভূমির উপর চিরকালীন মৌরসি পাট্টা হয়ে যায়, তা হলে, আসামের উপর ব্রহ্মদেশের অধিকারও মেনে নিতে হয়। কারণ, বর্মীয়েরা ১৮শ শতাব্দীর প্রথষ ভাগে আসাম দখল করে নিয়েছিল।একই যুক্তিতে বৃহত্তর গোয়ালপাড়া অঞ্চলের উপর মোগল বংশধরদের অধিকার মেনে নিতে হয়। মধ্যযুগের ১৬১৩ খৃষ্টাব্দ থেকে আধুনিক যুগের ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে এক নাগাড়ে মোগল রাজত্ব ছিল। এরও আগে গৌড়বঙ্গের সুলতান হুসেন শাহ ১৪৯৮ খৃষ্টাব্দে রাজধানী কমতাপুর ধ্বংস করে কামরূপের হাজো নগরকে কেন্দ্র করে মুসলমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উত্তরের পার্বত্য ভূটিয়া জাতি ১৬০৩-১৬৪১ খৃষ্টাব্দ নাগাদ হিমালয়ের পর্বতমালার পাদদেশ হতে ব্রহ্মপুত্র নদের উত্তরপারে গোঁসাই কমল আলি পর্যন্ত সমস্ত সমভূমি দখল করে নিয়েছিল। আহোমরাজ প্রতাপ সিংহ এক লিখিত চুক্তি অনুসারে কামরূপ-দরঙ্গ অঞ্চলে ভূটিয়াদের যাবতীয় অধিকৃত ভূমি এবং গিরিপথ (দুয়ার) সমূহের উপর ভূটিয়াদের অধিকার মেনে নিয়েছিলেন। তা হলে বর্তমান ভুটান দেশ এই সব জমির উপর নিজের অধিকার দাবি করলে উপেক্ষা করা যাবে না! উত্তরের অন্যান্য পার্বত্য জাতি সমূহ, যেষন, চারিদুয়ারের ভূটিয়া, অকা, দফলা এবং মিরি আদি জনগোষ্ঠী আহোম রাজাদের 'পচা' বন্দোবস্তে পাহাড়ের পাদদেশ অঞ্চলের গ্রাম সমূহের সমস্ত উৎপাদিত খাদ্যসামগ্রীর ভোগসত্ব লাভ করেছিল। তেমন বুঝি এখন করা যাবে! প্রায় দু'শ বছর ভারতে বৃটিশ রাজত্ব ছিল বলে কি ইংল্যাণ্ডের রাণীর হাতে আবার
ভারতের সার্বভৌমত্ব সঁপে দিতে হবে! না, আফগানিস্তানের গজনি বা ঘোর রাজ্যের মানুষদের আক্রমণে ভারতবর্ষ এক সময় স্বাধীনতা হারিয়েছিল বলে আবার তাদের হাতেই শাসন ক্ষমতা তুলে দিতে হবে!

.
নবদ্বীপের বিখ্যাত নিমাই পণ্ডিতের বাবা জগন্নাথ মিশ্র বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের চোখে 'অসমীয়া-সিলেটি' বলে
বিবেচিত হয়েছিলেন। সেই সময় ফোকটে পাওয়া শ্রীহট্টভূমির উপর চিরস্থায়ী অধিকার বজায় রাখার জন্য এমন তত্ব তুলে ধরা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু, শত অপপ্রচারেও শ্রীহট্রের মানুষদের 'অসমীয়া-সিলেটি' প্রমাণ করা গেল না। সমসাময়িক বিখ্যাত শ্রী
হট্টীয় চিন্তাবিদ বিপিন চন্দ্র পাল, দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী আদি মনীষীগণ আসামের বিজ্ঞজনদের এই তত্ব গ্রাহ্যই করলেন না। শ্রীহট্টীয়গণ বাঙালি হয়েই রইলেন। ইতিমধ্যে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৩০-এর দশকে আইন অমান্য আন্দোলনের ঘনঘটার মধ্যেই বৃটিশ পার্লামেন্টে 'ভারত শাসন আইন-১৯৩৫, গৃহীত হয়। ১৯৩৭ সালে নতুন আইন অনুসারে প্রায় সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত বৃহৎ আসাম একটি গবর্নর শাসিত প্রদেশ রূপে উন্নীত হয়। ১৮৭৪ সালের ২০ মার্চে ঘোষিত নোটিফিকেশন নম্বর ৪৯ অনুসারে খাসিয়া পাহাড়ে অবস্থিত শিলং শহর সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুখ্য প্রশাসনিক কেন্দ্র রূপে গড়ে উঠেছিল। ১৯৩৭ সালে শিলঙই নতুন প্রদেশের রাজধানী হয়। নতুন আইন অনুসারে ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সারা ভারত জুড়ে প্রদেশ সমূহের ২বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১০৮ সদস্যের আসাম বিধানসভায় কংগ্রেস ৩৩টি সমষ্টিতে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু, তা সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এর বিপরীতে অল ইণ্ডিয়া মুসলিম লীগ মাত্র ১০টি সমষ্টিতে জয়লাভ করে যদিও আঞ্চলিক মুসলিম দল 'আসাম ভ্যালি মুসলিম পার্টি' ২৪টি স্থানে জয়ী হয়। এছাড়া, অন্যান্য দলের ১৪ জন এবং ২৭ জন নির্দলীয় প্রার্থী জয়ী হন। কংগ্রেস সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়ায় মুসলিম লীগ ও আসাম ভ্যালি মুসলিম পার্টির সম্মিলিত বিধায়িনী দলের নেতা রূপে মৌলবি সৈয়দ মোহাম্মদ সাদুল্লা নেতা নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে বৃটিশ সরকার তাঁকে 'স্যার' উপাধিতে ভূষিত করেছে। পরবর্তী ১ এপ্রিল স্যার সৈয়দ মোহম্মদ সাদুল্লা একজন 'প্রীমিয়ার' রূপে আসামের প্রথম সরকার গঠন করেন। কংগ্রেসের গোপীনাথ বরদলৈ বিধানসভায় বিরোধী নেতা রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ৭ এপ্রিলে ১০৮ জন নির্বাচিত সদস্য নিয়ে আসামের প্রথম 'বিধানসভা' গঠিত হয় এবং শ্রীহট্টের বাবু বসন্ত কুমার দাস এই বিধানসভার প্রথম অধ্যক্ষ রূপে নির্বাচিত হন। পর দিন ৮ এপ্রিলে নিম্নতম ২১ তথা উর্ধতন ২২ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চতর সদন রূপে 'বিধানপরিষদ' গঠিত হয় এবং অন্য একজন বাঙালি নেতা মনোমোহন লাহিড়ী বিধানপরিষদের সভাপতি রূপে নির্বাচিত হন। শ্রীহট্টের বসন্তবাবু এবং ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে মনোমোহনবাবু এভাবে নতুন প্রদেশের নেতৃত্বের শিখরে উঠে আসাতে ছদ্ম অসমীয়া জাতীয়তাবাদের শিবিরে তীব্র ত্রাসের সঞ্চার হয়। এখানে উল্লেখ্য, এই উচ্চ সদনে কংগ্রেসের কোন সদস্য ছিলেন না । 

এই সময় হতে অসমীয়া জাতীয়তাবাদ শ্রীহট্টীয়দের প্রতি বিরূপ হতে আরম্ভ করে। লক্ষ্বীনাথ বেজবরুয়ার সম্প্রসারিত জাতীয়তাবাদ ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে আসাম কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা গোপীনাথ বরদলৈ এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বিষ্ণুরাম মেধির উদ্ভতাবনায় সৃষ্ট নতুন জাতীয়তাবাদ তত্ব গৃহীত হয়। অসমীয়া জাতীয়তাবাদের নতুন তত্বে শ্রীহট্টীয় তথা আসামবাসী সমগ্র বাঙালি জনগণ ব্রাত্য হয়ে পড়েন। এই সময় শাসকীয় কোয়ালিশনে ক্ষমতার দ্বন্দে ক্ষোভ দেখা দিলে মুসলিম লীগ সরকারের পতন হয় এবং কংগ্রেস সভাপতি সুভাষ চন্দ্র বসুর সময়োচিত রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় গোপীনাথ বরদলৈর নেতৃত্বে আসামে কংগ্রেস সরকার গঠিত হয়। এরপরও বার কয়েক সরকার অদল বদল হয়। আসামের রাজনীতির এই অস্থিরতার সময়ে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে অসমীয়া জাতীয়তাবাদের পক্ষে একক শক্তিতে সরকার গঠন করা সম্ভব নয়। সে সময় কংগ্রেস দলই অসমীয়া জাতীয়তাবাদী শিবিরিয় একমাত্র দলীয় সংগঠন রূপে প্রতীয়মান হয়। স্বাধীনতার পরবর্তীকালেও কংগ্রেস দল অসমীয়া জাতীয়তাবাদের ভরসাস্থল ছিল। ১৯৬০ সালে রাজ্যভাষা রূপে অসমীয়া ভাষার প্রতিষ্ঠা দাবি করে এই প্রদেশ কংগ্রেস প্রস্তাব পাশ করেছিল। সত্তর দশকের দিকে কংগ্রেসের উপর অসমীয়া জাতীয়তাবাদের ভরিয় নষ্ট হতে আরম্ভ করে। এই পরিস্থিতিতে 'অসম জাতীয়তাবাদী দল" 'পূর্বাঞ্চলীয় লোক পরিষদ' আদি আঞ্চলিকতাবাদী দল গঠিত হয়। শীঘ্রই 'অল আসাম সুডেস্টস ইউনিয়ন' অর্থাৎ আসুর নেতৃত্বে 'বহিরাগত' ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে উঠলে আঞ্চলিক দলসমূহ 'অল আসাম গণসংগ্রাম পরিষদ' নামক একটি জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির অঙ্গীভূত হয়ে আন্দোলনে সামিল হয়ে যায়। পরবর্তীতে 'অসম গণ পরিষদ' নামে একটি খাটি আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হয়। বহিরাগত বা বিদেশি বিতাড়ন আন্দোলনের শুরু হতেই সময় নতুন অসমীয়া জাতীয়তাবাদের সঙ্গে কংগ্রেস দলের দূরত্ব তৈরি হয়। এমন কি বামপন্থী দল সমূহ অসমীয়া জাতীয়তাবাদের শক্রতে পর্যব্যসিত হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য, তুমুল জনপ্রিয়তার মাঝেও অসম গণ পরিষদ ১৯৮৫ সালে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিধানসভায় অর্জন করতে পারে নি। বরাক উপত্যকার তিন জন নির্দলীয় বিধায়ক সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন। পারিতোষিক রূপে এদের একজন মন্ত্রীও হয়েছিলেন। অসম গণ পরিষদ দ্বিতীয় বারও ক্ষমতায় আসে। কিন্তু, দু-দুবার শাসন ক্ষমতায় এসেও তারা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদী অভীষ্ট পূরণে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার পরিণামে আঞ্চলিক দলটির জনপ্রিয়তায় ধ্বংস নামে। দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দলে পলায়ন আরম্ত হয়। বর্তমান সময়ে এদের অনেকেই ভারতীয় জনতা পার্টির শোভাবর্ধন করছেন। আসামের যাবতীয় প্রথিতযশা জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার ব্যক্তিগণ এই দলে ভীড় করে রয়েছেন। জাতীয়তাবাদী শিবিরের প্রমুখ ব্যক্তিগণই এই সময় আসামের মুখ্যমন্ত্রী তথা অন্যান্য মন্ত্রী, বিধায়ক, সাংসদ আদি হয়ে আছেন। এভাবে আমরা গত ১০০ বছরে আসামের আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের বিভিন্ন বিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছি।
 

১৯৩৭ সালে গঠিত বিধানসভার কার্যকাল ১৯৪২ সালে শেষ হয়ে যায়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের জন্য কিছু বিলম্বে ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় বিধানসভার নির্বাচনের জন্য দিন-ক্ষণ নির্ধারিত হয়। আগের বারের অভিজ্ঞতায় পরিপুষ্ট হয়ে এবার বিভিন্ন দল রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে নির্বাচনী যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়। মুসলিম লীগ অন্যান্য মুসলিম দলগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন কোয়ালিশনের অন্তর্ভুক্ত করে। মুসলিম লীগের পরিচালনায় অনেক ভারত বিখ্যাত সাম্প্রদায়িক নেতা 'হিন্দু-সুসলিম দ্বি-জাতি তত্ব নিয়ে আসামের সর্বত্র জোর প্রচার চালিয়ে পাকিস্তান গঠনের জন্য আপামর মুসলমানদের সমর্থন চাইলেন। এদের প্রথম দলে ছিলেন মৌলানা শাহ শরীফ, মৌলানা মহম্মদ ঈশাক, মৌলানা মুসলিম উদ্দিন, মৌলানা আব্দুল করিম এবং দ্বিতীয় দলে ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন, লিয়াকত আলি খান এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী । সুরমা (বৃহত্তর বরাক) উপত্যকা ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রচারের ঝড় উঠে। এমন প্রচার সারা দেশ জুড়েই চলছিল। সব কয়টি প্রদেশেই তখন বিধানসভা সমূহের নির্বাচন হয়। নির্বাচনের এই তুমুল প্রচার চলাকালে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির দ্বারা প্রচারিত নির্বাচনী ইস্তেহারে নতুন অসমীয়া জাতীয়তাবাদের প্রথম দলিল মূর্ত হয়ে উঠে। ইস্তেহারে এটা স্পষ্ট করে বলা হয় যে 'আসাম প্রদেশ যদি অসমীয়া ভাষা এবং সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে গঠিত না হয়, তা হলে অসমীয়া জাতীয়তা এবং সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে।' সেই ইস্তেহারে এটাও সরাসরি স্পষ্ট করে বলা হয় যে, 'বাংলা ভাষাভাষী সিলেট ও কাছাড় (সমতল অঞ্চল) এবং পতিত জমি সমূহে বসতি গড়ে তোলা লক্ষ লক্ষ বাঙালি অভিবাসী তথা আমদানীকৃত জনসমুদায় আসামের বৈশিষ্ট্যতাকে বিনষ্ট করার মত আশঙ্কা তৈরি করেছে। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক প্রচারের সমান্তরালে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি এমন জাতিগত প্রচার অভিযানের মাধ্যমে আসামে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। একই সঙ্গে আসাম প্রদেশ কংগ্রেস অন্য একটি কৌশলও গ্রহণ করে। মুসলিম সামাজিক সংগঠন 'জমিয়ত উলেমা-ই-হিন্দ"এর সঙ্গে কংগ্রেসের নির্বাচনী সমঝোতা হয়। উভয় সংগঠনের আগ্রহে 'কংগ্রেস-জমিয়ত' ফ্রন্ট তৈরি হয়। এই মিত্রজোটের হয়ে প্রচারের জন্য জমিয়তের সর্বভারতীয় নেতা মৌলানা সৈয়দ হোসেন আহমেদ মাদানি সুরমা উপত্যকার নানান জায়গায় কংগ্রেস-জমিয়ত জোটের জন্য জোর নির্বাচনী প্রচার চালান। জমিয়তের প্রচারের ফলে ভোটের ফলাফল প্রভাবিত হয়। ১৯৩৭ সালের তুলনায় কংগ্রেস ২৫টি অধিক সমষ্টিতে সাফল্য লাভ করে। এই সফল মিত্রজোট ১০৮ সদস্যের বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যার অধিক গরিষ্ঠতা অর্জন করে। কংগ্রেস দল সর্বাধিক ৫৮ সমষ্টিতে জয়লাভ করে। জমিয়ত থেকে ৩জন জয়ী হন। মুসলিম লীগ ৩১টি স্থানে জয়ী হয়। ইউরোপীয় প্রতিনিধি ৯জন এবং অন্যান্য ৭জন জয়ী হন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা রূপে গোপীনাথ বরদলৈ ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখে আসামে নতুন সরকার গঠন করেন। এই সরকারের শাসনকালে যুগান্তকারী অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়।
 

শীঘ্রই বৃটিশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ক্লীমেন্ট এটলি ইতিমধ্যে ভারতীয় দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছেন। এই বিষয়ে নীতি নির্ধারণের জন্য ভারত সচিব লর্ড পেথিক-লরেন্সের নেতৃত্বে স্যার স্ট্যরফোর্ড ক্রীক্স ও এ.ভি. আলেকজান্ডারের সমন্বয়ে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যাবিনেট মিশন গঠিত হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম লীগের নেতা মহম্মদ আলি জিন্নাহ আসাম ভ্রমণে আসেন। উদ্দেশ্য, তাদের প্রস্তাবিত মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে আসাম রাজ্যকে সামিল করার জন্য জনসমর্থন সংগ্রহ করা। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে শ্রীহট্ট, শিলং এবং গুয়াহাটিতে বিভিন্ন জনসভায় তিনি ভাষণ দেন। আসামের আব্দুল মতিন চৌধুরী এবং মৌলবি সৈয়দ মহম্মদ সাদুল্লা জিন্নাহ সাহেবকে রাজকীয় সংবর্ধনা প্রদান করেন। বিশিষ্ট অতিথির সম্মানে গুয়াহাটির প্রধান রাজপথে ৫ মার্চে ৫টি তোরণদ্বার সুসজ্জিত করে তোলা হয়। প্রতিটি সমাবেশে জিন্নাহ মুসলিম সমাজের কাছে আহ্বান জানান যাতে আসাম প্রদেশকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সকলে সর্বান্তকরণে সহযোগিতা করেন। ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন সরকার তৈরি হওয়ার পর পরই জিন্নাহ'র এই চ্যালেঞ্জ আসামের রাজনীতিকে অস্থির করে তোলে। মে মাসের ১৬ তারিখে ক্যাবিনেট মিশন এক নতুন 'গ্রুপিং ফরমূলা' ঘোষণা করেন। এই প্ল্যান অনুসারে বৃটিশ শাসিত ভারতের প্রদেশগুলোকে ৩ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথম 'এ' গ্রুপে এমন প্রদেশগুলোকে রাখা হয়, যাতে হিন্দু ধর্মীয় জনগণ সংখ্যা গরিষ্ঠ। দ্বিতীয় 'বি' গ্রুপে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগু লোকে রাখা হয়। তৃতীয় 'সি' গ্রুপে এমন প্রদেশ বা অঞ্চলগুলোকে রাখা হয়, যাতে অতি সামান্য জনসংখ্যার ভিত্তিতে হিন্দু বা সুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্দিষ্ট হয়েছে। এই সব রাজ্যের পর্যায়ে পড়ে শুধু বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এবং আসাম। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য সামান্য পার্থক্যের জন্যই মুসলিম লীগ দলকে সম্পূর্ণ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি এবং আসামকে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করার জন্য অতিরিক্লি প্রচেষ্টা করতে হয়।

সেই সময় আসাম প্রদেশ কংগ্রেস প্রধানতঃ ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ ছিল। শ্রীহট্ট ও কাছাড় জেলার কংগ্রেস কমিটিদ্বয় বেঙ্গল কংগ্রেস
কমিটির অন্তর্গত ছিল। আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি ক্যাবিনেট মিশনের গ্রুপিং প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ৫ জুন তারিখে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার গোলাঘাট, যোরহাট, তিনসুকিয়া, ধুবড়ী, নলবাড়ী আদি স্থানে 'গ্রুপিং বিরোধী দিবস' প্রতিপালিত হয়। উপত্যকার বিভিন্ন শহরে দোকানপাট বন্ধ থাকে। আইনবিদগণ কোর্ট-কাছারি বয়কট করেন। ১৬ জুলাই তারিখে গ্রুপিং-এর প্রতিবাদ করে প্রীমিয়ার গোপীনাথ বরদলৈর আনা প্রস্তাব মৌলানা ভাসানী এবং মৌলবি সৈয়দ মহম্মদ সাদুল্লার প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও আসাম বিধানসভায় পাশ হয়। অবশ্য ইতিমধ্যে জনতার অগোচরে আরো অনেক কিছুই হয়। পরবর্তীকালে জানা গেছে যে ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসেই প্রীমিয়ার গোপীনাথ বরদলৈ ক্যাবিনেট মিশনের কাছে এটা পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে আসামকে 'গ্রুপিং' থেকে আলাদা করার বিনিময়ে আসামের সম্পূর্ণ শ্রীহট্ট জেলাকে প্রস্তাবিত পাকিস্তানে হস্তান্তর করতে আসাম সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে। ভারতে বৃটিশ রাজ-প্রতিনিধি লর্ড ওয়াভেল এমন ভাষাতেই নিজের 'এপ্রিল ১৯৪৬ জার্নাল'-এ লিখেছেন শ্রীহট্ট জেলাকে পূর্ববঙ্গে অর্থাৎ পাকিস্তানে বিসর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েই আসামের কংগ্রেসি প্রীমিয়ার গোপীনাথ বরদলৈ ক্যাবিনেট মিশনের গ্রুপিং থেকে আসামকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন।' এভাবেই আসামের শাসক দলের সৌজন্যেই ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে আসামেরই এক ভূখণ্ডকে তখনো অস্তিত্বহীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধিকারের ব্যবস্থা হয়ে যায়। অথচ, মাত্র কয়েক বছর আগেই এই শ্রীহট্ট ভূমির উপর প্রথিতযশা সাহিত্যিক লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া আসামের চিরকালীন ভৌগলিক অধিকার তথা সার্বভৌমত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন বিভিন্ন সভা-সমিতি এবং সাময়িকীতে। খুষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে যাঁরা কুমার ভাস্করবর্মণের প্রজা ছিলেন, মধ্যযুগে যে ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা জগন্নাথ মিশ্রকে লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অসমীয়া বলে দাবি করেছিলেন, সেই ভূখণ্ডের বাসিন্দা বর্তমানকালের সিলেটিদের এভাবে গ্রুপিং-এর যুপ কাষ্টে আসাম সরকারের উদ্যোগে বলি দেওয়া হল! আসাম এভাবে নিজের চিরকালীন অধিকৃত ভূমির দাবি ত্যাগ করল!

গ্রুপিংয়ের এই জাঁতাকলে যখন শ্রীহট্টীয়দের চরম সর্বনাশ চূড়ান্ত হয়েছে, তখন তাদের পাশে কোন রাজনৈতিক শক্তি উপস্থিত ছিল না। শ্রীহট্ট ও কাছাড়ের জেলা কংগ্রেস আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের অন্তভুক্ত ছিল না। তাই, শ্রীহট্ট ও কাছাড়ের মানুষের প্রতি আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের কোন দায়বদ্ধতা ছিল না। অন্যদিকে বাংলা প্রদেশ কংগ্রেস নিজেই বৃহৎ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির 'গ্রুপিং' স্থিতি নিয়ে বিব্রত ছিল। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির হিন্দুদের কিভাবে পাকিস্তানের গ্রাস থেকে রক্ষা করা যায়, সেটাই তাদের কাছে মুখ্য সমস্যা ছিল। ইতিমধ্যে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টে মহম্মদ আলি জিন্নার 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন' ঘোষণা অনুসারে কুখ্যাত 'ক্যালকাট্টা কিলিং' আরম্ভ হয়েছিল। ২৯ আগস্টে পূর্ববঙ্গের নোয়াখালী জেলায় ফেণী নদীতে হিন্দু জেলেদের উপর আক্রমণ হয়। এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই ১ সেপ্টেম্বরে পূর্ববঙ্গের পাবনা আশ্রম ত্যাগ করে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সপরিবারে বিহার রাজ্যের দেওঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ঠাকুর তখন কলকাতা বা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কোন হিন্দু বহুল অঞ্চলে আশ্রয় নিতে ভরসা করতে পারেন নি। কারণ, অখণ্ড বাংলা অর্থাৎ পুরো বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সেই সময় গ্রুপিং-এর 'সি' শ্রেণীবিভাগের অন্তর্গত হয়ে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তাই, দূরদর্শী ঠাকুর সোজা বিহারেই আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই সময় পূর্ববঙ্গের সাম্প্রদায়িক হিংসা তীব্র আকার ধারণ করে। সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে হিন্দুদের দোকানপাট লুট এবং অগ্নি সংযোগ হয়। ২ অক্টোবর থেকে ঘন ঘন হত্যাকাণ্ড আরম্ভ হয়। ১০ অক্টোবর কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে নোয়াখালীর গণহত্যা আরম্ত হয়। ভূতপূর্ব সিপাহিদের দিয়ে গড়ে তোলা গোলাম সরোয়ার হোসেনের মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডস ঝাঁপিয়ে পড়ে রামগঞ্জ, বেগমগঞ্জ, রায়পুর, লক্ষীপুর আদি স্থান সমূহে। হাজার হাজার নিরীহ হিন্দুদের হত্যা হয়। দলে দলে নারী অপহরণ হয়। গ্রামের গ্রাম ভস্মীভূত হয়। শীঘ্রই কুমিল্লার বিভিন্ন গ্রামেও হিংসা ছড়িয়ে যায়। যেখানে সেখানে গণহত্যা চলতে থাকে। এই অবস্থায় মানুষ দিশাহারা হয়ে উঠে। গ্রুপিংয়ের ষড়যন্ত্র আড়ালে পড়ে যায়। অবস্থা একটু থিতিয়ে আসতেই দলমত নির্বিশেষে বাংলার হিন্দু নেতৃত্ব বাংলার হিন্দুদের জন্য ভূখণ্ড সংরক্ষণের জন্য যত্রবান হয়ে উঠেন। ১৯৪৭ সালের ২৯ মার্চ ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন বাঙালি হিন্দুদের জন্য পৃথক বাসভূমির প্রস্তাব পাশ করে। পরবর্তী এপ্রিল মাসের ৪ থেকে ৬ তারিখ পর্যন্ত বাংলা প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা তারকেশ্বরে তিন দিনের একটি মহাসম্মেলন আয়োজন করে। সেই সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক বাসভূমি তৈরির জন্য প্রস্তাব গৃহীত হয়। সমান্তরালভাবে, এপ্রিলের ৪ তারিখেই বাংলা প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিও বঙ্গ বিভাগ করে হিন্দু বাঙালিদের জন্য আলাদা রাজ্য গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। সম্পূর্ণ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্তির বিরুদ্ধে ২৩ এপ্রিল তারিখে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর আহ্বানে এক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। সি-পি-আই অর্থাৎ ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি নিয়ন্ত্রিত শ্রমিক সংগঠন সি.আই.টি.ইউ. সেদিনের সেই ধর্মঘট বয়কট করা সত্ত্বেও তা স্বতঃস্ফুর্ত জনসমর্থন লাভ করে। পুরানো পরম্পরা অনুসারে বরাবরই ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি স্বজাতি বিরোধী অবস্থান নিয়ে থাকে। তাদের সুসংগঠিত বিরোধিতা সত্বেও, হিন্দু বাঙালিদের জন্য আলাদা বাসভূমির দাবিতে জনমত শীঘ্রই অতি তীব্র হয়ে উঠে। ২০ জুন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বিধানসভায় সব হিন্দু সদস্যগণ আলাদাভাবে প্রস্তাব পাশ করে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর হিন্দু বহুল এলাকা গুলি নিয়ে হিন্দুদের জন্য আলাদা বাসভূমি গঠন করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এরই সঙ্গে পুনরায় বঙ্গ ভঙ্গ করে 'পশ্চিমবঙ্গ' রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। ভাগ্যের কী পরিহাস! ১৯০৫ সালে যে বাঙালি মনীষা বঙ্গ ভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন, পরিবর্ত পরিস্থিতিতে তারা নিজেরাই অনোন্যপায় হয়ে ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে নিজেদের জন্য এক পৃথক বাসভূমি গঠন করতে গিয়ে সেই প্রিয় বঙ্গভূমিকে ভঙ্গের দাবিতে আন্দোলন মুখর হয়ে উঠে এবং বিদেশী শাসক গোষ্ঠীর বিভেদ নীতিই অবশেষে সাফল্য মণ্ডিত হয়। ২৮ জুন ডঃ প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে একটি ছায়া মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে 'পশ্চিমবঙ্গ' রাজ্য গঠনের অবধারণা রাজনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত হয়ে উঠে।

ক্যাবিনেট মিশনের দৌত্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন অবশ্যস্তাবী হয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে দেশ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠে। প্রীমিয়ার গোপীনাথ বরদলৈ স্বেচ্ছায় আসাম থেকে শ্রীহট্ট জেলা ছাটাইয়ের প্রস্তাব দিলেও শ্রীহট্টের মানুষজনের ঘোর প্রতিবাদে সরকার বাহাদুর শ্রীহট্টে গণভোট নিতে বাধ্য হন। ১৯৪৭ সালের ৬-৭ জুলাই তারিখে কুখ্যাত 'সিলেট রেফারেন্ডাম' অনুষ্ঠিত হয়। কুখ্যাত এজন্যই বলা হচ্ছে, কারণ এই গণভোটে কোন গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় নি। শ্রীহট্ট জেলার চা-বাগিচায় বসবাসকারী আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী ও হিন্দীভাষী লোকদের ভোটাধিকার দেওয়া হয় নি। কারণ হিসাবে বলা হয় যে তারা না কি এই অঞ্চলের মূল বাসিন্দা নন! গোপীনাথ বরদলৈর সরকার এই যুক্তি বিনা বাক্যে মেনে নেন। এই ব্যবস্থায় আদিবাসী ও হিন্দী ভাষী লোকদের ভোট না দেওয়ার ফলেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গ্যাড়াকলে পড়ে হিন্দু গরিষ্ঠ শ্রীহট্ট জেলা পূর্ব-পাকিস্তানে সামিল হয়ে যায়। এভাবে স্বাধীন ভারত একটি সমৃদ্ধ ও বর্ধিষ্ণু জনপদের অধিকার হতে বঞ্চিত হয়। যার ফলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাষের প্রথম সারীর নেতা বিপিন চন্দ্র পাল তথা লক্ষ লক্ষ
হিন্দু মানুষের বাসভূমি 'সুন্দরী শ্রীভূমি' রাতারাতি চিরকালের জন্য পরদেশে রূপান্তরিত হয়। শ্রীহট্টের মানুষ হাজার হাজার বছরের বাসভূমি হতে চিরতরে উৎখাত হয়। আর কী পরিহাস! সেই ১৯৪৭ সালের সিলেট রেফারেন্ডামে যে সব আদিবাসী ও হিন্দী ভাষী লোকদের ভোট দেওয়ার যোগ্যতা স্বীকার করা হয় নি, তাদের নাম এই সময় কোন রকম দস্তাবেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এন-আর-সি-তে সরাসরি প্রবেশাধিকার লাভ করেছে! কিছু সময়ের ফেরে চূড়ান্ত বিপরীত ধর্মী ব্যবস্থা! নেপালিদের ক্ষেত্রেও এন-আর-সি-তে অবাধ প্রবেশাধিকার স্বীকার করা হয়েছে! এসব শুধু এই যুক্তিতে যে এই সকল জাতি গোষ্ঠীর আসামে অভিবাসনের সঙ্গে বাংলাদেশের কোন সম্পর্ক নেই!

উনবিংশ শতাব্দীতে ১৮৭৪ সালে বিদেশি শাসনের অভিশাপে শ্রীহট্টভূমি একটি জেলা হিসাবে চীফ কমিশনার শাসিত নবীন আসাম প্রদেশের অঙ্গীভূত হয়েছিল। দীর্ঘ 146 বছর পরে এই একবিংশ শতাব্দীর 2020 ইংরাজীতেও সেই বৃহৎ শ্রীহট্ট জেলার একটি অংশ আসামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়েই আছে। ১৯৪৭ সালের কুঅভিসন্ধিমূলক সিলেট রেফারেণ্ডামের ফলে শ্রীহট্টের বৃহত্তর অংশ পূর্ব-পাকিস্তানে চলে গেলেও সেই বর্ধিষ্ণু শ্রীহট্টের অংশবিশেষ এই সময় পর্যন্ত আসামের অঙ্গীভূত হয়েই আছে এবং সেটাই বর্তমানের করিমগঞ্জ জেলা। সেই একোমেবদ্বিতীয়ম শ্রীহট্টের অংশ-বিশেষ করিমগঞ্জ জেলার মানুষগণ এখন আর অসমীয়া নন! এই সময়ের কট্টর অসমীয়া জাতীয়তাবাদী শিবিরের দৃষ্টিতে শ্রীহট্টীয়রা সকলেই হিন্দু বাংলাদেশী। অথচ, সাহিত্যরথী লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া একসময় বলেছিলেন যে শ্রীহট্টীয় মানুষগণ মূলতঃ অসমীয়াই! স্বনামধন্য লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়ার সমকালীন অন্যান্য বিজ্ঞ অসমীয়া জাতীয়তাবাদের প্রবক্তাগণ শ্রীচৈতন্য দেবকেও অসমীয়া বলে দাবি করেছিলেন। একনাগাড়ে প্রায় দেড় শত বছর যাবৎ আসামরাজ্যের স্থায়ী অধিবাসী তথা চিরন্তন ভারতীয় নাগরিকরপে স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধা শ্রীহট্টীয়গণ এই সময় একদল ঘোর ফ্যাসিষ্টদের ষড়যন্ত্রে 'হিন্দু বাংলাদেশী' সাব্যস্ত হয়ে যাবেন! স্বাধীন দেশের সংবিধান, হাজার হাজার বছরে গড়ে ওঠা নীতিশাস্ত্র, আধুনিক আইন বিজ্ঞান ইত্যাদি কি দেশের স্বার্থ বিরোধী একদল ফ্যাসিষ্টদের তালুবন্দী হয়ে গেছে! শ্রীহট্টীয়গণ ছাড়াও পূর্ব-বঙ্গীয় মূলের অন্য বাঙালিদেরও এই ফ্যাসিষ্টগণ বিনাবাক্যে ব্যয়ে যথার্থ ভারতীয় বলে স্বীকার করছে না। এ ব্যাপারে এদের চোখের পর্দা নেই। অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয় যে উত্তর পূর্বাঞ্চলের যে কোন জাতি বা উপজাতিদের কেউই জাতিগতভাবে বিদেশী মূলের বলে মানা হচ্ছে না। যদিও বাঙালি ছাড়াও অনেক জাতি ও উপজাতি পূর্ব পাকিস্তান থেকে এদেশে শরণার্থী হয়ে এসেছেন। চুড়ান্ত খসড়া থেকে বাঙালি ছাড়া যে সব পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ হতে আগত জাতি-উপজাতিদের নাম বাদ পড়ে গেছে, তাদের যাতে বিদেশী ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হতে না হয়, তাদের নাম যাতে সরাসরি চুড়ান্ত তালিকাতে সামিল হয়, সে ব্যাপারে জোর সুপারিশ হয়েছে। এমন কী, বাঙালি ছাড়া অন্য জাতি-উপজাতিদের সমর্থনে সুপ্রীম কোর্টে নাকি 'পি-আই-এল' অর্থাৎ পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনও দায়ের করা হয়েছে। অন্যদের জন্য এক এবং বাঙালিদের জন্য পৃথক আইনি ব্যবস্থা! এটাই গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষ! তাই, করোনারির মারণ ছোবলের মুখোমুখি হয়েও বাঙালি নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিহরিত হচ্ছে।

 

বাঙালিদের এই অবস্থায় 1985 সালের মত পুনরায় রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত হতে হবে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার নেতৃস্থানীয় বাঙালিগণ ইতিমধ্য শোণিতপুর জেলার ঢেকিয়াজুলিতে গত দশ ও এগার অক্টোবরে একত্রিত হয়ে একটি পাঁচ বছরের পুরানো রাজনৈতিক দলকে পুনর্গঠিত করেছেন। অবশ্য এই প্রক্রিয়ায় বরাক উপত্যকার শুভদীপ দত্তও সক্রিয় ভাবে রয়েছেন। এই দলটির মাধ্যমে আগামী বিধানসভার নির্বাচনে খুব জোর প্রতিদ্বন্দিতা করে বেশ কয়েকটি সমষ্টিতে জয় হাসিল করে রাজনৈতিক শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলেই বাঙালিদের স্বার্থের পরিপন্থী ফ্যাসিষ্ট গোষ্ঠীগুলির শক্তিক্ষয় হবে এবং তাতেই ধীরে ধীরে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রের অবসান হবে। খষি বঙ্কিষচন্দ্র, খষি অরবিন্দ, বিপিনচন্দ্র পাল, স্বামী বিবেকানন্দ ও নেতাজী সুভাষ আদি প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষদের সৃষ্ট ভারতীয় রাস্ট্রীয়তাবাদের উত্তরাধিকারী হয়ে বাঙালি অবশ্যই সগর্বে মাথা তুলে দীড়াবে। জয় হিন্দ! বন্দে মাতরম্‌!

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions