প্রবন্ধ - ১১

বরাক উপত্যকায় বঙ্গীয় সংস্কৃতি :  প্রাথমিক পর্যালোচনা
অধ্যাপক অমলেন্দু ভট্টাচার্য
সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক, শিলচর

আসামের দক্ষিণতম তিনটি সমতল জেলা— কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ একত্রে বরাক উপত্যকা নামে পরিচিত৷ এই অঞ্চলের প্রধান নদীর নাম বরাক৷ নাগা পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উৎপন্ন হয়ে মণিপুরের উপর দিয়ে এসে বরাক নদী পূর্ব সীমানা দিয়ে কাছাড় জেলায় প্রবেশ করেছে৷ এরপর পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে হরিটিকর নামক স্থানে দুই শাখায় বিভক্ত হয়েছে৷ শাখা নদী দুটির নাম—সুরমা ও কুশিয়ারা৷ এই দুটি নদীই পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে৷৷ নদীর নামেই উপত্যকাটি বরাক উপত্যকা নামে চিহ্নিত৷ বাক উপত্যকার উত্তরে বড়াইল পাহাড়, পূর্বে মণিপুর, দক্ষিরে মিতোরাম, পশ্চিমে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমানা৷ তিন দিকে পাহাড় ঘেরা বরাক উপত্যকার পশ্চিম দিকই শুধু উন্মুক্ত৷ দূর অতীতে এই পথেই বঙ্গ সংস্কৃতির প্রবাহ এসে পৌঁছেছিল এখানে৷ প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার জন্য বঙ্গ সংস্কৃতির পূর্ব মুখী যাত্রা বরাক উপত্যকায় এসে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল৷অর্থাৎ বঙ্গসংস্কৃতির পূর্রপ্রান্তবর্তী শেষতম ভূমি বরাক উপত্যকা৷ এ প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন, “বরাক ও সুরমা নদীর উপত্যকা তো মেঘনা উপত্যকারই (মৈমনসিং–ত্রিপুরা–ঢাকা) উত্তরাংশ মাত্র৷ এই দুই উপত্যকার মধ্যে প্রাকৃতিক সীমা কিছু নাই বলিলেই চলে এবং এই কারণেই প্রাচীনন ও মধ্যযুগে পূর্ব বাঙলার এই কয়টি জেলার—বিশেষ ভাবে ত্রিপুরা ও পূর্ব মৈমনসিং জেলার সংস্কার ও সংস্কৃতি এতত সহজে শ্রীহট্ট কাছছাড়ে বিস্তার ললাভ করিতে পারিয়াছিল৷ এখনও শ্রীহট্ট কাছাড়ের হিন্দু-মুসলমানের সমাজ ও সংস্কৃতি বাংলারয পূর্বতম জেলাগুলির সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা৷ শুধু তাহাই নয়, লৌকিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনও বাংলার এই জেলাগুলির সঙ্গে৷

নীহাররঞ্জন রায়ের এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করা যেতে পারে৷ বরাক উপত্যকার অন্তর্গত করিমগঞ্জ জেলা দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত ছিল সিলেট (শ্রীহট্ট) জেলার একটি মহকুমার সিলেট-কাছাড়ের সংস্কৃতি অভিন্ন হওয়ার জন্য ব্রিটিশ আমলে সিলেট-কাছাড়কে একত্রে বলা হতো সুরমা উপত্যকা৷ কারণ সিলেট শহরটি ছিল সুরমা নদীর তীরে৷ খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সিলেট-কাছাড় হরিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল৷ “বলা বাহুল্য, বরাক উপত্যকার ইতিহাসের মূল কাঠামো তৈরি হয়ে গিয়েছিল সুদূর প্রাচীন যুগের আর এই কাঠামোর সবচেয়ে গতিশীল যে প্রভাবটি লক্ষণীয় সেটা হচ্ছে এই উপত্যকার ভৌগোলিক অবস্থান৷...ভৌগোলিক ও সামাজিক কারণেই এই উপত্যকা পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব বঙ্গের সমতট, বঙ্গ, হরিকেল ইত্যাদি রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে ইতিহাসের বুকে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছিল৷ উত্তর কাছাড়া পর্বতমালার অবস্থানের জন্য সে যুগে ব্রহ্মপুত্র উত্যকার সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব ছিল না৷”

 

একাদশ শতাব্দীতে শ্রীহট্ট কাছাড় নিয়ে গঠিত হয় স্বাধীন শ্রীহট্ট রাজ্য৷ শ্রীহট্ট রাজ্যের অবসানের পর ক্রমান্বয়ে ত্রিপুররী, কোচ ও হেড়ম্ব (ডিমাসা) রাজারা এখানে রাজত্ব করেছেন৷ হেড়ম্ব রাজ্যের শেষ রাজা গোবিন্দচন্দ্র নারায়ণ ১৮৩০ খ্রিঃ নিহত হবার পর ১৮৩২ খ্রিঃ ১৪ আগস্ট কাছাড়া ব্রিটিশদের দ্বারা অধিগৃহীত হয়৷ ইতিহাসের এই বহমান ধারায় আবহকাল কাল থেকে বরাক উপত্যকার মূল সাংস্কৃতিক ধারাটি বঙ্গীয়৷ সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠবে বরাক উপত্যকা আসামের অন্তর্ভুক্ত হল কীভাবে? সুরমা উপত্যকাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশরূপে গঠন করা হয় ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে৷ এই গঠন প্রক্রিয়ার কারণগুলি ছিল—প্রথমত, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির আয়তন এত বড় চিল যে পূর্ব ও উত্তর সীমার প্রান্তীয় অঞ্চল শাসন পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছিল৷ দ্বিতীয়ত, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও সুরমা উপত্যকা চিল চা-উৎপাদনকারী অঞ্চল৷ এই দুই উপত্যকাকে এক শাসনতান্তি্রক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করলে বযবসায়িক দিক থেকে সুবিধা হবে৷ তৃতীয়ত, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ ছিল কম৷ রাজস্বের এই ঘাটতি পুররের জন্য বঙ্গভাষী অঞ্চল সিলেট কাছাড়কে আসমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়৷ এই সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ওই সময়েই শ্রীহট্ট-কাছাড়বাসী তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন : “The reaction of the people of Surma Valley to the transfer of their area to Assam was a manifestation of the Level of Political consciousness and an awareness of their identity and their cultural and linguistic affinity with Bengal. Situated in the north-east corner of Bengal, this tiny valley could be well be described as Ishan Banga (or North-East Bengal) in geographical context, although the state formation process in the region and the ethnic, linguistic and cultural traits of the population had made in almost inceparable from North-East Bengal. This commonality of heritage prompted the people lto react spontaneously to the separation.”

তিন দিক অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় আসা-যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল জলপথ৷ নদীর নামটিও তাৎপর্যপূর্ণ৷ প্রচলিত মত অনুযায়ী আঁকাবাঁকা বলে নদীটিকে বলা হত বরবক্র৷ বরবক্রের তদ্ভব রূপ বরাক৷ কিন্তু সংস্কৃত ও বাংলা অভিধানে বরাক একটি স্বতন্ত্র শব্দ৷ অর্থ, প্রার্থনাশীল, শোচনীয়, দুর্গত, দীন ইত্যাদি৷ আমাদের অনুমান, পাহাড়ঘেরা জলা-জংলায় পরিপূর্ণ এই প্রান্তীয় অঞ্চলে যারা বসবাস করতেন তাদের অবস্থা ছিল শোচনীয়৷ অন্যদের দৃষ্টিতে তারা ছিলেন দুর্গত মানুষ৷ এই পরিপ্রেক্ষিতে দূর অতীতে নদীটির নামকরণ করা হয়েছিল বরাক৷

সুপ্রাচীন কালেই যে এখানে বঙ্গীয় জনবসতি গড়ে উঠেছিল তার প্রমাণ রয়েছে স্থানীয় জীবনচর্চার পরতে পরতে৷ সুদৃঢ় কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠলেই একটি অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের প্রয়োজন হয়৷ বরাক উপত্যকায় ভূমি পরিমাপের নিজস্ব একক রয়েছে৷ এককগুলি এরকম—জস্টি, পোওয়া, কেদার/কিয়ার, বিঘা, হাল, কুল/কুলবা৷ কেদার, হাল (হল) ও কুল/কুলবা প্রাচীন ভারতে ব্যবহৃত ভূমি পরিমাপের একক৷

 

ইতিহাসবিদ দীনেশচন্দ্র সরকার ‘কুলবা’ একক বিষয়ে লিখেছেন, “বাংলায় দোন এবং আঢ়া অর্থাৎ প্রাচীন দ্রোরবাপ এবং আড়বাপ বা আঢ়কবাপের সন্ধান পাওয়া যায় বটে কিন্তু কুল্যবাপের মত কোনও ভূমিমাপের নাম পাইনি৷ কিন্তু কাছাড়ে প্রচলিত ‘কুল্যবায়’ সংজ্ঞক যে ভূমি পরিমাপের কথা শোনা যায়, সেটি প্রাচীন কুল্যবাপ নামটির অপভ্রংশ হতে পারে৷ কাছাড়ে ১৪ বিঘা জমিতে কে কুলবায় হয়৷ কিন্তু গুপ্তযুগের কুল্যাপ এর চেয়ে অনেক বড় ছিল, তাতে সন্দেহ নেই৷”

ব্রিটিশ অধিগ্রহণের পূর্ববর্তী কাল পর্যন্ত কাছাড়ে গ্রাম শাসনের নিজস্ব নিয়ম ছিল৷ “They had a constitution of their own, based on a revenue system now perculiar to Cachar, which is perhaps a vestige of the onece great Cachari kingdom. The fundamental principle of this system was the holding of land by a number of persons connected by voluntary association. The Unit of the system was the khel.”

 

কাছাড়ের কৃষিভিত্তিক রাষ্ট্রমণ্ডলের নিমানতম একক ছিল ‘খেল’৷ ‘খেল’–এর সদস্যরা শাসনতান্ত্রিক সম্বন্ধে আবদ্ধ ছিলেন৷ রাজস্ব সংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব ছিল যৌথ৷ ‘খেল’–এর সদস্যরা রাজস্ব এবং অন্যান্য শাসনতান্ত্রিক ব্যাপারে “খেল” প্রধানের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন৷ লক্ষণীয় যে, মনুসংহিতায়, মহাভারতে, কৌটিল্যের প্রধানের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন৷ লক্ষণীয় যে, মনুসংহিতায়, মহাভারতে কৌটিল্যের অর্থশাস্তে্র একই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর কথা রয়েছে৷ ইতিপূর্বে কেউই ‘খেল’ শব্দের উদ্ভব সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি৷ আমাদের অমুনান, ‘খিল’ শব্দ থেকে ধ্বনি পরিবর্তনের প্রভাবে ‘খেল’ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে৷ ‘খিল’ শব্দের অর্থ অচষা বা অকৃষ্ট ভূমি৷ সাধারণত অচষা ভূমি চিাষের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়৷ উল্লেখ্য যে, মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে অনাবাদি জমি অর্থে ‘খিল ভূমি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে; ‘সরকার হৈল কাল/খিল ভূমি লিখে নাল/বিনি উবগারে খায় ধুতি৷’

একটি অঞ্চলের জনবসতির প্রাচীনতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত সংস্কার-বিশ্বাসও একটি উপাদান হিসেবে গণ্য হতে পারে৷ বরাক উপত্যকায় বঙ্গীয় হিন্দু সসমাজে প্রচলিত সংস্কার বিশ্বাসগুলি আলোচনা করলে দেখা যায়, আপাত দৃষ্টিতে যেসব সংস্কার-বিশ্বাস লৌকিক বলে মনে হয় সেগুলি আসলে স্মৃতিশাস্ত্রের নির্দেশ৷ যেমন—

১. স্থানীয় সংস্কার   :  

 

গরু বান্ধার দড়ি ডেইত (অ) পারে না৷             

(গো বন্ধনের রজ্জু উল্লঙ্ঘন করতে নেই)

                

জল (অ) নিজর ছায়া দেখত পারে না৷           

(জলে আত্মপ্রতিবিম্ব দর্শন করতে নেই)

  

মনুসংহিতা     :  

ন লঙ্ঘয়েদ্বৎসতন্ত্রীং ন প্রধাবেচ্চ বর্ষতি৷

ন চোদকে নিরীক্ষেত স্বং রূপমিতি ধারণা৷৷ (৪৷৩৮)

(অনু) :   বৎস–বন্ধনের রজ্জু উল্লঙ্ঘন করিবে না; বারিবর্ষণ কালে দৌড়িয়া যাইবে না এবং জলে আপনারা প্রতিব্বি দেখিবে না৷

 

২. স্থানীয় সংস্কার   :  

 

দাত কড়মড়ি করলে ছাবালর আয়ু কমে৷

(দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণ করলে সন্তানের আয়ু কমে৷)

  

মনুসংহিতা     :  

নাস্কোটয়েন্ন চ ক্ষেড়েন্নচ বক্তো বিরাবয়েৎ৷৷ (৪৷৪৬)

(অনু) :   দন্তে দন্তে ঘর্ষণ করিয়া শব্দ করিবে না কিংবা অনুরাগভরে গদ্দভাদির ন্যায় চীৎকার করিবে না৷

 

৩. স্থানীয় সংস্কার   :  

 

বাসন (অ) পাও লাগাইত পারে না৷

(বাসনপত্র পা ছোঁয়াতে নেই)

                

ভাঙ্গা বাসন (অ) খাইত পারে না৷

(ভাঙা পাত্রে খাওয়া নিষিদ্ধ)

  

মনুসংহিতা     :  

ন পাদৌ ধাবয়েৎ কাংস্যে কদাচিদপি ভাজনে৷

ন ভন্নেভাণ্ডে ভূঞ্জীত ন ভাবপ্রতিদূষিতে৷৷ (৪৷৬৫)

(অনু) :   কাংস্যপাত্রে কখন পদ-ধাবন করিবে না৷ ভগ্ন পাত্রে ভোজন করিবে না৷ অথবা যে পাত্রে আহার করিলে মনে বিঘ্ন উপস্থিত হয়, তাহাতে ভোজন করিবে না৷ 

 

এরকম সাদৃশ্য আরও বহু ক্ষেত্রেই রয়েছে৷অবরুদ্ধ অঞ্চল বলেই এখানকার আচার-অনুষ্ঠান, পূজা পার্বণে নিহিত রয়েছে বঙ্গসংস্কৃতির অনেক সুপ্রাচীন উপাদান৷ বরাক উপত্যকার লোকসংস্কৃতির দুটি সুস্পষ্ট ধারা—একটি কৃষিভিত্তিক অন্যটি নৌবাণিজ্য কেন্দ্রিক৷

 

পূর্ব ভারতে তাম্রলিপ্তি ও চম্পা বন্দরকে কেন্দ্র করে নৌবাণিজ্য বিকাশিত হয়েছিল৷ খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকে তাম্রলিপ্তি বন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ ইতিহাসবিদদের অনুমান, এক সময় বঙ্গোপসাগর শ্রীহট্ট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল৷ “it is however, certain that in ancient times a large part of Srihatta ware included in a large sea, in all probability the Bay of Bengal. In Cachar, Karimganj and Sylhet districts there are large lakes that are locally called haor which is believed to be a corruption of Sagar (or Sea). Huentsang (The century A.D) described sylhet as shi-li-cha-talo which was to the north east of Samatata among the hills near sea.”

 

অতীতে সমুদ্র তীরে অবস্থিত শ্রীহট্ট একটি সমৃদ্ধ বন্দর ছিল মেন অনুমান অসঙ্গত নয়৷ পরবর্তী সময়েও শ্রীহট্টের নৌবন্দরের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ দশম শতাব্দীতে শ্রীচন্দে্রর তাম্রলিপিতে ‘ইন্দে্রশ্বর নৌবন্ধ’ অর্থাৎ ইন্দ্রেশ্বর নৌবন্দরের উল্লেখ রয়েছে৷ এই বন্দরের আয়তন ছিল ৫২ পাটক ভূমি৷

 

নৌ নির্মাণেও শ্রীহট্টের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন৷ সিলেট জেলা গেজেটিয়ারে নৌকা নির্মাণে স্থানীয় ঐতিহ্যের কথা আলোচিত হয়েছে৷১০

 

পরবর্তীকালে রচিত মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্য পূর্ব ভারতের সমৃদ্দ নৌবাণিজ্যের ইতিহাসের সাহিতিযক দলিল৷ রাধাকুমুদ মুখার্জীর গ্রন্থে এ-কথার সমর্থন আছে৷১১

 

অতীতের নৌবাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকটি নদী উৎসব এখনো বারাক উপত্যকায় অনুষ্ঠিত হয়৷ উৎসবগুলি হল— তেনার কইন্যা ভাসানি (নদীতে কাপড়ের তৈরি পুতুল ভাসানো), ঢঙে নাও (নৌকার উপর ট্যাবলো), নৌকাটানা (শারদীয় দুর্গোৎসবে নবমীর রাতে অনুষ্ঠিত) ও নৌকাপুজা৷ এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নৌকাপুজো৷ নৌকাপুজা নৌকার পূজাঅর্চনা নয়, এটি আসলে সমারোহপূর্ণ মনসা পূজা৷ মনসা এবং অজস্র পৌরাণিক দেবদেবীকে নৌকার উপর স্থাপন করে পূজা করা হয় বলে অর্চনাটির নাম নৌকাপুজা৷ কাছাড় জেলা গেজেটিয়ারে নৌকাপূজার বিবরণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “A special form of religious ceremony is known as the noaka or boat puja and is performed by a wealthly man in satisfaction of a vow, who generally spends from Rs 300 to Rs. 500 on the ceremony. A shed is built, at the end of which is a boat painted and gilt, from which wise tier upon tier, the image of various Gods, amongst whom Bishari is generally the most prominent. For several days sacrifices are offered to the deities, and Brahmians, who are well paid and feasted fgor their services, offer up their prayers. At the end of this time the house and its contents are abandoned and allowed to fall to pieces.”১২

 

উত্তর পশ্চিম ভারত থেকে শুরু করে পূর্ব ভারতের আসাম পর্যন্ত মনসা পূজার বিস্তৃতি৷ সর্বত্র একই মন্তে্র পূজা সম্পন্ন হয়৷ এমতাবস্থায় আমাদের অনুমান, সর্পভয় নিবারণ নয় বরং নৌকাণিজ্যের সঙ্গেই মনসার সংযোগ বেশি৷ এ জন্যই যেসব জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি জল-নির্ভর (aquatic culture) তাদের মধ্যেই মনসাপূজা বেশি জনপ্রিয়৷ এই নৌবাণিজ্যের সূত্রেই বঙ্গদেশে নৌকাপূজার উদ্ভব হয়েছিল৷ অনুসঙ্গ হারিয়ে যাওয়ার অন্য অঞ্চল থেকে নৌকাপূজা লুপ্ত হয়ে গেলেও বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বরাক উপত্যকার এই বিশেষ পূজাটি এখনো টিকে আছে৷ নৌকাপুজা এবং নৌকাপূজার আবশি্যক অঙ্গ ওঝার গান বরাক উপত্যকার আঞ্চেলিক সংস্কৃতি নয়৷ এত বৃহৎ মূর্তি পরিকল্পনা এবং নৃত্যের পোষাক ও পরিশীলিত ভঙ্গিমা প্রাপন্তীয় অঞ্চলে ক্ষুদ্র পরিসরে উদ্ভুত হওয়া সম্ভব নয়৷

বরাক উপত্যকার কথা বাংলায় প্রাচীনত্বের নিনদর্শন রয়েছে৷ চর্যাপদের বেশ কিছু এখনো একই অর্থে এখানে ব্যবহৃত হয়৷ কয়েকটি নমুনা নিম্নরূপ :

        চর্যাপদ                                        বরাক উপত্যকার কথ্য বাংলা

ক) রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ        (২)  রুখর চেয়ার৷ (কাঠের চেয়ার)

খ) চীঅপ বাকলঅ বারুণী বান্ধঅ      (৩)  কুমড়ার বাকল পালাইয়া রন্ধিঅ৷

   দশমি দুআরত চিহ্ন দেখইঅ         (৩)  পিছ দুয়ারেদি যাইও না৷

গ) জে জে আইলা তে তে গেলা        (৭)  যে যে অন আছইন৷

                                                     কে আইলা গ তুমার বাড়িত?

ঘ) পহিল বিআণ মোর বাসনপুড়া      (২০)  পয়লা বিয়ানর গাই৷

                                                      (প্রথম শাবক প্রসবকারিণী গাভী)

ঙ) উঁচা উঁচা পাবত                        (২৮)  চাইরোবায় উচা উচা গাছ৷

                                                       (চতুর্দিকে উঁচু উঁচু গাছ)

 

এ প্রসঙ্গে সুখময় মুখোপাধ্যায়ের উক্তিটি স্মরণীয়৷ “দুহিল দুধু বেন্টে যামায়” উক্তিটি আধুনিক শ্রীহট্টের ভাষায় ‘দোহাইল (বা ক্ষীরাইল) দুধ বানে সামায় না’ আকারে মেলে৷”১৩

এসব উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে এমন ধারণা অমূলকক নয়, যে প্রাচীন বাংলা ভাষার উদ্ভবের সময়কাল থেকে বঙ্গীয় মূলের মানুষেরা এখানে আছেন৷ অবরুদ্ধ অঞ্চল বলে ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তন প্রক্রিয়া এখানে ক্রিয়াশীল হয়েছে পরে৷

এসব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য হল, সংস্কৃতি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি-প্রকরণ অনুসৃত হচ্ছে তা দেশজ সংস্কৃতির স্বরূপ বিশ্লেষণে কার্যকরী নয়৷ কারণ অধ্যয়ন প্রক্রিয়ায় প্রাধান্য পাচ্ছে রাজনৈতিক ভূগোল৷ রাজনৈতিক ভূগোল শাসনতান্ত্রিক সীমানা নির্দেশক৷ সংস্কৃতি কখনো রাজনৈতিক ভূগোলে আবদ্ধ থাকে না৷ এর পরিসর বহু বিস্তৃত৷ এ বিষয়ে আমরা কেটিমাত্র উদাহরণ দিচ্ছি৷ শীতলামঙ্গল কাব্যের আলোচনায় অনেকেই শীতলাকে আঞ্চলিক দেবী বলেছেন৷ কিন্তু মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, নেপাল, মধ্যপ্রদেশ, বিহার পশ্চিমবঙ্গ, আসামে বসন্ত রোগের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শীতলার পূজা হয়৷ কলকাতা, মুম্বাই, হায়দরাবাদ, নাগপুর, জলন্ধর, গুরুগ্রাম, নালন্দা ইত্যাদি বড় বড় শহরের শীতলা মন্দিরে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়৷ এই পরিপ্রেক্ষিতে আঞ্চলিক পরিসরে নয়—শীতলার স্বরূপ সন্ধান করতে হবে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ভূগোলের প্রেক্ষিতে৷ আমাদের বক্তব্য হল, বরাক উপত্যকার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক স্তরে সৃষ্ট কিছু সাংস্কৃতিক ধারা থাকলেও অধিকাংশ বৃহত্তর বঙ্গ সংস্কৃতির সুপ্রাচীন ধারার অবশেষ৷ অতএব মধ্যযুগের বঙ্গ সংস্কৃতির অধ্যয়নে আজও বরাক উপত্যকার গুরুত্ব অপরিসীম৷

 

 

উল্লেখপঞ্জি :

১.   নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদিপর্ব), প্রথম দে’জ সংস্করণ, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৪০০ বঙ্গাব্দ, পৃ. ৬৯

২.   জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য, ‘বরাক উপত্যকার ইতিহাসের রূপরেখা’, ‘শ্রীহট্ট কাছাড়ের প্ররাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির রূপরেখা’ (সম্পা. জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চৌধুরী ও অন্যান্য), প্রথম সং, রবীন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগার ও ববঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, শিলং, ১৯৯৬, পৃ. ৮৭

৩.   J. B. Bhattacharjee, ‘Reaction of the People of Surma Valley to Transfer of the Valley to Assam (1874)’, ‘Proceeding of North East India History Association, Tenth Session’, Shillong, 1989, p. 451-452

৪.   মনু সংহিতা, ৭৷১১৯, ৯৷৩৮৷

৫.   ড. দীনেশচন্দ্র সরকার, ‘ভূমি পরিমাপ, খ-কুল্যবাপ, দ্রোণবাপ ও আঢ়বা৷ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ (১ম খণ্ড), প্রথম মুদ্রণ, সাহিত্যলোক, কলকাতা আশ্বিন ১৩৮৯, পৃ. ১৩১.

৬.   W. W. Hunter, A statistical Account of Assam, Vol-2, Spectrum Publications. Guwahati, ISBN-81-85319-93-6, 1998, p. 395

৭.   মনুসংহিতা, ৭৷১১৫-১১৭৷

৮.   J. B. Bhattacharjee, Land-grants, Land Management and the nature of Social Formation in Srihatta during the 75th to 11th century A. D., The North Eastern Hill University gournal of Social Sciences and Humanities, Vol-V, No-2, Apr.-June, 1988 (Reprint), p.2

৯.   Karmala Kanta Gupta, Copper Plates of Sylhet, Firoted, Published by the author, Sylhet, 1967, p. 99

১০.  B. C. Allen, Assam District Gazetteers, Vol-II, Sylhet, Shillong, 1905, P.1 155, 156

১১.  Radha Kumud Mookerji, Indian Shipping, Munshiram Manoharbal Publishers edition, New Delhi, ISBN 81-215-0916-5, 1999, P. 155-162

১২.  B. C. Allen, Assam District Gazetteers Vol-III, Cachar, Shillong, 1905, P. 101.

১৩.  সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন কবিদের পরিচয় ও সময়, দ্বিতীয় সং, পুনমুদ্রণ, ভারতী বুক স্টল, কলকাতা, জুন ১৯৯১, পৃ. ১

পুনর্মুদ্রিত : প্রথম প্রকাশ—বর্ণমালা সাহিত্য পত্র বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ, জুলাই-২০১৮৷

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions