প্রবন্ধ - ১২

নিউ নর্মালের উৎসব
পাপড়ি ভট্টাচার্য
শিক্ষিকা ও লেখিকা, শিলচর

শিক্ষকরা ছুটি বেশি  পান এমন একটি অর্ধসত্য প্রচলিত রয়েছে।যদিও এর আশেপাশের পূর্ণ সত্য হল শিক্ষক, অশিক্ষক,  সরকারী, বেসরকারী , বিভিন্ন বয়স, রুচি, আবহাওয়ার মানুষেরও উৎসবের ছুটি এবং হঠাৎ পাওয়া ছুটি বেশ ভালো লাগে। স্কুলগুলো খুলে গেছে বেশ কয়েকমাসের করোনাকালীন ছুটির পর। স্কুলের কমন রুমে যে বড় ছুটি আর উদযাপন তিথির ক্যালেন্ডার ঝোলানো থাকে তা প্রায়ই দেখতে হয়। ছুটি যদি একডজন হয় তবে 'অবশারভেশন ডে' থাকে তিন ডজন। তিন দিন ব্যাপী স্বাধীনতা দিবস উদযাপন,  সপ্তাহ ব্যাপী স্বচ্ছ্ব ভারত অভিযান, সাতদিন ব্যাপী গান্ধী জয়ন্তী, তিনদিনের সুষম আহার অভিযান, অর্ধেক ক্লাসের পর হাত ধোয়া দিবস পালন বা সারাদিন ব্যাপী পরিবেশ দিবস এমন আরো অনেক অনেক দিবসের মাঝে মাঝে কিছু কিছু ছুটির দিন সহ স্কুল ক্যালেন্ডার একেবারে ঠাসা। তাই ক্যালেন্ডারটার সাথে দেখাসাক্ষাৎ প্রায়ই হয়। সেদিন এক সহকর্মী বলল, " দিদি, শনিবার ছুটি।" পুজোর আগে আবার কিসের ছুটি জানতে চাইলাম। দেখে বলল, " বিহুর ছুটি।" হঠাৎ বিহু শুনে সবাই বেশ অবাক হলাম। " এখন কিসের বিহু?" উত্তরে বলল, " কাতি বিহু গো। ওই যে আশ্বিনে রান্ধে কার্তিকে খায় যে বর মাগে সেই বর পায়, সেই দিনটা। আশ্বিনের সংক্রান্তি।" বিশ্বাসই হল না। দুর্গা পুজোই হল না, "আটআনাজ"  তো লক্ষ্মী পুজো আর দেওয়ালীর মাঝামাঝি কোন একটা সময় হয়। সহকর্মী হেসে বলল, " বিশের বিষে দুর্গামাও বেকায়দায়। " সত্যি এবারের পুজোটা বড়ই আলাদা। আমার জানা বেশ কিছু প্রাচীন লোককে জিজ্ঞাসা করেছি। কিন্ত পিতৃপক্ষ পেরিয়ে দেবীপক্ষ এসেও পুজো হয় না এমন তারা দেখেন নি। পঞ্জিকার গুণভাগের হিসেবে এবছর মহালয়া পার হয়ে পুজো আসতে আসতে মহালয়া যে হয়েছিল তাই তো ভুলতে বসেছি।
     

দুর্গা পুজো দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং বাঙ্গালি হিন্দুর প্রধান উৎসব। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, , ঝাড়খন্ড, মণিপুর, আন্দামান ও নিকোবর সহ বাংলাদেশ, নেপাল ও পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই আড়ম্বরের সাথে এই উৎসব  উদযাপন করা হয়। ২০০৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউসিয়ামের গ্রেট হলে অভিবাসী বাঙ্গালিরা "voices of Bengal" নামক সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর অঙ্গ হিসেবে বিশাল দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।  ওয়াইট হাউসের দিওয়ালীর আলোর মালার চেয়ে এর গ্ল্যামার ও বিশ্বজনীন আবেদন কোন অংশে কম নয়। তবে পুজোর এই আবেগ উচ্ছ্বাস যা একে মেগা ইভেন্টের সম্মান দিয়েছে তা অল্পদিনের গল্প নয়। একটি বিরাট অভিযাত্রার ফল আজকের পুজোর এই বিশালতা। সেই সুরথ রাজা,ঋষি কাত্যায়ন, শ্রীরামের ভগবতী আরাধনার পর কিভাবে সেই আদি দেবী  কৈলাশের গৌরী আর আমাদের উমার রূপ নিয়ে বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হলেন তার তো লম্বা ইতিহাস রয়েছে। কিছু হয়ত লেখা আছে। কিছু একেবারেই মৌখিক আবার কিছু নির্ভেজাল জনশ্রুতি, রিউমার এবং অতিশয়োক্তি। যেমন বনেদি বাড়ির পুজো জাত আর পয়সাকড়িওয়ালাদের আধিপত্য ছাড়িয়ে কিভাবে দুর্গা প্যান্ডেলের সর্বজনীনতায়  সর্বজনমনোগ্রাহী হয়ে উঠল তারও একটা মজার কাহিনী আছে। ১৭৭১ সালে অর্থাৎ পলাশী যুদ্ধের বাইশ বছর বাদে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সেই যুগে হলওয়েল সাহেব কলকাতার দুর্গাপুজোকে " গ্রান্ড জেনারেলস অফ ফেন্টুস " বলেছিলেন। জেন্টলম্যান অর্থাৎ বনেদীরা এই পুজো করতেন। সেই পুজোয় দেখনদারী বেশি ছিল, সাহেবদের স্তুতি করবার সুযোগও। দেশীয়দের উপেক্ষা করে সেখানে সাহেবসুবো, রাজারাজরা,জমিদারদের প্রচুর অভ্যর্থনা করা হত।  একবার কিছু সাধারণ ঘরের যুবক নিতান্ত কৌতুহল বশত: এক বনেদী বাড়িতে প্রবেশ করতেই দারোয়ান তেড়ে এসে বলা নেই কওয়া নেই চাবুকের দু ঘা বসিয়ে দিল। সেটাই প্রথা ছিল বনেদী বাড়ির পুজোর। অপমানিত, উপেক্ষিত যুবকরা নিজেরাই পুজো করবার সিদ্ধান্ত নিলেন।সাল ১৭৯০, কলকাতার গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে বারোইয়ারি বা প্রথম বারোয়ারী পুজোর প্রচলন করেন। সেই পুজোয় ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের প্রবেশাধিকার ছিল। বারোয়ারী পুজো সময়ের সাথে সাথে সর্বজনীন পুজোর রূপ নেয়। বনেদী বাড়িতে পুজো হতে টাকার যোগাড়ের চিন্তা ছিল না, কত "গৌরী সেনরাই" তো ছিলেন। কিন্ত সাধারণ মানুষের পুজোতে টাকা তো চাঁদার মাধ্যমেই যোগাড় হত, সেই যুগ থেকেই।  মাঝে মাঝে চাঁদার জোর জুলুম যে হত না এমন নয়।

  
এই প্রসঙ্গে আর একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। বনেদি বাড়ির মহিলারা পাল্কি নিয়েই পথ চলতেন। কিছু যুবক এই সুযোগের সদব্যবহার করত। তারা পাল্কি আটকে মহিলাদের লজ্জা ও ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে চাঁদা আদায় করত। ঘটনার বাড়বাড়ন্ত হলে তা ইংরেজ অফিসারের কানে যায়। আইনের সরকারের সেই অফিসার এই দুর্বৃত্তদের পাকড়াও করতে অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি নিজেই পাল্কিতে চেপে নানা গলি ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। যুবকেরা পাল্কি মানেই মহিলা যাত্রী ভেবে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করলে তিনি স্বমুর্তি ধারন করে তাদের সায়েস্তা করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যেই শহরের এই সমস্যার নিরসন হল। এই ভাবে মিঠে কড়া, সাধারণ অসাধারণ, শাস্ত্রীয় লোকায়ত আচার, নিয়ম, অনুভূতি মিলেয়ে দুর্গোৎসবের পথচলা এবং আজকের অবস্থানে পৌঁছানো। 
               

সাবেকি শব্দের পর যে শব্দ বহুল জনপ্রিয় তা 'থিম পুজো।'। বাড়ির পুজোগুলো সাবেকিই হয়। প্রতিমা দোচালা বা চৌচালার মন্ডপে রাখা হয়। কোনকোন বাড়িতে ব্রহ্মঘটে সব নীতিনিয়ম মেনে পুজোর প্রচলন রয়েছে। সেবেকি পুজোয় প্রতিমা বা  সাজসজ্জা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ না থাকলেও শাস্ত্রীয় বিধির সাথে কিছু পারিবারিক রীতিনীতি যোগ হয়ে প্রতিটি পুজোকে অভিনব করে তোলে। দেবী একজনই কিন্তু প্রতিটি পরিবারে তাকে দেখা, চাওয়া পাওয়ার দর্শনটুকু খানিকটা হলেও আলাদা। স্ত্রীআচারের ভূমিকাও সেখানে কম নয়।  কোন কোন বাড়িতে চারদিনই ভগবতীকে নিরামিষ ভোগ নিবেদন হয়। আবার কোন কোন বাড়িতে নিবেদন করা হয় আমিষ ভোগ। গ্রাম কাছাড়ের এক বাড়িতে দুর্গামায়ের সাথে দেবী বিষহরিরও পুজো হয়। এবং তাদের পুজোয় ভোগে কচুশাক চাই ই চাই। কিছু বাড়িতে সোনারূপার গয়না দিয়ে দেবীকে সাজানো হয়।সাজান বাড়ির মেয়ে বৌরা। তারা নিজেরাও এই কয়দিন সালাংকারা হয়ে থাকেন। একবাড়িতে দশমীর ভোগ শুধুমাত্র পান্তাভাত আর পাঁচরকমের ভাজা।তিনদিনের গুরু ভোজনের পর মেয়ে স্নিগ্ধ আহার করে পুত্র কন্যা নিয়ে যাতে নির্বিঘ্নে কৈলাশে ফিরে যেতে পারে তার জন্যই এমন। কিছু কিছু বাড়িতে শ্রীহট্টের প্রাচীন " নাইওর" এর রীতি অনুযায়ী চিড়ে, চাল, হলুদ, মিষ্টি, মাছ বা মাছ কেনার টাকা একটা পুটলি করে বেঁধে প্রতিমার সাথে নিরঞ্জন করা হয়। অনেক বাড়িতেই অষ্টমীতে নারকোলের ব্যবহার নিষিদ্ধ। পারিবারিক সাবেকি পুজোতে দেবীকে মাতৃভাবে, কন্যাভাবে কল্পনা করে পারিবারিক কিছু " গীত" গাওয়ারও প্রচলন আছে। কাছাড়ের বরখলা অঞ্চলের দেবলস্কর পরিবারের এক সদস্য যিনি আমার সহকর্মী একবার পুজোর আগে গুনগুন করছিলেন একটা গান।  তার কাছেই জেনেছি চৌতালের উপর এই গান তাদের পূর্বপুরুষ কেউ একজন লিখেছিলেন। আমি চারটে লাইন লিখে রেখেছিলাম।
        

" একবার হেরো গো নয়নে মায়ের রূপ আনন্দ মনে
   হৃদি প্রকাশিত কর শ্রীদুর্গা চরণে--
   রাবনকে বধিবার তরে পুজা করে রঘুবরে
   আইনে শত নীলপদ্ম দিল শ্রীচরণে। "

সাল ১৯৮৫ থেকে " শুদ্ধশুচি, সুস্থরুচি" এই স্লোগান নির্ভর করে আজকের দিনের অতিজনপ্রিয় "থিম" পুজোর শুরু। বিগ বাজেটের এই পুজোগুলো larger than life,সব সেখানে ঝাঁ চকচকে। এই পোষ্ট ট্রুথের যুগে আগামীতে অবশ্যই ডিজিট্যাল পুজোও বেশ জনপ্রিয় হবে। করোনাকালীন অনলাইন অফলাইনের সুইচ অন অফে মানুষ মানসিক ভাবে অনেকটাই ডিজিট্যাল হয়েছেন।

                     

পুজোর এই বিবর্তনে  ঋষি মুনি রাজামহারাজা জমিদারের একচ্ছত্র অধিকার থেকে সরে এসে পুজো সাধারণ জনগনের আবেগে পরিণত হয়েছে। এমন কি সাবঅলটার্ন ভাষ্যও এর সাথে ধীরে ধীরে জুড়ে যাচ্ছে। তাই কোন মহামারি কালীন বিধিনিষেধ যখন এমন আবেগের উপর চড়াও হয়ে  তাকে বেঁধে রাখতে চায় , জনমনে অস্থিরতা তো তৈরি হবেই। 


গালভরা শব্দ 'নিউনর্মালে' নর্মাল হওয়া ব্যক্তিবিশেষের জন্য কিছুটা সহজ হলেও একত্রিত মানব অভ্যাসের জন্য একে গ্রহন করা সত্যই কঠিন। তাছাড়া এই উৎসবের সাথে অর্থনীতির এমন সুনিবিড় যোগাযোগ রয়েছে যে পুজোর আয়তন ছোট হওয়া মানেই অনেকেরই  ডালভাতের যোগাড় হওয়াও বেশ কষ্টের তখন। আবেগ নিয়েই তো ভোটের বাজার গরম হয়। তাই ডান বাম ঊর্ধ অধ: সকলের এই নিয়ে কিছু মন্তব্য রয়েছে এবং করোনাকালীন বিধিনিষেধ নিয়ে নানা তর্জমাও চলছে। সামাজিক মাধ্যমও এই নিয়ে বেশ সরগরম। সরকারী এসওপির ঘনঘন অদলবদল যে জটিলতার সৃষ্টি করছে তা জনগনের পুরোনো গতের পুজো ছেড়ে নতুন নিয়মের সাথে মানিয়ে চলার যে মানসিক যুদ্ধ তারই প্রতিফলন। এবারের পুজো সত্যিই আলাদা। এবং এবারের পুজোর আবেদনও তাই বেশি। মানুষ প্রাণপনে উৎসব মুখর হতে চাইছেন আবার প্রাণের ভয়ে পিছিয়ে আসছেন। এই টানাপোড়নের  দুদিকেই মানুষের ক্ষতির আশংকা । হয় স্বাস্থ্য, নয় অর্থনীতি, কোন একটাকে ছাড়তেই হবে। আর এই উৎসবে ধন এবং জন দুটোই সমান ভাবে দরকার। অদ্ভুত এক রশি টানাটানির খেলা যেন। ফলে বাজারে ভিড় হয়েও কম, উৎসব মুখর হয়েও হওয়া যাচ্ছে না। তবে এমন টানাপোড়ন, এমন দুর্দিন তো নতুন কিছু নয় ইতিহাসে। মারি, যুদ্ধ, দেশভাগ, শোষন, শাসন, নিপীড়নের পরও মানুষ কিছুদিনের শ্রান্তির পর আবার জেগেছে, আবার নতুন করে উৎসবে মেতেছে। এবার নাহয় আমরা ' নিউ নর্মালেই' উৎসব মুখর হই। পরে আবার "ওল্ড নর্মালে" ফিরে যাওয়া যাবে। কারন…. আসছে বছর আবার হবে।