প্রবন্ধ - ৩

উৎসবের ডাক
দীপঙ্কর ঘোষ
প্রাবন্ধিক, শিলচর
68489834_1394746000674468_87628809506410

রবীন্দ্রনাথ 'উৎসবের দিনে' বলেছিলেন "হে ঈশ্বর তুমি আজ আমাদের আহ্বান করো, বৃহৎ মনুষ্যত্বের মধ্যে আহ্বান করো। আজ তুমি আমাদিগকে বিচ্ছিন্ন জীবনের প্রাত্যহিক জড়ত্ব, প্রাত্যহিক ঔদাসীন্য হইতে উদ্বোধিত করো।" এ ছিল কবির উৎসবের দিনের উদাত্ত আহ্বান।  মানুষের উৎসব নাকি সেদিন, যেদিন সাংসারিক দুঃখ-কষ্টের দ্বারা সে নিজেকে ক্ষুদ্র করে রাখে না, প্রাকৃতিক নিয়ম পরম্পরার হাতে ক্ষুদ্র জড়ভাবে অনুভব করে না। কবির মতে উৎসবের দিনে মানুষ সর্বজয়ী মানবশক্তিকে উপলব্ধি করে, সে দিন সে গৃহে অবরুদ্ধ নয়, কর্মে ক্লিষ্ট নয়। সেদিন উজ্জ্বলভাবে নিজেকে ভূষিত করার দিন। উদারভাবে আহ্বান করার দিন।


কিন্তু সামনেই উৎসবের দিনকে পেয়েও এই তত্ত্ব কথার সঙ্গে কীভাবে নিজেকে একাত্ম করবে আজকের বাঙালি বিশ্বকবি ? কোন দুঃসাহসে তোমার দর্শনকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে উজ্জ্বলভাবে নিজেকে ভূষিত করবে আজকের বাঙালি? প্রাত্যহিক জীবনের দীনতা শুষ্কতা আর নির্লজ্জ কৃপণতা থেকে কোন অসীম বলে মুক্ত হয়ে জীবনের জয়গান গাইবে বাঙালি?  এদেশ বা সেদেশ - দু'দেশেই তো বাঙালি আজ কোণঠাসা, হতশ্রী, আত্মগরিমাহীন এক জাতি। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, অসমে প্রাদেশিকতা আর পশ্চিমবঙ্গে মেকি ধর্মনিরপেক্ষতার যাঁতাকলে ফেঁসে যাওয়া এক হতভাগ্য জনগাষ্ঠী মাত্র। না ধর্ম, না ভাষা, না আধ্যাত্মিকতা কিছুই তো তাকে উদ্বোধিত করেনি, এক সূত্রে বেঁধে রাখতে পারেনি। পঙতির প্রথম দিকে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি যেমন পেছনের ছেলেদের ঠেলায় ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে বাঙালিও গত কয়েক দশকে কেবল পেছনেই গেছে আর তাঁকে ঠেলে আগে চলে গেছে অন্যরা। জ্যান্ত বাঙালি তো অনেকদূর তাঁর আইকনরাও আবছা হয়ে আসছেন রাজনৈতিক উদাসীনতায়। শ্যামাপ্রসাদ ঝাপসা হয়েছেন, নেতাজি রাজনৈতিক ইস্যু হয়েছেন আর তাঁর আরাধ্য দেবীর আরাধনা নির্ধারিত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা।

 

এই অসমেও দশক দশক ধরে বরাক - ব্রহ্মপুত্রের মিলন সাঁকো বানানোর কারিগরেরা মিছেই স্বপ্ন দেখিয়ে শুধু ভোট লুট করেছেন। পরিবর্তনকামী সরকারের আমলে সাম্যের স্লোগান গত পাঁচ বছরে  ফিকে হয়ে এসেছে।  সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের আঁধারে অসমীয়া - বাঙালি একাত্ম হয়ে থাকার যে ফর্মুলা তৈরি হয়েছিল কোনো কুটির রাজনীতির শিকারে আজ সেই তত্ত্ব অধরা মাধুরী হয়েছে। আজ বরং পরিস্থিতি আগের থেকে অনেক জটিল হয়েছে, জাতীয়তাবাদের প্রবল চাপে, প্রচারে আর অপপ্রচারে। ঘটনায় দুর্ঘটনায় বাঙালি আর অসমীয়া মধ্যে লোকায়িত স্তরে মিলে মিশে থাকার পরম্পরা রাহুর গ্রাসে পড়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন, রিপোর্ট ইত্যাদিতে যখনই বাংলাদেশী আগ্রাসনের নমুনাগুলো প্রকাশিত হচ্ছে তখনই দুটি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অবিশ্বাসের বাতাবরণ। সংঘাত, আশঙ্কা, অবিশ্বাস আর অপমানের ধিকি ধিকি আগুন লেলিহান শিখা হয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে সংস্কার সভ্যতা হৃদ্যতা। ৬ নং দফা, এনআরসি, খিলঞ্জীয়ার সংরক্ষণ- এই কথাগুলো এই অস্তিত্বের চিতানলে ঘৃতাহুতি দিচ্ছে। এই দুঃসময়ে আবারো আসছে  দুর্গোৎসব। যে উৎসব ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল বিশ্বজনীন তাকে ক্ষুদ্রতার গন্ডিতে আবদ্ধ করে বাঙালির উৎসব বলে নির্ধারণ করার প্রক্রিয়া চলছে। আধিপত্যবাদীদের রক্তচক্ষু উৎসবের বিশ্বজনীন ডাককে ক্ষুদ্রতার গন্ডিতে  টেনে নামাতে চাইছে। আমরা আর তোমরা- এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে সাহিত্য-সংস্কৃতি মনীষী এমনকি উৎসবও !

 

তাই প্রশ্ন জাগে কবিগুরুর উৎসবের দিনের আহবান কি কেবলই বাঙালির জন্য ছিল ? এ ডাক বিশ্বজনীন ছিল না? যে উৎসবের দিনে জনমানস বিশ্ব মানবিকতার দিকে ধাবিত হবার কথা তা কি কেবলই এক বিশেষ ভাষাগোষ্ঠীর হয়ে গেল?  প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্রতা থেকে উদ্বুদ্ধ হবার দায় কি কেবল বাঙালির, অন্যদের নয়? বাঙালি শুধুই দেবে বিনিময়ে পাবে না কিছুই ?  অখন্ড ভারতের সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্বাধীনতা সংগ্রামে, আধ্যাত্বিকতার অমূল্য উন্মেষে অবদান জুগিয়ে  আজ সে অবাঞ্ছিত,অনাবশ্যক, ভাসমান পরাশ্রয়ী? মহামারীর এই বিষন্ন দুর্দিনে অর্থনৈতিক, সামাজিক, শৈক্ষিক- সমস্ত বিপর্যয়ের সাথে যে আরেক আশঙ্কা নিয়ে বাঙালি প্রহর গুনছে তা হলো অস্তিত্বের সংকট। তাই দুঃখজনক ভাবেই এই উৎসবের দিনে বাঙালি অন্তরের সমস্ত প্রেমভক্তি আর স্নিগ্ধতার নৈবদ্য সাজিয়েও আশীর্বাদ বঞ্চিত এক জাতি। হাজার প্রদীপ প্রজ্বলিত করেও  বুকে দুঃসহ ব্যথা  নিয়ে হাঁটতে থাকা ইতিহাসের নির্মম অনাচারের সাক্ষী এক হতভাগ্য জনগোষ্ঠী। তাই এই উৎসবের দিনে মনের মধ্যে হু হু করে জ্বলতে থাকা আগুন খানিকটা নির্বাপিত হোক।  কল্পনার মায়াবী বিভ্রমে এই উৎসবের দিনে মহামিলনের গান গাইতে থাকা বাঙালি একবার আবার নস্টালজিয়ায় ছেড়ে জেগে উঠুক। মাতৃ আরাধনায় অজেয় হোক।