প্রবন্ধ - ৬

এ তো কান্না নয় !
সীমা ঘোষ

কান্না, সে তো  শিশুর ধন। আর  ওটা তো কান্না নয়, ওটা ক্ষুধা তৃষ্ণা যন্ত্রণা প্রকাশের জন্য শিশুর একমাত্র ভাষা। এ ভাষায় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব শিশু কথা বলে। একটু বড়ো হতে হতে মানে শৈশব একটু একটু দূরে রেখে আমরা আমাদের জীবনের অনিবার্য অধ্যায়গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগিয়ে চলি ।  কিন্তু  ক্ষুধা তৃষ্ণা তখন মানুষ সহ্য করে নীরব ভাষায়। কিন্তু মনের কষ্ট, মনের দুঃখ দূর করার গোপন ভাষা তখনও তার সেই কান্না । সে তখন খুউব গোপন, চুপিসাড়ে বড়ো চোরা । বাথরুম, বারান্দার কোণ, আর মোক্ষম স্থান বিছানা কিংবা  মাথার বালিশ। বালিশের বুকে মুখ রেখে কষ্টের শব্দহীন ঝর্না। কেউ টের পাবে না, পাশের মানুষের নাসিকার গর্জন বিচ্ছুরিত নিষ্ঠুর নিদ্রাও তখন খুব নিশ্চিন্ত থেকে যেতে পারে । গায়ের মানুষ, কাছের মানুষ,খুব প্রিয় মানুষ , আত্মীয় পরমাত্মীয় জাতীয়  মানুষ তখন অপরিচিত, বহু বহু দূর আকাশের তারার মতো । দেখে শোনে হাত বাড়ায় না। পিঠে তার একটা ভালবাসার হাত  ছুঁয়ে দেয় না।

   

কত কাছের মানুষ কেমন করে দূরে চলে যায়, কোনো কোনো দূর আবার  কাছের হয়ে যায় । তবু,  কারো কাঁধে দুঃখ মুছে দেওয়া যায় কি ? তবে, কান্না এক শক্তিও,  কষ্ট জয়ের শক্তি । আর জীবনের কঠিন পথ পার হতে হতে  কান্না আরও গভীরে পৌঁছে যায় , তাকে আর দেখা যায় না ।যেন সে ক্লান্ত হয়ে কোথাও জিরোতে শুরু করেছে। অনেক সময় মানুষ নিজেও যেন এর অস্তিত্ব  টের পায় না। একে এক পাশে সরিয়ে রেখে দিয়েছে সে কবে,  তার নির্দিষ্ট কোনো তারিখও তার  কোনোদিন লেখা হয়ে ওঠে  না  । এর মধ্যে পিঠে চেপে বসা কত দায়িত্বের বোঝা সামলাতে হয়। কষ্টকে কোল দেওয়ার সময় কোথায় ? তাই, কান্নার আর অবসর মেলে না। আর কেউ যেন  কানে কানে বলা শুরু করে -  এখন এই  মূল্যবান মুক্তো আর  অপচয় করা চলবে না । নিজেকে দেখো,  কত দক্ষতায় ঘর- বাহিরের  সাযুজ্য গড়ে তুলেছ তুমি ! সামাজিক দায়বদ্ধতাও কি থাকেনা সেখানে ? থাকে তো! তবে, এতেই কিন্তু তোমার সব শেষ নয় । নিজেকেও একটু ভালোবাসো। তাকেও  তাকিয়ে দেখো। নিজের জীবনটিও কত সুন্দর আর মূল্যবান । সে-ই তো মহার্ঘ্য। দেখতে শেখো নিজেকে, তার দিকে গভীর মনোযোগ দাও । তোমার ভালো কাজের মূল্য দেয়নি হয়তো পরিবার কিংবা সমাজ, সে তো তোমার নয়,তাদের দুর্ভাগ্য!  

 

পাশের জন তোমার গুণকে তাচ্ছিল্য করে, সে তো তারই অশিক্ষা! বন্ধু বলে যাদের ভাবতে, তারা ঈর্ষায় কাতর হয়, সে তো  তাদের মনের দারিদ্র্য ! তাই  নিজের সফলতাকেও ছোটো করে দেখার দরকার নেই। পারলে  নিজেই নিজের পিঠ  চাপড়ে সাবসি দাও, নিজেকে এভাবেই  সম্মান করো ।  এরপরও যদি রাত্রির অন্ধকারে বুকের কষ্টরা এসে ভিড় করে, বালিশে মাথা রাখার আবদার করে , তবে  তুমিই তাকে আশ্রয় দিও, সেই তো তোমার পরম রতন , যে তোমায় পাথর ছড়ানো রাস্তা পার করতে করতে  এতদূর এনেছে । আর একেবারেই তো সে কথা মিথ্যে নয়  ! তাই জন্যই না কবিরা এমন করে  লিখে যেতে  পারেন  - "দুঃখ যদি না পাবে তো /দুঃখ তোমার ঘুচবে কিসে "? তাই , কাছের লোকের মনোযোগ না পাওয়া , তাদের উপেক্ষা অবজ্ঞা প্রথম প্রথম নরম অভিমানী মনের পক্ষে সহ্য করা খুব কষ্টের ‌। সে এক দুঃসহ বেদনার ভার, সে নড়তে চায় না। বুকে বোবা আহত কুকুরের মতো বসে থাকে । তারপর ঠিক সেদিনের শুরু হয় নিঃশব্দে, যেদিন থেকে এগুলো উপেক্ষা করার  তীব্র শক্তি টের পায়  মানুষ। সে এক অচিন পাখির সন্ধান। যে এই দুঃখের পারাবার সাঁতরে চলে যায় ঠিক বেদনাবর্জিত সেই পারে !
 

-----------------------------------------------------------------

এ তো দেখেছি আমরা,  দুঃখের  তমসা জাল ছিন্ন করে একদিন খুশির  চাঁদ ক্ষীণ আলো নিয়ে হাজির হয় । হোক না সে ক্ষীণ আলো । তবু সে নিজের । এই নিজেরটুকু একদিন এক মা-ও খুঁজে পেলেন । সেই মা, যিনি অকালে স্বামী হারালেন । প‍রিবারের চাওয়ার বিপরীত স্রোতে সাঁতার কেটে সন্তানকে বড়ো করলেন, কিন্তু , জীবন  বড়ো রহস্যময়, অনিশ্চিত । তাই,সেই  সন্তানটিও একদিন যৌবনের জীবনের সব অপূর্ণ সাধ নিয়ে চিরদিনের মতো পৃথিবী ছেড়ে  চলে গেল । দিয়ে গেল তীব্র আর এক আঘাত।  স্বভাবতই  মায়ের মনে হলো, আর কী বাকি ? সব তো  হারালো। জীবন এখন এক অর্থহীন বোঝা মাত্র - এরকম এক বোধ নিয়ে জীবনটাকে যেন টেনে টেনে বয়ে চলা। যে স্বেচ্ছাসেবী  সংস্থায় অতি অল্প বেতনে কাজ করে তিনি সন্তান কে বড়ো করেছিলেন, অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দুঃসহ অভিযান করেছিলেন, সেই সংস্থার  কাজ শেষ করে একদিন, প্রতিদিনের মতো ফিরছিলেন,   আসন্ন সন্ধ্যায় নদীর বুকে এক নৌকার যাত্রী তিনি, অনেকের সঙ্গে । তবে ঐ , বরাবরের মতো ভেতরে ভীষণ একলা । যাত্রী কোলাহল  তাকে স্পর্শ করছে না । তিনি আটকে আছেন আকাশে, যেখানে উঠেছে পূর্ণিমার এক  বিশাল গোল চাঁদ। মনে হলো,  এ চাঁদ কবে কোন্ শৈশব কৈশোরে দেখা যেন স্মৃতি । এর সঙ্গে কতকাল  দেখা হয়নি । পৃথিবী যে কত সুন্দর হতে পারে বহুকাল যেন তা ভুলে বসেছিলেন। বিশ্ব চরাচর ছেয়ে সেদিন জোৎস্নার প্লাবন। মন থেকে মুছে গেছে সে মুহূর্তে , তিনি এক অকালমৃত স্বামীর সামাজিক নিয়মমানা বিধবা , ভুলে গেছেন, বুক শূন্য করে চলে গেছে তার একমাত্র সন্তান! শুধু, 'প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে'। মন  খুশিতে ভরপুর । না ,সেখানে  কোথাও কোনো দুঃখ নেই ব্যথা নেই অবসাদ নেই। মন ছেয়ে আছে অসময়ে  জেগে ওঠা তারুণ্যের দুর্নিবার কোলাহলে ।নিজেকে  কখনও কিশোরী, কখনও উদ্ভিন্ন যৌবনা নারী মনে হচ্ছে। মধ্যবয়সের ঝিমিয়ে পরা চেতনার চিহ্নহারা বিশ্বের একমাত্র উজ্জ্বল নারী বুঝি এখন  সে-ই ।প্রতিটি রোমকূপে জেগেছে  জীবনের প্রতি  লালসা , জীবনকে ভালো লাগার এক তীব্র বোধ, মনে ঘুরছে প্রেমের এক অপার অনুভব। মন যেন গাইছে বেশ "হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে" ততক্ষণ, যতক্ষণ না মাঝি নৌকা থেকে নামার জন্য তাগাদা দিল!  সে যেন এক স্বপ্নের ঘোরলাগা জীবনে জ্যোৎস্নামাখা স্নান । নৌকা থেকে ধীর পায়ে নামার পর নিজের  আস্তানাটুকুর  নাগাল পেতে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে চলার সঙ্গে  সঙ্গে ভিড়  করে এল পুরনো স্মৃতি। সন্তানকে একলা ঘরে রেখে কর্মজগতে  যাওয়া সেই  মায়ের ঘরে ফেরার হুঁশ হারানো আকুলতা ।  সেই সঙ্গে ফিরে এল মৃত সন্তানের স্মৃতি । আর  মন ছেয়ে  গেল একরাশ অপরাধবোধে । এ কী ! এ কোন্ মা ? স্বামী হারা, সন্তান হারা মায়ের এ কী  ধরনের পাপ চিন্তা? এরপর থেকেই নিজের বিচারে  তিনি হয়ে গেলেন এক পাপ চিন্তাক্লিষ্ট অপরাধী মা।
   

দিনের পর দিন যায় , কিন্তু  তিনি সেই গ্লানি থেকে আর বেরোতে পারেন না । শুরু হলো মানসিক অবসাদ । প্রয়োজন হলো চিকিৎসকের সাহায্য। বেশ কয়েকবার চিকিৎসকের ওষুধ ও পরামর্শ নিয়ে  ফিরে পেলেন নতুন এক জীবনবোধ ও বিশ্বাস। বুঝলেন, জ্যোৎস্নার আলোয় মন হারিয়ে ফেলা অপরাধ নয় । জীবনের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ জাগলে অকালমৃত সন্তানের প্রতি অপরাধ হয় না । স্বামী ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা মুছে যায় না। এ আসলে  জীবনকেই ভালোবাসা ।স্বামী হারিয়ে বেঁচে থাকা,  সন্তান হারিয়ে বেঁচে থাকা সে তো জীবনের প্রতি  ভালোবাসা আছে বলেই, সে বাঁচা অর্থহীন নয়! পৃথিবীর রঙ রূপ রস গন্ধে জীবন ভরে তোলা, গড়ে তোলা, চাইলে আবার জীবনের কোনো  নতুন  অধ্যায়  শুরু করা এ-ও কোনো  অপরাধ নয়! তিনি যাকে অপরাধ ভাবছেন তা সমাজের নিজস্ব রুচি ও স্বার্থে গড়ে তোলা শুষ্ক অর্থহীন  নিয়ম। যা  জীবনকে কৃত্রিম ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে  বাঁধে মাত্র, তাকে  গতিহীন ছন্দোহীন করে তোলে। অথচ, ভেতরে  ফল্গুধারার মতো জীবনের  রস প্রবাহিত  হয় , খুব কম মানুষ  তার টের পায় , বেশিরভাগই পায় না ,সমাজের চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক বিশ্বাসের বোধ সরিয়ে ।

 

--–-----------------------------------------------------------
সংসার স্বামী সন্তান সন্ততি আত্মীয় পরিজন ষষ্ঠী  শেতলার যূপকাষ্ঠে নিজস্বতাটুকু বিসর্জন দেওয়ার মধ্যেই জীবনের সার্থকতার মন্ত্র পাঠ করতে করতে বড়ো হয়েছিল মন্দিরা, বিশ্বের লক্ষ কোটি নারীর মতো ।মধ্য বয়সে  এসে একদিন সে আবিষ্কার করল, পরিবারে তাকে আর  বিশেষ দরকার  হচ্ছে না কারো। বাঁধা নিয়মে  সকাল থেকে উঠে প্রত্যেকের প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করে সে। সবাই জানে, এটা তারই দায়। বিনিময়ে একটি স্বীকৃতি সূচক কৃতজ্ঞতা সূচক শব্দ উচ্চারণের প্রয়োজন কেউ বোধ করে না। ভালো রান্নার, ধোয়া পোষাকের, নিত্য নতুন রসিপিতে বানানো টিফিনের গন্ধে সবাই মাতাল হয়, ভোগ করে ,কিন্তু নেপথ্য কারিগরের কোনো সম্মান ? না, নেই। না থাকাটাই নিয়ম । থাকলে তা ব্যতিক্রম। যারা কথায় কথায় থ্যাংকস জানায় সবাইকে, বন্ধুকে অনাত্মীয়কে এমনকী  শত্রুকেও, তারা সকলেই  আধুনিক  সমাজজীবনে সুসভ্য নাগরিক। সে জীবনে ম্যানারস একটি  গুরুত্বপূর্ণ  বিষয়। নগরজীবনের আদবকায়দায় ছেলে মেয়ের নিজস্ব জগতও একটি  হয়েছে, সে -ও খুব স্বাভাবিক । তবে,  মন্দিরা  সেখানে প্রয়োজন সরবরাহকারী, চাহিদা মতো মালের যোগানদার। তাদের মনের দরজায় সে সামান্য সময়ের জন্যও কাঙ্ক্ষিত নয়। কেজো স্বামীর জগৎ তো চিরকালই আলাদা ছিল । অফিস মিটিং ট্যুর ,হঠাৎ একদিন উদয় হন তো  আবার হুস্ করে একদিন অস্ত যান । তবে, ছেলেমেয়ের শ্বশুর শাশুড়ির খাওয়া দাওয়া তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য অসুখ বিসুখ স্কুল কলেজ টিউশন এসবের ভিড়ে স্বামীর থাকা না থাকার অনুভব বিশেষ হা হুতাশের সুযোগ পেত না। একরকম করে যেন মিটে যেত । কিন্তু , এখন ? নাহ্ ,এখন মেয়ের ঘর ছেলের ঘর সারাদিন আগল তোলা থাকে। প্রাইভেসি নষ্ট  হয় । ঠিক- ই  ওরা বড়ো হয়েছে , প্রাইভেসি বলে একটা  ব্যাপার তো থাকাই উচিত । আচ্ছা তবে তারও তো প্রাইভেসি দরকার। ভাবতেই হাসি পেল মন্দিরার । সে একবার রান্নাঘর গোছায়, ঝুল পরিষ্কার করে, ফ্রিজ মোছে বোতলে পানীয় জল ভরে রাখে , শোবার ঘর গোছায়, আসবাবপত্র এদিক ওদিক করে ঘরে একটা বিউটি আনার চেষ্টা করেই সারাদিন চলে। প্রথম প্রথম ভাবত অফিস ফেরত, ট্যুর-ফেরত  স্বামীকে চমকে দেবে তার রুচিবোধ অশোকের উচ্চ প্রশংসায় ভরে উঠবে। অশোক  কী কী  বলবে সবই  কল্পনা করতে করতে মন্দিরার মনে পুলকের বুদবুদ। বুদবুদ  তো !  এর  স্হায়িত্ব আর কতক্ষণ ! তাই মন্দিরার, বেশি দিন লাগেনি বুঝতে যে, সে আশার কোনো মর্যাদাই নেই সেখানে। এরকম আশায়  জল ঢেলে মন্দিরাও থেমে যায় একদিন । ওখানে অফিসের বস  ট্যুর প্রোমোশন পার্টি ল্যাং মারামারি ভেদ করে বেডরুমের ড্রয়িং রুমের বিউটি পৌঁছাতে পারে না । সে এক বিটকেল রকমের হাস্যকর,  বেমানান বালখিল্যপনা বইকী ! নিজেকে খুব বোকা বোকা লেগেছিল ছিল সব কিছু বুঝে  যাওয়ার পর । ফুলের একটা দুটো টবের পরিচর্যা, স্বামীর সুগার কোলেস্টেরলের ওষুধ  সময় মতো জোগান দেওয়া , নিজের প্রেসার নির্দিষ্ট সময় অন্তর চেক আপ করানো,এসব কেজো জগতে জীবনটা গিঁট বেঁধেছে চমৎকার । আর ততদিনে বাইরের দেশে পড়ে  চাকরি পাওয়া সন্তানকে ফোন করে সাড়া  না পেতে পেতে হতাশ হয়ে ওঠা ,কন্যার চাকরি শ্বশুরবাড়ি ও সন্তানকে সামলে প্রতিদিন  জর্জরিত হওয়ার খবর নিতে  নিতে উদ্বিগ্ন হওয়া, এসবের মন্দিরেই মন্দিরার দেবতা আটকে গেছেন। । এরকমই  যন্ত্রণাময় উদ্দেশ্যহীন জীবনের  চাপা কষ্ট আর এক বোবা গ্লানির বোধ নিয়ে  কাকলির সঙ্গে যোগাযোগ হয় এক বিয়েবাড়িতে । কাকলি মন্দিরার স্কুলের সহপাঠী । অথচ এ শহরেই যে মুক্ত বিহঙ্গের মতো কাকলি  এতকাল আছে, ঘর-সংসার  পরিপাটি  করে  চালানোর বিনিময়ে খেয়েপরে বেঁচে থাকা মন্দিরা জানতেই পারেনি । একথা সেকথার পর ফোন নম্বরের আদান প্রদান হলো পরস্পরের কাছ থেকে বিদেয় নেওয়ার আগে।  মন্দিরা টের পেলো,  কাকলি আগের মতো আর শান্তশিষ্ট মুখচোরা মেয়েটি নয় । অনেক চঞ্চল প্রাণবন্ত। কাকলি নামটা  এই মধ্য বয়সে এসেই যেন মানিয়েছে  । কাকলির একমাত্র মেয়ে ব্যাঙ্কে চাকরি করে। বিয়ে  হয়ে গেছে । এই  শহরেই থাকে । আর সে নিজে, একটা পাড়ার প্রাইভেট স্কুলে চাকরি করে । আগে ও একটা  সরকারি চাকরি করতো । তবে, বিয়ের পর সামলানো যায়নি । চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।। কিন্তু, একসময় চাকরি করে স্বাধীন উপার্জন করা মেয়ে সে। মাসের শেষে স্বামীর কাছে ফোনের রিচার্জ করার জন্যও হাত পাততে তার আত্মমর্যাদাবোধ আহত  হতো । তাই , পাড়ার একটা স্কুল হচ্ছে জেনে কাকলি মরিয়াভাবে  যোগাযোগ করে চাকরিটি আদায় করে। সে-ও  যে  খুব সহজ ছিল এমন  নয় । কিন্তু স্কুলের কাছাকাছি অঙ্ক ও বিজ্ঞান এর  শিক্ষক পেতে ওদেরও সমস্যা ছিল। আর বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষক জোগাড় করার মতো আর্থিক বিলাসিতা দেখনো এরকম পাড়ায় গজিয়ে ওঠা বেসরকারি স্কুলে প্রথম  দিকে দেখানো সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না  । পিওর সায়েন্স নিয়ে বি এসসি করা কাকলি বাচ্চাদের অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়ায়। তবে, এটা ঠিক, পরিবারে এ নিয়ে বিশেষ আপত্তি ওঠে নি । মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে । ধীরে ধীরে  কেমন  করে  একসময় বন্ধু হয়ে যাওয়া শাশুড়িও বৌমার এ আবদার মেনে নিয়েছিলেন । সহযোগিতাও করেছেন যথেষ্ট । স্কুল থেকে ফিরলে উনিই নাতনীর  খাওয়া দাওয়ার দেখাশোনা করেছেন । আর বেসরকারি এই স্কুল তার বাড়ি থেকে একেবারে হাঁটা পথ। কাজেই উপার্জনহীন জীবনকে আবার নতূন ছন্দে গেঁথে নিতে পেরেছিল কাকলি । তাই কি সে এমন কলতান মুখর, খুব আনন্দে খুশিতে আছে, মন্দিরা নিজের জীবনের পাশে  ওকে রেখে  ভাবে এইসব । চাকুরিজীবী মেয়ের  বিয়ে হয়ে যাওয়া আর  টুক করে একদিন শাশুড়িরও পরপারে চলে  যাওয়ার পর স্কুল ফেরত কাকলির ঘরে সময় যেন অলস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে‌। ব্যাঙ্ক ম্যানেজার স্বামীর  ফিরতে রাত আটটা নটা বেজে যায় । তাই ইদানীং বিকেলের  দিকে সপ্তাহে তিন দিন  দুচারটা  ছেলেমেয়ের টিউশন করে । উইক এণ্ডে মাঝে মাঝে মেয়ে আসে অথবা তারা স্বামী স্ত্রী  দুজনে কাছাকাছি কোথাও ঘোরাঘুরি করে । দুবছর পরপর দুজনের সুদূরের ডাকে সাড়া দেওয়ার বিষয়টা তো আছেই। ইদানীং ফোনে অনেক কথা  হয় মন্দিরার কাকলির সঙ্গে। এরকমই  একদিন  মন্দিরার  সব কথা শুনে প্রস্তাব করেছিল , 'তুই আমাদের স্কুলে গান শেখাবি ? তুই তো গান করতিস খুব ভালো। 'কারণ, ওদের স্কুলের গানের টিচারের বিয়ে হয়ে গেছে। ওরা ভালো গানের টিচার চাইছে । তবে মন্দিরার বাড়ি থেকে স্কুলটা দূরে । কাকলির মতো পায়ে হাঁটা পথ নয়। অটো করে যেতে হবে । তা হোক, কাকলি স্কুলের এখন সিনিয়র টিচার , শিক্ষক হিসেবে ওর নাম আছে বেল, প্রিন্সিপালও ওকে বেশ সমীহ করেন। মন্দিরা চাইলে কাকলি  এই চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারবে - আত্মবিশ্বাসে ভরপুর একটা গলা শোনে মন্দিরা, যে একদিন তার স্কুলে সহপাঠী ছিল । কিন্তু,মন্দিরার তো ভেতরে ভেতরে অবিশ্বাসের লোনা জল ! সে করবে চাকরি ? তার হারমোনিয়াম তানপুরা বাপের বাড়ি থেকে খুব যত্নে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল শ্বশুরবাড়িতে । শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে  অশোক মন্দিরাকে দেখতে গিয়ে  তার গান শুনে  অভিভূত হয়ে গিয়েছিল । বিয়ের বাসরে অশোকের বন্ধুরা গান শুনে ঈর্ষার কথা জানাতে দ্বিধা করেনি ‌। প্রথম প্রথম অশোক খুব ওর গান শুনতে  খুব ভালোবাসত । বন্ধু  বান্ধব  আত্মীয় স্বজনকে গর্ব করে  তার  গানের  গলার  প্রশংসা  করতো। তারপর ক্রমশ অবহেলার ধুলো আর অভিমানের আড়ালে গান একটু একটু করে কবেই হারিয়ে গেল। মাঝে মাঝে গুনগুন করলে ঘরের সবার জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো ডাকাডাকি করে। সবা্র সব প্রয়োজন তাকে দিয়েই হতে পারে ।  আর , এসব যেন শেষ হয় না কিছুতেই । ছেলে মেয়ে স্কুলে আর  অশোক  অফিস  চলে গেলে শ্বশুর শাশুড়ি সবাই যেন জড়বৎ স্থির। সে-ই শুধু সচল, দম দেওয়া পুতুল । সেখানে কোনো গানের  মতো  উদাসী  হাওয়া উড়তে পারে না । এরকমটাই যেন দস্তুর । ছেলেমেয়েরা যখন  বাইরে চলে গেল শ্বশুর শাশুড়ি আর আত্মীয় স্বজনের দেখভাল আদর আপ্যায়নে কোনো খামতি না রাখলেও সবার মধ্যে সামান্যতম তৃপ্তি বোধের ছায়া দোলাতে পারত না কখনও । ভেতরে ভেতরেএকটা দুঃসহ একাকিত্ববোধের করুণ ঝর্ণা নামতো । কেউ জানতে পারেনি  কখনও । কারণ, তার বাইরেটা একেবারে স্থির,  নিস্পন্দ, পাতা নড়ে না । এক বছরের ব্যবধানে শ্বশুর শাশুড়িও গত  হলে, ঘরে নেমেছিল নৈঃশব্দের বন্যা। কীসের আগুনে মন্দিরা জ্বলে পুড়ে খাক হয় কেউ জানেনা। এমনই বোবা একঘেয়ে তরঙ্গহীন জীবনে কাকলির উপস্থিতি ওর ভেতরে বিস্ময়ের ঘোর লাগালেও তা ঘুচিয়ে দিতে বেশি দেরী করল না। কে যেন প্রবলভাবে  ডাক দিল তার অন্তরাত্মাকে--- এখন  তো ওঠো জাগো , নিজের দিকে মুখ ফেরাও।

 

শৈশবে  মন্দিরা গান  লেখাপড়ার  পাশাপাশি খেলাধুলোর চর্চা করতো । পাড়ার ক্লাবে খেলতে যেত ছোটবেলায়।  স্কুলের স্পোর্টসে ভালো করতো । ঘরে যখন টিভি ছিল না তখন লিগের ফুটবল,  টেস্ট ক্রিকেটের খবর রাখতো সে রেডিও আর আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে । এদের যাবতীয় রেকর্ড সব মুখস্থ । আর টেনিসের খবর ?  সে-ও এক উন্মাদনা। বিয়র্ন বর্গ জন ম্যাকেনরো নাভ্রাতিলোভা এদের নানা ট্রফি জেতার খবরের সঙ্গে মিষ্টি জার্মান মেয়ে স্টেফি গ্রাফের উত্থান , কিংবা  মিউনিখ অলিম্পিক মন্ট্রিল অলিম্পিক, সব সব খবর তার সব রাখা চাই-ই । ওর ক্লাসের বন্ধুদের গল্পে ভিড় করে থাকে তখন, কোন্ ছেলে কার দিকে তাকিয়েছে , কে কাকে প্রেমের প্রস্তাব দিল, কার প্রেম  ভেঙে গেছে, কার বাড়িতে গোপন প্রেম ফাঁস হয়ে গেছে , নয়তো পাড়ার সিনেমাহলে নতুন কী সিনেমা এল এইসবে। মন্দিরা  মনে মনে এদের একটু করুণাই করতো। সেই মন্দিরা বিয়ের পর কীরকম ভাবে যেন কোথায় হারিয়ে গেল। দায়িত্ব আর কর্তব্যের মাঝে সে নিজেই নিজের কাছে  হয়ে গেল যেন এক বিস্মৃত ইতিহাস।
 

এখন নিজের উপর রাগ হয়, ক্ষোভ হয় দুঃখ হয় ।মনে হয়  জীবনটা আর  একবার  শুরু করা গেলে ভালো হতো। তার  গানের  গুরু অভয় জেঠুর প্রিয় এই ছাত্রীটি অনেক দেরি হলেও বুঝতে পারল, পড়ার নেশা, খেলার নেশা , বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পাওয়া  নানা পুরস্কার সব যেন তার অস্তিত্ব বিসর্জনের এক চতুর চোরাবালি । সে এসব নিয়ে ক্রমাগত বনেদি ঘরের সুচাকুরে একমাত্র সন্তানের আর স্ত্রী-ই নয়, নিষ্ঠাবতী কর্ম-নিপুণ বিনা বেতনের ফাইফরমাস খাটা এক কর্মচারীও হয়ে উঠেছে। সে  ডুবে গেল কোন্ অতলে যেখানে নিজের নাগাল পাওয়া যায় না ! প্রথম প্রথম এ বিসর্জনকেই অনিবার্য মনে হতো । পরে ধীরে ধীরে যত দিন যায়  মনে হতে লাগলো , '...সব পাখি ঘরে ফেরে, ফুরায় এ জীবনের  সব লেনদেন /থাকে শুধু  অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার...!' গান  শেখাবে  সে ! জীবনের মধ্য গগনে এসে প্রথম সে মনের  বদ্ধ ঘরের একটা খিড়কি খুলবে - এ-ও কি সম্ভব ? এই অবিশ্বাসী উত্তেজনার ঝড় মন্দিরার মনে বেশিক্ষণ পাত্তা পেল না। কাকলির স্কুলে গান শেখানোর প্রস্তাব মন্দিরার কাছে হয়ে গেল এক ফালি  আলোর ইশারা। দৃঢ় মন  দাঁতে দাঁত চেপে  প্রতিজ্ঞা করে , না, একে গ্রহণ করতে হবে । এ আলো নিবিয়ে দেওয়া যাবে না । তাই, পাড়ার দোকান "সুর ও তাল"- এ দিয়ে এল মন্দিরা হারমোনিয়াম আর তানপুরা । সব ঠিক ঠাক করে নিতে হবে । অশোক অফিসে চলে গেলে তো সে রেওয়াজ করেই , ট্যুরে গেলে রেওয়াজ চলে দীর্ঘ সময় ধরে। বিদেশে পড়তে চলে যাওয়ার পর থেকে ছেলের ঘরের বিছানাতেই ও দুপুরের অলস প্রহরে এক চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে এপাশ ওপাশ করত। তবে,  বুক ঠেলে কান্না আর বের হতো না । অথচ মনে হতো  কাঁদলে ভালো হতো। এখন ঐ বিছানাতেই তার এক  নতুন জগৎ জন্ম নিয়েছে ।
 

হারমোনিয়াম তানপুরা পরিপাটি করে সেখানে রাখা, অশোক দেখেছে। মন্দিরা ভেবেছিল হয়তো অশোক একদিন কৌতূহলী হবে, জানতে চাইবে  এসব কী জন্য , আমি আবার গান করছি কিনা । নাহ্ এসব কিছুই হয়নি। সে ঘর মোছা ন্যাতার মতো । প্রয়োজনে ব্যবহারের পর কেউ ফিরে তাকায় না , তার গায়ে ভোরবেলা কোনো আলো বুলিয়ে দিলেও। তাই, অশোকের মনে এসবের জায়গাও নেই।  সেখানে ঘোর ঠাণ্ডা । জীবনের তাপহীন  কঠিন এক উত্তুরে হাওয়া ! কাজের মাসি, রতনের মা, আর পাড়ার এক কাকিমা শুধু দু একদিন গানের  আওয়াজ পেয়ে কৌতূহলী হয়ে  দু একটা কথা জানতে চেয়েছিল। ব্যাস্। মন্দিরা ভাবে, থাক সারা পৃথিবী তার দিকে ঘুমিয়ে থাক। ও নিজের পৃথিবীকে এখন থেকে জাগিয়ে রাখবে । ঘুমোতে দেবে না কোনোদিন । ছেলেমেয়ের একটি ফোনের জন্য আর আকুল হবে না । ফোন বেজে বেজে ক্লান্ত হয়ে গেলে ব্যস্ত ছেলের কখন সময় হবে এর জন্য অপেক্ষার দুয়ারে আর সে  হত্যে দেবে না। 'মা, পরে ফোন করবো, এখন বিজি আছি ।' এই 'পরের ফোনের' প্রহর মন্দিরার আর গোনার সময় নেই। সে খুব ব্যস্ত । স্কুলের ছেলেমেয়েদের গান শেখাতে শেখাতে গানের দুটো একটা টিউশন করার আবেদনও এর মধ্যে সে  পেয়েছে । তবে, আপাতত সে টিউশনের কথা ভাবছে না । বলেছে এখন নয়,  কিছুদিন পরে তাদের জানাবে । স্কুলে একটা গান শেখানোর চাকরি করবে  শুনে  প্রথম অশোক খুব অবাক হয়েছিল।
 

মন্দিরা জানিয়ে দিয়েছে, তুমি অফিস যাওয়ার পরে স্কুলে  গেলেই  হবে । মনেমনে বলেছিল,  'তোমার স্বাচ্ছন্দ্যের শর্ত পূরণ করেই এইটুকু মুক্তি আমি কিনেছি অশোক , ভয় কোরো না ‌। তবে, কিছু  জিনিষ এখন থেকে একটু বদলাবে বইকি ! ' গানের ক্লাস স্কুলের সেকেন্ড হাফ থেকে  শুরু হয়। কাজেই একটু  পরে বের হলেই হবে আপাতত। তবু অশোকের ধন্দ যায় না । জানতে চায়, 
 

- তা হঠাৎ এরকম গান শেখানোর কী দরকার পড়লো ?
- এমনি,  ইচ্ছে হলো ।

 

এই প্রথম মন্দিরা নিজের ইচ্ছের কথা বললো, তাই নিজের কানেই কথাটা একটা আনকোরা সুরের শব্দ হয়ে  যেন বেজে উঠল । এ একেবারেই নিজের  ইচ্ছে ! প্রথম নিজের  ইচ্ছে ঘোষণা করার শক্তি কী তা-ও অনুভব করলো। বুঝল সে এ  বেশ তীব্র ও তাপের শক্তি !

 

- তা ঘরের দেখাশোনা। 

- কী যে বলো ! ঘর কি মানুষ যে তার দেখাশোনা লাগবে ?

- স্কুলের গানের দিদিমণি হচ্ছো, ছেলেমেয়েরা জানে ?
- ওদের   এসব জানার দরকার নেই । আর তা ছাড়া  ওদের সময় কোথায়, এসব শোনার ?  ওরা কী করছে আমি কি সব জানি ? এই তো ছেলের পড়া শেষ হতে না হতেই চাকরিতে যখন জয়েন করেছিল, আমায় তো বলে নি ! তোমার সঙ্গে রাতে ফোনে কথা হলো বলে শুনেছিলাম ।

 

ঠিক, মন্দিরার সেদিনের গভীর গোপন যন্ত্রণার কথা জানে কেউ ? তিল তিল করে বড়ো করা ছেলে তার প্রতিষ্ঠার খবরটাও মাকে দেওয়ার দরকার মনে করে না ! অশোকেরই  কি  মনে হয়েছিল ছেলেকে কর্তব্যের কথাটা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার?  সেই বিনিদ্র রাতের খবর  অশোকের চেতনাকে আগের মতোই পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে নাকডাকা রাতের  মতোই একটুও স্পর্শ করেনি । যেন কিছুই হয়নি । এরকমই তো হওয়ার কথা ছিল !
 

তবে,  আজ , এই প্রথম অশোক একটা অচেনা মন্দিরাকে সামনে দাঁড়াতে দেখলো। দৃঢ় সাহসী আত্মপ্রত্যয়ী মন্দিরা। অন্য, অন্য, একেবারে অন্য,  সম্পূর্ণ অচেনা, বড়ো বেশি  আলাদা এক মন্দিরা । আন্দামানে বেড়াতে গিয়ে ফোনে ব্যস্ত থাকার জন্য একরাশ অভিমানে নীরবে চোখের জল মোছা সেই  মন্দিরা নয় । কীরকম একটা ঘোর লাগছে অশোকের,  সম্বিত ফেরে  মন্দিরার কথাতেই । 
 

- ড্রাইভার গাড়ির চাবি নিতে এসেছে । চাবিটা দাও। আর হ্যাঁ,  আমার দেরি হচ্ছে, স্নানে যাচ্ছি , তুমি দরজাটা বাইরে থেকে লক করে যেও। এটাও এই প্রথম, মন্দিরা  অশোকের যাওয়ার সময় দরজার একদিকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না , যতক্ষণ অশোকের গাড়ি চোখের আড়ালে চলে না যায় ।
 

বাথরুমে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন মন্দিরা,  শোষণের পৃথিবীর দিকে চরম অবহেলা ছুঁড়ে  দিয়ে নিরাভরণ অন্য  নারী সে, যে, ঠিক এখন জন্ম নিয়েছে। শাওয়ার থেকে ঝরা জলের বিন্দু পরম মমতায় তার এতদিনের আত্মবিস্মৃতির গ্লানি ধুয়ে দিচ্ছে। এত এত ক্লেদক্লিন্ন ছিল সে এতকাল! অনাদৃত উপেক্ষিত জীবনের বেদনার ভার বয়ে বয়ে  ক্লান্ত শরীর মন আজ প্রথম অন্য রকম উদ্দীপনা অনুভব করলো । বাথরুমের আয়নায় মন্দিরা দেখে এক নতুন মন্দিরাকে । বিষণ্ণতার ছায়া সরে গেছে মুখ থেকে - গলায়  গান উঠে আসে ,বিস্মৃত  রবিঠাকুর -'নিশীথের বুকের মাঝে এই যে কমল উঠল ফুটে এএএএএ /উঠল  ফুটে স্বর্ণকমল /আগুনের কী গুণ  আছে কে জানে  ,কে জানে। ' সত্যি কোন্ মুক্তির সুরের আগুন তাকে জাগিয়ে তুলেছে আজ !;
 

অটো  করে গানের  স্কুলে  যায় মন্দিরা। চারদিকে ফাল্গুনের  বসন্তের রঙ। কী যেন  এক অজানা খুশিতে মন ভরে আসে আজ। ভালোবাসায় ভরে আসে । সে কাকে ভালোবাসতে  শিখল এ বসন্তে ? নিজেকে  ? কে  জানে  ?  তাই হবে।
 

খুব  মন দিয়ে যত্ন  করে গান শেখায় মন্দিরা  স্কুলের বাচ্চাদের। ওদের  মধ্যে  দু একজন তো খুব সুরেলা । মন্দিরা মাঝে মাঝে ছোটোবেলায় ফিরে যায় ওদের দেখে । স্কুল থেকে ফিরে  গা হাত ধুয়ে আজ ছাদে  গেল অনেক দিন পর । তাকালো  আকাশের দিকে । সুপুরি  নারকেলের  বনে  তখন  সূর্য গলে  পড়ছে । আকাশ মুহূর্তে  মুহূর্তে  রঙ  বদলাচ্ছে।  কাকেরা  সব ঘরে ফিরছে সাথীদের নিয়ে । 
 

আজ এক নতুন বাসন্তী সন্ধ্যা। মনটায় যেন ফাল্গুনের আবিরে লালে লাল  । আজ সকালে প্রথম পেরেছে অনেক  নীরব  যুদ্ধ  করে অশোকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের  অস্তিত্ব ঘোষণার সাহস দেখাতে । তবে, আজকের  দ্বিতীয় পর্বটার জন্য মন্দিরা ততটা প্রস্তুত ছিল না।
 

রেওয়াজ করতে বসে  জানলা দিয়ে মন্দিরা দেখে  সন্ধের  আলোছায়া মাখা গাছগুলো ঝিরঝির করে দুলছে । মন্দিরা ওর গানের গুরু অভয় জেঠুকে একটা প্রণাম করলো মনে মনে‌ । বললো , জেঠু , দেখো আর কখনও গান ছেড়ে তোমার মন্দিরা  থাকবে না। তোমার শিক্ষাটুকু আজ আমার  সম্পদ,  সে  আমাকে চিনতে সাহায্য করেছে । এই গান আমার জীবনে বাঁচার মন্ত্র এনে দিল । তুমি বলতে , 'মন্দিরা তোর গলায় আসলে  সরস্বতী গান করে । তুই বুঝিস না ।' ঠিক জেঠু,  আমি বুঝিনি সেদিন তোমার কথা‌। এই সরস্বতীকে আবার ফিরিয়ে এনেছি । কখনও চলে যেতে দেব না ।বেশ টের পেল মন্দিরা তার  গণ্ডদেশ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। শেষ কবে মন্দিরা কেঁদেছিল মনে নেই। ঠিক তখনই হারমোনিয়ামের উপর রাখা  মোবাইলের স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠলো। টেক্সাস থেকে ছেলের ফোন। মন্দিরা তার বহু আকাঙ্ক্ষিত এই ফোনটা আজ ধরলো না, ভেজা চোখে ঠায় তাকিয়ে থাকল ফোনে ভেসে থাকা ছেলের নামটার দিকে । এক সময় ডেকে ডেকে  ক্লান্ত হয়ে  ফোন থেমে গেল । তার আলো নিবে গেল । চোখ মুছে খুব ধীরে ধীরে  মন্দিরা ফোন তুলে ছেলেকে মেসেজ পাঠালো। 
 

- রুদ্র, এখন ব্যস্ত আছি। পরে ফোন করবো ।
 

কাকলি তানপুরার তারে হাত দিয়ে গুছিয়ে বসলো ।গলায় রাগ বসন্ত্ । কিন্তু মোবাইলের রিংটোনের সুর স্ক্রিনে আবার ছেলের নাম ভেসে উঠলো । বারবার গানের এই ছন্দোপতন   ভালো লাগছে না। তবু, তানপুরা নামিয়ে  ফোনটা ধরলো । ছেলে খুব উত্তেজিত বিরক্ত।
 

-  কী ব্যাপার ? ফোন ধরছো না ? ব্যস্ত লিখেছো ? তুমি আবার কী কাজে ব্যস্ত ? আমি দিদি কেউই তো এখন বাড়িতে নেই । বাবাও তো নিশ্চয়ই এখনো ফেরে নি । তবে, কীসে ব্যস্ত তুমি, মা ? 

 

একনাগাড়ে ছেলে কথা গুলো বলে যায় । মাকে কোনো কথা বলার অবকাশ না দিয়েই। ওর চেনা  রাগ উত্তেজনায় ফুলে ওঠা গলা মন্দিরা  সব দেখতে  পায় । শান্ত গলায় বলে, 
 

- আমি এখন গানের রেওয়াজ করছি। 
- কী, গানের রেওয়াজ ? তুমি গান করছো ? কেন ?
- করছি । আমার ইচ্ছে হয়েছে। 
- কেন কেন কেন হঠাৎ এরকম ইচ্ছে ?
- হঠাৎ নয় । আমি গান শিখেছি গান  গাইতাম  একসময় । তুমি তোমরা সবাই জানো সে কথা । তবে, তোমাদের  তা  মনে রাখার তো কথা নয় !  সেগুলো আবার ঝালিয়ে নিচ্ছি, নিজেকে ফিরিয়ে আনছি রুদ্র ! আর আমি একটা স্কুলে এখন গান শেখানোর চাকরি করি । 
- কী ? কী  ? তুমি তুমি চাকরি করো ?
- হ্যাঁ, করি । 
- বাবা কিছু বলেনি ? বাবা রাজি হলো ?
- না, বাবার অনুমতি আমি নিইনি। এ সিদ্ধান্ত আমার একার। গানের মুডটা নষ্ট করতে চাইছি না।  পরে কথা হবে। কেমন ? ফোন কেটে দেয় মন্দিরা, কাটার আগে অনুমতি সূচক ভাষাটি বিবর্জিত হয়ে যায় আপনা থেকেই। ঘরে  এক  অপার নৈঃশব্দ্য নামে, তবে  তা যেন কী এক  শান্তির ! তার মনের গায়ে ঝিরঝির বাতাস দুলে যায়, বসন্ত বাতাস। পাশের কোনো বাড়িতে কি মাধবীলতার গাছে ফুল ফুটেছে ? এরকম গন্ধ তার খুব চেনা । এ তো মাধবীলতা ? ওদের বাড়িতেও এ গাছ ছিল । শৈশবের চেনা গন্ধ তো,  ভুল হবে না। তবে, কী আশ্চর্য ! এর আগে মন্দিরা এ বাড়ি  থেকে  কখনও ঐ গন্ধ টের পায়নি । আজ প্রথম । চোখ বন্ধ করে মন্দিরা লম্বা শ্বাস নেয়। মিষ্টি গন্ধে বুক ভরে ওঠে । তানপুরাটা আবার খুব যত্নে তুলে নেয় । তারে আঙুল ছুঁয়ে সুর বেজে ওঠে । গলায় বাজে রাগ  বসন্ত্  । মন্দিরা বেজে ওঠে ঠিক তালে লয়ে সুরে !!