প্রবন্ধ - ৮

বাংলার সিলেটি উপভাষা : প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ
অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য
প্রাক্তন উপাচার্য (আসাম বিশ্ববিদ্যালয়), প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক

এক

 

"মমতাবিহীন কালস্রোতে
বাংলার রাষ্ট্রসীমা হতে
নির্বাসিতা তুমি সুন্দরী শ্রীভূমি"

 

সিলেট সংক্রান্ত যে-কোনও আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের এই সুবিখ্যাত পঙ্ক্তিগুলি অনিবার্ধভাবেই ব্যবহৃত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে এই সিলেট কেন নির্বাসিত? রবীন্দ্রনাথ যখন লিখেছিলেন, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ছিল অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের অন্তর্গত। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও তার বিভিন্ন ফলশ্রুতি নিয়ে কম-বেশি প্রত্যেকেই অবহিত। কিন্তু ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ওপনিবেশিকদের চক্রান্তে সিলেট ও সিলেট সংলগ্ন কাছাড় সহ গোয়ালপাড়া জেলাকে যে আসামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সেইজন্যে এ ঘটনাকেই প্রথম নিঃশব্দ বঙ্গভঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত, এ সম্পর্কে আমাদের অভিনিবেশ শূন্য। কেন তুলনামূলকভাবে অনুন্নত অঞ্চলের সঙ্গে সিলেটকে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, এর মীমাংসা রয়েছে ১৭৯৩ থেকে ১৮৭২ অবধি বিস্তৃত রাজশক্তির রাজস্ব আদায় সহ বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে |

বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ সিলেটকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ফলে সিলেট-কাছাড়ের জনমানসে যে-জটিল অনন্য়ের সূচনা হয়েছিল, তার তাৎপর্য নিয়ে কখনও গভীর অনুসন্ধান করা হয়নি। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ফলে সিলেট নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্তর্গত হয়। অর্থাৎ সিলেটের পক্ষে তা যাহা বায়ান্ন তাহা তিপ্পান্ন ।  ১৯১১ সালে এই ব্যবস্থা বাতিল হলেও সিলেট কিন্তু পূর্ববঙ্গের সঙ্গে ঈপ্সিত  স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে যায়নি। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট যখন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, সে-সময় করিমগঞ্জ মহকুমার তিনটি থানাকে বাদ দেওয়া হয়। সেই অঞ্চল যুক্ত হয় খণ্ডিত ভারতে অর্থাৎ আসাম প্রদেশের কাছাড় জেলায়।

এই জরুরি তথ্যগুলি জেনে নিলে সিলেটের উপভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সমাজের নিষ্কর্ষ বুঝতে সুবিধে হবে। রবীন্দ্রনাথের প্রাগুক্ত পঙ্ক্তিগুলির পরবর্তী অংশ বিশেষ তাৎপর্যবহ :

'"ভারতী আপন পুণ্য হাতে
বাঙালির হৃদয়ের সাথে
বাণী মাল্য দিয়া
বাঁধে তব হিয়া
সে-বাঁধনে চিরদিন তরে তব কাছে
বাংলার আশীর্বাদ গাথা হয়ে আছে।"

সাবেক সিলেট জেলা এখন সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার নামে চারটি জেলায় বিন্যস্ত নতুন প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে পরিচিত। প্রতিটি জেলায় রয়েছে একাধিক উপজেলা । কালে- কালান্তরে এভাবেই বদলে গেছে সিলেটের মানচিত্র, যার প্রাচীন শ্রীহট্ট।  এই নাম কবে থেকে প্রচলিত হয়েছে, তা বলা কঠিন। আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী সম্পদপূর্ণ হাট বা ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল; কিন্তু তা একইসঙ্গে স্থান-নাম এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলেরও নাম। প্রাচীনকালে ব্যবহৃত পূর্বভারতের অন্তর্দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের প্রণালীবদ্ধ অনুসন্ধান করলেই এর হদিশ পাওয়া যাবে।

পুরোনো মানচিত্রে দেখা যায় যে সুরমা নদীর তীরে গড়ে-ওঠা শ্রীহট্ট নামক জনপদ থেকে একটি পথ জয়ন্তিয়া পর্বতমালার মধ্য দিয়ে আসাম প্রদেশে পৌঁছেছে। অনুমান করা কঠিন নয় যে এই পথই দু'টি বা তার চেয়ে বেশি শাখায় বিভক্ত হয়ে চিনদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। বিখ্যাত পরিব্রাজক ফা হিয়ান ও হিউয়েন সাঙ্‌ সম্ভবত এই পথ দিয়েই যাতায়াত করেছিলেন। তাদের বিবরণে যে সিলিহট এর কথা পাওয়া যায়, তা আমাদেরে শক্তি-সঙ্গম তন্ত্রে উল্লিখিত শিলহট্টের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই অঞ্চলের কাছাকাছি কোথাও সমুদ্র ছিল, পুরাণ-কথিত এই বিবরণ থেকে মনে হয় যে সিলেটের পশ্চিমে বিস্তীর্ণ হাওর (সায়র বা সাগর) জনমানসে সমুদ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিংবা তখনকার মানচিত্র অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে এই সুবিশাল জলাশয়ের যোগাযোগ ছিল। যোগিনীতন্ত্র, বৃহনীলতন্ত্র ও দেবীপুরাণ অনুযায়ী শ্রীহট্ট ছিল শাক্তধর্মের অনুসারী। এইসব প্রাচীন তন্ত্রের কালনির্ণয় খুব সহজ নয়। তবে তান্রলিপির সাক্ষ্য অনুযায়ী মহারাজ শ্রীচন্দ্র দশম শতকে শ্রীহট্ট জয় করেছিলেন। তার মানে বর্ধিষ্ণু বাণিজ্য-কেন্দ্র ও এশ্বর্যপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে শ্রীহট্ট অবশ্যই অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

বহুবিধ সম্পদের জন্যেই শ্রীহট্ট অতি প্রাচীনকাল থেকেই বহির্জগতের কাছে পরিচিত ছিল। তন্ত্র বা পুরাণের সাক্ষ্য তর্কাতীত নয় বলে আমাদের লক্ষ করতে হয় শ্রীহট্ট মণ্ডলে আবিষ্কৃত তান্রশীসনগুলিকে। মাইজগাঁও ও বরমচাল রেলস্টেশনের মাঝামাঝি ভাটেরা নামক গ্রামে রাজা গোবিন্দ কেশব দেব (১১ শতক) ও তার ছেলে ঈশান দেবের (১২ শতক) এর দ্বারা প্রচারিত দুটি তামরশাসন একসঙ্গে আবিষ্কৃত হয় ১৮৭২ সালে । আর ঠিক তার চল্লিশ বছর পর শ্রীহট্রের পূর্বাঞ্চলে বিয়ানীবাজার এলাকায় পঞ্চখণ্ড পরগণার নিধনপুর গ্রামে কামরূপের রাজা ভাস্কর বর্মার কয়েক খণ্ডে বিভক্ত তান্রশাসন ও রাজকীয় শিলমোহর আবিষ্কৃত হয়। এর সময়কাল সপ্তম শতক। ১৯৫৮ সালে শ্রীহট্রের রাজনগরে ইটা পরগণার পশ্চিমভাগ গ্রামে আবিষ্কৃত হয় বিক্রমপুরের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বিখ্যাত রাজা শ্রীচন্দ্রের (৯২৯-৯৭৫) একটি বড়ো তান্রশাসন। এছাড়া শ্রীমঙ্গলের কাছাকাছি কালাপুর গ্রামে অস্টম শতকের সামস্ত রাজা মরুগুনাথের একটি তান্রশাসন আবিষ্কৃত হয় ১৯৬৩ সালে।


দুই

এইসব তথ্য থেকে যেসব সিদ্ধান্ত অনিবার্য হয়ে পড়ে, তা হলো শ্রীহট্ট মণ্ডলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিশিষ্ট সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আইডেন্টিটি বা অভিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা । প্রসঙ্গত লেখা প্রয়োজন যে নিধনপুর তামরশাসন প্রকৃতপক্ষে ভাস্কর বর্মার বৃদ্ধ প্রপিতামহ ভূতিবর্মার দ্বারা ষষ্ঠ শতকে প্রদত্ত মূল তান্রশাসনের নবীকরণ। এতে জানা যায় যে চন্দ্রপুরি বিষয়ের অন্তর্গত ময়ূরশাল্মল অগ্রহার ক্ষেত্রের ভূমি ব্রাহ্মণদের কাছে রাজা নিষ্কর দান করেছিলেন। এই তথ্য এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ যে এ ময়ুরশাল্মল অগ্রহার ক্ষেত্র পরবর্তীকালে পূর্ব শ্রীহট্টের প্রখ্যাত বিদ্বৎ-সমাবেশ পঞ্চখণ্ড ও সংলগ্ন সাম্প্রতিক বরাক উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেইসঙ্গে এও জানা যায় যে কর্ণসুবর্ণ নগরের সঙ্গে এ অঞ্চলে অভিবাসী প্রায় দুই শতাধিক ব্রান্মণ পরিবারের কিছু না কিছু সম্পর্ক ছিলই। সুতরাং বৃহত্তর বঙ্গীয় পরিসরের যাবতীয় অনুষঙ্গ সহ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানের বিভিন্ন অনুপুঙ্খ চন্দ্রপুরি বিষয়ের অন্তর্গত ময়ূরশাল্মল অগ্রহার ক্ষেত্র সহ সমগ্র শ্রীহট্ট মঙ্গলে ব্যাপ্ত হয়েছিল।

বিভিন্ন তান্রশাসনে ব্রাহ্মণদের যেসব উপাধি পাওয়া যায়, পরবর্তীকালে তা অব্রাহ্মণদের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়। এ-ও সমাজের ভেতরকার সম্ভাব্য বিবর্তনের সূচক। কোনও সন্দেহ নেই যে অন্তত দু-হাজার বছর ধরে বৃহত্তর বঙ্গে যে নিরন্তর অভিবাসন প্রক্রিয়া চলছিল, শ্রীহট্র মণ্ডল ছিল তার পূর্বসীমা। প্রাচীন সমতট সংলগ্ন যে-অঞ্চল কখনও হরিকেল আর কখনও চন্দ্রপুর বিষয় হিসেবে পরিচিত হয়েছে, তারই কিছু অংশ শ্রীহট্ট রাজ্য বা মগুলে পরিণত হয়। তবে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক সীমা অনবরত বদলে গেছে। সাম্প্রতিক গবেষকরা মনে করেন যে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অস্তপর্বের সূচনা থেকেই ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে বহু  ব্রাহ্মণগোষ্ঠী পঞ্চখণ্ড পরগণায় প্রব্রজন করেন। সেইসঙ্গে বৃহত্তর বঙ্গের কান্যকুবজ, মিথিলা অঞ্চল থেকেও ব্রাহ্মণেরা এই প্রাকৃতিক সম্পদপূর্ণ হরিকেল বা শ্রীহট্ট অঞ্চলে অভিবাসন করেন।

এ-ও মনে করা হয় যে এই অঞ্চলে আর্যতর  জনগোষ্ঠীরা বনাঞ্জলে বাস করতেন। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল, আদিম ধর্মমতও ছিল। বিভিন্ন সময়ে সহজিয়া বৌদ্ধেরাও এই মণ্ডলে বাস করতেন। কারো কারো মতে চর্যাপদের কিছু কিছু প্রাকৃতিক উল্লেখ পঞ্চখণ্ড ও তার সংলগ্ন অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে। পর্বে-পর্বে মিশ্র পৌরাণিক ধর্ম ও রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যধর্মের সংঘাতও সহজেই অনুমান করা যায়। এছাড়া গবেষকরা যে সুববুঙ্গ বিষয়ের কথা জানিয়েছেন, তা সম্ভবত হাল আমলের বরাক উপত্যকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বঙ্গ-সমতট-হরিকেল ইত্যাদি জনপদের সংলগ্নতা ও বহু শতাব্দী ব্যাপ্ত আন্তঃসম্পর্কের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে নিশ্চয় পৌঁছাতে পারি যে অজস্র ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এতিহাসিক প্রক্রিয়াতেই শ্রীহট্রমগুল বৃহত্তর বঙ্গীয় পরিসরের শরিক হয়ে পড়েছিল।

 

সুতরাং অপভ্রংশ থেকে যখন বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ ক্রমশ স্পষ্ট হতে শুরু করে, সেসময় শ্রীহট্টমণ্ডলও ঐতিহাসিক অনিবার্যতায় তার অংশীদার ছিল। গবেষকরা মনে করেন , বাংলা ভাষার ক্রিয়াপদের প্রাচীন সংরূপ সংরক্ষিত হয়েছিল শ্রীহট্ট অঞ্চলে প্রচলিত কথ্যভাষার বিন্যাসে। যেহেতু মহারাজ ভূতিবর্মার প্রপৌত্র ভাস্করবর্মার সময়ে আজকের বরাক উপত্যকা সহ শ্রীহট্ট,  ময়মনসিংহ ও পূর্ব আসামের কিছু অংশ কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।  বঙ্গাল ও কামরূপী উপভাষার যুগলবন্দির প্রভাব এ অঞ্চলের ভাষা-ব্যবহারকে বিশিষ্টতা দিয়েছে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। পঞ্চম শতক থেকেই শ্রীহট্টমণ্ডল আপন কৃষ্টি-সংস্কৃতি-জীবনচর্যা নিয়ে নিজস্ব পদ্ধতিতে বিকশিত হচ্ছিল। পাল ও সেন রাজাদের আমলে এই প্রান্তিক অঞ্চলের জনগণের নিজস্ব বয়ান (ডিসকোর্স) যে আপন ভাষারূপ নিয়ে ব্যক্ত হতে শুরু করে, তাতে সন্দেহ নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য যে প্রাচীন ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব , নৃতত্ত্ব  সহ অন্যান্য মানবিকী বিদ্যার অবদানে এই কৌতুহলব্যঞ্জক প্রক্রিয়াটি যতখানি উদ্ভাসিত হওয়ার কথা ছিল, ততটুকু হয়নি। তবুও চর্যাপদের প্রাচীন বাংলায় আজকের সিলেটি উপভাষার যে-সাযুজ্য কোনও কোনও গবেষক লক্ষ করেছেন, তা এখনও বৃহত্তর বিদ্বৎবর্গের দ্বারা ঈপ্সিত মাত্রায় পরীক্ষিত হয়নি।

 


তিন

জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন এর ‘Linguistic survey of India’ নামক মহাগ্রন্থে শ্রীহট্রের উপভাষা সম্পর্কে যে গবেষণালব্ধ আলোকপাত করা হয়, তা এ-বিষয়ে যে-কোনও আলোচনার পক্ষে জরুরি। কিন্তু , উনিশ শতক ও বিশ শতকের সন্ধিপর্বে তিনি যে-সমস্ত স্থানীয় সংকলকের সাহায্য নিয়েছিলেন, তাদের পক্ষে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গ্রহণ করা কতখানি সম্ভব ছিল, তা প্রশ্নের বিষয়। অথচ এদেরই সংগৃহীত কথ্যভাষার নমুনার উপর ভিত্তি করে গ্রিয়ার্সন নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন :

"ময়মনসিংহের সঙ্গে সংলগ্ন জেলা হচ্ছে আসামের সিলেট জেলা । এই জেলার পশ্চিম ও দক্ষিণে বিশেষ করে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ভাষা ময়মনসিংহের ভাষার সদৃশ । উত্তরপূর্ব ও উত্তরদিকে বিশেষ করে জয়ন্তিয়াপুর ও করিমগঞ্জের  ভাষা অধিকতর বিকৃত। সিলেট শহর হচ্ছে জেলা হেড কোয়ার্টার, এটা জয়ন্তিয়া পরগণা থেকে মাত্র ছয়মাইল দূরে । সুতরাং এটাকেও ইউরোপীয়রা সিলেটিয়া বলে উল্লেখ করে। এজন্য ভুলবশত বলা হয় যে সমগ্র সিলেট জেলার ভাষা একরকম । কথাটা জেলার পশ্চিম অংশের আর উত্তরপূর্বের জন্য ভুলবশত প্রয়োগ করা হয়েছে। সিলেটিয়া কথাটা প্রকৃতপক্ষে শহরের জন্য প্রযোজ্য, সমগ্র জেলার জন্য প্রযোজ্য নয়।" 

 

গ্রিয়ার্সনের এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভ্রান্ত যার সম্ভাব্য কারণ একটু আগে উল্লেখ করেছি। অনভিজ্ঞ ও অবিশেষজ্ঞ স্থানীয় নমুনা-সংগ্রাহকদের কাছে প্রাপ্ত তথ্য নিশ্চিতভাবেই ভাষা-বিজ্ঞান সম্মত ও যথাযথ ছিল না। কিন্তু , প্রিয়ার্সন সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ইদানীং আমাদের কাছে স্পষ্ট যে বিপুল সমৃদ্ধিসম্পন্ন বাংলা ভাষায় অঞ্চলগত বাচনিক ভিন্নতার অন্ত নেই। সুনীতিকুমার -সুকুমার সেন- শহীদুল্লাহ প্রমুখ কৃতবিদ্য ভাষাতাত্ত্বিকদের কল্যাণে আমরা প্রধান উপভাষাগুলি সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। তার ওপর, জেলায় জেলায়, মহকুমায় মহকুমায়, পরগণায়-পরগণায় বাংলার লোকায়ত স্বভাব ও এশ্বর্য বাচনিক শক্তিতে ও লাবণ্যে আজও পরিস্ফুট। ধ্বনিতাত্ত্বিক , রূপবতাত্ত্বিক , পদান্বয় ও শব্দভাণ্ডার  সংশ্লিষ্ট বিচারে উপভাষা ও বিভাষার এই অন্তহীন বৈচিত্র্য ধরা পড়ে । অগভীর বিশ্লেষণ বা বিহঙ্গ-দৃষ্টিপাত দিয়ে মূল ভাষা-সংরূপের সঙ্গে তার লোকায়ত উপভাষাগুলির সম্পর্ক যাচাই করা অসম্তব। বিশেষত সিলেটের মতো প্রান্তিক  অঞ্চল বারবার আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক রাজনীতি দ্বারা বিড়ন্বিত ও আক্রান্ত হয়েছে, তার উপভাষিক পরিচয় অধ্যয়ন সহজ নয়। কেননা তা নিছক বিদ্যায়তনিক চর্চার প্রথাসিদ্ধ বিষয় নয়। নিরন্তর অভিবাসনের স্রোত কখনও উপলমস্থর আর কখনও দুর্দম বেগে প্রবাহিত হয়ে এখানকার রাজনৈতিক ভূগোলকেও অজস্রবার  পরিবর্তিত করেছে। তবু ইতিহাসের এই জটিল অভিঘাতের মধ্যেই প্রাচীন শ্রীহট্ট মণ্ডলে ও আধুনিক বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বাক্‌-ব্যবহারে কোন প্রবণতা প্রধান ও মূল বঙ্গীয় ভাবষারূপের সঙ্গে কীভাবে সংশ্লিষ্ট, তা বিশেষজ্ঞ জনেরাই শুধু বুঝে নিতে পারেন। উচ্চারণ-স্বরভঙ্গি-শব্দগঠন ও ক্রিয়াপদের ব্যবহারে শ্রীহট্টমণ্ডলের  মধ্যেও অঞ্চলগত ভিন্নতা খুব বেশি। কিন্তু , তাদের উপভাষিক পরিচয় আলাদা নয়। অনেক শিক্ষিতজনের মধ্যেও এই বিভ্রান্তিকর ধারণা রয়েছে যে ১৮৭৪ সালে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার ফলে অসমিয়া ভাষার প্রভাব এর ওপর পড়েছে। এঁরা এক মুহূর্তেই সহস্র বৎসরের পরম্পরা ভূলে যান। একবার মাত্র যদি মানচিত্রের দিকে তাকানো যায়, এর অসম্তাব্যতা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। উত্তরে খাসিয়া-জয়ন্তিয়া পাহাড় প্রাকৃতিক প্রাচীরের মতো বিদ্যমান থাকায় এ পর্বতমালা ডিঙিয়ে অসমিয়া ভাষা ব্যবহারকারি অঞ্চলের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ ভাষিক বা সাংস্কৃতিক বিনিময় উনিশ শতকের আগে সম্ভব ছিল না।

 

মনে রাখা দরকার, বহু শতাব্দীর পরম্পরায় উপভাষার নিজস্ব রূপ উনিশ শতকের আগেই সংহত হয়ে গিয়েছিল। পূর্বদিকে কাছাড় জেলায় যে বাঙালি জনবসতি ছিল, তা প্রাচীন সুববুঙ্গ বিষয়ার সুত্রে ভাষিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সূত্রে শ্রীহট্ট মণ্ডলের  সম্প্রসারিত অঞ্চল। শব্দপ্রয়োগে কিংবা উচ্চারণে অসমিয়ার সঙ্গে সিলেটের উপভাষার আপাত-সাদৃশ্য তো-ও খুব বেশি নয়) কার্যত কামরূপী উপভাষার সঙ্গে এতিহাসিক যুগলবন্দির ফলেই উদ্ভূত। একথা সবাই জানেন যে প্রাচ্যা-প্রাকৃতের অপত্রংশ থেকে ক্রমশ ওড়িয়া ও মৈথিলী এবং সব শেষে বাংলা ও অসমিয়া স্বতন্ত্র রূপ অর্জন করে নিয়েছিল। একই উৎস থেকে উৎসারিত বাচনিক অভ্যাস-প্রকরণ-অনুপুষ্থ প্রতিটি ভাষারূপ সহ তাদের উপভাষা মণ্ডলগুলির সাধারণ সম্পদ। এই সমরূপতাকে প্রভাব বলে ভাবা অসমীচীন। আরও একটি কথা। সাবেক পূর্ব শ্রীহট্টের প্রান্তিক পরিসর আজকের বরাক উপত্যকাও ছিল তিনদিকে পাহাড় ঘেরা । এই অঞ্চলে কখনও অসমিয়া অভিবাসন ঘটেনি।

 

সুতরাং পূর্ব থেকে পশ্চিমে অসমিয়া ভাষারূপ সংক্রমিত হওয়ার ন্যুনতম সুযোগও কোথাও ছিল না। এই বক্তব্য থেকে এটাই স্পষ্ট যে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে ভাষার স্বাভাবিক চলন সমতলেই শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত হয়। তাছাড়া আর্থ-সামাজিক সম্পর্কের ইতিহাস ও ভূগোল এক্ষেত্রে নিয়ন্তা ভূমিকা নেয়।

 

 

চার

 

উত্তরবঙ্গ ও উত্তর-পূর্ববঙ্গের প্রাচীন মানচিত্র অনুধাবন করলে বুঝতে পারি কেন আর্ধেতর জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলের সীমান্ত এলাকায় উপভাষা মূল ভাষারূপ থেকে খানিকটা দূরে সরে গিয়ে কার্যত বিভাষা হয়ে ওঠে। রংপুর-গোয়ালপাড়া আর কোচবিহার অঞ্চলে তা-ই ঘটেছে বলে খণ্ডিত ভারতের উত্তরবঙ্গে রাজবংশী বিভাষার সঙ্গে বাংলাভাষার মূল সংরূপের সম্পর্ক নিয়ে অযৌক্তিক বিবাদ তৈরি হয়। বলা বাহুল্য, এর পেছনে সক্রিয় থাকে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের নানা জটিল পাটিগণিত এবং আন্তর্জীতিক প্রভূত্ববাদের ভূ-রাজনীতির দাবাখেলা। আরাকান অঞ্চল সংলগ্ন নোয়াখালি ও চট্টগ্রামে উপভাষা ও বিভাষার সীমান্ত-স্বভাব খুবই কৌতুহলব্যঞ্জক। তবে প্রতাপের কৃকৌশল ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি সেখানে এমন পর্যায়ে যায়নি যে এ উপভাষা ও বিভাষার টানাপোড়েনে বিভ্রান্ত হয়ে জনগণ মূল ভাষা-রূপের সঙ্গে নিজেদের ব্যবধান কল্পনা করে নিতে পারেন। সিলেটি কি উপভাষা নাকি স্বতন্ত্র ভাষা : এই অকারণ সংশয় নিতান্ত সাম্প্রতিককালে তৈরি করা হয়েছে কিছুটা অজ্ঞতাবশত আর কিছুটা গভীর দুরভিসন্ধিতে। গত পাঁচ-ছয় দশকে পৃথিবীর সর্বত্র সিলেটিদের প্রত্রজন এবং ক্রমশ উৎসভূমি থেকে স্বেচ্ছারোপিত বিচ্ছেদ এই সংশয়কে আঁধিতে রূপান্তরিত করেছে। প্রবাসী সিলেটিরা খোদ লন্ডনের একটি বিশেষ অঞ্চলকে কীভাবে তৃতীয় বাংলা বা ক্ষুদ্র বাংলা হিসেবে অভিহিত করেন, তা এই নিবন্ধকার প্রত্যক্ষ করেছে। সেইসঙ্গে নজরে পড়েছে সিলেটি উপভাষা ব্যবহারকারীদের জীবনচর্যায় ও ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চায় অনিবার্য অনন্বয় এবং আত্মবিরোধিতাও। নিউ ইয়র্কে বা পৃথিবীর অন্য কিছু কিছু অঞ্চলে প্রব্রজিত সিলেটি উপভাষা ব্যবহারকারীরা গুঢ় মনস্তাত্ত্বিক কারণে “সিলেটি'কে স্বতন্ত্র ভাষা বলে দাবি করলেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিশ্বায়নের ফলে মূল সিলেট বিভাগও ( ডিভিশন ) কম রূপান্তরিত হয়নি। এতসব রূপান্তরের সম্মিলিত অভিঘাতে উপভাষাও আর সাবেক চেহারায় ও স্বভাবে উপস্থিত নয়। তবু ভাষাবিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি অনুযায়ী উপভাষার সংজ্ঞা ও চরিত্র নির্ণয় করতে হবে : এই হলো বিধি।

“সিলেটি নাগরী” নামে যে বিশিষ্ট লিপি সিলেটের কিছু কিছু অঞ্চলে মুখ্যত গ্রামীন সংস্কৃতির পতাকাবাহী মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত ছিল, তা ইদানীংকালে কার্যত লুপ্ত। তাহলেও এই লিপিতে লিখিত পাগুলিপিগুলির মধ্যে ওপভাষিক বৈশিষ্ট্য অবিকৃতভাবে উপস্থিত। এই লিপিতে সিলেটের ফকিরি ধারার মরমী কবিরা যেমন আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছেন, তেমনি বাস্তবজীবনের বিভিন্ন অনুপুঙ্খও এদের মধ্যে ধরা পড়েছে । সিলেটি নাগরী লিপি সংক্রান্ত সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে আমরা সিলেটি উপভাষার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সূত্রগুলি পেয়ে যাই। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া, অব্যয়, সর্বনাম সহ বাচনভঙ্গি, বাক্যগঠন, শব্দভাগ্ডার, বস্তুনাম, বিভক্তি, প্রবচন প্রভৃতি বিভিন্ন ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের সুযোগ বা পরিসর এখানে নেই। আপাতত শুধু একথাই বলা যায় মহকুমায় মহকুমায় এই উপভাষার স্বরভঙ্গি, ক্রিয়াপদ, ধ্বনিতাত্তিক ও রূপতাত্তিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হয়ে গেলেও তাদের মূল ওপভাষিক গোলাম কাদির প্রমুখ গবেষকেরা সিলেটি উপভাষা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। এমনকী প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী এবং অমিতাভ চৌধুরীও সিলেটি উপভাষা নিয়ে সুচি্তিত প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়া মোহম্মদ আব্দুল হাইও ' জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তান '--এ (১৯৬৪) সিলেটি উপভাষা নিয়ে আলোকপাত করেছেন।তবু মনে হয় যে সুরমা-বরাক উপত্যকার সামগ্রিক পরিমণ্ডলে বিরাজমান ভাষা-বাস্তবতা নতুন প্রজন্মের গবেষকদের জন্যে প্রতীক্ষারত এখনও । সাংস্কৃতিক রাজনীতির কুটিল চক্রান্তে গত সাত দশকে যে-সব বহিরৃর্ত উপাদান ও কারণ ওপভাষিক অবস্থানকে সংশয়ান্বিত এবং ঈষৎ বিভ্রান্ত করেছে, সাম্প্রতিক ভাষা-বিজ্ঞানীকে সেই সব মনে না রাখলেই নয়। অর্থাৎ তাকে লক্ষ করতে হবে ভাষা-মনস্তত্ব ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির জ্যামিতি আর আধিপত্যবাদী কৃতকৌশলের সঙ্গে সঙ্গে লোকায়তের প্রত্যাঘাতও । লক্ষ করতে হবে বৃহত্তর শ্রীহট্রমগুলে ব্যাপ্ত ফকিরি-মারফতি-দরবেশি ধারায় খচিত বেসরকারি প্রতিবেদনে উপস্থিত উপভাষার অকৃত্রিম সুবাস যাকে কোনো বহিরাগত উপাদান আচ্ছন্ন করতে পারেনি। বিশ্বায়নের চরম উৎকেন্দ্রিকতা হাল আমলে সিলেট নগর সহ হবিগঞ্জ-সুনামগঞ্জ-মৌলভীবাজার-বিয়ানীবাজার এবং সংলগ্ন বরাক উপত্যকার শিলচর-করিমগঞ্জ-হাইলাকান্দিতে প্রচলিত উপভাষায় যতই সংক্রমিত হোক, মূল বাংলা ভাষার সঙ্গে তার নাড়ীর সম্পর্ক বরং আরও মজবুত হয়েছে।

 


পাঁচ

এ প্রসঙ্গে এই তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামি প্রভাবে আরবি, ফারসি শব্দ বা বাকবন্ধ যতই যুক্ত হোক না কেন, উপভাষা আপন অন্তর্বৃত সামর্থ্য তাদের আত্মস্থ করে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হল, বৃহত্তর বঙ্গীয় পরিমণ্ডলের শরিক হিসেবে শ্রীহট্ট মণ্ডলের কবি ও লিখিয়েরা প্রাচীনকাল থেকেই বাংলা ভাষায় অজস্র  সৃষ্টি করে গেছেন। ফলে মূল ভাষার সঙ্গে এই ঔপভাষিক অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক সংযোগ শিথিল হয়নি কখনও । অতএব এই উপভাষায় অন্য কোনও ভাষাগোষ্ঠীর ছায়া কখনও দীর্ঘায়িত হয়নি। এমন হওয়ার পক্ষে যে বাস্তব ভৌগোলিক বাধা ছিল, তা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। আসলে ১৮৭৪ সালের নিঃশব্দে ঘটে-যাওয়া আদি বঙ্গভঙ্গ বাংলাভাষী জগৎ লক্ষই করেনি কোনওদিন। আর ১৯০৫ থেকে ১৯১১ পর্যস্ত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনও আমাদের একচক্ষু হরিণ করেই রেখেছে। নির্বাসিত গোয়ালপাড়া-সিলেট-কাছাড় সম্পর্কে আমাদের অভিনিবেশ ছিল না কখনও । নির্মম কাল ভাষিক-সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসী চরিত্র নিয়ে গোয়ালপাড়াকে শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে। অবিভক্ত কাছাড় অর্থাৎ হালের বরাক উপত্যকার সিলেটি উপভাষাকেও বরাকি  নাম দিয়ে আত্মসাৎ করার একটা বিভাজনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ১৯৬১ সালের ১৯শে মে এগারোজন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্যে শহিদ হওয়ার পরেও সেই প্রক্রিয়া যে দেখা দেয়, এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী আছে! বস্তত  , এখনও অব্যাহত রয়েছে ভাষিক সন্প্রসারণবাদের কুটিল চেষ্টা । বরং ইদানীং বাঙালি-বিদ্বেবী রাষ্ট্রশক্তির গোপন তর্জনী-সংকেতে বাংলা ভাষা ও বাঙালির সামর্ঘঢকে খণ্ড-বিখণ্ড  করার চক্রান্তে সক্রিয় হয়ে পড়েছে নব্য মীরজাফরেরা ।


অন্যদিকে জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ। যে-সত্য অনস্বীকার্য, তা হল, পূর্ণিয়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, খুলনা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম,সিলেট, কাছাড়, কোচবিহার প্রভৃতি প্রান্তিক অঞ্জলে উপভাষার বৈচিত্র্য এতটাই বেশি যে মহানগর-কেন্দ্রিক শিষ্ট বা প্রমিত বাংলা ব্যবহারকারী জনেরা এদেরে বাংলা ভাষার বিশিষ্ট আঞ্চলিক সংরূপ বলে বুঝতে পারেন না। মনে রাখেন না যে উপভাষার লোকায়ত শৌর্য ও লাবণ্য মূল ভাষাকেই সমৃদ্ধ ও এশ্বর্যবান করে। যেমন বৃহত্তর শ্রীহট্ট মণ্ডলের  সিলেটি উপভাষাও করছে। বিশ্বায়নের পর্বে আত্মসর্বস্বতা এতটাই উৎ্কট হয়ে পড়েছে যে আমাদের ঘর থেকে আঙিনাই বিদেশ। আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি সহ আর্থ-রাজনৈতিক পাটিগণিত মহানগর-কেন্দ্রিক  বলে বহুদিন আগেই আঞ্চলিক উপভাষাগুলির প্রতি সন্ত্রম ও শ্রদ্ধা লুপ্ত হয়ে গেছে। তার বদলে এসেছে কেবল কৌতুকবোধ ও তাচ্ছিল্য । দূর কেন্দ্র থেকে প্রত্যাখ্যাত অপর হিসেবে প্রান্তিক জনের প্রতি অন্যমনস্ক তাকানো। অবশ্য ইদানীং অন্তর্জালের ভাঙাভাষায় আচ্ছন্ন হয়ে প্রত্যেকে নিজেদের মাতৃভাষাকে অস্বীকার করতে শুরু করেছে। আত্মিক নিশ্চিহ্নকরণজনিত বিপর্যয়ের ভয়াবহ আশঙ্কার পর্বে সিলেটি উপভাষা সহ অন্যান্য উপভাষার বিজ্ঞানসম্মত চর্চা এই কালবেলায় কারা করবে, এই প্রশ্ন FAH করে দেয় শুধু। আমরা বরং ফিরে যেতে পারি ঠিক ১০৪ বছর আগে প্রদত্ত একটি অসামান্য ভাষণের কাছে।


১৩২৩ বঙ্গাব্দে সুরমোপত্যকা সাহিত্য সম্মিলনী'র সভাপতির অভিভাষণে ভূবনমোহন দেবশর্মা যেসব কথা বলেছিলেন, সেই প্রতিবেদন আজও জ্বলন্তভাবে প্রাসঙ্গিক। এর কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি :

"আমরা বাঙালি। বঙ্গভাষা আমাদের ভাষা । বঙ্গীয় সমাজ আমাদের সমাজ । আমাদের দেহে-দেহে বাঙালির রক্ত প্রবাহিত। আমাদের মস্তিষ্কে-মস্তিষ্কে বাঙালির চিস্তাস্রোত।... মগধ, মিথিলা, শ্রীহট্ট ও ওড়িশায়   একদা বাগবীণার একটিমাত্র তার বাজিত। কিরূপে তাহার ব্যত্যয় ঘটিয়াছে, আমাদের সুরমা উপত্যকার কথ্যভাষার দিকে লক্ষ্য করিলে, তাহার কথঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়।... সাহিত্যের সমগ্র শক্তি একমাত্র উহার কেন্দ্রস্থলে আবদ্ধ থাকিলে দেশের সর্বত্র সত্তর উহার অভ্যুত্থান ঘটিবে না; আমাদের বিরাট জাতীয় ভাষা ও জাতীয় সাহিত্যের সৃষ্টি হইবে না। আগে ভাষা, পশ্চাৎ সাহিত্য। দুঃখের বিষয়, আমাদের ভাষা ও সাহিত্য লইয়া কিছুদিন পূর্বে একটা সন্দেহবাত্যা বহিয়া গিয়াছে। কোনো কোনো পাশ্চাত্য লেখকের লেখনীমুখে প্রকাশিত হইয়াছিল - শ্রীহট্রের বাগ ব্যবহার বঙ্গভাষা হইতে স্বতন্ত্র এবং শ্রীহট্রের নিজের কোনো “সাহিত্য” নাই।... বাঙ্গালার প্রত্যেক জেলার শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সমাজের কথোপকথনের ভাষা সর্বাংশে একরূপ নহে। ... প্রত্যেক জেলার উচ্চশ্রেণী বা শিক্ষিত সমাজের কথ্যভাষা বঙ্গের আদর্শ ভাবার অনুরূপ; কিন্তু নিম্নশ্রেণীর কথ্যভাষা জেলায় জেলায় কিয়ৎ পরিমাণ বিভিন্ন ছাচে গঠিত; শব্দ-প্রয়োগ অপেক্ষা উচ্চারণগত বৈচিত্র্যই অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের ব্যবধান সৃষ্টি করিয়াছে। অশিক্ষিত লোকের কথ্যভাষা হইতে আদর্শ প্রহণ করিয়া পূর্বকথিত পাশ্চাত্য মনীষীগণ অবলম্বিত  প্রণালীতে সিদ্ধান্ত সংস্থাপন করিলে বলিতে পারা যায়, বঙ্গের প্রত্যেক জেলায় এমন কি, জেলার বিভিন্ন অংশে ভাষার বিভিন্ন আদর্শ প্রচলিত।.... বিভিন্ন জেলায় নিন্নশ্রেণীর কথ্যভাষায় বৈচিত্র্য বিদ্যমান থাকিলেও ইহারা মূলত অভিন্ন এবং অখণ্ড বঙ্গভূমির সাহিত্যিক ভাষার একই গতিপথ চিরকাল নিয়মিত রহিয়াছে ।... ভাষা ও সাহিত্যের সহিত জাতীয়তার একটা দুশ্ছেদ্য সন্বন্ধ রহিয়াছে। ... এই সম্বন্ধটুকু ছিন্নভিন্ন হইতে কেহই সম্মতি দিতে পারেন না। অখণ্ড বঙ্গভাষা শতখণ্ডে বিভক্তা হইলে বঙ্গ সাহিত্যের সম্প্রসার খর্বাকৃত হইবে এবং সাহিত্য সাধনার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়া যাইবে । আমাদের সাহিত্যের ভাষা বাঙ্গালা। উহার ঢাকাই-রঙপুরী-শ্রীহট্র-যশোহরী সংস্করণ নাই। সাহিত্য হইতে সর্বপ্রকার প্রাদেশিকতা সরাইয়া ফেলিয়া অখণ্ড বঙ্গভাষার উপাসনা করাই বঙ্গসাহিত্য সেবকের ধ্রুব লক্ষ্য । ... বঙ্গভাষারও শ্রীহট্ট নদীয়া নাই, অখণ্ড বঙ্গভূমি জুড়িয়া সব বাঙ্গালা?।"

একশ চার বছর আগে ভুবনমোহনকে যেমন ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কিত ' সন্দেহবাত্যা ' - র মোকাবিলা করতে হয়েছিল, সিলেটি উপভাষা সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনাকে তেমনি প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন সাংস্কৃতিক রাজনীতিজনিত সন্দেহ-বাত্যার মোকাবিলা করতে হয় আজও । ভূবনমোহনের পূর্ব-উদ্ধৃত বিখ্যাত অভিভাষণের প্রতিটি বাক্য আমাদের প্রগাঢ় অভিনিবেশ দাবি করে। উপ ভাষায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্পৃক্ত লোকায়ত সুবাসের অসামান্য দৃষ্টান্ত রয়েছে প্রবাদ-প্রবচনে  এবং মেয়েলি ছড়ায়-হেঁয়ালিতে, লোককথা-ব্রতকথার আখ্যান পরিবেশনে এবং  রয়েছে পীর-ফকির-বাউলদের অজস্র রচনায়। প্রণালীবদ্ধ ও আন্তর্বিদ্যা বিনিময়ের ভিত্তিতে প্রস্তুত গবেষণায় উন্মোচিত হোক উপভাষার স্বভাব ও সম্ভাবনা । আপাতত একটি চিত্ররূপময় লোক-রচনার নিদর্শন দিয়ে এই প্রতিবেদনের উপসংহার করি যাতে সিলেটি উপভাষার সংযোগ-সামর্ঘ্য চমৎকাররূপে  প্রকাশ পেয়েছে :

 " পুঞ্জ ম্যাঘার আঞ্জাআঞ্জি চেরাপুষ্জির পাড-অ
কালা ম্যাড়া ফাল্‌ দি পড়ে ধলা ম্যাড়ার ঘাড়-অ " 

 

অর্থাৎ,
 

পুঞ্জ-পুঞ্জ মেঘ জড়াজড়ি করে চেরাপুঞ্জি- পাহাড়ে ।  কালো ভেড়া লাফ দিয়ে পড়ে  সাদা ভেড়ার ঘাড়ে।

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions