প্রবন্ধ - ৯

"বাবার কলমে লেখা - শ্যাম ভবন"
চন্দ্রিমা শ্যাম
চিত্রশিল্পী, শিলচর

আমাদের "শ্যাম ভবন" এর কথা লিখতে বসেছি । মানুষ ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন "শ্যাম ভবন" । ঠাকুরদার দেওয়া নাম "নীলছায়া"  বাড়িতে একটি বিশাল কদমগাছ ছিল । ঠাকুরদা তার তলায় গিয়ে কদমফুল কুড়াতেন । বাবা ঠাকুরদা-ঠাকুরমার অষ্ঠম সন্তান । তাই কৃষ্ণের নামে নাম "নীপেন্দু - কৃষ্ণ - কদমগাছের মাথায় চাঁদ" । এখনও বাড়িতে একটি কদমগাছ আছে । 'বাদলদিনের প্রথম কদমফুল' দেখি তাতে । যে মাধবী ফুলের লতাটি বাড়িকে পুষ্পশোভিত করে মৃদু সৌরভে ভরিয়ে রাখে, বাবা বাবার দাদু শ্রী দীননাথ দাসের বাগান থেকে ছোট্ট চারা এনে লাগিয়েছিলেন বালকবেলায় । মাধবীলতা তাঁর প্রাণ ছিল । সেখানে তিনি বেঁচে আছেন মাধবীলতার সৌরভে । এখনও জোনাকি, ঝিঁঝিঁ, কোকিল, টিয়া, বুলবুলির অভাব নেই বাগানে । এককথায় নগরের বুকে অরণ্য ।

 

আমার ছোটবেলাটা ছিল যেন উৎসবের মতো । রথ, ঝুলন সাজিয়ে দেওয়া, পূজায় নতুন জামা ও বই, রিকশা করে দুর্গা ঠাকুর দেখা, সব কিছুই বাবা-মা মিলে পূরণ করেছেন । প্রতিবছর বাবা আমাকে দুর্গা পূজায় নতুন বই কিনে দিতেন - "আরাধনা", "নবপত্রিকা" ইত্যাদি ।

 

ছোটবেলা থেকেই অনুভব করতাম আমাদের বাড়ি রবীন্দ্র ভাবে উদ্বুদ্ধ । রবিঠাকুরের প্রতি ভালোবাসাই বোধহয় এ বাড়ির legacy। ঠাকুরমা ও ঠাকুরদার উদ্যোগেই শিলচরে প্রথম রবিঠাকুরের জন্মদিন পালিত হয় । ঠাকুরমা মালতি শ্যাম নারীকল্যাণ সমিতির (নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনের শাখা) পক্ষ থেকে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করে রবিঠাকুর কে চিঠি লিখেছিলেন । গুরুদেব আশীর্বাদ জানিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন । রবিঠাকুরের নিজের হাঁতে লেখা সে চিঠি আমাদের বাড়িতে ফ্রেম করা আছে । 

বাড়িতে নানা অনুষ্ঠান ও তৎকালীন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আসা যাওয়া লেগেই থাকত । সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠাকুরদার বন্ধু ছিলেন ।সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী চিত্রশিল্পী ছিলেন এবং আমার বড়পিসি এনায়নীকে বিয়ের কনে সাজিয়ে ছিলেন কোলকাতায় নাটোরের মাহারাজের বাড়িতে । সেখানেই বড়পিসির বিয়ে হয় । 

কোনও একবার পূর্ণদাস বাউল এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে । পূর্ণদাস বাউলের বাবা নবীনদাস বাউলকে ঠাকুরদা জানতেন । পূর্ণদাসকে সেসব কথা বলায় তিনি এত খুশি হয়েছিলেন যে আমাদের বসবার ঘরে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে তিনি গান করেছিলেন । একবার ভুপেন হাজারিকা এসেও অনেক গান শুনিয়েছিলেন ঠাকুরদাকে । বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক মেঘনাদ সাহাও অতিথি হন এ বাড়ির । ঠাকুরমা তাঁকে মাছের ঝোল তৈরি করে খাওয়ান । খেতে ভালোবাসতেন তিনি এবং সেই ঝোল খেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন তিনি, বাবার মুখে শোনা ।

 

ঠাকুরদা "ভবিষ্যৎ" নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করতেন । তখন বাংলার অনেক বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক সেই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন । এরমধ্যে কবি অন্নদাশংকর রায় ও ছিলেন । ঠাকুরদার রচিত "রূপ ও রস" ও "রবীন্দ্রনাথ : ধর্ম ও সমাজ" দুইটি গ্রন্থের কোনও একটি বিশ্বভারতীর গ্রন্থাগারে রক্ষিত আছে । 

 

ঠাকুরদা আইনজীবী ছিলেন পেশায় - মননে ছিলেন রবিঠাকুর অনুপ্রাণ । শিলচরে "বানীপরিষদ" নামে একটি সাহিত্য চর্চার আসর তিনিই প্রথম গড়ে তোলেন ও রবিঠাকুরের জন্মদিন পালন শুরু করেন । ঠাকুরদার অন্যতম প্রিয় কবিতা "বলাকা" কাব্যসংগ্রহের "চঞ্চলা" --

 

" হে বিরাট নদী

অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জলে

অবিচ্ছিন্ন অবিরল

চলে নিরবধি ।

ঠাকুরমা প্রয়াত হন মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে । এই প্রত্যন্ত উপত্যকায় নারীজাগরণের প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন তিনি । তাঁর কর্মকাণ্ড দেখলে বিস্ময় জাগে । আমার বন্ধু আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা ডঃ রামী চক্রবর্তী ঠাকুরমা নিয়ে অসাধারণ একটি বই লিখেছেন "মালতী শ্যাম - জাগরণের নান্দীপাঠ", প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কোলকাতা থেকে । সেই বইটি পড়লে ঠাকুরমার স্বত্বার কিছু আভাস পাওয়া যাবে ।

 

বাবার কাছেই সযত্নে সংরক্ষিত ছিল অমূল্য সব ঐতিহাসিক তথ্য । আমার পিসিরাও সবাই সাহিত্যর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন । এরমধ্যে ছোটোপিসি রুচিরা শ্যাম "অতন্দ্র" যুগের বিখ্যাত কবি, পরে "আজকাল" পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন । 

আমার বাবারও ছিলেন রবিঠাকুরই শেষ আশ্রয় । বাবা চিকিৎসক ছিলেন শিলচর মেডিকেল কলেজ হাঁসপাতালে । Hony. Secretary, Indian Medical Association ও Vice President, IMA, Silchar ছিলেন অনেক বছর । পরবর্তীকালে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত শিবসুন্দরী নারী শিক্ষাশ্রম Women's Hospital (উত্তর পূর্বাঞ্চলের অন্যতম আশ্রম hospital এর Hony. Secretary হিসেবে কাজ করে গেছেন । যা এখন ইতিহাস । 

 

ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় যখন পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, বাবা তখন কোলকাতা National Medical College এর ছাত্র । একবার ছাত্র আন্দোলন উপলক্ষে Dr. B.C. Roy এর সাথে তাঁদের দেখা হয়েছিল । জীবনের পরম পাওয়া সেই সাক্ষাৎ । বাবা শিবসুন্দরী নারী শিক্ষাশ্রম hospitalএ Doctor's Day (Dr. B.C.Roy এর জন্ম-মৃত্যু দিন) প্রথম পালন করা শুরু করেন। তাছাড়া রবীন্দ্র জয়ন্তীও পালন করা প্রথম শুরু করেন সেখানে । সেটা এখন পরম্পরা হয়ে দাঁড়িয়েছে । 

 

বাবা একটি অসাধারণ গবেষণামুলক গ্রন্থ রচনা করে গেছেন - "রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প - রোগ ও মনস্তত্ব" - জয়শ্রী প্রকাশন, কোলকাতা থেকে প্রকাশিত । রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ শ্রী শান্তিদেব ঘোষ বাবার লেখা সেই বইয়ের প্রবন্ধ পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন । বইটি Dr. William Radice কেও পাঠিয়েছিলাম । তিনি বলেছিলেন 'it's an unusual angle on Tagore's short stories' । কিছুদিন আগে শিলচরের "প্রান্তজ্যোতি" পত্রিকায় প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক শ্রী দীপঙ্কর ঘোষ বইটির যথাযোগ্য review করেছেন । বইটির ভুমিকা কবি অলোকরঞ্জন দাসগুপ্তের লেখা । অধ্যাপক অমরেশ দত্তও বইটি পড়ে বাবাকে সুন্দর করে পত্রে আলোকপাত করেছিলেন । বাবার এই বই Ramakrishna Mission Institute of Culture - Kolkata, Sahitya Academy, Rabindra Bhaban - New Delhi, The Nehru Center - London সব গ্রন্থাগারেই স্থান পেয়েছে । 

কিছুদিন আগে বাবার দেহান্তর হয়েছে । তিনিই ছিলেন এ বাড়ির পরম্পরার শেষ ধারক ও বাহক । বাবার কলমে লিখেই সেই পরম্পরা বা Legacyর ছোট্ট আভাস দেওয়ার চেষ্টা করলাম । 

     

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions