ছোটদের জানালা / Children's Window

রামধনু / The Rainbow , Episode - 3
8 August 2020

 

কবিগুরুর মহাপ্রয়ান তিথি উপলক্ষে ছোটদের জানালায় রামধনু সিরিজে এবার রইল তিনটি কবিতা।

আবৃত্তিকার ক্লাস ফাইভ-এর অর্চিষ্মান ভট্টাচার্য, কে জি ওয়ান-এর সোহিনী ভট্টাচার্য আর ক্লাস ওয়ান-এর জ্যোতিস্মিত দাস পুরকায়স্থ ।

 

Recitations

Archisman Bhattacharjee

Class V , Pranabananda Vidyamandir , Malinibil , Silchar

 

Sohini Bhattacharjee KG I , Prabananda Vidyamandir ,  Shibbari Road , Tarapur , Silchar

 

Jyotismit Das Purkayastha Class I , Donbosco High School , Lumding

 

Special Thanks to Dr. Suparna Bhattacharjee

 

Editing

Krishanu Bhattacharjee

 

রামধনু / The Rainbow , Episode - 2 
1 August 2020

 

হ্যালো বন্ধুরা , আমি দেবাগ্নি পাল ।

ঈশান কথায় চোখ রাখছ তো ??

প্রতি শনিবারে বড়দের সাথে সাথে আমাদেরও কিছু অনুষ্ঠান থাকে ।

আজ আমাদের সাথে রয়েছে দেবীতমা চক্রবর্তী ও পলাশপ্রিয়া ভট্টাচার্য ...

 

Anchor

Devagni Paul

 

Dance

Debitoma Chakraborty (Silchar) (Marathi Song : Apsara Aali, Singer : Bela Shende, Ajay Atul)

 

Nazrul Geeti

Palashpriya Bhattacharjee (Kolkata)

 

Concept & Direction

Joydeep Bhattacharjee & Chinmoy Bhattacharjee

 

Editing

Krishanu Bhattacharjee

 

Special thanks to Madhuri Paul

অনামিকার রান্নাঘর থেকে ...  
25 July 2020 

 

না ! কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বড়দের এই খামখেয়ালিপনা দেখে আর ভালো লাগছে না। মন চনমনে রাখতে গেলে ভালো খাবারও তো চাই। তা এত কিছু না পারলেও, চকোলেট তো হতেই পারে। তাই, অনামিকা আবার হাজির ওর আদর মাখা রেসিপি নিয়ে। এবার হবে, নিজের হাতে তৈরী চকো বলস ... yummy !!!

 

Little Anamika Paul makes Choco Balls for Ishan Kotha Viewers in her kitchen...

 

Thanks to Mrs. Phalguni Paul for Supervison & Guidance

ভুত বলে কিছু আছে কি ?
আলবাৎ আছে।
তুমি দেখেছো ?
দেখেছি তো। ঐ যে সিরিয়ালে দেখায় না!
কত ধরনের ভুত আছে জানো ? 
ভুত মানেই তো ভয়ঙ্কর। তাঁর আবার ধরন কি ?
আরে না। আমাদের সময় অনেক ধরনের ভুত ছিল। এখনো আছে।
যেমন ধরো-  গেছো ভুত, মেঠো ভুত,গা ছমছমে ভুত, মোলায়েম ভুত, দুষ্টু ভুত, ভালোমানুষ ভুত ......
যাঃ বাবা, জানতাম নাতো !
হ্যাঁ,তবে আর বলছি কি! তা তেঁনাদের গপ্প নিয়েই এবার আমাদের ছোটদের বিভাগ। পড়বে তো ? 
আচ্ছা, পড়ব। তবে যদি বৃষ্টি পড়ে আর  কোন কারনে আলো চলে যায় ? 
যাই বলো না কেনো এসব নিয়ে বেশি ঘাটানো ঠিক হচ্ছে না। এই দেখোনা আমার কেমন গা শিরশির করছে ।

ভুত আমার পুত , পেত্নী আমার ঝিঁ
রাম লক্ষন ...........
ভুত আমার .........

মজার ভুত  
জয়তী ভট্টাচার্য , ১৮ জুলাই ২০২০ 

 

ছবিতে ভুতের গল্প 'মজার ভুত' । রচনা ও চিত্রাঙ্কন - জয়তী ভট্টাচার্য 

1/17
ভয় 
হিমু লস্কর, ১৮ জুলাই ২০২০  

(১)

 

শিলচরগামী শেষ বাসটা ধরার জন্য মতিনগর বাসস্টপেজে দাঁড়িয়ে আছে সায়ন্তন। ঘড়িতে বিকেল সোয়াচারটা। তারমানে সন্ধ্যা ঘনাতে এখনও ঢের বাকি। কিন্তু এরইমধ্যে দিনের আলো মরে হেজে গিয়েছে। ঝাপসা আলোয় মনে হচ্ছে, হাত বাড়ালেই সামনের ভুবন-পাহাড়টাকে ছুঁয়ে ফেলা যাবে।

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসা মেঘের গর্জনে আকাশের দিকে চোখ চলে গেল সায়ন্তনের। মাথার উপরে কালো মেঘের  চাদর। ক্রমে সেটা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে। বেশ উঁচুতে কয়েকটা ফড়িঙ চক্রাকারে উড়ছে। এদের ওড়াউড়ি মানে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল ঝড়বৃষ্টি নামার সঙ্কেত।

 

অথচ আজ সকালের টকটকে পরিস্কার আকাশে মেঘের নামগন্ধও ছিল না। কিন্তু বিকেল পড়ে আসতেই মাথার উপরের দৃশ্যপটটা পাল্টে গিয়েছে আমূল। কখন যে একসঙ্গে এতগুলো পরিযায়ী মেঘ উড়ে এসে আকাশটাকে গ্রাস করে নিয়েছে,বোঝাই যায়নি। অবশ্য ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়ে এরকমই হয়। সকালের পরিস্থিতি দেখে বিকেলটা আন্দাজ করা যায় না।

 

||||||||||

 

দেখতে দেখতে জোরে হাওয়া বইতে শুরু করল। সঙ্গে বড়-বড় বৃষ্টির ফোটা। এদিকে সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু বাসের পাত্তা নেই। বাড়ি ফেরা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল সায়ন্তন। অবশ্য সায়ন্তনের চিন্তিত হওয়ার কারণও আছে। ইউনিভার্সিটিতে তার সহপাঠী মফিদুলকে বাদ দিলে এই তল্লাটে তার চেনাশোনা বলতে কেউ নেই। তাছাড়া মফিদুলদের বাড়িটাও ঠিক চেনে না  সে।  শুনেছে, মতিনগর বাজার পেরিয়ে আমড়াঘাট রোড ধরে একটু এগোলে ধারেকাছে কোনও এক চাবাগানে ওদের কোয়ার্টার…।

 

|||||||||

 

মেন রোডের উপর মতিনগর বাস-স্টপটা বাজার থেকে একটু দূরে। এদিকে দোকানপাট তেমন নেই।  জায়গাটা বেশ নির্জন। বাসস্টপ থেকে বাজারের ভেতরটা বেশ ভাল করেই দেখা যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সায়ন্তন দেখতে পেল, দুর্যোগ আঁচ করে হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপ ফেলছে দোকানিরা। হাটুরে লোকজন ত্রস্ত পায়ে বাড়ির পথ ধরেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে  খাঁখাঁ করতে লাগল বাজারটা।

 

আকাশটা আরও কালো হয়ে এসেছে।  ক্ষীয়মান আলো যা-ও-বা একটু ছিল, এতক্ষণে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে অন্ধকারের পেটে। আঁধারের গায়ে গা মিশিয়ে ভোজবাজির মত অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে ভুবন পাহাড়টাও।

 

কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল প্রবল ঝড়তুফান। মনেমনে প্রমাদ গুনল সায়ন্তন। দৃশ্যপটে এতটা দ্রুত পরিবর্তন আশা করেনি সে ।বৃষ্টি তো নয়, যেন আকাশটা-ই আজ মাথার উপর ভেঙ্গে পড়েছে। গাছপালার উপর দিয়ে ঝড়ো বাতাস শোঁ শোঁ শব্দে বয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আকাশের দরজা খুলে প্রলয় নেমে এসেছে চরাচরে। তার দানবীয় শক্তির খোঁচায় পৃথিবীটাই বুঝি গ্রহান্তরে উড়ে যাবে।

 

ক্ব…ক্ব…ক্কড়াৎ…!

 

সাপের জিভের মত লকলকে বিদ্যুৎচমকের সাথে আকাশ-মাটি বিদীর্ণ করে দূরে কোথাও বাজ পড়ল । ভয়ে কেঁপে উঠল সায়ন্তন ।পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে মফিদুলের নম্বরে ডায়াল করার চেষ্টা করল সে। দরকার পড়লে একটা রাত মফিদুলদের বাড়িতে কাটিয়ে দেওয়া যাবে। তার আগে ঠিকানাটা জেনে নিতে হবে। তাই মফিদুলকে টেলিফোনে পাওয়াটা জরুরি। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তাকে ফোনে ধরতে পারছে না সায়ন্তন। বারবার লাইন কেটে যাচ্ছে। নেটওয়ার্কের সমস্যা।

'ধুর ছাই...!  মোবাইল কোম্পানিগুলো সবই  এক। শুধু মুখে বড়বড় কথা। কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। '-- বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে একসা সায়ন্তন বিরক্তি ধরে রাখতে পারে না। হঠাৎ আরেকটা সম্ভাবনার কথাও মনের কোণে এসে উঁকি দেয়। বেশ ক'দিন হল, মফিদুলটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে না। যদি সিম পাল্টে ফেলে তাহলে তো মুস্কিল। এইক্ষেত্রে কাউকে জিজ্ঞেস করে মফিদুলদের বাড়িটা জেনে নিতে হবে। কিন্তু এই ঝড়জলের রাতে নির্জন বাজারে কাউকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবুও  আশপাশে একবার চোখটা বুলিয়ে নেয় সায়ন্তন। বিদ্যুৎচমকের আলোয় একটা লোককে বাসস্টপের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে আশান্বিত হয়ে ওঠে সে ....

                        

(২)

 

কাকভেজা হয়ে চাদরমুড়ি দেওয়া একটা ছায়ামূর্তি  বাসস্টপের ভিতর এসে ঢুকলো। লোকটা যে মধ্যবয়স্ক, অন্ধকারের মধ্যে-ও সেটা অনুমান করে নিতে সায়ন্তনের অসুবিধে হয় না। মানুষটার অবস্থা দেখে সে বলে,-'একি, আপনি তো মনে হচ্ছে আপাদমস্তক ভিজে আছেন! ভেজা শরীরে নিয়ে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হবে না।'

 

-'না না … ওনিয়ে আপনি একদম চিন্তা করবেন না। বৃষ্টি আমার রোজকার অভ্যেস। ' হাতদিয়ে মাথা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে লোকটা।

 

অবাক হয়ে যায় সায়ন্তন। বলে কি লোকটা! বৃষ্টিতে শখ করে এক-আধবার হয়ত ভেজা যায়। তাইবলে রোজ? কে জানে বাবা! বৃষ্টির সঙ্গে হয়ত লোকটার  আত্মিক সম্পর্ক। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সে।

 

|||||||

 

জলটল ঝাড়ামোছা করে এবার সায়ন্তনের দিকে তাকায় লোকটা। জিজ্ঞেস করে, 'তা মশাইয়ের বাড়ি কোথায়? এ তল্লাটে আপনাকে আগে দেখেছি বলে তো মনে হচ্ছে না!'

 

-'ঠিকই ধরেছেন। আমি সায়ন্তন রায়। বাড়ি শিলচরে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছি। গবেষণা সংক্রান্ত একটা কাজে আমাকে ভুবন পাহাড়ে যেতে হয়েছিল। এখন বাড়ি ফিরছি।'

 

-'একি! বাড়ি ফিরছেন মানে! এই ঝড়তুফানে গাড়ি পাবেন কোথায়?' 
 

কথা শেষ করে খিকখিক করে হেসে উঠে লোকটা। যেন সায়ন্তনের সমস্যা দেখে যারপরনাই খুশি হয়েছে সে।

 

কি তাজ্জব লোক রে বাবা!  মানুষের এতবড় বিপদেও একটা লোক এভাবে হাসতে পারছে! এতটাই পাষণ্ড! গা-পিত্তি জ্বলে যায় সায়ন্তনের। কোনওরকমে রাগ চেপে রেখে সে বলে, 'ঝড়বৃষ্টি একটু ধরে এলে আমি নাহয় হেঁটেই চলে যাব। এ নিয়ে আপনাকে আর না ভাবলেও চলবে।'

সায়ন্তনের কথায় লোকটা ফের ফিক করে হেসে উঠে। বলে, 'আমার কথায় গোঁসা হয়েছেন বুঝি! হেঁটে চলে যাবেন বলছেন!  কিন্তু রাতের মতিনগর যে একেবারেই নিরাপদ নয়, জানেন না সে কথা?'

 

|||||||||

 

একে ঝড়বৃষ্টিতে ঠাণ্ডায় কাঁপছে সায়ন্তন। তার ওপর লোকটার আগমনের পর থেকে বাসস্টপের ভিতরটা যেন হয়ে উঠেছে তুষারশীতল । কেন জানি রহস্যময় লোকটার কথাবার্তার এই ঢঙ সায়ন্তনের একেবারেই ভাল লাগছে না। শুরু থেকেই কেমন যেন ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টায় আছে লোকটা। তাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সায়ন্তন। তারপরও তাকে বেশি সময়  এড়িয়ে যাওয়া গেল না। কারণ, সায়ন্তনের অনবদমিত কৌতূহল। যে কারণে তার তরফ থেকে একের পর এক প্রশ্ন উঠে আসতে লাগল।

 

'রাতে মতিনগরে কীসের বিপদ, একটু খুলে বলবেন?', জিজ্ঞেস করে সায়ন্তন। 

 

-'কত রকমের বিপদ আছে, সব কি আর বলে বোঝানো যায়। এখান থেকে অল্প আগে টার্নিং কিংবা তার-ও কয়েক কিলোমিটার আগে স্বাধীনবাজার পার হয়ে আমজুর ঘাট এলাকার গাছতলা জায়গাটা দেখেছেন?'

 

-'হ্যাঁ, কেন বলুন তো!'

 

-'জায়গাটা ভাল নয়।'

 

-'কী হয় সেখানে?'--রসিকতার মেজাজে প্রশ্ন ছুঁড়ে সায়ন্তন। 
 

তার মনোভাব ধরতে না পেরে লোকটা বলে, 'অনেক কিছুই হয়। ডাকাতের ভয় তো আছেই। তাছাড়া রাত-বিরেতে তেনাদের দেখাও মেলে।'

 

-'তেনারা মানে! এরা আবার কারা?'
 

অবাক হওয়ার ভান করে ফের প্রশ্ন করে সায়ন্তন। লম্বা জিভ কেটে লোকটা বলে, ' রাত-বিরেতে তেনাদের নাম নিলে তারা কুপিত হবেন। '

এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারে না সায়ন্তন। খানিকটা তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,'জায়গার আবার কি দোষ! তেনাফ্যানা সব আপনাদের কুসংস্কার।'

 

তার হাসি দেখে লোকটা বেশ রেগে যায়। বলে-'আপনাদের মত নব্য শিক্ষিতদের নিয়েই যত সমস্যা। চার পাতার কয়েকটা বই পড়ে নিজেকে সবজান্তা মনে করেন। কিন্তু বইয়ের বাইরে আসল দুনিয়াটা যে কত রহস্যময়, সেটা জানতে-বোঝতে গেলে যেটুকুন অভিজ্ঞতা থাকা  দরকার, যেটা আপনাদের নেই।'

 

||||||||

 

অন্ধকারে লোকটার ফ্যাসফ্যাসে গলার স্বরের সঙ্গে সাপের হিসহিস শব্দের একটা সাদৃশ্য খুঁজে পায় সায়ন্তন। অপরিচিত মানুষটাকে বেশি ঘাটাঘাটি করা উচিৎ হবে না মনে করে সে বলে, 'না, কথাটা আমি সেভাবে বলিনি।' 
 

লোকটা বলে, 'রাস্তায় আপদবিপদ তো আর বলেকয়ে আসে না। কখন কি হয়ে যায়। এই আজকের কথাই ধরুন। সকালে কি ভেবেছিলেন সন্ধেটা আপনার এভাবে দুর্যোগের মধ্যে কাটবে। অন্ধকার নির্জন বাসস্টপে আমার দেখা পাবেন। আর আমিই বা কে, সেটা কি আপনি জানেন?'

 

লোকটার কথার ঢঙে এমন একটা কিছু ছিল, যা সায়ন্তনকে উদ্বেগে ফেলে দেয়। এই অজপাড়াগাঁয়ে একটা হোটেলও নেই যে রাতটা  কাটিয়ে দেওয়া যাবে। মফিদুলকেও ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর উটকো আপদ হিসেবে জুটেছে এই লোকটা! কে জানে বাবা, চোরছ্যাঁচড় নয়তো! আড়চোখে লোকটার উপর নজর রাখে সায়ন্তন।

 

|||||||||

 

এতক্ষণে হাওয়ার গতি কিছুটা কমে এসেছে। তবে বৃষ্টির বেগে একফোঁটাও পরিবর্তন আসেনি। অন্ধকারে ডুবে আছে চরাচর। সায়ন্তনের মনে হয়, সত্যিই তো, কথায় কথায় এতক্ষণ লোকটার পরিচয়টাই জানা হয়ে ওঠেনি। জিজ্ঞেস করে, 'কাকু,আপনার নামটা জানা হল না যে। '

 

ফ্যাচফ্যাচ করে হেসে উঠে লোকটা। বলে, 'ভূত...!'

       

(৩)

 

চমকে উঠে সায়ন্তন। কোনও মানুষের নাম ভূত হতে পারে, এটা তার কল্পনাতেও ছিল না। লোকটা যেন সায়ন্তনের মনের অবস্থা আঁচ করে নেয়। বলে, 'কী, ভূতের নাম শুনে পিলে চমকে গেল তো! আসলে আমার পিতৃপ্রদত্ত নাম হচ্ছে বাহারুল হামিদ ওলিউল্লাহ্ তালুকদার। এই নামের ইংরেজি বানানের আদ্যাক্ষর নিয়ে সংক্ষিপ্ত সংস্করণ এটাই।'
 

কথাটা মনে মনে যাচাই-বাছাই করে নেয় সায়ন্তন। সত্যিই তো!  ইংরেজি আদ্যাক্ষর গুলো জুড়লে লোকটার নাম হয়ে যাচ্ছে ভূত। খামোকাই সে আরও.... ।

 

অবশ্য সায়ন্তনকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এরকম একটা অপরিচিত  অন্ধকার জায়গায় অদ্ভুতুড়ে নাম শুনলে কার না পিলে চমকাবে।এবার খানিকটা ধাতস্থ হয় সে। রসিকতা করে বলে, 'যাক, বাড়ি ফিরে তাহলে জলজ্যান্ত ভূতের সঙ্গে কাটানোর অভিজ্ঞতা গল্প করা যাবে।'
 

সায়ন্তনের কথায় খিকখিক করে হেসে উঠে বাহারুল। বলে, 'তা কাকু বলে যখন ডাকলেই, তখন একরাত ভূতের বাড়িতে কাটালে নিশ্চয় তোমার অসুবিধে হবে না। এত রাতে আর শিলচর যাওয়ার গাড়ি পাবে বলে মনে হয় না। '

 

মাত্র এক-দেড় ঘন্টার পরিচয়ে কারও বাড়িতে রাত্রিবাস করা যায় না। তবে সায়ন্তনের কাছে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাহারুলের প্রস্তাবে রাজি হতেই হয়। জিগ্যেস করে , 'কাকু, আপনাদের বাড়িটা কোনদিকে?'

 

-'বেশি দূর নয়। এখান থেকে অল্প এগোলে রহমান নগর চা-বাগানে আমার কোয়ার্টার।'
 

বাহারুলের কথায় একটা আশার আলো দেখতে পায় সায়ন্তন। বলে , ' কাকু, আপনাদের ওদিকের কোনও এক বাগানে আমার এক বন্ধুর বাড়ি। কিন্তু তার বাড়িটা চিনি না। এমনকি টেলিফোনেও তাকে পাচ্ছি না।'

 

-'কি নাম তোমার বন্ধুর?'
 

-'মফিদুল।', ছোট্ট করে উত্তর দেয় সায়ন্তন। উত্তেজিত সুরে বাহারুল বলে, 'ও, তুমি তাহলে মফি'র বন্ধু। মফি যে আমারই ছেলে।' এ যেন মেঘ না চাইতে জল! যাক, বাঁচা গেল। মফিদুলকে পাওয়া না গেলেও তার বাবাকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সায়ন্তন। বুকের উপর চেপে থাকা জগদ্দল পাথরটা নেমে যায়। 
 

এতক্ষণে ঝড়বৃষ্টি থেমে গেছে। বাহারুল বলেন, 'এস বাবা এস, আজ রাতে তুমি আমাদের মেহমান। '
 

বাক্যব্যয় না করে মফিদুলের বাবাকে অনুসরণ করতে থাকে সায়ন্তন।

 

||||||||||

 

শিবরাত্রি শেষ হয়েছে আজ তেরো দিন। তারমানে মাঝখানে মাত্র একটা দিন। তার বাদেই পূর্ণিমা----মনেমনে হিসেব কষে সায়ন্তন।এতক্ষণে আকাশ আলো করে একধারে কিঞ্চিৎ চাপা রূপোর থালার মত চাঁদ উঁকি দিয়েছে। মফিদুলের বাবার পিছনে পিছনে মতিনগর বাজার পেরিয়ে আমড়াঘাট রোড ধরে এগিয়ে চলেছে সে। রাস্তার দু'পাশে ঝোপঝাড়, গাছপালা আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। বসন্তের মৃদুমন্দ বাতাস। প্রকৃতির এই শান্ত রূপ দেখে কে বলবে, একটু আগে এই জায়গার উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে প্রলয়ংকরী ঝড়। শুধু রাস্তার উপর বিক্ষিপ্ত পত্রপল্লব সেই ঝড়ের সাক্ষ্য বহন করছে।

 

শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীতে চাঁদ প্রায় পূর্ণিমার কাছাকাছি চলে যায়। নির্জন পথের উপর আলোর সমুদ্রে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলেছে অসম-বয়সী দু'টো মানুষ। দূরে রুপোলি আলোয় মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভুবনপাহাড়। জ্যোৎস্নায় আকাশ-বাতাস-মাটি‚  সবই যেন মাখামাখি হয়ে আছে। এ-আলোর শেষ নেই, অন্ত নেই রূপের। পাহাড়ের বুক চিরে চকচকে ফিতার মত কয়েকটা লম্বা লাইন নিচের দিকে নেমে গিয়েছে। চাঁদের আলো পড়ে সেগুলো চকচক করছে। সায়ন্তন জানে, এগুলো পাহাড়ি ঝর্ণা। রুপোলী জঙ্গলের উপর দিয়ে চাঁদটা যেন এক পাহাড় থেকে আরেকটা পাহাড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলছে।

 

সব সৌন্দর্যের বোধহয় একটা মাপকাঠি আছে। সেটা অতিক্রম করলে সৌন্দর্য তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে হয়ে উঠে ভয়ংকর। আর তখনই বোধহয় অভিধানে সেটাকে ভয়ংকর সুন্দর বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সুন্দরও যে ভয়ংকর হয়---আজ রাতের রুপোলী সমুদ্রে অবগাহন করে সেটাকে মনেপ্রাণে অনুভব করল সায়ন্তন।

 

দেখতে দেখতে আমড়াঘাট রোড থেকে হাতের বাঁ দিকে রহমান নগর টি-এস্টেটের রাস্তা ধরল সায়ন্তনরা। এখান থেকে বাগানের ফ্যাক্টরিটা আরও মাইলটাক। একটু এগোতেই বাগান রাস্তার পাশে মুসলমানদের একটা কবরস্থান। বিশাল কবরস্থানের ঠিক মাঝবরাবর পাশাপাশি শায়িত তিনটে নতুন সমাধিতে সায়ন্তনের নজর আটকে গেল। সমাধিকে সুরক্ষিত রাখতে যে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়, সেগুলো একেবারেই নতুন। নতুন বাঁশে চাদের আলো পড়ে সবক'টা সমাধি -ই চকচক করছে।  মনে হয়, খুব বেশি হলে কবরগুলো দু-তিনদিনের পুরনো। 


সায়ন্তনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে  তাড়া লাগালেন বাহারুল। -'কবরে কি দেখছ সায়ন্তন! তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চল।'

 

-'এগুলো কাদের কবর কাকু, সবাই কি একই পরিবারের?'

 

হাঁটতে হাঁটতে বিড়বিড় করে কিছু একটা উত্তর দেন বাহারুল। দূর থেকে থেকে সায়ন্তন তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারে না। আরও পনেরো মিনিট হাঁটার পর মফিদুলদের বাড়িতে গিয়ে যখন তারা পৌঁছোয়, তখন অনেক রাত।

 

||||||

 

মফিদুলদের দোতলা বাড়িটা বাগানের কোয়ার্টার লাইনের শেষ প্রান্তে। বাড়ির উল্টো দিকে একটা বিশাল দিঘি। এলাকাটা নির্জন। সদর দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে হাঁক পাড়লেন বাহারুল। 
 

-' মফিদুল,এ্যাই মফি...তাড়াতাড়ি দরজা খোল। দ্যাখ কাকে ধরে নিয়ে এসেছি।'

 

বাইরের আলোটা জ্বলে উঠে। দরজা খুলে বেরোয় মফিদুল।  সাদা ফতুয়া গায়ে বিমর্ষ মফিদুলকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে! বড্ড বেশি শুকিয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

 

-'কে এসেছে বাবা?' প্রশ্নটা করে মফিদুল। তার গলাটাও কেমন যেন ফ্যাসফ্যাসে। জ্বর-সর্দি হলে যেমন হয়--অনেকটা সেরকমই।

 

বাহারুল বলেন, 'নিজেই চেয়ে দ্যাখ।'
 

সায়ন্তনকে দেখে খুশিতে চোখ চকচক করে উঠে মফিদুলের। বলে,'একি সায়ন্তন তুই! আয় ভাই আয়..., ঘরে চল।'

 

'সেই ভাল মফি, তুই সায়ন্তনকে ঘরে নিয়ে যা । আমি বরং কলতলায় গিয়ে মাথাটা ধুয়ে আসি। যা বৃষ্টি গ্যাছে মাথার উপর দিয়ে!'.... 

 

বলতে বলতে কলতলার দিকে চলে গেলেন বাহারুল। মফির সঙ্গে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে সায়ন্তন শুনতে পেল, বাহারুল কাকু বলছেন,'ওগো মফির মা শুনছ, তোমার ছেলের বন্ধু এসেছে গো, ছেলের বন্ধু। তাড়াতাড়ি দু'টো ভাল-মন্দ রান্না বসিয়ে দাও দেখি।'

 

|||||||||

 

অনেকদিন বাদে দুই বন্ধুর দেখা। কথায় কথায় মফিদুলদের ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে নেয় সায়ন্তন। হঠাৎ এনআরসির নোটিশ পেয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণে সপরিবারে তাদের ছুটে যেতে হয়েছিল সুদূর বাকসা জেলার চাঁপাগুড়িতে। এর আগে সব নথিপত্র ঠিকঠাক করতে শিলচর-মতিনগরে অনেকবার চক্কর কাটতে হয়েছে। এইসব ঝামেলায় আর ইউনিভার্সিটি যাওয়া হয়ে ওঠেনি।  বাকসায় কাজ সেরে মাত্র তিনদিন আগে বাড়ি ফিরে এসেছে মফিদুলরা।

 

মন খারাপ হয়ে যায় সায়ন্তনের। সত্যিই তো , ধান্দাবাজ রাজনৈতিক নেতাদের মুখের বুলিই সার। এদিকে এনআরসির চক্করে পড়ে কতজন যে কতভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন,সে খবর ক'জন রাখে। মেজাজটা তেতো হয়ে গেল সায়ন্তনের ...

 

একটু বাদে ভিতর বাড়ি থেকে এক মহিলা এসে বললেন, তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে নাও বাবা, আমি ভাত বেঁড়ে দিচ্ছি।'
 

চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে যায় সায়ন্তনের। মহিলার চেহারায় একটা মা মা ভাব। দেখলেই শ্রদ্ধা জাগে।  মফিদুল পরিচয় করিয়ে দেয়, 'সায়ন্তন, ইনি হচ্ছেন আমার মা।' 
 

-'নমস্কার মাসিমা।' মাথা নুইয়ে প্রণাম করতে যায় সায়ন্তন। এক লাফে কয়েকহাত পিছিয়ে যান ভদ্রমহিলা। বলেন, 'না না বাবা, পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে হবে না। তুমি তাড়াতাড়ি পরিষ্কার হয়ে এসো।'

 

একটু পরে মফিদুলের সঙ্গে ওঘরে খেতে যায় সায়ন্তন। খাবারের টেবিলে শুধু একজনের প্লেট দেখে অবাক হয়ে সে জিগ্যেস করে, 'একি মাসিমা, আপনারা খাবেন না?"
 

-'তুমি খাও বাবা। আমি আর মফি আগেই খেয়ে নিয়েছি। আর তোমার মেসো এখন নামাজ পড়তে গেছেন। তার ফিরতে একটু দেরিই হবে। '

 

-'হ্যাঁরে সায়ন্তন, তুই বরং খেয়েদেয়ে এইবেলা ঘুমিয়ে পড়। সকালে তোর সঙ্গে আমিও ইউনিভার্সিটি যাব।'

 

মফিদুলের কথায় খাওয়া শুরু করে সায়ন্তন। পাতলা মসুরের ডাল, সঙ্গে কুঁচিকুঁচি করে ছোট দিশি আলু ভাজা। সেই  সঙ্গে আবার মফিদুলদের বাগানের গন্ধলেবু, কাঁচা লঙ্কা,স্যালাড,পাঁপড় ভাজা। মুরগির মাংসটা যা হয়েছে! ভাঁপের ইলিশটাও খাসা রান্না করেছেন মাসিমা!  নাহ্...! ভদ্রমহিলার রান্না এবং পছন্দ --- দু'টো'রই তারিফ করতে হয়। পেটপুরে খেয়ে নিল সায়ন্তন। একটু পরে খাওয়াদাওয়া সেরে মফিদুলের পাশের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে সায়ন্তন। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। এমন সময় বাগানের পেটা ঘড়িটা বেজে উঠল। রাত বারোটা। দেখতে দেখতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সে।

 

||||||||||

 

সকালবেলা জানালা দিয়ে আলো এসে চোখে পড়তে ঘুম ভেঙে যায় সায়ন্তনের। বাগানে আমগাছের মগডালে বসে কয়েকটা কাক অনবরত কা কা করে বাড়ি মাত করে তুলেছে।
 

ঘরে মফিদুল নেই। তার বিছানাটাও পরিপাটি করে গোছানো। হয়তো পাশের ঘরে গেছে,একটু পরেই চলে আসবে ----এই ভেবে  আরও কিছুক্ষণ বিছানায় গড়িয়ে নেয় সায়ন্তন। প্রায় কুড়ি মিনিট পার হয়ে যায়।

 

নাহ্, মফিদুলটা এখনও এল না। বাড়িটাও সাড়াশব্দহীন। দেখতে হচ্ছে তো, ব্যাপারটা কি।

 

বিছানা ছেড়ে উঠে পাশের ঘরে উঁকি দেয় সায়ন্তন। দরজাটা হাট করে  খোলা। কেউ নেই! এক এক করে সবক'টা ঘর ঘুরে দেখে সায়ন্তন। আশ্চর্য, কেউ কোথাও নেই। খাঁখাঁ করছে বাড়িটা! যেন হাওয়ায় উবে গিয়েছে সবাই। আশ্চর্যান্বিত হয়ে মফিদুলদের খোঁজে বাইরের বাগানে যায় সায়ন্তন।

 

-'মাসিমা... ও মাসিমা... মফিদুল...এ্যাই মফি... কোথায় গেল সব!'.....এবার বেশ উচ্চস্বরে ডাকাডাকি শুরু করে সায়ন্তন। খালিবাড়িতে শুধু তার আওয়াজটাই প্রতিধ্বনিত হয়ে যেন তাকেই ব্যঙ্গ করতে থাকে। গাছের মগডালে বসা কাকগুলো আরও তারস্বরে কা কা করে ডেকে উঠে।

 

'কাকে খুঁজছেন?'...

 

গুরুগম্ভীর গলার প্রশ্নে চমকে ঘুরে দাঁড়ায় সায়ন্তন। দেখে, পায়ে ক্যাম্বিস জুতোর সঙ্গে ম্যাচিং হাফপ্যান্ট, টি-শার্ট পরা ছড়ি হাতে এক গুঁফো ভদ্রলোক গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন তিনি। তাকে দেখে সায়ন্তন বলল,' না, মানে আমি আমার বন্ধু মফিদুল ও তার মা-বাবাকে খুঁজছি। কাল রাতে ঝড়বৃষ্টির সময় মতিনগর বাসস্টপে মফিদুলের বাবা বাহারুল আঙ্কেলের সাথে দেখা। তিনিই আমাকে এখানে নিয়ে আসেন। কিন্তু আশ্চর্য! ঘুম থেকে উঠে এখন আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।'

 

সায়ন্তনের কথা শুনে গুঁফো লোকটার চোখমুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গেল। ভদ্রলোক আরেকটু হলে ভিরমি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলেন । কোনও মতে টাল সামলে নিয়ে বললেন, 'ক্ক...ক্ক..ক্বি... কি বলছেন আপনি! এ যে সাংঘাতিক ব্যাপার!'

 

-'কেন কি হয়েছে বলুন তো?'
 

সায়ন্তনের প্রশ্নে সেই ভদ্রলোক বলেন, 'দেখুন, আমি এই বাগানের ফ্যাক্টরি ম্যানেজার স্বপন রায়চৌধুরী। সত্যি করে বলুন তো, কাল রাতে  কি ঘটেছিল! '
 

রাতের সমস্ত ঘটনা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে সায়ন্তন। সব শুনে গম্ভীর হয়ে যান স্বপন রায়চৌধুরী। বলেন,'আপনি আমার সঙ্গে আসুন।'

 

তাকে অনুসরণ করে রাতেরবেলা দেখা সেই কবরস্থানের সামনে গিয়ে পৌঁছায় সায়ন্তন। নতুন তিনটে কবর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে স্বপনবাবু বলেন, ওরা এখন ওইখানে শুয়ে আছে।'

 

সায়ন্তনের মনে হয়, লহমায় তার শরীরের সমস্ত শক্তি কে যেন ব্লটিংপেপার দিয়ে শুষে নিয়েছে। বাকশক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। তাহলে গত রাতে মফিদুলদের সঙ্গে গল্পগুজব, খাওয়াদাওয়া, আদর-আপ্যায়ন, স্নেহময়ী মাসিমা, বাহারুল কাকু ----- সমস্ত ঘটনা কি তবে মিথ্যে। মন মানতে চায় না । হতভম্ব সায়ন্তন ফ্যাক্টরি ম্যানেজার রায়চৌধুরীর কাছ থেকে জানতে পারে, বাকসা থেকে ফেরার পথে শিলঙ রোডে বাহারুলবাবুদের নাইট সুপার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গভীর খাদে পড়ে যায়। মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অনেক যাত্রী নিহত হয়েছেন। সপরিবারে মারা গিয়েছেন বাহারুল হামিদ ওলিউল্লাহ্ তালুকদার। মফিদুলটাও বাঁচেনি। মরদেহ আসার পর গত পরশুই তাদেরকে এইখানে সমাহিত করা হয়েছে।

 

|||||||

 

গতরাতের ঝড়বৃষ্টির জেরে সকালের দিকে বেশ কুয়াশা পড়েছে। এখানে-ওখানে ঝোপঝাড়,গাছপালার মাথায় জমে থাকা কুয়াশার স্তূপে সূর্যের নরম আলো পড়ে এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কবরের ঠিক পাশে একটা ঝাকড়া বকুল গাছ। সেটার মাথার উপরও একদলা কুয়াশা জমা হয়ে আছে। সায়ন্তন দেখতে পেল, অনেকগুলো বকুল ফুল কবরের উপর ছড়িয়ে আছে। যেন পরম যত্নে এগুলোকে বিছিয়ে দিয়েছে কেউ। গাছের পাতায় জমে থাকা কুয়াশাগুলো  বিন্দু-বিন্দু জল হয়ে টপটপ করে ঝরে পড়ছে। নিঃশব্দে। গাছটাও কি কাঁদছে... ! কে জানে...!
 

বন্ধু মফিদুল,ভূত কাকু, মাসিমা---সবার জন্য মনটা হু হু করে ওঠে সায়ন্তনের। নিজের অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে যায়।

 

ভূত নয়...ভূত নয়...ভূত নয়।  এই বিপন্ন সময়ে আরেকটা দানো'র কথা মনে করে সায়ন্তনের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।

 

এন...আর... সি...

 

তিন অক্ষরের শব্দটা তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খায়, হাতুড়ির মতো আঘাত করতে থাকে। কোত্থেকে একটা অজানা ভয়  এসে ক্রমশঃ অক্টোপাসের মত তার সমস্ত সত্ত্বাকে গ্রাস করে নিতে থাকে । কে জানে, এই ভয়ের হাত থেকে মুক্তি কবে...
 

পিকনিক  
ডাঃ কনকদীপ শর্মা , ১৮ জুলাই ২০২০ 

 

সারাদিনের হৈচৈ-হট্টগোলের পর আমাদের খাওয়া যখন শেষ হল, তখন আমরা বনপথে একটু ঘুরতে বেরোলাম। আর সময় বেশি নেই। জানুয়ারীর শুরু, দিনের তুলনায় রাত যেন ঘাসের তুলনায় বাঁশ।
 

পিকনিকে দু'ধরনের মানুষ থাকে। একদল যারা শুধু খাওয়া, সেলফি ও মজার জন্য যায় আর আরেকদলে স্বল্প কয়েকজন যারা সার্বিক দায়িত্ব নেয় এবং পরিচালনা করে। তো অধম আমি আর ছোটভাইএর মতো বন্ধু সুদীপ ছিলাম দ্বিতীয় দলে। সারাদিন রান্নাবান্না করে সবকিছুর সমাপ্তি করতে অনেকটা দেরিই হল৷ এরপর আমরা দস্তুরমত কাহিল। কিন্তু একটা নতুন জায়গা বলে কথা, অল্প হলেও ঘুরে দেখতে হয়। অন্তত দুজনের একটা করে ছবি তো চাই। 

 

সাদা জিনিসটা সুদীপই আগে দেখল৷ টিলার খাজে একটা গর্তের ভেতরে। খুবই উত্তেজিত হয়ে সুদীপ বলল- "এটা আমাদের জুলজি ডিপার্টমেন্টের ড০পুরকায়স্থকে উপহার দেব, স্যার খুব খুশি হবেন, আমাদের ল্যাবে সাজিয়ে রাখবেন"
 

আমি সহজ হতে পারলাম না। বললাম- " কিসের হাঁড় ওটা?"
 

হাতে অজানা প্রাণীর মাথার করোটি বা স্কাল নিয়ে উলটে পালটে দেখে ঠোঁট কামড়ে সুদীপ বলল-"হুম। ডগ ফ্যামিলির কিছু একটা হবে। আলবৎ ওয়াইল্ড কিছু।"

 

যখন সন্ধ্যা হয় হয়, তখন সবাই বাসে চাপলাম। ফেরার পথ ক্রমেই অন্ধকার হতে লাগল। দূরে তারস্বরে শেয়ালের দলবদ্ধ আর্তনাদ দিকবিদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

 

পিকনিকের জন্য একটা হোয়াটস্যাপ গ্রুপ হয়েছিল। ঘরে ফেরার পর সবাই সারাদিনের শতাধিক ফোটো এতে উপলোড করল। আমাদেরও কর্মরত কয়েকটা ছবি দেখে খুশি হলাম। বাড়ি গিয়ে সুদীপ সেই অজানা প্রাণীর মাথার হাঁড়ের ছবি তুলে গ্রুপে পাঠাল। ভয়ংকর। চোখের অন্ধকার গর্ত দু'টি যেন বেশ রাগান্বিত।  

 

গভীররাতে ফোন পেয়ে ঘুম ভাংল। রাত ২ঃ৩০টে। সুদীপ কলিং। উত্তেজিত হয়ে বলল যে শেয়ালের ডাকে তার ঘুম হচ্ছে না। আমি ঘুম জড়ানো গলায় বললাম " ধ্যাৎ পাগল, মফস্বলে শেয়াল কেন আসবে? ডিস্টার্ব করবি না আর৷ ঘুমো। যত্তসব!"
 

শান্তিতে আমার ঘুম হল। সকালে সুদীপের কথা মনে হল। পাশেই তো ওর বাড়ি। শেয়াল কাল সত্যিই ডাকলে আমিও নিশ্চয় শুনতাম। একবার যেতে হয় সুদীপের বাড়ি। 

 

"এ কি অবস্থা ভাই?" উসকু খুসকু চুল, অবিন্যস্ত কাপড় পরা ক্লান্ত চিন্তিত সুদীপকে জিজ্ঞেস করলাম।
 

মাথা দেওয়ালে ঠেসে সুদীপ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-
" ওরা প্রায় ভোরবেলা অবধি ডেকে চলল এই সামনের গেটে। তারপর আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। ঘরে মা বাবা আগরতলা পিশির বাড়ি। একা মশারির স্ট্যান্ড হাতে নিয়ে বের হলাম। কিন্তু ওরা যে কি! ছায়ামূর্তির মত। শেয়ালের আকার আকৃতি, কিন্তু ওদের শরীরের ভেতর দিয়ে দেখা যায় ওপারের সবকিছু। যেন ওদের শরীর কাঁচে তৈরি। আমি দিশেহারা তখন। আমার পুরো বাড়ি, ঘর, বারান্দায় ওরা বিচরণ করছে। আর তারপর .... খুব ভয় লাগছে...... তারপর ওরা আমার ঘর থেকে সেই প্রাণীর মাথার হাঁড় নিয়ে দলে দলে উন্মাদের মত ছুটে পালাল। "

 

কিছুক্ষণ নির্বাক ছিলাম। মনে মনে ভাবলাম সে এমন কি? মোবাইলে ছবিটা দেখতে গিয়ে দেখি নেই, কোনোভাবে ডিলেট হয়ে গেল কি? সুদীপ শুকনো হেসে বলল " এই ঘটনার পর পিকনিকের সবগুলো ছবি আছে কিন্তু এই বিশেষ ছবিটি নেই।"
 

তারপর পিকনিক গ্রুপের কেউই ছবিটা নিজেদের মোবাইলে খুঁজে পেল না।

এই বিভাগের লেখা ও ভিডিও নিয়ে আপনার মতামত

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 by Ishan Kotha. Site Developed by CHIPSS

2