কৃষ্টি ও সংস্কৃতি / Heritage & Culture

অধ্যাপক অমরেশ দত্তের প্রয়াণে  :   নীরব নমস্কার

  

আর মাত্র দুটি মাস পেরোলেই তিনি একশো দুই বছরে পা দিতেন। আমরা ঠিক উপলব্ধি করতে পারিনি এ নীরব উপস্থিতি যে ছিল একটি বিরাট সৌভাগ্য। এক জীবন্ত কিংবদন্তি, বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তটি দীর্ঘ জীবন আমাদের সঙ্গে রয়েছিলেন এই রাজ্যে, এই দেশে, এই বিপন্ন সময়েই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, দেশভাগের কিছুটা অভিজ্ঞতা তো তিনিও পেয়ে গেছেন, স্বাধীনতা-উত্তর অভিজ্ঞতা -- দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক দুঃসময়, গৌরবের টুকরো টুকরো মুহূর্তগুলো, জাতীয় জীবনে বহুস্তরীয় সৃজনশীলতার বিকাশ, বিচ্ছিন্নতার আগ্রাসন, চিন্তার দীনতা, মানবিকতার অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে নিস্ফল আক্রোশ -- এসবের মধ্য দিয়ে গিয়ে সর্বশেষে বিশ্বব্যাপী অদৃশ্য মারণব্যাধী, এও তাঁকে দেখে যেতে হল। তাঁর প্রয়াণ সংবাদ আমাদের কাছে খুব অপ্রত্যাশিত কিছু নয়, কিন্তু এ কোন সময়টিকে তিনি নির্বাচন করলেন, কিংবা তাঁর ভাগ্যবিধাতাই নির্ধারণ করলেন তাঁর জন্য ! আজও কান পাতলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাসে তাঁর সুস্পষ্ট উচ্চারণ শুনতে পাই "She should have died hereafter. There would have been a time for such a word..."। তিনি পড়াচ্ছেন মহাকবির নাটক ম্যাকবেথ। পত্নীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বিপন্ন, বিমুঢ় ম্যাকবেথ উপলব্ধি করছে এ দুঃসহ বার্তা গ্রহণ করার ক্ষমতাও তাঁর অবশিষ্ট নেই, জীবন তাঁর কাছে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন, "অ্যা ওয়াকিং শ্যাডো ... অ্যা টেল টোল্ড বাই অ্যান ইডিয়ট, ফুল অব সাউন্ড অ্যান্ড ফিউরি সিগনিফায়িং নাথিং"। শোক প্রকাশ করার অবস্থায় আমরাও কি আর আছি এ দুঃসময়ে ! আমাদেরও তো অসহায়ের মতন শুধু দেখে যাওয়া এ মহাবৃক্ষের পতন (মহাগুরু নিপাত)।

 

ব্যক্তিটি তো কেবল মাত্র উত্তর-পূর্ব ভারতের নন, তাঁর খ্যাতি সারা দেশব্যাপী, এবং বিদেশেও। খ্যাতিমান শেক্সপিয়ার জি, উলসন নাইট, ই এম ডবলিউ টিলিয়ার্ডও রয়েছেন তাঁর গুণমুগ্ধদের তালিকায়। তাঁর গুণমুগ্ধ পূর্বত্তর ভারতের হাজার হাজার ছেলেমেয়েরা। জনজাতীয় ছেলেমেয়েদের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ পক্ষপাত; অসমিয়া আর বাঙালিদের তিনি কারণে অকারণে ভর্ৎসনা করতে ছাড়তেন না, তবু এরা তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ; তাঁর মুখের বাক্যগুলো একটি প্রজন্মের মুখে মুখে আপ্তবাক্যের মতো ফিরেছে। দুবছর আগে জন্ম তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর এক অনাড়ম্বর আয়োজনে শেষ দেখার দিনে গভীর আত্মতৃপ্তির সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, সংবাদমাধ্যমে অদ্যাবধি তিনি কোন দেশবিরোধী, অমানবিক কাজ, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিতে তাঁর কোন ছাত্রছাত্রীর জড়িত হবার খবর পাননি। দীর্ঘ পরমায়ু নিয়ে এ দুঃসময়ে ছাত্রছাত্রীরা যে তাঁর এ বিশ্বাস অটুট রাখতে সফল হয়েছে এ বিশ্বাস নিয়েই তিনি বিদায় নিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীদের উপর এ বুঝি তাঁর ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি দায়িত্ব চাপিয়ে যাওয়া!

 

শিলচর শহরের অভয়চরণ পাঠশালা, কাছাড় হাইস্কুল এবং গুরচরণ কলেজ হয়ে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের সাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে অবশেষে ফিরে এসেছিলেন নিজভূমিতে -- গৌহাটি, এবং অতঃপর ডিব্রূগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ, সে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় দুটিকে সময়ের উপযোগী ভাবে গড়ে তোলার কাজেও তাঁর আত্মনিয়োগ। মধ্যিখানে আবার দেশের অন্যতম প্রধান সারস্বত প্রতিষ্ঠান, “সাহিত্য অকাদেমি”র বিশেষ প্রকল্প, যার পেছনে ছিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন সেই “ভারতীয় সাহিত্যের কোষগ্রন্থ” (Encyclopaedia of Indian Literature) সমাপ্ত করে একটি বহু প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক জাতীয় কর্তব্য সম্পাদন করে এসেছেন। ১৯৮৪ সালে গৃহীত এ প্রকল্পটিতে ছিল ২২টি ভারতীয় ভাষার সাহিত্যস্রষ্টা সহ তাঁদের সাহিত্যকৃতি নিয়ে সাত হাজার পাঁচশোটি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রাচীন, মধ্যযুগ এবং বর্তমান কালের জাতীয়সাহিত্যের আত্মপ্রকাশ এবং বিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরার প্রয়াস। অমরেশ দত্তের সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৮৭, ৮৮, এবং ৮৯ সালে এ প্রকল্পের তিনটি খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। এর পরবর্তী আরও তিনটি খন্ড নিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর কালে এত ভাষা, এত সংস্কৃতি এত এত কর্মীদের সমন্বয়ে মহাকাব্যিক পরিসরে এ মহাগ্রন্থ বিশ্বের দরবারে ভারতবর্ষকে বিশেষ ভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ডঃ হীরেন গৌহাই প্রয়াত অধ্যাপকের প্রতিভার মূল্যায়ন করে বলেছেন, তাঁর মধ্যে একজন পণ্ডিত, শিক্ষক এবং কবির সমন্বয় ঘটেছিল। ইংরেজি সাহিত্যের উপর তাঁর মৌলিক চিন্তাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতীয়ত্বের স্বাক্ষর। কয়েকটি প্রজন্মের ছাত্র তো বটেই এ সময়ের বিশিষ্ট বিদ্জ্জনের উপরও অধ্যাপক অমরেশ দত্তের প্রভাব অপরিসীম। জাতীয় জীবনের বড়ো দুর্দিনে আজ এ শিক্ষাগুরু আমাদের থেকে বিদায় নিলেন। এত কৃতিত্বের অধিকারী এ নীরব ব্যক্তিটির কোন খবরই রাখলেন না আমাদের দেশের পদ্মশ্রী, অকাদেমি, জ্ঞানপীঠ সম্মান প্রদানকারীরা। রাখলে এ হেন ব্যক্তির শতবর্ষ হয়ে উঠতে পারতো একটি জাতীয় উৎসব। সবার অলক্ষ্যে শতবর্ষ অতিক্রান্ত সচল, সক্ষম, সতত সুচিন্তক এ ব্যক্তিটি আজ সকালে বিদায় নিলেন। তাঁর উদ্দেশে এ অধম ছাত্রের নীরব নমস্কার।

সঞ্জীব দেব লস্কর

৬ আগস্ট ২০২০ 

ভারতবর্ষে মূলত বাঙালি মানস ও যাপনে কিছু মৌলিক পরিবর্তনের উনিশ শতকীয় অগ্রদূত ঈশ্বর চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় ( বিদ্যাসাগর ) ।  এই বিপ্লবী সমাজ সংস্কারক ও চিন্তাবিদের ১৩০ তম জন্মবার্ষিকী তিন বঙ্গ জুড়ে বেশ ব্যাপকতার সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে ।

এ যে এক ইতিবাচক ইঙ্গিত তাতে সন্দেহ নেই।

একই সঙ্গে এটাও স্বীকার করে নিতে কোনো দ্বিধা থাকার কথা নয় যে

এই করোনা মহামারি কালে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ও ওয়েব দুনিয়ার ডিজিটাল মাধ্যমে

সাধারণ মানুষ অনেক বিষয়ে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয় ও সোচ্চার । 
সোশ্যাল মিডিয়াতে কোনো ডিগ্রি তকমা বা আলংকারিক উপাধি ছাড়াও

অসংখ্য মানুষ নিজেদের ইচ্ছে ,স্বপ্ন আকাঙ্খা প্রকাশ করে সাধারণ ও অসাধারণ পাঠক শ্রোতাকে আকৃষ্ট ও উৎসাহী করেন।

মার্ক জুকারবার্গদের এই যে মুনাফা নির্ভর পরিসর প্রদান , ঈশ্বরচন্দ্র বেঁচে থাকলে সেই ব্যাপ্তির দেখা পেলে খুশিই হতেন হয়তো।
প্রকাশ ও প্রকাশনা সংক্রান্ত ঝক্কিতে না গিয়ে এই নতুন প্রকাশ মাধ্যম নিয়ে

ঈশ্বরচন্দ্র নিশ্চয়ই নতুন ভাবনায় আমাদের আলোকিত করতেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩০ তম জন্মদিন ঈশান কথার ওয়েব পেজেও অনাড়ম্বর ভাবে উৎযাপিত হলো

সীমা ঘোষের একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক অভিমত পুনঃপ্রকাশ করে ...

বিদ্যাসাগরের চেতনার উত্তরসূরি নেই !

সীমা ঘোষ , ১ আগস্ট ২০২০ 

  

বছর খানেক আগে একটা জাতীয় আলোচনা চক্রে যোগ দেব, বিষয় নির্বাচন করেছি এলজিবিটি (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল অ্যান্ড ট্রান্সজেন্ডার) আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য । মেয়ের ঘোর আপত্তি । ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্ন উড়ে এলো - এলজিবিটি আন্দোলন নিয়ে আমি কেন বলব ?  ঐ বিষয়েই কেন আলোচনা ? এদের আন্দোলন নিয়ে আমার কী ভূমিকা ইত্যাদি । আমিও ছাড়ি কেন, পাল্টা বাউন্স দিলাম, দিল্লির রাস্তায় এলজিবিটিদের মিছিলে পা মেলাবার তুইই তাহলে কে ?  এরপরে এসব আন্দোলনে সহমর্মিতা জানিয়ে যায় কিনা জানিনা । কিন্তু আমার যত বই পেপার কাটিং টুকরো টাকরা লেখা এ নিয়ে সব একপাশে সরানো এখনও । সেটা আবার একটু উস্কানি পেল । এই কয়েকদিন আগে মেঘমালা ফেসবুকে একটা গল্প পোস্ট করেছে "রবীন্দ্ররচনাবলী  ও একটি পুড়ে যাওয়া ব্রেসিয়ার", লেখক উত্তম দত্ত । গল্পটি 'যাপনকথা'য় প্রথম প্রকাশ সম্ভবত নয়, স্মৃতি কিলবিলিয়ে বলেছে, এ লেখা তার আগে পড়া । সে যাই হোক, সুমনা চৌধুরী খুব সুন্দর করে এ গল্পের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন । এ গল্পের দলিত মেয়েটি যার বুকের গড়ন ততটা নয়, যতটা হলে আমাদের চারপাশের যৌনকাতর পুরুষের লালা ঝরে । মেধাবী এই মেয়েটির মেধার চেয়ে সকলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তার শরীর, তার জাতি, তার প্রান্তিক অবস্হান ইত্যাদি । সহপাঠীদের উপহাস ব্যঙ্গবিদ্রুপে নিত্য বিধ্বস্ত হয় মেয়েটি । সুমনা চৌধুরীর বক্তব্য, মেয়েটির উপর চলতে থাকা এই নির্যাতনের যে মানসিক যন্ত্রণার প্রকাশ সবটাই একজন পুরুষ লেখকের চোখ মন ও অনুভূতি দিয়ে লেখা । তাই তা কখনও ঐ মেয়েটির নিজস্ব বয়ান হয়ে ওঠে না ।  ঠিক, ঐ যে বলে ' কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কীসে ..', সেরকম আর কি !

তবে, সবটাতে একমত হতে পারলাম না । একারণেই আমার আজকে বিদ্যাসাগর নিয়ে কিছু লিখতে গিয়ে একটু ধান ভাঙতে শিবের গীত গাইলাম । তবে তা কেন, লেখার সূত্র ধরেই  বলার চেষ্টা করব । নারীর বয়ান পুরুষ লিখলে তা ঠিক নারীর বয়ান হয়ে ওঠে না - এ কথার মধ্যে আংশিক সত্য আছে ।  তাতে সত্য  কম থাকতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি নয় । তাকে সম্পূর্ণ ফেলা যাবে না ।  কারণ, এ কথা তো অস্বীকার করা যাবে না, আজ এই যে সীমা, সুমনা, মেঘমালা সহ মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে না শুধু, নিজের মত প্রকাশে কলম ধরছে, তার পিছনে সেই সেই মহান ব্যক্তিত্বটিরই অবদান, যিনি জৈবিক দিক দিয়ে পুরুষ ।  যিনি আজ থেকে দুশো বছর আগে জন্মে এক কঠিন প্রতিকূল সময়ে কালাপাহাড়ি জেদ নিয়ে দেশের নিপীড়িত লাঞ্ছিত, বঞ্চিত মেয়েদের সমস্ত রকম মানবিক অধিকারের জন্য কোমর বেঁধে লড়েছিলেন । তিনি আমাদের গৌরব, তিনি আমাদের ঈশ্বর, বিদ্যাসাগর । তবে এ পর্যন্ত বললে তো সমাজসংস্কারক শিক্ষাসংস্কারক বিদ্যাসাগরকে পেলাম । কিন্তু তিনিই বাঙালি সমাজের প্রথম মানুষ যিনি নারীর যৌনতার অধিকার নিয়ে কথা বললেন । আমার লক্ষ্য সময়ের বিচারে এই মানুষটির সেই আশ্চর্য এই আধুনিক ভাবনা নিয়ে ।


আজ ২৬ জুলাই ২০২০ তে বসে যখন এ লেখা লিখছি, কাকতলীয়ভাবে ১৮৫৬ সালে ঠিক আজকের এই  তারিখে বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের আইন পাশ করিয়েছিলেন । স্বামী হারানো বালবিধবাদের  যন্ত্রণায় ছেলের সঙ্গে কাতর হয়েছিলেন মা ভগবতীদেবীও । একদিন, গাদা গাদা শাস্ত্রপড়া ছেলের কাছে এর একটি উপায় বের করতে  বললেন । সেই থেকেই তিনি নারীজাতির অনেক সমস্যা দূর করার সঙ্গে এই অসহায় বালবিধবাদের মুক্তির উপায় খুঁজতে নিবিড়ভাবে শাস্ত্র পাঠ শুরু করেছিলেন, এবং যথার্থই যোদ্ধার মতো ছিল সে অধ্যয়ন । এদের দুঃখ ঘোচানোর উদ্যমের সেই শুরু । তবে, চাইলেই কি সব করতে পারেন ! এ রাস্তা যে কত কঠিন, খুব জানেন তিনি । এ সমাজের কর্তাদের লাল চোখ কতটা নির্মম নিষ্ঠুর , আর তারা সুযোগ পেলেই 'গেল গেল 'করে সমাজকে ক্ষেপিয়ে দেবেন - এ তো তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা !  তাই বহু অনুসন্ধান করে তবেই একদিন বলে উঠতে পেরেছিলেন, "ইউরেকা ইউরেকা" । তিনি  পরাশর-সংহিতা থেকে বিধবাবিবাহের একটি শাস্ত্রীয় উপায় বের করে ফেলেছেন । তবে, মুখের কথায় 'চিঁড়া ভিজিবে না !'- এ কথাও তাঁর চেয়ে কে ভালো বোঝে ? তাই শেষ পর্যন্ত আইন পাশ করালেন । রক্ষণশীল দেশে তৈরি হল এক অসম্ভবের সম্ভব হয়ে ওঠার ছাড়পত্র !

 

তিনি আজ থেকে ১৬২ বছর আগে বিধবাবিবাহ নিয়ে তাঁর তোলা অত্যন্ত আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত  ভাবনার বিচারে তিনি  একটি যুক্তি তুললেন , সেটি মেয়েদের যৌনতার অধিকার ! তিনি ' বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব ' দ্বিতীয় পুস্তক ১৮৫৫ সালের অক্টোবরে যখন প্রকাশ করলেন , সেখানে বিরোধী পক্ষকে উদ্দেশ্য করে লিখছেন - " ... তোমরা মনে কর, পতিবিয়োগ হইলেই, স্ত্রীজাতীর শরীর পাষাণময় হ ইয়া যায় ; দুঃখ আর দুঃখ বলিয়া বোধ হয় না ; যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা বলিয়া বোধ হয় না ; দুর্জ্জয় রিপুবর্গ এক কালে নির্মূল হইয়া যায় । কিন্তু তোমাদের এই চিন্তা যে নিতান্ত ভ্রান্তিমূলক, পদে পদে তাহার উদাহরণপ্রাপ্ত হইতেছ ।" আজ এই একুশ শতকের দু দশক পরেও বিধবাদের বিয়ে তো সমাজের একটি 'ফিসফিসে' খবর । এখনও কতজন পুরুষ বিধবাবিবাহে প্রস্তুত ?


পিতৃতান্ত্রিক সমাজ আজও এ ব্যপারে খাপ পঞ্চায়েতি ভাব নিয়ে চলে । আমরা একটু তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করলেই জেনে যাই । তাই, বিদ্যাসাগর মেয়েদের যে যৌন অধিকারের দিকে স্পষ্টভাবে আঙুল তুললেন । সামাজিকভাবে তা এখনও সমাজ  মেনে নেয় নি কাগজ কলমে ছাড়া । ঠিক এখানেই আমার কথা, যথার্থ মানবিক অনুভূতি যদি তীব্র হয়, তবে,পুরুষও পারেন নারীর বয়ানে নারী হয়ে কথা বলে যেতে । রবীন্দ্রনাথের 'স্ত্রীর পত্রে'র মৃণাল কি অজস্র নারীর বয়ান নয় ? কিংবা নষ্টনীড়ের  স্বামীসঙ্গ বঞ্চিত চারুলতার সঙ্গে অজস্র নারী কি একাত্মবোধ করেন না ?  আজও নারীর জৈবিক চাহিদা পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নেহাতই একটি  হাস্যকর বিষয় । আর কোনো নারী এ নিয়ে কথা তুললে, সে তো চরিত্রহীন নির্লজ্জ বাসনার কামুক জীব মাত্র !  যৌনতা পুরুষের একচেটিয়া সাম্রাজ্য । তবু, মুখ ফসকে বঙ্কিমের নারীও যখন বলে ওঠেন 'যদি জানিতাম বিবাহ দাসত্ব তবে বিবাহ করিতাম না' এ তো নারীর বয়ান ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না ! আজও সন্তানের জন্ম দেওয়া নারীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক মানে "তিন সন্তান ফেলে পরপুরুষের সঙ্গে গৃহবধূর পলায়ন " ইত্যাদি জাতীয় শিরোনাম ।
 

তসলিমা নাসরিনকে ছি ছিক্কার দিই সে তো মূলত এই কারণেই !  যৌনতা শুধু পুরুষের বাপের সম্পত্তি নয় , এতে নারীরও অধিকার - এই দাবি এত জোরালোভাবে তসলিমার আগে কেউ তোলে নি ! পুরুষ পরকীয়া করবে, এ প্রজাতির কবিরা কচি মেয়েদের নিয়ে ফষ্টিনষ্টি করলে তবেই তো কালজয়ী কবিতায় দেশোদ্ধার হয় ! কিন্তু তসলিমা কেন যৌনজীবনের কথা লিখবে ? তসলিমা লেখক নয়, ছাপিয়ে ওঠে তাঁর লৈঙ্গিক পরিচয় । তাই, লেখেই যদি তা এতো খুল্লাম খুল্লা লেখা কেন ? আমি তো খুব হতাশ হয়ে দেখি আমার প্রিয় কবি -প্রাবন্ধিক মল্লিকা সেনগুপ্তের মতো লেখকও এ বিষয়ে চূড়ান্ত নিন্দায় টগবগ করে ওঠেন ! ঐ দেখুন, পুরুষেরা শুধু নয়, নারীও নারীর বয়ানকে ঘৃণা করেন ! তাই মল্লিকাও তসলিমার নিন্দায় মাঠে নেমে পড়েন । আমার এক নারী কবিবন্ধু তো তসলিমার নাম উচ্চারণে বমি করে ফেলেন প্রায় । আসলে পিতৃতন্ত্র একটি বিশেষ চিন্তা, যাকে পুরুষের সঙ্গে নারীও বহন করেন । তাই, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মমতা নারী হলেও মৌলবাদীদের সামনে টুপি খুলে দাঁড়ান । তসলিমাকে দেশ ছাড়া, রাজ্যছাড়া করে তবেই ফেলেন স্বস্তির শ্বাস । 

তাই এলজিবিটি হোক শ্রমিক কৃষক নারী দলিত হোক - বিষয়টা হল অভিজ্ঞতা । সে পরোক্ষ হলেও । আর চাই  সংবেদনশীল সৎ মন । হ্যাঁ, সৎ হতেই হবে । রবীন্দ্রনাথ যে অসততা করতে পারেননি ! সততা খুঁজেছিলেন । তাই লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত কথাগুলি লিখেছিলেন  'ঐকতান' কবিতায় - " কৃষাণের জীবনের  শরিক যে জন / কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন, / যে আছে মাটির কাছাকাছি , / সে কবির- বাণী -লাগি কান পেতে আছি / ...সেটা সত্য হোক ; / যেন ভঙ্গি দিয়ে না ভোলায় চোখ । / সত্য মূল্য না দিয়েই সাহিত্যের খ্যাতি করা চুরি / ভালো নয় ভালো নয় নকল সে শৌখিন মজদুরি ।"  ভঙ্গি সর্বস্বতা নয়, শৌখিন মজদুরি নয় । একি শুধু সাহিত্যের বিষয় ? যে কোনো সামাজিক কাজেরই তো এ মূল কথা ! রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে 'চারিত্রপূজায়' লিখছেন, "স্ত্রীজাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের  বিশেষ স্নেহ অথচ ভক্তি ছিল । ইহাও তাঁহার সুমহৎ পৌরুষের একটি প্রধান লক্ষণ । সাধারণত আমরা স্ত্রী জাতির প্রতি ঈর্ষাবিশিষ্ট ; অবলা স্ত্রীলোকের সুখ স্বাস্থ্য স্বচ্ছন্দতা আমাদের নিকট পরম পরিহাসের বিষয়, প্রহসনের উপকরণ । আমাদের ক্ষুদ্রতা ও কাপুরুষতার অন্যান্য লক্ষণের মধ্যে ইহাও একটি ।" এখন মেয়েরা অবলা যুগ পার হলেও তার  যোগ্যতা দক্ষতা "প্রহসনের উপকরণ '' হয়েই কি নেই ? তাই কবিতা লিখে  মেয়েটি পুরস্কার অর্জন করলে,  পুরুষ কবিটি ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের ঢেউ তুলে বলেন , 'তা প্রেমিকরা কী বলল ?' এই অপমান তাচ্ছিল্য উপহাস শুধু নয় অজস্র মানসিক নির্যাতন শোষণ সাজানো আছে আজও । মেয়েদের পথে পথে সমাজ পাথর ছড়িয়ে রাখে ! তাই, তার লড়াই স্বতন্ত্র ভাষা দাবি করে । আর সে সব পাতার পর পাতা লিখে যাওয়া তথ্যবহুল গবেষণার বিষয় । এ ক্ষুদ্র  পরিসরে সে কথা বলা সম্ভব নয় । 


শেষ করব এই বলে, যে,  বিদ্যাসাগর সময়ের বহু বহু আগে জন্মেছিলেন । আর সে সময় আজও ছুঁতে পারলাম না আমরা । "বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও" শ্লোগান তার অকাট্য প্রমাণ । প্রতিদিনের সংবাদপত্র আমাদের হতাশ করে বৈকি ! অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে  মেয়েদের যৌনতার অধিকার এখনও এক দীর্ঘ পথ । বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি হয়ে ওঠার গৌরব এ দেশ অর্জন করতে পারেনি - এ সত্য কঠিন হলেও মানতে হবে ...

এই বিভাগের লেখা ও ভিডিও নিয়ে আপনার মতামত

ঈশানের যোগাযোগ

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 by Ishan Kotha. Site Developed by CHIPSS