কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

কন্যাদান কেন করাইনি

অপরাজিতা ভট্টাচার্য

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

সম্প্রতি শিলচরের একটি বিবাহে মহিলা পুরোহিত দিয়ে কন্যাদান বিহীন সম্পূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করা কে নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তারপর পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই মতামত দিয়েছেন, কলম ধরেছেন।

আমরা এই সংখ্যায় তুলে ধরলাম সেই পুরোহিত শ্রীমতী অপরাজিতা ভট্টাচার্যের জবানবন্দী...

Aparajita Bhattacharjee_edited.jpg

মানব জীবনের দশম বা শেষ সংস্কার বিবাহ। প্রতিটি সংস্কারের ক্ষেত্রেই এক একটি কর্মানুষ্ঠানের প্রয়োজন হয়। তাই বিবাহ নামের শেষ সংস্কারেও একটি কর্মানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

পুরোহিতের পেশাটা যুগ যুগ ধরে পুরুষ কেন্দ্রিক হয়ে চলে আসছে। বর্তমানে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ পুরুষ ব্রাহ্মণ সন্তানই এই কাজে রত আছেন। যেহেতু শাস্ত্র মহিলা ও শূদ্রদের বেদের অধিকার দেয়নি, তাই এই সমস্ত কর্মকাণ্ডে মহিলা ও শূদ্ররা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকেন।

কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। সমাজে পুরুষদের সাথে মহিলারাও শিক্ষিত এবং অর্থ উপার্জনে সক্ষম। কাজেই তাঁরা তাঁদের নিজেদের কর্মক্ষমতায় বা যোগ্যতায় এই পেশায় নিয়োজিত হতে পারেন। 'বেদ' শব্দের দ্বারা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক, ও উপনিষদ, এই চারটি সাহিত্য বোঝায়। বৈদিক সাহিত্য সংহিতার মন্ত্রসমূহের স্রষ্টা বহু নারী ঋষি। অন্যান্য সাহিত্যে বিহু রমণী অধ্যাপিকা, শিষ্যা, তপস্বিনী, ব্রহ্মচারিণী এবং ব্রহ্মবাদিনীর নাম পরিদৃষ্ট হয়। সংহিতা গুলিতে বেদ মন্ত্র সমুহের অনেক নারী স্রষ্টা অথবা ঋষির নাম উল্লেখিত আছে। তাঁদের কাছে অনেক বেদ মন্ত্র প্রকাশিত হয়েছিল। তাই মহিলারা বেদের অধিকার লাভ করেননি কথাটা সঠিক নয়।

 

বিবাহ পদ্ধতি ঋগ বেদের অন্যতম প্রধান নারী ঋষি সূর্যা দ্বারা রচিত। ঋগ বেদের দশম মণ্ডলের বিবাহ সূক্তে কন্যাদানের কোন মন্ত্র নেই। বিবাহ সূক্ত নারী ঋষি সূর্যার রচিত বলে মেয়েদের পৌরহিত্যেও কোন আপত্তি হতে পারেনা। 

বিবাহের বিভিন্ন প্রথা অঞ্চলভেদে বিভিন্নরকমের হয়ে থাকে। কন্যাদান বা ভাত-কাপড় সব রীতিই কন্যার ভবিষ্যত সুরক্ষার কথা ভেবে তৈরি হয়েছিল। সেই সময় বাল্য বিবাহ প্রথায় মেয়েদের কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হতো। সেই মেয়ের বিয়েতে মেয়ের বাবা, ভাই বা বয়োজ্যেষ্ট কেউ কন্যা সম্প্রদান করতেন এবং তাঁতে গৌরীদানের পুণ্যফল লাভ করার আশা থাকতো। 

এখন সরকার আইন করে বাল্যবিবাহ প্রথা রোধ করেছে। মেয়েদের শিক্ষা ও পিতৃসম্পত্তিতে অধিকার সাব্যস্ত করেছে। মেয়েরাও শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের আর্থিক স্থিতি সুরক্ষিত করেছে। এই অবস্থায় "কন্যাদান" শব্দের যৌক্তিকতা কোথায়? 

সম্প্রতি শিলচরের দত্ত রায় পরিবারের মেয়ে অনন্যার বিয়েতে আমার পৌরহিত্য করা এবং কন্যাদান না করা নিয়ে যে কথা উঠেছে, তাঁতে অনেকেই আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সৎসাহসের সঙ্গে ব্রাহ্মণ (শিক্ষিত) ও অগ্নিকে সাক্ষী রেখে দুটি হৃদয়কে একসূত্রে গেঁথে দেওয়ার যে প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তা অনেকের শুভেচ্ছায় সার্থক হয়েছে বলেই আমি মনে করি।