কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

দোলের গান

 

প্রদীপ নাথ

২১ মার্চ ২০২২

বরাক উপত্যকায় ও পূর্ব বঙ্গে প্রচলিত দোল উৎসবের গান নিয়ে লিখেছেন বিশিষ্ট কৌতুক শিল্পী এবং নাট্যকার প্রদীপ নাথ...  

Pradip Nath_edited.jpg

বসন্ত বাতাসে যাই গো, বসন্ত বাতাসে, (২)

বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ (২)

আমার বাড়ি আসে, সইগো বসন্ত বাতাসে

বন্ধুর বাড়ির ফুলের বাগান

নানান রঙের ফুল (২)

ফুলের গন্ধে মন আনন্দে (২)

ভ্রমর হয় আকুল, সই গো বসন্ত বাতাসে৷

বন্ধুর বাড়ি ফুলের টুঙ্গি

বাড়ির পূর্বধারে (২)

সেথায় বসে বাজায় বাঁশী (২)

মন নিলো তার সুরে, সইগো বসন্ত বাতাসে

মন নিল বাঁশীর ও গান

রূপে নিল আঁখি (২)

তাইতো পাগল আব্দুল করিম (২)

আশায় চেয়ে থাকে, সইগো বসন্ত বাতাসে

 

বসন্তের বাতাস মানে যৌবন। আকুলি বিকুলি করা বাতাস। মনে নানা রঙের প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়।

সিলেটি কথায় আছে “আইলোরে বসন্ত কাল, বুড়াবুড়ির উঠা ফাল”। বসন্ত বাতাস এমন মোহময়, তাতে শুধুমাত্র যুবক যুবাদের নয় এমন কি বয়স্ক মানুষের তন মন প্রাণে যৌবনের সঞ্চার হয়। যৌবন মানে সৃষ্টির আধার তাই যৌবন বড়ই সুন্দর, ভিন্নতর স্পর্শ। ভিন্নতর অনুভব মানুষকে সদাই তাড়িত করে। আর অনুভবের তাড়নাতেই মানুষ গান গায়। গান সম্বন্ধে বলতে গেলে আমরা জানি “কানু বিনে গীত নাই”। এই কানু মানে কানাই, ভগবান কৃষ্ণ নয়, আমাদের ঘরের ছেলে শ্যামরায়, অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ পরকীয়ার কারিগর। নিজের ঘরের যে নারী বা পুরুষের মধ্যে প্রেমিক বা প্রেমিকা সত্বার নাগাল আমরা পাইনা, মন খুঁজে বেড়ায় সত্যিকারের প্রেম সত্বা।

তাইতো বসন্ত বাতাসে বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমাদের বিভোর করে দেয়। নানা অছিলায় মানুষ তাঁর বন্ধুর সান্নিধ্য চায়। স্পর্শকাতর মন একটু স্পর্শের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। বসন্তের রঙের বাহারে তাঁর হাতে উঠে আসে রঙ। সেই রঙ রাঙিয়ে দিয়ে যায় প্রেমাস্পদকে। তার ধারে ধারে মানুষের পবিত্র কামনা বাসনা সমাজ স্বীকৃত হয়ে যায়। এরকমই সর্বজনীন রঙের উৎসব দোল। অনুকুল আবহাওয়ায় মানুষ পরস্পরকে রঙমাখানোর আছিলায় ভিন্নতর স্পর্শসুখে মেতে উঠে। ভজনা করে পরকীয়া মেয়ের দুই চরিত্র রাধেশ্যামেরা।

 

বর্গ নিরেপেক্ষ এই উৎসবে তাই জাগ যজ্ঞের বালাই নেই, কোন পুরোহিত বা ব্রাহ্মণের দরকার নেই, শুধুই নাম গান কীর্তন। এখনও প্রান্তিক এলাকার মানুষ খোল করতাল সহযোগে কীর্তনানন্দে মেতে উঠে। দোল নিয়ে প্রান্তিক পদকার অজস্র গান রচনা করেন।

ললিতা গো প্রানসই, এবসন্ত ঋতুতে আমার প্রাণকান্ত

আইল বসন্ত ফাল্গুন, তাতে ভ্রমরার গুনগুন,

পঞ্চম শরতে রাধার মন ব্যাকুল,

প্রেমানলে অঙ্গজ্বলে, ধান দিলে  হয় যেন

দারুণ সন্তের স্বর তাতে কোকিলার ভ্রমর

পঞ্চবানে বিষয়কে জ্বালায় নিরন্তর

বুদ্ধি বলো এগো সখী, বুদ্ধি বল সই?

দোল হয়ে ওঠে আনন্দের প্রতীক, সাম্যতার প্রতীক এবং অতি অবশ্যই নরনারীর সুপ্তবাসনা চরিতার্থ করার এক উৎসব যাতে কাম গন্ধ নাই তা এক্কেবারেই বলা যাবে না।

 

তবে আরেকটি দোল আছে। প্রান্তিকরা তা উদযাপন করেন। তাকে পুস্পদোল বলা হয়। বসন্তের দোলের সংগে সম্পর্ক না থাকলেও, বৈশাখী পূর্ণিমায় তা পালন করা হয়। এক কাহিনী আছে, নন্দালয়ে শ্রীকৃষ্ণ শয়নে ছিলেন। হঠাৎ বাইরে দৃষ্টি পড়তেই দেখেন এত সুন্দর জ্যোৎস্না। দেখে শ্যামবন্ধুর রাধিকা এবং সখীগণের সংগে বাহারী ফুল দিয়ে দোল খেলার ইচ্ছো জাগে। ভাবেন এই মনোরথ যামিনী রাধা বিনে তো সম্পূর্ণ হয় না। ছুটলেন বাঁশী হাতে নিকুঞ্জবনে। গিয়ে রাধার সাক্ষাৎ না পেয়ে উতলা হয়ে উঠলেন। অন্যদিকে শ্যামবন্ধুর এই মধুর প্রতীক্ষার মাঝে রাধিকা সখীবৃন্দ নিয়ে দর্শন দিলেন। সারারাত মনের আনন্দে চলল ফুলের হোলি।

 

এরকমই কুঞ্জবানিয়ে গ্রামের নারীগণ শ্রীকৃষ্ণ রাধা সাজিয়ে সারারাত গান সংগে ধামাইল নৃত্য করে থাকেন। অনেক অনেক গানের মধ্যে একটি গানের উল্লেখ এখানে করছি

চলে নিকুঞ্জ কাননে নাগর বংশীধারী

স্মরণ করিয়া চিত্তে প্রারের কিশোরী৷৷

একপদ চলে না শ্যাম মুখে রাধারাধা

শ্যামের দুমরণে বহে প্রেমধারা

রামেশ্বরী বিনেরে নাগর বনমালী

দ্রুতবেগে চলে যেন মত্ত্ব শ্রীহরি

তরুলতার প্রতি শ্যামে জিজ্ঞাসা করিলা

তারা নি দেখিয়াছে আমার প্রাণের ও কিশোরী

ধীরে ধীরে কুঞ্জবনে প্রবেশিল হরি

চৌদিকে নেহার করি না পাইলা বিশ্বেস্বরী

হায় হায় দীনবন্ধু বলে বংশীধারী

কোথায় গেলে পাইব আমার প্রাণের কিশোরী

আমার কথা ফুরোলো নটে গাছটি মুড়লো। যদিও কথা ফুরোয় না। সমস্থ পৃথিবীর বুকে সদা বসন্ত বিরাজ করুক।