কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

বসন্ত এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের উৎসব হোলি

অজয় সেনগুপ্ত

২১ মার্চ ২০২২

যোগাযোগ--9954719332

অজয় সেনগুপ্ত। প্রো-কানাই লাল চক্রবর্তী।

রিটায়ার্ড মেন্স কলোনী। লেন নং-5। পো-বদরপুর।  জিলা--করিমগঞ্জ। আসাম। পিন--788806

আমাদের দেশ ঋতু বৈচিত্রের সৌন্দর্যময়। ঋতু পরিরর্তনের সাথে প্রতি বছর বয়ে যায় প্রকৃতির নতুন নতুন পর্যায়। শীতার্ত প্রকৃতির ঘুম ভাঙিয়ে আসে ঋতু বসন্ত। চৈত্রের শেষ পযর্ন্ত  তার গৌরবময় অবস্থিত। এ সময় প্রকৃতি সত‍্যিই হয়ে ওঠে ঋতুরাজের রঙ্গশালা। প্রকতি যেমন নিজেকে রিক্ত করে বসন্তের সিংহাসন সাজিয়ে দিয়েছিল, তেমনই বসন্তও প্রকৃত রাজার মত প্রকৃতিকে আবারও নতুন রূপে সাজিয়ে দেয়।
         

বসন্ত মানেই হল দোলযাত্রা। দোলযাত্রা মূলত একটি হিন্দু- বৈষ্ণব উৎসব বলেই বিবেচিত হয়। তাহলেও সর্বধর্মের মানুষের সান্নিধ‍্যের মধ‍্য দিয়েই উৎসবের আসল প্রাপ্তি। এই উৎসবের আরএকটি নাম বসন্ত উৎসব।  শ্রী চৈতন্য  মহাপ্রভূর জন্ম এই পূর্ণিমা তিথিতেই, তাই তাকে গৌর পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়।
       

আবিরে ভেসে যাওয়া রঙের খেলা, বাঙালির  ইতিহাসে  শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীচৈতন‍্যদেব সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে বসন্তের এই পূর্ণিমা তিথিতে।

দোল উৎসবের প্রাণ কেন্দ্রে রয়েছেন রাধা-কৃষ্ণ। তাঁদেরকে দোলায় বসিয়ে পূজা করা হয়। 
         

ইতিহাস বলে,খ্রিস্টের জন্মেরও প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকেই হোলি উৎযাপিত হয়ে আসছে। এই উৎসবের উল্লেখ রয়েছে হিন্দু পবিত্র গ্রন্থ বেদ এবং পুরানেও।
         

ইংরেজরা প্রথম দিকে এই উৎসবকে রোমান উৎসব "ল‍্যুপেরক‍্যালিয়া" হিসেবেই মনে করেছিল। অনেকে আবার একে গ্রীকদের উৎসব"ব‍্যাকাপালিয়া" এর সঙ্গেও তুলনা করত।

 

পূরীতে দোলউৎসব ফাল্গুন মাসে প্রবতর্নের যে রেওয়াজ হয়, সেখান থেকেই বাংলায় চলে আসে এই সমারোহ।
         

বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রী কৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন‍্যান‍্য গোপীগণের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই নাকি দোল খেলার উৎপত্তি  হয়।


আবার কারো কারো মতে হোলি হচ্ছে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির উত্থানেরও ইতিহাস। কথিত আছে, এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অশুরকে বধ করেছিলেন। আবার কোথাও অরিষ্টিসুর নামে অসুর বধের কথাও পাওয়া যায়। অত‍্যাচারী অসুরকে বধ করার পর সবাই আনন্দে মেতে উঠে। অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির জয়ে মহানন্দে মেতে উঠে সবাই।

 

তাছাড়া আমরা দৈত‍্য রাজ হিলণ‍্যকিশপুরের কাহিনীও জানি। প্রহ্লাদ অশুর বংশে জন্ম নিলেও, পরম ধার্মিক ছিলেন। প্রহ্লাদকে হত‍্যা করবার জন‍্য হিরণ‍্যকিশপুরের নির্দেশে আগুনে ক্ষতি না হতে পাওয়া বর প্রাপ্ত বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করে। কিন্তু আগুনে প্রবেশ করা মাত্র বিষ্ণুর কৃপায়  প্রহ্লাদ অক্ষত থেকে যায়। ক্ষমতার অপব‍্যবহারের ফলে বরপ্রাপ্ত হোলিকার মৃত‍্যূ হয় বলে এই উৎসব হোলি নামে পরিচিতি পায়।
           

শান্তিনিকেতনেও বিশেষ ন‍ৃত‍্য-গীতের মাধ‍্যমে বসন্ত উৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময় থেকেই চলে আসছে। ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ ঠাকূরের হাত ধরেই উৎসবের যাত্রা শুরু হয়ছিল। তিনি তখন এর নাম করেছিলেন "ঋতুরঙ্গ উৎসব"। এখনো সেই ধারা অব‍্যাহত রয়েছে। 
             

এই উৎসব কাল, স্থান কিংবা প্রথা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে পৃথিবীর  প্রতিটি  প্রান্তে বসন্ত ছুঁয়ে যায় ভিন্নতায়। তাই বসন্ত উৎসব পালিত হয় রকম ফেরে। উৎসাহ এবং উদ্দিপনায় বসন্ত পালিত হয় পৃথিবীর  বিভিন্ন দেশে।
             

দোল বা হোলি ধর্মিয় অনুষঙ্গের আড়ালে থাকে এক সামাজিক অনুষ্ঠানও। যার সার্বজনীন আবেদন আছে। দোলযাত্রা ঊৎসবের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দিকও রয়েছে। এখন আর শুধুমাত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ‍্যে হোলি খেলা নয়,বরং সর্বধর্মের নারী-পুরুষের মধ‍্যেই রং খেলার প্রবণতা দেখা যায়।
           

যাইহোক রংয়ের খেলা হোলি কিংবা দোলে হৃদয়ে অফুরন্ত খুশির দোলা দেয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বসন্তকে রাঙ্গিয়ে দেন উৎসবের রঙে তাই আজও হোলি খেলার মাধ‍্যমে প্রেমের বার্তা পৌঁছে যাক চারিদিকে। রঙে রঙে রাঙ্গিয়েদেই আমাদের মনের আকাশ। আমাদের মনের দরজা খুলে রবীঠাকুরের সুরে সুর মিলিয়ে হোলির রং যেন আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।


"ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল,লাগলো যে দোল
স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল
দ্বার খোল, দ্বার খোল।"