কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

বাঙালির বসন্ত

২১ মার্চ ২০২২

মতামত তুলে ধরেছেন...

রবি শঙ্কর ভট্টাচার্য,

জয়া ভাওয়াল,

ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য,

এবং

চন্দ্রিমা শ্যাম

রবি শঙ্কর ভট্টাচার্য (অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, কবি)

ফাল্গুন শুক্লপক্ষ পূর্ণিমা তিথি  নিয়ে বসোন্তৎসব। বাঙ্গালি সমাজে এ উৎসব পালিত হয়ে আসছে বহু যুগ ধরে। তার সম‍্যক উজ্জ্বল নিদর্শন পাই  বিশ্বভারতীর শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে। আবীর খেলার সঙ্গে চলে সঙ্গীত নৃত‍্যের মহোৎসব। না না, শুধু এ অঞ্চলে নয়, দোলোৎসবের প্রচলন উত্তর ভারতের প্রতিটি রাজ‍্যে। রবিঠাকুর তাঁর "হোরিখেলা" কবিতায় হোরিখেলার বিবরণ দিয়েছেন প্রাঞ্জল ভাবে।যা বলতে চাই, তাহল বরাক উপত‍্যকার হোলি উৎসব, যেখানে চা বাগান এক মূখ‍্য ভূমিকা পালন করে আসছে। শিশুকাল থেকে চা বাগানে আমার বিচরণ। বাগানের শ্রমিকদের (যারা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, বাঁকুরা, পুরুলিয়া বা সাঁওতাল পরগনা থেকে আগত) মধ‍্যে দুটো উৎসব বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য, এক দূর্গাপূজা, দুই হোলি বা দোল। আরো একটা উৎসবে ওরা মাতোয়ারা, পৌষ সংক্রান্তির টুসু পূজা। ঐ সময় ওরা বাবুদের বাড়ি গিয়ে গান বেঁধে চাঁদা আদায় করত। কয়েকটা গান এখনো কানে বাজে, "ওগো ওগো চাঘর বাবু তোর তো বড় নাম শুনি, হাজার টেকা বেতন পেয়ে চার আনা বকশিশ দিলি, হামরা লাজে মরি" বা "কে বইলেছে কে বইলেছে ডাক্তরবাবু মইরেছে, আঞ্জির গাছে হেলান দিয়ে তামুক খেতে বইসেছে"।

 

এই পরিবেশে আমাদের বড় হয়ে ওঠা। দূর্গাপূজা ও হোলির সময় কয়েকদিন বাগানের কাজকর্ম বন্ধ থাকত। হোলির উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল লাঠিখেলা। পূজার পর থেকে তার মহড়া চলত নিয়মিত। নানা রকম রঙ্গীন কাপড়ে সজ্জিত সাত/আট জন যুবকের লাঠিখেলা ছিল সত‍্যি দর্শনীয়, নাচের সঙ্গে গান থাকত যেখানে দেহাতি ছাড়াও ফিল্মী গান জায়গা করে নিত। বাড়ির উঠোনে ওদের নৃত‍্যগীত আমরা উপভোগ করতাম প্রাণভরে। এই স্মৃতি আমাদের মনে এখনো অমর হয়ে আছে।

জয়া ভাওয়াল (কবি ও সংস্কৃতি কর্মী)

রুক্ষ, কঠিন, জরাজীর্ণ শীতের পরই মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমীর দিন থেকে শুরু হয় 'বাঙ্গালির বসন্ত', যৌবনোচ্ছল 'ভেলেনটাইন'।নবপল্লবরাজি ও নানা রঙের ফুলসমাহারে সজ্জিতা প্রাণোচ্ছল প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে বসন্ত ঋতুবৈচিত্র সমন্বিত নাচে, গানে, কবিতায়, আনন্দ উৎফুল্লতায় পূর্ণ প্রকাশ বাঙালির বসন্তের। ফাল্গুনের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমায় প্রেমের অবতার রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মদিন কে সামনে রেখে আনন্দ উৎফুল্লতায় সারা বছরের সকল মান অভিমান ভুলে পারস্পরিক মধূর সম্পর্কের মাধ্যমে আগামী নতুন বছরের সূচনা করাই বাঙালির বসন্ত উদযাপন।

ইন্দ্রাণী ভট্টাচার্য (সংবাদ কর্মী, সমাজ কর্মী ও সংস্কৃতি কর্মী)

আমাদের ছোটবেলার শিক্ষা আর এখনকার শিক্ষার মধ্যে  বিস্তর ফারাক। আমরা  পুঁথিগত বিদ্যায় বাংলার ছয় ঋতুর নাম, সাত বারের নাম, বার মাসের নাম, তিথি-পক্ষের নাম শিখে বেড়ে ওঠেছি : যা এখনকার বাচ্চাদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। সে যাই হোক, আমরা জানতাম ফাল্গুন-চৈত্র দুইমাস বসন্ত  কাল। আর যথনই কোকিল ডাকা শুরু করবে তখনই অলিখিত ভাবে বসন্তকাল আসবে...


আজও এভাবেই বসন্ত আসে। শীতের কুয়াশার চাদর আস্তে আস্তে সরে গিয়ে বাসন্তীর আবেশ ছড়িয়ে দেয় প্রকৃতি। পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙের যৌবনের আবেশে রাধা কৃষ্ণের ফাগের খেলা চলে।


বসন্ত মানেই রাধা কৃষ্ণের হোলির সাথে প্রতিটি বাঙালির মন আষ্টে পৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। আমাদের বাঙালি জীবনে তাই হোলির সাথে বসন্ত কাল এক অপরিহার্য ঋতু, ভালোবাসার ঋতু। এই ঋতুতে ফুল ফুটে, নতুন গাছের পাতা গজায়, নতুন গাছের জন্ম হয়। এর ফলে গাছপালা বেড়ে উঠে, ফুল ও ফলের পরবর্তী বেড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাতাসে শোনা যায় ঝড়া পাতার নিক্কণ ধ্বনি।


..... কিন্তু  রুক্ষ শীতের আবেশ নিয়েও যখন বসন্ত জাগ্রত দ্বারে আসে তখন আমাদের চির প্রেমিক মন রঙিন হয়ে ওঠে। তাই তো রবীন্দ্র নাথের ভাষায় বলতেই ইচ্ছে করে —

প্রেমের জোয়ারে ভাসাবো দোঁহারে, বাঁধন খুলে দাও .....

চন্দ্রিমা শ্যাম (চিত্রশিল্পী)

বাঙ্গালির বসন্ত শুরু হয় বসন্ত পঞ্চমী থেকে। বসন্ত পঞ্চমী আজকের বাঙ্গালির Valentine's Day। 

 

বসন্ত পঞ্চমীতে আমার জন্ম তাই বসন্ত আমার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। আর বাঙ্গালির বসন্ত উৎসব তো রবি ঠাকুর ছাড়া অপূর্ণ।

 

বসন্ত ঋতুর বাইরের চেহারা উৎসবের কিন্তু অন্তরে বসন্ত বৈরাগী। একদিকে নতুন ফোটা ফুলের পাতা, আরেকদিকে শুকনো পাতা ঝরা ফুলের খেলা। 

 

বসন্ত বাতাসে - উদাসী সুর - 

"আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি

ফাগুন প্রাতের উতলা, চৈত্র রাতের উদাসী,

তোমার পথে আমরা ভেসেছি"