কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

বাবার পূজা গানে গানে

আগমনি ও বিজয়া গান : বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদের অন্যতম ভান্ডারী আমাদের বাবা

 

সঞ্জীব দেবলস্কর

Sanjib Deb Laskar.jpg

ইদানীং কলকাতাভিত্তিক কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের দৌলতে আমরা কিছু আগমনি গান শুনতে পাই যে গানগুলো আজ থেকে সত্তর আশি বৎসর আগেই বাবা গাইতেন। বিভিন্ন সংগীত সংকলন গ্রন্থ, গবেষণা নিবন্ধতে মাঝে মাঝে এসব গানের পদ মুদ্রিতও দেখা যায় সামান্য পাঠান্তর নিয়ে। মূলত বৈঠকী চালের এ গানগুলো বেহাগ, ভীমপলশ্রী, বিভাস, ভৈরবী রাগ এবং সে সঙ্গে কীর্তনাঙ্গে বাঁধা। কথা, সুর, তালের নিবিড় সমন্বয়ে এ গানগুলো যদিও এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নির্মাণ, তবুও বাবা গানগুলোকে ক্রমান্বয়ে সাজিয়ে নিয়েছিলেন। এতে যখন কিছু কথা, ভাষ্য সংযোগ করে পরিবেশন করতেন তখন এর মধ্যে একটি কাহিনির আদলও গড়ে উঠত। শ্রোতারা হিমালয়ে মা মেনকা এবং গিরিরাজের উপাখ্যান, কৈলাশে দুর্গা ও শিবের সংসারের চিত্র, স্বামী পুত্র কন্যা সহ পার্বতীর পুজো পিতৃগৃহে যাত্রা– এ নিয়ে সামগ্রিকভাবে একটি পারিবারিক কাহিনির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতেন। আবার একই সঙ্গে পারিবারিক সঙ্কীর্ণ গন্ডি ছাড়িয়ে এ হরগৌরী লীলা আরও একটি গৃঢ়তর, ভিন্নতর তাৎপর্যে উদ্ভাসিত হত, এটা বোদ্ধা শ্রোতা তো বটেই, সাধারণ শ্রোতারাও উপলব্ধি করতে সক্ষম হতেন। যারা বাবার কণ্ঠে ভাষ্য সহ এসব গান শুনেছেন তাঁরা গভীর ভাবে এটা অনুভব করতে পারবেন।

আশ্চর্য লাগে ভাবতে, গ্রামকাছাড়ের এই প্রত্যন্ত প্রান্তে, যেখানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তির কোন স্পর্শ লাগেনি সে সময়, যখন এদিকে তথাকথিত আধুনিকতার ছোঁওয়াও লাগেনি, তখনই চর্চিত হত অসাধারণ সব শাক্তপদ যে পদগুলোর যৎসামান্যই সংকলিত হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দ ও বৈষ্ণব চন্দ্র বসাক সংকলিত “সঙ্গীতকল্পতরু” (১২৯৪ বঙ্গাব্দ), অমরেন্দ্র নাথ রায় সম্পাদিত “শাক্ত পদাবলী” (১৯৪২), অরুণ কুমার বসু সম্পাদিত “নব শাক্ত পদাবলী” (২০০১), এবং এ যাবৎ প্রকাশিত বাংলা গানের সর্ব বৃহৎ সংকলন, দুর্গাদাস লাহিড়ি সম্পাদিত “বাঙালির গান” (১৯০৫, পুনর্মুদ্রণ ২০০১, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলিকাতা) প্রভৃতি গ্রন্থে৷ গানগুলো হারিয়ে যাবে এই আশঙ্কায় “বাড়ির পুজো” ১৪১৫ সংখ্যায় এর কিছু পদ মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল৷ যাদবপুর বিশ্ববিদযালয়ের অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস মহাশয় এ পদগুলো পাঠ করে নিজস্ব মতামত জানিয়েছেন পত্রয়োগে৷ গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, মালদহ এর বাংলা বিভাগের প্রধান, আমাদের অন্যতম পারিবারিক শুভাকাঙ্ক্ষী বিকাশ রায়ও এ পদগুলোর ঐতিহাসিক, ভাষিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্য অপরিসীম— একথা বলেছেন৷ তবে এ প্রসঙ্গ আপাতত থাক্৷

আমরা ছোটোবেলা থেকেই বাবার আগমনি গান শুনে আসছি। বাবা বলেছেন তিনি এসব গান উত্তরাধিকার সূত্রেই পিতা, পিতৃব্য, জ্যেষ্ঠা ভগ্নি এবং অন্যান্যদের থেকেই পেয়েছেন। তবে শুধু পাওয়াটাই বড় কথা নয়, এ গানগুলোর সাংগীতিক সম্ভাবনার পূর্ণ সদ্ব্যবহারও করেছেন তিনি। বিভিন্ন সূত্র থেকে,— কলকাতার রঙ্গমঞ্চ, কলের গান, স্বদেশি আন্দোলনের পর্বে সহযোগী শিল্পীদের থেকেও আহরণ করেছেন এবং সবকিছুর মধ্যে একটি শৈল্পিক স্পর্শ দিয়ে উত্তরণ ঘটিয়েছেন নিজস্ব মহিমায়, যেখানে পরিবেশন-শৈলির সঙ্গে আধ্যাত্মিক চেতনার ঘটেছে সংমিশ্রণ। বাংলা ভক্তিসংগীতে, বিশেষ করে আগমনি গানে বাবার এ নিজস্ব সংযোজন বাংলা গানের ইতিহাসে স্থান পাবার যোগ্য। রামকৃষ্ণ মিশনের অন্যতম সংগীতবোদ্ধা সন্ন্যাসী মহারাজ সৌম্যানন্দ ১৯৪৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শ্রীহট্ট থেকে বাবার কাছে লেখা একটি চিঠিতে অকুণ্ঠ চিত্তে প্রায় এরকম মনোভাবই প্রকাশ করেছেন। স্বামীজি বাবাকে সিলেট রামকৃষ্ণ মিশন সেবা সমিতিতে গিয়ে সংগীত  পরিবেশনের আমন্ত্রণ জানিয়ে ওই চিঠিতে লিখেছেন—

শিলচরে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণদেবের জন্মোৎসবোপলক্ষে আপনার স্বরচিত ও সুবিন্যস্ত পদকীর্তন শ্রীশ্রী গৌরীলীলা শুনিয়া খুবই আনন্দিত হইয়াছিলাম। দক্ষযজ্ঞ, গৌরীলীলা ইত্যাদি বিষয়ে কীর্তন এই অঞ্চলে বোধ হয় প্রথমে আপনিই আরম্ভ করেন। বহুকাল পুষ্ট আমাদের ভাবধারা আপনাদের চেষ্টায় রূপায়িত হইয়াছে। আমার বিশেষ ইচ্ছা এই সব দেবীলীলা রহস্য দেশে দেশে প্রচারিত হয়...'

এ চিঠিতেই যতীন্দ্রমোহনের দেবীলীলা অর্থাৎ আগমনি গানের মধ্যে যে একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল এর পরিচয় রয়েছে৷

শরতের শুরুতে, বলা চলে আশ্বিনের একেবারে সুচনায়ই< যখন মর্ডপে খড়বিচালির উপর মাটির এিটি মাত্র আস্তরণ পড়েছে, এরকম সময়ই আগমনির গান শুরু হয়ে যেত৷ গিরিরানির মন উমার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে, এরকম একটি শব্দ গিরিশ ঘোষের রচনা, আমাদের প্রাণে এসে বিঁধত৷ বাবা গাইতেন—

কুস্বপন দেখেছি গিরি, উমা আমার শ্মশানবাসী

অসিত বরণা শ্যামা মুখে অট্ট অট্ট হাসি।।

এলোকেশি বিবসনা মা যে আমার শবাসনা

ঘোরাননা ত্রিনয়না ভালে শশাভে বালশশী।।

যোগিনী দল সঙ্গিনী ভ্ৰমিছে সিংহ বাহিনী।

হেরিয়া রণরঙ্গিনী মনে বড় ভয়বাসী।।

বাবা ভাষ্য করতেন– পার্বতীর রণরঙ্গিনী মূর্তি ভেসে উঠেছে মা মেনকার স্বপ্নে কিন্তু তাঁর কাছে পার্বতী যে কোলের কন্যা। যে কোনো বাঙালি গৃহবধুরই এ কামনা, মেয়ে আসুক পিতৃগৃহে। মা স্বপ্ন দেখেছেন যে মেয়ে অনুযোগ করছে তাঁর কাছে। এরকম একটি অসাধারণ পদ –

শুন শুন, গিরিবর।

রজনী প্রভাতে স্বপন দেখিনু

উমা আসিয়াছে ঘর।

উমা আসিয়া, শিয়রে বসিয়া

কহিছে কাতর স্বরে

‘বরষ উতরি গেলা গো জননী

নিলেনা আমারে ঘরে, মা, ।

ভুলে কি গিয়েছ মোরে

রানি গিরিরাজকে স্বপ্নের বিবরণ দিচ্ছেন–

কহিলাম আমি, “শোন, মা ভবানী,

তব তরে নয়ন ঝরে।

আগে না বুঝিয়া, মায়াতে মজিয়া

দিয়েছি ভাঙেড়া বরে

তাই মোর নয়ন ঝরে।।”

এরপর এল স্বপ্নভঙ্গের পালা৷ এতক্ষণ সমস্ত ঘটনাই ঘটেছে স্বপ্নে৷ রাণি এবার জেগে উঠেছেন, স্বামীকে কাতর হয়ে বলছেন—

জাগিয়া উঠিয়া, উমা না দেখিয়া

হয়েছি কাতর অতি,

সহেনা সহেনা বিরহ যাতনা

আন মোর হৈমবতী, যাও আন মোর উমা সতী৷৷

এসব পদের মধ্যে যে কী নাটকীয়তা আর মায়াবী সুরের করুণ মূর্ছনা রয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না৷

এমনই আরেকটি গানে উৎসবের সাজে সজ্জিত পৃথিবী, তার নিসর্গ এবং নরনারী নিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে৷; রাণি মেনকার দৃষ্টি দিয়েই শরতের প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন পদকর্তা৷ গানটি সংগ্রহ করেচিলেন বাবা— 

যাও কৈলাসে, ওহে গিরিরাজ

আনিতে উমারে ঘরে।।

(আমি) নতুন বসন, নতুন সিঁদুর রেখেছি উমার তরে।।

নবীন ধান্য শ্যাম দূর্বাদলে

বরণ করিয়া আনিব উমারে

পল্লব নীরে মঙ্গল ঘট

দুয়ারে রাখিব ধরে।।

তারই আগমনি— আভাস আজিকে

লেগেছে উষার শিরে,

তারই অঞ্চল দোলাটি এলায়

কাশবন নদীতীরে।

শ্বেত শুচি বাস পরে পুরনারী

তরু মর্মরে আলাপন তারই

মোর উমা যে গো জগতের মা

আন তারে ত্বরা করি,

যাও আন তারে ত্বরা করি।।

 

এদিকে যখন গিরিপুরে প্রস্তুতি প্রায় সম্পূ্র্ণ, ওদিকে কৈলাসে উমার প্রাণেও সাড়া লেগে গেছে৷ উমাও মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করছেন পিত্রালয়ে নিয়ে যেতে—

পঞ্চঋতু হ’ল গত

শরৎ আগত।।

দুখিনী জননী বুঝি

কাঁদিতেছে অবিরত।

মায়ে আমা-হারা হয়ে

বাঁচে কী পরাণ লয়ে

আমি মা’র একা তনয়ে।

আমা বিনে সবই হত।।

যদি তোমায় সঙ্গী পাই

মায়ে দেখিবারে যাই

একাকিনী যেতে না চাই।

যাবে চল ভোলানাথ।।

দেবীপক্ষের শুরু থেকে একেবারে সপ্তমীর প্রভাতবেলা – এ সময়ের মধ্যে আগমনি গান উপচে পড়ত আমাদের সারা বাড়িতে। জীবনটা ছিল সুস্থির, সংহত, আগমনির গানে গানেই তখন এসে যেত ষষ্ঠীর সন্ধ্যা —

অনুমতি চাহে উমা, পশুপতি চরণে

বিদায় দাও তিন দিনের জন্য

যাইব পিতৃভবনে।।...

আর সেই বহুপ্রতীক্ষিত সপ্তমী তিথি এলে, যে গানটি সবার কণ্ঠে উঠত তা হল–

 শারদ সপ্তমী ঊষা

গগনেতে প্রকাশিল।

দশ দিশি আলো করে,

দশভুজা মা আসিল।

আকাশে বাতাসে শেফালির গন্ধ, পূর্বাকাশে লাল সূর্য, পূজামণ্ডপে শঙ্খ ঘন্টা ধ্বনি, চণ্ডীপাঠ– এরই মধ্যে এ গান যেন এক স্বপ্নলোকের পরিবেশ রচনা করত। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, সপ্তমী তিথিতে এসে আগমনি গানের সমাপ্তি ঘটত। অষ্টমী নবমীতে দুর্গাস্তুতি, শ্যামা সঙ্গীত, মালসি, ঠাঁট, চৌতালা, শ্রীরামচন্দ্রের অকালবোধন এসবই হত৷ আর নবমীর শেষে রাতের জন্য নির্ধারিত ছিল আরেক প্রস্থ বিষাদ মাখানো গান, যাকে বলা হয় “বিজয়া”৷ আগমনি গান প্রসঙ্গে আলোচনা করলে “বিজয়া” গান অনুক্ত থাকতে পারে না৷ নবমীর আনন্দ শেষ হতে না হতেই শোন যেত রাণি মেনকার বিলাপ— “নবমী নিশি পোহালে, উমা আমার যাবে চলে”, “কাল নবমী নিশি কেন রে পোহাইলো”, “যেও না নবমী নিশি”, “তোমায় নিতে আইল ভোলানাথ বৈরাগী, ওমা কোথায় যাবি”৷ এ গান গাইতে গাইতে বাবা সহ সবাই চোখের জলে ভাসতেন৷ তবে বাবা এসব গানকে সেই মাত্রায় নিয়ে যেতে পারতেন না যদি না তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র জগদীন্দ্রনারায়ণ, ভাগিনেয় রঞ্জিৎকুমার স্বামী, ভগিনী স্মৃতিকরা দত্ত রায়, ভ্রাতুষ্পুত্রী বীরাপাণি কর, বন্ধু ধীরেন চক্রবর্তী এবং অন্যান্যদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতা না পেতেন৷ শিলচর রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের উৎসাহ ও আশীর্বাদও তাঁকে এগিয়ে যাবার প্রেরণা দিয়েছিল, তা অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখে না৷