কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

॥          তৎসম হ্যাংওভার           ॥
বানান সমতা বিধানের গতিরোধক

শান্তনু গঙ্গারিডি

Shantanu Gangaridi.jpg

বাংলা বানান প্রমিতকরণ ও সমতাবিধানের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৩৬-এ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক করা বানানই আমরা একটু আধটু এদিকসেদিক করে এখনও ব্যবহার করছি।

ভাষাতত্ত্ববিদরা বলে থাকেন, বানান এসেছে ব্যুৎপত্তিগত যুক্তিতে, বানান কোন খোকার হাতের মোয়া নয়। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দে উইলিয়াম বুলোকার লিখিত প্যামফ্লেট ফোর গ্রামার বইটিকে প্রথম ইংরেজি ব্যাকরণ বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। বুলোকার সাহেব ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইংলিশ গ্রামারকে ল্যাটিন গ্রামারের নীতি নিয়মে চলতে হবে। অর্থাৎ, প্যামফ্লেট ফোর গ্রামার-টা আসলে লাতিন ভাষায় লিখিত লাতিন গ্রামারের বিধি নিষেধ ইংরেজি ভাষায় চাপিয়ে দেবার প্রচেষ্টা ছাড়া বিশেষ কিছু ছিল না।

এই ঘটনার প্রায় দু শ বছর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভেন্ট নাদেনিএল ব্রাসী হলহেড সাহেব ১৭৭৮ সালে বাংলা আখরে একটি বাংলা ব্যাকরণ লেখেন-- যাকে বঙ্গাক্ষরে লিখিত সংস্কৃত ব্যাকরণ বলে উল্লেখ করেছেন অভিধানকার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস। হাজার হাজার বাংলা শব্দের সংস্কৃত মূল ঢুঁড়ে বের করা ছাড়া বাংলাভাষার প্রতি এই পুস্তকটি সুবিচার করতে পারেনি।

প্রকৃত পক্ষে বাংলাভাষায় ব্যবহারিক ব্যাকরণ ও অভিধানের পথপ্রদর্শক হলেন মানুএল দ্য আসসুম্পসাঁউ (Father Manoel da Assamção) নামক পর্তুগিজ পাদরি। তখন ছাপাখানায় বাংলা ছাপার হরফ চালু না হওয়ায় পুরো বইটি রোমান হরফে লেখা হয়েছিল। ১৭৪৩ সালে প্রকাশিত বইটির নাম: Vocabulario em idioma Bengalla e Portuguez সেটাতে অন্তর্ভুক্ত Breve compendi da gramatica Bengala -কে প্রকৃত বাংলা ব্যাকরণের মর্যাদা দেয়া হয়। বইটির প্রকাশক Francisco da Silva, লিসবন।

বিভিন্ন কার্যকারণে এই বই নিয়ে আলোচনা খুব কম হয়। ইংরেজ রাজকর্মচারি হলহেড সাহেব যেখানে সুললিত সংস্কৃত শব্দে বাংলা ব্যাকরণকে সালাংকারা করে তুলেছিলেন পর্তুগিজ পাদরি মানুএল যে সেই পথে হাঁটার চেষ্টাই করেননি। পূর্ব বাংলার ভাওয়ালে বসে সেই জেস্যুইট ফাদার মেনুএল কী ধরনের বাক্য গঠন করেছিলেন দেখা যাক:

aixo pola, tomi quetta = আইশো পোলা, তুমি কেটা? (এস ছেলে, তুমি কে?)

এছাড়া maia মেয়ে kāwā কাক kela কলা ketha কাঁথা bokri ছাগল kaitor কবুতর dadi দিদিমা , salam সালাম guna পাপ এই সকল শব্দ দিয়ে পরিপূর্ণ সেই ব্যাকরণ উচ্চ শিক্ষিত বর্ণ হিন্দু বাঙালির মুখে রোচে বলুন! [ এখানে মনে রাখতে হবে তখনও মান্য চলিত বাংলা বা প্রমিত বাংলা ধারণাটা ভবিষ্যতের গর্ভে।]

বস্তুত ষোড়শ শতকের শেষ দিকে থেকে জেস্যুইট যাজকরা প্রভু যীশুর বাণী প্রচারের জন্য বাঙালির মুখের ভাষায় গদ্য রচনা শুরু করেছিলেন। কেউ লিখেছেন পুব বাংলার মুখের ভাষায়, কেউ হয়তো হুগলির ভাষায়। দুঃখের বিষয় হাতে লেখা সেই সব প্রচার পত্রগুলোর অধিকাংশ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এক আধখানার অস্তিত্ব থাকলেও ভুলে যাওয়া হয়েছে।

আমরাও জানি অনেকেই বলবেন, আরে মশাই, এ সকল যাবনিক বাংলা তো ভুলে থাকাই উচিত।

 

বাংলা ভাষায় আগ্রহী ছাত্ররা জানেন, বুৎপত্তি প্রতিপত্তির কার্যকারণে ও কল্যাণে বানান সংস্কার মোটেই নিরীহ ব্যাপার নয়। 

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম (ভাষা গবেষক এবং শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বানান সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনায় বলছেন, "বাংলায় উচ্চারণানুগ বানান-স্কুলের বিপরীতে ব্যুৎপত্তি-স্কুলের বিবাদ বহু পুরোনো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানবিধিতে শেষোক্ত স্কুল অংশত পিছু হটলেও নানা উপলক্ষে তারা আসর গাড়তে চায়। এটা উনিশ শতকীয় কলোনিয়াল রোগের প্রকাশ। মনে রাখতে হবে, কয়েক শ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহৃত বানানের ঐতিহ্য আর কোনো ‘মূল’ ভাষার ‘মূল’ শব্দের অনুকরণে বানান প্রমিতকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। আমাদের বেশির ভাগ আলোচক এই মূল্যবান সূত্রটি গুলিয়ে ফেলেন। [ প্রথম আলো, ১০জুলাই ২০২০]। 

আলোচনা যত দ্রুত এগোবে আমরা বেশ বুঝতে পারব যে সিংহভাগ ভাষা শিক্ষকরা বুৎপত্তি পথের পথিক। 

অধ্যাপক পবিত্র সরকার লিখছেন, "বাংলার উদ্ভব ও অর্ধতৎসম শব্দে নতুন বানান-নীতি নির্ধারণের মূল সমস্যাটি আর একবার স্মরণ করি তা কতটা ব্যুৎপত্তিকে স্বীকার করবে, আর কতটা ধ্বনিসংবাদী হবে এই হল প্রশ্ন। ধ্বনিসংবাদী হতে হলে বানানে সাধারণভাবে দীর্ঘ ঈ দীর্ঘ ঊ বা তার কারচিহ্ন, ঐ বা ঔ এদের কার চিহ্ন লেখা চলবে না, তার বদলে হ্রস্ব ইকার হ্রস্ব উকার বা এদের চিহ্ন, রি/র-ফলা - এই, ইত্যাদি লিখতে হবে। এতো গেল স্বরবর্ণের কথা। বাঞ্জনবর্ণেও ঞ, মূর্ধন্য ণ, য, যুক্তব্যঞ্জন বা (বিদেশি শব্দ ছাড়া) দন্ত স, য, বিসর্গ ইত্যাদির ব্যবহার হবে না, ---কারণ এই সবগুলি উচ্চারণ বাংলা ভাষায় হয় সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়েছে, না হয় দু-একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আংশিত বজায় আছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কারের সবচেয়ে বড়ো প্রতিবাদী দেবপ্রসাদ ঘোষ এইখানেই সবচেয়ে তীব্র আপত্তি করেছিলেন। তাঁর আপত্তির যুক্তিগুলি তুচ্ছ করার মতো নয়, সব কথা তাঁর অসংগতও ছিল না। ব্যুৎপত্তি ও বিবর্তিত রূপের মধ্যে একটা শারীরিক সাদৃশ্য থাকলে শিশুর পক্ষে ধরতে সুবিধা হয়। 'হীরক'-এ দীর্ঘ ঈকার ছিল বলেই 'হীরা" বা "হীরে'’-তে দীর্ঘ ঈকার রাখার জন্য সুপারিশ করা হলে তা হঠাৎ অগ্রাহ্য করা যায় না। 'হিরা' 'নিলা' যাঁরা লেখেন তাঁরা 'পুজো' 'মুলো'-র দৃষ্টান্ত তুলে বলেন, এখানে তো হ্রস্ব উ-কার চলছে, তবে "হিরা"-তে হ্রস্ব ই-কার চলবে না কেন? এ কথাটাও অসংগত নয়। তবে এখানেও লক্ষ করি, গোড়ায় উ-কার আমরা যত সহজে গ্রহণ করেছি দীর্ঘ উ কারের বদলে, দীর্ঘ ঈকারের সরিয়ে হ্রস্ব ই-কারকে অত সহজে মেনে নিতে পারিনি।..." [বাংলা বানান সংস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনা: চ্যাপ্টার ৫. তদ্ভব ও অর্ধতৎসম শব্দের বানান]

 

তবে এই আলোচনায় আমরা দেখতে পাব আমাদের বানান সংস্কারকরা আসলে "এক যাত্রায় পৃথক ফল" সূত্র মেনে চলতে ভাল বাসেন এবং এই দ্বিচারিতার পক্ষে নানা ধরনের যুক্তিজাল বিছিয়ে দিয়ে নিজ নিজ সিদ্ধান্তকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেন।

একটি বিধি বা নিয়ম সব নাগরিকের জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য হলে আইনের ভাষায় সেটাকে কমন ল বলা হয়। অপর দিকে সম্প্রদায় ভেদেও কিছু কিছু আইন কানুন থাকে সেগুলোকে পার্সোনাল ল বলা হয়। ভারতের মতো দেশে উত্তরাধিকার বিবাহ ইত্যাদি সীমিত কিছু কিছু বিষয় পার্সোনাল ল মোতাবেক পরিচালিত হয়ে থাকে।

বাংলাভাষার অভিভাবকেরা বাংলা শব্দের ভাঁড়ারকে দুটি মূল শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। তাঁদের মস্তিষ্ক প্রসূত এই বিভাজনের নাম: সংস্কৃত শব্দ এবং অসংস্কৃত শব্দ। 

সংস্কৃত শব্দের একটি আকর্ষণীয় নাম রয়েছে: তৎসম। মানে সংস্কৃতভাষার সমান। মোদ্দাকথা, যেগুলো সংস্কৃত শব্দ ছিল এবং যে শব্দের কোনো রকম পরিবর্তন হয়নি তারাই তৎসম শব্দ। (এখানে মনে রাখতে হবে বাঙালির নিজস্ব ধ্বনিতে সেই সংস্কৃত শব্দ সমূহের উচ্চারণ বদলে গেছে।)

তৎসম শব্দের বিন্দুমাত্র হেরফের হলে সে রাজ্যচ্যুত জাতচ্যুত হয়ে অনার্য ম্লেচ্ছ হয়ে যায়।

চোখের শান্তি মনের শান্তি তথা জ্ঞানের শান্তির পক্ষে বাঙালি ভাষাতত্ত্ববিদদের যাবতীয় উচ্ছ্বাস। তাই কেউ উচ্ছাস লিখলে চোখ কট কট করে, লজ্জা লাগে।

বানান যত কঠিন হয় খটোমটো হয় তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রলোকদের তত লাভ। জ্ঞানী পণ্ডিতেরা যাকে তাকে করুণার চোখে দেখার সুযোগ পেয়ে জান।

মনোজকুমার দ. গিরিশ লিখছেন, "বাংলায় আমরা যেন বরং বানান বিভ্রান্ত হতেই চাই, তাই হাজার রকম গোলমেলে সব ব্যাপার করে রেখেছি। কোথায় যে ই এবং ঈ-কার হবে তা নিশ্চিত করে বলা বেশ কঠিন কাজ। এমনকী পণ্ডিতেরা আলোচনা করেও ঠিক করতে পারছেন না, চিন হবে নাকি তা হবে চীন। আর এতেই পণ্ড হয়ে আছে এর বানান (মস্করা করে লোকে বলে, যঃ পণ্ডতি সঃ পণ্ডিতঃ) সংস্কৃতে নাকি চীনাংশুক বলা হয়েছে তাই এর বানান হবে চীন। অন্যেরা বলছেন চিন একটি বিদেশি শব্দ তাই তার বানান হবে চিন। সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষক কথা বলেছেন অরুণ সেন, তিনি বলেছেন, যে-শব্দকে কোনো অভিধানে তৎসম বলা হয়েছে, সেই শব্দকেই হয়তো অন্য অভিধানে তদ্ভব বা এমনকী কখনো বিদেশী বলে গণ্য করা হয়েছে  (বানানের অভিধান:বাংলা বানান ও বিকল্প বর্জন একটি প্রস্তাব-- অরুণ সেন। প্রতিক্ষণ, ডিসেম্বর, ১৯৯৩, পৃঃ-৫২)। 

[ সূত্র: বাংলা বানান-- এক হউক,  এক হউক,  এক হউক। Bangla Basa]।

 

বৌ’-এর জায়গায় ‘বউ’ বানান প্রস্তাবে সুনীতিকুমারও মন্তব্য করেছিলেন, ‘এ কেমন বৌ? মাথায় ঘোমটা নেই!’ তবু আমাদের মেনে নিতে হবে বিভ্রান্তি নিরসনের জন্য একটিমাত্র বানান প্রচলনের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন প্রজন্ম এই বানান শিখবে এবং পাঠে ও ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। 

 

[১]  লবন সত্যাগ্রহ

 

বাংলার নুন খেয়ে সংস্কৃতের গুণ গাওয়া বাঙালি ভাষাবিদদের ফতোয়া: তৎসম শব্দের বানান বদলাবে না। যাবতীয় সরলীকরণ টরন সব যাবনিক শব্দের জন্য।। লোনা লিখতে পারো। লোনা ইলিশ খেতে পারো। কিন্তু লবণ লিখতেই হবে। লবন অবৈধ।

ওঁরা ভুলে যাচ্ছেন যে হাজার বছর হল, বাঙালি মূর্ধন্য-ণ উচ্চারণ করতে ভুলে গেছে। তবু ন লেখা যাবে না, ণ দিয়ে লবণ বানান লিখতে হবে। পাঠশালার বিদ্যার্থীদের তৎসম শব্দ নামক একগুচ্ছ শব্দকে তোতাপাখির মতো মুখস্থ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

লবন বানান বৈধ করার দাবিতে ডান্ডি অভিযান ছাড়া উপায় নেই। লবন সত্যাগ্রহের মাধ্যমে তথাকথিত তৎসম শব্দের বেড়াজাল ছিন্ন করতে হবে।

আবার বলছি, কেন এই ডান্ডি অভিযানের প্রয়োজন? কারণ, সংস্কৃত শব্দ লবণ --যাকে আমরা লবন বলে উচ্চারণ করি সেটার সংস্কৃত উচ্চারণ সবটাই আমরা ভুলে গেছি। 

আমরা ধরতেই পারি না যে এই তিন অক্ষরের লবণ বানানটিতে দুই দুইটি বর্ণের পুরোপুরি বাংলায়ন হয়ে গেছে। আমরা যখন ণ নিয়ে মাথা ঘামানোয় ব্যস্ত তখন ভুলে যাচ্ছি লবণ শব্দের মধ্যবর্তী বর্ণটা অন্তঃস্থ-ব। 

বাংলা লিপি তৈরির কোন এক মুহূর্তের বাংলার অন্তঃস্থ-ব বর্গীয়-ব এর রূপ নিয়ে নিয়েছিল এবং তারপর থেকে (আহ্বান, জিহ্বা-র মতো দুয়েকটা শব্দ বাদে) বাঙালি আর অন্তঃস্থ-ব উচ্চারণ করে না। সব ব বর্গীয় ব।

লবণ শব্দটির সংস্কৃত लवण  (যদি দেবনাগরীতে লিখি)। মানে বাংলায় লওড়ঁ বা ঐ রকম কিছু বলতে হবে। এখন আমরা লোনা লিখি। আগে লোণা লেখা হতো কারণ মূল শব্দ লবণ। তারপর তদ্ভব বলে লোনা বৈধতা পেল। 

সংস্কৃতর আদি উচ্চারণের সঙ্গে বাঙালির লবণের বিন্দুমাত্র মিল নেই। তবু আমাদের পণ্ডিতরা লবণ-কে ছাড়তে রাজি না। লবণকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা লাবণ্য-তে ণ উপস্থিত। 

লবন-এর মতো নেহাত আটপৌরে বানানকে তদ্ভব বলে ছাড়পত্র দিয়ে বাঙালির জীবন সহজ সরল করাটা কি খুব বাজে কাজ বলে বিবেচিত হবে?

 

 

[২] পঙক্তি ভোজ না ডাবল ডোজ় 

 

এমন এক সময় ছিল যখন হিন্দু বিবাহ অন্নপ্রাশন এমনকি শ্রাদ্ধাদিতেও পঙক্তি ভোজনের স্ট্রিক্ট নিয়মাবলি ছিল।

সর্ব প্রথম বিপ্রগণ অন্ন গ্রহণ করতেন। তারপর বৈদ্য কায়স্থ বৈশ্য চণ্ডাল ইত্যাদি। শেষোক্তরা এক সময়ে খাদ্য গ্রহণ করলেও আলাদা আলাদা পঙক্তিতে আসন নিতে হতো।

আমার এই লেখাটা অবশ্য সেই পঙক্তি ভোজন নিয়ে না। আমি বাংলা বানান সরলীকরণে বা সমতাবিধানে তৎসম এবং অতৎসম বিভাজন নিয়ে বলছি। তৎসম শব্দ বাদে বাকি শব্দগুলোর বানান সরলীকরণের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাঙালির উচ্চারণের দীর্ঘ স্বর নেই বলে হ্রস্ব-করণ করা হয়েছে। 

অদ্ভুত ব্যাপার, যাঁরা এই কাজটা করেছেন তাঁরাই কিন্তু তৎসম শব্দগুলোতে হাত দিতে চাইছেন না। একে বারে নট নড়ন চড়ন নট কিচ্ছু! তৎসম শব্দ মানে অবিকৃত সংস্কৃত শব্দ। সেই তৎসম শব্দরাজি ভায়া পালি বাংলায় গৃহীত হয়ে বাঙালির নিজস্ব স্বরে উচ্চারিত হবার পরেও নাকি ঐ সকল তৎসম শব্দের চ্যাস্টিটি রক্ষার দায়িত্ব বাঙালিকে অনন্তকাল ধরে বহন করে যেতে হবে! অন্যান্য ম্লেচ্ছ যাবনিক শব্দের ছোঁয়া বাঁচাতে সংস্কৃত থেকে আসা তৎসম শব্দকে আলাদা পঙক্তিতে বন্দি করে রেখেছেন ওঁরা।

পবিত্র সরকার মহাশয় বাংলা বানান সংস্কার : সমস্যা ও সমাধান- বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, "তবে পাঠকদের কাছে খোলাখুলি বলি, বানান যেমন একজন লোক সারাজীবন ধরে শেখে, তেমনই সারাজীবন ধরে সিদ্ধান্ত নেয় এ সম্বন্ধে। এ ভূমিকা লিখতে গিয়েই দেখছি, বই ছাপতে ছাপতে কিছু বানান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আমার বদলে গেছে। ‘খ্রিষ্ট’, ‘খ্রিষ্টাব্দ’ সুপারিশ করেছি বইয়ে, কিন্তু সমতার খাতিরে এখন ‘খ্রিস্ট', খ্রিস্টাব্দ’-ই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। নিজের গোঁ নিয়ে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়।" 

আমরা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করি  পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বানান অভিধানে কৃষ্ণ কেষ্টঠাকুরই থেকে গেছেন। কেশ্ট বা কেস্ট ঠাকুর লিখে বাংলা বানানে সমতা বিধানের কোনো আলাপই সেখানে নেই। একেই বলে হিন্দু পুনরুত্থানবাদিদের গোঁ।

 

বাংলা বৈয়াকরণিকদের এই সংস্কৃত ভক্তি শেষ হবার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে সদর দপ্তরে কামান দাগা ছাড়া আর পথ নেই।

 

[৩] মজাদার খেলা ভান্ডা-ফুট 

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি শব্দ নিয়ে তুলকালাম চলছে। আনন্দবাজার পত্রিকা কিছু দিন থেকে "ভান্ডার" লিখছে। এই নিয়ে যাবতীয় সমস্যা। শব্দটা যদি তৎসম হয় তবে ভাণ্ডার হবে। না হলে ভান্ডার। 

বাংলাভাষার তাবড় তাবড় পণ্ডিতরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আলাপ আলোচনা করে / পুঁথিপত্র  ঘাঁটাঘাঁটি করেও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি।

ভাষাতত্ত্ববিদ পবিত্র সরকার লিখছেন:

"মুশকিল হল সুকুমার সেন প্রমুখেরা সংস্কৃত ভাণ্ডাগার থেকে এসেছে বলে নির্দেশ করেছেন।  তাই তদ্ভব ধরে আনন্দবাজার, এমনকি অন্যরাও ভান্ডার লেখে।  কিন্তু পরে দেখা গেছে যে, সংস্কৃত অভিধান মনিয়ের উইলিয়াম্সেও 'ভাণ্ডার'  (মূর্ধন্য ণ-এ ড-এ) আছে। অর্থাৎ সংস্কৃতে দুটোই প্রাপ্য, দুটোই তৎসম।  কাজেই মূর্ধন্য ণ ড-ই চলা উচিত।" আরো অনেক জ্ঞানীগুণীজন এই বিষয়টিতে নিজের নিজের মতামত দিয়ে চলেছেন। তবে হ্যাঁ, সৌভিক ঘোষালের মতো একজন অন্তত প্রশ্ন করেছেন, "মূল প্রশ্নটার তাতে কি আদৌ কোনও সমাধান হল? 

সংস্কৃতে এল কোথা থেকে?  রুটটা কী? ইন্দো ইউরোপীয় অন্য ভাষায় সম শব্দ মিলছে? না অস্ট্রো এশিয়াটিক/ দ্রাবিড় উৎসগত মনে হচ্ছে?  অস্ট্রো এশিয়াটিক / দ্রাবিড় থেকে সংস্কৃতে এলে তাকে দেশি শব্দের নিরিখে বিচার না করে তৎসম শব্দের নিরিখে বিচার করার কোনও কারণ থাকে কি?" 

এত কিছুর পরেও কেউ কিন্তু তৎসম শব্দ নিয়ে এই অহেতুক মাথা ঘামানো থেকে বিরত থাকতে রাজি না। বাংলায় বিলুপ্ত এই সংস্কৃতমুখী মূর্ধন্য ণ রক্ষণাবক্ষেণের পুরো দ্বায়িত্বটা যে তাঁদের! 

 

প্রসঙ্গত মনে পড়ল। শীতের বনভোজনে এক ধরনের খেলা হয়। ভান্ডা-ফুট খেলা। কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে দেবার পর নির্দিষ্ট দূরত্বে রাখা একটি ভান্ডকে ডান্ডা দিয়ে ফাটিয়ে দিতে হয়। 

ভাণ্ড প্রকাণ্ড প্রচণ্ড ষণ্ড মুণ্ডু শব্দাবলীতে ণ রক্ষার জন্য তাঁদের এই ব্যাকুল প্রয়াস এই ভান্ডা ফাটানোর মজাদার খেলাকে মনে করিয়ে দিল।

 

হাজার বছর আগে বাঙালি ণ-র প্রকৃত উচ্চারণ বিস্মৃত হয়েছে। বাঙালির জিহ্বা ও কণ্ঠে ণ ধ্বনি ন-র মতোই উচ্চারিত হয়। বাংলা বানানে ণ রাখার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ থাকতে পারে না।

ভাণ্ডার শব্দ নিয়ে নিজেদের ভান্ডা-ফুট হয়ে যাবার পরেও বাঙালি পণ্ডিতবর্গ নিজেদের গর্ব ছাড়তে রাজি না।  

কোমলমতি বাঙালি বিদ্যার্থীদের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই। ওদের ঘাড়ে অনাবশ্যক মূর্ধন্য ণ চেপেই আছে।

 

একটু খেয়াল করে দেখুন। আলতা বা আলতো উচ্চারণ করার সময় আমরা যে ল বলি সেটা দন্ত্য-ল। আবার, উলটা শব্দটা বলার সময় জিভ কিছুটা উলটে যায় তাই না। দ্বিতীয় ল-টা মূর্ধন্য-ল।

বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় মূর্ধন্য-ল রোজকার ভাষায় ব্যবহার করা হয়। যেমন, দেবনাগরী লিপিতে ळ রয়েছে যা মরাঠিভাষায় নিত্যসঙ্গী। তামিল এবং কন্নড় ভাষায়ও মূর্ধন্য-ল রয়েছে। তামিল নামটির শেষ ল মূর্ধন্য -ল। 

বাংলায় একটা ল দিয়ে কাজ চালাতে বাধা না থাকলে একখানা ন দিয়েও কাজ চালানো সম্ভব।

আমার এই লেখায় যাঁদের কিছু যায় আসে না তাঁরা অবশ্য ব্যাকরণ-কৌমুদীর পাতা খুলে দেখিয়ে দেবেন "গিরিনদী" লিখছি সেটাই বেশি, আসলে তো "গিরিণদী" লিখতে হয়। তাঁরা বলবেন দেখো ঈর্ষা বানানটা কত সহজ করেছি। পুঁথি ঘেঁটে দেখিয়ে দেবেন, আসলে ঈর্ষ্যা লেখা উচিত ছিল।

 

[৪]  পিঁজরাপলে বন্দি বাংলা শব্দ 

 

বাংলা একাডেমি-ঢাকা, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এমনকি আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীও বাংলা বানান সংস্কারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এসেছে। 

ইতিমধ্যেই দেশি বিদেশি শব্দগুলোর হ্রস্ব-করণের কাজ শেষ হয়েছে। পরিতাপের ব্যপার, অনেকটা এগিয়ে যাবার পর এই তিনটি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাকি বানান সংস্কার করতে গিয়ে তাদের সংস্কারে লাগছে। এতদিনের মেনে আসা বিশ্বাস ও ভক্তিতে আঘাত করে কেউ আর মহাপাতক হতে চাইছেন না।

একগুচ্ছ বাংলা শব্দকে যুক্তি বুদ্ধিহীন ভাবে তৎসম বলে চিহ্নিত করে পিঁজরাপল বদ্ধ গোমাতার স্ট্যাটাস দিয়ে রেখে দিয়েছেন এঁরা।

তাঁরা বেমালুম ভুলে গেছেন যে আমাদের মাতৃভাষা সংস্কৃত ভাষা থেকে আসেনি। বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃত পালি থেকে। বাঙালির শব্দ উচ্চারণ পালি প্রভাবিত। সংস্কৃতভাষা আমাদের বাংলাভাষার অতি অতি অতি বৃদ্ধ প্রমাতামহী বা প্রপিতামহীও না।

 দুঃখের কথা হল আমাদের বৈয়াকরণিকেরা এবং অভিধান রচনাকারেরা সেই পালি সংযোগকে সম্পূর্ণ রূপে ভুলিয়ে দিয়ে প্রতিটি বঙ্গজ শব্দের মূল খুঁজতে গিয়ে গোবলয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেটার খেসারত বাঙালি দিয়ে চলেছে। বাংলা ব্যাকরণ তৈরি হলেও কার্যত সেটা সংস্কৃত ব্যাকরণই রয়ে গেছে।

 

এই মুহূর্তে বাঙালি ভাষাতত্ত্ববিদরা তৎসম শব্দের হ্রস্ব-করণ করার বিপক্ষে অনড় অজর অবস্থান নিয়েছেন। 

বাংলা ভাষাকে আধুনিক ভাষা, সহজ বোধ্য সরল ভাষায় পরিণত হওয়া থেকে বিরত রাখার কাজে এঁদের ক্লান্তি নেই।

আগে পাখী লেখা হতো। এখন পাখি লেখা হয়। কারণ, বাঙালি দীর্ঘ স্বর উচ্চারণ করে না। যে পণ্ডিতরা এই কথাটা বলেন তাঁরাই পর মুহূর্তে পাল্টি খেয়ে বলে উঠেন: "পক্ষী লিখিতে হইবে কারণ উহা তৎসম শব্দ"। হাতি ঠিক কিন্তু হস্তীর দীর্ঘমেদ কমাতে রাজি হচ্ছেন না।

যে বাঙালি ছেলেটির নাম উজ্জ্বল সে নিজেদের নাম উচ্চারণ করে উজ্-জোল। কিন্তু তাকে নাকি উজ্জ্বল লিখতেই হবে। হিন্দিওলারা শব্দটাকে উজ্ওল উচ্চারণ করে। সংস্কৃতেও তাই। 

আরেকটি শব্দ উচ্ছ্বাস। ব-ফলাটা অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয়। বাঙালি উচ্-ছাশ বলে। সংস্কৃতে উচ্ছ্-ওয়াস। তবু আমাদেরকে নাকি সংস্কৃত বানানটাই লিখতে হবে। 

উচ্ছ্বাস শব্দের বানান নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকা ব্যবহার বিধির বই "বাংলা কী লিখবেন কেন লিখবেন"-এ লেখা আছে: "ব-ফলার কথা মনে রাখুন। ওটা বাদ না যায়। কাগজে মাঝে মাঝে 'উচ্ছাস' দেখা যায় তাই সতর্ক থাকা দরকার।"

উজ্জ্বল বানান নিয়ে লেখা হয়েছে: "ব-ফলা এক্ষেত্রে জরুরি। কলকাতার একটি সিনেমা হলের নামের বানানে ব-ফলা নেই, কাগজে কিন্তু থাকাই চাই।"

বুঝুন, কতটা অন্ধ হলে এবং চরম সংস্কৃত ভক্তি থাকলে এরকম যুক্তিহীন বিধি রচনা সম্ভব। বাঙালি তো অন্তঃস্থ ব লিপিটাই গিলে ফেলেছে। জিহ্বা আহ্বান ইত্যাদি দু চারটা শব্দ ছাড়া বাঙালির কথায় অন্তঃস্থ ব উচ্চারণ নেই। আমাদের ভাষাতত্ত্ববিদেরা তবু জেদ ছাড়তে রাজি না।

বৌদ্ধধর্ম ও প্রাকৃত পালিভাষার সরাসরি প্রভাবে আমাদের ভাষা ও উচ্চারণ রীতি গড়ে উঠেছিল। শক্ত ভিতের উপরেই দাঁড়িয়ে ছিল। পরবর্তী কালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের উত্থানের পর উচ্চবর্ণের জ্ঞানীগুণিরা মাটির কাছাকাছি থাকা বাংলা ভাষার সংস্কারের মহান দ্বায়িত্বটা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এঁরাই প্রাকৃত পালিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে বাংলা বানানকে সংস্কৃত অনুসারী করে তোলেন। তবে এটাও লক্ষ্যণীয় যে এত কাঠখড় পুড়িয়েও এঁরা বাঙালির মুখের জবান বদলাতে পারেননি। উচ্চারণ পরিবর্তন করতে পারেননি। 

আপামর বাঙালিকে তৎসম নামক এক অদ্ভুত অযৌক্তিক অযোনিসম্ভূত কৃত্রিম বানানের শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত করে রেখেছেন এই সব পণ্ডিতেরা।

 

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখতে পাই ১৮৭৮ সালে শ্যামাচরণ গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন, বাংলা শব্দে দীর্ঘ স্বর নেই। মূর্ধন্য ণ নেই, য নেই, ম-ফলা য-ফলা ব-ফলা একেবারেই সংস্কৃতের মতো উচ্চারিত হয় না। তিনিও অবশ্য দীর্ঘ দিনের সংস্কার ত্যাগ না করে "তৎসম শব্দগুলো যেমন লেখা হচ্ছে তেমন হোক" বলেছিলেন। সেই সঙ্গে এটাও বলেছিলেন যে "বাকি শব্দে আমরা বাংলার উচ্চারণ প্রকৃতি মেনে বানান লিখব"।

১৮৭৮ থেকে ২০২১, মানে ১৪৩ বছর। সেদিনের অবস্থানেই থেকে গিয়ে তৎসম ব্যতিরেকে বাকি শব্দের বানান সংস্কার করেছেন আজকের সংস্কারকেরা। তথাকথিত তৎসম শব্দের বানান সরলীকরণ নিয়ে এক চুল এগিয়ে যাবার কথা ভাবতে পারছেন না বাঙালি ভাষাবিদরা।

 

পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাবার পর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ "শোজা বাঙলা"-র কথা চিন্তা করতে পেরেছিলেন। প্রস্তাব রেখেছিলেন, যদিও বাস্তবায়িত হয়নি।  

আজকের পণ্ডিতেরা তৎসম শব্দের রক্ষাকর্তা সেজে চোখ ঢাকা কলুর বলদের মতো একই বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছেন।

বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের ওপর এক ধরনের মানসিক নির্যাতন চলছে।

বাংলাভাষায় ব্যবহার করা সব শব্দ বাংলা শব্দ --এই ভাবনা থেকে সকল উৎস্যজাত শব্দের বানানে একই বিধি তৈরি করে সমতা বিধান করাই আশু লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সজনীকান্ত দাস লিখেছেন, "সাহেবরা সুবিধা পাইলেই আরবী-পারসীর বিরোধিতা করিয়া বাংলা ও সংস্কৃতকে প্রাধান্য দিতেন, ফলে দশ পনের বৎসরের মধ্যেই বাংলা গদ্যের আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হইয়াছিল।" 

সংস্কৃত কলেজে বাইশ বছর পড়িয়েছেন জয়গোপাল তর্কালঙ্কার। তিনি পারসীক অভিধান লিখে তাতে ২৫০০ যাবনিক বা ফার্সী শব্দের জায়গায় সংস্কৃত শব্দ যোগ করে মহান কাজ ছিলেন! এরপর তাঁর হাতে তৈরি হল ‘বঙ্গাভিধান’। তিনি খোলাখুলি ঘোষণা দিলেন, "ইহাও উচিত হয় যে সাধুলোক সাধুভাষা দ্বারাই সাধুতা প্রকাশ করেন। অসাধুভাষা ব্যবহার করিয়া অসাধুর ন্যায় হাস্যাস্পদ না হয়েন।"  শুধু জয়গোপাল না। এই ভাষাশুদ্ধি মিশনে আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় প্রায় সকল পণ্ডিতবর্গ নিজের নিজের কন্ট্রিবিশন রেখেছিলেন।

কৃত্তিবাস ওঝা কাশীরাম দাশ সৈয়দ আলাওল রামপ্রসাদ সেন ভারতচন্দ্ররা যে সাহিত্য রচনা করে গেছেন তাতে সংস্কৃত এবং অসংস্কৃত বা যাবনিক শব্দ বলে কোনও বিভাজন ছিল না। সব ছিল বাঙালির বাংলা শব্দ। এত ঐতিহ্য থাকার পরেও একটা সময়ে এসে বর্ণহিন্দু পণ্ডিতদের হাতে পড়ে বাংলাভাষার শুদ্ধিকরণ হয়ে গেল। চিরদিনের বাংলা শব্দের এক বিরাট অংশকে তৎসম বানিয়ে বানান বদলে দেয়া হল।

এর ফলে বাঙালির পাঠ্যপুস্তক এমন ঘরাণায় তৈরি হোল যে মুহম্মদ শহিদুল্লাকে আফশোস করতে হচ্ছে, “আমাদের শিশুগণকে প্রথম হইতেই রাম শ্যাম গোপালের গল্প পড়িতে হয়। সে পড়ে গোপাল বড় ভাল ছেলে। কাসেম বা আবদুল্লা কেমন ছেলে, সে তাহা পড়িতে পায় না। এখান হইতেই সর্বনাশের বীজ বপিত হয়। তারপর সে পাঠ্যপুস্তকে ---- হিন্দু মহাজনদিগের আখ্যানই পড়িতে থাকে। স্বভাবতঃ তাহার ধারণা জন্মিয়া যায়, আমরা মুসলমান ছোট জাতি, আমাদের মধ্যে বড় লোক নাই। এই সকল পুস্তক দ্বারা তাহাকে জাতীয়ত্ববিহীন করা হয়। হিন্দু বালকগণ ঐ সকল পুস্তক পড়িয়া মনে করে , আমাদের অপেক্ষা বড় কেহ নয়। মোসলমানেরা নিতান্ত ছোট জাত। তাহাদের মধ্যে ভাল লোক জন্মিতে পারে না। এই প্রকারে রাষ্ট্রীয় একতার মূলোচ্ছেদ করা হয়।"

 

 

[৫] পণ্ডিতিয়া বাংলা এক শুঁয়ো পোকার স্বপ্ন 

 

আমার আপনার পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে স্বপন নামধারী বাঙালির অভাব নেই। স্বপন নামের ছেলেটিকে পাঠশালায় ভর্তি করার সঙ্গে সঙ্গে বা অক্ষর জ্ঞান হবার সঙ্গে বুঝিয়ে দেয়া হয় "বাবা শপোন তোমার নামটার শুদ্ধ বানান শিখে নাও: স-এ ব-ফলা স্ব প দন্ত-ন মিলে স্বপন!"

এই ছেলেটিকেই পরে আরেকটা উচ্চারণ শিখতে হয়। হিন্দি বা ইংরেজিতে "সওয়োপন" বলে নিজের পরিচয় দিতে শেখানো হয়।

অথচ সেই ছেলেটি যদি হাতেখড়ির দিন নিজের নাম সপন লিখতে শিখত তাহলে এই সমস্যা হতো না। তৎসম শব্দের সম্মান রক্ষার জন্য স্বপন নামের বাঙালি যুবকদের ৯৯.৯৯৯% এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। 

যে জ্ঞানীগুণী পণ্ডিতেরা বাংলা দাপিয়ে স্বপ্ন স্বপন বানানের ফতোয়া দিয়ে রাখেন বাংলার বাইরে গেলেই বাঙ্গালীবাবুর হিন্দি উচ্চারণ নিয়ে খিল্লি খেয়ে হজম করেন। না জানেন হিন্দিতে স্বপন উচ্চারণ না আসে গণেশ উচ্চারণ। পাণ্ডিত্যের গণেশ উল্টে মানে মানে ঘরে ফিরে আসেন।

ণত্ব ষত্ব বিধি মেনে চলা হিন্দিভাষায় কিন্তু সপন / সপনা মান্য শব্দ। 

सपन - संज्ञा। पुलिंग देशज। उदाहरण - सुनि सिय सपन भरे जल लोचन । भए सोचबस सोचविमोचन । - मानस, 2 ।225 ।

অনেক হিন্দিভাষি নিজের নামের বানান সোজাসাপ্টা सपन লেখে থাকেন। ০.০০১ শতাংশ বাঙালি সপন বানানে নিজেকে উপস্থাপন করেন না।

আকাদেমি বানান অভিধানে (২০০৯) স্বপ্ন সম্বন্ধীয় ৬৪ টি শব্দ রয়েছে। মহাপাতক হবার আশংকায় সপন বা সপ্ন বানান রাখাই হয়নি। তবে সবাই তো আর এরকম নয়। আমরা দেখতে পাই জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর বাঙ্গালাভাষার অভিধানের পাতায় দুটো সপন-কে জায়গা করে দিতে কুণ্ঠা বোধ করেননি। ১ম সপন মানে ৬ পণ। ২য় সপন মানে স্বপ্ন। এই ২য় সপন-এর পাশে সপ্ন শব্দটাকেও স্থান দিয়েছেন। সংস্কৃত স্বপ্ন-এর অপভ্রংশ হিসেবেই সপন এবং সপ্ন-কে অভিধান ভুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু হে বাঙালি, সৎসম শব্দের স্বপ্নচারী আজকের ভাষাবিদরা মাটির সোঁদাগন্ধ থাকা দেশজ সপন ও সপ্ন শব্দ দুটোকে বেমালুম হাফিশ করে উড়িয়ে দিয়েছেন। 

অনুচ্চারিত ব-ফলার ভার বহন করে চলেছে বাঙালি।

 

[৬]  কি করিতে হইবে

 

১৭৭৮ সালে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড সাহেব আ গ্রামার অফ বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ নামে যে বইটি প্রকাশ করে ছিলেন সেখানে যথা সম্ভব প্রতিটি বাংলা শব্দের সংস্কৃত উৎস খুঁজে বের করা হয়েছিল। পরবর্তী কালপর্বে বাঙালি পণ্ডিতবর্গ সেই গ্রন্থটিকেই আকর গ্রন্থ ধরে নিয়ে আঁকড়ে বসেছিলেন এবং এখনো বসে আছেন।

 

শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস মহাশয়ের অভিধানের একটি সংস্করণের মুখবন্ধ লিখতে গিয়ে সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত বলেছেন: "হলহেড ১৮৭৮ খৃষ্টাব্দে যে প্রথম বাংলা ব্যাকরণ লিখেন তাহা সংস্কৃত ব্যাকরণেরই অনুগামী। বাংলা ভাষা যে সংস্কৃত ভাষা হইতে উদ্ভূত তাহা মানিয়া লইলেও ইহার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, নিজস্ব শব্দগঠন প্রণালী আছে, ইহার মধ্যে বহু দেশজ শব্দ প্রবেশ করিয়াছে, বিদেশী ও অন্য দেশী ভাষা হইতে ইহা বহু শব্দ গ্রহণ করিয়াছে ও করিতেছে। সংস্কৃত হইতে যে সকল শব্দ ইহা গ্রহণ করিয়াছে তাহাদের অর্থেও নিজস্ব মোড় দিয়া দিয়াছে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলা সংস্কৃতেরই অধীন ছিল। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কলেজে বাংলা পড়াইতেন সংস্কৃতের অধ্যাপকেরা এবং স্কুলে সংস্কৃত পড়াইতেন হেডপণ্ডিত আর বাংলা পড়াইতেন তাঁহারই অনুগামী সেকেণ্ড-পণ্ডিত। খাটি বাংলা ব্যাকরণ ও খাটি বাংলা অভিধান রচনার ভার যাহাদের উপরে পড়ে তাঁহারা এই কাজের জন্য কোন দিক্‌ দিয়াই প্রস্তুত ছিলেন না।" [৩১ অক্টোবর ১৯৭৮]

 

বাঙালি মাত্রেই আত্তা বলি। পশ্চিমবঙ্গীয়রা আঁত্তা উচ্চারণ করেন। আত্তা শব্দটা পালি থেকে বাংলায় এসেছে এবং বাংলার পলিমাটির মানুষের মুখেও আত্তা উচ্চারণ মান্যতা পেয়েছে। কিন্তু আত্তাকে আত্তা বানানে লিখলে আমাদের জ্ঞানীগুণিজনদের আত্তারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যায়। আত্তঘাতী বাঙালির ছেলেপুলেদের তাই একই শব্দের দুই ধরনের উচ্চারণ শিখে নিতে হয়। পাড়ার বিশ্বাসবাবু নিজেকে বিশ্শাশ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। হাফ সাহেব বা হিন্দিওলাদের কাছাকাছি এলে এই ব্যক্তিই মিস্টার বিশওয়াস হয়ে যান। সাধে কী আর আজকালকার ছেলেমেয়েদের মুখে শুধু মহাৎমা গান্ধী শোনা যায়। মহাত্তা উচ্চারণ উঠে যাচ্ছে। তৎসম বানানের বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে গিয়ে বাঙালির নতুন প্রজন্মের ভাষা হিন্দি হিন্দি হয়ে যাচ্ছে। বাংলা ভাষা শিক্ষার আড়ালে কোমলমতি বিদ্যার্থীদের দ্বিচারিতা শেখানোর এই জড়ভরত পদ্ধতির অবসান না হলে বাঙালির বিপন্ন অস্তিত্ব বিপন্নই থাকবে।

হাত হাতি মাথা পাতা পাথর ছাতা তামা শব্দগুলো সরাসরি পালি হত্থ হত্থি মত্থ পত্ত পত্থর ছত্ত তাম্মা থেকে এসেছে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদি / বর্ণবাদি ভাষাবিদরা বলবেন, ওগুলো যথাক্রমে সংস্কৃত হস্ত হস্তী মস্তক পত্র প্রস্তর ছত্র এবং তাম্র থেকে এসেছে।

এদের পাল্লায় পড়ে ছাত্রদের শিখতে হয় উচ্ছ্বাস উজ্জ্বল। গণ্ড থেকে গণ্ডুষ। গন্ডা গন্ডার গান্ডেপিন্ডে ঘণ্টা ঘণ্টী কিন্তু ঘুন্টি। ঘূর্ণি ঘৃণা ঘ্রাণ চরণ। 

যাকে বলে চরম অব্যবস্থা ও চরম বিপর্যয়।

সংস্কৃতের ধামাধরা বাঙালি পণ্ডিতবর্গের ক্রিয়াকলাপ শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের নজর এড়িয়ে যায়নি। তাই নিজের অভিধানের ২য় সংস্করণের ভূমিকায় লিখছেন, "তখন খাটি বাঙ্গালাভাষার নাম ছিল সংস্কৃত হইতে ভ্রষ্ট–“অপভাষা” “অপভ্ৰষ্টভাষা” বা “ইতরভাষা”। কিন্তু তখনকার পণ্ডিতসমাজ-নিন্দিত অবজ্ঞাত এই অপভাষাই ছিল আমাদের প্রাণসঞ্চারিণী বাঙ্গালা ভাষা। অপভাষায় তখন গ্রন্থ লিখিবার দুঃসাহস যাঁহারা রাখিতেন, তাঁহারা সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতমণ্ডলীর দিকে চাহিয়া যেন কোন অজ্ঞাত অপরাধের জন্য মার্জনা ভিক্ষা করিয়া অতীব সঙ্কোচে, অতি ভয়ে ভয়ে কলম ধরিতেন। তখন Phonetic spelling অর্থাৎ উচ্চারণগত বানানই এখনকার অপেক্ষা অধিক প্রশস্ত ছিল এবং তাহা প্রাদেশিক বৈভিন্ন প্রভাবে নানা রূপান্তর গ্রহণ করিয়াছিল। কিন্তু এই বৈচিত্রময় ভাষাই ছিল প্রাচীন বাঙ্গালীর প্রধানতঃ কথ্য এবং অংশতঃ সংস্কৃতানভিজ্ঞদের লেখ্য ভাষা। এই ভাষায় যাহারা প্রথম প্রথম বাঙ্গালা ব্যাকরণ ও অভিধান প্রণয়নের প্রয়োজন বোধ করিয়াছিলেন তাহাদের পূর্ব্বতম পথ-প্রদর্শক ছিলেন জনৈক পর্তুগীজ পাদরী মানুএল-দা-আসস্সুষ্পসাঁউ। তাঁহার বাঙ্গালা ব্যাকরণ এবং বাঙ্গালা পর্তুগীজ ও পর্তুগীজ বাঙ্গালা শব্দকোষ রোমান অক্ষরে মুদ্রিত হইয়াছিল। পরে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর সিভিল ( অসামরিক) কর্মচারী নাদেনিএল ব্রাসী হলহেড্ সাহেব ১৭৭৮ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গাক্ষরে একখানি বাঙ্গালা ব্যাকরণ লেখেন এবং তাহারই সমসাময়িক যুগপ্রবর্ত্তক মহাত্মা রাজা রামমোহন রায় তাহার “গৌড়ীয় ব্যাকরণ” লিখিয়া এই অভাব দূর করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন। কিন্তু সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতমণ্ডলীর প্রভাবে এবং তৎকালীন লেখক ও পাঠক সাধারণের উৎসাহ ও সহানুভূতি অভাবে, সংস্কৃত-ব্যাকরণের সূত্রানুশাসনবর্জিত বাঙ্গালা ব্যাকরণগুলি ভাষার ইতিহাসগর্ভে আত্মগোপন করিয়া রহিল এবং সংস্কৃত ব্যাকরণের বঙ্গানুবাদ ও তাহারই ছাঁচে ঢালা বঙ্গাক্ষরে ও বঙ্গভাষায় লিখিত সংস্কৃত ব্যাকরণই প্রবল থাকিয়া বাঙ্গালা লেখ্যভাষাকে নিয়ন্ত্রিত করিতে লাগিল। ব্যাকরণের মতই বাঙ্গালা অভিধানগুলি সংস্কৃত কোষের বঙ্গানুবাদ অথবা প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত-বাঙ্গালা অভিধানে পরিণত হইল।" [৩০ ডিসেম্বর ১৯৩৭]

 

আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি "তখন Phonetic spelling অর্থাৎ উচ্চারণগত বানানই এখনকার অপেক্ষা অধিক প্রশস্ত ছিল এবং তাহা প্রাদেশিক বৈভিন্ন প্রভাবে নানা রূপান্তর গ্রহণ করিয়াছিল।" মানে তখন বাংলা বানান বাঙালির উচ্চারণে লেখার চল ছিল কিন্তু এক সময় সেটা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

 

এত বড় সত্য জানার পরেও আমরা এই ২০২১ সালে এসে বাংলা শব্দগুলোকে "যাবনিক"  "বৈদেশিক"  "দেশজ"  "তৎসম" নামে ভাগ বাটোয়ারা করে পৃথক পৃথক বানান স্থির করব? এই অনাচার আর চলতে পারে না। 

সময় সমাসন্ন। তৎসম শব্দকে পিঞ্জিরা মুক্ত করে যথা সম্ভব মুখের কাছাকাছি করা হোক। 

সেদিনের আনন্দবাজার পত্রিকায় এক শ বছর আগের একটি সংবাদ দেখছিলাম। সূর্য গ্রহণের পর গঙ্গাস্নানে আগত হাজার হাজার লোকের জন্য কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। আজকের কংগ্রেস পার্টি ঠিক এই কাজ করবে কি?

বিগত যুগের অভিধান প্রণেতারা যে বানান লিখে গিয়েছেন আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে সেটাই মেনে চলার মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই। 

বাংলার অনেকগুলো ব্যঞ্জন বর্ণের মধ্যে দুটি ব্যঞ্জন মূর্ধন্য-ণ ও দন্ত-ন। সংখ্যায় দুই হলেও এই দুটো বর্ণকে বাঙালিরা কাছাকাছি উচ্চারণ করে থাকেন। 

হাজার বছর হল বাঙালিরা ণ-র সংস্কৃত উচ্চারণ বিস্মৃত হয়েছেন। 

অন্যদিকে, হিন্দি মরাঠি গুজরাতি ওড়িয়া ইত্যাদি আধুনিক ইন্ডিক ভাষায় ণ-র সংস্কৃত মূলানুগ ধ্বনি রক্ষিত আছে। ণ অনেকটা ড়ঁ-এর মতো উচ্চারিত হয়ে থাকে। কান পেতে শুনলে বুঝতে পাবেন গণেশ আকাশবাণী শব্দ দুটো ওরা গড়েঁশ আকাশবাড়ীঁ উচ্চারণ করে।

কিন্তু, বাঙালি কোন অবস্থাতেই ণ উচ্চারণ ড়ঁ করে না।

তাহলে আর কত দিন মূর্ধ্যণ ণ-র এই অনাবশ্যক বোঝা বাংলার বিদ্যার্থীদের বয়ে বেড়াতে হবে।

বাংলা বানান এবং বাংলা ব্যাকরণ কবে সংস্কৃতর শৃঙ্খল ছিন্ন করে স্বাবলম্বী হবে?

তথাকথিত বিদেশি শব্দের হ্রস্ব-করণ হয়েছে কিন্তু তৎসম শব্দের বানান পরিবর্তনে কোনো ভাবেই সায় দেয়া হচ্ছে না। 

এই ব্রাহ্মণ্যবাদের অবসান ঘটিয়ে সহজ সরল বাংলা বানান বিধি চালু করা হোক। বাংলা ভাষা আত্মনির্ভর হোক না।

অভিধান সংস্কার বানান সরলীকরণ যুগের দাবি। স্বয়ং শেক্সপিয়ারের লেখা সংশোধন করে পড়া হচ্ছে। ইংরেজি অভিধান নিয়মিত সংশোধন করা হয়। পর্তুগিজ জার্মান বানান সমতা বিধান হচ্ছে।

বাংলা একটি আধুনিক ভাষা। জীবনীশক্তিতে ভরপুর আমাদের এই মাতৃভাষারও সময়ানুগ ঘষামাজা প্রয়োজন। সংস্কৃত নামক একটি ভাষার রক্ষণাবক্ষেণ করাটা আমাদের কাজ না।

তাই প্রস্তাব রাখছি। প্রথম চোটে ণ-কে বাদ দেওয়া হোক। উজ্জ্বল উচ্ছ্বাস থেকে অনাবশ্যক ব-ফলাকে চিরমুক্তি দেওয়া হোক।

ব্যঞ্জন বর্ণমালায় ণ থাকলে থাক। পণ্ডিতদের কাজে লাগবে। জেনে রাখা ভাল হিন্দিভাষিরা তৎসম শব্দ সংস্কৃত নিয়ম মেনেই লিখে থাকেন। তারাও কিন্তু काण्ड प्रचण्ड षण्ड বানানকে ছাত্রদের স্বার্থে সরলীকরণ করে कांड प्रचंड षंड লিখছেন। 

যাঁরা তৎসম শব্দের বানান সংস্কার করাকে আটকে রেখেছেন তাঁদের একটাই সুরক্ষা বর্ম সেটার নাম ফোনেটিক বিতর্ক। দেশজ এবং বিদেশি শব্দের বানান সরলীকরণ করার সময় তাঁরা ফোনেটিক বিতর্ককে কুলুঙ্গিতে তুলে রাখেন। তৎসম শব্দের বানান বদলের কথা উঠলেই নামিয়ে আনেন।

তাঁরা বিস্ময়কর ভাবে বিস্মৃত হয়ে যান যে আসলে তাঁদের তৎসম হ্যাংওভারটাই কাটছে না! সংস্কৃত শব্দের বিশুদ্ধতা রক্ষার মন্ত্রগুপ্তি নিয়ে বসে আছেন তাঁরা।

বাংলা বানান নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রবল বাগ্‌যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দেবপ্রসাদ ঘোষ(এম.এ., বি.এল.)। রবীন্দ্রনাথ তার জবাবও দিয়েছিলেন৤ তা নিয়ে পরে দেবপ্রসাদ ঘোষ একটি বই প্রকাশ করেন, 'বাঙ্গালা ভাষা ও বাণান'। এখানে দুটি শব্দের বানান লক্ষ করতে হবে, 'বাঙ্গালা' এবং 'বাণান'। তাঁর অভিমত ছিল বানান শব্দটি সংস্কৃত বর্ণন থেকে এসেছে। তাই “বাণান” লিখতে হবে।

বলতে দ্বিধা নেই আমাদের পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি এবং বাংলা একাডেমি, ঢাকার বানান নিয়ামকরা তৎসম শব্দের সরলীকরণ করছেন না, কারণ এই একটি বিষয়ে তাঁদের সকলেই দেবপ্রসাদ ঘোষপন্থী এবংং অবশ্যই প্রাচীনপন্থী। প্রাচীন পন্থীরা চাইছেন সংস্কৃত শব্দ যেরূপে বিদ্যমান তৎরূপ থাকুক। মুখে অন্য কথা বললেও তাঁরা সংস্কৃতকেই বাংলার ভাষার জননীর মর্যাদা দিতে চান। অথচ, আজকাল আমরা সবাই জানি যে,  সংস্কৃতভাষা থেকে বাংলাভাষার উদ্ভব হয়নি। বাংলাভাষার সঙ্গে সংস্কৃতের সম্পর্ক কিছুমাত্র যদি থাকে তবে তা দূর জ্ঞাতি সম্পর্ক। সংস্কৃতের মহাপণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় বলেছেন, "আমি কিন্তু সংস্কৃতকে বাংলার অতি-অতি-অতি-অতি-অতি-অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহী বলি।"

 

পালি প্রাকৃত থেকে বাংলায় গৃহীত তথাকথিত সংস্কৃত শব্দরাজির তৎসম অস্তিত্ব ঘোষণা আসলে একটা হোক্স। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতেরা এই গুজব ছড়িয়ে বাঙালিকে ভব্যসভ্য করার মহান কাজে হাত দিয়ে ছিলেন। এই গুজবকে শক্ত ভিতে দাঁড় করানোর জন্য অনেকানেক সংস্কৃত শব্দ আমদানি করে বাংলাভাষাকে কৃত্রিম ভাষায় কনভার্ট করে ছিলেন। তদ্ভব শব্দগুলোকে আর্যাবর্তের বানানের ছাঁচে ফেলে তাঁদের কষ্ট লব্ধ নৈয়ায়িক জ্ঞানকে সার্থকতা দিতে সৃষ্টি হল তৎসম সমৃদ্ধ বাংলা ব্যাকরণ ও শব্দকোষ।

আজকেও সেই একই দ্বিধা একই দ্বন্দ্ব। বাংলায় দীর্ঘ স্বর নেই বলে যাঁরা যাবতীয় যাবনিক শব্দের হ্রস্ব করণ সম্পন্ন করলেন তাঁরাই তৎসম শব্দ নামক এক গোলক ধাঁধায় এসে থমকে গেলেন। যিনি বললেন, সমতাবিধানের স্বার্থে খ্রিষ্ট বদলে খ্রিস্ট লেখায় সম্মতি দিলাম, তিনিই কেষ্ট ঠাকুরের পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। আলতা-র ল আর উলটা-র ল আলাদা বলার পরেও তাঁরা বলছেন তৎসম শব্দে মূর্ধন্য-ণ-র ব্যবহার তুলে দিলে মহাপাতক হয়ে দোজ়খে যাব।

সংস্কৃত লেখায় হ্রস্ব-করণের প্রত্ন নিদর্শন থাকলে অবশ্য আপত্তি নেই। যেমন, শ্রেণী এখন শ্রেণি। কোনো অর্বাচীন শ্রেনি লিখলে দশ বছরের ফাঁসি!

বাঙালির দীর্ঘ উচ্চারণ হয় না বলে বানান বদলে দিতে যাঁদের কলম কাঁপে না তাঁরাই সুর পালটে বলেন, যেমন উচ্চারণ তেমন বানানের নীতি থেকে আমাদের সরে আসতেই হবে। 

আসলে সংস্কৃত শব্দের বানান সংরক্ষণের খাতিরে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, ধ্বনিসংবাদী হওয়া কঠিন কাজ। ফোনেটিক ভাবে বানান লেখা জটিল বিষয়। 

মহাশয়দের জ্ঞাতার্থে জানানো দরকার: না আমরা ফোনেটিক বানানের কথা বলছি না। আমরা সেমি-ফোনেমিক বানান পেলেই ধন্য হব।

বাংলায় আত্তীকরণ হয়ে যাওয়া সকল শব্দের বানান লেখার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট বিধান দরকার। এক যাত্রায় পৃথক ফল তো দ্বিচারিতা মাত্র।

একটি দৈনিক ভান্ডার লিখছে বলে পণ্ডিতদের ঘুম উবে গেছে। তৎসম হলে ভাণ্ডার লিখতে হবে বলছেন ওঁরা। কি সাংঘাতিক বালখিল্য অবস্থান।

সমতাবিধান চাইলে একটি যুক্তিতে চলতে হবে। কিছু সংস্কার বুৎপত্তিতে আটকে যাচ্ছে বলা চলবে না। 

যে যুক্তিতে ষ্ট্রীট থেকে স্ট্রিট হল তেমন যুত্সই কিছু বের করে পন্ডিত উচ্ছাস লেখার অনুমতি দিলেই চলবে। ভাষা রসায়নের পাতন-যন্ত্র, বক-যন্ত্র সবকিছু তো আপনাদের দখলে। তৎসম শব্দের সরলীকরণে নিপাতনে সিদ্ধ পন্থাটা খুঁজে বের করুন না। 

বাংলা শিক্ষক, যাঁরা তৎসম রক্ষার মন্ত্রগুপ্তি নেননি তাঁরাও কিছু বলুন।

যতই সরলীকরণ বা সমতা বিধানের কথা বলা হোক না কেন বাংলা বানান এখন পর্যন্ত মধ্যযুগ পেরিয়ে আসতে পারেনি। মূল বাধা তথাকথিত ৪৪ শতাংশ তৎসম শব্দ।

আমি তো মনে করি বাঙালি যেদিন "পন্ডিত" লেখার অফিসিয়াল অনুমতি পাব সেদিন থেকে বাংলা বানান পোস্টমডার্ন যুগে প্রবেশ করবে। লবন লেখা শুরু করলে বাংলা বানানে সমতা আসবে, লাবণ্য ফিরবে!

 

বাংলা স্বরবর্ণের সারিতে অ্যা-কে যাকে বলে অফিসিয়াল স্থান দিতে হবে। 

 

অ্যা উচ্চারিত শব্দাবলি এক একলা কেন কেমন যেন যেমন খেলা গেল গেছে দেখা ইত্যাদির বানানে এ-কার বাদ দিয়ে অ্যা-কার আসুক।

ও উচ্চারণ করা হয় এমন শব্দে ও-কার লাগিয়ে দিলে আমার মতো বাঙালের প্রমিত বাংলা উচ্চারণ শিখে নিতে সুবিধে হবে।

 

কিছু দিন ধরে বানান সরলীকরণ নিয়ে লেখালেখি করছি । এর মানে এই নয় যে আমি সংস্কৃত ভাষা বা অন্য কোনো ভাষার বিরুদ্ধে বলছি। বাংলা বানানে সমতা বিধানেরর পক্ষে, বাঙালির পক্ষে কথা বলছি। এখানে ফোনেটিকের কথাও বলছি না। বাংলা বানান সেমি-ফোনেমিক হলেই অনেক সরলীকরণ সহজায়নের পথ সুগম হবে।

তৎসম শব্দের সরলীকরণের প্রশ্ন ওঠালেই স্থিতাবস্থাবাদিরা "ফোনেটিক" নিয়ে এসে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কেটে পড়েন। এঁরা যখন তৎসম বাদে বাকি শব্দের সমতাবিধান করেছিলেন তখন ফোনেটিক টোনেটিক নিয়ে এক বিন্দু মাথা ঘামানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করেননি।

 

বাঙালি যখন হিন্দি মারাঠি গুজরাতি কন্নড় ওড়িয়া অসমিয়া তামিল শিখবে তখন সেই সেই ভাষার উচ্চারণ রীতি শিখবে।

যেমন, তামিল শিখতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে তামিল শব্দের ল-টা মূর্ধন্য-ল ল়। ল়-এ এসে জিহ্বা উল্টে জোর দিয়ে বলে দেখুন। আপনার তামিল়  বন্ধুটি কেমন খুশি হয়ে যাবে। ( বাঙালিকে বঙ্গালী বললে আমাদের ভাল লাগে না)।

Dravida Munnetra Kazhagam দলটাকে দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কারাগাম বলতে হবে। মালোয়লিতে Kozhikode উচ্চারণ কোড়িকোড। এ সব জানতে হবে।

महाबाळेश्वर ঘুরতে গেলে ळ আর ल-তে পার্থক্য চোখে পড়ে কি? কৌতূহল মেটাতে হলে মারাঠি ভাষায় উঁকি মেরে দেখতে হবে।

 

তৎসম শব্দের বানানের অপরিবর্তনীয়তায় গভীর ভাবে বিশ্বাসীরাই আমাদের সমাজপতি। তাঁরা কি এ ধরনের লেখা পড়ে দেখেন? তাঁদের বিচার বিবেচনার ওপর বাংলা ভাষার সহজায়ন অনেকটাই নির্ভর করছে। 

বাঙালির মুখে উচ্চারিত সব শব্দই যাকে বলে নিখাদ খাঁটি বাংলা। এখানে কোনো উর্দু ফার্সি হিন্দি সংস্কৃত/তৎসম পর্তুগিজ ইংরেজি গ্রিক বা হিব্রু শব্দ নেই। আত্তীকরণের ফলে সবই বাংলা শব্দ-- তা যে ভাষা থেকেই আসুক। বাংলা মানে শুধুই বাংলা, আর কিছু না। এক ভাষাভুক্ত সকল শব্দের বানান সরলীকরণে একই সূত্র প্রয়োগ করে সহজায়নের কাজ শেষ করতে হবে। 

এই সহজ সরল ব্যাপারটি বাঙালি ভাষাতত্ত্ববিদরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবেন বাংলার জন্য তত মঙ্গল।

 

Gangaridi1.jpg
Gangaridi2.jpg
Gangaridi3.jpg