কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

যে সমাজটাকে দেখেছি শিলঙে

অধ্যাপক তন্ময় ভট্টাচার্য

Tanmay Bhattacharjee_edited.jpg

আমার বাবা তারাপদ ভট্টাচার্য শিলঙে এসেছিলেন ১৯২১ সালের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে। অনুমান করি, মে মাস অথবা জুনের কোন এক সময়ে। হয়ত অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল তখন। বাবা কিন্তু ছিলেন একেবারে গ্রামের ছেলে। গ্রামের ধারেকাছে তো কোন স্কুল ছিল না, বিধবা মায়ের একমাত্র পুত্রসন্তান, বাবার স্কুল-কলেজের পড়াশোনাও কিন্তু এক শুভানুধ্যায়ী ভদ্রলোক, হরকান্ত দাসের সৌজন্যে। তিনি ছিলেন সিলেট কোর্টের উকিল। গ্রামের ব্রাহ্মণ সন্তান মাত্রই তার কাছে ছিলেন কর্তা। তাই ব্রাহ্মণ হিসাবে হরকান্তবাবুর বাড়িতে স্থান হলো বাবার। সপাক অবস্থান, নিজেই রান্না করে খেতেন বাবা। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল একমাত্র হরকান্তবাবুর জন্যে। গ্রামীণ সমাজে তিনি ছিলেন প্রথম ম্যাট্রিক পাশ, পরে সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজ থেকে ডিস্টিংশনে গ্র্যাজুয়েট। বাবার কাছে শুনেছি যে গ্রামের লোক অনেকে তাঁকে দেখতে এসেছিল। সহায়-সম্বলহীনা বিধবা মায়ের কাছে ছেলের এই কৃতিত্বই ছিল সব থেকে বড় পাওনা। এর থেকে বড় কিছু তিনি ভাবতে পারেননি।

শিলং রাজধানীর কথা জানা থাকলেও সেখানে পৌঁছনোর ব্যাপার ছিল কঠিন ব্যাপার। কিন্তু কিছু লোক সিলেট থেকে সেখানে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন চাকরির সন্ধানে এর আগের শতাব্দীতে। যাত্রাপথ ছিল অতি দুর্গম। রাজধানী শহরটাকে ভব্যসব্য করে গড়ে তোলার জন্য তো লোক চাই, তখন তো ইংরেজি জানা লোক গন্ডায় গন্ডায় পাওয়া যেত না। রাজধানীর আকর্ষণে দেশের অনেক প্রতি লোকেরা এসেছে। ইংরেজ শিলঙে নতুন প্রদেশের রাজধানী বসিয়েছিল তাদের নিজেদের তাগিদে। ইংরেজের তৈরি করা শহরগুলি দেখলে মনে হয় তাদের শহরগুলি সৃষ্টির এক নির্দিষ্ট ‘ধরন’ ছিল, সেই সব কিছু শিলঙেও ছিল উপজাতিদের নিজস্ব ইউডো বাজার ছিল, এটা হয়ত সেই ক্ষুদ্র ‘জনগোষ্ঠীর’ জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু একটা রাজধানী শহরের জন্যে তা যথেষ্ট ছিল না, তাই দলে দলে ব্যবসায়ীরা এলো, মাড়োয়ারিরা এলো বিশেষ করে৷ বাঙালিরাও এলেন, শিলঙে একটি “সমাজ” গড়ে উঠল৷ প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠী তাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী “সমাজ” গড়ে তুলল৷

বাবা তার বি.এ. পরীক্ষা পাশ করার পর শিলঙে এসেছিলেন না এখানে এসে পাশ করার খবর পান, তা সঠিক আমি জানি না৷ বাবাকে এই কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি৷ কিন্তু তাঁর শিলঙে আসার পেছনে শিলং জেলরোডের সতীশচন্দ্র রায় চৌধুরীর যে অনুপ্রেরণা ছিল তা বাবা কোন এক সময় আমাকে বলেছিলেন৷ তিনি আমাদের আত্মীয় এবং শিলঙে এসেছিলেন বাবারও অনেক আগে৷ শিলঙে অনেককে ডেকে আনার ব্যাপারেও “অনুঘোটক” হিসেবে ছিলেন রায়চৌধুরী মহাশয়৷ বিংশ শতাব্দীর প্রথম কয়েকটি দশক সিলেট থেকে আসা ভদ্র সমাজ গড়ে উঠেছিল৷ কিন্তু একটু অনুসন্ধান করলেই জানা যাবে যে, চেরাপুঞ্জি রাজধানীতে থাকা সিলেটের “প্রতিনিধি” শিলঙে রাজধানী স্থাপনের ভূমিকায় ছিলেন৷ এদের কারো বংশধারা ক্ষীণ হলেও শিলঙের সমাজে আজও হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে৷ ইংরেজ শাসকদের এদেরও প্রয়োজন ছিল৷ এদের ছাড়া এতবড় সাম্রাজ্যের ভিত তৈরি হত না৷ আজকের আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেকেই এই বাঙালি সমাজটিকে অনাহুত বলে ভাবলেও এরা এই রাজধানী শহরের সৃষ্টিতে একদিন অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল৷ এদের ভুললে চলবে না৷

আমার সবসময় মনে হয় যে, ইংরেজের কাছে ভারত সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যেন এক পূর্বনির্দিষ্ট ব্যাপার ছিল। সব কিছু নিয়ে এদের যে খুব তাড়া ছিল তাও নয়। পাঞ্জাব থেকে বর্মা, একে একে সব অঞ্চলগুলিই ভারত সাম্রাজ্যের অংশভুক্ত হয়ে যায়। বাইরে থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অগ্রগতির প্রত্যাহ্বান আসতে পারত ফরাসীদের কাছ থেকে, কিন্তু এদের সামরিক শক্তি অষ্টাদশ শতাব্দীতে শেষ হয়ে যায়, এদের দৃষ্টি আবদ্ধ থাকে ইউরোপে ও আফ্রিকায়, ভারত উপমহাদেশে কেবল টিকে রইল। শিলঙের মত অজস্র শহর ব্রিটিশ আমলে সৃষ্টি হয়েছিল। সাম্রাজ্য স্থাপন কেবল উচ্চ প্রশাসক ও সেনাধ্যক্ষের দ্বারাও হয় না। নিচের লক্ষ নিম্ন কর্মচারীদেরও প্রয়োজন হয়। এক বর্মী লেখকের লেখা বই পড়েছিলাম, বর্মায় ব্রিটিশ শাসন নিয়ে লিখেছিলাম৷ বর্মীদের চোখে সব ভারতীয়ই ছিল কালা আদমি আর এদের বর্মার সর্বত্র দেখা যেত৷ বেশিরভাগ অফিসকর্মী ছিল বাঙালি, এক আধুনিক মায়ানমারের লেখকের চোখে এরা ছিল “হেটেড” অর্থাৎ সাধারণ বর্মীরা এদের খুব একটা পছন্দ করত না৷ বাংলার নামকরা উপন্যাসিক লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত অনেক লেখাই রেঙ্গুনে বসে লিখেছিলেন৷ শিলঙেও এক সময় অফিস আদালতের নিম্ন কর্মচারীরা ছিলেন বাঙালি৷ শিলং আসাম রাজ্যের রাজধানী হওয়ার সুবাদে অল্প সংখ্যায় হলেও অসমিয়ারাও ছিলেন৷ যারা অসমিয়া-বাঙালি দ্বন্দ্বের উৎস সন্ধানে ব্যস্ত, তারা ব্রিটিশ আমলে শিলঙের নিম্ন আমলাতন্ত্র কিভাবে চলত, সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে মানসিকতা কি ছিল তা জেনে নিতে পারেন৷

ব্রিটিশ সেনাদলে ছিল গুর্খাদের আধিপত্য, এদের দাপটে এই অঞ্চল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে এসেছে। যতদিন শিলঙে রাজধানী ছিল, ততদিন যেন ব্রিটিশ শাসনের ‘হ্যাংগ অভার’ সময়কাল চলছিল। শিলঙের বাঙালিরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না তাদের অবস্থান কি হবে। প্রায় একশো বছর সময়সীমার মধ্যেই শিলঙের বাঙালি সমাজের কথা চিন্তায় আনতে হবে। আমরা দেখেছি কিভাবে শিলঙের বাঙালি পল্লীগুলি গড়ে উঠেছে। বিদ্যালয়, ধর্মস্থল, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় রকমের বাধা আসেনি, কিছু প্রতিবন্ধকতা অবশ্য ছিল। তবে অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলি ত নিজেদের মত করে তাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। অসমিয়াদের প্রতিষ্ঠানগুলিও ছিল। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শিলং শাখাটিতেও ‘সংস্কৃতি চর্চা’ বহমান ছিল। পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারার ক্ষমতা বাঙালিদের আছে।

তবে আমাদের জীবনে ‘রুটি’ রোজগারের সমস্যাও তো আছে। বিট্রিশ আমলে সরকারী চাকরির বাজার ছিল সীমিত কিন্তু বাঙালি বাদে অন্য কোনও যোগানদার এই ক্ষেত্রে ছিল না তাই বাঙালিদের জন্য তেমন চিন্তার কারণও ছিল না৷ এছাড়া, দেশে ফিরে যাবার ক্ষেত্রেও তো কোন বাধা ছিল না৷ দেশের সেই বারো মাসে তেরো পার্বেনের সরঞ্জাম শিলঙের পার্বত্য পরিবেশেও বেশ চলত৷ দুর্গা, কালী, লক্ষী ও সরস্বতীর আরাধনা ও সঙ্গের কর্মকান্ডে এখনও আছে কিন্তু  সেই সময়ের শিলঙে ‘প্রবল উপস্থিতি’ নিয়েই ছিল। ব্রিটিশ শাসনে, শাসকদের চোখে শিলং ছিল তাদের নিজেদের দেশের দেশের এক অনুভূতি। আমাদের চোখেও ছিল শিলঙে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির সম্প্রসারণ। আমার স্বর্গত মাকে মাঘের প্রচন্ড ঠান্ডায় মাঘব্রত, মঙ্গলচন্ডীর ব্রত পালন করতে দেখতাম। বাবা শ্যামাসঙ্গীত লেখায় বিভোর হয়ে থাকতেন। শিলং যেন তাঁর গ্রামেরই এক সম্প্রসারিত অংশ। ছোট সময়ে যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তাম ‘শ্রীহট্ট’ জেলার বিবরণও পাঠ্যসূচিতে ছিল৷ তাই শিলং তখন বিভিন্ন রূপে প্রতিভাত হতো৷ “সাহেবদের” শিলঙের সঙ্গে আমাদের ভাবনা মেলার কথা নয়৷ রবিঠাকুর যখন ‘শেষের কবিতা’ লেখেন তখন তাঁর মনে হয়ত শিলঙের ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজের কথা মনে ছিল, কিন্তু সেই সমাজ ও বাঙালিদের মধ্যে সংখ্যালঘুর সম্পর্ক ছিল। অমিত রায়, লাবণ্য ও একটি যে বাঙালি সমাজের, এদের সঙ্গে আমাদের আলোচ্য “করনিক” বাঙালিদের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতায়’ শিলংকে বিখ্যাত করে রেখেছেন। পট-চর্চায় “শেষের কবিতা’র অমিত রায়-রা শতবর্ষ আগের, কিন্তু এদের খুব বেশি পুরনো মনে হয় না।

শিলঙের সাহিত্য পরিষদ এখনও শিলঙের বঙ্গীয় সংস্কৃতি ধরে রেখেছে, কিন্তু আর্থ-রাজনীতি শিলঙের বাঙালিদের এখন ঘরছাড়া করে ফেলেছে। যে বাঙালি সমাজটা এক সময় শিলংকে একান্ত নিজের বলে ভাবত এখন তারা এত নিবিড়ভাবে শিলংকে নিজের বলে ভাবতে পারছে না। সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেল চোখের সামনে। “স্থানীয়” রাজনীতির উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ছে অবিরত। যারা শিলংকে গড়ে তুলেছিলেন, এদের নবীন প্রজন্মগুলি আজ শিলঙে নেই, এরা আবার নতুন ইহুদি হয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্য কোথাও, নতুন নিরাপত্তার সন্ধানে। এই সাহিত্য পরিষদে বাংলা সাহিত্যের অনেক রথী এসেছিলেন পরিষদের আহ্বানে। শাখার পূর্ব স্মৃতিতে এদের সম্বন্ধে লেখা থাকবে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, খগেন মিত্র ও এস ওয়াজেদ আলির কথা মনে পড়ছে। আই.সি.এস দেবেশ দাশ ছিলেন সাহিত্যিকও। তিনিও পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন।

বাবা তারাপদ ভট্টাচার্য ছিলেন পরিষদের প্রথম সম্পাদক। ক্ষিতীশ চন্দ্র চৌধরী আসামের কম্পট্রোলার ছিলেন, সম্ভবত তারই অধ্যক্ষতায় পরিষদ স্থাপিত হয়৷ বহুদিন পরিষদের নিজস্ব কোন গৃহ ছিল না৷ কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য ছিলেন সাহিত্য পরিষদের দীর্ঘ সময়ের সম্পাদক৷ তাঁর সময়ে পরিষদের স্থায়ী ঠিকানা হয়৷ তাঁকে নিরলস পরিশ্রম করতে দেখতাম৷ খুবই সাহিত্যানুরাগী ছিলেন তিনি৷ পরে, সাহিত্য পরিসদকে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে চালিয়ে নিয়ে গেছেন পরবর্তী অনেকেই৷ আগেকার কম্পট্রোলার বর্তমান কালের এ্যাকাউনটেন্ট জেনারেল৷

পরিষদ এখনও আছে, কিন্তু শিলঙে বাঙালিদের সংখ্যা কমেছে৷ সংস্কৃতির এই প্রদীপ শিখাটিকে জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন জনাকয়েকের হাতে, এরা ক্ষীয়মাণ সংখ্যার মাঝে কতদিন চালিয়ে যেতে পারবেন এর উত্তর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কাছে। কিন্তু দুর্গাপূজার কয়েকটি দিনে শিলঙের বাঙালি যেন আবার তাদের পুরনো স্মৃতিকে আবার নতুন করে পায়। খুব ইদানীংকালে শিলঙে দুর্গাপূজার সময় ছিলাম৷ স্বাধীনতার আগেকার ও পরে দেখেছি পূজা। মনে হয়, তুলনামূলকভাবে এখন শিলঙের প্রতিষ্ঠিত পূজা মন্ডপগুলি অনেক বেশি জাকজমকপূর্ণ। পূজার ভিড়ে সামিল হতে ভাল লাগে। অনেক দশক আগে পূজায় ছিল আমাদের নিজস্ব দেশি ভাবের প্রভাব, বাংলা আধুনিক গানও শোনা যেত খুব, পূজার নতুন রেকর্ডের গান শোনা যেত আমাদের গায়ক-বন্ধুদের (দু’-একজন যারা ছিল) গলায়। পূজার সাজসজ্জায় এতো চমক ছিল না। পূজার ঠাকুর প্রতিমা গৌহাটি থেকে আনা হত চৌষট্টি মাইল পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে। খুব ছোট সময় এই ব্যবস্থা দেখেছি। তাই সকল প্রতিমা ‘অক্ষত’ অবস্থায় থাকতেন না শিলং পৌঁছনোর পর। সব প্রতিমাই গৌহাটি থেকে আসতেন কিনা তা জানিনা। আমি ছোটবেলায় আমাদের পাড়ায় একবার দেখেছিলাম, স্মরণে আছে। আগে পূজায় এত “টেকনিকেল” প্রয়োগ ছিল না৷ হিন্দি চিত্রজগতের দাপটও এতো লক্ষ্য করা যেত না। তবে দেশবিভাগজনিত বিচ্ছিন্নতায় সম্পূর্ণ ভাবে আমাদের সাংস্কৃতিক “শেকড়” কিন্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি পুরোপুরি ভাবে। ‘মেঘালয়’ রাজ্য গঠনের পর বাংলা বোধহয় প্রাথমিক ও উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিদেয় নিয়েছে অনেকদিন হয়ে গেল। লিখিত বাংলার সঙ্গে শিলঙের বাঙালিদের সম্পর্ক হয়ত ঘুঁচে গেছে, কিন্তু ‘বিদ্রোহী’ বাঙালি দু’-একজন থাকলেও থাকতে পারেন, এখনও যারা সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প ও ফেলদার কীর্তিকাহিনী অরিজিনাল বইতে পড়তে পারেন। এছাড়া আমাদের “চিরন্তন” রবীন্দ্রসঙ্গীত রয়েছে যারা আবেদন রোমান অক্ষরে গানগুলি লিখলেও শেষ হয়ে যায় না৷ এছাড়া রয়েছে সিলেটি সুনামগঞ্জের পল্লীসঙ্গীত হাসনরাজা ও রাধারমণ দত্তের প্রাণমাতানো গান৷ হয়তো স্বাধীনতার আগে এরা এতো বিখ্যাত ছিলেন না, এখন যেমন এদের গানগুলি খুবই জনপ্রিয় হয়েছে৷

শিলঙের বাঙালিদের মধ্যে সিংহভাগই সিলেট জেলার লোক। রাজনৈতিক পালাবদলে এদের দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, কিন্তু এরা যে এখনও হারিয়ে যায়নি তা বোঝা যায় উৎসবের সময়। শিলং যারা গড়ে তুলেছিলেন, তাদের বর্তমান প্রজন্ম শিলং-ছাড়া হচ্ছে। যারা অভিযোগ করে থাকেন যে, পূর্ববাংলার লোকেরা এখানে এসে ভিড় জমিয়েছে, তাদের বলতে ইচ্ছে হয়, এখন বিপরীত দিকে প্রব্রজন। স্রোত চলছে। আগে আসা লোকেরা আরো বেশি করে মেঘালয়/আসাম ছাড়ছে। নিরাপত্তা ও অর্থনীতি এখন এদের কাছে বড় প্রশ্ন। শিলঙের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাদের আর বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। এদের অর্থ-কৌলিন্য তেমন না থাকলেও সংস্কৃতির গর্ব ছিল। স্কুলের শিক্ষক ও কলেজের অধ্যাপক, বিখ্যাত হবার দাবী নিয়ে অনেকেই ছিলেন। স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চায় অগ্রণী ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র চৌধুরী। তাঁর লেখা Khasi Canvas বইটিকে আমি P R Gurdon এর The Khasis থেকেও উচ্চে স্থান দিই।

এক সময়ে শিলং শহরে ব্রাহ্মসমাজের দাপট ছিল। তখনকার বাংলার সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ, এতে যুব শ্রেণি সামিল হয়েছিলেন। সেই টানে অনেক বিখ্যাত বাঙালির সঙ্গে শিলঙের যোগাযোগ ছিল। ডাক্তারবিধানচন্দ্র রায়ের পিতা প্রকাশচন্দ্র রায় শিলঙে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক ছিলেন। ব্রাহ্মধর্মের ভিত শিলঙে যে গভীরে গ্রোথিত ছিল এর প্রমাণ পুলিশবাজারের ব্রাহ্ম উপাসনা স্থল। লাবান পাড়ায়ও ছিল ব্রাহ্মমন্দির। বোধকরি, বিংশ শতাব্দীতে ব্রহ্ম আন্দোলনে ভাটার সময়। এক সময়, সারা খাসিয়া, জয়ন্তিয়া পাহাড় জুড়ে ছিল ব্রাহ্ম প্রচারকদের গতিবিধি। অনেক খাসিয়া যুবকও ব্রাহ্ম আন্দোলনে আকৃষ্ট হয়েছিল। স্বামী বিবেকানন্দের নতুন ভাবে অদ্বৈত দর্শনের ব্যাখ্যা ও রামকৃষ্ণ মিশনের জনমুখী সেবাধর্মী শিব জ্ঞানে জীব সেবা ব্রাহ্ম ধর্মের দার্শনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। কেবল শিলং নয়, সর্বত্রই এর বিপরীত প্রভাব ফেলে। ব্রাহ্মধর্ম আর প্রবল আন্দোলন হয়ে রইল না, এর জীবনস্রোতও স্তিমিত হয়ে পড়ল৷ কিন্তু ক্ষুদ্র গোষ্ঠী হিসেবে এখনও অস্তিত্ব জিইয়ে রেখেছে৷

এই বিষয়ে একটি বই পড়ছিলাম, বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে সিলেটের এক ব্রাহ্ম মহিলা স্বামীর সঙ্গে শিলঙে থাকতেন৷ সম্ভবত সর্বরী দত্ত (নাম ভুল হতে পারে) লেখিকার নাম৷ খুব বিস্মৃত আলোচনা আছে বইটিতে যা বর্তমানের শিলংবাসী বাঙালিরা খবর রাখে না৷ তিনি কোন পুজো-আচ্চায় বিশ্বাস করতেন না৷ তখন ব্রাহ্মধর্মের অনুরাগীদের সঙ্গে প্রচলিত কর্মকান্ডের বেশ বিরোধ ছিল৷ ঠাকুর পরিবারেও এই বিরোধ ছিল৷ যাই হোক শিলঙের শিক্ষিত মহলে ব্রাহ্ম-প্রভাব ছিল৷ শিলঙে বিধানচন্দ্র রায়ের একটি পরিচিতি আছে৷ কেনচেস্ট্রেস্ পাড়ায় বিধান রায়ের বাংলো ও অফিস পাড়ায় শিলঙের বিদ্যুৎ সরবরাহের হেড অফিস, এখনও বিধান হাউস নামে পরিচিত৷ বিধানচন্দ্র রায়ের এতো প্রসিদ্ধি শিলং শহেরে থাকলেও তাঁর পিতৃদেব প্রকাশচন্দ্র রায়ের নাম খুব কম লোকেই জানেন৷ ব্রাহ্মধর্মে বিশ্বাসী এই লেখিকার লেখায় প্রকাশচন্দ্র রায়ের নাম অনেকবারই এসেছে৷ তবে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলঙে থাকাকালীন সময়ে ছিলেন৷ রবি ঠাকুরের ভাইঝি-জামাই, লক্ষ্মীনাথ বেজ বরুয়াও ছিলেন সঙ্গে৷ লক্ষ্মীনাথ ডানুন কমপাউন্ডে থাকতেন৷ তাঁর জ্বর কমছিল না, পরে শিলঙে উপস্থিত ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে ডাকা হল৷ তাঁর ঔষধে রোগীর রোগ নিরাময় হলো৷ সম্ভবত লক্ষ্মীনাথের ম্যালেরিয়া হয়েছিল৷

শিলঙের বাঙালি অধ্যুষিত পাড়াগুলিতে পূজা-মন্ডপগুলি এক সাংস্কৃতিক পরিচিতি বয়ে নিয়ে চলেছে এখন পর্যন্ত। রিলবং হরিসভা (লাবান), জেল রোড, উমপ্লিং এখন বঙ্গ সংস্কৃতির ধারক। এক সময় শিলংকে বাঙালিরা বড় আপন করে নিয়েছিল। যেন, দেশ বিভাগের পরে শিলং আমাদের জন্যে এক নিরাপদ আস্তানা৷ এই ধারনা যে ভুল ছিল তা বোঝা গেলবড় রকমের রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে৷ এই পট পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটা কঠিন হয়ে পড়েছে৷ মানুষ এখন শিলঙের বিকল্প খুঁজছে৷ কলকাতার গড়িয়া অঞ্চলে এখন দেখা যাচ্ছে এক বিস্তৃত “মেঘালয়ের” বাঙালি বসতি৷ গড়িয়া অঞ্চলে এই সব নতুন ইহুদিদের সংখ্যা বাড়ছে৷

কেবল গড়িয়া নয়, চেন্নয়ের বাঙালি কলকাতার অন্যত্রও নিরাপদ আস্তানা নিয়েছে। পূজা-মন্ডপগুলির জমায়েতে এই নিরাপত্তা হীনতার কারণ হঠাৎ করে হয়ত বুঝে উঠতে পারে না। মেঘালয়ের চাকরি করে কলকাতায় শেষদিনগুলি কাটানোর চিন্তায় অঅএছন বহু লোক। গড়িয়ার সরু গলিগুলিতে ‘সিলেটিতে’ বাক্যালাপ ঘটে। খুব বেমানান মনে হয় না। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এদের মধ্যে নতুনকে খোঁজার তাড়াও আছে৷

শিলঙের সাহিত্য পরিষদ হলে এক সময় নাটক লোকের মন ভরিয়ে তুলত। অজস্র বাঙালি নাটকপ্রিয় ছিলেন। সম্ভবত, আফজলদা (আফজল হোসেন) এদের বিবরণ দিয়েছেন কোন আলোচনায়। কিন্তু আমি রাখাল ভট্টাচার্যের পরিচালনায়। নাটক দেখেছি। অনেক যশস্বি অভিনেতা ছিলেন শিলঙে। এরা পেশাদার ছিলেন না, শিলঙের বিভিন্ন অফিসের অফিসকর্মী, অবসর সময়ের অভিনেতা। এরা কিন্তু খারাপ অভিনেতা ছিলেন না। কলকাতার পেশাদারি চটক তারা এখানেও আনার চেষ্টা করতেন। বিভিন্ন জায়গায় এদের নাট্যপ্রতিভার প্রদর্শন হতো৷ এমন কি, বাংলাদেশেও এদের নাটুকে দলের প্রদর্শন হয়েছে। সেই সব দিন গেছে, লোকের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তাদের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলিকেও আটকে রেখেছে কোথাও।

আফজলদার বাড়ির বাইরের ঘরে শিলঙের পুলিশবাজারের একটি চিত্র টাঙানো আছে। ১৮৭৮ সালে তোলা ছবি। একটি গরুর গাড়ির সামনে দন্ডায়মান এক খাসিয়া উপজাতির লোক, ধুতি পরিহিত। জায়গাটি নাকি, পরবর্তিকালের ‘বিজু সিনেমার’ সম্মুখে। এর চার বছর আগে শিলং রাজধানী হয়েছে। তখন গরুর গাড়িই ছিল একমাত্র পরিবহন। খাসি যুবকটির চেহারার সেই সময়কার ছাপ স্পষ্ট। ১৪২ বছর আগেকার ছবিটির জন্য আফজলদাকে ধন্যবাদ। আফজলদার বাবা, আওলাদ হোসেনও শিলঙের সাংস্কৃতিক জগতে ভাল অভিনেতা ছিলেন।

তাদের পরিবারটি পশ্চিমবঙ্গের ও শিলঙের রাজধানী অভিধা পাবার আগে থেকেই আফজল-দাদের পূর্বপুরুষ শিলঙে এসেছেন। এর আগে, চেরাপুঞ্জি রাজধানীর সঙ্গেও। তাদের যোগাযোগ ছিল। তাই, শিলঙের বাঙালিদের সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা আফজল হোসেনই করতে পারেন৷ এঁরাই কিন্তু লেখার প্রকৃত হকদার৷

আলোচনার সময়সীমা বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের প্রারম্ভ পর্যন্ত৷ মেঘালয় রাজ্য সৃষ্টির পর শিলঙের নতুন “অধ্যায়” শুরু হলো৷ কেবল উপজাতিগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালি নয়, সব গোষ্ঠীর কাছেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে একটি প্রত্যাহ্বান হিসেবেই হাজির হলো৷

বছর দশেক যখন আমার বয়েস, তখন আমাদের পাড়া থেকে অনেক দূরে একটি স্কুলে যেতে শুরু করলাম, পথে পড়ত চপলা বুক স্টল যা এখনও দাঁড়িয়ে আছে একই জায়গায় এই সেদিন পর্যন্ত, এখন শুনেছি এর স্থানান্তর হয়েছে৷ সেই বইয়ের দোকানে বসে দুইভাই মনে হত দু'টি “স্ট্যাচু” বসে আছেন৷ কিনতে গিয়ে যখন বইয়ের নাম বলতাম, গম্ভীর আওয়াজে প্রশ্ন আসত, মানে বইয়ের বইয়ের লেখকের নাম। এরা ছিলেন চপলা বুক স্টলের মালিক দুই ভাই বিভুভূষণ চৌধুরী ও তাঁর ভাই৷ চপলা বুক স্টল নিশ্চয়ই শিলঙের এক ল্যান্ডমার্ক বা হেরিটেজও বলা যেতে পারে, এক জীবন্ত ঐতিহ্য। ঠিক এখন, শিলঙের বাইরের বাতাবরণ খুব সুস্থ বলে মনে হয় না। মাঝে মাঝেই এখানে সেখানে অশুভবার্তা কানে আসে, খারাপ লাগে৷ মনে হয়, এই বইয়ের দোকানের কথা। আশি-নব্বই বছর পুরনো হবে হয়তো৷ কিন্তু চারিদিকে এতো ঝড়-ঝাপটা সত্বেও এখনও টিকে আছে। এটা গর্বের কথাও বটে৷

আমাদের পাড়া রিলবং ছোট পাড়া, কিন্তু প্রায় শতবর্ষ থেকেই এক সংহত সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। তিন ও চার প্রজন্ম থেকে প্রত্যাহ্বান আসছে। এই প্রজন্মের হাতে নেই অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা। স্বভাবতই এই প্রজন্মের বেশির ভাগ ছেলে-মেয়েরা নিজেদের খেয়েপরে বেঁচে থাকার সন্ধানে বাইরে চলে গেছে, কেউই যেন স্বাভাবিক মনে হয় না। রিলবঙের পূজা মন্ডপের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু পুরনো লোকেরা ‘দেশ’ ছাড়ছেন। রিলবঙের ঐতিহ্য সম্পন্ন ‘নেতাজি পাঠাগারে’ পাঠক নেই। বইয়ে ঠাসা এই পাঠগারটিতে গ্রাহকশূন্য অবস্থা মেনে নিতে কষ্ট হয়। অথচ পাঠগারটিতে একজন গবেষকের গবেষণার সব রসদ মজুদ আছে। নেতাজি পাঠাগার (রিলবং) ও রবীন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগার (পুলিশবাজার), দু’টিই ছিল শিলঙের বড় রকমের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে। জ্যোতিরিন্দ চৌধুরী (মুকুলদা) রবীন্দ্র  স্মৃতি গ্রন্থাগারটিকে নিজের আপন সন্তান বলেই ভাবতেন। খুব বেশি দিন আগের কথা তো নয়। তাঁর মৃত্যুর পর যেন শেষ হয়ে গেল। এটা কেন হলো? বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, রবীন্দ্র স্মৃতি গ্রন্থাগার ও নেতাজি পাঠাগার, এইগুলি শিলঙের বাঙালিদের বড়ধরনের ঐতিহ্য ছিল৷ নেতাজি পাঠাগরার এখনও আছে, কিন্তু এই প্রজন্মের পাঠকদের উৎসাহ যেন কমে যাচ্ছে৷

আমাদের পাড়া ছিল ছোট্টটি, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল, আমাদের বর্ণপরিচয় হয়েছিল এই বিদ্যালয়ে৷ আমাদের সময়ে শিক্ষার আরম্ভ হয়েছিল মাতৃভাষায়, ইংরেজিতে আমরা একটু বড় হয়ে পাঠ নিয়েছি৷ এতে আমাদের ক্ষতি-বৃদ্ধি কি হয়েছে জানি না, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে এই প্রথাই চালু ছিল দেশে৷ প্রথম থেকেই ইংরেজি শিক্ষা ও মাতৃভাষার পুরোপুরি নির্বাপন, ঔপনিবেশিককালে ছিল না৷ যে স্কুলে পড়তাম, সেখানে নাকি পুরোপুরি এখন ইংরেজি মাধ্যম৷ শিলঙের শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেচে৷ দেশ যখন স্বাধীন হয়েছিল তখন সবাই ভেবেছিলেন দেশে “রাজার” পরিবর্তন হয়েছে, সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি একই থাকবে৷ কিন্তু না, সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে৷ যে স্থানে একটি জনগোষ্ঠী নিজের মত করে অনেক কিছু গড়ে তুলেছিল, সেই জায়গাটিকে এখন চিনে নিতে কষ্ট হচ্ছে৷ আমাদের দেশের দক্ষিণে পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ আছে, অসংখ্য ছোট-বড় মাঝারি দ্বীপের সমাহার এই দেশটি৷ বর্তমানে দেশটি ডাচ্রা শাসন করত তিনশো বছর ধরে৷ ইন্দোনেশিয়া নামে আমরা জানি এখন৷ সেখানে চীনা অভিবাসী “জনতা” ছিল৷ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল এদের হাতে। ডাচ আমলে এদের কোন অসুবিধা ছিল না। উদ্যমী জাতি চীনা। কিন্তু ডাচ শাসনের আমলে এদের কপাল ভাঙল, নতুন শাসকরা এদের অপছন্দ করতে লাগল। কিন্তু এদের মত জাতি, সংখ্যায় অল্প হলেও সারা ইন্দোনেশিয়া জুড়ে এদের উপস্থিতি ছিল। নতুন শাসকদের চোখে এরা হয়ে গেল ‘ব্রাত্য’। এই বিবরণ অবশ্য কোন তুলনা নয়, কিন্তু সর্বত্রই যেন নতুন শাসকরা পুরনো কিছুকেই মানতে চায় না।

একশো বছরের সম্পর্ক খুব কম সময়ের নয়। শিলঙে বাঙালিদের সঙ্গে ‘স্থানীয়’ লোকেদের ‘সামাজিক’ সম্পর্ক ঘটেছে। এটাই স্বাভাবিক ছিল। আমাদের পাড়া রিলবং আয়তনে খুব বড় নয়। এই ছোট পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত বাল্যবন্ধু স্বদেশ৷ সে এখন এই পৃথিবীতে নেই, সে তার যৌবনে এক খাসিয়া যুবতীর প্রেমে আবদ্ধ হয়ে বিয়ে করল। কিন্তু স্বদেশ তার খাসিয়া ‘বহুকে’ তার নিজের ঘরে নিয়ে এলো৷ অদ্ভুত তৎপরতায় সে উপজাতীয় বধূকে একেবারেই বাঙালি ঘরের বৌ করে তুলল৷ এই একশো বছরে শিলঙে স্বদেশ মোটেই একা নয়, অবশ্যই অসংখ্য বাঙালি-উপজাতির মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের এক অতি ক্ষুদ্রাংশই স্বদেশের বাঙালি-উপজাতি নয়, অবাঙালিদের সঙ্গেও ঘটেছে৷ বেশির ভাগ এরকম সম্পর্কের পরিণতি ঘটেছে উপজাতির সমাজে এদের সন্তান-সন্ততি মিশে গেছে৷ একটি “মাতৃ অনুসারী” পরিচয়ের নিদর্শন থাকবে না৷

খাসিয়াদের মধ্যে একটি উপাধি আছে “ডখার”, এর অর্থ হল বিদেশী৷ কিছু শ্রদ্ধেয় খাসিয়া জননেতার পূর্বপুরুষ যে এরকম সামাজিক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মনে হয় শিলঙে স্থিত বাঙালিদের মধ্যে প্রতি ১২-১৫টি পরিবারের মধ্যে একটিতে হয়ত উপজাতি রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে৷ এটা অবশ্য একটি সম্ভাব্য অনুমান, তবে খুব অমূলকও নয় এই বিশ্বাস৷ শিলঙে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে হয়ত, ভবিষ্যতে আরোও হবে৷; “করণিক বাঙালি” শিলং থেকে এরই মধ্যে অপসারিত৷ যে সব পল্লী বাঙালির স্মৃতি নিয়ে বিরাজ করছিল, এই পল্লীগুলি স্তিমিত শক্তিতে এখনও রয়েছে৷ বাঙালি লড়াকু বা উদ্যমশূন্য কিনা তা নিয়ে “বিতর্ক” থাকতেই পারে৷ কিন্তু তাদের এক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছ যা দিয়ে তাদের চিহ্নিত করা যায়৷ রক্তের মিশ্রণ ঘটেছে দেড়শত বছরে, সেই সঙ্গে রয়েছে সাংস্কৃতিক যোগ৷ এ থেকে শিলঙের বাঙালিকে আলাদা করা যায় না৷   

বাবার শিলঙে আসার প্রসঙ্গে শুরু করেছিলাম আমার শিলং চর্চা। বাবা এই শিলং শহরেই দেহরক্ষা করেন আষাঢ় মাসের এক ঘনঘটাচ্ছন্ন দিনে, ১৩৮৪ বাংলায় তাঁর শিলঙে বসবাস ছিল অর্ধ শতাব্দীরও বেশি। সাহিত্য পরিষদে প্রবন্ধ পাঠে তাঁর ডাক পড়ত প্রায়ই। সম্পাদক কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য আমাদের পল্লীতেই থাকতেন। বিপত্নীক কুমুদরঞ্জনের কাছে সাহিত্য পরিষদই ছিল সবকিছু। বক্তা ছিলেন না, কিন্তু তাঁর সাহিত্যপ্রীতি ছিল খুব৷ আমাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল৷ চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক ছিলেন তাঁর জামাতা৷ সেই সুবাদে প্রচন্ড রকমের “রাডিকাল” ও প্রায় উদ্ভ্রান্ত, ঋত্বিক শিলঙে এসেছেন অনেক বার৷ “মেঘেঢাকা তারা” চলচ্চিত্রটি শিলঙের প্রাকৃতিক আবহে তৈরি হয়েছিল৷ নায়ক অনিল চট্টোপাধ্যায় ও নায়িকা সুপ্রিয়া চৌধুরীকে শিলঙে দেখেছি৷ ঋত্বিকের শ্বশুরমশাই, কুমুদ ভট্টাচার্য থাকতেন রিলবং পাড়ায়৷ সেখানে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের দর্শন হয়েছিল আমার৷

আফজলদার বাড়িতে ধুতি পরিহিত গরুর গাড়ির চালকের ছবি আছে৷ খুব ছোট সময়ে খাসিয়াদের ধুতি পরতে দেখতাম৷ অতি পুরনো দিনেও কে সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল, কিন্তু সাংস্কৃতিক পরিবেশ যেন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে৷ নংক্রেম নৃত্যেও খাসিয়া পুরুষদের পরিচ্ছদও সেই ধুতি৷ বাবার এক খাসিয়া বন্ধু ছিলেন কালিচরণ রায়৷ তিনি বাবাকে বলতেন, তুমি-আমি তো এক, অর্থাৎ তোমার ও আমার নামের অর্থ তো এক৷ এরকম “নামধারি” খাসিয়া অনেকে ছিলেন৷ স্বাধীনতার সময়ের খাসিয়া জননেতা জে জে এম নিকলস রায়ের পরিচিতি কম ছিল না৷ তাঁর আদ্য নাম জয়মোহন৷ শোনা যায়, তাঁর ও পূর্বপুরুষ বাঙালিই ছিলেন৷ আজ এক লহমায় যদি শিলঙের সব বাঙালি “নিশ্চিহ্ন” হয়ে যায়, তাহলে সেখানে এক “সাংস্কৃতিক” শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা সহজে পূরণ হবে না৷ আফজল হুসেনের বাড়ি শিলঙের পুলিশবাজারের কাছে, আর তাঁর বাইরের ঘরে বিস্তৃত দেওয়ালে টাঙানো ছবির সময়কাল ১৮৭৮ সাল, মাত্র চার বছর আগে শিলং আসামের রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছিল৷

শ্রীতপন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের লেখা ‘রবীন্দ্রনাথের শিলং ভ্রমণ’ কাহিনী পড়লাম সাপ্তাহিক বর্তমানে (৮ আগষ্ট, ২০২০)। মালবিকা বিশারদের নামের উল্লেখ আছে। মালবিকা ‘শিলঙে রবীন্দ্রনাথ’ নিয়ে কাজ করছে, সেইসব ঐতিহ্য যা রবীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তা সংরক্ষণের দাবীও রাখে সব সময়। এ কাজে অবশ্য আরো অনেকেই রয়েছেন। “পড়োবাড়ি” কেসি দের বাংলোর কম্পাউন্ড কত বড় হতে পারে তা আন্দাজ করা যেতে পারে যে মেঘালয় রাজ্যের অস্থায়ী বিধানসভা এই বাংলোর এক কোণায় অবস্থিত। তার পরও অনেক খালি জায়গা ও মূল বাংলো বাড়িও বাড়িও রয়েছে। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী ‘উম্ সিরপি’ মৌন নীরবতায় কত শতাব্দী ধরে৷ মালবিকা রিলবং পল্লীর প্রয়াত মাস্টারমশাই রবীন্দ্র বিশারদের পুত্রবধূ, কলকাতার মেয়ে। আমি আসলে শিলঙের “বর্ন অ্যান্ড ব্রট আপ” এই বাংলোবাড়ি ব্রুকসাইড্, আমাদের ছোট সময়ে পড়োবাড়ির মত মনে হত৷ বিশাল এলাকা নিয়ে কে সি-দের বাংলো৷ কিরণ চন্দ্র দে ব্রিটিশ আমলের আইপিএস অফিসার৷ ১৯১৯ সালে যখন রবীন্দ্রনাথ এখানে ছিলেন তখন রিলবং পাড়ার জন্ম হয়নি৷ এমন কি ১৯২৩ সালে জিৎভূমিতে থাকার সময়ও রিলবং পাড়ার অস্তিত্ব ছিল না৷ এখন রিলবং পাড়াকে ঘিরে বিভিন্ন বাংলোবাড়িগুলির মালিকানা এখন বিভিন্ন মালিকানায় চলে গেছে৷ বিস্তীর্ণ পাইনের বন কোথায় হারিয়ে গেছে৷ জিগজাগ রোড কোন পোষাকী নাম নয়, আমারাই কেবল বলতাম৷