কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

কোম্পানি আমলে বঙ্গে Doorgah পূজা

দীপঙ্কর ঘোষ

Dipankar Ghosh.jpeg

দূর্গা পূজার সাথে জড়িয়ে আছে জাতি গঠন বা সংহতি চিন্তা।  বৈদিক সুক্তে  দেবী নিজ মুখে বলেছেন "অহং রাষ্ট্রী" অর্থাৎ আমি রাষ্ট্রস্বরূপিণী, এই জগতের অধীশ্বরী একমাত্র আমিই । দেবীমুর্তির মধ্যে সেই ঐক্য চেতনা ও জাতিগঠনের ইঙ্গিত আমরা দেখতে পাই। দুর্গা প্রতিমা মানে বৃহত্তর হিন্দু জাতি বা হিন্দুসমাজ। তাই এই পূজায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, ক্ষৌরকার, কুম্ভকার, ধনী-গরীব, জাতি-ধর্ম- বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। একটি রাষ্ট্রকে পরিচালনা করতে জ্ঞানশক্তি, ক্ষাত্রশক্তি, ধনশক্তি ও জনশক্তি এই চারটি শক্তির প্রয়োজন। রাষ্ট্রপরিচালনায় এই চার শক্তির সমন্বয়ের প্রতীক হচ্ছে দুর্গাপূজা আর বঙ্গদেশের দুর্গাপূজাতো শুধু রাষ্ট্রশক্তির প্রতীকই নয় এর সঙ্গে জুড়ে আছে তার অর্থনীতি, সমাজভাবনা, লোকাচার, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সবকিছুই। এই নির্ভেজাল সত্যটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে সাহেবরা খুব ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন। হিন্দুদের মন জয় করে সুচারুভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে তাই তাঁরা দুর্গাপূজাকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাছাড়া এদেশে হিন্দুদের ভাবাবেগেকে আঘাত করে একের পর এক মুসলমান শাসকের উত্থানের ইতিহাস তখনও খুব পুরনো হয়নি। তাই রাজা-প্রজা নির্বিশেষে বঙ্গের শ্রেষ্ঠতম সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজায় নেটিভদের যত আনন্দ তার চেয়েও বেশি উৎসাহ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। কলকাতার বড়লোকদের বাড়ির দূর্গাপুজায় আমন্ত্রিত হতেন সাহেব মেমরা। বড় বড় সাহেব কর্তাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ এর কার্ড যেত। সাহেবরা তাঁদের মেম আর বাচ্চাদের নিয়ে সেজেগুজে নিমন্ত্রণ রক্ষায় যেতেন। যেসব বড়লোকের সঙ্গে সাহেবদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বা ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল না তাঁদের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে নিমন্ত্রণ জানানো হতো। ১৭ অক্টোবর ১৮২৯ -এর 'সমাচার দর্পণে' লেখা হয়েছিল, "ক্রমে ক্রমে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের আমলে যাঁহারা ধনশালী হইলেন তাঁহারা আপনাদের দেশাধিপতির সমক্ষে ধনসম্পত্তি দর্শাইতে পূর্বমত ভীত না হওয়াতে তদৃষ্টে এই সকল ব্যাপারে অধিক টাকা ব্যয় করিতেছেন। "
 

এমন কথা লেখার পিছনে কারনও ছিল। সে সময় এদেশীয় বিত্তবানদের মধ্যে দুর্গাপূজায় নিজেদের বনেদিয়ানা আর ধন-সম্পদ দর্শানোর একটা প্রতিযোগিতা ছিল।  প্রভাব-প্রতিপত্তি আর সামাজিক কৌলিন্য দেখানোর জন্য জাঁকজমক আর আড়ম্বরের কোন সীমা ছিল না।  কার পূজায় কজন ইংরেজ সাহেব এসেছেন তা ছিল একটা চর্চার বিষয়। এ নিয়ে সরকারি মহলে নিজেদের প্রভাবের কথাটাও বেশ ফুটে উঠত। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে এক একটি ধনী পরিবারে তৎকালীন দুর্গাপূজায় পাঁচ-ছয় লক্ষ টাকা খরচ হতো। আজকের দিনের হিসেবে টাকার পরিমান কত তা ভাবলে মাথা ঘুরে যায়। কোম্পানি যেমন দুর্গোৎসবে আর্থিক সহায়তা করতো তেমনি পূজায় সাহেব-বিবিদের নিমন্ত্রণ করে এনে তাঁদের খুশি করে কোম্পানির আস্থাভাজনও হওয়া যেত। এভাবে চলতে চলতে একটা সময় কলকাতার পূজা পরোক্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পূজা হয়ে দাঁড়ালো। খ্রিস্টীয় আঠারো-উনিশ শতকে ইংরেজ বণিকদের আনুকূল্যে বা ইংরেজ সরকারের চাকরি সূত্রে কলকাতায় এক নতুন ধনীবাবুর সৃষ্টি হলো। এই জাতীয় পয়সাওয়ালা মানুষদের Gentoo(জেন্টু) বলা হত। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে হলওয়েল 'Interesting Historical Events' গ্রন্থে লিখছেন, " Doorgah Puja is the Grand general feast of the gentoos, usually visited by all Europeans(by invitation) who are treated by the proprietor of the feast with the fruits and flowers in seasons and are entertained every evening whilst the feast losts, with bands of singers and dancers. "
 

কলকাতার দুর্গোৎসব সম্বন্ধে এই নথিবদ্ধ প্রমাণ রাজা নবকৃষ্ণদেবের সময়কালের। রাজা নবকৃষ্ণদেব তাঁর এক বন্ধুকে লিখেছিলেন, " এবার লর্ড ক্লাইভ পূজার সময় আমার বাড়িতে প্রতিমা দর্শন করতে আসছেন তোমার এবার আসা চাই-ই।" রাজা নবকৃষ্ণদেবই প্রথম সাহেবদের নিমন্ত্রণ করে দুর্গাপূজায় শামিল করেন। তারপর তাঁর দেখাদেখি অন্য বড়লোকরাও সাহেবদের নিমন্ত্রণ করতে শুরু করেন। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের 'ক্যালকাটা ক্রনিকেল' পত্রিকায় এরকম আরো ক'জন বড় লোকের নাম পাওয়া যায়, যাঁদের মধ্যে প্রাণকৃষ্ণ সিংহ, কেষ্টচাঁদ মিত্র, নারায়ন মিত্র, রামহরি ঠাকুর, বারাণসী ঘোষ ও দর্পনারায়ন ঠাকুরের নাম রয়েছে। এছাড়া সেসময়ের যেসব বড়লোক দুর্গোৎসব করতেন তাঁদের মধ্যে রামকান্ত চট্টোপাধ্যায়, রাজা সুখময় রায়, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর অন্যতম।
 

সেকালের দুর্গোৎসবে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা যোগদান করতেন তার প্রমাণ আমরা পাই ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর তারিখের 'বঙ্গদূত' পত্রিকায়- " মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুরের দুই বাটীতে নবমীর রাত্রে শ্রী শ্রী যুত গবরনর জেনারেল লর্ড বেন্টিং বাহাদুর ও প্রধান সেনাপতি শ্রী শ্রী যুত লর্ড কাম্বরমীর ও প্রধান প্রধান সাহেবলোক আগমন করিয়াছিলেন। " শুধু যে লাটসাহেবরা আর অন্য সাহেব মেমরা পূজা দেখতে আসতেন তা নয় মাঝে মধ্যে মন্দিরে তাঁরা পূজা দিতেও আসতেন, বিশেষভাবে কোম্পানির কোন সংকটকালে। কালীঘাটে এসে সাহেবদের পূজা দেওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ওয়ার্ড সাহেব লিখেছেন, "আমি এমন বিবরণ পেয়েছি যে ইউরোপিয়ানরা নিয়মিতভাবে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন এবং দশ হাজার টাকা অবধি তাঁরা পূজা-অর্চনায় খরচ করেন।  হালেই  অনারেবল কোম্পানির এক কর্মচারী মোকদ্দমা জিতে কালীঘাটে তিন হাজার টাকার পূজা দিয়ে এসেছেন। " ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাঙালির দুর্গোৎসবকে কতটুকু গুরুত্ব ও মর্যাদা দিতে তার প্রমাণ পাই চিপস সাহেবের এক ঘটনা থেকে। এই চিপস সাহেব হলেন হান্টারের, ' Aunals of Rural Bengal' এর বিখ্যাত ম্যানুফ্যাকচারার জন চিপস, বীরভূমের জনপ্রিয় 'শ্রীযুত চিক বাহাদুর' এবং পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অডিটর জেনারেল। প্রথম জীবনে যখন চিপসের ব্যবসা কিছুতেই জমছিল না তখন কোম্পানির অফিশিয়ল মেজাজের কথা মাথায় রেখে তিনি দুর্গাপূজা শুরু করেন এবং অচিরেই তাঁর ভাগ্য ফিরে যায় তারপর আমৃত্যু তিনি এ পূজা চালিয়ে যান।
 

এ কথাগুলোর উল্লেখ পাওয়া যায় দেবব্রত দাসের,' ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গোৎসব' নামে বিশেষ রচনায়(সাপ্তাহিক বর্তমান ৯ অক্টোবর ২০২০ সংখ্যায়)।  তিনি আরো লিখেছেন যে নেটিভদের পূজায় বা আনন্দ উৎসবে যোগ দেওয়া ছিল সাহেবদের সাধারণ শিষ্টাচার। কোম্পানি তখন সরকারিভাবে হিন্দুদের সম্পত্তি তদারকি করতো। কমিশনে লোক লাগিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রী টেনে এনে মন্দিরের আয় বাড়াতো। প্রতিদিন ঠিকমতো পূজা বা ধুনো দেওয়া হচ্ছে কি না সাহেব কর্মচারীদের কর্তব্য ছিল সেগুলো দেখাও। আইন ছিল যে  নেটিভদের পর্বের দিনে দেবতার সম্মানার্থে কোম্পানির ফৌজকে এসে সামরিক কায়দায় স্যালুট দিতে হতো, কামান দাগাতে হতো, বিগ্রহের পেছনে পেছনে মার্চ করতে হতো।
 

সেসময়ের কলকাতার বাবুদের বাড়ির দুর্গোৎসবের আরও একটা অঙ্গ ছিল জলসা, বাইজি নাচ,আর অঢেল খানাপিনার আয়োজন। সুরেলা কন্ঠের নর্তকী আনার জন্য বাবুদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল।  আবার যে শ্রেষ্ঠ নর্তকী আনতে পারতেন সাহেবদের চোখে তাঁর কদরও বাড়তো।  যেহেতু ধনীবাবুদের বাড়ির দুর্গোৎসবের সঙ্গে কোম্পানির সাহেবরা একাত্ম ছিলেন তাই বড় বড় ইংরেজি পত্রিকায় তখন ফলাও করে দুর্গাপূজার খবর আর কোথায় কী অনুষ্ঠান হচ্ছে তার বিবরণ থাকত। বিজ্ঞাপনে বাইজিদের নাম থাকত- নর্তকী নিকি, বেগম জান, শ্রীজান,হিঙ্গল, আসারুন, হীরা বুলবুল প্রভৃতি।  নাচ গানের সঙ্গে সং-ও ভাড়া করে আনা হতো যারা লম্বা পা লাগিয়ে হেঁটে বা কাচের বোতল চিবিয়ে সাহেব আর বাবুদের আনন্দ দিত।
 

ফ্যানি পার্কস তার 'ভ্রমণ বৃত্তান্তে' এক বড়লোকের বাড়ির দুর্গা পূজার কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন যে, " পূজা মন্ডপের পাশের একটা বড় ঘরে নানারকম উপাদেয় খাবার অঢেল পরিমাণে সাজানো রয়েছে। সবই বাড়ির কর্তার সাহেব অতিথিদের জন্য। খাবার সরবরাহ করছেন বিদেশি পরিবেশক মেসার্স গান্টার এন্ড হুপার।  খাবার জিনিসের সঙ্গে বরফ ও ফরাসি মদও প্রচুর।... বাইজিদের নাচ -গান সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিল। "
 

ধীরে ধীরে কোম্পানির আনুকূল্য হারিয়ে বাবুদের বাড়ির দুর্গোৎসবের রং ফিকে হতে লাগল। সেই আমোদ, আল্হাদ, খানাপিনা সবকিছুতেই একটা দৈন্য দেখা দিল।  সাধারণ মানুষ তখন এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নতুন পথ খুঁজতে লাগল।  এল বারোয়ারি পূজার পরিকল্পনা।  বাঙালির পূজা আবার ঘুরে দাঁড়ালো। এত আলো, এত আনন্দ যে আজ বাবুর বাড়ির ঠাকুরদালান থেকে সাধারণ্যে নেমে এসেছে তার কারন কিন্তু  সাহেবদের পৃষ্ঠপোষকতায় সেই দুর্গোৎসবের  ধুমধামের রেশকে ধরে রাখতেই। বারোয়ারি পূজার
 

উৎস সন্ধানে ইতিহাস ঘাটলে হয়তো আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে কিন্তু আজ না হয় থাক সে গল্প।

তথ্য ও ঋণ স্বীকার:-
(১) অপরাশক্তি মা মহামায়া- স্বামী অতীশানন্দ( শারদীয়া ১৪১৭ নবকল্লোল)
(২) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গোৎসব -দেবব্রত দাস