কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

।। শারদ প্রাতে রাত পোহালো ।।

ডঃ স্বরূপা ভট্টাচার্য

Swarupa Bhattacharjee.jpg

ঈশান কথা'র শারদ পত্রের জন্য লেখা দিতে অনুরুদ্ধ হয়েছি। লেখাতে আমার বরাবরই ভয়। মুশকিল হচ্ছে এই করোনাকালে মালাবারেও  পালাবার পথ নেই। অতঃপর নিতান্ত দীন-হীন চিত্তে চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে মনে যেন হঠাৎই একটা মন খারাপের মেঘ চেপে বসল। এই বেয়াড়া রোগটা মাঝে মাঝেই আমায় ভোগায়। কলম হাতে মনটা চলে গেল অনেকদূর । প্রায় চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছর আগে।  যেখানে এমনি এক শরতের ভোরে ছোট্ট একটি মেয়ে শিউলি তলায় শিউলি কুড়োচ্ছে। দোসর তার পাঁচ বছরের বড় জ্যাঠতুতো দাদা। শিউলিতলা টা ফুলের চাদরে মোড়া। ঘাস মাটি প্রায় দেখাই যায়না। বড় বড় দুধ তিনটে ডালা শুধু শিউলি ফুলে ভর্তি হয়ে গেছে। এছাড়াও রয়েছে থোকা থোকা গোলাপি স্থল পদ্ম আর লাল জবা। 


চল্লিশ বছর আগের সময় সিনেমার দৃশ্যের মত চোখের সামনে পরপর ফুটে উঠছে। চারদিক সরগরম বাড়িতে হাঁকডাক চলছে। বড় জেঠু সপরিবারে এসে গেছেন। আমার মা দুর্গার মত দেখতে মনি মা'র তত্ত্বাবধানে রান্নাঘরে উদয়াস্ত রকমারি রান্না হয়ে চলেছে। যেন রান্না খাওয়া ছাড়া জীবনে আর কোন কাজ নেই। ফোঁড়ণ হিসেবে রয়েছে অপূর্ব হিউমারের অনুষঙ্গ। আমাদের ছোটদের তো পোয়াবারো। পড়াশোনার বালাই নেই, বকাঝকার ভয় নেই, নেই চোখ রাঙানো- দিবারাত্রি শুধু অনাবিল আনন্দ। সেই আনন্দের মধ্যে পোশাকের কোনও প্রতিযোগিতা নেই। নেই কোনো দেখনদারির পেছনে ছোটা। সত্যি কথা বলতে সেই সময়টায় আমাদের মনে পোশাক নিয়ে আদিখ্যেতার কোন জায়গা ছিল না। নতুন কাপড় হলেই হল। কটা হল অথবা হলো না সেটা নিয়ে যে চিন্তা করার কোনো ব্যাপার রয়েছে সেটাই তখন আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। বায়না বা আবদার করে বড়দের সেরকম কোনো অস্বস্তিতে ফেলেছি বলে মনে পড়ছে না। যেটা নিয়ে আমাদের ছোটদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলত সেটা হচ্ছে নারকেলের নাড়ু,  নারকেলের সন্দেশ অথবা ক্ষীরের সন্দেশ কে কতটা চুরি করতে পারলাম। সেটা যে কি আনন্দের ছিল তা লিখে বোঝানো যাবে না। মজার ব্যাপার ছিল আমাদের এই চুরিটা ধরা পড়লেও মা ঠাকুরমারা এ সময় অপার করুণাধারা বর্ষণপূর্বক বিশেষ বকাঝকা করতেন না।


আমাদের এই কম্পিটিশনে আমার ছোট বোন তখন ও যুক্ত হয়নি। কারণ তখন ও সে অনেক ছোট। আমার-ই বা বয়স কত হবে? মেরে কেটে ছয় সাত। আরেকটু বড় হতে আরেকটা ইস্পেশাল ব্যাপার যোগ হল। তখন ক্লাস থ্রি ফোর হবে। শুরু হলো কমিকস বা অমর চিত্র কথা'র কালেকশন। পুজোয় বাড়ি আসার সময় জেঠু গৌহাটী ষ্টেশন থেকে দাদাকে ট্রেনে পড়ার জন্য অনেকগুলো কমিকস কিনে দিতেন। দাদা সেগুলোর সদ্ব্যবহার আদৌ করত কি না জানা নেই। তবে শিলচর বাড়িতে পদার্পণ করামাত্র সেগুলোর অলিখিত মালকিন আমিই হয়ে যেতাম। এই কমিকস এর জন্য আমি সারাবছর অপেক্ষা করে থাকতাম। বাবাও মাঝে মধ্যে দিতেন। কিন্তু পুজোর সময়ে কমিকস গুলো পাওয়ার মজাটাই ছিল আলাদা। আসলে আমাদের 'শিশু বিতান' স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে একটা অলিখিত কম্পিটিশন ছিল-- কার কাছে কত কমিকস কালেকশন রয়েছে। এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে এইসব 'পাগলামো' বোধহয় আর নেই।

 
পুজো মানেই হৈহৈ রৈরৈ ব্যাপারটা চিরদিনই ছিল,  এখনও আছে। কিন্তু আমার ছোটবেলায় ক'টা ঠাকুর দেখলাম- সে হিসেবটাও কখনো করেছি বলে মনে পড়ছে না। আসলে তখন যৌথ পরিবারের এফেক্টটা এমনই ছিল যে ঐ ক'টা দিন পারিবারিক হৈ-চৈতেই বুঁদ হয়ে থাকতাম। মা আর মণিমা তো খাটতে খাটতে নতুন কাপড় পরার সময়ই পেতেন না। অষ্টমীর দিন বাড়িতে ঘটের পুজো হত। সপ্তমীর দিনটা তার যোগাড়েই কেটে যেত। আর নবমীতে এতদিনের ক্লান্তির ভারে আর রাস্তায় ভিড়ের ভয়ে মায়েরা আর বেরোতেই চাইতেন না। এই প্রসঙ্গে মায়ের মুখে শোনা একটা মজার গল্প মনে পড়ছে। একবার মা আর মণিমা'র পুজোর কাপড়ে কি একটা ব্যাপার হল, বদলাতে হবে। বদলানোর জন্য দশমীর আগে তাঁরা আর সময় বের করতে পারলেন না। দশমীর দিন দুপুর বেলা কোনোরকম সময় বের করে গেলেন 'মাতৃ বস্ত্রালয়' (যেটা তখন আমাদের পরিবারের সম্বৎসরের বাঁধা দোকান ছিল) । সেলসম্যানের হাতে আগের কাপড়টা তুলে দিয়ে গল্প করতে করতে দুজনেই চেয়ারে একটু গা এলিয়ে দিলেন। হঠাৎই তাঁরা আবিষ্কার করলেন বসে বসেই তাঁরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এত ক্লান্তি। পুজোর ছুটিতে যৌথ পরিবার ছুটির আনন্দে সরগরম। শুধু বাড়ির বৌদের কোন ছুটি নেই । বরং এ সময়টা তাদের খাটুনি দ্বিগুণ ত্রিগুণ বেড়ে যায় সকলের ছুটির আনন্দ পরিপূর্ণ ভাবে যাতে উপভোগ করতে পারেন তার যোগান দিতে। তাই তাদের না থাকে বেড়ানোর অবকাশ, না পারেন পুজোর নতুন কাপড় পরার সময়। একটু অবকাশ পেলে চোখ জুড়ে নেমে আসে রাজ্যের ক্লান্তি। যাই হোক, কহানী মেঁ টুইস্ট হল চটকা ভাঙতে মা দেখেন এতদিনের পরিশ্রমের পর সেলসম্যান ও গদীতে শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন আর তার নাক ও ভুঁড়ি যোগ্য সঙ্গত করে চলেছে।

 

আরেকটা মজার কথা মনে পড়ছে। পুজোর সময় যে বস্তুটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটা হল বন্দুক। কালো বন্দুক আর চিকন ফিতের মত রোল করা গুলি না হলে পুজো অসার বলে মনে হতো। জেঠুর বদন্যতায় বন্দুক প্রাপ্তি হত।একবার হয়েছে কি বাড়িতে ঘটপুজোর দিন, অল্প কিছু লোকসমাগমও হবে; মা রান্না বসিয়েছেন।তখন গ্যাসের উনুন ছিলনা, ছিল সাবেকি চূলো। যদ্দুর মনে পড়ছে, মা বড় কড়াইতে বাঁধাকপি বসিয়ে কোথাও গেছেন,আমি আর আমার বিচ্ছু দাদাটি আস্তে আস্তে রান্নাঘরে গিয়ে দুই প্যাকেট গুলি চুলোর আগুনে।আর যায় কোথা ! দম-দম-দমাস বিকট শব্দে গুলি ফাটছে তো ফাটছেই। ইতিমধ্যে মাও এসে দেখে আমরা চোরের মতো বেরোচ্ছি রান্নাঘর থেকে।আর শব্দের আকস্মিকতায় সকলের আতঙ্কিত হয়ে ছুটে আসা, মা'র চিৎকার সহযোগে লম্ফ এবং সর্বোপরি আমাদের দুজনের পিঠে উত্তম মধ্যম পড়াটা এখনও মনে পড়লে হাসির উদ্রেক করে।

পুজো উপলক্ষে অনেকগুলো শারদীয়া পত্রিকা আসত বাড়িতে। এখনও আসে।মা আর মনিমা'র মধ্যে কে কোনটা লুকিয়ে রাখবেন তা নিয়ে রীতিমত হেলদি প্রতিযোগিতা লেগে থাকত। যে কোনো একটা লাইন শুনেই বা পড়েই মনিমা বলে দিতে পারতেন এটা কোন লেখকের লেখা।এই ব্যাপারে আমার মাও কম যেতেন না। এখনও যাননা।

আমার মনিমা'র বাড়ি আসাটা সকলের কাছে একটা বিরাট উৎসবের ব্যাপার ছিল।দেখতে শুনতে ,চিন্তায় ভাবনায়,চলায় ফেরায় অসাধারণ ব্যাক্তিত্বময়ী ছিলেন। ছিলেন খুব স্নেহময়ীও।তার উপর তাঁর আভিজাত্য, পড়াশোনা, অফুরন্ত রসবোধ, এবং অসাধারণ সেনসিটিভিটি তাকে অনন্যসাধারণ করে তুলেছিলো।আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেরই অসাধারণ প্রিয়পাত্রী ছিলেন। ছিলেন আমাদের পরিবারের প্রাণকেন্দ্র।এমনি এক অসাধারণ প্রাণবন্ত মানুষ এক শারদ প্রাতে অনেক অভিমানে আমাদের সকলের কাছ থেকে পুজোর সবটুকু রঙ কেড়ে নিয়ে চলে গেলেন কোন সুদূরে....সব সীমানার পার ছাড়িয়ে ... কোন অনন্তলোকে।

পুজো এলেই তাই মন-খারাপের মেঘটা বেশি করে চেপে ধরে।যৌথ পরিবারের মূল্যবোধ এখন অনেকটাই ম্লান। কর্পোরেট দুনিয়ায় পুজোর মাহাত্ম্য হারাতে বসেছে বাঙালি। কিন্তু বাঙালি মনটা তো রয়ে গেছে।সে তো চায় বারবার ফিরে সেই শারদ প্রাতের ছোঁয়া পেতে।তাই বাড়ি ভেঙে যতই ফ্ল্যাটবাড়ি উঠুক না কেন, বাঙালি মননের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।বানিপাড়ায় ধুপছায়া এপার্টমেন্টে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ফ্ল্যাট বুকিংয়ের সময় রণধীরবাবুকে বলেছিলাম এক চিলতে মাটি রেখে দেওয়ার জন্য। তিনি আমার অনুরোধ রেখেছেন। সেই এক চিলতে মাটিতে সগৌরবে দাঁড়িয়ে একটি শিউলি গাছ শরৎ কালের প্রকৃতি আর মার আগমনবার্তার জানান দেয়।প্রতি সকালে তাঁর অফুরন্ত ফুলের ভান্ডার মাটিতে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলে ' আমায় ভুলে যেওনা'। আমার মেয়ে শিউলি কুড়োতে কুড়োতে যখন বলে - ' মা, এত ফুল, গন্ধে ম-ম করছে' - নিঃসন্দেহে নিজের ছোটবেলাকে খুঁজে পাই। এভাবেই এই মানসিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে যাক। রাত পোহালেই মায়ের আগমন। সমস্ত কালিমাকে ধ্বংস করে শুভ্র পবিত্রতার স্পন্দনে দিক্- দিগন্তর মুখরিত হোক, আজ এটাই আন্তরিক কামনা।