কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

শিলচরের দূর্গোৎসবে নাটক : অতীত, বর্তমান এবং ...

 

সুবীর ভট্টাচার্য

Subir Bhattacharjee.jpg

শিলচর শহর নাটকের শহর। অবশ্য অনেকেই হয়ত ' নাটকের শহর ' শব্দটিতে আপত্তি জানাবেন। আপত্তি থাকতেই পারে। তবুও আমি ' নাটকের শহর ' শব্দটি ব্যবহারে অটল থাকবো। নাটকই এই উপত্যকার মানুষের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের একমাত্র মাধ্যম, এবং আজ থেকে ১৫০ বছর আগেও এখানকার বাঙালিদের সাংস্কৃতিক জীবনে নাটকের যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল। এই নাটককেন্দ্রিক সংস্কৃতির ফলে যে কোন নতুন ভাবনা চিন্তা বৃহত্তর মানুষের কাছে উপস্থাপনার জন্য নাটক অবলম্বন করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। ছিন্নমূল বাঙালির সাংস্কৃতিক কাজকর্মের ধারা অনুযায়ী এইসব নাটক পূজা-পার্বনে মঞ্চায়ন হতো এবং এইসব মঞ্চায়নের মাধ্যমে এখানকার বাঙালির নাট্যজগতে প্রবেশের হাতে-খড়িও হতো। ফলে ছোটবেলা থেকেই নাটক, মঞ্চ,আলো সম্বন্ধে সকলেরই সম্যক একটা ধারণা জন্মে যেত। আমার নিজের কথাই বলি--- ছোটবেলায় পূজা-পার্বনে চেনা পরিচিতদের করা নাটকের প্রতি এক বিরাট আকর্ষন ছিল। নাটক দেখার অভিজ্ঞতাও প্রচুর এবং অভিনব। নাটক নিয়ে স্কুলে,ক্লাবে ও আড্ডায় নাটক নিয়ে কম বেশী আলোচনাও হতো। বস্তুত সাংস্কৃতিক আলোচনা বলতে ছিল আগের রাতে দেখা নাটক নিয়ে আলোচনা।  তখনকার দিনে বিশেষ কোন পত্র-পত্রিকাও ছিল না। যে কটি ছিল সে কটিতেও নাটক নিয়ে কোন আলোচনা প্রকাশ হতো বলে আমার স্মৃতিতে নেই। যাইহোক, ছোটবেলায় পূজামণ্ডপে বা নাট্য উৎসবে নাটকের প্রতি যতই মোহ থাকুক না কেন, নব্বইয়ের দশকে বরাক উপত্যকা তথা শিলচরের নাটকের প্রতি দর্শকের একধরণের উন্নাসিকতা তৈরী হতে থাকে। এর কারন অবশ্য ছিল এখানকার নাট্যগোষ্ঠীগুলির নাটকের ব্যাপারে সম্পূর্ণভাবে কলকাতার মুখাপেক্ষীতা। বহুক্ষেত্রেই যেসব নাটক কলকাতায় সাফল্য অর্জন করেছে সেগুলিকে নির্বিচারে এখানকার নাট্যদলগুলি অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করা। সবগুলি নাটকই যে খারাপ  ছিল তা নয়। তবে বেশীরভাগ নাটকই ছিল একধরণের অগভীর নাট্যচিন্তার ফসল। তাই এখানকার দর্শকরাও হলে অনুপস্থিত থেকে নাটকগুলি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে এ ব্যাপারে নাটকার,নির্দেশক, অভিনেতা চিত্রভানু ভৌমিক ও শেখর দেবরায় ব্যতিক্রমী ছিলেন। তাঁরা দুজনেই অনেকদিন ধরেই শিলচরের নাট্য দর্শকদেরকে একের পর এক নাটক আজ অবধি উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। দর্শক যে তাঁদেরকে সাদরে গ্রহণ করছে তা দর্শকের উপস্থিতিই বুঝিয়ে দিচ্ছে। দর্শকের প্রতিক্রিয়া যাইহোক, নাট্যকর্মীদের মনে নাটক যে করতে হবে,  এবং সেই নাটকগুলি নিজেদেরই লিখতে হবে। ভাল নাটক করতে গেলে তা নিজেদেরই লিখা হতে হবে। এ নিয়ে সংশয়হীন হয়ে নাট্যকর্মীদের দৃঢ বিশ্বাস হলো নিজের নাটক ছাড়া আশাজাগানো দর্শকের প্রতিক্রিয়া আমরা পাবো না। আশার কথা, শিলচর তথা বরাক উপত্যকায় অনেক অনেক নাট্যকার নাটকের জন্ম দিয়েছেন এবং সফল মঞ্চায়নও করেছেন। উল্লেখেনীয় যে ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে আমরা নাট্যকর্মীরা চিত্রভানু ভৌমিক,শেখর দেবরায়, ইন্দ্রনীল দে,সুজয় ভট্টাচার্য, প্রয়াত যীশু চন্দ,প্রয়াত দেবব্রত চৌধুরী, প্রয়াত বিশ্বজিত চৌধুরী, প্রয়াত সলিল পাল(পাথারকান্দি) দীপেন্দু দাস, অরিজিৎ আদিত্য, শেখর দাস, চম্পা ভট্টাচার্য, কল্যানী চৌধুরী, জয়া দেব,মৌটুসি বিশ্বাস তাঁদের নাট্যলেখনীতে বরাক উপত্যকার নাট্যচর্চাকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাচ্ছেন।

বরাক উপত্যকা তথা শিলচরের নাটক নিয়ে যদি আলোচনা করতে হয় তাহলে দুটো ভাগে ভাগ করতেই হবে। এক স্বাধীনতা পূর্ব দুই স্বাধীনতা উত্তর কাল। স্বাধীনতা পূর্বে আমরা প্রায় সবাই জানি, নাট্য ইতিহাসের তথ্য অনুসারে ১৭৯৫ খ্রীষ্টাব্দে হেরাসিম লেবেডেফের কলকাতার বেঙ্গলি থিয়েটারে অভিনীত ' কাল্পনিক সংবদল ' নাটক থেকেই বাংলা নাটকের সূচনা। ১৮৭১ সালে ' নীলদর্পণ ' নাটকের স্রষ্টা দীনবন্ধু মিত্র শিলচরে এসেছিলেন। ১৮৭৩ সালে তিনি লিখলেন বরাক উপত্যকার ইতিহাস নির্ভর বিখ্যাত নাটক ' কমলে কামিনী '। উনিশ শতকের বাংলা স্থান করে নিল বরাক উপত্যকার ইতিহাস। সে সময় মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল কবিগান,পাঁচালী ও যাত্রাগান। আধুনিক মনষ্ক রাম কুমার নন্দী সেই উনিশ শতকে  লিখলেন দাতা কর্ণ, কংস বধ ইত্যাদি নাটক। ১৯০৪ সাল নাটকের জন্য এক ঐতিহাসিক ক্ষণ। শিলচরে ডাকঘর কর্মীরা অভিনয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। ১৯১০ সালে আর,ডি,আই হল উদ্বোধন হবার পর শিলচরের নাট্য চর্চা এক নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে যায়। এরপর একে একে রবি ঠাকুরের  'রাজা রাণী', নিজস্ব অনুবাদে শেক্সপীয়ারের 'ম্যাকবেথ',নিজস্ব অনুবাদকৃত ফরাসি নাটক 'টিন্টাগিলিসের মৃত্যু ' মঞ্চস্থ হয়। প্রাক স্বাধীনতা পর্বে বরাক উপত্যকায় প্রথম সর্বসমক্ষে এসে মহিলারা " মেঘমল্লার নাটকটি অভিনয় করলেন। নির্দেশনা ছিলেন প্রয়াত মালতি শ্যাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ফলে স্বাভাবিক নাগরিক জীবন যাত্রায় বাধা আসে। স্বাভাবিকভাবে গতিময় নাট্যচর্চায় বিঘ্ন ঘটে।

স্বাধীনোত্তর কাল থেকে শহর শিলচরে দূর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নাট্যচর্চা আবার শুরু হয়। পাশাপাশি আমাদের গ্রামীণ সাংস্কৃতিক চর্চাও দূর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে। গ্রামীণ সংস্কৃতি মুখ্য আকর্ষন ছিল যাত্রানুষ্ঠান। অনেক যাত্রাদল তৈরী হলো। দূর্গোৎসবকে কেন্দ্র করেই বরাকের প্রতিটি চা বাগানে যাত্রার আসর বসত। শিলচরে স্বাধীনতা পূর্ব থেকেই যাত্রানুষ্ঠানের রমরমা ছিল। এই যাত্রাশিল্পের যারা পুরোধা ছিলেন এবং শিলচরের নাগরিক জীবনে থেকেও ওরা কিন্তু যাত্রাশিল্পকে বেছে নিয়েছিলেন। তারমানে,দূর্গাপূজায় যাত্রানুষ্ঠান অবধারিত অনুষ্ঠান হিসাবেই মেনে নিতেন। যার ফলে আমরা শিলচরে অনেক যাত্রাদল তৈরী হয়েছে। অনেকেই হয়ত জানেন,যাত্রা নিয়ে যারা  এখনো কাজ করে যাচ্ছেন, টিমটিম করে হলেও এখনও যাত্রাশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার আকুল প্রয়াস করে যাচ্ছেন। তারমধ্যে প্রথম নাম অবশ্যই শিলচর পুলিশ দলের। শিলচর পুলিশ দলের রিজার্ভের পুজোর তিনদিনই যাত্রার আসর বসত। তারপরই পুলিশ দল জেলার নানা প্রান্তরে পুরো মাস ব্যাপী দল নিয়ে যাত্রা করতেন। শহর এবং গ্রামের মানুষ পূজো উপলক্ষে যে আনন্দ উপভোগ করা এটা কিন্তু যাত্রার মাধ্যমেই করতেন।

অন্যদিকে স্বাধীনতা কালীন সময়ের জ্বালা যন্ত্রণা নিয়ে যারা শিকড় বিচ্ছিন্ন মানুষ এই বরাক উপত্যকার মধ্যে বর্তমানে তিন জেলার মধ্যে বাস করছেন যাদের মধ্যে অনেকেই শ্রীহট্টের বাসিন্দা ছিলেন। তার ফলে দেখা গেছে যে নাগরিক জীবনের শিক্ষাদীক্ষার পরিবর্তন। বরাকের প্রত্যেকটা অঞ্চলের করিমগঞ্জ,হাইলাকান্দিতে আধুনিক শিক্ষার ফলে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তারাই কিন্তু দূর্গাপূজার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাটককে অগ্রাধিকার দেন। প্রতিটি মন্ডপে একদিকে পূজোর অনুষ্ঠান আরেকদিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নৃত্য,গান তো ছিলই সঙ্গে মুখ্য আকর্ষন ছিল নাটক বা যাত্রা। আমরা সবাই জানি, করিমগঞ্জে অনেক নাটক হতো,হাইলাকান্দিতে হতো,শিলচরে তো হতোই। বিভিন্ন পাড়ায় নাটকের একটা রেওয়াজ ছিল।

ইংরেজি শিক্ষা লাভের মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্য নাট্য সাহিত্যের সঙ্গে শিক্ষিত বাঙালির যে পরিচয় ঘটল তারই স্থায়ী প্রভাব বাংলা নাটকের মঞ্চায়নে প্রতিফলিত হলো। যেমন, নতুন নতুন স্কুল,কলেজ,অফিস এসে যাওয়ায় বাইরে থেকে মানুষ এসে এই উপত্যকায় বসবাস শুরু করে। তখন আমরা অনেক আধুনিক নাটকের প্রতিফলন দেখতে পাই। এরমধ্যে শিলচরের মধ্যে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব আর্যপট্টি দূর্গাপূজা কমিটি। তাঁদের নিজস্ব অস্থায়ী মঞ্চ ছিল। আর্যপট্টি অঞ্চলের নাটকঅন্ত প্রাণ যারা ছিলেন তাঁদের মধ্যে সাধন দত্ত,পান্না নাগ,দিলু ধর,যীশু চন্দ ও অগ্রজ আরো অনেক। তাঁরা সবাই মিলে একটি স্থায়ী মঞ্চ তৈরী করেন। উন্নতমানের দীর্ঘ নাটক আর্যপট্টি মঞ্চে মঞ্চস্থ হলো। রক্তকরবী,উল্কা,ক্ষুধিত পাষানের মতো নাটক শিলচরের নাট্যামোদী দর্শক দেখতে পেলো। আমরা যারা ষাটোর্ধ তাঁরা জেলা গ্রন্থাগারে নাটক না দেখে আর্যপট্টিতেই আমাদের নাটক দেখা শুরু হয়েছিল।১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আর্যপট্টি মঞ্চে একের পর এক মঞ্চসফল নাটক মঞ্চস্থ হলো। যেমন- বিল্বমঙ্গল,ফুল্লরা, সাবিত্রি প্রাণের দাবী, ঋণংকৃত্বা, মেঘমুক্তি,পথের শেষে,মিশরকুমারী, মানময়ী গার্লস স্কুল,রঘুবীর,পল্লীসমাজ, প্রফুল্ল, বিন্দুর ছেলে,এবং তথ্য না পাওয়া  আরো অনেক। স্বাধীনতা উত্তর কালে ক্ষুধিতপাষাণ, লৌহকপাট, মেঘে ঢাকা তারা,সিরাজের স্বপ্ন,খুনি কারা,বাংলার শেষ নবাব,রক্তের জবাব,দুইমহল,অন্য ছায়া,সম্রাটের মৃত্যু এবং আরো অনেক নাটক মঞ্চস্থ হয়।  এই মঞ্চ যাদের শৈল্পিক অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁদের মধ্যে ক্যাপ্টেন নলিনী মোহন গুপ্ত,প্রফুল্ল মুখার্জী,হীরালাল সাধ্য,দূর্গাদাস রায়,সীতেশ মহারাজ,ধীরেন ব্যানার্জী,সুনীল কুমার রাহা,নলিনী মোহন দেব,রমন চন্দ্র দাস,গঙ্গেশ চন্দ্র চৌধুরী, ভজন লাল মুখার্জী,নির্মল ভৌমিক,সুধাংশু চৌধুরী, চন্দন গুপ্ত, ননী গুপ্ত, রাজেন্দ্রলাল সেন ইত্যাদি। যেসব পুরুষ শিল্পীরা নারীচরিত্রে অভিনয় করতেন তাঁদের মধ্যে শক্তি গুপ্ত,অনিল রায়,সুধীন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য, পরিমল মুখার্জী উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে আমরা পাই সাধন দত্ত,পান্না নাগ,পল্টু দত্ত,শিবু গুপ্ত,টুনটুন চৌধুরী মন্টু বনিক,মহাদেব বনিক,চয়ন ভট্টাচার্য, রুপু চন্দ,চয়ন এন্দো,সুব্রত ভট্টাচার্য, তরুন রায়,বলাই চৌধুরী, বিপ্লব দত্ত,সুপ্রিয় ভট্টাচার্য বাদল ধর প্রমুখ। মহিলা শিল্পীদের মধ্যে কল্যাণী চৌধুরী, টুবলী রাহা,মিষ্টু চন্দ এবং অনেকেই এই মঞ্চকে সমৃদ্ধ করেছেন। সাধন দত্তের নির্দেশনায় ক্ষুধিতপাষাণ ও প্রমিথিউস এক অনন্য সৃষ্টি।

নাট্যকথা বল্লেই মধ্যশহর সাংস্কৃতিক সমিতির নাম উল্লেখ করতেই হয়। মধ্যশহরে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য, পরান চক্রবর্তী,স্বনামধন্য হিন্দী চিত্র পরিচালক মণি ভট্টাচার্য ছিলেন নাট্য মঞ্চায়নের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে দূর্গোৎসবে তাঁদের নির্দেশিত পথে চলে অনেক নাটকের মঞ্চায়ন হয়। কঙ্কাবতীর ঘাট,সীতা (নিজস্ব), টিপু সুলতান,রক্তকরবী,সুরা,নারী ও সিংহাসন, সংক্রান্তি, থানা থেকে আসছি,মহাবিপ্লব, ফেরারী ফৌজ, রবিঠাকুরের শেষরক্ষা,ভক্তিমাধব চট্টোপাধ্যায়ের ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কিন্তু কেন,কাঞ্চনরঙ্গ নাটকগুলি উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী সময়ে দূর্গাপূজা উপলক্ষে নাট্য মঞ্চায়ন স্থিমিত হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে প্রশান্ত বসু ও অজয় চক্রবর্তী নাট্য প্রযোজনার সেই সোনালী দিনগুলি ফিরিয়ে আনতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। মধ্যশহর নাট্য মঞ্চায়নে যাদের অভিনয়ে গুণান্বিত তাঁদের মধ্যে মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য, কালীনন্দন কর্মকার,পরান চক্রবর্তী,আশীষ দাস,বিনয় গাঙ্গুলী,ডা:ঋষিকেশ ভট্টাচার্য, পবিত্র দাসগুপ্ত,রুনু গুপ্ত,ড: লালবিহারী নাথ,দেবেন্দ্র চক্রবর্তী,ননী কর্মকার,সাধন কর্মকার,নীলু সেনগুপ্ত,বাদল চক্রবর্তী,ইন্দুভূষণ ঘোষ,মানিক দেবরায়,প্রশান্ত বসু প্রমুখ এবং অভিনেত্রীদের মধ্যে গোপা আইচ,স্রবা দত্ত,মীরা ভরদ্বাজ,মায়া সেনগুপ্ত,মায়া চক্রবর্তী,দীপ্তি ভরদ্বাজ,তুলসি সাহা,বাসন্তি চক্রবর্তী উল্লেখযোগ্য।

আর্যপট্টি,চৌরঙ্গী, মধ্যশহর ও রামকৃষ্ণ মিশন রোড পূজোর তিনদিনই নাটক মঞ্চস্থ করতেন। রামকৃষ্ণ মিশন রোড ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি নিরবিচ্ছিন্নভাবে দূর্গোৎসবে নাটক মঞ্চায়নের ধারা বজায় রেখে চলেছেন। যদিও বর্তমান  অতিমারীর কারনে গতবছর কোন প্রযোজনা করতে পারেন নি। এবারও হয়ত সম্ভব হবে না। নাট্য অনুষ্ঠান ছাড়া যেন রামকৃষ্ণ মিশন রোডের পূজা অসমাপ্ত থেকে যায়। পূজা আয়োজনের শুরুর সময় থেকেই মণ্ডপ তৈরীর সাথে সাথে অস্থায়ী মঞ্চও তৈরী করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটকের মঞ্চায়ন হতো। এক পয়সার পালা,কালপুরুষ, মুকুট, ঝাঁন্সী রাণী,রানার,লৌহকপাট, বাঞ্চারামের বাগান,নরক গুলজার,দৃষ্টি,রানা প্রতাপ,মুক্তারী মাইর,শিল্পী চাই,ভাড়াটিয়া চাই,কেনারাম বেচারাম,ইত্যাদি নাটক উল্লেখযোগ্য। ঝুনু নাগ,ফণী দাশগুপ্ত,ব্রজেন্দ্র নাথ,রণি দাশগুপ্ত, ননীগোপাল দেব,রবীন্দ্র ব্রম্মচারী,শেখর দেবরায়,মনোজ দেব,প্রদীপ দাস,নিশিকান্ত দত্ত,সুদীপ দেব এবং অভিনেত্রীদের মধ্যে কৃষ্ণা দেবরায়,রত্না দাস পুরকায়স্থ, রাখী দেব,টুকু নাগ,মান্না দত্তরায়,দীপালি নাথ,সান্ত্বনা রায়চৌধুরী,নীলিমা দেব উল্লেখেনীয়। তাঁদের পূজার মঞ্চেই পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রাপালা মঞ্চ হয়।

ইটখোলা দূর্গাবাড়ি। এই অঞ্চলটি হিন্দী ভাষী মানুষদের বসবাস বলেই পরিচিত। এই মন্ডপেই অস্থায়ী মঞ্চে দূর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দী নাটক মঞ্চস্থ করতেন। দূর্গা মণ্ডপের ঠিক বিপরিত দিকে অস্থায়ী মঞ্চ ছিল। সেটি এখনও বর্তমান আছে কিন্তু দু:খের ব্যাপার নাটক আর মঞ্চস্থ হয় না। একদিকে আমাদের ভাবভক্তি,আরেকদিকে আমাদের সংস্কৃতি। সত্যি কথা বলতে কি,আমাদের মতো অনেক শিল্পীরা আজকে যারা নবীন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের আঁতুড় ঘর কিন্তু ঐসব অস্থায়ী মঞ্চ। দূর্গাপূজার অস্থায়ী মঞ্চের নাটকের মধ্য দিয়েই আমাদের হাতে-খড়ি। কারন, শিশুরা, কলেজ পড়ুয়া,বয়োজ্যেষ্ঠরা নাটকে যোগ দিয়ে এই দূর্গাপূজার সময়েই স্বত:স্ফুর্তভাবে নাটক করতেন। এই নাটকের মধ্য দিয়েই সবার মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে  যেতো।

স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই অম্বিকাপুর দূর্গাপূজা কমিটি নাটকের আয়োজন করতেন। ঐ সময়ে কর্ণাজুন নাটক সাড়া জাগিয়েছিল। সীতেশ দেবগুপ্ত,মনোরঞ্জন দেব,সুখময় সিংহ,অহিন্দ্র পুরকায়স্থ, আশুতোষ পালিতের অভিনয় গুণে নাটকটি এক অন্যমাত্রায় চলে গিয়েছিল। অম্বিকাপুর বর্তমান চৌরঙ্গীতে একের পর এক  ভিন্ন স্বাদের নাটক মঞ্চায়ন হয়। নাটকগুলির মধ্যে ধাত্রী পান্না,উত্তরা, রাঠোর বিপ্লব,সতী তুলসী, দেবলা দেবী, উল্লেখেনীয়।  আশীর দশকে চোর, উল্কা,মহেশ,সাহেব বিবি গোলাম,কানা গলি,অংশীদার, সোনার বাংলা,দুই পুরুষ,সিন্ধু গৌরব,বঙ্গে বর্গী নাটক খুবই সমাদৃত হয়। তখন যাদের অভিনয়ে অম্বিকাপুর অঞ্চলের মানুষরা রাত জেগে নাটক দেখতেন তাঁরা হলেন প্রয়াত মৃণাল কান্তি দত্ত বিশ্বাস(পলু), মুকুল দত্ত,কিরণময় নাগ,অনাথবন্ধু ভৌমিক(চানু), নলিনী দাস,শচীন্দ্র লোধ,নরেশ পাল,শ্যামল রায়,রঞ্জিত ঘোষ,মিলন সেন,হরি চক্রবর্তী,সুভাষ দেবনাথ,অজিত বিশ্বাস,শান্তিময় সেনগুপ্ত,জ্যোৎস্নাময় দত্তরায়,মাখন চক্রবর্তী প্রমুখ। এবং মহিলা অভিনেত্রীরা ছিলেন গোপা চৌধুরী, অনন্যা রায়চৌধুরী, কৃষ্ণা মিশ্র ও ভরদ্বাজ বাড়ির মেয়েরা। নাট্যসমৃদ্ধ অম্বিকাপুর থেকেই আলোক শিল্পী সুভাষ চৌধুরী এবং রন্টু বাগচিকে আমরা নাট্য অঙ্গনে দেখতে পাই। বর্তমান সময়ে তাঁদেরই উত্তরসূরি দেবজ্যোতি রায়(টিন্টু) কে নাট্য আলোকশিল্পী হিসাবে মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরো যারা,নাট্যধারাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁদের মধ্যে প্রভাস দেব চৌধুরী, সুশান্ত কৃষ্ণ দাস,অবিনাশ চক্রবর্তী,ষন্ময় সেন,কাজল রায়,অমিয় নাগ,কানন ভট্টাচার্য, বুলু বিশ্বাস,নানকু বিশ্বাস,তারামণি ভট্টাচার্য, সেবা চৌধুরী, অলি কর,আলো রায় এবং আরো অনেকেই উল্লেখযোগ্য।

পাব্লিক স্কুল রোড দূর্গাপূজা কমিটিও পূজো উপলক্ষে বহুবছর ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাট্যানুষ্ঠান করে আসছে। কিন্তু নাট্য তথ্য অপ্রতুলতা হেতু নামগুলি উহ্যই থেকে গেল। নাট্যাভিনয়ে অংশ নিয়েছিলেন আশীষ ভৌমিক,প্রদীপ দাস,বাচ্ছু চৌধুরী, সুব্রত রায়,বিভু রায়,প্রবীর দাস,প্রয়াত সঞ্চিতা বিশ্বাস,রুমি রায়,শিবানী দাস অন্যতম।

জেল রোড দূর্গাপূজা কমিটিও দূর্গাপূজার পক্ষকালীন সময়ে  (বর্তমান দশরুপক সংস্থার মাঠ) নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান করে থাকে। এখানের অনুষ্ঠানে নাট্যকার চিত্রভানু ভৌমিক ও দশরুপক সংস্থার প্রত্যেক সদস্যরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকেন। শুভ্রাংশু শেখর দত্ত,অশোক দত্ত,বিবেক দাশগুপ্ত, স্বপন দাস, প্রয়াত বিশ্বজিৎ দত্তরায়,শিবশংকর দত্তরায়,সন্তোষ চক্রবর্তী,মিতালী রাজকুমারী, নয়না চৌধুরী, চিত্রভানু ভৌমিক এবং নাম না জানা অনেকেই নাট্যাভিনয়ে অংশ নিয়ে দর্শককুলকে সমৃদ্ধ করছেন।

নাট্য মঞ্চায়ন আলোচনার মধ্যেই যাত্রাশিল্পের কথা বিশদভাবে বলা উচিৎ।  যাত্রা এমন একটা শিল্প বাঙালির রক্তের মধ্যে পুথিত। আমাদের প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ তাঁর রঙ্গমঞ্চ প্রবন্ধে লিখেছিলেন--- " আমাদের দেশের যাত্রা আমার ঐ জন্য ভাল লাগে। যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটা গুরুতর ব্যবধান নাই। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আনুকুল্যের প্রতি নির্ভর করিয়া কাজটা বেশ সহৃয়তার সহিত সম্পন্ন হইয়া উঠে। " এই গ্রামীণ শিল্পটি শহরেও কিন্তু দাপিয়ে বেড়িয়েছিল। পুলিশ রিজার্ভ,আনন্দ পরিষদ,তারাপুর রাইসমিল,সুভাষনগর,শ্মশানরোডে প্রতি বৎসর দূর্গাপূজার দিনে বা পরের পক্ষকালের মধ্যে যাত্রা অনুষ্ঠান হতো। নব্বইএর দশকে পুলিশ রিজার্ভে পূজোর তিনদিন যাত্রানুষ্ঠান হতো। ইদানিংকালে পুজোর একদিন যাত্রা এবং দুদিন চটুল হিন্দী গানের অনুষ্ঠান হয়। নবীন প্রজন্ম যাত্রার প্রতি সেই আবেগ,অনুভূতি আর নেই। কোথায় যেন সবকিছু হারিয়ে গেছে। বর্তমানে (যাত্রাদলের অভাব হেতু হয়ত) সেসব জায়গায় যাত্রার আসর বসে না। যদিও রাইসমিল এখন নাটক মঞ্চায়নের দিকেই ঝুকে গেছেন। এইভাবে প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় নিজস্বই হোক বা আমন্ত্রিত দলের মাধ্যমে নাট্য মঞ্চায়নের প্রয়াস নাট্য সমৃদ্ধির পথেই নিয়ে যাবে। এইভাবেই হয়ত সময়ের সাথে সাথে সংস্কৃতির রুপ,রস বদলে যায়। এই বদলে যাওয়া কি আমরা মেনে নেব..! আমার মনে হয়, বাঙালি হিসাবে আমাদের মেনে নেওয়া থেকে মনে নিয়ে যদি ধরে রাখতে পারি তাহলেই হয়ত: আমাদের দূর্গাপূজা উপলক্ষে নাট্যানুষ্ঠানের বিশেষত্ব থাকে। তারজন্যে যেসব পাড়ায় সংস্কৃতিমনা কর্মীরা আছেন তাঁদের কাছে হয়ত: এটা একটা প্রত্যাহ্বান। এই সময়ে দাঁড়িয়েও দূর্গাপূজা উপলক্ষে উৎসবের মেজাজের লক্ষ্যে নাটক তৈরী করে নাট্যানুষ্ঠানকে প্রমোট করা এটাই হচ্ছে নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতি কর্মীদের সময়ের আহবান।

২০২১ এ দাঁড়িয়ে আমাদের অনেক মঞ্চ কিন্তু সেই জৌলুষ আমরা ধরে রাখতে পারি নি। অনেক কারন হয়ত আছে। বর্তমানে জায়গার অভাবটাই প্রকট। যেমন চৌরঙ্গীতে নাট্য মঞ্চায়নের ইচ্ছে থাকলেও জায়গার অভাবে মঞ্চায়নের  প্রয়াস নিতে পারেন না। আর্যপট্টি,মধ্যশহর,চৌরঙ্গী, আনন্দ পরিষদে নাটকের নামগন্ধ পাওয়া যায় না। পাব্লিক স্কুল রোড অবশ্য নিজস্ব এবং আমন্ত্রিত দলকে নিয়ে সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠানের বিশাল আয়োজন করছেন। দু- একটি স্থানে ব্যতিক্রম হলেও একটা শংকা থেকেই যায়, নাট্যশিল্পকে কিভাবে উত্তরণের পথে নিয়ে যাওয়া যায় তার মূল চাবিকাঠি কিন্তু নাট্যঅন্ত নাট্যকর্মীদের কাছেই।বিভিন্ন পাড়ার নাট্যকর্মীরা যদি বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে নাট্যাভিনয়ে যোগ দেন, তাহলে হয়ত স্থিমিত নাট্য মঞ্চায়ন থেকে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করাই যেতে পারে। শেষ হয়ে  গেছে এটা বলার সময় এখনও হয় নি। আমি জানি সব নাট্যকর্মীরাই স্বপ্ন দেখে।  আমিও দেখি একদিন শিলচরের নাট্যশিল্পে সেই জৌলুষ ফিরে আসবে, আসবেই।

বিশেষ কথা:- অনেক নাটক,যাত্রা, অভিনেতা, অভিনেত্রী এবং অনেক প্রযোজনার কথা হয়তো অন্ধকারেই থেকে গেলো। শিলচরের দূর্গাপূজার নাট্য ইতিহাস একটা প্রবন্ধ কেন পৃষ্টার পর পৃষ্টা লিখলেও শেষ করা যাবে না। শিলচরের নাট্যচর্চার পিছনে বিংশ শতাব্দির শেষ পর্যন্ত মিডিয়ার আশানুরূপ আশীর্বাদ নেই বল্লেই চলে। ফলে আস্থা রাখতেই হয় কিছু নাট্যবিজ্ঞ ও প্রবীন মানুষদের স্মৃতির উপর এবং কিছু পত্র-পত্রিকা ও স্মরণিকায় প্রকাশিত হওয়া প্রবন্ধ,নিবন্ধের উপর। কিন্তু তবুও, প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব থেকেই যায়। উপরিউক্ত লেখাগুলো কিছু রেখা মাত্র।

 

ঋণ স্বীকার~

শেখর দেবরায়, চিত্রভানু ভৌমিক, দীপক সেনগুপ্ত এবং কয়েকজন নাট্যকর্মী।