কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

অরণ্যের দিনরাত্রি : সংবেদনহীন চরিত্রের সমীক্ষা 

সন্দীপা দাস শীল

 

সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে অরণ্যের দিনরাত্রি ছবিটি নিয়ে কিছু কথা লিখেছেন লেখিকা...

Sandipa Das.jpg

সত্যজিৎ রায়' অরণ্যের দিনরাত্রি ' তৈরী করেন ১৯৭০ এ। স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের সমস্যাগুলো নিয়ে সত্যজিৎ রায় ওয়াকিবহাল নন- এ ধরনের সমালোচনার প্রত্যুত্তর হয়তো এই সিনেমা । অবশ্য এই কথাটা হলফ করে কেউই বলতে পারেন না। সত্যজিৎ রায় যেহেতু তার রাজনৈতিক মতবাদের বিশ্বাস নিয়ে কোনও কালেই সোচ্চার ছিলেন না- এটাও তাকে মার্কসবাদীদের সমালোচনার মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছিলো। অরন্যের দিনরাত্রি তেই আমরা দেখতে পেলাম ভিন্নধর্মী বিষয়ের অবতারণা। এই ছবির মাধ্যমেই সত্যজিৎ রায়ের Calcutta Trilogর যাত্রারম্ভ হয় । অনেকেই হয়তো মনে করবেন ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইছি কেন? - তার কারন যে সময়টায় Cinemaটা তৈরী হচ্ছিল সেই সময়টা ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। অনেক যুবক যুবতী তখন একটি বিশেষ রাজনৈতিক ভাবাদর্শে বিশ্বাস রেখে নিজেদের প্রাণ হারিয়েছিলেন। আর ঠিক এর বিপরীতে আমরা দেখি কিছু শিক্ষিত কিন্তু সংবেদনহীন, অনুভূতহীন, মূল্যবোধহীন চরিত্রকে। সত্যজিতের অন্য কোনও ছবিতে আমরা একসঙ্গে এতো সংবেদনহীন চরিত্র আগে দেখিনি।

 

ছবিতে দেখি চারজন শহুরে যবুককে পালামৌ অঞ্চলে বেড়াতে যায়। চারজন পুরুষ চরিত্রের চারজনকেই সংবেদনহীন বলা যায়। শহর ছেড়ে অরন্যে এসেও ওরা কেউ গাছপালা, প্রকৃতি, পশুপাখির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেনি যেখানে প্রতিটি দর্শক অরণ্যের পরিবেশের সঙ্গে একাত্ব বোধ করছিলেন। সত্যজিৎ এর অন্যান্য ছবির চরিত্রগুলো থেকে ওরা সম্পূর্ণ আলাদা। 'অশনী সংকেত'এর ক্ষুদার্থ অনঙ্গ বৌ কে আমরা দেখি আলু তুলতে গিয়ে লজ্জাবতী ফুল দেখে মুগ্ধ হয়। কি অদ্ভুত বিপরীতমুখীতা। প্রকৃতিকে নিংড়ে নিয়ে অনুভব করার মতো সুযোগ পেয়েও এই চার পুরুষচরিত্র নিজেদের চাকরী আর জুয়ার গল্প করে। তবু এরমধ্যেই আশার আলো দেখতে পাই যখন অসীম আর সঞ্জয়ের মুখে কলেজ জীবনে বের করা লিটল ম্যাগাজিনের গল্প শুনতে পাই। কিন্তু Forest Bunglow এর চৌকিদারের বৌ অত্যন্ত অসুস্থ জানার পরও ওদের একবারও খবর নিতে দেখা যায় না। অথচ মহিলাদের সঙ্গে মেমোরি গেম খেলারসময় সঞ্জয় (লেবার অফিসার) কে আমরা প্রথমেই কার্ল মার্কস নামটা বলতে শুনি। ওদের দলের আরও একজন যিনি ব্যর্থ ক্রিকেটার, হরিকে দেখা যায় সাঁওতাল যুবতী দুলিকে টানতে টানতে জঙ্গলে নিয়ে যায়। হরি দুলিকে মিথ্যে আশা দেখায়। অসীম যে কোনো এক বিখ্যাত প্রাইভেট কোম্পানীর এক্সিকিউটিভ, সে সুন্দরী, শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, উচ্চবিত্ত অপর্ণার প্রতি উৎসাহ দেখায়। আর সঞ্জয় কমবয়সী বিধবা জয়ার সঙ্গে ফ্লার্ট করে। এই চরিত্রগুলোর অনুভূতিহীন স্বত্তার সঙ্গে যোগ হয় মূল্যবোধহীনতা। হরি দুলিকে মিথ্যে আশ্বাস দেয় যে শহরে নিয়ে যাবে। সঞ্জয় বিধবা জয়াকে ভুলে যাবে শহরে চলে গেলেই। অসীম অপর্ণার মূল্যবোধ, তার মানসিকতা কিছুই জানার চেষ্টা করে না।

 

এই চারজন যুবককেই সবসময় দেখি নিজেকে জাহির করতেই ব্যস্ত। শেখর ফুল পেন্ট পরল। সঞ্জয় দাড়ি কামালো, অসীম ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবী পরল আর হরির ঝিমুনি কেটে গেলো। অথচ তাদের জঙ্গলে আসার অন্য উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু সংবেদনহীন, অনুভূতিহীন, মূল্যবোধহীন মানুষরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের ভণিতা ছেড়ে বেরোতে পারলো না।
 

এই ছবির একটি অন্যতম শ্রেষ্ট দৃশ্য মেমোরি গেম - মেমরি গেমে দেখা যায় পুরুষ ও নারী চরিত্ররা এক এক করে বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যাক্তিদের নাম বলছেন। একজন নাম বলার পর পরের জনকে আগের নামগুলো ক্রমানুসারে বলে নিজে অন্য একটা নাম জুড়তে হবে। আর এই দৃশ্যতেই বুঝতে পারি কিভাবে এই প্রজন্মের মানসিকতা নিয়ে পরিচালকের মোহভঙ্গ হয়। গেম যত এগোয় আমরা শুনতে পাই মার্কস, মাও, ক্লিওনেট্রার মত নাম। পরে শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ, রাণী রাসমনি, মুমতাজ মহলের নাম। একমাত্র শেখর স্বাধীনতা আন্দোলনের তিন মুখ্য ব্যক্তি গান্ধী, নেহেরু ও আজাদের নাম উচ্চারণ করে। স্বাধীন ভারতের সেকুলার, একাত্ম ভারতের ধারনা এই গেম এ সামঞ্জস্যহীন ভাবে প্রকাশিত হয়। এই দৃশ্যে আমরা বিবিধের মাঝে এক্য এই পোষিত ভারতবর্ষের ধারণা বদলে এক ছিন্নভিন্ন ভারতবর্ষ দেখতে পাই। এই নামগুলোর কোলাজ কোনও স্পষ্ট ভারতের ধারণা তৈরী করে না। এই উচ্চারিত নামগুলো আবার ও এক ভনিতার মতই ঠেকে ।

অরণ্যের দিনরাত্রি ছবিকে ব্লা যায় সংবেদনহীন চরিত্রের সমীক্ষা । সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতে যদি একাধিক চরিত্র থাকে, তাহলে চরিত্রগুলোর মধ্যে এক তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টি করেন। কিন্তু এই সিনেমায় আমরা সেই মেরুকরণ দেখিনা। চার বন্ধুর চেহারা, ম্যান্যারিজমের পার্থক্য থাকলেও এই চার যুবককে প্রায় একই লোক বলে মনে হয়। অন্য কোনও মানুষের প্রতি ওদের কোনও আগ্রহ নেই।

 

চারপাশের পরিবেশ নিয়ে যাদের আগ্রহ নেই তাদের ত্যে সংবেদনহীনই বলা যায়। এই চারটি চরিত্র একইরকম ভাবে সংবেদনহীন। এই ছবিতে সব চরিত্রকে ঘিরে রেখেছে প্রকৃতি। কিন্ত দুঃখের বিষয় এই ছবির চারটি চরিত্র সেই প্রকৃতির দিকে এক বারও তাকায় না।