কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

ডহরের ঘোর
পর্ব ৪ (শেষ পর্ব)
পল্লব ভট্টাচার্য 
০৩ মার্চ ২০২১

শক্তিপদ ব্রহ্মচারী,

পদ্য লিখে দম্ভ ভারী ।

শহর ভোগে কাব্য রোগে,

কু-লোকে কয় কম্ম তার-ই ।

"বহুদিন আগে শোনা; -কাব্যরোগে ভোগা একটি শহর, যেখানে পদ্য লিখে ভারি দম্ভ করেন কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী,

ফলে শহরে কাব্যরোগ দেখা দেয়, আর নিন্দুকেরা এর জন্য শক্তিপদের কম্মকেই দায়ি করে থাকেন।

এরকম যুক্তি-পরম্পরায় সাজানো, বর্ষীয়ান কবি বিমল চৌধুরীর উপরের লিমেরিকটি আজ যদি আমরা বিনির্মাণ করি,

তবে, প্রান্তিক শহর হয়ে ওঠা শিলচরের বিন্যাস থেকেই শুরু করতে হয়"...

 

গত ১ ফেব্রুয়ারি ছিল কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ১৬তম প্রয়াণবার্ষিকী (১৯৩৭ - ২০০৫) ...

অতন্দ্র যুগের এবং বরাক উপত্যকার সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা পুনঃপ্রকাশ করলাম

১৪১৩ বাংলায় মাহবাহু পত্রিকায় (Little Magazine) প্রকাশিত হওয়া পল্লব ভট্টাচার্যর এই লেখাটি।

চার পর্বে বিস্তারিত এই লেখাটির চতুর্থ (শেষ) পর্ব প্রকাশিত হল আজকে ...

ss1.jpg

পর্ব ১

 

শক্তিপদ ব্রহ্মচারী,

পদ্য লিখে দম্ভ ভারী ।

শহর ভোগে কাব্য রোগে,

কু-লোকে কয় কম্ম তার-ই ।

 

বহুদিন আগে শোনা; -কাব্যরোগে ভোগা একটি শহর, যেখানে পদ্য লিখে ভারি দম্ভ করেন কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, ফলে শহরে কাব্যরোগ দেখা দেয়, আর নিন্দুকেরা এর জন্য শক্তিপদের কম্মকেই দায়ি করে থাকেন। এরকম যুক্তি-পরম্পরায় সাজানো, বর্ষীয়ান কবি বিমল চৌধুরীর উপরের লিমেরিকটি আজ যদি আমরা বিনির্মাণ করি, তবে, প্রান্তিক শহর হয়ে ওঠা শিলচরের বিন্যাস থেকেই শুরু করতে হয়। টমাস ফিশারের উদ্যোগে, ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে, ব্রিটিশ অধিকৃত কাছাড়ের সদরদপ্তর স্থানান্তরিত হয় শিলচরে। আর ৪১ বছর পর, ১৮৭২য়ে রামকুমার নন্দী মজুমদার যখন কাছাড়ে বসে বীরাঙ্গনা পত্রোত্তরকাব্য রচনা করছেন, তখনও শিলচর, একটি ছোট্ট জায়গায় কাছারি গির্জাসহ মাত্র কয়েকটি ইটের বাড়ি নিয়ে নামমাত্র জেলাশহর। শিলচরের এই বিন্যাস প্রান্তিক যে কোনও মফস্বল শহরের মতোই। মফস্বল, কারণ ততদিনে অবচেতনে হলেও আমরা কলকাতার সদরত্ব বা রাজধানীত্ব মেনে নিয়েছি। শক্তিপদে এই মেনে নেওয়ার স্বীকৃতি ' শৈশবের নাভি থেকে এক সুতো কলকাতামুখীন '। যদিও সুরমা উপত্যকার বিপুল লোক-ঐতিহ্য এ অঞ্চলে জড়িয়ে আছে, তবু সদ্য গড়ে ওঠা এরকম মফস্বল শহরে, ' আধুনিকতা ' নামে উনিশ শতকের যে বিশিষ্ট চাহিদা, তার অভাব থাকাই স্বাভাবিক। এখানে বসে শক্তিপদ ব্রহ্মচারী নামের একজন কবি আজীবন কবিতাচর্চা করে গেছেন। এমন তো অনেক কবিই থাকেন, ছিলেনও, তবু শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর উপর-ই কেন শহরে কাব্যরোগ ছড়ানোর দায় চাপানো হচ্ছে ? এটা ভাবতে গিয়ে লিমেরিকের শেষ অংশে “পদ্য” শব্দটি বিশেষ ভাবে নজর এল। পাঠক, লক্ষ করুন, শক্তিপদের দম্ভ কিন্তু “পদ্য” লিখে, কাব্য বা কবিতা নয়। কবি বিমল চৌধুরী অন্তত সচেতনভাবেই তাই মনে করছেন। নইলে, পদ্যের বদলে কাব্য লিখলে যে লিমেরিকের ছন্দ টাল খেত না, এটা তো স্পষ্ট। (ভাবা যেতে পারে, তৎকালীন শক্তি চট্টোপাধ্যায় ব্যবহৃত পদ্য শব্দটির জনপ্রিয়তা তাকে টেনেছিল।) কিন্ত, শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতার একটা বড়ো অংশে আজ যখন আমরা পদ্যধর্মীতা লক্ষ করি, তখন এই ব্যবহার যে আদৌ অসচেতন নয়, বরং, শিলচর বা বরাক উপত্যকায় শক্তিপদের ছন্দ-মিলের ব্যাপক জনপ্রিয়তার মুলসূত্রটিও চিহ্নিত করার দিকে নিয়ে যায়, এ ব্যাপারে আমারা নিশ্চিত হতে পারি। কবিতাকে শিলচর শহরে জনপ্রিয় করে তোলার কম্মটি শক্তিপদ ও তাঁর বন্ধুদের । যাদের কম্মটি আজ, এ অঞ্চলে অতন্দ্রের আন্দোলন নামে চিহ্নিত ইতিহাস।

শক্তিপদ এই ইতিহাস রচনার একজন মুখ্য কারিগর। যদিও খুব স্পষ্টভাবেই তিনি বলেছেন, ' শিলচরে এসে আমি কবিতা লেখা আরম্ভ করিনি। ' তবু ১৯৫৬-য় হবিগঞ্জ থেকে শিলচরে আসার পরই যে, তরুণ শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবি শক্তিপদ হয়ে ওঠা, এটাও আমরা অস্বীকার করতে পারি না। শিলচরে, কলেজ ম্যাগাজিন থেকে সাহিত্যচক্র, বহু জায়গায় নিজেকে ছড়ানোর পর, আস্তে আস্তে যখন সমমনস্ক কয়েকজন তরুণ বন্ধুকে পেলেন, তখন থেকেই আধুনিকতার ক্ষুধায়, তৎকালীন বরাক উপত্যকার কবিতা জগতের পক্ষে ভিন্নতর একটা ভাষা সৃষ্টি করতে চাইলেন। তৎকালীন কৃত্তিবাসের কবিতা আলোড়ন হয়তো তাঁদের অন্যভাবে ভাবতে প্ররোচিত করেছিল। তাঁদের সেই ভিন্নতর কবিতা রচনার বাহন হয়ে, ১৯৬৩ তে, দৈনিক প্রান্তজ্যোতির পাক্ষিক ক্রোড়পত্র হিসাবে প্রকাশিত হল, কবিতার "অতন্দ্র" সেই থেকে শক্তিপদ অতন্দ্রের সম্পাদকীয় দায়িত্বে থেকেছেন। আজ, বিশেষত বরাক উপত্যকায় শক্তিপদ যে উদয়ন ঘোষ কথিত "মৎস্যেন্দ্রনাথ" হয়ে উঠেছেন, তারও গৌরীপাট রচিত হয়েছে অতন্দ্রে।

 

১৯৭৬-৭৭য়ে, প্রায় বালক আমি, শিলচরে বেড়াতে এসে, সম্পূর্ণ অকাব্যিক এক পরিবারে শুনেছিলাম, একজনই স্থানীয় কবির নাম ও তাঁর বিখ্যাত পদ্যের লাইন। বুঝলাম জনপ্রিয়তা কাকে বলে! জানলাম, “কে ওখানে” বললে, এই শহরে একজনই সোচ্চারে জানান দেন, “আমি হুজুর শক্তিপদ ব্রহ্মচারী”। যে কদিন ছিলাম, প্রায়ই দূর থেকে দেখেছি। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। তিনি আসতেন। খালপাড়ের সেই বাড়ি তখন তৈরি হচ্ছে। তিনি একদিকে বসে থাকতেন। মিস্ত্রিরা কাজ করত নিজেদের মতো। তদারকি করতেন বলে মনে হয়নি। তাঁর দুটি উজ্জ্বল চোখের চেয়ে থাকা দেখতে দেখতে মনে হতো, কবিরা এমনই হয়। এরপর বহুবার শিলচর গেলেও, শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর সঙ্গে তেমন পরিচয় হয়নি। করার ইচ্ছেও হয়নি। তাই, আজও দূর থেকেই দেখতে চাইছি, ছাপার অক্ষরে আঁকা শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর মুখ।

 

বহু বছর আগে, শতক্রতুর শক্তিপদ ব্রহ্মচারী সংখ্যায়, মনোতোষ চক্রবর্তী, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ অনুযোগ করেছিলেন, শক্তিপদ জনপ্রিয়তার প্রতি মুগ্ধতাবশত কবিতায় মাঝে মাঝেই লঘু বাতাস্‌ বইয়ে দিচ্ছেন অথবা "জনসংযোগের কবিতা" লিখছেন। সম্ভবত এমনটাই ছিল তাঁদের অনুযোগের সুর। আজ, যখন শক্তিপদ ব্রহ্মচারী এই মরজগতে নেই, তখনও, সমরজিৎ সিংহ প্রশ্নাতুর হয়ে ওঠেন এইভাবে, 'লঘুছন্দের দিকে শক্তিদার এত দুর্বলতা কেন ছিল ? তিনি কি চেয়েছিলেন তাঁর কবিতা সকলের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ুক?' এই আপাত নির্বিষ প্রশ্ন বা অনুযোগ সামনে রেখে, আমরা যদি আজ শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা পড়তে চাই, তবে তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ গুলোই হতে পারে আমাদের একমাত্র সহায়িকা।

 

১. সময় শরীর হৃদয় (১৯৭০)

 

২. এই পথে অন্তরা (১৯৭৬)

 

৩. অনন্ত ভাসানে (১৯৮৪)

 

৪. কাঠের নৌকা (১৯৯৪)

 

৫. দ্বন্দ্ব অহর্নিশ (২০০৪)

 

এছাড়া রয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতা ও লঘুপদ্য নামে একটি ছড়ার বই। গদ্যের উল্লেখ করলাম না, কারণ, আমি এখানে মূলত কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর পদচিহৃসন্ধানী।

 

যদি, ১৯৬৩ থেকেই ধরা যায় তাঁর কবিজীবনের সংহত কাব্যিক অভিযাত্রার শুরু, তবে দেখা যায়, দীর্ঘ সাত বছর সময় লেগেছে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হতে। দ্বিতীয় বই, তার পাঁচ বছর পর। তারও সাত বছর পরে বেরিয়েছে তৃতীয় কবিতার বই। আর শেষ দুটি বই বেরুনোর মাঝখানে বয়ে গেছে দশ দশটি করে বছর। এই তো তৃতীয় ভুবনের (বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য আবিস্কৃত) জনপ্রিয় হতে চাওয়া একজন কবির ভাগ্য! পাশাপাশি, তথাকথিত প্রথম ভুবনের জনপ্রিয়তম শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠানধন্য প্রকাশক্রম লক্ষ্য করলে, বোঝা যায় অবচেতনের কোন বোধ থেকে শক্তিপদকে লিখতে হয়,

 

'এ-সব কেন যে লিখি ছাই-পাঁশ ; ঘাটের রানায়

কেবলি অপেক্ষা নিয়ে জলের বিলোল তামাসায়

মুখ দেখি অবিরল শিশ্লোদর পরায়ণ শীতে...'

 

এই-ই ভাগ্যলিপি নিয়ে, বাংলাভাষার একজন কবি, তথাকথিত মফস্বল শহরে স্বপ্ন ও সম্বিতের মাঝখানে / এক ইঞ্চি মতন যে নো-ম্যান'স ল্যান্ড / তার মধ্যেই একজীবন' কাটিয়ে দেন। সংখ্যাগুরু পাঠকের উষ্ণ সম্বর্ধনা বা প্রচারের আলো স্পর্শ করবে না জেনেও, তাঁকে লিখতে হয়, 'যা লিখেছি এতদিন সারসত্য তার, ভালবাসা।' ভালোবাসা, কিন্ত কাকে ভালোবেসেছিলেন শক্তিপদ? নিজের জীবনকে ? আপাত পাঠে মনে হয়, বড়ো বেশি অতীতপ্রবণ তিনি। ভালবাসছেন নিজের শৈশবস্মৃতি, চারপাশের বিস্তৃতি থেকে গুটিয়ে আনছেন নিজেকে। 'মায়ের উপুড়-করা স্নেহের মতো আমাদের মাথার উপর আজন্ম আকাশ ছিল / দিগন্ত ছোঁয়া মাঠের মধ্যে সবুজ ও সোনালী ছিল আমাদের প্রিয় রঙ / আমরা কাকের ডাক শুনতে শুনতে টিয়া পাখীর নাম মুখস্থ করতাম' কিংবা 'সেই গোবর্ধন বট, ভয় ভয় শ্বশানের ধ্বজা / মজা পুকুরের কোণে বৃষকাঠ, কেন যে মানুষ মরে যায় / মা বলেছে ষাট ষাট, শক্ত হাঁতে দিয়েছি দরোজা / তেরে আসে বৃষকাঠ, ভয় ভয় শ্মশানের ধবজা' এইসব কবিতার পঙক্তি তিনি ঘুরছেন নিজের চারপাশে। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হচ্ছেন। নিয়তি-তাড়িত সেই ক্লান্তি প্রত্যাখ্যানের, অচরিতার্থতার। সেই ক্লান্তি থেকে, কিছুটা দম নেওয়া অভ্যাসে মাঝে মাঝেই, হয়তো 'লঘু ছন্দের দিকে', 'জনসংযোগের দিকে' ঝুঁকেছিল তার কবিতা।

 

কিন্তু, লঘুছন্দ বলতে ঠিক কী বুঝতে চাইছেন সমরজিৎ সিংহ? লোকায়ত বাংলার অকৃত্রিম সেই ছন্দকে কি, যার একটি পারিভাষিক নাম "স্বরবৃত্ত" ? এই ছন্দকে লঘু বলার যে প্রবণতা আধুনিকতাবাদীদের রয়েছে, সমরজিতের প্রশ্নও যদি সেই উৎস থেকেই উঠে আসত, তবে, সেই লেখাতেই তিনি, শক্তিপদের কবিতায় স্বকীয়তা ও এক উদাসীন দর্শনের উল্লেখ করে, এই বলে সংশয় প্রকাশ করতেন না যে, এই স্বকীয়তাবোধ হয়তো তিনি লঘুছন্দেই খুঁজে পেয়েছিলেন। অথচ রবীন্দ্রনাথ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অব্দি, অনেকেই এ ছন্দে লিখেও, গভীর ভাব প্রকাশের বাহক হিসাবে এই ছন্দকে উপযুক্ত মনে করেননি। শক্তিপদ কি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম? তিনি কি সত্যিই লঘু ছন্দে স্বকীয়তা খুঁজে পেয়েছিলেন? কিছুটা অন্তত পাল্টে দিতে পেরেছিলেন এই ছন্দের চরিত্র?

 

এতসব প্রশ্নের মুখোমুখি দীড়িয়ে, আজ, অন্তত লুকোচুরি খেলবার কোনও সুযোগ নেই। শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা খনন করতে করতে বুঝে নেয়ার দায় আমাদের। এই দায় থেকে, যদি একটা পরিসংখ্যান নেয়া যায়, তবে প্রথমেই আমরা দেখি, সংখ্যার হিসাবে শক্তিপদের স্বরবৃত্তে লেখা কবিতার পরিমাণ, তাঁর এ পর্য্ত প্রকাশিত কবিতার ১০% ও হবে কিনা সন্দেহ। বাকি ৯০% কবিতার বেশির ভাগটাই অক্ষরবৃত্ত বা ভাঙ্গা পয়ার। কিছু কিছু সরাসরি গদ্যে। আর ক্ষুদ্র একটা অংশ মাত্রাবৃত্তে।

তাহলে একথা তো বলা যেতেই পারে, তাঁর প্রধান প্রবণতা ছিল অক্ষরবৃত্তের দিকে। তাঁর সাক্ষ্য থেকেই উল্লেখ করা যায়, ' তানপ্রধান (পয়ার) ছন্দের খুঁটিনাটি বৈশিষ্ট্য তখন জানতাম না। হিসাব নিয়ে বুঝতে পারি, ৮/৯ বছর বয়সের একটি ছেলের exercise book তখন চৌদ্দমাত্রার পয়ারেই ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। ' ছোটবেলা থেকেই, পয়ার বা অক্ষরবৃত্তের দিকে এই যে স্বাভাবিক ঝোঁক, তাঁর সমস্ত কবি জীবনেই তা ফিরে ফিরে এসেছে। তাহলে তার কবিতায় লঘুছন্দের, প্রাধান্যের এত অনুযোগের কারণ কী, তাঁর কিছু কিছু লঘু ছন্দের কবিতার তথাকথিত জনপ্রিয়তা ? যা তাঁর মুগ্ধ পাঠকদেরও বিভ্রান্ত করে, ভাবিয়েছে এদিকেই তাঁর মূল প্রবণতা ! এই ছন্দেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন স্বকীয়তা !

 

' তাঁর কৌতুক ও রঙ্গব্যঙ্গ যখন বেদনায় মথিত হয়ে ওঠে, অথবা ছন্দমিলের কৌশলের মধ্যে ঝিলিক দিয়ে ওঠে কলা, ঝজু ও দৃঢ়ভাবে খোঁজে আপন অন্বিষ্ট, তখনো শক্তিপদ জনতার কাছে শুধুই ছন্দমিলের বেপারী। এই ভাবেই ভুল পাঠকেরা ভুল শক্তিপদকে খাড়া করে হিন্দি ফিল্মের গান বাজাচ্ছে। ' এই ভাষ্য থেকে, ব্রজেন্দ্রকুমার সিংহ যে অনুসিদ্ধান্তের দিকে আমাদের নিয়ে গেছেন, তা এরকম, 'ছন্দমিলের আপাত লঘুতার জন্য এবং সহজিয়া ধর্মচারণের জন্য যারা তাঁকে ভক্তি শ্রদ্ধা করেন, তারা নিশ্চিতভাবেই সচেতন পাঠক আবার যারা শক্তিপদকে হাল্কা মেজাজের কবি বলে চিহ্নিত করেন তারাও কিন্তু পাঠক হিসাবে আমার শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে পারেন না।'

দুর্ভাগ্যবশত এটা সত্য। আরও কঠোর সত্য এই যে, প্রান্তিক অবস্থানে থাকা কোনও কবির কৃতিতে আলোকসম্পাত করার মতো কোনও তাপস সেন আজ অবশিষ্ট আছেন কিনা সন্দেহ। এই রঙ্গমঞ্চ সত্যি অন্ধকার। চরিত্রের মুখ ও সংলাপ শনাক্ত করার কোন সুযোগ আজকের মিডিয়া দেয় না। ফলে বিভ্রান্তি বাড়ে। শক্তিপদকে নিয়েও এধরনের বিভ্রান্তি জমেছে, কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়া শক্তিপদকে চেনায় না। আর আমরাও তাঁর কবিতার রেখাগুলি ভুলে গিয়ে একটি মনোলিথিক চরিত্র দেয়ার জন্য অনেকসময় ব্যস্ত হয়ে উঠি। উঠি, তাও মূলত আমাদের স্বভাবসূলভ আলস্য আর হীনমন্যতাবোধের জন্য-ই, নইলে, অনেক বেশি পাঠশ্রম ও যুক্তিপ্রবণতা দাবি করেন এই প্রান্তিক কবিরা। এই দাবি মিটিয়ে দেয়ার বিনিময়ে, যখন মিডিয়াশাসিত কূপালোক আমাদের উপরে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে না, তখন উপযুক্ত শ্রম দেয়ার প্রয়োজনীয়তা আমাদের অনেক তথাকথিত সাহিত্য-সমালোচকই যে অনুভব করেন না, তা আজকের এই বিনিময় সাম্রাজ্যে অন্তত স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কিন্তু আমরা যারা তার মতোই প্রান্তিক অবস্থানের বাসিন্দা হয়ে শব্দশ্রমকেই নিয়তিনির্দিষ্ট করে নিয়েছি, তাঁদের পক্ষে, ভালোবাসার দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয় বলেই, আমাদের পক্ষে যুক্তিহীন যে কোনও মন্তব্য বিষবৎ পরিত্যাজ্য।

 

আজ যখন, জীবনানন্দ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কবি উৎপলকুমার বসু বলছেন সেই সময়ের পলিটিক্যাল, ইকোনমিক্যাল ও কালচার‍্যাল অর্ডার না বুঝলে, তাঁর কবিতা বোঝা সম্ভব নয় ; তখন শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর মতো প্রান্তিক অবস্থানের বাসিন্দা, প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিতে নিম্নবর্গীয় একজন কবিকে বুঝতে গেলে, অন্তত আজকের পোস্ট কলোনিয়াল সময়ে, যে চতুর্থ মাত্রাটিও বুঝতে হবে, তা নিশ্চিতভাবেই জিয়োগ্রাফিক্যাল অর্ডার।

 

শক্তিপদের কবিতা ঘুরে ফিরে সেই জিয়োগ্রাফিক্যাল অর্ডারের আওতায় চলে আসে। যেখানে একটি অখ্যাত গ্রাম বারবার মুখ তোলে। জানান দেয় নিজের অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব। 'সেই গ্রামের নামটি ছিল খুবই অকাব্যিক ও বিচ্ছিরি / এমনকী' শক্তিপদের মতো যারা আধুনিকতাকে জেনেছেন, তাদের 'লিখতেও লজ্জা করে।' আসলে কি তা লজ্জা, নাকি শক্তিপদ লজ্জিত করতে চেয়েছেন কলোনিপ্রভুদের, যাদের ভূবন থেকে এসমস্ত গ্রামের সত্তার অস্তিত্বকেই বাতিল করা হচ্ছে দ্বিধাহীনভাবে। নিজের বাসভূমির পরিচয়, আত্মপরিচয়কেও যে আধুনিকতা লঙ্জার বিষয় করে তোলে, শক্তিপদ তাকেই চিহ্নিত করে যান।

 

পিতা ঈশ্বর মৃত জেনেও, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের মতো, আত্মসত্তার প্রতিকল্প হিসাবে ঈশ্বরকে দাঁড় করানোর যে আধুনিকতাবাদী অভিমান আমরা বোদলেয়ারে দেখি, তেমনি এক অদ্ভুত অভিমানে শক্তিপদের কাছে রবীন্দ্রনাথও হয়ে ওঠেন, ঈশ্বরপ্রতিম প্রথমসত্তা।উত্তরাধিকারসূত্রে যে অধিকার প্রাপ্য মনে করেন, তা থেকে বঞ্চিত, শক্তিপদ ব্রহ্মচারীদের প্রান্তিক বা অপর হয়ে ওঠা কবিসত্তার কাছে প্রতিষ্ঠানপুরের পীঠপুরুষ প্রতীকে উপস্থাপিত হলেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ একই সময়ে কৃত্তিবাসীদের জোড়াপায়ের লাথিতে যখন রবীন্দ্ররচনাবলী পাপোষে লুটাচ্ছে তখনও শক্তিপদের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের বিপুল উপস্থিতি কি তাঁর প্রান্তীয় ও নিম্নবর্গীয় চেতনাকেই চিহ্নিত করে না? যে প্রান্তীয় বা নিম্নবর্গীয় চেতনায় একই সঙ্গে মিশে থাকে ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতি মুগ্ধ শ্রদ্ধাবোধ আর অনাদৃূতের অভিমানজনিত ক্ষোভ । উচ্চবর্গের তত্বকেও যে চেতনা সহজাত প্রতিভায় নিজের মতো করে গড়ে নেয়, নিজস্ব অর্থ প্রদান করে, সেই চেতনা থেকেই শক্তিপদ বলেন, --

 

' জানেন রবীন্দ্রবাবু, আমাদেরও ছেলেবেলা ছিলো

সামান্য জীবনস্মৃতি, জীবন না ঘুনপোকা, খায় কুরে কুরে

মনসা পুজোর পাঁঠা ঘাস-পাতা চিবোয় রোদ্দুরে। '

এই যে তিনি ' জানেন রবীন্দ্রবাবু ', বলে সম্বোধন করছেন, তাতে কোথায় যেন একটু অনাত্বীয়তার ইশারা থেকে যাচ্ছে। থেকে যাচ্ছে 'রবীন্দ্রবাবু'দের না জানা ভূগোলের ইশারাও। আর তারপরই অমোঘ একটি শব্দ 'আমাদেরও', দিয়ে শক্তিপদ স্পষ্টতই আলাদা করে নিলেন নিজেকে, কিন্তু একা নয়ঃসমষ্টি হিসাবে। এভাবেই তাঁর কবিতায়, শৈশবের গ্রামীণ জীবনযাপনের সূত্রে, স্বাভাবিকভাবেই নিম্নবর্গীয়তার উপস্থিতি ঘটে। অথচ নিজের মফস্বলি মধ্যবিত্ততাও ভুলতে পারেন না। ফলে একটা মানসিক দুরত্বও তিনি অনুভব করেন, আর এই দূরত্ব যত বেশি তাঁকে আক্রান্ত করে, ততই তিনি কবিতায় জড়ো করতে থাকেন গ্রামীণ প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ। তাঁর কবিতায়-এজমালী পুকুর, পান-দোক্তা, আপন্য-খোরাকি, পুঁইমাচা, খয়রাতি দান, তৈজসপত্তর, আমানি, কেঁড়াপুক, এমন সব শব্দ স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহৃত হতে থাকে, কবিতার পটভূমিকে পুষ্ট করতে।

 

যাকে আপাতভাবে দেখলে মনে হতে পারে নস্টালজিয়া বা অতীতচারিতা। তাঁর কবিতায় নাগরিকতার চিত্র নেই, উদয়ন ঘোষের এই অন্বীক্ষণ স্বীকার করে নিয়েও, বলতে দ্বিধা নেই যে, তাঁর কবিতার অবয়বের লোকজীবন যতটা স্পষ্টতা পায়, আত্মায় ততটাই থাকে মধ্যবিত্ততার শাসনরেখা । এই দ্বন্দ্ব অহর্নিশ চলতে থাকে তাঁর কবিচৈতন্যে।

 

এই দ্বন্দ্ব থেকে কখনও দেখা দেয় এক অদ্ভুত আত্মগ্লানি। যে আত্মগ্লানি নিয়ে, মধ্যবিত্তবিবেক নিজেকে বিদ্রুপে জর্জরিত করে, কখনও স্ব-শ্রেণীর বিলুপ্তি পর্যন্ত কামনা করে। আবার অপ্রাপ্তি ও অপারগতায় কখনও অসম্ভব নিস্পৃহ হয়ে ওঠে। এমন বিদ্রপ ঝলসে ওঠে শক্তিপদের বহু কবিতায়, এই যেমন- 

যদিও বিবেক-ভন্ড তুমি

নৈনিতাল, কার্সিয়াং তোমার বিবেকশিলা আছে

এবং বোনাস আছে, নিবেদন বকেয়া বাকী ফি-বছরে

একবার বাঁধা।

টবের ফুলের মতো শিশুরা সভ্যতা শেখে ইংরাজী ইস্কুলে

তোমার সন্তান থাকে দুধেভাতে। ঈশ্বর পাটনীর কেউ নয়।

বচনে সর্বস্ব-হারা; শ্লোগানে, মিছিলে পুরোগামী...

এমন আত্মগ্লানি থেকেই হয়তো তিনি কবিতাকে সরল করে তুলতে চাইলেন, যাতে তা অন্তত নিম্নবর্গীয় চেতনার কাছে পৌছুতে পারে। এই অন্বেষে কখনও তার কবিতা সরল হতে গিয়ে প্রগলভ হয়েছে, তরলতায়ও পৌছেছে হয়তো, তবু কবিস্বভাবে তিনি আদৌ তরল নন।

যে উদাসীন দর্শনের উল্লেখ সমরজিৎ করেছেন, তার একদিকে রয়েছে মধ্যবিত্ততার নৈরাশ্যজনিত নিস্পৃহতা, অন্যদিকে নিম্নবর্গীয় নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ প্রবণতা, যাকে আপাতদৃষ্টিতে উদাসীনতা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

এমনি উদাস করে রাখো

যেন অপমান এসে ঘাড় নুইয়ে ফিরে যেতে পারে ।

এই যে উদাস হতে চাওয়া, একে আপাতভাবে একধরনের উদাসীনতা (যে অর্থে বৈরাগ্য প্রচলিত) মনে হলেও মুলত চিরকালীন নিম্নবর্গীয় চেতনার সঙ্গেই জড়িত এর বোধ। লক্ষ করলে দেখা যায় উচ্চবর্গের দেওয়া উপেক্ষা-অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ অসম্ভব জেনেই,

নিম্নবর্গ সবসময় নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধে সেই উপেক্ষার অস্বীকৃতিকেই অস্বীকার করে এসেছে। এমন বিনম্র ঘাস-সুলভ সেই নিম্নবর্গীয় অস্বীকার, যে 'অপমান'ও যথেষ্ট অপমান করতে না পেরে, 'ঘাড় নুইয়ে ফিরে' যেতে বাধ্য হয়। বাংলার মধ্য ও প্রাগাধুনিক লোকধর্মের উদ্ভবের ইতিহাস লক্ষ করলে দেখা যাবে, ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার অস্বীকৃতি ও অপমানের প্রতিরোধে, নিম্নবর্গ সেই অপমানকেই অস্বীকার করেছে, অপমানিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে। গড়ে নিয়েছে এমন সব উদাসের ধর্মদর্শন, যা সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিকতাকেই বিনম্রতায় অস্বীকার করে।

পর্ব ২

শক্তিপদ ; যিনি "গরীব গুরু বংশ"এর সন্তান, যার ছেলেবেলা "ঘোরতর সামন্ততান্ত্রিক পরিবেশে কেটেছে", নিজের আত্মপরিচয়ে যিনি বলেন, ' সিলেটি বাঙাল বটে, অধুনা কাছাড়ি ' তাঁর কবিতায় লোকজীবনের আততি স্বাভাবিক। প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গে উঠে আসতেই পারে লোকধর্মের নানাদিক, কিন্তু অনেকবার অনেকভাবে মনসামঙ্গলের উল্লেখ, শুধুমাত্র শ্রীহট্টে বহুল মনসা পুজোর জন্যই এসেছে এমন একমাত্রিক ধারণা শক্তিপদের মতো কবির ক্ষেত্রে মেনে নিতে অসুবিধা হয়। অবচেতনে থাকা মনসা পুজোর স্মৃতির সঙ্গে কী কোনভাবেই জড়িয়ে থাকে না কোন সচেতন ভাবনা?

' এ কোন গহীন গাঙে কার লাস ভাসে

লক্ষ্যহীন ললনার কলার মান্দাসে '

কিংবা

' নাগালয়ে মা ভবানী বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তমতে '

 

বা

' আস্তিকস্য মুনের্মাতা, হ্যাঁ মনের্মাতা, মুনির্মাতা নয়

গাঙের ডহর পাতালের নাগকন্যা

সাপের ছোবল ওঝা গুনিন '

অথবা

' জাল টানা ছেলে আজ রাতে গেছে জলে ' দেবতাকে জলা অঞ্চলের নিয়ত সর্পভয় থেকে অভয় পাওয়ার জন্যই আরাধনা করা হয়। স্বাভাবিক ভৌগোলিক কারণেই এ দেবী পশ্চিমবঙ্গে অনেকটাই অনাদৃতা। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে স্ট্যান্ডার্ড ভাষার মান্যতা প্রাপক পশ্চিমবঙ্গীয় আধিপত্যবাদী-উপেক্ষার বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গীয় সাংস্কৃতিক ভিন্নতার একটি প্রতীক হিসাবে মনসার উপস্থাপনায়, শক্তিপদ, সচেতনভাবেই আলাদা হতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রাপ্ত প্রান্তিকতাকে নিয়ে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর- ' ইন্দিরাজী দিল্লী থেকে হিন্দি শেখায় সস্তা দরে / কিলো খানেক তাও কিনেছি জাতীয় সংহতির ভরে ' বিদ্রুপের প্রসঙ্গটি মনে রাখলে, তাঁর কবিতায় মনসার উল্লেখ আমাদের কাছে ভিন্নমাত্রায় উপস্থিত হতে পারে।

আমরা মুখ ফেরাতে বাধ্য হই ভৌগোলিক রাজনীতির শিকার প্রান্তিকতায় বিচ্ছিন্নপ্রায় এক একজন কবির দিকে, কেন্দ্রিকতার অস্বীকৃতিতে অভিমানহত হয়ে, যারা তীব্রভাবে গ্রামীণ শিকড়ে ফিরে যেতে চাইলেন, এবং বাংলা কবিতার তাঁতে, কেন্দ্রে ও পরিধির টানাপোড়েনে বুনে তুললেন অনন্য সৌন্দর্যে নক্সা, শক্তিপদ তাঁদের একজন। উদয়ন ঘোষ যথার্থই বলেছেন, ' তাঁর কবিতার শব্দ আর ইমেজ খাঁটি বাঙালী জীবনের উৎসমূল থেকে উৎসারিত। ...তাঁর কবিতা খাঁটি বাংলায় লেখা। '

' সপ্তডিঙ্গা মধুকর চারিদিকে জল

শ্রাবণের অবিশ্রাম মনসা-মঙ্গল

পচা পাটে এঁদো ডোবা বিষধর ফণা

ছেঁড়া কাঁথা কাণি আর বেহুলা যন্ত্রণা

হুহু করা কালসন্ধ্যা ভেসে আসা গানে

সায়ের ঝিয়ারি যায় অনন্ত ভাসানে।

কোথায় নিছনি কোথা চম্পকনগর

 

সাতনরী শিকা ঝোলে ঘরের ভিতর

কুপি লম্ফে রাতকানা নিরক্ষরা বুড়ি

লখার মরণে কান্দে আছুড়ি-পিছুড়ি

 জাল টানা ছেলে আজ রাতে গেছে জলে

রেখো মা মনসা তার সর্বাঙ্গ কুশলে।

গাঙের গর্ভিণী সেই গন্ধ ভেসে আসে

শ্রাবণীর দিগম্বরা দখিনা বাতাসে

এখনো বুকের দ্বিজ বংশীদাস কহে

হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কালীদহে ...

ডহরের ঘোর লাগা গহনের টানে

সায়ের ঝিয়ারি যায় অনন্ত ভাসানে। '

পাঠক, লক্ষ্য করুন, ভাবনাকে ত্রিকালের পটে বিধৃত করতে, কবি এই কবিতার প্রকাশ মাধ্যম হিসাবে স্বীকার করে নিলেন পয়ারের ঐতিহ্যগত বন্ধন। এই স্বীকার করার মধ্যে কিন্ত কবির অভিপ্রায়টিও চিহ্নিত হয়ে যায়। পয়ারের প্রবহমানতার সঙ্গে কবি সময়ের অন্তহীন প্রবহমানতাকে মিলিয়ে নিতে চেয়েছেন খন্ড খন্ড সিনেমাটিক চিত্রে।

 

"সপ্তডিঙ্গা মধুকর" শব্দবন্ধটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে, বাঙালির স্মৃতি, সুদূর অতীতের বানিজ্যসমৃদ্ধ কিংবদন্তীর দিকে মুখ ফেরাতে বাধ্য হয়। তারপর-ই চারিদিকে জলের কথা বলে এক চলমানতার দিকে আমাদের ইশারা করলেন। কিন্ত থামলেন না। সপ্তডিঙ্গা মধুকরের যাত্রী আমাদের নিয়ে এলেন শ্রাবণের অবিশ্রাম মনসা মঙ্গলে। তবে কী মনসা মঙ্গলকে তিনি কৃষিজীবনের প্রতীকে উপস্থাপিত করলেন? বৃষ্টি নির্ভর কৃষি উৎপাদনশীলতার যে ঐতিহ্য অনিশ্চয়তার ভয়ও মনসায় জড়ানো, মূলত লোকায়ত বলেই অবিশ্রাম, নাকি তাই চিহিত করতে চাইলেন?

 

এই বৃহত্তর সময়ের জলের কন্ট্রাস্ট হয়ে এরপর-ই এলো, ক্ষুদ্রতার পচা পটে এঁদো ডোবা। মনে পড়ে, তাঁর "বাবুর বৌ" কবিতার গনেশ দাস মুরলী ধরের পাটের আড়তের তলা, যেখানে উচ্চমন্য অধিকারও দেউলে হয়ে গেছে। তবে কি সপ্তডিঙ্গা মধুকরের বানিজ্য সমৃদ্ধির গতিময়তা থেকে আজকের পাট পচা এঁদো ডোবার বদ্ধতায় নিয়ে এলেন আমাদের ? বিষধর ফণার ইঙ্গিত কি মিলছে গনেশ দাস মুরলী ধরের পাটের আড়তের তলায় ? যদি মেলে, তবে তার ফলশ্রুতি ' ছেড়া কাঁথা কাণি আর বেহুলা যন্ত্রণা ' নিয়ে থাকা এই কৃষিজীবন। অনুল্লেখেও কবি যার উল্লেখ করে গেলেন।

 

তারপর-ই "কালসন্ধ্যায়" ভেসে আসা গানে, সায়ের ঝিয়ারি যায় অনন্ত ভাসানে। ভাসান মানে কি বিসর্জন? নাকি ভেসে যাওয়া? ভাসানের আগে অন্তত ব্যবহারে মনে হয়, এ পর্বে ভেসে যাওয়া বোঝানোই তাঁর অভিপ্রায়। অন্তহীন এই ভেসে যাওয়া কি "সোঁতের সেউলা হেন" সেই সব অনিকেত মানুষের, যারা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাল থেকে ক্ষমতার নির্যাতন আর অপমানের "বেহুলা যন্ত্রণা" নিয়ে কোথাও থেকে আরও অন্য কোথাওর দিকে ভেসে চলছেন ! বহু আকাঙ্ক্ষিত স্বাদহীন স্বাধীনতাও যাদের স্থিতি দিতে পারছে না।

শক্তিপদ এরপর-ই এক অমোঘ জিজ্ঞাসা নিয়ে এলেন, ' কোথায় নিছনি কোথা চম্পকনগর '। স্পষ্ট করে বললেন না, - না, কোথাও নেই। কারণ "সুবলের মা" ও তাঁর ' দেশের নাম এখন বাংলাদেশ ' !

শুধু আবার ক্যামেরা আইয়ে তুলে আনলেন একটি ঘরের ভেতরের ক্লোজ শট। সাতনরী শিকা ঝুলছে। মিড ক্লোজে কুপিলম্ফ। রাতকানা এক বুড়ি। ব্যাকগ্রাউন্ডে লখার মৃত্যু গান। বুড়ি আছুড়ি-পিছুড়ি কাঁদছে। ফ্ল্যাশব্যাকে রাতের জলা। একটি ছেলে জাল টানা নৌকায়। পারাপারহীন অন্ধকারে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বুড়ির কান্না আর প্রার্থনা । অমোঘ ও চিরকালীন। ' রেখো মা মনসা তার সর্বাঙ্গ কুশলে '।

 

এপর্যন্ত যে মৌলিক ও চিরন্তন প্যাটার্ণ আমরা লক্ষ্য করি,তা কৃষি জীবন ভয় মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা এরকম একটা বৃত্ত তৈরি করে। যে ঐতিহ্য যৌথ অবচেতনে থেকে যায়, সময়ের ঐতিহ্য বিযুক্তিও তা জীবন থেকে মুছে দিতে পারে না। এর সাক্ষ্য এবং প্রত্যয় যেন উঠে আসে এই অংশে।

 

শেষ ছয় পঙক্তিতে কবি আরও ইশারাপ্রবণ হয়ে উঠলেন। তিনি বললেন, ' গাঙের গর্ভিণী সেই গন্ধ ভেসে আসে ', কিন্তু স্পষ্ট বললেন না কোন গন্ধ। গর্ভিণী তো সম্ভাবনার প্রতীক। উৎপাদনশীলতার। আশা ও আকাঙক্ষার। জেলের কাছে গর্ভিণী গাঙ তো অনেক রূপালি শষ্যের সম্ভাবনা নিয়ে আসে। তবে কী এই গন্ধ আসন্ন সফলতার, আনন্দের গন্ধ ! গন্ধ ; কারণ তা নিরেট নয় স্বপ্নকল্প - সম্ভাবনা। দখিনা বাতাসের মাধ্যমে যা প্রগাঢ আকর্ষণের ইশারা আনে। এই ইশারা হৃদয়ের। তাই, ' এখনো বুকের দ্বিজ বংশীদাস ডাকে '। এখনো, এই লোক ঐতিহ্য বিযুক্তির অসময়ে ডাকার কথা নয়, লোকপুরুষ দ্বিজ বংশীদাসের। তবু ডাকছেন। চিরকালীন বাঙালির হৃদয় হয়ে । রবীন্দ্র অবসেশন হয়তো, তাই ' হেথা নয়, হেথা নয় ' বলেই এই ডাক। ঔপনিষদিক চরৈবেতি ? কিন্তু কোথায় ? অন্য কালীদহে। যে কালীদহে চাঁদ বনিকের সপ্তডিঙ্গা মধুকর ডুবেছিল মনসার কোপে, এ সেই কালীদহ নয়। কালের দহ ? সেখানেই ডুবতে হবে। কারণ, ' ডহরের ঘোর লাগা গহনের টান ' আছে। ঘোর কী জলের কুম্ভীপাক হয়ে টানছে ! ঘোরের আভিধানিক একটা অর্থ তো ভয়ঙ্করও। তবে কি সায়ের ঝিয়ারির এই ভাসান আসলে ভয়ঙ্কর কালের কাছে আত্ম-বিসর্জন ? অন্তহীন সেই বিসর্জনের দিকেই কি চলেছি আমরা ! সেই সব অনিকেত মানুষ ; স্বাধীনতা যাদের ব্যক্তিপরিচয় মুছে নিয়ে, হীনমন্যতাসূচক এক গোষ্ঠী পরিচয় দিয়েছে - উদ্বাস্তু।

 

উত্তরপূর্বের (বিজিৎকুমার ভট্টাচার্য যাকে বাংলা সাহিত্যের তৃতীয় ভুবনের অংশ বলেন) বাংলাভাষী প্রায় প্রত্যেক অগ্রজ কবি; দুর্ভাগ্যজনক হলেও এই উদ্বাস্তু পরিচয় অস্বীকার করতে পারছেন না। শৈশব স্মৃতি, পারিবারিক ও সমাজ-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যর স্মৃতি তাঁদের কাতর করেছে। অন্যদিকে, স্থানীয়দের দ্বারা এবং সরকারী পরিভাষায় উদ্বাস্তু নামটি তাদের জন্য স্থায়ী হয়ে গেছে অনেকদিন। শক্তিপদও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নন। নন বলেই এক অদ্ভুত আত্মগ্লানি তাঁরও ছিল। তাই, ব্যক্তিগত গদ্যে, শিলচর তাঁর জন্মভূমি না জানিয়েও, শিলচরকেই তিনি নিজের শহর বলে মেনে নেন। পুনর্বার উদ্বাস্তু না হতে চাওয়া শক্তিপদ জানান, - 

' কলকাতা নয়, শিলচরে আছি বেশ

সজ্জন সন্ন্যাসী আর দু'জন দরবেশ

আমাকে ফুসলায়, বলে, ' আয়

ন-জন সুজন নিয়ে পড়ে থাকবি তেঁতুল তলায় ' ।

 

শৈশবের নাভি থেকে এক সুতো কলকাতামুখীন

দক্ষিণ ভারত-সিন্ধু, উত্তরের চীন

দরাজ হাতের টানে যত দরজা খোলে,

হাওয়া আসে, হাওয়া চলে যায়

ঘরে ঘরে কে যেন ফুসলায়

' কত আর ভিক্ষা নিবি, নেই বুঝি বাটপাড়ের ভয় ' ।

 

আমি শুয়ে থাকি, দেখি, তোমার সমূহ অপচয় ! '

এই সমূহ অপচয় কার? একদিকে যদি তা হয়, প্রান্তীয় মানুষের প্রতিভার অপচয়, অন্য দিকে এই প্রতিভাকে স্বীকৃতি না দেয়ার মধ্য দিয়ে কি কেন্দ্রেও অপচয় ঘটছেনা ? উভয়ত এই অপচয়ে মৃতপ্রায় হয়ে উঠছে মুলত বাঙালির সংস্কৃতি। আর তা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা প্রান্তীয় মানুষের হাতে আজ আর নেই, এ কথা জেনেই কি এই অলস শুয়ে থাকা আর দেখে যাওয়া?

কবিতায় শক্তিপদ নিজেও এভাবে দেখে যান, মাঝে মাঝে মনে হয়, বড়ো বেশি অলস এই দৃষ্টিপাত ; তবু দেখতে দেখতে একসময় টের পেয়ে যান নিজের মধ্যবিত্ত কবিসত্তা ও নিম্নবর্গীয়তার মধকার ফাঁক ও ফাঁকিটুকু। তাদের জীবনের প্রকৃত শরীক হওয়ার অপারগতায় আত্মগ্লানি তাঁর কবিসত্তাকেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপে বিদ্ধ করতে থাকে। 

' জীবন আনন্দময় নয় বটে তবুও তো কাঙালের ক্ষুধা

আমাদের পেটে নেই, ইলিশ বাড়ন্ত হলে জীবন-নাট

কিছুটা বিস্বাদ লাগে, সুখে বেঁচেবর্তে আছি স্ত্রী-পুত্র-বসুধা

আমরা কবিতা লিখি আর যারা কবিতার বিরল পাঠক

নির্বিরোধী কাঁচামাল হে গরীব, মানিকের তারাশঙ্করের

তোমার উদ্দেশে আজ কবিতারও কারুশিল্প নিত্য ধাবমান '

কাঁচামাল ও কারুশিল্প শব্দদুটি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলেই আমরা পেয়ে যাবো, কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ্মানসদ্বন্দ্ব ও দর্শনপ্রস্থানের মূলসূত্রটি। এবং এখানে এসেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি জনসংযোগের কবিতা লিখতে চাইছেন না তো ? আপাত সরলভাষা ও বিবৃতিপ্রবণতা তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য। এই ভাষা-সরলতা তাঁকে অর্জন করতে হয়নি, বাংলার যে লোকায়ত বৈশিষ্ট্য যামিনী রায়ের রেখার সারল্যে প্রকাশিত, সেই সারল্য গ্রাম-বাংলার নিজস্ব বলেই শক্তিপদের কবিতাও তা অনায়াস। সৌভাগ্যক্রমে নাগরিক জটিলতা ও অনন্বয় তাঁর কবিতাকে গ্রাস করেনি, তবু একধরণের অনন্বয় তো থেকেই যায় এই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যা ব্যক্তিকে সুস্থির থাকতে দেয়না কোন পরমতায়। শক্তিপদের কবিতায় তেমন অনন্বয়ের চিহ্ন অজস্র। সেই চিহ্ন খুঁটে খুঁটে তাঁকে অনন্বয়ী আধুনিকতার একজন কুশলী কারিগর বানিয়ে তোলা অসাধ্য হবে না হয়তো, কিন্তু তাতে শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যাবে। 

পর্ব ৩

তিনি যে, যাপনশৈলীর মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতায় প্রান্তীয় নিম্নবর্গীয়তার মুখপাত্র হয়ে উঠছেন, সম্ভবত শক্তিপদ নিজেও এসম্পর্কে ততদূর সচেতন ছিলেন না। কিন্তু অনুভবের সততায় বুঝতে পেরেছিলেন, কিছু বলার আছে, রয়ে গেছে আজকের বাংলা কবিতার কেন্দ্রিকতার উদ্দেশে।

' আসলে কিছু মৃত ও দুঃখী মানুষের মুখ

বোবা প্রকৃতির গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থেকে

কী যেন বলতে চায় ... '

এই যে বলতে চাওয়া, তা কাদের ? বোবা প্রকৃতির গা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এরা কারা ? দুঃখী মানুষ? তবে মৃত কেন? পাঠক, লক্ষ্য করুন, কী অপরূপভাবে দুঃখী মানুষের আগে মৃত শব্দটি ব্যবহার করেছেন কবি। যে সময়ের কাছে, যাদের কাছে এই মানুষেরা বলতে চায়, তাদের কাছে, এরা মৃত। তাই, এই বলতে যে চাইছে তাও স্পষ্ট নয়, হয়ে উঠেছে-কী যেন বলতে চায়। বলতে যে চাইছে তা বোঝা গেলেও, ভাবার দুস্তর ব্যবধানে, নাগরিক মানুষের বোধগম্যতার অতীত হয়ে উঠেছে গ্রামীণ মানুষের এই ভাষা । তাই সেই বলতে চাওয়া “কী যেন”, তাই সে মানুষ মৃত ?

মৃত মানে অস্তিত্বহীন। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রিকতার দিকে এইসব অস্তিত্বহীন মানুষের একজন হয়ে শক্তিপদ যখন বলেন, ' মনে রাখব না সীতার বনবাস মনে রাখব না কথামালা / না মনেন রাখব না জোড়াসাঁকো / দেখে নিও দেখে নিও / আমি আমিও প্রতিশোধ নিতে শিখে গেছি। ' তখন বিস্ময়ে আমরা লক্ষ্য করতে বাধ্য হই, ভূলে যাওয়ার জন্য তিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির কিছু কীর্তি ও পীঠস্থানকে বেছে নিয়েছেন। এই বেছে নেয়াটা যে ইতিহাস সচেতন একজন মানুষের, তা বুঝতে গেলে বৃটিশ উপনিবেশে মধ্যবিত্তের তথাকথিত নবজাগরণে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিচ্ছেদের দিকটি মনে রাখতে হবে। যে বিচ্ছেদ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে আজ মধ্যবিত্তের তৈরি আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে লোকায়ত সংস্কৃতির যোগাযোগহীনতায়।

 

এই যে এতদূর অব্দি আমরা শক্তিপদ ব্রহ্মচারীকে দেখলাম, এক প্রান্তীয় নিম্নবর্গীয়তায় নিজের জন্য এবং নিজের ভূগোলের বাসিন্দাদের জন্য ভাষা খুঁজে নিচ্ছেন, শৈলী খুঁজে নিচ্ছেন, সেই ভাষা-শৈলী কী শক্তিপদকে আলাদা ভাবে শনাক্ত করাতে পেরেছে, বাংলা কবিতার জগতে? নাকি, বাংলা কবিতার সমুদ্রে মিশে বিলীন হয়ে গেছে উত্তর-পূর্বের এই শীর্ণতোয়া নদী, যার নাম শক্তিপদ! এই প্রশ্ন নিয়ে, আবারও যদি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা জগতে প্রবেশ করি, তবে দেখবো, এতদুর অব্দি যে, মহাসময়ের প্রেক্ষিতে খন্ড সময়কে উপস্থাপিত করা, বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও অঞ্চলকে স্বরূপে উপস্থাপিত করার অভিমানী মনোভঙ্গী ও ভাষা, বাংলা কবিতায় এটাই শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর অর্ঘ্য।

 

এই অভিমানী ভাষা কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো উচ্চকিত ও আলোড়নময়। উচ্চকিত বলেই তাকে লঘু বলা যুক্তিসঙ্গত নয় । আমাদের মনে রাখতে হবে, তিনি যে ভূগোল থেকে যে জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই ভূগোলে সেই জনগোষ্ঠীর মনস্তাত্বিক ভাষাই তাঁকে ব্যবহার করতে হয়েছে। আত্মপ্রতিষ্ঠাকামী যে কোন জনগোষ্ঠীর সামাজিক ভাষা সব সময়-ই উচ্চকিত, আলোড়নময়। নিজের অস্তিত্বকে জানান দেয়াই যেখানে মুখ্য, সেখানে ভাষার নম্র-কারু বহুকাল অনুচ্চারিত থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

 

তবু; এই যে এতটা সময় আমরা বুঝতে চেষ্টা করলাম, প্রান্তীয় নিম্নবর্গীয়তায় তাঁর নিজস্ব মনোভঙ্গির মূলটি কীভাবে প্রোথিত আছে, তারপরও কি বলা যাবে এই মনোভঙ্গির উচ্চাবচ প্রকাশেই তাঁর কবিতা ? সামগ্রিক পাঠের পর, মনে হয় এতটা একরৈখিক নয় তাঁর কবিতা প্রবণতা। এটা সত্য, তাঁর মনোভঙ্গির শিকড় রয়েছে প্রান্তীয় নিম্নবর্গীয়তার গভীরে। এই গভীর থেকে রস ও রসদ নিয়েই, তাঁর কাব্যশরীর-মানস গঠিত হলেও, শাখা প্রশাখা ছড়ানো রয়েছে তামসালোকঅভিসারী ভিন্ন ভিন্ন দিকে।

 

একটু আগেই যে, তার কবিতার উচ্চকিত আলোড়নময় ভাষার উল্লেখ করা হলো, এর সামাজিক চরিত্র আবিস্কার করা গেল, তাও কি শক্তিপদের কবিতা ভাষার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় দেয়? 

 

আমরা লক্ষ করি সংহত ইশারাময় এমন অনেক কবিতা তিনি লিখেছেন, যা প্রচল কবিতাধারার মধ্যেও বিশিষ্ট। এবং এই বিশিষ্টতা তাঁর মনোভঙ্গির মূলটিকে ছুঁয়েই বিকশিত হতে পেরেছে। একরৈখিকতা নয়, বহুরৈখিকতাই তার অর্জন।

যদি আমরা তাঁর কবিতায় বহুরৈখিকতার চিহ্নগুলিকে সাজাতে চাই, তবে দেখবো সেইসব কবিতার মধ্যে আছে :

১. প্রেম ও যৌনতাসহ নারী সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা, যেমন :

 

বুকে সেফটিপিন গেঁথে যৌবন শাসনে রাখো তুমি '

' নারী মানে নগ্ন, শূন্য, সুন্দর

নারী মানে আকাঙক্ষা, তৃষ্ণা, শুদ্ধি

অনিদ্রা, উৎপত্তি, সংগম '

' হৃদয়ের ভাবে উন্মনা হলো হাওয়া

বাতাসে বাতাসে মেঘেরা হয়েছে ভারী

কতোদিন হলো তোমার চোখের দিকে

তাকাতে পারি নি নষ্ট হয়েছি নারী। '

' জিহ্না মেলে তৃষ্ণা দেখায় ভুরু নাচায় ডবকা ছুঁড়ি

ভরন্ত এই দুপুরবেলায় বর্ষা হবে ইলশে গুঁড়ি '

 

২. গ্রামীণ জীবন ও পারিবারিক-পারিপার্শ্বিক স্মৃতি, যেমন :

 

' আমরা ছিলাম শীতের কচুগাছের মতো নিঃসাড়

 আমাদের জীবনে কোনো বড় রকমের ঘটনা ছিল না

কল শাসিত জীবনের আধুনিক দুর্ঘটনাগুলোও ছিল

আমাদের সম্পূর্ণ অজানা '

' আলীপুরের মহাজন-বাড়ির ছেলে পল্টন

ইনাথগঞ্জের স্টেজ দাপিয়ে "অ্যাক্টও" করল

আমরা ভেবেছিলাম যখন বড় হব

আমাদেরও অভিনেতা হিসেবে খুব নামডাক হবে। '

 

' পাটখেতের সবুজ বলিহারি, ডহরের ঘোর-লাগা টান

গায়ে খুসকি হাটুরে মানুষ

মাঝে মাঝে নদীর চরে পড়ে তাকে মাটির ভাঙ্গা কলসী

আর গরীবের নেংটির মতো ধ্বজ-পতাকার নিঃশব্দ হাহাকার

আর তখনি কলজে ছিঁড়ে গেয়ে উঠত কাঙাল হরিনাথ

হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল... '

৩. দারিদ্রতা ও ব্যক্তি পরিচয় জ্ঞাপক অভিজ্ঞতার স্মৃতি, যেমন :

 

' ছারপোকাসার নেড়া তোষক বগল ছেঁড়া গায়ের জামা...

তুমি আমার খয়রাতি দান রেশম-চালের পাথরকুচি

 

' আছিল যা নিজের কইতে, ভাঙ্গা থাল এক কাণা ঘটি

উপরে আছেন আল্লাহ, আর আছে কোমরে লেঙ্গটি।

 

' গায়ের শস্তার গেঞ্জি কোমরের কষি টিলে করে

ঘামাচি চুলকোয় আর অল্প স্বল্প পানদোষ আছে

বিড়ি খায়, আদরে ও অত্যাচারে মাথার বালিশ

ক্রমশঃ তেলচিটে হয়ে ফেটে পড়ে একদিন তার '

৪. শব্দ ও কবিতা সম্পর্কিত নিজস্ব অভিজ্ঞতা, যেমন :

' শব্দেরও অসুখ আছে, ক্ষয় আছে অবক্ষয় আছে

এবং বৃক্ষের কাছে গাছের প্রার্থনা নিয়ে বাঁচে...

শব্দ লীলাময় তার অনুগত ভৃত্য ও বান্ধব

দয়া ও দাক্ষিণ্য পায় এই মাত্র তার পরাভব...

শব্দের শাসন আছে, কপট কটাক্ষ আছে, আর

অমিয় বিভূতি আছে গন্ধের গোপন সমাহার...

 

' শব্দ কত সীমাবদ্ধ এই সত্য আমিও জেনেছি

যে দুঃখের কান্না নেই তার কাছে শব্দ অসহায় '

 

' যেন বা মুখর মহানগরীর পথে

কবিতা-মেদুর যন্ত্রণা পারগামী

মিয়োনো পোষাকে মফস্বলের কবি। '

' ছাই-পাঁশ লিখে যাস। মানুষের কী যে কাজে লাগে

বুঝি না কিছুই, দেখি, কলমের শিস মুখে, আর

মাঝে মাঝে বিড়বিড় করিস

শব্দ শব্দ শব্দ ব্রহ্ম চারিদিকে শব্দের জঞ্জাল

অর্থহীন বাক্যমালা তোকে শব্দ খুবলে খেয়ে যাবে। '

৫. দেশ-কাল ও রাজনৈতিক প্রবণতা সম্পর্কিত চিন্তা, যেমন :

' চোখের সামনে লঙ্গরখানায় ক্ষুধার মতো দাউদাউ জ্বলছে

মুখস্থ করা, বা বানিয়ে লেখা, বা টুকলি-মারা

একগাদা ভবিষ্যৎ, হে ভবিষ্যৎ ' হে ঈশ্বরের অজ্ঞাত ভবিষ্যৎ

হে জাতীয় জীবন, হে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা, হে আদিদাস

আমি মানুষের বাচ্চাদের ভবিষ্যতের দিকে চোখ রেখে হাত বাড়াই

একটা সিগারেট

কিন্তু ডাক্তার বলছে, সিগারেট ছাডুন, ' আপনার হার্ট, লাংগস, কিডনী...

বর্গী এলো দেশে শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ছি, ঘুমিয়ে পড়ছি '

 

' কথা হচ্ছে মাটিরও রং বদলায়, স্বাদ ও। সবাই যাকে চেনে, এবং

যিনি কাউকেই তেমন চেনেন না, সেই জননেতার মতো মাটিও বড়

প্রাগম্যাটিক । '

৬. মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদের প্রতি তীব্র শ্লেষ ও বিদ্রপ, যেমন :

' আর কেবল গৌরবার্থে 'আমরা' নয়

উত্তম পুরুষ একবচনের অহংকার

কায়দা করে লুকিয়ে ফেলতে ফেলতে

হাড়ে হাড়ে টের পেলাম

আসলে রাম, শ্যাম ও যদুর দঙ্গলের মধ্যে

আমিও ঠিকঠাক মধুর ভূমিকায়

খাপ খেয়ে গেছি। '

মহাত্মাজী ও মহাপ্রভুর ছবিতে সকাল সন্ধ্যা ধুপ-ধুনো দিচ্ছি

এবং ছেলেকে কনভেন্টে পড়াচ্ছি

আমরা যারা এই চলমান সমাজ-ব্যবস্থা নামক

বেশ্যার দালাল

আমরা যারা হাড় বজ্জাত, পাজির পা ঝড়া

শুকরের বিষ্ঠা এবং...

কথা হচ্ছে এই আমরাকে নিয়ে

আমরা নমকহারামরাই ওই গরীবের গায়ে

থু থু ছিটিয়ে বলছি, শ্লোগান দিচ্ছি, এবং...

দোহাই আপনাদের, গরীবের দুঃখ নিয়ে

কাব্যি করবেন না। '

 

৭. বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বের বোধ, যেমন :

' রাতের বেলা একলা ঘরে কাঁদি

দিনের বেলা ঠুনকো ঘর বাঁধি

একা আমার ভীষণ একা লাগে '

' জেনিছি বহতা নই আমি শুধু অচঞ্চল বারি

দুরের রক্তাক্ত বেদী মাঝে মাঝে স্পর্শ করে যদি

আমার আত্মজ, সে তো আমি নই জনম অবধি

আস্ফালন-মুঢ় হাতে রেখেছি তরবারি। '

' একাকী তোমাকে নিয়ে গাড়লের মতো বাস জীবনানন্দের দিকে বায়। '

৮. বামপন্থায় বিশেষত লেনিনিজমে বিশ্বাস, যেমন :

" 'মহান' নামক বাল-শোভন শব্দটি

তাঁর নামের আগে শোভা পায় না।

সারা পৃথিবীতে এই বিশেষণটির হাজার গন্ডা দাবীদার

সেই সব অতিমানুষের ভীড়ের নন তিনি।

খুব আলতো ভাবে তাঁর নামের প্রথম অংশ পর্যন্ত

আমরা ছেঁটে দিয়েছি

কারণ, তিনিই তো ইতিহাসের উত্তর-ভাগ, প্রান্তিক, গ্রগতি

তিনি লেনিন।...

গৌরবে যারা গুরুজন, তাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলুম

শ্রদ্ধা, ভক্তি, বিনয়...

তিনি আপনজন

তাঁকে দেবার মতো 'আমি'ই তো রয়ে গেলাম। "

' একটি গোলাকার, জীবনের প্রতীক হাতে নিয়ে ফিরছি

বস্তুটির কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ

এই সহজ সমস্যাটির সমাধানের জন্য

আমি কপিলাবস্তু থেকে কার্ল মার্কসের বসতবাটি পর্যন্ত

ঘুরে দেখবো '

৯. রবীন্দ্রনাথের অপরিমেয় উল্লেখ ও উপস্থাপনা, যেমন :

' ইতিহাস ক্রম-গত শুধু তুমি চলে আস কাছে

প্রতিটি মুহূর্ত পায় বিস্ময়ের বিদ্যুচ্চমকে

আনন্দ ও স্তম্ভনের শিহরন ; স্তব্ধবাক আমি।...

ইতিহাস দ্রুতগতি, বিশ্বকবি তুমিও তো বিস্তৃত সুদূর

নিত্য যারা মুখোমুখি আমার বাঙালি আর- - আমাদের

রবীন্দ্রঠাকুর। '

 

 

পর্ব ৪

ইদানিং মহানাগরিকতার কবি রণজিৎ দাশের "আধুনিক মানুষ, পানশালার দর্শন এবং রবীন্দ্রনাথ" প্রবন্ধটি পড়তে গিয়ে লক্ষ করলাম, তিনি শঙ্খ ঘোষকে বলেছেন, - ' রবীন্দ্রনাথের যে কোন একটি লেখা প্রথমবার পড়ার যে আনন্দ, সেই আনন্দ আপনি আর পাবেন না। '

তিনি লিখেছেন, ' একজন আদ্যোপান্ত আধুনিক মানুষ আমি-- আধুনিকতার বোধে, সংশয়ে এবং বিষাদে জাড়িত মানুষ-- আমার ভারাক্রান্ত মনে রবীন্দ্রনাথের লেখা এক পরাক্রান্ত প্রাণের বার্তা নিয়ে আসে। সেই বার্তা তৎক্ষণাৎ আমার প্রাণকে সঞ্জবিত করে, বন্ধ ঘরে ঢুকে পড়া একঝলক সমুদ্রবাতাসের মতো ' । 

 

পাঠক, মিলিয়ে নিন, শক্তিপদের কবিতার ' প্রতিটি মুহূর্ত পায় বিস্ময়ের বিদ্যুচ্চমকে / আনন্দ ও স্তম্ভনের শিহরন ; স্তব্ধবাক আমি। ... ' লাইন দুটির বিস্ময়ের সঙ্গে। আর এর মধ্য দিয়েই আমরা হদিস পেয়ে যেতে পারি, কবিতার পর কবিতায় রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি কেন তাঁর কাছে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

 

' সেই তুমি কবে

 রাবীন্দ্রিক নায়িকার মতো

এসেছিলে চৈত্রের উৎসবে '

 

' শ্রীখোলে রবীন্দ্রগীতি কীর্তনীয়া নেড়াবুনে

হুজুর এবার ঢাকী হবেন, আমরা হব ঢাকের কাঠি

 নব্যসমস্কৃতি বিনা সব শালা খেঁজুরের আঁটি '

 

' রবীন্দ্রনাথের কবিতা তুমি অবিকল মুখস্থ পারো

 আর কৃপা করার মতো দু'য়েকটি একালের কবিতা পঙক্তি

 তুমি আমার কবিতা লুকিয়ে পড়ো মুখিয়ে গালাগাল দাও '

 

' যত-ই ছাড়তে যাই আষ্টেপৃষ্ঠে তত বাঁধে জট;

এ-কেমন মায়া তব গুল্মকুলে হে প্রবৃদ্ধ বট । '

 

কোন নিগুঢ় সম্পাদনাবোধ থেকে নয়, এই সব কবিতা পঙক্তি বিচ্ছিন্নভাবে হাতের কাছে পাওয়া শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কয়েকটি কবিতার বই থেকে তুলে আনা হয়েছে, শুধুমাত্র তাঁর কবিতার বহুরৈখিক চরিত্রটি প্রকাশ করার প্রয়োজনে। এই বহুরৈখিকতাকে মূল সুতোয় তিনি বেঁধে নিয়েছিলেন, তা ভালোবাসা। অজস্র প্রেমের কবিতা লিখেছিলেন বলেই যে তাঁর কবিতার মূল সুতোটিকে ভালোবাসার বলছি, তা নয়। জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি, এবং হ্যা, মানুষীর প্রতিও তাঁর ভালোবাসা অপরিনামী ছিল বলেই তিনি লিখতে পেরেছিলেন, ' যা লিখেছি এতদিন সারসত্য তার ভালোবাসা। '

 

এই সারসত্যটি জেনে নিয়ে, তিনি যে ভালোবেসে গেলেন তা আসলে এক যুদ্ধ; নিজের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে, প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে এই যুদ্ধে তাঁর আয়ুধ শব্দ, আর আয়ুধ ব্যবহারের শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে তার আবেগ।

 

আবেগ এই যুদ্ধের পরিচালক, নিয়ন্ত্রক। শক্তিপদের রথের সারথি । তাই, আবেগের স্বভাব অনুযায়ী তথাকথিত যুক্তিবুদ্ধির অতীত অনেক প্রবণতাও তাঁর কবিতা ধারণ করেছে। কখনও ছন্দ মিলে, কখনো আভরণহীন গদ্যে, সংহতি ও প্রগলভতায় মিলে মিশে চলেছে তাঁর কবিতা; ভালোবাসার জন্য, ভালোবাসাহীনতার বিরুদ্ধে। আর ঠিক এজন্যই, শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা এককথায় গ্রহণ বা বর্জন করা অসম্ভব। কখনও একটি অসতর্ক টিলেঢালা কবিতা পাঠের পর, হয়তো শক্তিপদের কবিত্ব সম্পর্কে কোনও পাঠক পুনর্বিবেচনা করতে মনস্থ করছেন, ঠিক তখনই তিনি হয়তো পেয়ে গেলেন, --

 

' একদিন মরে যাব; একদিন সব তুচ্ছ হবে

আকুন্ঠ তৃষ্ণার ঋতু ভৃঙ্গারে রক্ষিত ভালবাসা

পাবে না জিহ্নার স্বাদ; সেদিন বিক্ষত পরাভবে

কোথায় কুড়োব শান্তি অমলতা প্রথম পূর্বাসা।

হে ললিত বিহঙ্গমা, তোমারও কি জন্মলগ্নে মীন

পুচ্ছের রুপালি-শীর্ষে দোলাবে কিঞ্চিৎ আয়ুস্কাল

তারপর শূন্যতোয়া স্বেচ্ছাবহ সমীরে উড্ডীন

পাত্রের তলানি হবে রক্তদীর্ণ আহত কপাল । '

এই অমোঘ উচ্চারণের পর নিঃসাড় হওয়া ছাড়া পাঠকের কী করার থাকে ! তবু চমকে উঠে ভাবলেন, "জন্মলগ্নে মীন" এরকম একটা অনুষঙ্গ কোথায় যেন পড়েছেন! যদি মনে পড়ে, আজকের তরুণ কবি প্রবুদ্ধসুন্দরের বায়োডাটার "সিংহরাশি, বৃষলগ্ন, শুক্রের জাতক / নক্ষত্র মঘার বশ, মুষিক পাতক' অংশটুকু, তাহলে টের পাবেন প্রজন্মান্তরেও কীভাবে প্রজন্মবাহিত অনুষঙ্গের এক অন্তর্স্রোত সঞ্চারিত হয়ে চলেছে ধীর বিষের মত।

' জন্মেই জেনেছে দুঃখ, ভালবাসা ভূমণ্ডল ঘুরে

মেলে নাই তার

নক্ষত্র নিহত হল, সূর্যরশ্মি স্বপ্নের মতন

নামে অন্ধকার

লোভী লক্ষ বাহু মেলে চতুর্দিকে প্রগলভ বাসনা

বলে, আছে সুখ

ভোগে, তুমি সুখ চাও? বীরভোগ্যা পৃথিবীর কাছে?

...

বাহিত বাতাসে কার কণ্ঠস্বর বলে যায় তারে

আমি ফুটিয়াছি

কোথা তুমি, অবিশ্বাসী উচ্চকিত আসঙ্গ-লোলুপ

ভগ্নকন্ঠ, যার

নিহত নক্ষত্রবীথি বুকে নিয়ে তাঁকে ঘিরে রাখে

অনঙ্গ আঁধার । '

তিনি যে, নিবিড়-সংহত-ইশারাময় কবিতাও লিখেছেন একান্ত বোধের কাছেদায়বদ্ধ থেকে, তেমন কবিতার অজস্রতা ছেনে অনেকেই উল্লেখ করেছেন, তাঁর "৬মার্চ/ ১৯৭১" কবিতাটির। বাহুল্য জেনেও কবির সামগ্রিক মনোভঙ্গির এমন নির্যাসঘন রূপ পুনরুল্লেখের লোভ সংবরণ করা অসম্ভব, আমার পক্ষেও।

' একদিন মেধা এসে নিয়ে যায় ডেকে

সামগ্রিক বিষণ্ণতা থেকে ।

তৃষ্ণার্ত জিহ্নার কাছ থেকে নেমে আসে জল

জীবনানন্দের গ্রাম, স্লান বেতফল

ঝরায় সামান্য আয়ু খরার বিবেকে। '

 

বিষণ্ণতার বিশেষণ হয়ে এই যে "সামগ্রিক" শব্দটি ব্যবহৃত হল, তার চরিত্রটি বুঝাতে "খরার বিবেক" পর্যন্ত যেতে হয় আমাদের। আমরা যারা, আধুনিকতার বিষামৃত ধারণ করে আছি, তাদের অন্তরঙ্গ-বহিরঙ্গ জেনেই প্রকাশিত হয় "সামগ্রিক বিষণ্ণতা" ও "খরার বিবেক" এই দুটি শব্দবন্ধ। "সামগ্রিক বিষণ্ণতা" থেকে মেধা এসে ডেকে নেয়, সবদিন নয়, একদিন। এই একটি দিনের জন্যই কি তবে জীবনধারণ?

 

আবেগের যে ঘনবদ্ধরূপকে বলা হয় মেধা, সেই মেধাশাসিত তবে কোনও একদিনের জীবন! মূল্যবোধের খরায় অবশিষ্ট যেটুকু বিবেক, তৃষ্ণার্ত বলেই আজ রয়ে গেছে, তাতে সামান্য আয়ু ঝরিয়ে দিতে নেমে আসে জল। সেই জল; যাকে কবি দেখালেন-- জীবনানন্দের গ্রাম, স্লান বেতফল হিসাবে। জীবনানন্দের গ্রাম কি রূপসী বাংলার অনিঃশ্বেষ গ্রামের চিহ্ন বয়ে আনে, যা ভারতীয় জনজীবনের প্রতীক আজও? নাগরিক চোখে এই গ্রাম, এর বেতফল-- স্লান। তবু, এর অনিঃশ্বেষ, প্রাণশক্তিই তৃষ্ণার্ত নাগরিক জিহ্নার কাছে জল। জল শব্দটিই তো ধারণ করে আছে জন্ম ও লয় শব্দ দুটির আদ্য অক্ষর। জন্ম থেকে লয় অব্দি যা, তাই জল। অন্য নামে জীবনও। দুঃসময়ের খরায় এই জীবন, নিজেকে বিলিয়ে দেয় সুসময়কামী অবশিষ্ট বিবেকের উদ্দেশ্যে। বাড়িয়ে দেয় এই বিবেকের আয়ু। যে বিবেক ভালোবাসে, ভালোবাসা চায়-বৃহত্তর মানবিকতায়।

 

আমাদের মনে পড়ে, জল, জলাশয়, নদী শক্তিপদের কবিতায় অনন্যসাধারণ মোটিফের মতো বারবার ঘুরে ফিরে আসে। তাঁর কবিতায় বেশ কয়েকবার ব্যবহৃত হয়েছে "ডহর" শব্দটি। আঞ্চলিক এই শব্দটি প্রাকৃতিক জলাশয় বোঝায়। পূর্ববাংলার জলসমৃদ্ধ জনজীবনের স্মৃতি থেকেই কি তিনি কুড়িয়ে নিয়েছেন এই মোটিফ? নাকি, বিষ্ণু দে'র মতো, লোকায়ত ভাবনার মতো, তিনিও কি বিশ্বাস করতেন, জল প্রাণশক্তির প্রতীক?

 

জন্ম ও লয় সমন্বিত এই জল-জীবনের উদ্দেশ্য তো বহুজন হিতায় আত্মবিসর্জনের মঙ্লাকাঙক্ষা। যে নামেই ডাকা হোক, এই-ই জলের ধর্ম, জীবনের ধর্ম। আধুনিক ত্রাতা মনস্কতায়, - অবহেলা করলেও, পণ্য করতে চাইলেও, আপাত অবহেলার আড়ালে সে থেকে যায় চিরকালীন মানবতার মতো, কবিতার মতো। এই জীবনের প্রতি ঘোর বা মোহাবেশ অনিঃশ্বেষ বলেই শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর মত কবিরা অন্তেবাসী হয়েও, লিখে যান--

 

কেবলি অবসান দিনাবসানেও

কেবলি মৃত্যুর শিশিরপাত

এবং চারিদিকে নীলিম অধিরেখ

জড়ানো ভ্রান্তির উচ্চারণ

কেবলি ফাটা বুকে চোঁয়ানো রোদ্দুর

কেবলি মেঘে ঢাকা হিমানী দিন

সোহাগে যত থির পতনে অবিরল

লোমশ জোড়া হাতে আলিঙ্গন

যতই ঢেকে আনো ততই কাঙাল

পথের মায়ারেখা দীর্ঘতর

কেবলি ঢেকে দাও কেবলি বিস্তার

কেবলি নিশি পাওয়া ত্রস্ত রাত

এবারে ফুটফুটে দু'চোখে কুয়াশায়

এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ

কেবলি অবসান বধির কানে দাও

কেবলি নিঃসীম শিশিরপাত।

ডহরের ঘোর নিয়ে পঞ্চাশের আসন্ন মৃত্যুদিনেও তিনি জানতেন, ভালোবাসার জন্য নিজেকে টিকিয়ে রাখার এ এক আজীবন যুদ্ধ। সময় যখন দুঃসময়, তখন একমাত্র কবিই তো পারেন উৎসর্গ পৃষ্ঠায় লিখে রাখতে,--

ছন্নমতি অন্ধকার ঊর্ধ্বে বহে নীল

মায়াচ্ছন্ন চতুর্দিক সাগর সলিল

তারি কোণে এক ধারে বাসা বেঁধে থাকা

কখন যে ডুবে যায় হাতের পতাকা।

হাঁতের পতাকা ডুবতে না দেওয়া এই এক স্বপ্নসম্ভব ঘোর নিয়ে, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, আজও পাঠকের মনের পাতায় লিখে চলেছেন ভালোবাসার অমোঘ কবিতা। আগামী দিনেও নিশ্চয়ই ভালোবাসাই থাকবে এই জীবনের সারসত্য, এই আশায়।

(সমাপ্ত)