কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

রুপকুণ্ড সফর

ধারাবাহিক ভ্রমণ কথা (পর্ব ১ - ৭ একসাথে)

নীলাঞ্জন ভট্টাচার্য

০৮ আগস্ট - ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

Nilanjan Bhattacharya_edited.jpg
রুপকুণ্ড ১
রুপকুণ্ড ১

press to zoom
রুপকুণ্ড ২
রুপকুণ্ড ২

press to zoom
রুপকুণ্ড ৬
রুপকুণ্ড ৬

press to zoom
রুপকুণ্ড ১
রুপকুণ্ড ১

press to zoom
1/6

 পর্ব ১ 

সময়টা ছিলো ২০১১ সালের আগস্ট মাস। এই সময় অফিস থেকে ছুটি পাবো না আগেই জানতাম। তাই আলাদা করে ছুটির কোনো আবেদন রাখি নি। কিন্তু পাহাড়ে যাওয়ার আইঢাইটা কোনোভাবেই ধরে রাখতে পারছিলাম না। সব দোষ মনের। বছরে অন্তত একবার পাহাড়ের জন্য ট্যাঁ সে করবেই। অরুপদারা আগেই প্ল্যান করে রেখেছিলো। আমারও টিকিট কাটা। এবারের গন্তব্য রুপকুণ্ড।

 

ছুটি নিয়ে একটা সংশয় ছিলো মনে। তাই ফট করে ভগবানের কাছে আর্জি রেখে দিলাম। আমার সাফ কথা- সারা বছর খেটেছি, এবার একটু হিমালয় চাই। এমনিতে রোজ এটা ওটা কতো চাই। কিন্তু একমাত্র হিমালয় নিয়েই দেখেছি ভগবানও একটু সিরিয়াস। নয়তো ঠিক একই সময়ে কি গৌহাটিতেও স্টেট লেভেল মিটিং পড়ে। আমিও এই সুযোগে বেরিয়ে পড়লাম। আমার ইমিডিয়েট বসকে আগেই বলা ছিলো যেকোনো ভাবে ম্যনেজ করবেন স্যার। তিনিও আমতা আমতা করে মেনে নিয়েছিলেন। 

কোনোরকমে মিটিং সেরেই দে ছুট। সোজা অরুপদার বাড়ি। তখন প্যাকিং এর ফাইনাল টাচ। পরের দিন ভোরের রাজধানী। আমরা বেরেলি নামবো। ওখানে পার্থদা আগেই পৌছে গেছেন। পার্থদা কোলকাতার ইউবেক কোম্পানির একজন কর্ণধার। এবারের ট্রিপটা ইউব্যাকই ম্যানেজ করছে। তাই তিনি আমাদের সফর সঙ্গী। অরুপদা, মানসদা এরা দুজনেই একই ফ্ল্যাটে থাকে। কাল আমরা একসাথেই বেরোবো সকালে।  আরেকজন নতূন যোগ হয়েছে উৎপলদা। সে সোজা আসবে স্ট্যাশনে। মাধব এন.জে.পি. থেকে উঠবে। এবার শুধু নবারুনদা আর বুবাই মিসিং। কি একটা কাজের জন্য ওরা যেতে পারে নি।

 

একই দলে আমরা আগেও ঘুরেছি নর্থ সিকিম। ভীষন মজা হয়েছিলো সেবার। সেই থেকে যাকে বলে টিম সেটিং, আমাদের এটা আম্বুজা সিমেন্টের মতো শক্ত।  এবারও ক্যপ্টেন অরুপদা। টিকিট করা থেকে ইউবেকের সাথে কথাবার্তা সবই ওর।

 

মাধবের এ্যন্ট্রির আগে অবধি আমিই সবচেয়ে ছোটো। তাই কোনো দ্বায়িত্বের ভার আমার উপর নেই। অফিস সামলে নিজের বডিটা এনে যে ট্রেনের কামরায় তুলে দিয়েছি - এটাই অনেক। বাকিটা অরুপদা, মানসদারা জানে। যেদিকে নেবে সেদিকে যাবো। একটা ঝাকুনি দিয়ে ট্রেন শুরু হলো। সবাই একই কামরায়। গলার মধ্যে ছোটবেলার সেই ব্যথা ব্যাথা আনন্দটা বেশ টের পাচ্ছিলাম। কখন যে ট্রেনের কু-ঝিক-ঝিকের সাথে সেই ব্যথার নেশায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতে পারি নি।

 পর্ব ২ 

রুপকুণ্ড নিয়ে অনেক আগে পড়েছিলাম কোনও এক ম্যাগাজিনে। প্রায় 16000 ফিট উপরে হিমালয়ের  একটা ছোট্ট জলাশয় বা কুণ্ড। বছরের বেশীরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকে। কিন্তু এই বরফের পেছনে এক রহস্য লুকিয়ে আছে। কুণ্ডর চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো মানুষের হাড়গোড়, খুলি, বড়ো বড়ো জুতো, লাঠি ইত্যাদি। কেউ জানে না কোথা থেকে এলো এগুলো। কেউ বলে দেবীর অভিশাপ। দেবী কোনও কারণে রেগে গিয়ে কিছু পাপীকে অভিশাপ দিয়েছেন। রাগের কারণ নিয়েও জনমনে অনেক সংশয়। আবার যুক্তিবাদিরা বলেন পশ্চিম থেকে আসা কোনও এক  যাযাবর দল যখন ক্লান্ত হয়ে রাতে কুণ্ডের পাশে রাত কাটাচ্ছিলো, তখনই এক বিকট শিলাবৃষ্টিতে মারা পড়ে সবাই। গল্পের কোনও শেষ নেই। এও পড়েছিলাম কোনও এক সাংবাদিক দল কুণ্ডের পাশে রাত কাটাতে গিয়ে অদ্ভুত সব ভুতুড়ে ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমি রোমাঞ্চিত। আর মাত্র দুদিন। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা হয়েও যেতে পারে ঐ প্রাগৈতিহাসিক ভুতদের সাথে। 


বেশ চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙলো। কি জেনো একটা ঝামেলা চলছে বাইরে। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম পুলিশ-জনতা খণ্ডযুদ্ধ চলছে। পাথর ছোড়াছুড়ি, লাঠিচার্জ সবই হচ্ছে। ভয় হচ্ছিলো। আমরাও ট্রেনের ভেতর মাথা নামিয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। তবে বিষয়টা আদৌ কি বুঝে উঠতে পারছিলাম না তখনও। পরে শুনেছিলাম কি একটা কারণে বন্ধ ডেকেছিল আদিবাসীরা। পুলিশ বন্ধ ভেস্তে দেওয়ায়ই সব গণ্ডগোল।

 

ট্রেন গিয়ে সোজা বঙ্গাই-গাও স্টেশনে থেমে গেলো। আর এগোচ্ছে না। চারিদিকে পুলিশ আর পুলিশ। নিরাপদ আশ্রয়। আমাদেরও ট্রেন থেকে নামতে দিচ্ছে না। এভাবে অনেক্ষণ হয়ে গেলো। প্রায় ৭ থেকে আট ঘণ্টা তো হবেই। ট্রেন এখনো বঙ্গাইগাওএ আটকে আছে। তবে পরিস্থিতি আগে থেকে অনেকটা শান্ত। কোনও ঝামেলা চোখে পড়ছে না আপাতত। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়। তাই আমরাও স্টেশনে পায়চারি করে বেড়াচ্ছিলাম। অরুপ-দার কপালে একটু ভাঁজ লক্ষ্য করলাম। ক্যাপ্টেনের ঘাড়েই মূল দায়িত্ব। পুরো ট্রিপটা ঘড়ির কাটার মতো সেট করে রেখেছে অরুপ-দা। অনেকদিনের প্ল্যান। কোথাও একটু অযথা সময় বেড়ে যাওয়া মানেই সময় আর খরচের হিসেবে গণ্ডগোল। বাকি রাস্তায় গতি বাড়িয়ে ভারতীয় রেল যে দেরিটা পুষিয়ে দেবে সে বিশ্বাস কারো নেই। তাই হয়তো একটু টেনশন হচ্ছিলো অরুপ-দার। আমি কিন্তু গায়ে হাওয়া লাগিয়েই ঘুরছি। অফিস থেকে বেরোতে পেরে ফুরফুরে মেজাজে আছি। নিজেকে মোটামুটি কনভিন্স করে নিয়েছি যে অরুপ-দারা থাকতে আমার অযথা মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। তার থেকে বরং ঘুরে ঘুরে বঙ্গাই-গাও স্টেশনটি এনজয় করি কিছুক্ষণ। 


ট্রেনের হুইসল শুনতে পেয়ে আবার উঠে বসলাম। ঠিক সময়ে চললে হয়তো নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছে যেতাম আমরা। আস্তে আস্তে ট্রেনের গতি বাড়তে থাকলো। দুলকির সাথে আবার আড্ডা জমেও উঠলো। হাসি-ঠাট্টায় জমজমাট পুরো কামরা। জানালা দিয়ে একের পর এক গ্রাম, নদী, জনপদ চোখের সামনে থেকে সরে যাচ্ছে। তখন সূর্য ডুবডুবি। একটু পরেই সন্ধ্যা নেমে এলো। ট্রেনের গম গম শব্দ শুনে বুঝতে পারছিলাম মহানন্দা ব্রিজ পেরচ্ছি আমরা। অল্প পরেই এন.জে.পি. স্টেশন। 


এন.জে.পি. পৌছতে প্রায় রাত আটটা হয়ে গেলো। প্ল্যটফর্মে নেমে মাধবকে খুজছিলাম। দূর থেকে দেখতে পেলাম কাঁধে বেগ নিয়ে মাধবও খুঁজছে আমাদের। বেচারা সকাল থেকে ঠায়ে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। চিৎকার করে ডাকলাম "মাধব...৷ এইতো এখানে.. এই কামরায়"। ছুটি নিয়ে মাধবেরও সংশয় ছিলো অনেক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেরে উঠার তৃপ্তি ওরও চোখে মুখে। মাধবের আপ্যায়ন চা দিয়ে হলও। কনিষ্ঠতম মেম্বারকে পেয়ে সবাই খুশী। টিম মোটামুটি কমপ্লিট। পার্থদার সাথে কাল বিকেলে দেখা হলেই মাঠে নামার প্রস্তুতি।


পাঠকের জ্ঞাতার্থে টিমের প্রত্যেক মেম্বারের একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে রাখি। 

প্রথমেই অরুপ-দা - আমাদের ক্যাপ্টেন। সম্পর্কে আমার জামাইবাবু। মামাত বোনের বর। ছফুটের মত লম্বা। শরীরের গঠন শক্ত। ফটোগ্রাফির নেশা। সান্দাকফু ট্রিপে ওর তোলা কিছু অসাধারণ ফটো আছে। সান্দাকফু নিয়ে এর থেকে ভালো ফটো আমি দেখি নি। এবারও আমরা মুখিয়ে আছি ট্রিপের শেষে ফটোগুলো দেখার জন্য।

তারপর মানস-দা। অরুপ-দার বাল্যবন্ধু। শিলঙে একসাথে বেড়ে ওঠা ওদের। ঘটনাচক্রে একই ফ্ল্যাটে থাকে দুজন। মানস-দা হচ্ছে যেকোনো আড্ডার প্রাণপুরুষ। ওর এন্ট্রি মানেই আড্ডার মজা গ্যারেন্টেড। যেকোনো বিষয়েই জ্ঞান রাখে। মানস-দারও এটা প্রথম ট্রেক।

উৎপল-দার সাথে আমার আগের কোনও পরিচয় নেই। অরুপ-দার সাথে একই অফিসে চাকরি করে। সান্দাকফু ট্রিপে অরুপ-দার সাথে গেছিলো আগেরবার। এবার সাথে করে একটা ভিডিও ক্যমেরা এনেছে । তাই একটু পরে পরেই বিভিন্ন মুহূর্তগুলো ক্যমেরাবন্দি করে চলেছে।

মাধব আমার মামাত ভাই। বাচ্চা ছেলে। আমার থেকে অনেক ছোটো। চাকরিসুত্রে শিলিগুড়ি থাকে। ভীষণ জমাটে। খুব ভালো গান গাইতে পারে। যেকোনো আড্ডাতে অন্য মাত্রা দিতে মাধবের গলার জুড়ী নেই। 

আমার সম্পর্কে আলাদা করে বলার কিছু নেই। আড্ডা ও ঘোরা দুটো ভীষণ পছন্দের ব্যাপার। বৎসরে অন্তত একবার হিমালয়ের সান্নিধ্যে পেলেই খুশি।
 
আমাদের টিম নিয়ে আমরা তৈরি। এখন কোচ পার্থদার অপেক্ষায়। 


বেরেলি পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেলো। ট্রেন প্রায় বারো ঘণ্টা লেট। অরুপ-দার সাথে পার্থদার ফোনে কথা হয়েছে। পার্থ-দা ইতোমধ্যে হল-দেওয়ানি চলে গেছেন। হল-দেওয়ানি আমাদের লিস্টে ছিলো না। ট্রেনের বারো-ঘণ্টা লেট সব গণ্ডগোল পাকিয়ে দিয়েছে। সময়মতো পৌছলে আজই গোয়াল-দাম যাওয়ার কথা। পার্থ-দা আমাদের বেরেলি টেক্সিস্ট্যাণ্ডে চলে যেতে বললেন। লোক থাকবে। আমাদের গাড়ি করে হল-দেওয়ানি নিয়ে আসবে।

 

অটো করে সোজা টেক্সিস্ট্যাণ্ডে পৌঁছনো গেলো। ওখানে আমাদের জন্য জওহর সিং ও তাঁর ছেলে মনসুখ অপেক্ষা করছে।

 

জওহর সিং একজন মাঝবয়েসী ছোটোখাটো লোক। সিসনে গাইডের ব্যবসা। এই রুটে গাইড হিসেবে তার বেশ নাম আছে। বাড়ি উত্তরাখণ্ড। মাথায় একটি হিমাচলি টুপি। এক গাল হাসি লেগেই আছে মুখে। হাসলে মুখে ও কপালে অনেকগুলো ভাঁজ পড়ে। চেহারা দেখে পাহাড়িদের বয়স বোঝা দায়। তাই জওহর সিঙের বয়স নিয়ে মনে একটা সংশয় থেকে গেলো।


মনসুখ 16/17 বছরের একতা বাচ্চা ছেলে। চোখে মুখে পাহাড়ের সারল্য।  বাবার আদেশের অপেক্ষায় সদাই তৎপর।


একটি সুমো বুক করা হলো। মনসুখ ও ড্রাইভার মিলে আমাদের জিনিসপত্র উপরে তুললো। রওয়ানা হলাম আমরা হল-দেওয়ানির পথে। গাড়ি থেকে যতটুকু দেখতে পাচ্ছিলাম বেরেলি একটি বড়ো শহর। বড়ো বড়ো রাস্তা, গাড়ী-ঘোড়ার যানজট লেগেই আছে। তাই শহর থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় পড়তে একটু সময় লাগলো। বেরেলি হচ্ছে উত্তরপ্রদেশে। আর হল-দেওয়ানি পড়েছে উত্তরাখণ্ডে। বেরেলি থেকে হল-দেওয়ানির দূরত্ব প্রায় 100 কি.মি। নিয়মমতো 2.5/3 ঘন্টার রাস্তা হওয়া উচিৎ। কিন্তু রাস্তার অবস্থা ভীষণ খারাপ। ঝাঁকুনির চোটে নাড়ি- ভুরি সব বেরিয়ে যাচ্ছিলো। হল-দেওয়ানি পৌঁছাতেই প্রায় 5 ঘণ্টা লেগে গেলো। তখন রাত। এবার সংশয় হচ্ছে এই রাস্তায় একদিনে গোয়াল-দাম পৌছনো যেতো কি না। ঘর্মাক্ত কলেবরে ধুলোয় ধূসরিত হয়ে কোনোরকম হোটেলে পৌঁছলাম। খুবই সাধারণ মানের হোটেল। সুবিধাগুলো খুবই ন্যুনতম। আমাদের দেরি হওয়ায় হঠাৎ করে হোটেলের ব্যবস্থা করতে হয়েছিলো পার্থদার। কোনোরকমে রাত কাটিয়ে দিলেই হলো। কাল ভোরে তো আবার বেরোনো। 

ডিনারে পার্থদার সাথে পরিচয় হলো। লম্বা গড়ন। ছ'ফুট তো হবেনই। গায়ে-গতরে বড়োসড়ো লোক। হাফপ্যান্ট পরেছিলেন। থাই আর কাফ-মাসুল দেখে বোঝা যাচ্ছিল বেশ কসরত করা লোক। আত্মবিশ্বাসী চেহারা। খাওয়ার পর হাতে একটা চকোলেট দিয়ে বললেন "এগুলো পকেটে রাখবে। ট্রেকিঙে গলা শুকোলে মুখে দেবে। আগে ট্রেক করেছো কোনোদিন ?" আমি মাথা নেড়ে বললাম " না"। "কিচ্ছু ভাববে না। দেখবে সবাই মিলে গল্প করতে করতে ঠিক পৌঁছে যাবো"। কথার মধ্যে একটা ভরসা আছে। এখানে বলে রাখা ভালো এর আগে আমার একটা অর্ধেক ট্রেকের অভিজ্ঞতা আছে। নেপালে এ.বি.সি র উদ্দেশ্য রওয়ানা হয়েছিলাম একবার। কিন্তু  এক বন্ধুর অসুস্থতায় দুদিনের মাথায় ট্রেক সেরে ফিরে আসতে হয়েছিলো। এটাকে পুরাদস্তুর ট্রেক বলা যায় না। তাই এনিয়ে পার্থ-দাকে আর কিচ্ছু বললাম না। 


পরদিন ভোরবেলা গাড়ি বোঝাই করে রওয়ানা হলাম গোয়াল-দামের পথে। হল-দেওয়ানি থেকে গোয়াল-দামের দূরত্ব প্রায় 180কি.মি। আজ গোয়াল-দামে রাত কাটিয়ে পরদিন কুলিং গিয়ে গাড়ির পথ শেষ। এখান থেকেই ট্রেক শুরু হবে।
 
হল-দেওয়ানি থেকে গোয়াল-দামের এই রাস্তাটা বেশ মনোরম। বিস্তীর্ণ হিমালয়ের বুক চিরে রাস্তা। চারিদিকে সবুজের মেলা। কোথাও বা তাকে তাকে হলুদ ধান ক্ষেত। আবার কোথাও বা আবার পাইন, ঝাউ গাছের জঙ্গল। মাঝে মধ্যেই রাস্তার বাঁকে চোখে পড়ে ছোটো ছোটো পাহাড়ি গ্রাম। সাথে নাম না জানা পাহাড়ি নদী। সরু সরু রাস্তায় পাহাড়ের খাইগুলো দেখে ভয় হয়। তবে ড্রাইভার সাহেব বিন্দুমাত্র বিচলিত নন। তার একহাতে সিগারেট, আরেক হাতে স্টিয়ারিং। প্রতিটা বাঁকেই নূতন নূতন আবিষ্কার। আমাদের গাড়ির গতি মাঝে মাঝে গ্রামীণ শিশুদের আপন মনে খেলাকে কিছুটা থমকে দেয়। অগাধ বিস্ময়ে আমাদের তিকে তাকিয়ে কখনো হাত নাড়িয়ে টাটা করে অথবা খানিকটা সাথে সাথে দৌড়য়। মেঘেদের কোনও বাধা নেই। যেকোনো চূড়াকে ইচ্ছেমতো ঢেকে দিচ্ছিল। আবার কিছুক্ষণ পরে খুলেও দিচ্ছিলো। ঈশ.. একটু যদি থামা যেতো। সাক্ষী হতে পারতাম গ্রাম হিমালয়ের এই সান্নিধ্যের। কিন্তু রাস্তাটা এত লম্বা, বলার সাহস হচ্ছিলো না।

রাস্তায় পড়বে আলমোড়া, রানী-খেত, কোসেনী, সোমেশ্বর, বৈজনাথ ইত্যাদি। ভ্রমণকাহিনীগুলোতে কত পড়েছি এই যায়গাগুলোর নাম। আজ স্বচক্ষে দেখবো। আমি আর মনসুখ ড্রাইভারের পাশের সীটে বসেছিলাম। মনসুখ প্রায় গিয়ার-বক্সের উপর আর আমি জানালার পাশে। পেছনের দুটো সিটে অরুপ-দা, মানস-দা, উৎপল-দা, মাধব ও পার্থ-দা ভাগাভাগি করে বসেছে। পেছনের সিটে জওহর সিং। পাশের জানালা দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া মুখে এসে লাগছিলো। আমি তখন একের পর এক কল্পনায় আচ্ছন্ন। হঠাৎ মনসুখের গলার আওয়াজে ঘোর ভঙলো। একি?.... মনসুখ বমি করছে। তারাতাড়ি গাড়ি থামানো হলো। জওহর সিং লাজুক হাসিতে বললেন মনসুখের নাকি পাহাড়ি রাস্তায় অমন বমি হয়। অবাক কাণ্ড! পাহাড়ের ছেলের কি করে পাহাড়ি রাস্তায় বমি হতে পারে? সবাই এ নিয়ে হাসাহাসি করলো। মনসুখকে সামলে গাড়ীতে উঠবো এমন সময় পেছন থেকে আবার 'ওয়াক'। তাকিয়ে দেখলাম অরুপ-দাও জানালা দিয়ে কোনোরকমে  গলা বার করে বমি করছে। একি?..শেষ পর্যন্ত তুমিও গুরু? অরুপ-দাকে সামলাতেও কিছুক্ষণ সময় লাগলো। এখন দুজনই মোটামুটি সুস্থ। অরুপ-দাকে নিয়ে আবার একরাশ হাসাহাসি হলো। অরুপ-দা নিজেও হাসতে হাসতে কুট। ক্যাপ্টেনের এই হাল হলে বাকি টিমের কি হবে? কিন্তু সত্যি কথা বলতে এতো প্যাঁচানো রাস্তায় বমি না হওয়া বরং কঠিন। তাই পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকেই আমি আগেই এভোমিন খেয়ে নিয়েছি। কোনোভাবেই রিস্ক নিতে রাজি নই। সব ঠিকঠাক হওয়ার পর আবার চলা শুরু হলো।

 

গোয়াল-দাম পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেলো। পাহাড়ে সন্ধ্যা তাড়াতাড়ি নামে। শুনলাম এখানে দিনভর বৃষ্টি হয়েছে। তাই ঠাণ্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। কোনোরকমে নিজেকে লেপের তলায় পুরে শুয়ে পড়লাম। কাল থেকে ট্রেক।

 পর্ব ৩ 

সারা রাত মুশলধারে বৃষ্টি হয়ে ভোরের দিকে থামলো। ঘুম থেকে উঠে হোটেলের বারান্দা থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম পাহাড়গুলো মেঘমুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। মেঘেরা সব দলবেধে ঘর বেধেছে পাহাড়ের গায়ে। তাই পাহাড়ের উপর বৃষ্টি আঁচ করতে পারছিলাম। খানিকক্ষণ দাড়ালাম বারান্দায়। গায়ে হালকা, মিস্টি শীত  লাগছে। গায়ে চাদর জড়ালেই চলে। আকাশের রঙ তখনও ধুসর। মাঝে মাঝে মেঘ সরলেই সবুজ চূড়াগুলো ভেসে উঠে। বারান্দা থেকে নীচে তাকালে দেখা যায় হোটেলের একটা ছোট্ট সবুজ উঠোন। খুব সাজানো নয়। নাম নাজানা নানান ফুল এলোমেলোভাবে ফুটে রয়েছে। তাতেও পাখিদের ব্যস্ততার কোনও অভাব নেই। একবার এই ডালে, কি আরেকবার ঐ ডালে। দূর থেকে ভেসে আসা কোনো এক কৃষকের মাটি কোপানোর শব্দও এই নিস্তব্ধতায় কেমন যেনো তাল জুড়ে দেয়। মনটা ভালো হয়ে গেলো। পার্থদা বললেন ঐ মেঘের পেছনেই লুকিয়ে আছে আলি বুগিয়াল, বেদনি বুগিয়াল আর রুপকুণ্ডের যতসব রহস্য।

আগের দিন আমাদের হলদেওয়ানি পৌছতে দেরি হওয়ায়, ট্রেকের খাবারদাবার, জিনিসপত্র কেনাকাটায় একটু দেরি হলো। দুপুর প্রায় ১২ টায় রওয়ানা দিলাম কুলিঙের পথে। রাস্তা ঠিকঠাক ছিলো। প্রায় ২.৩০ নাগাদ কুলিং পৌছুলাম। এখানেই গাড়ির রাস্তা শেষ। যতটুকু বুঝতে পারছিলাম এই অঞ্চলটি বোধহয় মুল কুলিং গ্রাম থেকে একটু দূরে অবস্থিত। আশেপাশে কোনও জনবসতি নেই। সাকুল্যে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান। দোকানটার পাশ বেয়েই একটি সরু পথ নেমে গেছে পাহাড়ে। এটাই দিদিনা গ্রামের রাস্তা। কিন্তু হাতে মাত্র দু-ঘন্টা সময়। তাই একটু তাড়াহুড়ো আছে। তারপর সন্ধ্যা নেমে আসবে পাহাড়ে। জওহর সিং মালপত্র দিয়ে খচ্চরগুলোকে আগেই রওয়ানা করে দিয়েছেন। আমরাও পেছন পেছন হাটা শুরু করলাম। প্রথমে অনেকটা পথ নেমে গিয়ে প্রায় একটি নদীর সমতলে চলে এলাম। এখান থেকে খাড়া দমফাটা চড়াই। হাটতে গিয়ে জমা সব দম বেরিয়ে যাচ্ছিলো। সন্ধ্যা নেমে এলে আবার এই রাস্তায় বন্য জন্তুর আনাগোনাও ঘটে। তাই পার্থদা আর জওহর সিং তাড়া দিচ্ছিলেন পা চালানোর জন্য। সাথে করে আনা জলের বোতল প্রায় খালি। সত্যি আর পারা যাচ্ছিলো না। ছেড়ে দে মা, কেদে বাঁচি অবস্থা। দাঁড়িয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই। জওহর সিং আমাদের কয়েক কদম আগেই চলছেন। পেছন পেছন পার্থ-দা, মাধব, অরুপ- দা, মানস-দা। শেষ স্থান নিয়ে আমার ও উৎপল-দার মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে আছে। এরই মধ্যে মানসদা একটি মজার হিন্দি ডায়লগ দিয়ে বেশ জমিয়ে তুললো। জওহর সিংকে নীচে থেকে "সিংজী মাহোল কেয়সা হে?"- জিজ্ঞেস করলেই তিনি উপরে চারিদিক তাকিয়ে বলেন "মাহোল ঠিক হ্যায়"। আমাদেরও চলার এক মজা তৈরি হয়। তাছাড়া এই প্রশ্নের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে একটু  রেস্টও নেওয়া যায়। পরে আমাদের নিজেদের মধ্যেও চালু হয়ে গেলো "মাহোল কেয়সা হ্যায়"। একটু হাপিয়ে উওঠলেই "মাহোল কেয়সা হ্যয়"। পার্থদারও আপত্তির কিছু নেই। মাহোল ঠিক হলেই তো এগোবো।  

প্রায় সন্ধ্যার সময় দিদিনা পৌছোলাম। গিয়ে সত্যিকারের  ঠিকঠাক মাহোল পেলাম। খাবার-দাবার, গরম জল, সব রেডি। আমাদের ঠাই হলো একটি গ্রামের বাড়িতে। সম্ভবত কাঠ ও মাটি দিয়ে তৈরি সমস্ত বাড়িটি। মোটা মোটা মাটির দেওয়াল। কাঠের ছাত। সরু সিড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ঐ ছাতের উপরেই আজকের রাতে সওয়ার ব্যবস্থা। চাল আর ছাতের তফাতটা খুব কম। তাই কেউ দাড়ালে মাথা লেগে যায়। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হচ্ছিলো। পাশেই একটি ভেন্টিলেটর। কাঁচের বদলে পলিথিন লাগানো। সমস্ত রাত জুড়ে হাওয়ার ফর ফর শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দিদিনা গ্রামটার দিকে চোখ গেলো। হিমালয়ের বুকে ভেসে থাকা ছোট্ট একটি গ্রাম। ২০/২৫ ঘর হবে। কৃষিই বোধহয় এদের মূল জীবিকা। ক্ষেতগুলোতে মেয়েরা স্থানীয় পোষাক পরে কাজ করছে। মাথায় কাপড় বাধা। ছেলেরা গরু নিয়ে ব্যস্ত। সবার পায়ে গামবুট। ইচ্ছে ছিলো গ্রামটা ঘুরে বেড়াবার। কিন্তু সময় নেই। এখনই বেরোতে হবে। পরোটা-সব্জি খেয়ে আবার রওয়ানা হলাম আমরা। আজকের গন্তব্য আলি বুগিয়াল। গলায় বাধা ঘন্টা টুং টাং শব্দ করে খচ্চরগুলো আমাদের আগে বেরিয়ে গেলো। সাথে মনসুখ। শুরুতে তেমন চড়াই নেই। প্রায় সমতল। রাস্তায় লাই পাতার মত বড়ো বড়ো গাছ পেলাম। পাতাগুলো আয়োতনে বিশাল। বাড়িতে বাবা লাই-শাক ভালোবাসেন। তাই হিমালয়ান লাই নিয়ে গেলে হয়তো খুশি হতেন। কিন্তু বাড়িতে ব্যবহৃত রোজকারের বাজারের ব্যাগে এই পাতা আটার কথা নয়। এর জন্যও হয়তো হিমালয়ান সাইজেরই কোনো ব্যাগের দরকার। আমি আরও নিশ্চিত আমার বাবার হজম শক্তিতেও  কুলোবে  না এই লাইয়ের হিল্লে করা। তাই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্ল্যানটা আপাতত বাদ দিলাম।

আলি বুগিয়ালে যাওয়ার রাস্তাটা কখনও সরু কখনো বিস্তৃত। ঘন জঙ্গলে ঘেরা। কোথাও জঙ্গলের ঘনত্ব এতোটাই বেশী যে সূর্যের আলোও ঢোকা মুশকিল। একটা থমথমে নিস্তব্ধতা। গাছগুলোর গা বেয়ে ঝুলে আছে শতাব্দী প্রাচীন ফার্ন। কোথাওবা ঝুলে আছে অর্কিড। কে জানে এদের বয়স কতো। হয়তো এই পথ দিয়ে হেটে যাওয়া কতো পর্বতারোহীর পদচিহ্নের সাক্ষী। আগের দিনের বৃষ্টির কোপ রাস্তাতে পড়েছে। বার বার পা পিছলাচ্ছে। গাছ থেকে জোঁক বৃষ্টির আশঙ্কাও আছে এই রুটে। তাই বারে বারে হাত-পায়ের খেয়াল রাখতে হচ্ছে।আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সমস্ত উপত্যকা জুড়ে শুধু মেঘই মেঘ। ভিসিবিলিটি খুবই কম। আমরা অনেকটা পথ চলে এসেছি। মেঘের মাঝখান থেকে জওহর সিঙের আকাশবাণী শোনা গেলো "হম আলী পহচনেওয়ালে হে। কুছ দিখাই নেহি দে রহা। মাহোল খারাব হ্যায়। সহমলকে চলনা।" ছোটো পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে যে একটা বড়ো উপত্যকায় চলে এসেছি - সেটা বুঝতে পারছিলাম। পায়ে পায়ে লাল, বেগুনি, হলুদ হাজারো রকমের ছোটো ছোটো ফুল। একটু মেঘ সরলেই সবুজ উপত্যকার ব্যপ্তিটা বোঝা যাচ্ছিলো। এই লাল বেগুনি ফুলের মাঝখান থেকেই মেঘ ভেদ করে হঠাৎ কয়েকটি ঘোড়াকে দৌড়তে দেখতে পেলাম। এ তো বাস্তব নয়। নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া রুপকথা। পক্ষীরাজ ঘোড়া ও রাজপুত্রের রাজ্য। এই রাজ্যেই মাঝখানে একটি ছোট্ট ট্রেকার্স হাটে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। আপাতত ভিজে যাওয়া গায়ের কাপড়গুলো শুকোতে দিয়েছি। এখনো মেঘ কমে নি। রহস্যে ঘেরা উপত্যকা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমিও ভাসমান।

 পর্ব ৪ 

অসংখ্য জগৎযন্ত্র,  ঘুরিছে নিয়মচক্রে

          অসংখ্য উজ্জ্বল গ্রহ রহিয়াছে ফুটিয়া।

গম্ভীর অচল তুমি, দাঁড়ায়ে দিগন্ত ব্যাপি,

          সেই আকাশের মাঝে শুভ্র শির তুলিয়া।

আলি বুগিয়ালের পুর্ণিমার আকাশ ভেদ করে ওঠা নন্দা-কুণ্ঠি শৃঙ্গদুটিকে দেখে উপরের কবিতার লাইনগুলোই মনে হচ্ছিলো বার বার। অরুপদাই ঘুম থেকে ডেকে তুললো সবাইকে। বাইরে কনকনে ঠান্ডা। জ্যাকেট চাপিয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়ালাম। সমস্ত আকাশজুড়ে তখন আলোর বাধ ভেঙেছে। মর্মে মর্মে সুখের সংবাদ। আকাশ ভরা তারাগুলোর মাঝখানে শ্বেতশুভ্র নন্দা-কুণ্ঠি। আহা.. সে কি দৃশ্য। রুপকথার আনাগোনা। এক স্বপ্নের জগৎ। হিমালয়ের সাথে এই ভাষাহীন আদানপ্রদানের রহস্য একমাত্র হিমালয়ই জানে। ভবিষ্যতে আর কোনোদিন এরকম দৃশ্যের সাক্ষী হতে পারবো কিনা - জানা নেই। তাই শেষরাতটা চোখভরে জ্বলজ্বলে শৃঙ্গদুটিকে দেখে দেখেই কাটিয়ে দিলাম।

সকাল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি। 'আলি' ছেড়ে যাবার ইচ্ছে করছিলো না।  আবারও হাটতে হাটতে ভিজতে ভিজতে 'পাথর নাচউনি' ট্রেকার্স হাটে হাজির হলাম আমরা। সারাটা রাস্তা এতোই ভিজেছিলাম যে স্মৃতিতে বৃষ্টি ছাড়া আর কিছু মনে নেই। এই রুটের হাটগুলো খুব সুন্দর। কোনো এক পাহাড়ের চূড়ায় নানান রঙের টুকটুকে মিষ্টি একটা বা দুটো পাশাপাশি ডোম। ডোম বলতে সিমেন্টের একটা প্ল্যাটফর্মের উপর টিন দিয়ে গোল করে একটা ঘর। এর ভেতরেই স্লিপিং ব্যাগ পেতে ঘুমের ব্যবস্থা। আর প্রাকৃতিক কাজকর্মগুলো বাইরে খোলা আকাশের নীচে। এরইমধ্যে একটা মজার বিষয় আবিষ্কার করলো মানস-দা। উৎপল-দার ব্যাগ থেকে দুটো হলোফিল জ্যাকেট, প্যান্ট  ইত্যাদি বেরোলো। পার্থদা প্রায় আতকে উঠলেন। পাহাড়ে যেখানে একটা ব্যাগের ওজন নেওয়াই কষ্টকর, সেখানে দুটো ব্যাগ। আমরা এতোদিনে বুঝে গেছিলাম উৎপল-দা ভীষণ স্টাইল কনসাশ লোক। একদম বেছে বেছে কাপড়জামা পরে।  তাই পাহাড়কেও বাদ দেয়নি। অনেক পিড়াপীড়ির পর শেষ পর্যন্ত উৎপল-দা স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে এই জ্যকেটগুলো প্যান্টের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে প্ল্যান করে এনেছে।  এতোদিনের ট্রিপে শুধু একটা কালারের জ্যাকেট পরে কাটানো সম্ভব নয়। তাই দু রঙের দুটো নিয়েছে। 

পরদিন সকালে 'পাথর নাচউনি' থেকে 'বাগুয়া বাসা' পৌঁছাতে হবে। হাই অল্টিচুড ট্রেক। বেশ কষ্টকর। পার্থদা আমার সাথে সাথেই চলছিলেন। মাঝেমধ্যে কথা বলে বলে আমাকে সাহস যোগাচ্ছিলেন। হাপাতে হাপাতে কোনো রকমে 'কেলু বিনায়ক' পৌঁছনো গেলো। পা আর এগোচ্ছিলো না। তাই কিছুক্ষণ  ড্রিনকস ব্র্যেক। কেলু বিনায়ক হচ্ছেন সিদ্ধিদাতা গনেশ। একটা পাথরের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি গনেশের মুর্তি। জওহর সিঙের কথায় বোঝা গেলো স্থানীয়রা খুব মানে এই স্থানটিকে। বৎসরের কোনো এক সময় ভক্তদের ঢল নামে এখানে। ভাবতে আশ্চর্য লাগে এতো উপরে এই গনেশ মুর্তটি স্থাপন করলো কে? একদল গুজরাটি ট্রেকার্সের সাথে পরিচয় হলো। বাবা-ছেলে একসাথে বেরিয়েছেন। কিছুক্ষণ কথা হলো এদের সাথে। ওরাও পূজো দিলেন।  
 
পাহাড়ের গা বেয়ে সরু রাস্তা দিয়ে হাটতে হচ্ছিলো। নীচে দীর্ঘ খাদ। রাস্তাজুড়ে লাল রঙের কিছু ছোটো ছোটো পাতা ফুটে রয়েছে। কিছুদূর গিয়ে কিছু ব্রহ্মকমলেরও দেখা পেলাম। জওহর সিং উচ্ছ্বসিত হয়ে দেখালেন আমাদের। এই রুটের এটা একটা আকর্ষণ। কিন্তু যতটুকু শুনেছিলাম চোখের সামনে দেখে কিন্তু তেমন আকর্ষণীয় কিছু লাগলো না। নেহাৎ সাদামাটা একটি ফুল। এতো উপরে ফোটার জন্য হয়তো এতো নামডাক। 

বাগুয়াবাসা ট্রেকার্স হাটের লকেশনটা তেমন ভালো লাগে নি আমার। তুলনায় একটু ম্লান। বলার মতো তেমন আলাদা কিছু নেই। পার্থদা দেখালেন সামনের যে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে ওটার মঝখানেই  রুপকুণ্ড।  কাল ওখানেই যাবো আমরা।

 পর্ব ৫ 

সারা রাত হাওয়ার তাণ্ডব চললো উপত্যকা জুড়ে। সোঁ সোঁ শব্দে মনে হচ্ছিলো ঘরের বাইরে যেনো একদল  বুনো হাতি রাগে ফুঁসছে। গোটা ট্রেকার্স হাটটাই না হাওয়ায় উড়িয়ে  নিয়ে যায়। কিন্তু  সকালে উঠে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম সবকিছু শান্ত। যেনো কিচ্ছুটি হয় নি। অনেক দুষ্টুমি করলেও আমার মেয়ের চোখের দিকে তাকালে যেমন বোঝার কোনো উপায় থাকে না - ঠিক তেমনি হিমালয় কিন্তু তার নিজের ছন্দেই আছে। মিনিটে মিনিটে সাজ পাল্টাচ্ছে। ৮০ র দশকের নায়িকাদের মতো। সাজ সরঞ্জামেরও অভাব নেই। ছায়া, মেঘ, বরফ, রোদ -এদের একটু হেরফেরেই নতুন নতুন  রূপ। 

আমাদের পাশেই একটি বিদেশী ট্রেকার্সদের গ্রুপ ছিলো। আজকের ট্রেকিং এর জন্য এরাও তৈরি হচ্ছে। পোর্টাররা মিলে টেন্টগুলো গোটাচ্ছে আর সাহেবরা পাশের পাতানো লম্বা টেবিলে ব্রেকফাস্ট নিচ্ছেন। যে যাই বলুক যেকোনো ব্যপারে সাহেবী কায়দাই আলাদা। থাকার জন্য একরকমের টেন্ট, খাওয়ার জন্য আরেকরকমের, এমনকি প্রাকৃতিক কাজকর্মের জন্যও আলাদা টেন্ট। রাজষিক ব্যাপার। আমরা তো এই ১৫০০০ ফিটেও মধ্যবিত্ত। নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থানে অনড়। বুকভরা শুধুই হতাশা। আমাদের থাকা, খাওয়া, রান্নার জন্য একটাই ঘর। পোশালে থাকো। আর প্রকৃতির ডাকে খোলা আকাশের নীচেই যেতে হয়। আলাদা কোনো টেন্ট নেই। সকালে উঠেই এদিক-ওদিক দৌড়োদৌড়ি। নিজেকে আড়াল করার মতো কোনো ঝোপও এই উচ্চতায় নেই। ছাতাই ভরসা। কোনোরকমে কোথাও একটু  ঝোলার মতো যায়গা পেলেই অনেক।

বাগুয়াবাসা থেকে রুপকুণ্ড চড়াইটা মারাত্মক। প্রায় হাজার ফিটতো হবেই। জওহর সিং মাঝে মাঝাই "মাহোল ঠিক হ্যায়" বলে সাহস যোগাচ্ছেন। সাথে সাথে আমরাও কদম কদম বাড়িয়ে যাচ্ছি। আজ অপেক্ষার অবসান হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বহু প্রতিক্ষিত রুপকুণ্ডে পৌছাবো। রুপকুণ্ড দেখা শেষ করে বাগুয়াবাসাতে ব্রেকফাস্ট করে সোজা বেদনী বুগিয়ালে নেমে যেতে হবে। পার্থদা বলছিলেন আজ প্রায় ২৬ কি. মি. হাটা। আমার জন্মেও এতোটা পথ হাটি নি একসাথে। আমরা যেখানে হাফিয়ে হাফিয়ে চলছি, জওহর সিং প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে চলছেন। পায়ে একটা সাধারণ চটি, গোটানো প্যান্ট আর পরনে নিতান্তই সাধারণ একটা জ্যাকেট। তবে সবচেয়ে সেজেগুজে বোধহয় উৎপল-দাই। টুপি থকে জুতো সব রং মেলানো। আরেকজনের কথা না বললেই নয়, সে হচ্ছে মাধব। হাটা দেখলে মনে হয় যেনো হিমালয়ে নয় কোনো বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। টুক টুক করে দিব্যি একের পর পাহাড় চড়ে যাচ্ছে। কোনো ক্লান্তি নেই। অরুপ-দা, মানস-দারাও ভালোই চলছে। আজ আমিও কিন্তু একটা আলাদা এনার্জি পাচ্ছিলাম। হাটতে তেমন কোনো কষ্ট হচ্ছিলো না।

হাটতে হাটতে চোখে পড়ছিলো রাস্তায় ছড়ানো ছিটানো চকলেটের খোসা, চিপসের প্যাকেট, জলের বোতল, মদের বোতল। আধুনিক মানুষের পদচিহ্নগুলো থেকে হিমালয়ও রক্ষা পায় নি। হয়তো একদিন বরফ ঢেকে ফেলবে এগুলোকে। কিন্তু হিমালয়ের বুকে এই ক্ষতগুলো থেকে যাবে চিরন্তন। চিড়েভাজা, ডালমুট, কফি দিয়ে জলখাবার সারা হলো। জওহর সিং সাথে করে অনেকগুলো আদার টুকরো এনেছিলেন। কারো মাউণ্টেন সিকনেস হলে কাজে দেয়। কিন্তু এ যাত্রা বোধহয় এই সিকনেস থেকে বেচে গেলাম। এবার একটা খাড়া চড়াই। উপরে উঠার সেরকম কোনও নির্দিষ্ট রাস্তাও নেই। এক পা একটি পাথরে দিলে আরেক পা কোথায় দেবো দেখে ঠিক করতে হয়। পাথরগুলোও নড়েবড়ে। যেকোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়তে পারে। উপরে উঠলেই দেখা যাবে রুপকুণ্ড। এখানেই হয়তো সন্দীপন-দার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিলো। বরফে ঢাকা থাকায় আঁচ করতে পারে নি। পা ফেলতে গিয়ে প্রায় পুরো শরীর ঢুকে গেছিলো বরফের গর্তে। শেষ পর্যন্ত আর রুপকুণ্ড দেখা হয় নি। ৫০০ মিটার দূর থেকে ফিরে আসতে হয়েছিলো। 

কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। নীচে সবুজ রঙের একটি ছোট্ট পুকুর দেখতে পেলাম। এটাই রুপকুণ্ড।

 পর্ব ৬ 

মনে আছে 'রোজা' সিনেমার শেষ দৃশ্য? সিনেমার নায়িকা মধু-র সাথে তার স্বামী অরবিন্দ স্বামীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাক্ষাৎ। দর্শকরাও এই মিলনের জন্য টানা তিন ঘন্টা চোখের জল সামলে রেখেছিলেন। ব্রিজের ওপার থেকে স্বামীকে আসতে দেখে দৌড়ে গিয়েও থেমে গেলেন মধু। আর পা চলছিল না। এতদিনের এতো অপেক্ষা, বিরহ, স্বপ্নের এক মুহূর্তে অবসান। সমস্ত শরীর কাঁপছিলো তার। আর একসাথে এতো আনন্দ বিশ্বাসও হচ্ছিল না তার। তারপর ব্যাকগ্রাউন্ডে আবার 'রোজা জানেমন' বেজে উঠলো। সিনেমার সমাপ্তি। দর্শকেরা চোখ মুছতে মুছতে হল থেকে বেরিয়ে পড়লেন।

যদিও প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু উপর থেকে রুপকুণ্ড দেখে আমার অবস্থাও সেরকমই ছিলো। বার বার শিহরিত হচ্ছিলাম। আমার জীবনের প্রথম সফল ট্রেক। আনন্দ প্রকাশের কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বসে পড়লাম একটা পাথরের উপর। আর এগোতে যাচ্ছিলো না। আমার পাশ দিয়ে একে একে সবাই নীচে নামল। অগত্যা অনিচ্ছা সত্বেও আবার রওয়ানা হলাম আমি। রাস্তা মসৃণ নয়। হড় হড় করে পাথর ঝরছে। প্রায় চতুষ্পদী প্রাণীর মতই হামাগুড়ি দিয়ে নামলাম।

কূণ্ডের সামনে যাওয়ার আগেই একটি পাথরের উপর একটি নরখুলি ও দুটো হাড় রাখা দেখে চমকে উঠলাম। নীচে আবার একজোড়া বিশালাকায় জুতোও রাখা ছিলো। অনেকটা ডেঞ্জার সাইনের মতো দেখাচ্ছিলো। তবে এতো গোছানো ডেঞ্জার আগে দেখিনি কোনোদিন। এটা কে বা কারা সাজিয়েছেন তা ভগবানই জানেন। তবে এই দৃশ্যপট যে একটা গা ছমছমে ব্যাপার তৈরি করেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

রুপকুণ্ডের সৌন্দর্য নিয়ে তেমন বর্ণনার কিছু নেই। চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা একটা কুণ্ড। পাহাড় ডিঙিয়ে বাইরে দেখার কোনো উপায় নেই। বছরে প্রায় এগারো মাস বরফে ঢাকা থাকে। চারিদিকে ছড়ানো রয়েছে অনেকগুলো হাড়গোড়, জুতো। সবাই এগুলো নিয়েই মেতে রইলাম কিছুক্ষণ। হলিউডের যেকোনো হরর ছবির প্লটের মতো। কোনো এক মন্ত্র পড়লেই কঙ্কালগুলো আবার না চলতে শুরু  করে দেয়। হাড়গুলোর পসিশন দেখে মনে হচ্ছিলো মৃত্যুর সময় একদল লোক হয়তো কুণ্ডের চারিদিকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিন্তু তারপর কোনো এক আকষ্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় সবার। যে, যেভাবে বসেছিলেন, কঙ্কালগুলো ওভাবেই রাখা আছে। কোথাও কোথাও আবার পাহাড়ে চড়ার জন্য ব্যবহৃত লাঠির ফসিলও ছিলো। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা ভেবে একটু বিষন্ন বোধ করছিলাম। হয়তো বাঁচার জন্য  কত আর্তনাদই করেছিলেন এরা। এই মৃত্যু নিয়ে প্রচলিত আছে নানান গল্পও। কেউ বলেন এই কঙ্কালগুলো জাপানি সৈন্যদের মরদেহ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এই পথে পালাবার সময় তুষাড়ঝড়ে আটকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তাদের। আবার অনেকের ধারনা যে এই কঙ্কালগুলো কাশ্মীরের জেনারেল জড়োয়ার ও তাঁর সৈন্যদের, যারা ১৮৪১ সালে তিব্বত যুদ্ধ থেকে ফেরার সময় রুপকুন্ডতে ঝড়ের কবলে পড়ে। তবে স্থানীয়দের মতে কানৌজের রাজা যশধাওয়াল গর্ভবতী রানী বালাম্পাকে, কিছু দাসী ও নাচের একটি দল নিয়ে নন্দা দেবীর মন্দির দর্শনে গিয়েছিল। ফেরার পথে তাঁরা তুষারঝড়ে পরে এবং তাদের মৃত্যু হয়। যদিও জওহর সিং এই ঘটনার সাথে দেবীর অভিশাপ নিয়ে এক নিখুঁত গল্প শোনালেন। কথাগুলো এতোই দৃড়তার সাথে বলছিলেন, শুনে মনে হতে পারে হয়তো তাই। 

জওহর সিঙের মুখে আরও  শুনতে পেলাম আগে এই হাড়ের সংখ্যা আগে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ ছিলো। কিন্তু  দীর্ঘদিন ধরে চুরি হতে হতে এই হাড়ের সংখ্যা ক্রমশই কমে এসেছে। কথাটায় বেশ খটকা লাগলো। চুরি? - মানে? শেষ পর্যন্ত হাড়গোড়? - এই অঞ্চলে তো ট্রেকার ছাড়া আর কেউ আসার কথা নয়।  কিন্তু এই হাড়গুলো নিয়েই বা কি হবে? কাউকে তো হাড়ের টুকরোকে হরিণের সিঙের মতো বাড়ির দেয়ালে সাজিয়ে রাখতে দেখিনি কোনোদিন। অদ্ভুত ব্যাপার। এখন  যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় আমি বাড়ি যাওয়ার পর ব্যাগ খুলে সুভেনির হিসেবে গদগদ হয়ে একটা আস্তো মানব হাড় তুলে ধরি সবার সামনে, তবে কি হতে পারে? ... মা, বাবা, বৌ, মেয়ে, বন্ধুবান্ধব কি রিয়েকশন দেবেন? - হয়তো চিরকালের জন্য ট্রেকিঙের সমাপ্তি। নয়তো বাবার হাতেই ঐ হাড়ের আঘাতে মৃত্যু। পরের দিনের সংবাদপত্রের শিরোনাম - ' হাজার বছর পুরনো হাড়ের আঘাতে পিতার হাতে পুত্রের ঐতিহাসিক মৃত্যু '।

রুপকুণ্ড দেখে আমরা জুনারগলির পথে রওয়ানা দিলাম। জুনারগলি রুপকুণ্ড থেকে ৪০০ মিটার উপরে। প্রায় আধঘন্টা লাগে পৌঁছাতে। আমরা সবাই গেলেও, কেনো জানি না পার্থদা গেলেন না আমাদের সাথে। উনি রুপকুণ্ডেই থেকে গেলেন। এবার আমাদের সাথে জুড়লো পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা দুটো ছেলে। দুজনেরই বয়স ২০- ২৫ এর মধ্যে। এরমধ্যে একজন ফুটবল প্লেয়ার। এই প্লেয়ারবাবুর নিজেকে নিয়ে গর্বের কোনো শেষ নেই। এগুলো পাহাড়ে ওঠা উনার জন্য নাকি কিছুই না। রোজ ৫/৬ কি.মি. দৌড়নোর অভ্যাস। তাই উনি প্রায় দৌড়ে দৌড়েই উঠতে থাকলেন। পাহাড়ে যে কোনোরকমের গায়ের জোর খাটে না- এ ব্যপারে প্রায় সকল পাহাড়যাত্রীই সগমত পোষণ করবেন। আমরা প্রমাদ গুনছিলাম ঐ ভদ্রলোকের মাউন্টেন সিকনেস না হয়ে যায়। এবং তাই হলো। জুনারগলি উঠে দেখলাম ভদ্রলোক মাটিতে কাঁত হয়ে শুয়ে গোঙাচ্ছে। কোনোরকমে জলটল দিয়ে সারানো হলো। 

জুনারগলিতে তখন সব মেঘাচ্ছন্ন। আমরা একটা রিজের উপর দাড়িয়ে আছি। উল্টোদিকে মেঘের পর্দা। পর্দা সরলেই নাকি নন্দা-কুণ্ঠি দর্শন হয়। অধীর অপেক্ষায় রইলাম। আমাদের সাথে আরও অনেকগুলো ট্রেকার গ্রুপ ছিলো। নিজেদের সাফল্যে লাফালাফি করছিলো সবাই। হঠাৎ জওহর সিং চিৎকার করে বলে উঠলেন 'উহ দিখ রহা হ্যায়'। তাকিয়ে দেখি একটু একটু করে মেঘ সরছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সমস্ত আকাশ পরিষ্কার। ঢিল ছোড়া দূরত্বে নন্দা-কুণ্ঠি। সবাই তালি বাজাতে লাগলো। গায়ে কাটা দেয়। অবিশ্বাস্য। আহা! এ কি দেখলাম! - এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। হঠাৎ হাউ হাউ কান্নার শব্দে তাকিয়ে দেখলাম উৎপল-দা কাঁদছে। অঝোরে জল ঝরছে চোখ দিয়ে। সাদাকালো  অক্ষরে এ কান্নার কারন আমার জানা নেই। জুনারগলিতে যতক্ষণ ছিলাম তন্ময় হয়েছিলাম। সামনে ধ্যানমগ্ন নন্দা-কুণ্ঠি। বেশীক্ষণ থাকা গেলো না। আবার মেঘ ঢেকে দিলো সবকিছু। ফিরতে হবে এখন। আজ অনেকটা পথ হাটতে হবে।

 পর্ব ৭ 

পৌরাণিক মতে কোনো এক সময় পার্বতীর নিজের মূখ দেখার জন্য আয়নার অভাব হয়েছিলো। এ নিয়ে পার্বতীর ভীষণ অভিমান হয়। কথাটা কোনোভাবে মহাদেবের কানে যায়। তিনি তো দেবাদিদেব। সবার গার্জেন। আর সামান্য আয়নার জন্য কি না তাঁর বৌয়ের দুঃখ পেতে হয়। রেগেমেগে  ত্রিশুলের খোঁচায় দিলেন একটি  আস্তো কুণ্ড খুঁড়ে। শেষ পর্যন্ত  সেই জলে নিজের রুপ দেখে পার্বতীর মূখে হাঁসি ফুটে উঠে। এরজন্য নাম রুপকুণ্ড। ব্যাপারটা পার্বতীকে মহাদেবের সারপ্রাইস গিফট ছিলো কি না জানা নেই। তবে কাজটা নিসন্দেহে মহাদেবসুলভ।  

রুপকুণ্ড নামতে নামতে রাস্তায় আবার পাথরনাচৌনি পড়ে। বড় বড় পাথরের সমাহার চারিদিকে। দেখলে ভয় হয়। সামান্যতম ফসকে গেলেই আমাদের গড়িয়ে নিয়ে যাবে হাজার ফুট নীচে। এই পাথরগুলো নিয়েও জওহর সিং আরেকটা ইন্টারেস্টিং গল্প জুড়লেন। পাথরনাচৌনিতে নাকি কোনো নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো কোনো সময়। কিন্তু কোনো রাজা বা রাণী (সঠিক মনে নেই) এই নিষেধ অমান্য করায় দেবীর অভিশাপে সবাই পাথর হয়ে যান। মানে গল্পমতে প্রতিটি  পাথর আসলে রাণীর এক একজন পরিচারিকা। কেনো জানি না হিমালয়ের এই পরিবেশে এই অদ্ভুত গল্পগুলো খুব মানানসই মনে হয়। রোমাঞ্চকরও বটে।

আজ আমাদের যেকরেই হোক বেদনী বুগিয়ালে নামতে হবে। প্রায় ২৬ কি.মি. পথ। রুপকুণ্ড যেতে বেদনী ও আলী এই দুটি বুগিয়াল পড়ে রাস্তায়। কেউ কেউ আলী বুগিয়াল না ছুয়ে সোজা বেদনী বুগিয়াল হয়ে উপরে উঠেন। তবে ঐ রুটটা অনেক বেশী খাড়া। তাই অনেকেই এড়িয়ে যান। এটা লোহারজং থেকে ওয়ান হয়ে উঠতে হয়। আবার আরেকটা রূট, যেটা দিয়ে আমরা উঠেছিলাম, দিদিনা হয়ে। আমরা নামার সময় দ্বিতীয় রুটটা ধরবো। পার্থদা দুটো বুগিয়ালই ছুঁয়ে যাওয়া এনসিউর করেছিলেন। 

হাটতে হাটতে পথ শেষ হচ্ছে না। যে যার মতো করেই হাটছে। হিমালয় থেকে বিদায়টা বেশ বেদনাদায়ক। এই গাড় নীল আকাশ, বিস্তৃত পর্বতমালা, প্রতি বাঁকে নতুন রুপ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হয় না। 'আবার কবে আসবো'- প্রশ্নটা বার বার চলতে থাকে মনে। 

প্রায় দুপুর দুটোর সময় বেদনী বুগিয়াল পৌছুলাম। পা-টাকে আর চালানো যাচ্ছিলো না। শেষ পদক্ষেপগুলো এলোমেলোই ছিলো। ওপর থেকে বেদনী দেখা যায়। চারিদিকে বুগিয়াল। মাঝখানে একটি লেক। এই লেক পেরিয়েই থাকার যায়গা। অনেকগুলো ছোটো ছোটো হাট। অনেকটাই গোছানো যায়গা। লোকসমাগমও বেশি।  অনেকেই বেদনী এসে ঘুরে যান। রুপকুণ্ড যাওয়া হয়তো সবার পক্ষে সম্ভব নয়। বেদনীর সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। আকাশ পরিষ্কার ছিলো। চূড়াগুলোর প্রতিবিম্ব পড়েছে লেকের জলে। হাজারো মেষ নিয়ে মেষপালকরা পাহাড় থেকে নামছে। মেষ ও মেষপালক দুজনেই মাঝে মাঝে হারিয়েও যাচ্ছে মেঘের ভেতর। শুধু অরুপদার ক্যামেরার খচ খচ। ওদিকের আকাশে নন্দা-কুণ্ঠি,  ত্রিশূল, চৌখাম্বা তখন স্পষ্ট। সময়ের সাথে সাথে আকাশেও তখন সিঁদুরের খেলা। 

 

'আর কি কখনও কবে এমনও সন্ধ্যা হবে?'
       

- এর উত্তর আমার জানা নেই। তবে আয়োজনগুলো যেনো আমাদেরই জন্য। আমরা না থাকলে এই আয়োজনগুলো দেখবে কে? হে ঈশ্বর কি দেখালে? আমার এই চোখ ধন্য। পথের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই শেষ। ভাবতে খারাপ লাগছিলো কাল আমাদের ট্রেক শেষ। গতো এক বছরের সকল প্রস্তুতির সমাপ্তি। তবে মনে নিয়ে গেলাম আগামীতে বেচে থাকার রসদ।

 সমাপ্ত