কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

শেষে হাতে পড়ে থাকে একখানা রবীন্দ্রনাথ
সীমা ঘোষ
০৯ মে ২০২১

আসলে আমরা যতই বলি আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। এটা মুখে বলি মাত্র,  ভেবে দেখি না এর গভীরতা। ভাবিনা তাদের ঠিক কোন ধরনের ভবিষ্যত বানাতে চাইছি আমরা। এরা কি পঙ্গু জড়ভরত আধখানা মানুষের ভবিষ্যত হয়ে উঠবে? নাকি মানুষের একখানা অখণ্ড সত্তা হয়ে উঠবে?


শিরোনামে রবীন্দ্রনাথের নাম নিয়ে এসব কেন বলছি ? চলুন,  বেশি ধানাই পানাই না করে সেদিকেই যাই ... 

সম্প্রতি আমাদের দেশের পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা ইলেকশন হয়ে গেল। নির্বাচনের দিন ঘোষণা হলো ঠিক যখন চারদিকে করোনা কঠিন পরিস্থিতি একটু একটু কমেছে। মানুষ একটু একটু করে ছন্দে ফিরছে। সবচেয়ে বেশি করে ফিরছে ছাত্রছাত্রীরা। তাদের স্থগিত থাকা পরীক্ষা নেওয়ার দিনক্ষণ ঘোষণা হচ্ছে। আমাদের রাজ্য আসামে সরকারি স্কুল আগেই খোলা হয়েছে। কলেজ খুলেছে পরীক্ষা হয়েছে, আবার একটি প‍রীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মাঝে ইলেকশন কমিশনের ঘন্টা। নির্বাচন মানেই স্কুলের দফারফা। ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্কুল চাই নির্বাচন কর্মী হিসেবে শিক্ষক চাই, অশিক্ষক কর্মচারী চাই। এই ডামাডোলে অনলাইনে ছাত্রদের সারা বছর বসিয়ে রেখে ফাইনাল পরীক্ষার কাজ সেরে অনেক বেসরকারি স্কুল চুপচাপ প্রচুর অর্থের বিনিময়ে নতুন ক্লাসের ভর্তির কাজ সেরে নিল। কম্পিউটারের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের ও স্মার্ট ক্লাসের পয়সাটুকু আদায় করে নিল তখন, যখন আমাদের রাজ্যে করোনা দ্বিতীয় বার হামলা শুরু করে দিয়েছে। গত বছরের পরিষেবাহীন আদায়ীকৃত অর্থের কোনো কৈফিয়ৎ না দিয়েই এইসব স্কুল মোটা অঙ্কের টাকা বাগিয়ে নিয়েছে। আর দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর দল স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমস্তরকম পরাামর্শ উপেক্ষা করে ক্ষমতা দখলে নেমে পড়তে চাইল। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি কারো পরামর্শ, সদুপদেশ সব অগ্রাহ্য করল। ৩২ লক্ষ মানুষের "পুণ্য" স্নানে আর আমাদের কোটি টাকা ব্যয়ে ভোটের খেলা খেলে নিতেই হবে। কর্তাভজা সংবাদমাধ্যম কানের কাছে রোজ গেয়েছে, "কত্তা, এই তো ফসল পেকে গেছে আপনাদের এখনই তো গোলায় তোলার উপযুক্ত সময়।" কত্তা ভাবলেন, 'আর দেরি নয় আয় গো তোরা .. ।'


কিন্তু ভোট পর্ব চলতে চলতেই দেখা গেল যারা কোভিড জয়ের ধ্বজা ওড়াচ্ছিলেন তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা, বিজ্ঞানীরা সত্য হলেন, কিন্তু, ক্ষমতাধর আমরা তা মানব কেন। কোনো রকম ব্যবস্থা ছাড়া দেশের মানুষকে একটা পরিকল্পিত অতিমারীর সামনে ঠেলে দেওয়া হল বললে ভুল হয় না ।

ছাত্রছাত্রীদের তবে কী হবে ?


*********

আর দেশের ছাত্রছাত্রী নামক সেই ভবিষ্যতকুলকে তাদের পড়াশোনা পরীক্ষা দেওয়া না দেওয়ার দোলাচলে রেখে অনিশ্চয়তার মধ্যে উদ্বেগের সামনে  বসিয়ে দেওয়া হলো। সরকারি নির্দেশ এল - পরীক্ষা বন্ধ। অফলাইন ক্লাস বন্ধ।  অনলাইনে ক্লাস নিতে হবে। এই নির্দেশ  যাঁরা জারি করছেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাঁদের অনেকেই  হয়তো  নিজেদের মোবাইল এখনো ঠিক মতো চালাতে জানে না। অথচ এঁরা দেশের শৈশব কৈশোর যৌবনকে মোবাইলের সামনে যন্ত্রবৎ বসিয়ে রাখার নির্দেশ দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন। এঁরা ছাত্রছাত্রীদের বাস্তব সমস্যাটা বুঝতেই পারছেন না। একজন শিক্ষক একটি একটি  ক্লাস নেবেন আর ছাত্রছাত্রীরা ঘরে ঠায় এক জায়গায় একটি ছোট্ট যন্ত্রে চোখ মন আটকে বসে থাকবে। এতে এদের কোনো  শারীরিক মানসিক  চাপ ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে কিনা এসবের এঁরা ধার ধারেন না। এঁরা জানেনই না, আর খোঁজ নেওয়ার চেষ্টাও করেননি এক বছরের বেশি সময় ঘরবন্দি জীবনে এইসব শিশু কিশোর কিশোরীর দল এতে আদৌ কোনো সুবিধা পেল কিনা। এ ছাড়া ঠিক কতজন ছাত্রছাত্রী স্মার্টফোনের সুবিধা পেয়েছে ?  আর যারা পেয়েছে তাদের মধ্যে কতজন ছাত্রছাত্রী মনের সঙ্গে চোখের দৃষ্টি শক্তির জোর হারিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছে। না, এঁদের এসব ভাবার দরকার নেই। তাই স্মার্টফোনের চেয়ে এঁরা বিশেষ বয়সের ছাত্রীদের হাতে স্কুটি তুলে দেওয়া "লাভজনক" মনে করে। মনে করে, এদের শারীরিক মানসিক সমস্যার কথা বোঝার চেয়ে এদের মনোহীন পুতুল ভাবা ভালো। তাই, এদের কীরকম ক্লাস রুটিন হলো,  রুটিন অনুুযায়ী ক্লাস চলছে কিনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের "কড়া নজরদারি"। আসল কথা, বেতনের টাকা গুনে শিক্ষকরা ফাঁকি দিচ্ছে কিনা সেটাই বড়, এতে ছাত্রছাত্রীদের ঠিক কী আর কতখানি উপকার হচ্ছে এসব ভেবে কী লাভ!  ঠিক এইখানে ঝপ করে একখানা রবীন্দ্রনাথ হাতে এসে পড়ে ।।
 
অথ রবীন্দ্রকথা


******

ছাত্রছাত্রী নামক আমাদের দেশের হতভাগাদের জীবনের প্রবাহের সঙ্গে স্বাস্থ্যকর সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো পথ আর থাকছে না। (হ্যাঁ, ঠিক করে ধরেছেন, রবীন্দ্রনাথের কথাই একটু নিজের মতো বলার চেষ্টা করলাম )!!  প্রকৃতির মধ্যে জীবন যাপনের শিক্ষার সামান্য গতি যেটুকু ছিল সবটাই এখন অনলাইন পড়াশোনার নাম করে কেড়ে নেওয়া হলো। সবচেয়ে বড় কথা সব স্কুল কি নির্দিষ্ট সময়ের অন্তর রাখছে দুটো ক্লাসের মধ্যে এনিয়ে বিজ্ঞানসম্মত কোনো নির্দেশিকা নেই। এদের মতামতের মূল্য নেই। এদের মনের খোঁজ নেওয়ার মতো শিক্ষাও আমাদের নেই। আমাদের বলতে শিক্ষক অভিভাবকদের কথা বলছি। আরও বিশেষ ভাবে শিক্ষা পরিচালনার কর্তাব্যক্তিদের কথা বলছি। কারণ, এই অভাগা উপভোক্তাদের মধ্যে সংখ্যা গরিষ্ঠেরই ভোট নেই। জানি, রবীন্দ্রনাথ যে প্রকৃতির ভেতর থেকে শিক্ষার কথা বলতেন তা আমরা কতটা পারতাম তার চেষ্টা না করেই, তাকে অবাস্তব করে তুলেছি। কিন্তু, এর পরেও রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে অপছন্দের চৌহদ্দির প্রাচীরঘেরা স্কুলই একমাত্র জায়গা যেখানে এই সব শৈশব কৈশোর যৌবন খুব কম সময় হলেও সমবয়সীদের সঙ্গ সান্নিধ্য পেতে পারে শিক্ষকদের রাঙা চোখের বাইরে। পরিবার, সমাজ ও অভিভাবকদের সীমাহীন চাপিয়ে দেওয়া আকাঙ্ক্ষার বাইরে শরীর মন নাড়াচাড়ার ঐ মুক্তিটুকুও আমরা কেড়ে নিলাম ।

রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি রাখুন , কিন্তু ভাবনার পাতে


****************


একটু রবীন্দ্রনাথও রাখুন , মানিয়ে যাবে ।


************
 
"...স্বাধীনভাবে দেশকে শিক্ষাদানের ভার আমাদের নিজেকে লইতে হইবে। দেশের কাজে যাঁহারা আত্মসমর্পণ করিতে চান এইটেই তাঁহাদের সব চেয়ে প্রধান কাজ। "শিক্ষাবিধি" তে রবীন্দ্রনাথের এই লেখা পড়ে আমার যেমন হাসি পাচ্ছে, আপনারা যদি কেউ এ লেখা পড়েন তবে তাঁরাও মুচকি হাসছেন। "দেশের কাজে আত্মসমর্পণ" করার জন্য যে লড়াই এই নির্বাচনে দেখলাম তাতে হাস্যোদ্রেক স্বাভাবিক। কারণ দেশের ভার যাঁরা নেন, তাঁদের চেতনার জগতে ছাত্রছাত্রী নামক বিষয়টাই নেই, ফলে, তাদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধ জাগানোর দায় আছে বলে তাঁরা বিশ্বাসই করে না। তাই, এদের মধ্যে মানবিক বোধ জাগিয়ে তুলতে কী করা দরকার তা নিয়ে ভেবে এদের "শ্বাসকষ্ট" হয় না। কীভাবে এদের স্বাভাবিক অগ্রগতির সব রাস্তা রুদ্ধ করে নিজেদের পছন্দ মতো সুবিধা মতো একটা ভাবনাকে এদের মধ্যে গেঁথে দেওয়া যায় এই সব ভেবেই এঁরা স্বপ্নে অক্সিজেন পান। তাই ওঁদের ভেতরের মনুষ্যত্বকে ছেঁটে ফেলার পরিকল্পনা থাকে। সে যেন মানুষ না হয়ে তাদের শাসন ক্ষমতা রক্ষা করার প্রয়োজনীয় সামগ্রী হয়ে ওঠে। আর, আগামী দিনের দিনের শুষ্ক পণ্ডিত হয়ে উঠতে চায়। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি, "তখনি সে মানুষ না হইয়া মাস্টার-মশায় হইতে চায় ;  তখনি সে আর প্রাণ দিতে পারে না, কেবল পাঠ দিয়া যায়।" 

ওরা যন্ত্র নয়, কোমল সজীব সতেজতায় পূর্ণ প্রাণ -


**************

 

ওদের যত্ন নিন। ওরাই আমার দেশের গৌরব।


*************

 

অজান্তে ওদের "দেশদ্রোহী" ক‍রছেন কিনা ? সতর্ক থাকুন !


**************

 

সব শেষে বলি, অল্প পরিসরে সব কথা তো বলা যায় না, তবু, আমাদের সরকারি স্কুলে "ফ্রি শিক্ষা" র দিন তো দেখছি না। তাই অনলাইন ক্লাসের যদি কোনো বিকল্প নাই থাকে তবে, তাকে যতটা সম্ভব ছাত্রছাত্রীদের শরীর মনের দিকে লক্ষ রেখে রুটিন তৈরি হোক। সপ্তাহে তিন দিনের বেশি ক্লাস রাখবেন না। যতই বিদ্যালয় বিদ্যালয় বলুন পড়াশোনা এখন টিউশন নির্ভর। এরা অনলাইনে টিউশনও করে ভুলে যাই যাবেন না। ভাবের ঘরে চুরি না করে সরকারি কর্মকর্তাদের মেনে নেওয়া ভালো, প্রাইভেট টিউশনই এখন ত‍রী পারের "মোক্ষম" উপায়। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম ২০ জনের নাম বের হলে, সংশ্লিষ্ট  স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নির্দিষ্ট। স্কুলের যে গর্ব ফলাও হয় ওটা পরের সেশনে ছাত্র ভীড় বাড়ানোর বিজ্ঞাপন মাত্র। স্কুলের কৃতিত্ব তিন আনার বেশি নয়। ওখানে বাবা মার পকেটের মোটা টাকার টিউশনির বাকি ১৩ আনার অবদান আছে - এই সরল সত্য মেনে নিন। আমার ঘরের কাজের মাসিিকে ছেলেমেয়েদের' "মাস্টারের বাড়িতে'' প্রাইভেট পড়ানোর জন্য রোজগার করতে হয়। বই খাতা মিড ডে মিল টিউশন ফিস জিরো হলেও তাদের ছেলেমেয়েদের এটাই ভরসা। যতদিন না এর বিকল্প হয় ততদিন রবীন্দ্রনাথ শিশুদের মধ্যে অক্সিজেনের অভাবে হাঁপিয়ে মরছে। কোভিড সেখানে মড়ার উপর খাড়ার ঘা ।


তাই, সতর্ক হোন কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ সহ্য করে যদি আমাদের কেউ কেউ টিঁকেও যাই, তবে কোমর বেঁধে ময়দানে নামতে হবে। কী করে এর মোকাবেলা করা যায়। মন্দির মসজিদে কোভিডের সঙ্গে যুদ্ধ হয় না। ওটাকে শেষে তো হাসপাতাল ই বানাতে হয়। আবার তৃতীয় ঢেউয়ের ধাক্কা এলে ছেলেমেয়েদের ঘরবন্দি করে মনেপ্রাণে পঙ্গু  ক‍রে তোলার যে অপচেষ্টা করছি, তা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। ওরা পিছিয়ে যাচ্ছে মানে দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র নেতা মানে সে তো সবজান্তা নন। তাই তাঁকে বুঝতে হবে, "মানুষ মানুষের কাছ হইতেই শিখিতে পারে ; যেমন জলের দ্বারাই জলাশয় পূর্ণ হয়, শিখার দ্বারাই শিখা জ্বলিয়া ওঠে ,প্রাণের দ্বারাই প্রাণ সঞ্চারিত হ ইয়া থাকে। মানুষকে ছাঁটিয়া ফেলিলেই সে তখন আর মানুষ থাকে না, সে তখন আপিস-আদালতের বা কলকারখানার প্রয়োজনীয় সামগ্রী হইয়া ওঠে।"