কৃষ্টি ও সংস্কৃতি

বাউল কবি রবীন্দ্রনাথ
শ্রী নগেন্দ্র চন্দ্র শ্যাম (পুনঃপ্রকাশ)
১১ মে ২০২১

শ্রী নগেন্দ্র চন্দ্র শ্যাম মহাশয়ের লেখা এই রচনাটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল
২৫শে বৈশাখ, ১৩৬৮ বঙ্গাব্দে, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে দৈনিক প্রান্তজ্যোতি পত্রিকায়...

রবিন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। কিন্তু এই বিশ্বকবি কথাটা দিয়ে, রবীন্দ্র মানসের সম্পূর্ণ পরিচয় দেওয়া যায় কিনা সন্দেহ। রবীন্দ্র সাহিত্য ও শিল্প শৈলীর সাথে যাদের সামান্য মাত্র পরিচয় আছে, তারাই জানেন জাগতিক জীবনে এমন খুব কম ভাব ও বিষয় রয়েছে, যা রবীন্দ্র শিল্পে স্থান পায়নি। ধূলিকণা থেকে মহাকালের সূর্য তারা, বিশ্ব জীবন প্রবাহের নিগূঢ় উপলব্ধি, বিরাট ভাবনা রাশি রুপের সঙ্গে রূপাতীত জগতের অভেদ সমন্বয় স্থান পেয়েছে কবি মানসে। এক কথায় রবীন্দ্রনাথ অখণ্ড জীবন প্রবাহের সঙ্গে তাঁর সংবেদনশীল অন্তর নিয়ে এক স্তরে আছেন, সদ্য কৈশোর অতিক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ;

হ্রদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,

জগত আসি সেথা করিছে কোলাকুলি।

প্রভাত উৎসব কবিতায় তরুণ কবি আকাশের দিকে চেয়ে সমগ্র বিশ্ব জীবনের সঙ্গে একত্বের জন্য আকুল হয়ে গিয়েছেন -----

আকাশ "এসো, এসো" ডাকিছে বুঝি ভাই,

গেছি তো তোমারি বুকে আমি তো হেথা নাই।

প্রভাত আলো সাথে ছড়ায় প্রাণ মোর,

আমার প্রাণ দিয়ে ভরিব প্রাণ তোর।

তরুণ রবীন্দ্রনাথের এই উচ্ছল আবেগ সঞ্চারিত হয়েছে, তাঁর সাহিত্য শিল্পে, ----- এতে বিন্দুমাত্র অতিশয়োক্তি নেই। রবীন্দ্রনাথের বিকাশ ধারাকে অনুসরণ করতে গেলেই এই সত্যটি অনস্বীকার্য হয়ে পড়বে। "কড়ি ও কোমল" এর "প্রাণ" কবিতার প্রকাশ কাল ১২৯০ বঙ্গাব্দ, কবির বয়স ২২ ----- সনেট লিখতে শুরু করেছেন। কবি-হৃদয়ে মানুষের প্রতি ভালোবাসার উৎসরণ -----

 

মরতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে

মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।

এই সূর্য করে এই পুষ্পিত কাননে

জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই।

ধরায় প্রাণের খেলা চির-তরঙ্গিত

বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রুময়।

মানবের সুখ দুঃখে গাঁথিয়া সঙ্গীত

যদি গো রচিতে পারি অমর আলয়।

রবীন্দ্রনাথ সর্বকালের সর্বমানবের মনে যে অমর আলয় রচনা করেছেন তাঁর নিজের জন্য - তাঁর শতবার্ষিকী এই প্রমাণ বহন করে আজ উপস্থিত হয়েছে। কবির সর্বদানুভুতি তাঁর রচনার সর্বত্রে বিদ্যমান। সকল মানুষের, বিশেষতঃ মাটির কাছাকাছি মানুষের যে কতখানি আপন কবি রবীন্দ্রনাথ, সেই কথাটিও বলবার একটা বিশেষ সার্থকতা রয়েছে আজ। ধনীর ঘরে জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু আভিজাত্যর সামাজিক খোলস তাঁর মানবিকতা কে অবরুদ্ধ করে রাখতে পারেনি। বাইরের খোলস, লৌহ কঠিন সামাজিক কাঠামো রবীন্দ্রনাথের কাছে অচলায়তন ----- কারাগার। এই কারাগার ভেঙ্গেই হয়েছে তাঁর মানসনির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র ----- বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কোনও প্রভেদ নেই তাঁর কবি মানসে। এই প্রসঙ্গে একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি "সোনার তরী"র "বসুন্ধরা" কবিতা থেকে -----

" সমুদ্রের তটে ছোট ছোট নীলবর্ণ পর্বত সংকটে একখানি গ্রাম ; তীরে শুকাইছে জাল, জলে ভাসিতেছে তরি, উড়িতেছে পাল ; জেলে ধরিতেছে মাছ, গিরি মধ্য পথে সংকীর্ণ নদীটি চলি আসে কোনমতে আঁকিয়া বাঁকিয়া, ইচ্ছে করে, সে নিভৃত গিরিক্রোড়ে সুখাসীন ঊর্মি মুখরিত লোকনীড় খানি হৃদয়ে বেষ্ঠিয়া ধরি ...... ইচ্ছা করে মনে মনে স্বজাতি হইয়া থাকি সর্বলোকসনে দেশ দেশান্তরে ; উষ্ট্র দুগ্ধ করি পান মরুতে মানুষ হই আরব সন্তান দুদম স্বাধীন ...... সকলের ঘরে ঘরে জন্মলাভ করে লই হেন ইচ্ছা করে। "

 

এই ইচ্ছা রবীন্দ্র মানস জীবনের মর্মকোষের একটি বাস্তব অনুভূতি। এই অনিবার্য প্লাবন রবীন্দ্র রচনার সর্বত্র প্রবাহিত ----- কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে। এই অবারিত দুর্বার উচ্ছ্বাসে ক্রমেই তাঁর রচনায় রসঘন রূপ ধারণ করেছে। "সোনার তরী"তে যা ইচ্ছা বা উদ্গত অভীপ্সা, "চিত্রা"য় তা সঞ্চরণশীল স্পন্দিত হৃদয়বেগ, দুঃখ দুর্দশা লাঞ্ছিত জীবনের বাস্তবঅঙ্গণে কবি চিত্তের সক্রিয় সরব অভিযান।

ওরে তুই ওঠ আজি 

আগুন লেগেছে কোথা !

কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি

জাগাতে জগৎ-জনে !

কোথা হতে ধ্বনিছে

ক্রন্দনে শূন্যতল।

কোন অন্ধকার মাঝে

জর্জর বন্ধনে ;

অনাথিনী মাগিছে সহায় !

স্ফীতকায় অপমান 

অক্ষমের বক্ষরক্ত শুষি

করিতেছে পান

লক্ষ মুখ দিয়া !

বেদনারে করিতেছে পরিহাস

স্বার্থোন্ধত অবিচার।

এই স্বার্থোন্ধত অবিচারের শেষ আজও হয়নি। রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী আত্মা নিপীড়িত মানুষের বেদনার মধ্যে বাসা বেঁধেছে কালস্রোতের গতিপ্রবাহে। ইতিহাসের বিবর্তিত পথে মানুষের মধ্যে যে হিংস্র নিষ্ঠুর সংঘাত, সেই আত্ম নির্যাতনের বিরুদ্ধে বেদনা বিধুর কবি মানসের প্রতিবাদের ধ্বনি আমরা বহুবার শুনেছি নৈরাশ্য ক্ষুব্ধ চিত্তের জ্বালাময়ী ভাষায়। রবীন্দ্রনাথ দুঃখ পেয়েছেন, দুঃখকে বরণ করেছেন। যৌবনের আবেগ তাঁর সাহিত্যে একটি স্নেহাশ্রিত তথ্য হলেও তাঁর প্রকাশকে তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা দিয়ে সংযত ও নিয়ন্ত্রিত করেছেন ----- দুঃখ সহ্য করেছেন ----- দুঃখ দেননি। প্রচণ্ড আঘাত কে বুকে নিয়ে বিধাতার জয়-শঙ্খ তুলে ধরেছেন ; কিন্তু তাঁর অন্তর্বেদনা তাঁর দেবতার চরণতলে সমর্পিত -----

 

"তুমি কি তাঁদের ক্ষমা করিয়াছ ?

তুমি কি বেসেছ ভালো ?"

 

রবীন্দ্রনাথ সুধু বহির বিশ্বের রূপাশ্রয়ী কবি নন, তিনি মানবাত্মার অসীম ব্যাপ্তি ও নিগূঢ় বেদনার কবি, তাঁর বেদনাতুর হৃদয়ের তন্ময় আত্মসমর্পণ সর্বজনের বেদনার মনের মানুষের অন্বেষণে সার্থক হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বমানবের পথিক আত্মা ভারতীয় সাধনার বাউল কবি, তাঁর একাত্ম আত্মীয়তা জাতিহারা, ধর্মহারা, বন্ধনহীন মানুষের সঙ্গে। নিগূঢ় বেদনা মথিত চিত্তে বাউল কবি বলেছেন -----

ওরে নিঠুর দরদী

তুই কি মানস মুকুল

ভাসবি আগুনে

এই অন্তর্বেদনার পথে এখানে বাউল সাধকের নিবিড় প্রেমের যে অভিযান তার সার্থক প্রকাশ দেখি রবীন্দ্রনাথের "জীবন দেবতা" কবিতাটিতে -----

 

" ওহে অন্তরতম,

মিটেছে কি তব সকল তিয়াষ

আসি অন্তরে মম ?

দুঃখ সুখের লক্ষ ধারায়

পাত্র ভরিয়া দিয়েছি তোমায়

নিঠুর পীড়নে নিঙাড়ি বক্ষ

দলিত দ্রাক্ষা সম। "

 

এই হৃদয় মথিত দ্রাক্ষারনে রবীন্দ্র সাহিত্য অভিসিঞ্চিত। জাত নেই, সমাজ নেই যাদের, পথে পথে মনের মানুষের গান গেয়ে ঘুরে যারা, রবীন্দ্রনাথ সেই অন্ত্যজ, ব্রাত্য, মন্ত্রবর্জিত মানুষের কবি, তাঁদের স্ববর্ণ, স্বগোত্র, তাঁদের সাথে "দেবতার আপনার স্থানে" বিশ্বের সুদুর প্রসারিত জীবনের ক্ষেত্রে "দেবতার বন্দিশালার বাইরে" কবির মনের মানুষেরা পুজা। খণ্ড জীবনে মানুষের সৃষ্ট অচলায়তন ভেঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংস্কার মুক্ত কবি মানস বাহির হয়েছে বিশাল বিশ্বের সীমাহীন অঙ্গনে। তাঁর আত্মা মুক্ত আকাশের মুক্তপক্ষ বিহঙ্গ। জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সাহিত্য শিল্পে, কাব্যকলায়, সমাজ জীবনের শৃঙ্খল মোচনে শিক্ষার নুতন ধারার প্রবর্তনে রবীন্দ্রনাথ "পাকা দেউলের পুরাতন ভীত" ভাঙ্গাকে আপনার ধর্ম বলে গ্রহণ করেছিলেন। এই জন্যই কবি পেয়েছেন আপন পরিচয় বাংলার বাউলের মধ্যে, বিশ্ব বেদনার সঙ্গে যাদের স্বতস্ফুর্ত অন্তরঙ্গ অনুভূতি একাত্ম -----

 

কবি আমি ওদের দলে

আমি ব্রাত্য আমি মন্ত্রহীন

 

দেবতার বন্দীশালায় আমার নৈবদ্য পোঁছাল না। আলোর নিঃশব্দ চরণ ধ্বনি তাঁর রক্ত চাঞ্চল্যে "জন্ম পূর্বে কোন পুরাতন কালযাত্রা থেকে" এই ধ্বনি তাকে করছে অনুসরণ। "অসীম কালে প্রসারিত হয়েছে তাঁর চিত্ত সৃষ্টির আলোক তীর্থে এক চিরন্তন জ্যোতির মধ্যে নিজের জাগরণকে অনুভব করছেন কবি -----

 

" সেই জ্যোতিতে আজ আমি জাগ্রত- যে জ্যোতিতে অযুত নিযুত বৎসর পূর্বে সুপ্ত ছিল আমার ভবিষ্যৎ, আমার পুজা আপনি সম্পূর্ণ হয়েছে প্রতিদিন এই জাগরণের আনন্দে, আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন রীতি বন্ধনের বাইরে। আমার আত্মবিস্মৃত পুজা কোথায় হল উৎসৃষ্ট, জানতে পারিনি। "

 

আলোকতীর্থের চিরজাগ্রত কবিকে সকল রীতিবন্ধনের বাইরে মানুষের হৃদয়বেদনায় খুঁজে পাওয়া যাবে ----- সেই বেদনালোকই তাঁর "যথাস্থান"। এখানেই তিনি বাউল।