বহমান বর্তমান

একটি ছোট পদক্ষেপ - ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত
সঞ্জীব দেবলস্কর
০৫ জানুয়ারি ২০২১ 

চোখে ভাসছে সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘শতরঞ্জ-কি-খিলাড়ি’র সেই দৃশ্য। দুই দাবাড়ু জায়গিরদার নগরীর বাইরে নিরিবিলি স্থানটিতে বসে বসে প্রত্যক্ষ করছেন বিজয় গৌরবে গোরা পল্টন নবাব ওয়াজিদ আলি শার প্রাসাদ অবরোধ করতে চলছে। এরা অপেক্ষা করছেন কখন অন্ধকার নামবে, আর মুখলুকিয়ে কোন ক্রমে বাড়িতে ফিরে যাবেন। ছোট্ট বাচ্চা খিদমতগার কাল্লু বলছে, ‘কেউ লড়াই দিল না, একটি গুলিও ফোটালো ন, গোরা সাহেব আমাদের মুলুকের মালিক হয়ে গেল!’

  

এবারের বড়দিনে দরগাকোণার সমস্ত ঘটনা প্রত্যক্ষ করে কেন কী জানি বার বার মুন্সি প্রেমচান্দের কাহিনির উপর ভিত্তি করে তৈরি ছবিটি বার বারই মনে আসছে। দীক্ষান্ত ভাষণে কোন জ্ঞানতপস্বী নয় মুখর হলেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের  ইতিহাসে এক নতুন নজির সৃষ্টি হল। শিক্ষব্রতীদের দিন বুঝি অবসান। চোখে বাসছে জেনারেল আউট্রামের সেই ঔদ্ধত্য। বিপন্ন নবাব মাথার মুকুট খুলে দিয়েছেন, কিন্তু খৎ দেবেন না বলে দিলেন। তবুও একটা প্রতিবাদ তো বটে। আমাদের কাল্লুরা তো এটা বুঝতেই পারল না, কেমন নিঃশব্দে একটা বিপ্লব হয়ে গেল, কেউ টু শব্দটি করল না।  উজির-এ আজমের সাদা অনৃত ভাষণ শুনে কে কতটা পুলকিত হলেন এ প্রতিযোগিতায় শিক্ষক ছাত্রকূল নেমে গেলে আমরা হাসব, না কাঁদব বুঝতে পারি না। বরাকবাসী ভাষা শহিদের অবমাননায় খুব একটা আহত হয়েছেন তা বোঝা গেল না।

  

ইতিহাস একটা সৃষ্টি হয়েছে বটে। এক শ্রেণীর ছাত্রকূলের ওই দিন যাবার কথা ছিল তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসবে, সেদিন তো কথা ছিল এদের পরিবার পরিজন নিয়ে বড়দিনের উৎসবে মত্ত হওয়ার। বছরের ওই একটি দিন মাত্র জিসুর পায়ে নত হয়ে হিংসায় উন্মত্ত এ পৃথিবীর রোগব্বহোগ, রক্তপাত, মারির হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রার্থনা করার অবকাশটুকুও কেঁড়ে নেওয়া হল। মহামহিম  উপাচার্যের পরামর্শদাতা, সহচর, অনুগামী এরা যে হীরকরাজার পার্ষদদের মতো ‘ঠিক’, ‘ঠিক’ করেই চলেছেন। ওদিকে তাঁর হুজুরেরা সমস্ত প্রটোকল ভেঙে তছনছ করে সমাবর্তন মঞ্চে উদ্বাহু নৃত্য করে গেলেন। অনেকেই মনে করতে পারেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সামাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রাক্তন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী সন্তোষমোহন দেবকেও (এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর কিছু ভূমিকা ছিল বই কি) বসতে হয়েছিল দর্শকাসনে। এ নিয়ে তাঁর অতি উৎসাহী অনুগামীরা উচ্চবাচ্য করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ  ছিলেন অনড়।

 

২.

 

পাঠক এবার একটু ফিরে যান সাতাশ বছর আগের সেই দিনটিতে। কারা যেন বন্ধ ডেকেছিল ঠিক ওই দিনটিতেই। আমি আবার মনে করিয়ে কাউকে বিব্রত করছি না। তবে সেও ছিল এ উপত্যকার একটা উৎসবের দিন। ওই উৎসবকে পণ্ড করার সমস্ত শক্তিই সেদিন প্রয়োগ করা হয়েছিল। একেবারে কেন্দ্র থেকে রাজ্য অবধি। নইলে নির্বাচন ঘোষণার পরেই বিশ্ববিদ্যালয় শিলান্যাসের দিন ঘোষণাই বা কেন। কেনই বা শিলান্যাসের বদলে একটা প্রক্সি শিলান্যাসের অভিনয়! রাগী ছাত্রদের খুশি করতে কেনই বা বিশ্ববিদ্যালয় আইন রূপায়নের প্রক্রিয়া পুরো পাঁচটি বছর আটকে রাখা? এদের জন্য দীর্ঘ কুড়ি বছরের আন্দোলনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া। যারা সেদিন উচ্চগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ রোধ করে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের নথি সংসদ ভবনের বাইরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, যারা হুমকি দিয়েছিলেন রক্তগঙ্গা (না রক্ত ব্রহ্মপুত্র) বইয়ে দেবেন, এদেরই ভাই বিরাদররা এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শোনান, এ উপত্যকাবাসীর কানে উপদেশবাণী, শান্তির পরামর্শ দিয়ে যান। শুনিয়ে যান আসাম বিশ্ববিদ্যালয় নাকি আসামচুক্তির ফল, এর পেছনে রয়েছে আটশো পঞ্চান্ন শহিদের আত্মত্যাগ। এটা শুনতে শুনতে মনে এল উনিশ শো আটচল্লিশ সালে ঢাকা কার্জন হলে অনুষ্ঠিত এক সভার কথা। কার্জন হলে ভাষণ দিতে গিয়ে কয়েদ-এ-আজম জিন্না  যে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। সেই দুর্যোগের দিনেও  শ্রোতার আসন থেকে প্রতিবাদ ধ্বনিত ‘না, না, না, বাংলা, একমাত্র বাংলাই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এখানে অবশ্য এতটা আশা করা অন্যায়। আশ্চর্য লাগে একষট্টির ভাষা আন্দোলন, একাদশ শহিদ, শিক্ষক সংগঠন, শিক্ষা সংরক্ষণ সমিতি, বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, এবং কাছাড়-করিমগঞ্জ ছাত্র সংস্থার দীর্ঘদিনের আন্দোলন সবকিছুই অস্বীকৃত হয়ে গেল, কেউ টু শব্দটি করল না। 

  

৩.

  

পাছে আমাদের উচ্চশিক্ষিত সমাজ ভুলে যান, তাই একটু মনে করিয়ে দিই। আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত এরাও মনে করতে পারবেন কী খাপছাড়া একটা উদ্বোধনী (থুড়ি প্রক্সি উদ্বোধনী) উপহার দিয়েছিলেন ওরা।

  

দরগাকোণায় অস্থায়ী হ্যালিপেডে অবতরণ করলেন দক্ষিণভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসিমরাও।  সুরক্ষা বলয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চের  দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন সন্তোষমোহন দেব। প্রধানমন্ত্রীর অতি সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর দাঁড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর সইকিয়া। তাঁরও কোন ভাষণ নয়,ঙ্কিছু বিক্ষিপ্ত কথনই বলা যায়। অসমিয়াতে নয়, সুস্পষ্ট বাংলাতেই—তিনি বোঝালেন  আজ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হয়ে গেল—হ্যানতেন।

     

প্রফেসর জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবার ব্যাপারটিও কেমন যেন খাপছাড়া। কোনও জ্ঞানগর্ভ কথা, কোন মহৎ আদর্শের কথা—এরকম অনুষ্ঠানে নিয়ম রক্ষার জন্যেও সচরাচর যা হয়ে থাকে এসব কিছই নেই। খাপছাড়া বাক্যগুলোর মধ্যে জনতাকে উদ্ববেলিত করার কোন অনুপান নেই। থাকবার কথাও নয়। আজ যে প্রতিটি শব্দই মেপে জোখে বলতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিতে কী যে বলবেন সম্ভবত ঠিক করে উঠতে পারেন নি। এর উপর শুরু করেছেন বাংলায়। ভাগ্যিস! নিজের মাতৃভাষায় বললে শেষণ সাহেবের নির্দেশটি এত সহজে আমতা মামতা করে এড়িয়ে যেতে পারতেন না, যেমন পেরেছেন বাংলার উপর নির্ভর করে।

    

অতি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই গর্জে উঠল আকাশজানের ইঞ্জিন।  অস্থায়ী হ্যালিপেডে রাশি রাশি ধূলি উড়িয়ে আকাশপথে রওয়ানা দিল প্রধানমন্ত্রীর বিমান, নীচে রইল যেন মহাভারতের হাজার রথচক্রের ধূলিতে আচ্ছাদিত যুদ্ধক্ষেত্র। এ সব কিছু যে একেবারে কাকতালীয় না পরিকল্পনামাফিক সেটা বিশ্লেষণ করা ধৈর্য, অবকাশ আর মানসিকতা সেদিন কারোরই ছিল না। তবে এটা সবার কাছেই স্পষ্ট ছিল ওরা চান নি, এ বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথভাবে এগিয়ে যাক। এর লক্ষণ আজ স্পষ্ট হচ্ছে। একটু মনে করিয়ে দেওোয়া প্রয়োজন সেদিন আসামের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী গোলক রাজবংশী মহোদয় কেন্দ্রীয়  মানব সম্পদ বিকাশ মন্ত্রী অর্জুন সিং সমীপে যে সুপারিশ পাটালেন এতে বরাকের এ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি ‘general type with masters degree and research programme in traditional disciplines’ করার কথাই বললেন। আপদ বিদায় আরকি। তবে হ্যাঁ বায়না করে দ্বিতীয় যে বিশ্ববিদ্যালয়টি আদায় করা হয়েছেসেটি অবশ্য হওয়া চাই একটি, ‘centre of excellence not only for the northeast but for the entire country’। আগামী শতকের প্রত্যাহ্বান মোকাবিলা করার উপযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞাই ধ্বনিত হল মন্ত্রীমহোদয়ের  উচ্চারণে, ‘to prepare the young generation to a vastly changing world of the next century’ (letter dated 9th August, 1993)। কেমন লাগল শুনতে?  মনে আসছে সুকুমার রায়ের ছড়াটি? আমরা ভারি লক্ষ্মীসোনা তোমরা ভারি বিশ্রী, তোমরা খাবে নিমের পাচন আমরা খাব মিছরি।‘

 

৪.

 

বলছিলাম এবারে সমাবর্তন অনুষ্ঠান একেবারেই বেনজির। ওই বিশেষ দিনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ওরা ভুলিয়ে দিতে প্রপয়াস পেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র আছে। এটা যে কেবল মাত্র একটি ধর্মের পড়ুয়াদের জন্য নয়। A small step for today, and a very big (ominous) step for tomorrow। এ উদাহরণ দেখে পার্বত্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ট এরা তো দুর্গাপূজা কিংবা ইদের দিনেই সমাবর্তন ডাকতেই পারেন। এ থেকে শুরু হতে পারে আরেক ঐতিহাসিক অধ্যায়। আর কিছুতে না হোক এদিকে অগ্রণীর ভূমিকায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় তা বলতেই হবে। এমনি করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাদ পড়বে ‘বিশ্ব’। ‘বিদ্যা’র অধিষ্ঠাত্রী দেবীতো কাঁদতে কাঁদতে বিদায় বিদায় নিতে চাইছেন, তবে তো বাকি থাকে  শুধু ‘লয়’!

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions