নাটক

সূর্য ওঠার পালা

হরেন্দ্রনাথ বড়ঠাকুর

(অনুবাদ : সুশান্ত কর)

হরেন্দ্রনাথ বরঠাকুরের জন্ম ১৯৪১। মাস চারেক আগে তিনি জন্মের আশি বছর পার করেছেন।

২০১৭তে অসমীয়া শিশু সাহিত্যে, তথা নাটকে জীবনজোড়া অবদানের জন্যে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। শিশুনাটকগুলো জড়ো করে এর আগে ‘শিশুনাট সমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৪তে।

বইটিতে মাত্র ১০টি নাটক সংকলিত হলেও অপ্রকাশিত নাটকের সংখ্যা আরও অনেক, যেগুলো নানা মঞ্চে অভিনীত হয়েছে।

একাধিক শিশু উপন্যাসও তিনি লিখেছেন। ‘খরিয়ে মেলিলে পাট’ ও ‘কণ পরুআর বিলৈ’ এর মধ্যে অন্যতম।

আকাশবাণীর স্বকৃত গীতিকবি তিনি।  ‘মই কিয় নাস্তিক হলো’ নামে ভগৎ সিঙের বইয়ের অসমিয়া অনুবাদও করেছিলেন।

সারা অসম জনসাংস্কৃতিক পরিষদের দীর্ঘদিন সভাপতি ছিলেন। আকাদেমি পুরস্কার ছাড়াও ‘মাধবীলতা সাহিত্য বঁটা ২০০৯’

‘ধর্মেশ্বর কটকী শিশু সাহিত্য বঁটা ২০১১’ -র মতো বেশ কিছু পুরস্কারেও তিনি সম্মানিত হয়েছেন।

       

বর্তমান নাটকটি তাঁর ‘বেলি অলোআ সাধু’ নাটকের অনুবাদ। মূলকে অক্ষত রেখে করা কোনও অনুবাদই ভালো অনুবাদ নয়।

তবু বড়দের জন্যে লেখা গল্প, উপন্যাস,প্রবন্ধ অব্দি মূলের অনেকটা ধারে কাছে রেখে দেওয়া যায়।

প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে কবিতা, নাটক ইত্যাদি। বিশেষ করে যদি সেই সব ছোটোদের জন্যে হয়।

আর সমস্যা হয় রূপকথা লোককথার অনুবাদে। লোকের মুখে মুখে অনুবাদে রূপকথা, লোককথা, প্রবাদের প্রবচনের অনুবাদ হতে হতে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস বহু প্রাচীন। ফলে এগুলো আবার অনুবাদ করবার কোনও মানেই হয় না।

সেরকম গানে হবহু অনুবাদে তাল ছন্দ মেলানো কঠিন। বিশেষ করে কেশম মোহন্তের লেখা ‘নাম’ আর একেবারে শেষে ‘বরগীত’-এর অনুবাদ অসম্ভব ছিল। তাই আমরা কোথাও হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ও রবীন্দ্রনাথের গান সোজা ব্যবহার করলাম।

তেমনি শেষে বরগীতের বদলে রবীন্দ্র কবিতা। মাঝে জয়ন্ত হাজরিকার বিখ্যাত গান ‘আগলতি কলাপাত লৰে কি চৰে’-র বাংলা অনুবাদ বেখাপ্পা হত বলে আমরা উপেন্দ্র কিশোরের গল্পের দুই পঙক্তি ছড়াটিই ব্যবহার করে কাজ চালালাম।

যেখানে মনে হয়েছে নাট্যকার স্বাধীন গান রচনা করেছেন, আমরাও স্বাধীন ভাবানুবাদ করেছি।

একটিতে অমর পালের বিখ্যাত গানের সুর নির্দেশ ছাড়া বাকিটা পরিচালকের উপরে ছেড়ে দিয়েছি।

Sushanta%20Kr_edited.jpg

নাট্য চরিত্র ৷৷

 

১) ঘোষক বা কেশব মোহন্ত রূপে গল্প দাদু            

২) কাবেরি, অলঙ্কৃতা, আফ্রিদ, বাণু, বার্বি, রাগ, বেদান্ত প্রমুখ ছয় সাতজন কিশোর কিশোরী। এরাই শুরুতে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীর ভূমিকাতে থাকবে।

৩) চিল (নারী)

৪) টিয়া

৫) ময়ূর

৬) কোকিল

৭) মোরগ

৮) কাক

৯) প্যাঁচা

১০) বাদুড়

১১) জনা ছয় জোনাকি

১২)  নেপথ্য কণ্ঠে সূর্য 

ঘোষক õò (গায়ে পাঞ্জাবি শার্ট, পরনে ধুতি। শার্টের উপরে বুক খোলা একটি সোয়েটার। হাতে একটি টুপি ঘোষকের ভূমিকাতে  টুপিটি হাতে নিয়ে থাকবেন।) ছোটো ছোট খোকা-খুকুরা তোমরা অসমিয়া কবি কেশব মোহন্তের নাম শুনেই থাকবে। তিনি যে কবিতাই লিখতেন তাই নয়। খুব ভালো গান বাঁধতেন আর গল্পও। একবার এক স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে ডেকে নিয়ে গেলে তাঁদের গান শোনালেন। কবিতা শোনালেন। আর শোনালেন একটি রূপকথার গল্প –‘সূর্য ওঠার গল্প’। তা সেই গল্প কেমন ছিল, তাই বলব বলে ভেবেছি। গল্পটা তাঁর মুখে শুনতে পারলেই ভালো হত। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে তিনি আর আমাদের মধ্যে বেঁচে নেই। তা গল্পটা কি শুনতে চাইবে?

       

[ নেপথ্য থেকে ছোটোদের কণ্ঠে দলবদ্ধ জবাব আসবে --- হ্যাঁ, চাইব। বল, গল্প বল।]         

 

ঘোষক õò কিন্তু গল্প বলতে গল্পের পরিবেশটাও চাই। তোমরা তবে আমার সামনে গোল করে বস। আমি আর আমি নই। আমি কেশব দাদুই সেজে নেই। মনে কর কেশব দাদুই গল্পটা বলছেন। আর আমরা যেহেতু অভিনয় করব, তো আমাদের অভিনয় কলাকে সেই কালে কী বলত জান তো? পালা গান। তা আমাদের গানের নাম হবে ‘ সূর্য ওঠার পালা’।

[ হাতের টুপিটা পরে নেবেন। পকেট থেকে পুরনো আমলের একটি চশমা চোখে দেবেন। মঞ্চের আলো কমে আসবে। একেবারে পেছনের দিকে একটি চেয়ারে বা টোলে বসে আছেন কেশব মোহন্ত। তাঁর চারপাশে একদল স্কুল পড়ুয়া ছেলে মেয়ে। সাধারণ পোশাকে, মনে রাখতে হবে তাঁরা পরে কেউ নানা রকম পাখি ও জোনাকি সাজবে, সামনে গল্প শোনার জন্যে বসে থাকবে। ]

ঘোষক তথা কেশব দাদু õò ‘সূর্য ওঠার পালা’। তা গল্পটা কি তোমরা কেউ জান?

ছেলেমেয়েরা õò না, জানি না।

দাদু õò তবে শোনো। (কিছুক্ষণ নীরব) এক সময় আমাদের চারদিকে অন্ধকার হয়ে পড়েছিল। কেউ কাউকে দেখে না। স্কুলে যেতে পারে না। ছেলে মেয়ে মাকে খোঁজে পায় না। অন্ধকার হয়েছে কেন? সূর্য ঘুমিয়ে পড়েছিল। সূর্য যদি ঘুমিয়েই থাকে তবে কি আলো হবে?

ছেলেমেয়েরা õò না! না!

দাদু õò সূর্য ঘুমিয়ে থাকলে আলো হবে না। তবে আলো আনতে কী করতে হবে?

১ম ছেলে õò তাকে জাগাতে হবে।

সবাই õò তাকে জাগাতে হবে।

দাদু õò সূর্যে জাগাবেটা কে? (সবাই নীরব) সূর্যের কাছে যাবে কে? মানুষ তো যেতে পারবে না। বহু দূর উড়ে উড়ে যেতে হবে।

২য় মেয়ে õò রকেটে চড়ে যেতে হবে।

দাদু õò  কিন্তু তখন তো রকেট তো বেরোয় নি। যে সময়ের গল্প বলছি তখনও গাড়ি মটরই বেরোয় নি। মানুষ তখন পায়ে হেঁটে চলে।

৩য় ছেলে õò তবে তো পায়ে হেঁটেই যেতে হবে।

দাদু õò কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সূর্য তো থাকে আকাশে। সেখানে কেউ হেঁটে যাবে কী করে?

সবাই õò উড়ে উড়ে যেতে হবে।

দাদু õò আর মানুষ উড়তে পারে না। পারে কারা?

সবাই õò পাখি! পাখি!

দাদু õò তখন সব মানুষে মিলে পাখিদের ডাক দিল। কিন্তু সব পাখিকে ডেকে তো লাভ নেই। আকাশের খুব উপরে কোন পাখি উড়তে পারে? দেখেছ কি কেউ?

৪র্থ মেয়ে õò বক।

দাদু õò তাই কি? বক তো ঝাঁক বেঁধে উড়ে আর অনর্গল কথা বলে বলে যায়। কিন্তু তারা আর তত উপরে উঠতে পারে কই? কিন্তু অনেক অনেক উপরে উঠা পাখি দেখো নি?

৫ম ছেলে õò দেখেছি! দেখেছি! ঘুড়ির মতো ঘুরে ঘুরে গোল করে উড়ে! 

দাদু õò ঠিক। সেই পাখির নাম কী?

১ম ছেলে õò  (চেঁচিয়ে) চিল!

বাকি সবাই õò (চেঁচিয়ে) হ্যাঁ, হ্যাঁ! চিল! চিল!

দাদু õò চিলকে নিয়েও আমাদের একটা গল্প আছে মনে আছে?  গল্পটি লক্ষ্মীনাথ বেজবরুয়া অসমিয়াতে লিখেও রেখেছেন। বাংলাতে লিখে রেখেছেন উপেন্দ্র কিশোর রায়। আমাদের সত্যজিৎ রায়ের ঠাকুরদাদা। লক্ষ্মীনাথ লিখেছেন ‘চিলের মেয়ের গল্প’ আর উপেন্দ্র কিশোর লিখেছেন ‘চিলের মা’। গল্প সেই একটাই। শুনেছ কি?

সবাই õò না।

দাদু õò কিন্তু চিলের মেয়ে যখন মাকে ডাকত সেই মন্ত্রটি শুনে থাকবে--- এক গাছে টান দিতে বেত গাছ নড়ে,/চিল মা, চিলমা, আয় মা উড়ে! এমন করুণ সেই মন্ত্র যে আমাদের জয়ন্ত হাজরিকা এই নিয়ে অসমিয়াতে একখানা গানই বেঁধে ফেলেছিলেন। তোমরা সুযোগ পেলে শোনো। আমরা এখন গল্পে থাকি। মেয়েটি তো মানুষ ছিল। রাজার সাত রানির এক রানি। বিপদে পড়লেই সেই  মন্ত্র পড়ে ডাক দিত।আর দিলেই ওর চিল মা চলে আসত,আর সব বিপদ থেকে রক্ষা করে দিত মেয়েকে। সে আরেক গল্প,অন্যদিনে শোনাব। আজ আমরা কী গল্প বলছি?

২য় মেয়ে õò সূর্য উঠার গল্প।

দাদু õò ঠিক। আমরা এই গল্পে থাকি।

৩য় ছেলে õò আমরা সেই মন্ত্র পড়লে এখনও কি চিল চলে আসবে?

দাদু õò মন দিয়ে ডাকলে আসতেও পারে। তোমরা ডাকতে পার। কিন্তু তোমরা কি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সেই গান জানো? শঙ্খ ছিলেন গান?

সবাই õò না তো। 

       

[ সবাই নিজের মতো করে ‘এক গাছে টান...আয় মা উড়ে’ মন্ত্রটি আওড়াতে শুরু করবে। এরই মধ্যে দাদু বলে যাবেন]

 

দাদু õò বড়দের গান। কিন্তু শুরুটা তোমাদেরও ভালো লাগবে... আমি বরং সেটি একটু গেয়ে শোনাই।

গান

 

সুদূর সমুদ্দুর
প্রশান্তের বুকে, হিরোশিমা দ্বীপে
আমি শঙ্খচিল৷
আমার দুডানা ঢেউয়ের দোলা
আমার দুচোখে
নীল, শুধু নীল৷

সাগরের জলে সিনানের শেষে
প্রবালের সিঁড়ি বেয়ে
মৎস্যগন্ধা মেয়ে
ঝিনুকে নূপুরে
রুনুক ঝুনুক
যেত সে সাগরিকা
ঝিলিক মিলিক নাচিয়ে গলায়
মুক্তার মালিকা৷

পূর্বাচলের প্রাঙ্গণে
সাগরিকার অঙ্গনে
দিক্বধুরা খেলে রে,
সমুদ্র হিল্লোলে তার
দোলে হৃদয় দোলে,
শঙ্খচিলের সঙ্গীতে তার
স্বপন দুয়ার খোলে
দারুচিনি বনের পাতায়
সোহাগ চামর দোলে,
দোলে হৃদয় দোলে৷...

[গানটি যখন চলবে মঞ্চ আঁধার হতে শুরু করবে। প্রথমাংশে দাদু গাইছেন আবছা আবছা দেখা যাবে। সবাই তখন মন্ত্রটি ধীর কণ্ঠে আওড়াতে থাকবে। শেষাংশ ‘পূর্বাচলের প্রাঙ্গণে...’ থেকে গানটি হবে সমবেত কণ্ঠে আর মঞ্চ তখন পুরো অন্ধকার হয়ে যাবে। গাইতে গাইতে সবাই বেরিয়ে যাবে। দেখা যাবে না]

                                                           

প্রথম দৃশ্য

চিল õò  কে আমাকে ডেকেছিলে? কে ডেকে ছিলে, বল? (মঞ্চের দুই দিক থেকে তিনটি ছেলে ও তিনটি মেয়ে চলে আসবে ) কে? কে তোমরা? আমাকে কে ডেকেছিলে? কে আমাকে ডাকার মন্ত্র পড়েছিলে?

অলঙ্কৃতা õò আমরা ডেকেছিলাম। ঘোর অন্ধকারে তোমাকে কোথাও না দেখে ডেকেছিলাম। তুমি এসেছ, তোমাকে ধন্যবাদ।

চিল õò কেন ডেকেছিলে?  এত আদর করে ডাকলে আমি না এসে কি থাকতে পারি?

আফ্রিদ õò চারদিক অন্ধকার। আমার বড় বিপদ হয়েছে চিল মা। বেঁচে থাকাই কঠিন হয়েছে।

চিল õò বুঝেছি। জানি বিষয়টা।সূর্য মানে রবিমামার কথা বলছ তো? মামা আর হামা দেয় না।এতদিন আলো দিতে দিতে রবিমামা বুঝি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। গভীর ঘুমে ঢুলে পড়েছেন।

কাবেরি õò শুনেছিলাম সেকালে কুম্ভকর্ণ ছয়মাস ধরে ঘুমত। এখন দেখি মামা কুম্ভকর্ণকেও হার মানালেন।

রাগ õò ছ-মাস কবেই পেরিয়ে গেছে। কোনও সাড়া শব্দই নেই।

বার্বি õò এদিকে আমাদের জমানো খড় খড়ি সবই ফুরিয়ে গেছে। ধানের ভারাও ফুরিয়ে আসছে। চাষের সময় চলে এসেছে। সেই যে অমাবস্যা নামল শেষ হচ্ছেই না, হচ্ছেই না।

অলঙ্কৃতা õò এতো যে গুমট অন্ধকার,বাবারা কাকারা চারাই তুলবেন,না হাল বাইবেন।চারদিকে বরফ পড়তে শুরু করেছে।হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস।

আফ্রিদ õò আগুন নেই যে পোহাব,খাবার বলে কিছু নেই।রোদ না পেয়ে শিশুরা সবাই কেমন মন মরা হয়ে গেছে।এভাবে কদিন বেঁচে থাকব?

চিল õò কিন্তু আমাকে কেন ডেকেছিলে? আমি কী করব?

কাবেরি õò তুমি যদি এই বিপদ থেকে রক্ষা কর। সূর্য বা কখন জাগে। কে জানে?

চিল õò কেউ জানে না। আমিও জানি না।

বাণু õò  রবিমামা নিজে জেগে উঠবেন বলে পথ চেয়ে থাকতে থাকতে আমরা মরে শেষ হয়ে যাব।

বার্বি õò সেই জন্যেই আমরা তোমাকে ডেকেছি। তাঁকে জাগাতে হবে।

চিল õò সূর্যকে জাগাবে? কী করে?

অলঙ্কৃতা õò আমরা জাগাতে পারব না। তাঁর কাছে যাব কী করে?

কাবেরি õò সেই জন্যে তোমাকে ডেকেছি। তুমি পারবে। তুমিই পারবে। তোমার তো পাখা আছে, আর তুমি অনেক উপর দিয়ে উড়ে যেতে পার।

চিল õò পারব বুঝি? কোনও দিন যাই নি তো।

বেদান্ত õò পারবে, পারবে। তুমি না পারলে আর কেবা পারবে?

চিল õò পারলেও একা পারব না। বাকি পাখিদের সাহায্য লাগবে।

আফ্রিদ õò যেভাবেই হোক, মোট কথা কেউ গিয়ে রবিমামাকে ডেকে তুলতে হবে। দেখো, তুমি এই কাজ করলে পৃথিবীতে মানুষজাতি শেষ হয়ে যাবার থেকে রক্ষা পাবে। তুমি এই উপকার করে দিলে আমরা চিরদিন কৃতজ্ঞের সঙ্গে তা মনে রাখব।

চিল õò বেশ। ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করে দেখি।

সবাই õò ধন্যবাদ চিল মা। অশেষ ধন্যবাদ।

[ মঞ্চ আবার অন্ধকার হবে। কেবল ঘোষক তথা কেশব দাদুর উপরে আলো পড়বে।]

 

 

দ্বিতীয় দৃশ্য

দাদু õò বাজ, মেঘ গর্জন আর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে উড়ে যেতে যেতে প্রচুর পাখির বাসা থাকা একটি বড় গাছের নিচে চিল মা খানিক বিশ্রাম করল। সেখানে যত পাখি ছিল সব্বাই নিজের বাসার ভেতরে,পাতার আড়ালে ঝোপ বেঁধে বসে ছিল। তাদের সবাইকে সম্বোধন করে চিল পাখির ভাষাতে তাদের বলল, (ঘোষক তথা কেশব দাদুর উপর থেকে আলো সরে যাবে। মঞ্চে দেখা যাবে একটি বিশাল গাছের নিচে চিল বসে আছে।)

চিল õò ভাই-বোনেরা,লোকের বড় দুর্গতি হয়েছে।আফ্রিদ,কাবেরি,বাণু,বার্বিদের তোমরা সবাই চেনই।তারা মানুষ।আমাদের থেকে তাদের বুদ্ধি বেশি।সেই জন্যে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটি অনুরোধ রেখেছে। (গাছের উপর থেকে নেমে আসবার মতো করে নেমে আসবে টিয়া) 

টিয়া õò কী ? কী ? কী? বল , কী অনুরোধ? বল, অনুরোধ না আদেশ না উপদেশ না মহাদেশ? (প্যাঁচার প্রবেশ)

প্যাঁচা õò ঈশ! ঈশ ! ঈশ! --- ছি –ই—ই –ই।

চিল õò ঠাট্টা করিস না তোরা। আমার উপরে একটি গুরু দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আমি আজ সেই জন্যে সব দিক ভেবে চিন্তে পাখিসমাজের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি--- আমাদের মধ্য থেকে অন্তত তিনজন পাখিকে সূর্যের কাছে যেতে হবে। তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে জাগাতে হবে। দেরি হলে বিপদ বাড়বে। দ্রুত কাজে নামতে হবে।

টিয়া õò এই প্রস্তাবটি আমি সর্বান্তকরণে সমর্থন করি।এর পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরতে পারি।

কাক õò (গাছ থেকে নেমে আসতে আসতে) ঠিক আছে। ঠিক আছে। বল তো দেখি কী যুক্তিতে তুমি এই আহ্বানকে সমর্থন জানালে?

টিয়া õò আমরা পাখিরা যুগে যুগে শুধু মানুষ কেন,মানুষরূপে স্বয়ং ভগবানকেও সাহায্য করে এসেছি।জটায়ু হয়ে সত্যযুগে রামকে করেছি,গরুড় হয়ে কৃষ্ণকে দ্বাপর যুগে আমরা যে ভগবানকে সাহায্য করেছি,সেই কথা ইতিহাসে লেখা আছে। নোয়া যখন নৌকা তৈরি করে প্রলয় থেকে বাঁচতে তখন তাঁকেও সাহায্য করেছি বাইবেলে লেখা আছে।

সবাই õò ঠিক! ঠিক ! সত্য কথা।

 

টিয়া õò আজ আবার এসেছে অন্ধকার রূপী অসুরকে নাশ করবার দায়িত্ব। এবারে মানুষের ঈশ্বর শিশুরা আমাদের সাহায্য চেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য।

 

ময়ূর õò (ল্যাজ ঝুলিয়ে কাছে আসতে আসতে) বড় ভালো কথা বলেছ। বড় কাজের কথা। আরও একটা কথা মনে রাখতে হবে, এবারের বিপদটি আমাদের সবার বিপদ। অন্ধকারে বাস করে আমরা নিজেরাও কি অনেক কষ্ট পাচ্ছি না?

 

সবাই õò ঠিক। ঠিক। আমরাও বড় কষ্টে আছি।

 

কাক õò বাসায় ডিমগুলো বরফ হয়ে পড়েছে।বুকের ওমে আর এগুলো টিকিয়ে রাখতে পারছি না।এই বছরে মনে হয় আমাদের কারোরই আর সন্তান হবে না। তাই,সূর্যকে জাগাতে আমাদের সবার মরণ পণ করতে হবে।

 

চিল õò তাহলে আমরা এই কাজের জন্যে ভালো বক্তা টিয়াকে পেলাম।আমাদের বিপদের কথা সূর্যকে সে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারবে,যদি ওখানে যেতে পারে।কিন্তু কোথায় কী সমস্যা হয়,তার তো ঠিক নেই।ফলে আরও দুই পাখিকে তৈরি রাখা দরকার।

 

সবাই õò  ঠিক! সত্য কথা! আরও দুজনকেও যেতে হবে।

 

চিল õò আমি অনেক ভেবে চিনতে আমাদের মধ্য থেকে দুই দক্ষ পাখির নাম প্রস্তাব করতে চাইছি---কোকিল আর ময়ূর।                                  

[সবাই পাখা তুলে তালি দেয়। মুখে বলে ‘বেশ ! বেশ! খুব ভালো হবে!’]

 

চিল õò সুরেলা কণ্ঠের কোকিলের কথা বলছি। কেন না,তার গান শোনে দেবতারাও খুশি হন।

 

টিয়া õò এক্কেবারে নিখুঁত বাছাই। কোকিলের মতো সুরেলা কণ্ঠ জগতের আর কোনও জীবেরই নেই।

 

সবাই õò হ্যাঁ, হ্যাঁ! এই কথা দুনিয়া জানে।

 

চিল õò তবু যদি কোকিল সফল না হয়, তখন ময়ূর যাবে।

 

কাক õò  ঠিক! ঠিক! কারণ গানের পরেই আসে নাচ।ময়ূরের মতো সুন্দরী রূপসী পাখিও জগতে আর দ্বিতীয় নেই।সে নাচলে মনে হয় অপ্সরা নাচছে। চোখ না মেলে কেউ থাকতেই পারে না। একবার নজর ফেললেই আমরা থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি।

 

সবাই õò সে আর বলতে? সে গেলে আমাদের কাজ হবেই হবে। (সবাই পাখা তুলে তালি দেয়)

 

চিল õò তবে এই কথাতে কারও আপত্তি নেই তো? (সবাই ‘নেই! নেই’ বলে সমর্থন দেয়। বাদুড় এগিয়ে আসতে থাকে দেখে...) কিন্তু বাদুড় আর প্যাঁচা এখনও কিছু বলে নি কিন্তু।

 

বাদুড় õò এটা কি একটা সিদ্ধান্ত হল? গান গাইলে আরও ভালো ঘুম পায়। গান গেয়ে কেউ কোনোদিন কাউকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেছে দেখেছ কি? (যেমনি এসেছিল, পাখা মেলে আবার চলেও যায়।)

 

প্যাঁচা õò রাখ তোমাদের সিদ্ধান্ত। নেচে গেয়ে সূর্যকে জাগানো। লোক হাসানো। আমি থাকছি না এই সবে। ( পাখা চাপড়ে সেও চলে যায়)

 

চিল õò এরা দেখছি চলেই গেল। (এবারে মোরগ এগিয়ে এল।)

 

মোরগ õò  যাবে না কেন? বাদুড় আর প্যাঁচা অন্ধকারই ভালোবাসে। অন্ধকার থাকলেই এদের আনন্দ। আলো হলে এরা পেট ভরে দরকারের বেশি খেতে পায় না যে।

 

সবাই õò আচ্ছা, আসল কাহিনি তবে অন্য।

 

চিল õò আচ্ছা, লতায় পাতায় কথার গুড়িটা কই মোরগ না বললে তো ধরতেই পারতাম না।

 

সবাই õò যেতে দাও, যেতে দাও। ওদের কোনও দরকার নেই।

 

চিল õò তাহলে আমাদের যাওয়াটাই ঠিক রইল।

 

সবাই õò হ্যাঁ। তাই হোক।

 

চিল õò বেশ, তবে। ভাই বোনেরা এস তবে আমরা তিন সাহসী দেশপ্রেমী পাখি জাতির গৌরব টিয়া, কোকিল,ময়ূরকে অন্তর থেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে সূর্যের সম্মানে গান করি

 

জেগে ওঠো !

হে সূর্য, জেগে ওঠো ২

 

আর কত রাত রবে, কবে বা প্রভাত হবে !

কবে বল দিনমণি জাগবে!

সাত ঘোড়া চেপে ঐ, মেঘ চিরে হৈ হৈ

কবে বল রবিরথ ছুটবে!

 

জেগে ওঠো !

হে সূর্য, জেগে ওঠো ২

 

অমানিশা আর না, চারপাশে কান্না

কালোমেঘে রামধনু ছায় না।

সাগর শুখিয়ে গেছে, ভ্রমর ভুলেছে গান

শুখিয়ে পাথর নদী ঝরনা

 

জেগে ওঠো !

হে সূর্য, জেগে ওঠো ২

 

                                              

তৃতীয় দৃশ্য

                                     

[মঞ্চে ম্লান আলো। একা টিয়া]

টিয়া õò ছ্যা! এত্ত অন্ধকার! চোরে চড় মারলেও দেখব না। (পায়চারি করে) ধ্যাত! বড় বিপদ হল। যাই কী করে এখন? (খানিক থেকে কী বা ভেবে) না যাওয়াটাই ঠিক হবে কি না। (আবার ভেবে) না গেলে মান সম্মান বলে কি কিছু থাকবে? কী করা এখন? উহ! কী যে একটা ঝামেলাতে জড়িয়ে গেলাম।এক্কেবারেই ভালো লাগছে না।গেলে মরব কি বাঁচব তারও ঠিক নেই।না গেলেও পাখির সমাজে মুখ দেখাব কী করে? নাক কাটা যাবে না? কাটা নাকে বাঁচব কী করে? আচ্ছা, মরণ হল তো। (মোরগ এসে এক পাশ থেকে টিয়ার গতিবিধি দেখতে থাকবে।) ঈশ!এখন আমাকে বাঁচাবে কে? এমনিতেই এই ঘোর অন্ধকারে নিজের বাসাতেই পা ফেলতে ভয়। এখন এই পথঘাট চিনি না, মহাকাশে যাও। কই মর মর গে!

 

মোরগ õò (সামনে এসে) এই যে সুবক্তা মশাই। আপনারা একটা কথা কিন্তু ভালো করে ভেবে দেখলেন না। শুধুই পাখিদের মধ্যেই আলোচনাটা করলেন। এই যে টু শব্দটি না করে উড়ে জোনাকি পোকা, তাদের একবার অনুরোধ করলে কিন্তু আলোতে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারত।

 

টিয়া õò যাহ! যাহ! সাগরে সিনান করে শিশিরে ডরাই আর কি! সামান্য জোনাকি পোকাকে তোষামোদ করতে আমার বয়েই গেছে। (চিল চলে এল)

 

চিল õò না হে টিয়া! মোরগ ঠিকই বলেছে। আমাদের সভাটা কেবল পাখি সমাজকে নিয়েই হল। এখন যা হবার হয়েছে। দেরি করে হলেও জোনাকি মামা-মাসিমাদের একটু অনুরোধ করেই দেখি বলে আমিও ভাবছি।

 

টিয়া õò এহ! এই অতি ক্ষুদ্র জোনাকিরা আবার মামা-মাসি হয়ে গেল। আমি যাচ্ছি না ওদের পায়ে ধরতে।

 

চিল õò রাগ কেন কর টিয়া ভাই! জোনাকিরা আলো দিল বলেই আমরা ছোট হয়ে যাই না, না। ওদের এই গায়ের আলোর বাইরে আছেই বা কী? তুমি যে মহান ত্যাগ করতে বেরোলে তার তুলনাতে তাদের সেই আলো অতি সামান্যই।

 

টিয়া õò হবে! হবে! তাদের পাঠিয়ে দাও গে যাও!ওদের পাঠিয়ে দাও।আমি কিন্তু ওদের পাত্তা দিতে যাচ্ছি না।তোমরাই দিচ্ছ। আমি ওরা না হলেও যেতে পারব।

 

চিল õò তুমি তো যাবেই।আমরা তোমাকে সামান্য সাহায্য করতে চাইছি আর কি। আমরা ওদের পাঠিয়ে দিচ্ছি।তুমি একটু সময় ওদের আসার জন্যে অপেক্ষা কর।

 

টিয়া õò যাও! যাও! দেরি করবে না কিন্তু। দেরি হতে দেখলে আমি একাই চলে যাব,বলে দিলাম। (চিল আর মোরগ চলে যায়) এবারেই মারা পড়লাম। এরা আমাকে ঠেলেঠুলে হলেও পাঠিয়েই ছাড়বে দেখছি। হায়, আমার কপাল! এখন কই বা গিয়ে মরি!

 

[নেপথ্যে এক দল ছোটছোট মেয়েদের পাখির কাকলির মতো সংলাপ। ‘ ভাল্লাগছে বুঝলে। আকাশের এত উপরে আগে কখনও যাই নি। সূর্য না হয় সবচাইতে বড় জোনাকিই। আমি যেন ছোটছোট সূর্য।’ সবাই খিলখিলিয়ে হাসে ]

 

টিয়া õò ওহ! জোনাকির দল এসেই গেছে। হাসছিস! ফুর্তি করছিস? টের পাবি। দাঁড়া। সব্বাই মিলে পুড়ে মরবি। ফিরে আসতে পারব বলে ভেবেছিস! (জোনাকিদল চলে আসে)

 

১ম জোনাকি õò  সুবক্তা মশাই, চলুন।

 

টিয়া õò চুপ! ঈশ! যেন ছেলেখেলা করতে এসেছে আর কি। চল, কিন্তু হল্লা চিৎকার করতে পারবি না। একদম চুপচাপ।

 

[ যাত্রা আরম্ভ হল। আগে পরে জোনাকি, মাঝে টিকা পাখি। পাখা মেলে মেলে মঞ্চে ঘুরতে থাকবে]

 

টিয়া õò এক মহান ভার আজ আমার উপরে। সূর্যকে জাগাতে হবে। জাগাতে হবে শিশুদের রবিমামাকে। তোরা সামান্য পোকা। পাখা না হয় আছেই তোদের---তবু পোকা তো পোকাই।আমিই এক নম্বর।আর তোরা? তোরা তো আলো দিচ্ছিস না। তোরাই আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছিস।আমি কিন্তু তোদের সঙ্গে যাচ্ছি না। কোথায় ঢোল আর কোথায় টিনের কৌটা। (হঠাৎ টিয়া ক্লান্ত হয়ে পড়ল)ঈশ!আর কত উড়ব?নিজের শরীর খুইয়ে আর পরের উপকার করতে পারি না।নিজেকে কষ্ট দেবার মানে সমস্ত জীবকেই কষ্ট দেওয়া।না না! ফিরেই যাই।এরা দেখছি জোনাকি না হয়ে আপদই হল।ওদের বা কী?কষ্ট করাই স্বভাব।আমি তো সেই বলে গাধার মতো খাটতে পারি না।এহ! আর পারি না।আধা পথেই জিহ্বা বেরিতে যাবে। (সুড়ুত করে টিয়া দল থেকে বেরিয়ে যাবে। জোনাকিরা ঘুরতেই থাকে। হঠাৎ একটা জোনাকির নজরে পড়ে টিয়া আর সঙ্গে নেই।)

 

২য় জোনাকি õò ঐ ঐ ! বাকসর্বস্ব সুবক্তা সঙ্গে নেই যে!

 

বাকি জোনাকি õò তাই তো। মশাই গেলেন কোথায়? পালাল, পালাল। ফিরে চলে গেছে। চল চল আমরাও ফিরে যাই।

 

[সবাই উলটো পথে ঘুরতে শুরু করে। মঞ্চ আঁধার হয়]

                                                              

 

চতুর্থ দৃশ্য

 

কেশব দাদু õò বাকসর্বস্ব টিয়ার কথাই সার।কাজে মস্ত ফাঁকিবাজ।সে কোথায় গেল,কই লুকল খুঁজে পাওয়া গেল না।জোনাকিরা ফিরে এসে সব কথা সবিস্তারে চিলকে জানাল।চিল এবারে কোকিলকে বলল।মোরগ কোকিল আর জোনাকিকে উৎসাহ যোগাল।কোকিল আর জোনাকিরা বহুদূর ওড়ে ওড়ে সূর্যের প্রাসাদে গিয়ে পৌঁছুল।

 

[মঞ্চ আঁধার হবে। আলো হলে দেখা যাবে নেপথ্যের দিকে তাকিয়ে কোকিল আর জোনাকির দল]

 

কোকিল õò (নেপথ্যে সূর্যের নাকের ডাক শোনা যাবে। সূর্যের দীর্ঘ শ্বাসে কোকিল আর জোনাকিদের গায়ের পোশাক হাওয়াতে উড়বে। যেন অনবরত ঝড়ো বাতাস বইছে।) ঐ যে সূর্য! আমাদের রবিমামা! দেখ। দেখ। আমরা এখনই তাঁর কাছে যাব না। তিনি গভীর ঘুমে আছেন। দেখছিস না, নাকের নিশ্বাস নয় যে তুফান বইছে। কাছে গেলে দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন হবে। এখান থেকেই স্তুতি মিনতি করি, চল। আমি কীর্তন গাই, তোরা দোহার দিবি। দেখি, কী জানি বা জেগেই উঠেন।

                                                           

গান

 

[অমর পালের ‘জাগহে এই নগর বাসী’ কীর্তনের সুরে  কেশব মোহন্তের ‘নাম’ ‘উঠা উঠা দিনমণি হ’ল বহু বেলি’- র ভাষান্তর।]

                                   

জাগো হে, ঐ আকাশবাসী ২

মাটি কান্দে, সাগর কান্দে পোহাও গো নিশি

জাগো হে, ঐ আকাশবাসী ২

তোমার আলো, তোমার হাসি, আশারও কিরণ

কবে ফিরে পাইব ভানু, করহ প্রকাশ

জাগো হে ঐ আকাশবাসী ২...

মাটির বুকে তোমার তাপে ফেরাও গো জীবন

তিমির নাশ দিনমণি, ঝিলমিল করুক প্রাণ

জাগো হে এই আকাশবাসী ২

[ গানের শেষটা দ্রুত তালের হলে ভালো। না হলে অতিবিলম্বিত। যাতে সবাই ক্লান্ত আর হতাশ হয়ে পড়বার যুক্তিটা দাঁড়ায় ]

 

কোকিল õò না। কোনও সাড়া শব্দই দেখছি নেই। উলটে আগের থেকে ঘুম গভীরই হল।হবে না, বুঝলি।কীর্তন গাইলে দেহ মন আরও শান্ত হয়ে আসে। নিদ্রা গভীর হয়।

 

১ম জোনাকি õò তবে এখন উপায় কী করবে?

 

কোকিল õò কাছে যাব কি? কাছের থেকে গাইলে যদি সাড়া দেন।

২য় জোনাকি õò আমরা এখানেই তাঁর শ্বাসের ঠেলাতে দাঁড়াতে পারছি না। কাছে গেলে তো নিশ্চিত মরণ।

 

কোকিল õò তোদের যেতে হবে না। তোরা এখানেই থাক। পারি আর না পারি আমি চেষ্টা একটা চালাই।(কোকিল সূর্যের দিকে এগিয়ে মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। জোনাকিরা উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। সূর্যের নাকের ডাক আরও প্রবল হয়।)

 

৩য় জোনাকি õò আর বেশি কাছে যেও না। তুমি তো সোজা দাঁড়াতেই পারছ না গো।

 

৪র্থ জোনাকি õò ঈশ রাম! দেখ, দেখ দেকিনি! দাঁড়াতে না পেরে বসেই গেল।

 

৫ম জোনাকি õò  দেখছিস কি, কীভাবে পা টেনে টেনে যাচ্ছে। (চেঁচিয়ে) হবে। আর যেতে হবে না।

 

[হঠাৎ বজ্রপাতের মতো ভয়ঙ্কর শব্দ হবে। এক ঝলক প্রবল তুফানের ধাক্কাতে মঞ্চের জোনাকিরা গড়িয়ে পড়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে ‘মরে গেলাম গো! মা গো!’ বলে নেপথ্যে চেঁচাবে কোকিল। যেন কেউ তাকে প্রবল ধাক্কা দিয়ে গড়িয়ে দিয়েছে। সে একদিক থেকে ঢোকে আর দিকে বেরিয়ে যায়। জোনাকিরা বড় কষ্টে উঠে দাঁড়ায়]

 

৬ষ্ঠ জোনাকি õò কী হল? কিছু ধরতে পারলি?

 

১ম জোনাকি õò  আমরা যে দিকে এসেছি সেদিক দিয়ে কোকিল দেখি তিরের মতো ছিটকে বেরিয়ে গেল। কী হল,কিছুই তো বোঝা গেল না।

 

২য় জোনাকি õò কথা বাড়িয়ে লাভ নেই এখন। আমরাও পিছু নিই চল।

 

সবাই õò চল, চল। এখানে থাকলে বিপদ আছে।

 

[মঞ্চ আঁধার হয়]

 

 

পঞ্চম দৃশ্য

 

কেশব দাদু õò কোকিলের যাত্রা সফল হল না।ওদিকে কাবেরি বার্বিদের চোখে ঘুম নেই।সূর্যকে জাগাতে চিল মা কী বা করল, এরা টেরই পায় নি।এস দেখি,আমরা ওদের খবর নিই।

 

[মঞ্চ আবার আঁধার হবে। আলো পড়লে দেখা যাবে গায়ে চাদর মোড়ে আফ্রিদ, কাবেরি, অলঙ্কৃতারা দম বেঁধে বসে আছে।]

 

আফ্রিদ õò উফ! যত দিন যাচ্ছে শীতের প্রকোপ বাড়ছেই বাড়ছে। পুরো দুনিয়া বরফে ঢাকা পড়ে গেছে। সব জমে গেছে।

 

অলঙ্কৃতা õò  সব্বাই আমরা মরব শেষে।

 

কাবেরি õò  চিল মায়ের দেখি আর দেখাই নেই।

 

বেদান্ত õò  সে মনে হয় সূর্যের কাছে গিয়ে পৌঁছে গেছে। কম দূর বুঝি? গিয়ে পৌঁছুতে কদিন বা লাগে।

 

আফ্রিদ õò  সেখানেও নিশ্চয় গুমট অন্ধকার।

 

বার্বি õò শুধু কি তাই? আবার এত দূরে ফিরে আসা। এক মাসের মতো তো লাগবেই।

 

বাণু õò বেশি না হলেও কম হবে না।

 

অলঙ্কৃতা õò  চিলের ফিরে আসা অব্দি কত আর পথ চেয়ে থাকবি? আমাদেরও কিছু একটা করা দরকার।

 

কাবেরি õò  কী করবি বা?

 

আফ্রিদ õò  কিছু না পারলেও রোদের স্তুতি করে কিছু একটা করতে তো পারি।

 

অলঙ্কৃতা õò  তাই তো। আগে দেখতি না, মা মাসিমারা টানা বৃষ্টি দিলে সূর্যকে গানে গানে ডেকে আনতেন। এখনও যদি রোজ ডাকতে থাকি, তবে কি জানি জেগেই ওঠে।

 

বাণু õò  ধ্যাত! বৃষ্টি হলেও আগে সূর্য জেগে ছিল। এখন তো ঘোর ঘুমে। কই আর আমাদের গান শুনবে।

 

বার্বি õò  গাইতে আপত্তি কীসের? এমনি বসে থাকার চাইতে চল গানই করি।

 

সবাই õò  গা! গা!

 

কাবেরি õò  ধরবি কিন্তু ...

                                                           

গান

                                   

সুর্যাই আইস, আইসরে সুর্যাই আইস আমার বাড়ি

আইস আইস আইস সুর্যাই আইস আমার বাড়ি

 

আমার বাড়ি আইসরে সুর্যাই ঝিকিমিকি দিয়া

ঘরে আমার আইন্ধার ছাইছে যাইব ডরাই গিয়া

সুর্যাই আইস, আইসরে সুর্যাই আইস আমার বাড়ি...

 

আস যদি আমার দেশে সাত ঘোড়া হাঁকাইয়া

মেঘে মেঘে পন্থ কইরা সোনার ধুল উড়াইয়া

 

সুর্যাই আইস, আইসরে সুর্যাই আইস আমার বাড়ি...

                                   

শইতে দিমু চান্দের পালঙ্ক, বইতে দিমু পিড়া

খাইতে দিমু দৈ মাখাইয়া শালি ধানের চিঁড়া

সুর্যাই আইস, আইসরে সুর্যাই আইস আমার বাড়ি...

 

                                                         

ষষ্ঠ দৃশ্য

[ ঈষৎ আলোতে মঞ্চে চিল আর মোরগ]

 

চিল õò কোকিল গিয়ে পৌঁছল কি না? কী বা করছে ওখানে গিয়ে।

 

মোরগ õò চিন্তা কর না মাসে বড় সাহসী।চতুরও।দেখনি কি,কী কৌশলে কাকের বাসাতে ডিম পেড়ে বাচ্চা বিয়োয়। সে বিপদে পড়বে না।

 

চিল õò কী জানি। আমার কিন্তু মনটা ভালো লাগছে না রে। কী যেন একটা অঘটন ঘটবে, এবারেও সফল হবে না---এমটা মনে হচ্ছে।

 

মোরগ õò অমন কথা বলবে না তো। ওসব  অলক্ষুণে কথা ভাবছ কেন? (বলতে না বলতেই ঘুরতে ঘুরতে এসে কোকিল মঞ্চে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চিল চমকে যায়।)

 

চিল õò কী? কী পড়ল? (কাছে গিয়ে) আরে! এতো আমাদের কোকিলা। হায়! এই যাত্রাও বৃথা গেল। (নাড়ি টিপে দেখে।) না, প্রাণ বায়ু চলে গেছে। হায়, হায়!

 

[মোরগ খুঁটে খুঁটে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। প্যাঁচা প্রবেশ করল। ]

 

প্যাঁচা õò নি—ই-ই উ! মরেছে। মরল! (চলে যায়)

 

চিল õò কী করি আমি এখন? শেষ সম্বল ময়ূরটিই আছে। চল তো,ওর সন্ধানেই যাই।

 

[চিল আর মোরগ চলে যায়। ধুনুক ধানাক করে টিয়া আর বাদুড় আসে। কোকিলের মৃত দেহ দেখে]

 

বাদুড় õò গেছে। একেবারে নাকে মুখে রক্ত। কী যে কারবার। শেষে দুঃসাহসের এই গতি হল গিয়ে।

 

টিয়া õò সেই জন্যেই আমিও না যাওয়াটাই স্থির করেছিলাম।এদের দশা এই হল।বেচারি কোকিলার জীবনটাই গেল।অন্ধকার ঘুচল কি? অগত্যা,গিয়ে কী লাভ? মিছেমিছি কষ্ট।শক্তির অপচয় করতে নেই। আমাদের অন্ধকারকে মেনে নেওয়াই ভালো।

 

[ এরা চলে যায়। কোকিলের মৃতদেহের উপরে আলো পড়ে ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যাবে। নেপথ্যে করুণ সুর। মঞ্চ ক্রমে অন্ধকার হয়ে আসবে। আবার যখন আলো ফিরবে, চিল মোরগ আর ময়ূরকে দেখা যাবে।]

 

চিল õò আমাদের দুজনের যাত্রা ব্যর্থ হল। কোকিলের মত সবার আদরের শিল্পীকে আমাদের হারাতে হল।এখন শেষ আশা তুমিই আছ  বাবা ময়ূর! নিজের চোখে সব দেখতে পেলাম। শেষ চেষ্টা একটা করে দেখি।তুমি নূপুর পরে নাও। তোমার নাচে গিয়ে সূর্যের ঘুম ভাঙাও গিয়ে। জোনাকি মায়েরা এস।

 

[জোনাকিরা আসে। নূপুর পরে ময়ূর তৈরি হয়।]

ময়ূর õò (পেখম তুলে এক পাক নেচে) জুনঝুন ঝুনুন। সবাই শুনুন। টিট টিট টাই, সূর্য জাগাতে যাই।

 

[মঞ্চ আঁধার হবে। আবার আলো হলে ঘোষক তথা কেশব দাদুকে দেখা যাবে]

 

দাদু õò  কোকিলের মতোই বহু দিন পরে ময়ূর সূর্যের কাছে গিয়ে পৌঁছল। আর সোজা গিয়ে সূর্যের পিঠে চড়ে নাচতে শুরু করল। একেবারে ভৈরব নৃত্য।সূর্যের গা চুলকে দিল যেন।শুয়ে শুয়ে শরীর নিথর হয়ে পড়েছিল।ময়ূরের নখের আঁচড়ে মনে হল যেন কেউ চুলকে দিয়েছে।তার আরও আরাম হল।ঘুম গভীর হল। ভাঙবার নামই করল না। হিতে বিপরীত হল।জাগবে কি,আরও বেশি করে ঘুমিয়ে পড়লেন রবিমামা। নেচে নেচে ক্লান্ত হয়ে ময়ূরও ফিরে এল। চিল মা এখন কী করে?

 

[মঞ্চে আবার আঁধার নামবে। আলো হলে সেই আলো চিলের গায়ে পড়বে]

 

চিল õò এখন কী করি? কার কাছে যাই? তিন যাত্রাই ব্যর্থ হল।সূর্যের ঘুম ভাঙবে কই? আরও গাঢ় হল। এদিকে পৃথিবী ঠাণ্ডাতে কাঁপছে।রোজ দলে দলে বুড়ো বুড়ি আর কচিকাঁচারা মরতে শুরু করেছে।শুকনো পাতার খসখসানি আর প্রাণীর কাকতি মিনতির বাইরে শব্দ একটা নেই।কী করি আমি?আমার যশ মান,অতীত গৌরব সব বরফ হয়ে গেল। (হঠাৎ নেপথ্যে কীসের খচমচ শব্দ।) কে ওখানে? (কিছুক্ষণ লক্ষ করে) কথা বলছ না কেন? কে?

 

মোরগ õò (ভেতরে আসতে আসতে) আমি গো মা। কথা একটা বলব বলে এলাম।

 

চিল õò কী কথা, বল দেখি।

 

মোরগ õò অনুমতি চাইছিলাম।

 

চিল õò কীসের অনুমতি? অনুমতি কীসের? কোনও অনুমতি-ফতি নেই। অনেক দিয়েছি। সব মিথ্যে। সব ফাঁকি।

 

মোরগ õò মা, আমি একবার যেতে চাইছিলাম।

 

চিল õò কই? কই যাবি তুই?

 

মোরগ õò সূর্যের ওখানে।

 

চিল õò কী! তুই! রাখ! রাখ ! ওসব। ইন্দ্রের সভাতে গিয়ে প্যাঁচার কাকলি শোনাতে হবে না।

 

মোরগ  õò না, মা! যাবার ইচ্ছেটা হচ্ছিল।

 

চিল õò যা বলছি! আমার এখান থেকে সরে পড়।

 

মোরগ õò সে না হয় পড়ব। কিন্তু এসেছিই যখন আপনার কাছে -- সরলে একেবারে সূর্যের ওখানেই যাব।

 

চিল õò  যা, যেখানে যাবার ইচ্ছে গিয়ে মরবার মর গে। (চলে যায়)

 

মোরগ õò জোনাকি বোনেরা, তোমরা কই আছ? (ঝাঁক বেঁধে জোনাকিরা চলে আসে)

 

সব জোনাকি õò কী হল দাদা?

 

মোরগ õò তোমাদের বেশ কষ্ট হয়েছে। তিনবার করে মহাকাশে গিয়ে নিশ্চয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছ। কষ্ট করে ফল পেলে ক্লান্তিতে কাবু করতে পারে না। সেই জন্যে তোমাদের একটা অনুরোধ করতে চেয়েও সাহস করতে পারছি না।

 

১ম জোনাকি õò  কিছু হবে না দাদা। কী কথা বলবে,বল। আমরা খারাপ পাব না।

 

মোরগ õò  সূর্যকে যে করেই হোক জাগাতে হবে।প্রাণীকুল,বৃক্ষলতাকে বাঁচাতে হলে সূর্যকে জাগানো ছাড়া পথ নেই আর। তোমরা যদি সাহায্য কর এবারে সূর্যকে জাগাতে আমি যাব বলে ঠিক করেছি।

 

সমস্ত জোনাকি õò ভালো কথা। খুব ভালো কথা। তোমার সঙ্গে যাবার জন্যে আমরা সবাই তৈরি আছি।

 

১ম জোনাকি õò  তিনবার করে গিয়ে এসে সামান্য জ্ঞানও হয়েছে। তুমি সূর্যকে জাগাতে পারবে যদি আমাদের জ্ঞানগুলোকে কাজে লাগাও।

 

মোরগ õò কী-- বল তো দেখি।

 

২য় জোনাকি õò সূর্যের একেবারে সামনে না যাওয়াই ভালো। তাঁর নিশ্বাসের সামনে তুমি দাঁড়াতেই পারবে না।

 

৩য় জোনাকি õò সূর্যের নাকের সামনে তো একেবারেই যাবে না।

 

৪র্থ জোনাকি õò সূর্যের শরীরে চড়া যাবে না। আমাদের মতো ক্ষুদ্র জীবেরা তাঁর শরীরে চড়তে তিনি আরও আমার পান।

 

৫ম জোনাকি õò তাঁর পিঠের দিকে গিয়ে কানের কাছে গিয়ে কিছু বলতে হয়তো তিনি শুনবেন।

 

মোরগ õò আর?

 

১ম জোনাকি õò তাঁর চোখ আধা মেলা আধা বন্ধ থাকতেই চলে আসবে। পুরো চোখ খুললেই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

 

মোরগ õò  ঠিক আছে। তোমাদের উপদেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। এখন চল তবে।

[যাত্রা আরম্ভ হয়। মোরগকে মাঝে রেখে গান গেয়ে গেয়ে জোনাকি দল ওড়ার ভঙ্গিতে মঞ্চে পথ পরিক্রমা করে।]

 

গান

(লোকগানের সুর)

                                               

তুমি কই লুকাইলা গিয়া বন্ধু, বল দিবাকর

                                               

কপাল পুড়িল, হইল আন্ধার বাড়িঘর,

 

রে বন্ধু, আন্ধার বাড়িঘর

                                               

তুমি কই লুকাইলা গিয়া বন্ধু, বল দিবাকর ২

                                                 

                                             

কাশ বরণ কন্যা মেঘের দুর্মতি কি হইল

                                               

সে কি তোমার সোনার হাসি, বাইন্ধা লুকাই থইল

                                                                                   

বন্ধু, বাইন্ধা লুকাই থইল

                                               

                                     

তুমি কই লুকাইলা গিয়া বন্ধু, বল দিবাকর ২

                                               

                                               

না ডাকে আর কোকিল কাকে, না ফুটে আর ফুল

                                               

মৌমাছি আর গায় না সুরে, ময়ূর নাচে ভুল

রে বন্ধু,   ময়ূর নাচে ভুল

তুমি কই লুকাইলা গিয়া বন্ধু, বল দিবাকর ২

      

অষ্টম দৃশ্য

                                     

[সূর্যের প্রাসাদে মোরগ আর জোনাকিরা]

 

মোরগ õò (মঞ্চের এক পাশে এসে নেপথ্যের দিকে তাকিয়ে) তোমরা এখানে থাক। আমি আস্তে আস্তে এগোই। সাবধানে যাব। তোমাদের কথা মনে আছে। আমার জন্যে ভেবো না।

 

[মোরগ বেরিয়ে যাবে । জোনাকিরা উঁকি ঝুঁকি দিয়ে এদিকে ওদিকে তাকাতে থাকে ]

 

১ম জোনাকি õò (ফিসফিসিয়ে বলবে) দেখ, দেখ! একেবারে গা চেপে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

২য় জোনাকি õò তাই তো। কী করতে চাইছে?

 

৩য় জোনাকি õò ঠিকই তো করছে। পিঠের দিকে যাচ্ছে।

 

৪র্থ জোনাকি õò দেখ, দেখ! পিঠে উঠেই গেছে দেখছি।

 

৫ম জোনাকি õò ওর সাহস দেখ। একেবারে কানের ফুটোতে মুখ দিচ্ছে গিয়ে। কী প্রকাণ্ড কান। কুলার থেকেও বড়।

 

১ম জোনাকি õò জেগেছে! জেগেছে! একেবারে চটে গেছে।

 

২য় জোনাকি õò পেরেছে, পেরেছে! মোরগ দাদা পিঠ থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছে।

 

৩য় জোনাকি õò ভাগ্য ভালো। নাকের আগে পড়ে নি। একেবারে কোকিলের মতো জোর ধাক্কাতে পৃথিবীতে গিয়ে পড়ত।

 

৪র্থ জোনাকি õò  চোখ মেলেছে। চোখ মেলেছে। সূর্য চোখ মেলেছে। মোরগ দাদা আসছে। জোরে পা চালিয়ে আসছে।

 

[দৌড়ে এসে মোরগ আবার প্রবেশ করবে। হাঁপাতে থাকবে]

 

মোরগ õò  বাপরে! কী বিশাল বপুরে বাবা! শরীরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা ছিল। মরি বা বাঁচি কানের ভেতরে গিয়ে ঢুকে গেলাম। ধমক দেবার মতো চেঁচিয়ে দিলাম ‘এই, সূর্য…’ কান মাথা ঝাঁকিয়ে সূর্য একেবারে গর্জে উঠল যেন।

 

১ম জোনাকি õò তার পর?

 

মোরগ õò তার পরে চোখ জোড়া কুঁচকে টুচকে পরে মেলে দিল। আমি এই সুযোগে আমাদের দুঃখ দুর্দশার কথা বললাম।

 

২য় জোনাকি õò তার পর?

 

মোরগ õò দাঁড়া! ঐ সূর্য আসছে মনে হয়। (মঞ্চের আলো বাড়তে শুরু করবে) গরম লাগছে না ?

 

১ম জোনাকি õò আসছে, আসছে। বড় আস্তে আস্তে আসছে। আসছে বলে মনেই হচ্ছে না। চল, চল আমরা সরে যাই।

             

[ জোনাকিরা বেরিয়ে যায় উলটো পথে। কিন্তু মোরগ সেই নেপথ্যের দিকে ভালো করে তাকিয়ে নেয়্]

 

সূর্য õò যা! এখন পৃথিবীতে ফিরে যা। নইলে আর একটু পরে যখন পুরো জেগে যাব, চোখ মেলে দেব তুই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবি।

 

মোরগ õò প্রভু, এই যে চোখ মেললেন সন্ধ্যা হবার আগে আর বুজবেন না যেন।আপনি যদি দিনে রাতে শুয়ে থাকেন তবে আকাশের অন্ধকার,মেঘের বজ্রনাদ,পৃথিবীর নিশাচরেরা সুযোগ নেয়।আদর স্নেহ শ্রদ্ধা প্রীতি জীবনের সব ভালোও আপনার সঙ্গে হারিয়ে যায়। তার উপরে দিনে ঘুমনো নিজের স্বাস্থ্যের জন্যেও তো ভালো নয়।

 

সূর্য õò হবে, যা। (মোরগ যেতে পা বাড়ায়) এই শোন শোন। তুই নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পরের উপকার করলি। এতটা সাহস করলি।পাখি হয়েও তুই শ্রেষ্ঠ প্রাণী।ডতুই আমাকে জাগালি।পৃথিবীর দুঃখ ঘোচালি।আজ থেকে তুই ডাকলেই আমি ঘুম ছেড়ে উঠে যাব। এখন চলে যা। (মোরগ চলে গেল)

                                                 

[মঞ্চে আবার আঁধার। আলো হলে চিল আর জোনাকিদের দেখা যাবে]

                                               

              

নবম দৃশ্য

চিল õò যাক বাবা! তোরা একটা বিশাল কাজ করলি। তোরা এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি যে? মোরগ তো এখনও এসে পৌঁছল না।

 

১ম জোনাকি õò কী করবে? সূর্য যত এগোচ্ছিল চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। তাপ বেড়ে গেল। আর এক মুহূর্ত ওখানে থাকলে নিমেষে পুড়ে ছাই হয়ে যেতাম। পালাতে বাধ্য হলাম। আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছুবার আগে আমরা এসে না পৌঁছুলে আধা পথেই মারা যেতাম।

 

২য় জোনাকি õò এখন তো মোরগকে আলো ফেলে পথ দেখাবার দরকার নেই। ওর পেছনে পেছনে আলো আসছেই।

 

চিল õò দাঁড়া তো। রাত পোহাচ্ছে মনে হচ্ছে না? ভোর ভোর লাগছে না? লাগছেই তো। রাত পোহাচ্ছে তো।

           

[ধীরে ধীরে ভোর হয়। পাখির কাকলি, ভ্রমরের গুঞ্জনে পরিবেশ মুখর করে তোলে। টিয়া দৌড়ে এসে প্রবেশ করে]

টিয়া õò আমি কি বলিনি? সূর্যের কাছে গিয়ে বাহাদুরি দেখাবার দরকারই নেই। সব নিজে নিজে ঠিক হয়ে যাবে। আমরা এদ্দিন সহ্য করে ছিলাম বলে এখন সুফল পেলাম। কথায় আছে সবুরে মেওয়া ফলে।শুধু শুধু অশান্তি।আজ যদি কোকিলা বেঁচে থাকত কত খুশি হত। সত্য সত্যই। তুমি আমি চেষ্টা করি আর না করি সত্য নিজের পথে একদিন এসে দেখা দেবেই।

 

চিল õò দাঁড়া টিয়া। রাখ তোর ভাষণ। যা হয়েছে এমনি এমনি হয় নি। সূর্যকে জাগাল কে জানিস? মোরগ। ( মোরগ এসে সবার মাঝে ধপাস করে পড়ে। সবাই ওকে ঘিরে ধরে।)  ঈশ! ঈশ! নাকে মুখে রক্ত বেরোচ্ছে। দাঁড়া তো,ময়ূরকে ডেকে দে তো। ও এসে পাখা করুক।আমি জল নিয়ে আসি। (ময়ূর এসে পেখম তুলে বাতাস করতে থাকে। গাছের পাতাতে করে জল এনে চিল মোরগের মাথাতে ঢেলে দেয়।) তুমি এখন কথা বল না বাবা মোরগ। জোনাকিরা সবই বলেছে। ভালো লাগছে কি একটু?

 

[ইতিমধ্যে আলো উজ্জ্বল হয়ে পড়বে। হুলস্থূল করে আফ্রিদ, কাবেরিরা এসে ঢুকছে বোঝা যায়। এরা নেপথ্যের থেকেই ‘চিল মা! চিল মা’ বলে ডাকতে ডাকতে এসে প্রবেশ করে।]

 

চিল õò এস এস বাছারা।

 

আফ্রিদ õò তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, তুমি কথা রাখলে।

 

চিল õò আমাকে নয় , মোরগকে ধন্যবাদ দাও। ওর জন্যেই আজ আমরা সবাই উদ্ধার পেলাম। (ইতিমধ্যে মোরগ সুস্থ বোধ করে উঠে দাঁড়ায়।)

 

কাবেরি õò আমরা রবিমামা সূর্যকেও ধন্যবাদ জানাই, এস সবাই। (আলোর উৎসের দিকে তাকিয়ে)

 

সবাই õò হে সূর্য ঠাকুর ! হে দিনমণি ! হে ভাস্কর ! হে তপন! হে আলোর দেবতা---তোমাকে নমস্কার।

                       

[রবীন্দ্র সঙ্গীত ‘আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা’ গানটি বেজে উঠবে। মোরগকে মাঝে রেখে সবাই তালে তালে নাচবে। গান শেষ হতে হতে বাকিরা হয় বেরিয়ে যাবে বা হাঁটু মোড়ে বসে যাবে। পেছনে সাইক্লোরামাতে ধীরে ধীরে সূর্যোদয় হতে থাকবে গানের শেষের দিকে। আকাশের দিকে মুখ তোলে মোরগ ডাক দেবে। প্রথম ডাকে লাল সূর্য ক্রমে বড় হবে। তৃতীয় বা চতুর্থ ডাকে সূর্য এবং মোরগ দুইই স্থির হয়ে যাবে। নেপথ্যে একক নারী বা পুরুষ কণ্ঠে শোনা যাবে ‘নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ’-এর কয়েকটি পঙক্তি… ]

                                   

…আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের ’পর,

কেমনে পশিল        গুহার আঁধারে

       প্রভাত-পাখির গান।

না জানি কেন রে        এতদিন পরে

জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

       জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,

ওরে        উথলি উঠেছে বারি,

ওরে       প্রাণের বাসনা     প্রাণের আবেগ

       রুধিয়া রাখিতে নারি। …