হাল্কাচ্ছলে

মোদের গরব মোদের আশা


কল্যাণ দেশমুখ্য
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

86738759_199264754522747_3537921663028953088_o_edited.jpg

২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস। এই দিনটিতে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার্থে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমান বাংলাদেশে সঙ্ঘটিত ভাষা আন্দোলনে রফিক, সালাম, বরকত সহ আরো অনেকে শহিদ হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রাক্কালে বিশ্বের প্রতিটি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। ভাষা ও সংস্কৃতি প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর পরিচায়ক। নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার, লেখার অধিকার প্রত্যেক শিশুর জন্মগত পাওনা। কিন্তু যখন সেই ন্যায্য পাওনার ওপর প্রশ্ন চিহ্ন বসে, তখনই আন্দোলনের সূচনা হয়। কোন ও জাতির মাতৃভাষার ওপর হস্তক্ষেপ করা মানে সেই জাতির সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করা। আর সেই চেষ্টাকে ব্যর্থ করতে এগিয়ে আসেন বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও জাগ্রত জনতারা।

আমাদের সাধের বাংলা ভাষার জন্য বরাক উপত্যকায় শহিদ হয়েছেন ১৫ জন। ওপার বাংলায় শহিদ হয়েছেন অনেকজন। আহতের সংখ্যা ও বহু। কিন্তু বাঙালির এই প্রিয় মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জা বোধ করেন একালের অনেকে। একালের কিছু বাঙালি বাংলা শব্দের মধ্যে হিন্দি ও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন। সেদিন শুনলাম, একটি ছোট মেয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করছে, দিদি কবে পয়দা হয়েছিল?  

 

অন্য আরেকটি বাঙালি ছেলে তার বাবার বকুনি খেয়ে বলেছে, কেন শুধু শুধু আমাকে পরিশান করছো? এধরনের বাংলাকে খিচুড়ি বাংলা বলা যায়। এক কবি দুঃখ করে লিখেছেন--


' বাঙালি আজ বাংলা ভাষায়
কথা বলতে লজ্জা পায়।
সাহিত্য, কবিতা আর গানগুলো তাই--
জীবন থেকে নিচ্ছে বিদায় '।

কিছু কিছু বাঙালি বুদ্ধিজীবীর উক্তি হলো, আমার কচি ছেলেমেয়েরা ইংরেজিতে লেটার মার্কস পায়। কিন্তু তারা বাংলা শব্দ লিখতে ও পড়তে পারে না। তাই ভাবছি, ওদের কনকনে শীতের দেশ ওই লন্ডনে পাঠিয়ে ঝলমলে ইংলিশ শিখিয়ে বিলেত ফেরত করে আনব। অতএব সবার আগে চাই আমাদের পাড়ায় পাড়ায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রতিষ্ঠা। অলি গলিতে চাই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বীজ বপন। ভাইসব বাংলা বর্জন করো। ইংরেজি সানন্দে গ্রহণ করো।

একালের শিশুকে সাধারণত ছেলে বা মেয়ে বলা হয় না। বলা হয় বাচ্চা। এই বাচ্চা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয় সবেধন নীলমণি। এর লীলাখেলা শেষ করাতেই মা- বাবার ভবলীলা প্রায় সাঙ্গ হবার জোগাড়। বাচ্চার বয়স আড়াই বছর হতে না হতেই তাকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করে দিতে হবে। স্বচ্ছল বাঙালির প্রথম পছন্দ বাংলা মাধ্যম স্কুল নয়। তাদের পছন্দ নার্সারি। মাছের পোনার জন্য যেমন আছে নার্সারি, তেমনি মানুষের বাচ্চার জন্য ও আছে নার্সারি। আহা, আমার ছেলে মেয়ে সব ক্লাসে ফার্স্ট হবে। বড় হয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে। হয়তো বা জজ, ব্যারিস্টার ও হতে পারে। বেশি আদর পেয়ে এদের মধ্যে কেউ কেউ হয় বাঁদর। বড়দের মধ্যে কেউ কেউ এদের চালচলন দেখে ব্যঙ্গ করে বলেন--


' বাঙালি হয়ে ও সে যেন ইংরেজ খাটি।
ভাবখানা দেখো, কত যেন বিজি,

বাংলায় সে নয় মোটেই ইজি,

ইংরেজ গেছে, তবুও সে বলে ইংরেজি।

দেখাতে চায় কায়দা সাহেবি '।

একালের অনেক বাঙালির ছোট ছোট ছেলে মেয়ে বাংলা বর্ণপরিচয়ের অ আ ক খ জানে না। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে হিন্দি কিংবা ইংরেজিতে। হিন্দি রাষ্ট্রভাষা। শেখা প্রয়োজন। ইংরেজি ও বিশ্বের কমন ভাষা। শেখা দরকার। শিখলে চাকরি পাওয়া যায়। তা বলে মাতৃভাষা শিখব না? মাতৃভাষায় কথা বলব না? পড়ব না বাংলা লেখা ভারতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য যেমন রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, নজরুল, শরৎচন্দ্র, মাইকেল, সুকান্ত। তবে এখন ও সময় আছে। যে ভাষার রস আস্বাদনের জন্য বহু অবাঙালি বাংলা শিখতে আগ্রহী, সে ভাষার জন্মগত অধিকার থেকে বাঙালি শিশুদের বঞ্চিত করে রাখা রীতিমতো অপরাধ। তাই অনুরোধ করছি, যেখানে যত বাঙালি আছেন, বাংলায় কথা বলুন। বাংলা শিখুন, বাংলা পড়ুন, বাংলা পড়ান। বাংলা টিভি সিরিয়াল ও সিনেমা দেখুন। বাংলায় সাইনবোর্ড লিখুন। বাংলা গান শুনুন, বাংলা যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করুন। তবেই বাংলা ভাষা বাঁচবে।বাংলা সাহিত্য বাঁচবে। এর দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। নাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের কৈফিয়ত দিতে হবে। করতে হবে জবাবদিহি।

 
সবশেষে বলছি, শিলচর রেলস্টেশনের নাম পরিবর্তন করে ভাষা শহিদ স্টেশন করতে হবে। এই কাজে আপামর বাঙালিকে এগিয়ে আসতে হবে। এবার এক সুরে বলুন, বাংলা ভাষা জিন্দাবাদ, মাতৃভাষা জিন্দাবাদ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস জিন্দাবাদ।