সাহিত্য পত্র

সম্বরিত ব্রহ্মশির

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়

বিশ্বের সর্ববৃহৎ মহাকাব্য হতে পাঠককুলে এতাবৎকালে উপেক্ষিত অন্যতম সর্ববৃহৎ চরিত্র কে নিয়ে লেখা

গবেষণামূলক উপন্যাসের ধারাবাহিক প্রকাশ

(প্রারম্ভের কথা এবং পরিচ্ছেদ ১-৮)

২৩ জানুয়ারি - ০৩ এপ্রিল ২০২২

লেখক পরিচিতি ...

সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়, M.Sc., M.A, বৃত্তি ছাত্র পড়ানো, নেশায় প্রাইমেট বর্গের গ্রন্থকীট।

প্রবন্ধ লেখা তার প্রিয় ব্যসন, কিন্ত নিজেকে 'দুরাশার ছলে মুগ্ধ' পল্লবগ্রাহী বলেই মনে করে করেন।

 

লেখকের প্রকাশিত বই ...

ঐতিহাসিক গ্রন্থ - "প্রচারের আড়ালে মুর্শিদাবাদ"
অনুবাদ গ্রন্থ্‌- "ঈশোপনিষদ ও মুন্ডকোপনিষদ"
ধর্ম ও দর্শন সংক্রান্ত গ্রন্থ- "হিন্দুধর্মের গোড়াপত্তন"

 গ্রস্থকারের নিবেদন 

 

গণমানস যেন চিরকাল এক রকম। এযুগে বিজ্ঞানবাদীর ছদ্মবেশে কতিপয় হীণতাপন্থী আছে, সে যুগেও ছিল। এরাই প্রচার করেছিল নগরে দুর্যোধনের জন্মকালে শেয়াল ডেকেছিল, আর আশ্রমে যুধিষ্ঠিরের জন্মকালে কিছুই ডাকে নি।
 

এযুগে যাকে বলা হয় ঈশনিন্দা বা ব্লাসফেমী, সে যুগে তাকেই বলা হত গুরুদ্রোহিতা। মহৎ এর সম্বন্ধে হেয় আলোচনা করে নিজেকে জ্ঞানী বীর যুক্তিবাদী জাহির করতে চায় কিছু লোক, প্রাচীন যুগে এদেরই অগ্রদূত ছিল কর্ণ। কর্ণ 'দুর্যোধনসখা' এবং 'অঙ্গরাজ' এই পদ বা উপাধী পেয়ে যখনই কুরুরাজসভায় স্থান পেল তখন থেকে এর কাজ ছিল ব্লাসফেমী-- প্রতিটি প্রসঙ্গে ভীষ্ম-বিদুর-দ্রোণ ইত্যাদি গুরুজনকে সর্বসমক্ষে হেয় করা। এদের চেতনা বেশ মুখরোচক এবং সংক্রামক- দুর্যোধন সহ শতত্রাতা'র মধ্যে ভালই সংক্রামিত হয়েছিল, কারণ ভারতে গুরুনিন্দা নিন্দনীয় হলেও উন্মুক্ত মতপ্রকাশের পরিবেশ ছিল, শুধু মতের জন্য গলাকাটার বিধান ছিল না।
 

আত্মস্বার্থহীণ, জ্ঞান ও শক্তি'র ভান্ডার, সংসারে থেকেও ত্যাগী, বিশ্বস্ত, কর্মী- সবযুগেই বিরল। ভীষ্ম-বিদুর-দ্রোণ এই তিন জনের জন্ম ও প্রাথমিক জীবন মহাভারতের প্রধান আখ্যানভাগে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে; তারা তখন সেই বিরল আলোকবর্তিকা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাল জিনিসের চেয়ে খারাপ জিনিসই বেশি সংক্রামক; সংক্রমণ হয়েছিল খারাপটা। এক বস্তা টাটকা আলুর মধ্যে একটা পচা আলু রাখলে পুরো বস্তাটাই পচে যায়। এটা প্রবাদ নয়, বাস্তব ঘটনা । কোনো প্রবাদ বা প্রচলিত সস্তা সহজলভ্য ধারণা আবৃত্তি করার জন্য এই লেখা নয়।
 

এই লেখা হল মহাভারত সম্বন্ধে আধুনিককালের প্রবাদতুল্য প্রচলিত ধারণার গন্ডীর বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষ সংস্কারমুক্ত যুক্তিশীল বাস্তবোচিত মূল্যায়ণ । জানেন, মহাভারতের বীরশ্রেষ্ঠ কে যিনি কৃষ্ণ-অর্জুন এর সমতুল্য মহৎ? এ প্রশ্নের উত্তর মহাভারতের মধ্যেই আছে। স্পষ্ট আছে। অথচ প্রচার হয় নি। বেতার টিভি যাত্রা আর পালাগান এর সম্প্রচার এর মধ্যে নেই। সস্তা জনপ্রিয়তার বাইরে অবস্থিত এই কেন্দ্রীয় চরিত্রটি এতাবৎকালে উপেক্ষিত নিন্দিত। এখানে কোনো আঞ্চলিক মহাভারতকে স্থান দেওয়া হয় নি। যেমন শকুনির একশত ভাই ও তাদের একত্রে বন্দী থাকার কথা কোনো প্রামাণ্য মহাভারতে নেই, এ সব প্রসঙ্গ পুরোপুরি বর্জন করা হয়েছে। সংস্কৃত মহাভারত এর যে রূপ আধুনিককালে গৃহীত, তা স্বীকার করে এটা লিখিত। অতএব আমার বক্তব্যে প্রামাণ্যতা নিয়ে সংশয় কম। স্থানে স্থানে এদের অবিকল উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়েছে। তবু সুধী সংস্কারমুক্ত পাঠকের মতামত কাম্য । প্রধানত যে সব গ্রন্থ/অনুবাদ-গ্রন্থের উপর নির্ভর করা হয়েছে তা হল---
১ কৃষ্ণচরিত্র- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,

২. মহাভারত- কালী প্রসন্ন সিংহ,

৩. কুরুপান্ডব- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,

৪. মহাভারত- রাজশেখর বসু।


মহাভারতের কাকে এযুগে সবচেয়ে বেশি অবহেলা বা অবিচার করা হয়? একথা ভাবতে বসলে অনেকের মুখে অনেকগুলো নাম আসবে। যে সব নাম আসবে সেগুলো সবই বহুল আলোচিত। যেমন কর্ণ। বহুল আলোচিত চরিত্র উপেক্ষিত হয় কি করে? উপেক্ষিত অনাদরে পাঠকের শ্রদ্ধা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন অশ্বথামাকে। কোনো দিন ভেবেছেন কে সেই ধৃষ্টদ্যুম্ন? সত্যবতীর মনোবেদনা, কর্ণের প্রথম পত্রী বৃষালীর নিরব অবদান কেউ কোনোদিন শুনেছেন? ভেবেছেন কি পত্নী হিসাবে দুর্যোধন-জায়া ভানুমতী'র তুল্য সুনির্ভরযোগ্য সৌভাগ্যবতী মহাভারতে দ্বিতীয় ছিল না? এই বই যারা বদ্ধমূল ধারণা*য় বা কোন এক ব্যাক্তিকে পছন্দ করার ধারণা'য় অটল তাদের জন্য নয়। যারা পূর্বসংস্কারমুক্ত হয়ে এই লেখা পড়বেন তাদের জন্য। আসুন মহাভারত থেকে সকলের কথা একে একে আলোচনা করি।

 

গ্রন্থটির নাম দিয়েছেন প্রথম পাঠক শ্রী জিষ্ণু দত্ত।

বিনীত- সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায় 

 শেষ কুরু-সেনাপতি 

আজ থেকে পাঁচ হাজার একশ বছর আগে গঙ্গা-যমুনা অববাহিকার এক শক্তিশালী রাজবংশের ক্ষমতার দ্বন্দে, বংশবিনাশী যুদ্ধের জন্য পঞ্চাশ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলতে থাকা সমগ্র ভারতময় বিস্তৃতজাল কুটনীতির কাহিনী নিয়ে আজও ভারতবাসীর আগ্রহ, ধারণা ও বিতর্কের শেষ হয় নি। প্রচন্ড নাটকীয়তায় সম্পৃক্ত ঠাসবুনন কাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের সাথে দারুন উজ্জ্বল পার্শ্বচরিত্রের কোন অভাব নেই।

 

War is the highest form of politics, বলেছিলেন লেনিন, কথাটা চিরায়ত সত্য।

 

পঞ্চাশ বছরের বেশী সময় ধরে অগ্নিগর্ভ রাজনীতির শেষে অনিবার্য পরিণতি যুদ্ধ, আঠারো দিনের যুদ্ধ শেষে সমূহ বিনাশ, তার মধ্যে দুইদিন রাত্রিযুদ্ধ, ভারতের সমর্থ যোদ্ধাকুলের প্রায় সবাকার সামগ্রিক ধ্বংস নাকি ধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল এহেন বিশ্বাস পাঁচ হাজার বছর ধরে বিজয়ী পক্ষের সমর্থনে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে আপ্তবাক্য হিসাবে জপ করার ফলে বিজ্ঞাপিত হয়ে থাকে। ইতিহাস বিজয়ী পক্ষকেই ন্যায্য বলে বিজ্ঞাপিত করে, এটাই স্বাভাবিক, এবং বিজিত পক্ষের ন্যয্য দাবি ও যুক্তি ক্ষতস্থান থেকে উৎসারিত রক্তের সঙ্গে ধুয়ে চলে যায়।

 

কিন্তু প্রচারের ঢক্কানিনাদের মায়াজাল ভেদ করে কার্যকারণ সম্পর্কের যুক্তির আলোকে যাবতীয় সূত্র ও সম্ভাবনার সুক্ষ বিচার করে সত্য অনুসন্ধান চেষ্টা আজও চলেছে।

 

বিজয়ী পক্ষের শক্তি সামর্ঘ্যের সম্পর্কে জনধারণা বিবর্ধিত হয়ে তাদের প্রায় দেবত্বে কিংবা অবতারত্বে উত্তরণ হয়তো স্বাভাবিক। ইতিহাস বিজয়ীরা লিখিয়ে নেয়।

কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ খুব সহজ ছিল না। মহাভারতে কিছু লিখিয়ে নেওয়াও সহজ নয়, দুরন্ত বিস্ময় মহাভারতের সত্যের উপাদান ব্যাসকূট। এই মহাকাব্য শুধু প্রচণ্ড বিতর্কিতই নয়, আজও তা ভারতবাসীর ন্যায় সম্পর্কিত ধারণা ও অনুশীলনের মাপকাঠির উপাদানে সমৃদ্ধ ।

 

দুর্জয় মনোবলের কুরুরাজপুত্র দূর্যোধন মহাভারতের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র, যার মরণাহত অবস্থায়ও যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় নি। সখাবৎসল দুর্যোধনের অন্যতম প্রিয়সখা অতীব রণনিপুণ যোদ্ধা শেষ কুরু-সেনাপতি অশ্বথামার অতুলনীয় নৈশ রণনৈপুণ্য যুদ্ধের অষ্টাদশ রাতে যাবতীয় ফলাফল বদলে দিয়েছিল।


পাণ্ডবদের জিতে যাওয়া যুদ্ধ এক রাতে কার্যত পরাজয়ে বদলে দিয়েছিলেন অশ্বথামা।


তখন হতাশার চূড়ান্ত অবস্থায় পাণ্ডবপক্ষের কুটিল কৌশলী কৃষ্ণ অশ্বথামাকে নিহত কিংবা পরাস্ত না করতে পেরে তাঁর চরিত্র হনন করার চেষ্টা করেন, মিথ্যা কলংক লেপন করার চেষ্টা করেন। যারা অন্ধ বিশ্বাসী তারা তাই অশ্বথামার নিষ্কলঙ্ক চরিত্রে অপবাদ আরোপ করে পাঁচ সহস্র বর্ষ ধরে।


কিন্তু সকল মানুষকে যেহেতু সর্বকালের জন্য ভাঁওতা দেওয়া যায় না, সেহেতু মহাযোদ্ধা অশ্বথামার চরিত্রের কলঙ্কমোচন ও মহাভারতের আরো অনেক ব্যাসকূটের রহস্যমোচন করে এই দুর্দান্ত বিশ্লেষণ রচনা করেছেন শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায়।


অনবদ্য তাঁর এই প্রচেষ্টা ও বিশ্লেষণ। শব্দের মাধ্যমে মহাভারতের বহু ঘটনাবলী চমৎকার ভাবে তিনি উপস্থাপন করেছেন। সুক্ষ বিশ্লেষণে আগ্রহী ইতিহাসমনস্ক পাঠকের জন্য এক দারুণ উপহার এই বইটি।


লেখক তাঁর বইটির ভূমিকা লেখার অনুরোধ করে আমাকে সম্মানিত করেছেন।


আমি তাঁর বইটির সাফল্য সর্বান্তকরণে কামনা করছি।


প্রচলিত ধারণা, অন্ধ বিশ্বাস ও কূপমণ্ডূক মানসিকতার দুর্লজ্ঘ্য বাধা অতিক্রম করে সত্য অনুসন্ধান এবং তদনুযায়ী লব্ধ সত্য প্রকাশ এক অতীব দুরুহ কর্মই শুধু নয়, সে নিজেই এক দুঃসাহসের কাহিনী।

 

লেখক সেই ঝুঁকি নিয়েছেন অবলীলায়, এটা জেনেবুঝেই যে তাঁকে মূর্খদের গালাগালি, অপবাদ, অপমান প্রচুর পরিমাণ সহ্য করতে হবে যা সম্পূর্ভাবেই অযৌক্তিক, অযথা এবং মিথ্যা, অনেকটাই যেভাবে মহাযোদ্ধা অশ্বথামাকে অযথা, অকারণ মিথ্যা অপবাদের, অপপ্রচারের শিকার হতে হয়েছে।

যে নিরস্ত্র মহাবীর তুচ্ছ তৃণখন্ডকে অনুপল মাত্র সময়ে বিধ্বংসী ব্রহ্মশির অস্ত্রে রূপান্তরিত করতে সক্ষম ছিলেন তিনি কিনা সেই অস্ত্র সংবরণ করা জানতেন না, এমন মিথ্যা অপপ্রচার লোকে বিশ্বাস করে।


সেই অপবিশ্বাসের বন্দ আগল ভাঙার কাজও নিতান্ত দুঃসাহসিক কাজ যা কিনা শ্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর মুখোপাধ্যায় করে দেখিয়েছেন যাবতীয় ঝুঁকি নিয়ে।

 

বর্তমান এবং আরো দূর ভবিষ্যতের ভারতবাসী ও বাঙ্গালী পাঠকের আগ্রহের তৃপ্তি হবে এই আশায় । । । । ।


---নিবেদনে শ্রী জিষ্ণু দত্ত

 পরিচ্ছেদ ১ 


কে বঞ্চিত-বিড়ম্বিত নয়?

হ্যালো স্যার/ম্যাডাম, সত্যবতীর নাম শোনা আছে? চেদী-রাজের ঘরের, পাকে চক্রে ঘরে তোলেনি বাপ। জেলের ঘরে মানুষ হয়েছিল। মাছ ধরে মেছো গন্ধ হয়ে গিয়েছিল গায়ে। মনে আছে মহিলাকে? তিনটি পুরুষ এসেছিল তার জীবনে, তাদের মধ্যে সেরা যুবকটির বদলে তার বুড়ো বাপকে বিয়ে করতে হয়েছিল। আদর্শ রাজপুত্রের রাণী না হয়ে কোনোদিন বঞ্চিত নিপীড়িত বলে কাঁদতে শুনিনি সেই মেয়েকে। সাধারণভাবে যে কোনো রাজমোহিনী যুবতী কি চায়? আর তিনি কি পেলেন? তাকে কোনোদিন কাঁদুনি গাইতে দেখি নি। না তার হয়ে কেউ কাঁদুনি গেয়েছে।


মহাভারতের কোন্‌ চরিত্রটিকে আমরা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষা করেছি, কখনো আলোচনায় আনি নি? অথবা সাধারণ এর বিচারে মহাভারতের কাকে এযুগে সবচেয়ে বেশি অবহেলা বা অবিচার করা হয়? একথা ভাবতে বসলে অনেকের মুখে অনেকগুলো নাম আসবে। যে সব নাম আসবে সেগুলো সবই বহুল আলোচিত। যেমন কর্ণ। বহুল আলোচিত চরিত্র উপেক্ষিত হয় কি করে? কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে অশ্ব্থামাকে ভেবেছেন কি? কৃষ্ণা ও ধৃষ্টদ্যুম্ন এই দুজন বাস্তবে কে কে? সত্যবতীর মনোবেদনা, বৃষালীর নিরব অবদান কেউ কোনোদিন শুনেছেন? অথবা ভানুমতীর অনন্যসাধারণ পতিভাগ্য। পত্রী হিসাবে তার তুল্য সুনির্ভরযোগ্য সৌভাগ্যবতী যে মহাভারতে দ্বিতীয় ছিল না। ভেবে দেখেছেন বঞ্চিত ধৃতরাষ্ট্র অথবা বিড়ম্বিত ভীষ্ম বা দ্রোণ এর অটল ন্যায়পরায়ণতা সহানুভূতির সঙ্গে? জানেন, কৃষ্ণ-অর্জুন এর সমতুল্য মহৎ এবং মহাভারতের বীরশ্রেষ্ঠ কে, এ প্রশ্নের উত্তর মহাভারতের মধ্যেই আছে। বেতার টিভি যাত্রা আর পালাগান এর সম্প্রচার এর মধ্যে নেই। আসুন মহাভারত থেকে সকলের কথা একে একে আলোচনা করি।


মহাভারতের কাহিনী সকলেই কমবেশি শুনেছেন। স্যার/ম্যাডাম, সেই গরিবের ছেলেটার নাম শুনেছেন, বন্ধবান্ধবদের দুধ খেতে দেখে বাবার কাছে দুধ খেতে চেয়েছিল, কিন্তু পায় নি? মনে পড়ে তার বাপ ছেলেকে একটু দুধ খাওয়ানোর সাধে বাল্যবন্ধুর কাছে সাহায্য চেয়ে অপমান পেয়েছিল? পরে সেই ছেলেটা ধনুর্বিদ্যায় সেরা হয়েছিল, তরবারি বা খড়া চালনাতেও অদ্বিতীয় হয়েছিল, সেরা ৫ জন দিব্যাস্ত্রবেত্তার মধ্যে পড়ত। সেই ছেলেটি সম্বন্ধে মহাভারতকার কি লিখেছেন পড়ুন, রাজশেখর বসুর অনুবাদে,

 

"যিনি তেজে সূর্যতুল্য, বুদ্ধিতে বৃহস্পতি তুল্য, যাঁর পিতা অযোনিজ, মাতা অযোনিজা, যিনি রূপে অনুপম, সর্ববিদ্যার পারগামী এবং গুণের সাগর!"


এখনো চিনতে পারেন নি? অশ্ব্থামা। যার মনে কখনো উদয় হয় নি মহাবীর গুরুজনদের হেয় কথা বলা। বিনয় গুণ এর উপস্থিতির জন্য সে ঔদ্ধত্য তার ছিল না। প্রকৃত বিদ্যা তাকে বিনয় দান করেছিল।


ভাবতে পারেন, দ্রোণ প্রথমটা অশ্বথামা'র মৃত্যু বিশ্বাস করতে পারেন নি কেন? কারণ এত বড় বীরকে যুদ্ধে মারা অসম্ভব। দ্রোণ নিজে মৃত্যু নিশ্চয় করে যুদ্ধ করছেন, যুদ্ধে মৃত্যু খুব স্বাভাবিক এবং তা বীরগতি- গৌরবের, এবং দুর্যোধন সহ সকল রাজাই যুদ্ধে নিজ নিজ পুত্রের মৃত্যু সহ্য করছেন। যতক্ষন না যুধিষ্ঠির বলছে ততক্ষন দ্রোণ অশ্বর্থামা'র মৃত্যু বিশ্বাস করেন নি। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে কালান্তক ভীম-অর্জুনের উপস্থিতি সত্তেও এটা অবিশ্বাস্য।


হে রবীন্দ্র কাব্যনাট্যের আবেগ-গদগদ বাঙালী! তুমি যদি "রবে নিষ্ফলের হতাশের দলে" তো অশ্বথামা তোমার প্রিয় বীর (Hero) হোক। কারণ শেষ জীবনে সেই অশ্বথামা হয়ে গেল সবহারা। যে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ আর বন্ধুকৃত্যে দিনরাত এক করে দিতে পারে।


"বিধির প্রথম দান মাতৃস্তন্য হতে
কেন মাতঃ করিলে বঞ্চিত?"

 

কর্ণ জন্মের পর হস্তান্তরিত একটা শিশু। কিন্তু তিনি রাজার সারথীর বাড়ীতে রাজ পরিমন্ডলে মানুষ। রাজপুত্ররা যে অ্যারিস্ট্রোক্র্যাট স্কুলে ট্রেনিং নেয়, সেই অ্যারিস্ট্রোক্র্যাট স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছিল। প্রশ্রয়প্রাপ্ত ভাগ্যবান বলা যায়। অনবরত ঘ্যানঘ্যান করা, হামবড়া, বন্ধু'র গুরুজনকে বারবার নিন্দা, নিজের গুরু'কে নিন্দা করা, মিথ্যা কথা বলে অনবরত মিথ্যা বড়াই করা, ভিকটিম প্লেয়ার, সভাকক্ষে মহিলাকে উলঙ্গ করার নির্দেশ দেওয়া বিকৃত-কাম 'কর্ণ' যে জাত এর প্রিয় বীর (Hero) হয় সে কেমন জাত?


যারা কর্ণের জাতের কথা তোলেন, অথবা মাতৃস্তনের এই রবীন্দ্র আকুতিতে যারা বিভোর থাকেন তাদের কি মনে পড়ে আর একজন জন্ম থেকে মা এর দুধ পায় নি, সেও ভিন জাতের মা এর কাছে মানুষ? তাঁর জন্য কেউ দুঃখ না গেয়ে তাঁর নিন্দা করার জন্য ব্যাকুল লোকের অভাব নেই।


সে হতভাগার নাম কৃষ্ণ।

ধৃতরাষ্ট্র কৌরব বংশের বড় ছেলে, পান্ডু ছোট। জ্যেষ্টপুত্র সিংহাসনের সরাসরি উত্তরাধিকারী। এটাই নিয়ম। কিন্তু তার সব ইন্দ্রিয় যেন সক্ষম হয়। জন্মান্ধ, প্রতিবন্ধী হওয়া যে জন্ম দ্বারাই বিড়ম্বনা, অতএব তার সব দোষ লঘু করে দেখতে হবে, এটা কিন্তু কেউ ভাবে নি।

অথচ প্রসবিতা-মাতৃ-স্তন্য না পাওয়ার ওকালতি কর্ণের জন্য কতবার করা হবে যুগে যুগে। সে তো মায়ের স্তনসুধা পেয়েছিল। এই বইতে দেওয়া পৌরাণিক মানচিত্রে দেখুন, কোথায় কুন্তীভোজ এর রাজ্য, আর কোথায় কুরুরাজ্য। জন্ম থেকে কর্ণের কতরকম অলৌকিক সাহায্য - যমুনা নদীর উজানে (নিচের দিক থেকে উপরের দিকে) তীব্র বেগে ভেসে গিয়ে অতি অল্প সময়ে কুন্তীর কোল থেকে রাধার কোলে পৌঁছে যাওয়া, রাধার স্তনের অমৃতের সঞ্চার, রাজসারথীর বৌ এর সংসারে আনন্দে গৃহীত হওয়া, বাল্যে রাজপুত্রদের সঙ্গে শিক্ষা পাওয়া-- তার বঞ্চনা কোথায়?

Sambarita Brahmashir 1.png

 পরিচ্ছেদ ২ 

 

ভাগ্যের পরিহাস।

 

কনিষ্ঠ পান্ডু রাজা হল। ধৃতরাষ্ট্রের সব জ্ঞানেন্দ্রীয় সক্ষম নয়, এই আইনে, জ্যোষ্ঠ রাজপুত্র হয়েও তিনি পান্ডুর মাননীয় আশ্রিত মাত্র। যে ভীষ্ম-বিদুর এই বিধান দিলেন, তারাই পরে এই নিয়ম ভাঙবেন। তাদের ধৃতরাষ্ট্র'কে এইভাবে বঞ্চিত অপমানিত করা যে সব সমস্যার মূলে, গোটা ভারতবর্ষের 'অবহেলা-দরদী'রা কেউ এটা ভেবে দেখলেন না।

 

পান্ডুর দুই বউ কুন্তী ও মাদ্রীর কোন সন্তান হল না। পান্ডুর রাজকাজ ভাল লাগল না। জনপদ থেকে দূরে ঋষিদের আশ্রমে কাল কাটাবেন, জেদ ধরলেন। রাণীরাও সঙ্গ নিল। তখন ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডু উভয়ে অপুত্রক। পান্ডুর নিজের সমস্যা, তার দাদার বৌ এর সমস্যা। মহাভারতকার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এটাই হয়তো পান্ডুর অবসাদ এর কারণ। মিথুনরত মৃগযুগলকে শিকার করে ধার্মিক পান্ডু অনুতপ্ত হয়েছিলেন। মৃগমিথুন এর অভিশাপ বাজে কথা। পান্ডু মৃগয়ায় গিয়ে এমন কিছু শারীরিক ও মানসিক আঘাত পান যার দরুণ তার জন্য বৈদ্যের আদেশে সঙ্গম নিষিদ্ধ হয়ে যায়।

 

বাধ্য হয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে রাজদায়িত্ব নিতে হল। অসুবিধা নেই। এক্ষেত্রে আইন হল, “রাজা কর্ণেন পশ্যতি” - অমাত্য বর্গই দেখে রাজাকে বলবেন, রাজা তাদের কথা শুনে নীতি নির্ধারণ, আদেশ জারি করবেন। অমাত্য ও  গুপ্তপুরুষই রাজার চক্ষুকর্ণ। আহা! এই আইনটা প্রথমে কোথায় ছিল বিদুর মশাই, ভীষ্মদেব? সেক্ষেত্রে অনুগত ভাই পান্ডুর চেয়ে বড় চক্ষু আর কে হত? আপনারা শুধু শুধু খুঁতো ছেলে বলে বড় ছেলেকে বঞ্চিত করেছিলেন।

 

গান্ধারী কি কম বঞ্চিত? বড় বংশ বড় সামরিক নিরাপত্তা দেখে বিয়ে হল, কিন্তু অন্ধ স্বামী, সে রাজা হয়েও রাজা নয়। বহুদিন পরে ব্যাসদেবের কারিকুরিতে, দীর্ঘ গর্ভধারণের পর দুর্যোধন ও ক্রমান্বয়ে কৌরবদের জন্ম হল। এদিকে ইন্দ্র-যমাদি দেবতার কৃপায় দুর্যোধনের জন্মের এক বছর আগে যুধিষ্ঠির হয়েছেন, ক্রমান্বয়ে পরবর্তী পান্ডবগণ। এ খবর হস্তিনাপুরে পৌঁছয় নি, কারণ পান্ডবদের জন্ম বহুদূরে হিমালয়ের পাদদেশে। গান্ধারী জানত তার দুর্যোধনই ভবিষ্যতের যুবরাজ। সেই আশাতেই সে কৃপাচার্যের কাছে রাজনীতি ও সমরনীতির পাঠ নিচ্ছে। কিন্তু পোড়া কপাল এই যে কুন্তীর গর্ভলাভ এর এক বৎসর আগেই গান্ধারী গর্ভবতী হয়েছিলেন। অলৌকিক দুর্ভাগ্য যে গান্ধারীকে দু বছর অপেক্ষা করতে হল সন্তানের জন্য। সাধারণ নিয়মে দুর্যোধনের রাজার ছেলে হওয়ার কথা, এমন কি কুরুপান্ডব এর মধ্যে বংশের জ্যোষ্ঠ পুত্র হওয়ার কথা। এর জন্য গান্ধারীকে কেউ কর্ণ-কুন্তীর মত কাঁদতে দেখে নি। কোন কবি গান্ধারীর হয়ে কাঁদে না।

চলবে-- বাঁধা গত এর বাইরে মহাভারতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ ।


ব্যাস এর শিষ্য লোমহর্ষণ সুত ও ঋষি বৈশম্পায়ন। লোমহর্ষণ এর পুত্র উগ্রশ্রবা সৌতি। ব্যাস মূল আখ্যান বলেছিলেন পুত্র শুকদেবকে, শুকদেব সতীর্থ বৈশ্যম্পায়নকে, বৈশম্পায়ন তার শিষ্য উগ্রশ্রবা সৌতিকে। মহাভারত প্রাচীনকালের লোক শুনেছে, কিছুটা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এর শিষ্য ব্রাহ্মণ বৈশম্পায়ন এর মুখে, কখনো সুত সঞ্জয়, কখনো সুত উগ্রশ্রবা এর মুখের বর্ণনা হিসাবে। পরে নাম-আকাঙ্ক্ষা-বর্জিত বহুজনের রচনা এতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। বেদ-সংকলনকারী মহাপ্রাজ্ঞ কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ঋষিকে আমরা স্থানে স্থানে দেখেছি একটি গৌণ চরিত্র হিসাবে।


এই প্রসঙ্গে সুতজাতির কথা বলা বিশেষ প্রয়োজন, কারণ বিতর্কিত কর্ণের পরিচয় সুতপুত্র। ব্রাহ্মণকন্যা ও ক্ষত্রিয়পুত্রের বিবাহে উৎপন্ন সংকরকে সুত বলা হত। সুত'দের স্মৃতি, মুখস্থ করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি বলে এদের দিয়ে অনেক কিছু মুখস্থ করানো হত। এদের চলমান গ্রন্থাগার হিসাবে মনে করত গবেষক ঋষিরা। এরাই ঋষিদের ও আমাদের মহাভারত বলেছেন। জাতিবাদী বর্ণবিদ্বেষী ভুলনিবাসী'দের হতাশ করে বলি, সুতপুত্র কর্ণ ছিল না কোন অবহেলার পরিচয়। মৎস্যদেশের রাণী সুদেষ্ণা এবং সেনাপতি কীচক-- সুতকন্যা ও সুতপুত্র ছিলেন। এরা অনেক বেশি যুদ্ধ বুঝতো বলেই এদেরকে সারথী করা হত। কৃষ্ণ সুতকর্ম করেছেন।


হ্যালো, স্যার/ ম্যাডাম, সেই ছেলেটিকে জানেন যার জন্মকালে মা বাবা পাওয়া কর্ণের মতই অলৌকিক, কিন্তু তফাত সে শৈশবে গরুর গোয়ালে আর গোচারণে দিনরাত কাটিয়েছে? লেখাপড়া শেখার জন্য ভাগ্যে প্রথম মাষ্টার জোটে ষোল বছর বয়সে? (এ জন্মবৃত্তান্ত এখানে আলোচ্য নয়, কারণ এ জন্মবৃত্তান্ত মহাভারতের নয়, ভাগবত বা হরিবংশের ।)

 

আর আছে, অশ্ব্থামা। আরো অনেক উপেক্ষিত'র কথা বলার পরেই তার কথা আবার বলবো। আমি তো জানি মহাভারতে কর্ণের চেয়ে বেশি যোগ্যতায়, বেশি ভাগ্যবিড়ম্বিত অনেক আছে।

 

পাঠক, যারা সুতপুত্রের মিথ্যা ভিকটিম প্লে করেন, তাদের কি মনে হচ্ছে, তারা ঠিক করেন? ব্রাহ্মণ বড় সম্মানে বড় আদরে প্রশ্রয় প্রাপ্ত ছিল?

 পরিচ্ছেদ ৩ 

 

পান্ডুপুত্রদের হস্তিনাপুর প্রবেশে সম্পর্কের নতুন রসায়ন

 

পান্ডু সস্ত্রীক বাস করতেন বহুদূরে ঋষিদের আশ্রমে। দীর্ঘ প্রায় ১৭/১৮ বছর পরে, কয়েকজন তাপস(ছাত্র বা ঋষিশিষ্য)কে সাক্ষী হিসাবে সঙ্গে করে পঞ্চপুত্র সহ কুন্তী, পুত্রের অধিকার কামনা করতে হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। খবর পাওয়া গেল মাদ্রীর সাথে সঙ্গম করতে গিয়ে পান্ডু মারা গেছেন। শোকতপ্তা মাদ্রী, সকলের মর্মঘাতী ধিক্কার, বিশেষত বিলাপের ছলে কুন্তীর কঠোর ধিক্কারে, অনুতপ্তা মাদ্রী মৃত্যুবরণ করেছেন। সেই আশ্রমে একই সঙ্গে পান্ডু ও মাদ্রীর অন্ত্যেষ্টি হয়। মহাভারতের কথক বৈশম্পায়ণ জানিয়েছেন, ধৃতরাষ্ট্র কুন্তীর মুখে পান্ডুর মৃত্যুর খবর পেয়ে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান যথারীতি করান। খষিশিষ্য'রা সাক্ষ্য দিলেন, পুত্রদের জন্ম পান্ডুর জীবিতকালে এবং পান্ডুর সহমতে দেব-ঔরসে। ঋষিসাক্ষ্য অগ্রাহ্য করার সাহস সেকালে রাজা বা রাজ-অমাত্যদের ছিল না। হিসাবে দেখা গেল, জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরের বয়স তখন ১৬, ভীমের ১৫, অর্জুন ১৪, যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের ১ বছরের বড় (রাজশেখর বসু)।


সেই সময় একটা রটনা হল হস্তীনাপুরে। আচ্ছা! দুর্যোধনের জন্মমুহুর্তে কি শিয়াল ডেকেছিল? আর যুধিষ্ঠির এর জন্মমুহুর্তে ঋষির তপোবনের নিকটে কি জন্তু ডেকেছিল? কেউ জানে না। ঠিক হয়ে গেল দুর্যোধন খারাপ। এই রটনা, এটাও কি ধৃতরাষ্ট্রের বুকে শেল দেয় নি? এ রটনা কি দুর্যোধনকে বিড়ম্বিত করে নি? বঞ্চনা-দরদীরা কেউ ভেবে দেখে নি।


এই রটনা কোন্‌ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ? কেউ ভেবে দেখলেন না? কেন কার দ্বারা এমন রটনা করা হল রাজার ছেলের বিরুদ্ধে?


কে যুবরাজ হবে? বর্তমান রাজার জ্যেষ্ঠপুত্র? এইবার ষড়যন্ত্রের মূল প্রশ্ন উঠে এল, নিন্দুকেরা বলল, বর্তমান রাজা তো পান্ডুর গচ্ছিত সিংহাসনের অভিভাবক, অছি মাত্র। তিনি তো আদিতে রাজা ছিলেন না। তবে কি প্রাক্তন রাজার  জ্যেষ্ঠপুত্রকে যুবরাজ ঘোষণা করতে হবে? কিন্তু বর্তমান রাজা এতকাল রাজা হিসাবে কাজ করেছেন, তিনি বংশের জ্যেষ্ঠপুত্র, অতএব ন্যায়ত তার জ্যেষ্ঠপুত্র দুর্যোধন এর সিংহাসন প্রাপ্য। যুক্তির উভমুখী সঙ্কট।

 

নিশ্চিত যে কুন্তী নগরে ঢোকার আগেই যুবরাজ দুর্যোধন এর জন্মতারিখ জেনে গেছেন, কারণ এটা রাজ্যে সবাই জানে। আজন্ম রাজনীতি জানা কুন্তী যুধিষ্ঠির এর বয়সটা ইচ্ছা করে বাড়িয়ে দিলেন কি? আশ্রমের আচার্যরা তাদের কাজকর্ম (অধ্যয়ণ অধ্যাপনা) ছেড়ে কুন্তী'র সঙ্গে আসতে পারে না। কুন্তী'র সঙ্গে পাঠিয়েছিল কোনো তাপসকে অর্থাৎ শিষ্যদের মধ্যে বাছা কাউকে। তারা সাক্ষী দিতে গিয়ে জন্মতারিখ নিয়ে বিতর্ক তুলতে পারে না। আর দুর্যোধন এর জন্মতারিখ তো কমানো বাড়ানোর উপায় নেই, রাজার বড় ছেলের কথা নগরে সবাই আগে থেকে জানে।


আজকের যুগে মানুষ আগেই স্থির করে রেখেছে, পান্ডব মানে ধর্ম, কৌরব মানে অধর্ম। কিন্তু মহাভারত তা বলে না। জনগণের কেউ কেউ যে তাদের পান্ডুপুত্র পরিচয়ে সন্দেহ করেছিল সে নিদর্শন পাওয়া যায়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, মহাভারতেই তাদের জন্মবৃত্তান্ত গোলযোগ প্রসিদ্ধ আছে--- "যদা চিরমৃতঃ পান্ডুঃ কথং তস্যেতি চা পরে" --- অন্য অন্য লোকে বলিল, "বহুকাল অতীত হইল পান্ডু প্রাণত্যাগ করিয়াছেন; ইহারা কিরূপে তদীয় পুত্র হইতে পারেন"?


অত দূরের আশ্রম, যেখানকার খবর ১৭ বছর কেউ পায় নি, সেখান থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল সিংহাসনের হকদার। দুর্যোধনের মনের অবস্থা খারাপ হওয়া কোন অন্যায় নয়, বরং স্বাভাবিক। আপনি ১৫ বছর বয়সে হঠাৎ সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হলে কি ভাবতেন? রেডিমেড ছেলেগুলোকে আসল রাজপুত্র হিসাবে মেনে নিতে হবে। নিজেকে বংশের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে আগন্তককে সকল অধিকার দিতে হবে। আপনি কি আহ্লাদে গদগদ হতেন? তার উপরে জন্মকালে শেয়াল ডাকা বংশনাশকারী --- এই রকম আরোপ যার উপরে হয় সে জানে কি মর্মভেদী আরোপ!


ভীষ্ম বললেন, "আপাতত সকলে অস্ত্র ও রাজনীতি শিখুক, ১৮ বছর বয়স হোক, দেখা যাবে"।

 

ভীষ্ম এটাও বুঝলেন যে নিষ্পাপ শিশু দুর্যোধন এর পাকে চক্রে ভিলেন হওয়া শুরু। এই কারণে তিনি সারা জীবন নিরপেক্ষ থেকেও দুর্যোধন এর পক্ষে থেকেছেন। সেযুগে বামপন্থী নগন্য ছিল, তাই এত জাতের বিভেদ ছিল না। যারা কর্ণ ও একলব্যের দোহাই দিয়ে জাতের বিড়ম্বনা প্রচার করেন, তারা দুর্যোধন-ভীষ্মের এসব বিড়ম্বনা বোঝেন?


দুর্যোধনরা শত ভাই ও যুধিষ্ঠিররা পাঁচ ভাই এর মধ্যে বাল্যক্রীড়া স্বাভাবিক। এই সময়কার কিছু ঘটনা না বললে নয়। ভ্রাতুষ্পুত্র শ্রী সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুবাদ অনুসরণে শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত বিশ্বভারতী প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত অনুবাদগ্রন্থ 'কুরুপান্ডব' গ্রন্থে আছে,

 

"ভীমের বল এত অধিক ছিল যে তাহার পক্ষে যাহা ক্রীড়া, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের পক্ষে তাহা পীড়া হইয়া উঠিল। তাহারা গাছে চড়িলে গাছে পদাঘাত করিয়া তিনি তাহাদিগকে শাখাচিত করিয়া দিতেন, জলক্রীড়াকালে তিনি তাহাদিগকে বলপুবর্ক জলমগ্ন করিতেন, কেশাকষর্ণ করিয়া মাটিতে ফেলিতেন, দুইজনকে পরস্পরের সাহিত নিষ্পেষণ করিতেন, এইরূপে নানা প্রকার উৎপীড়নে তিনি ধৃতরাষ্ট্রদের অপ্রিয় হইয়া উঠিলেন"।

এই অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে দুর্যোধন গোপনে মারণ-বিষ যোগাড় করে ভীমকে খাইয়ে দেয়। সকলের অজান্তে নদীতীরে কয়েকদিন পড়ে থাকে ভীম। কপাল জোরে বেচে ফিরে আসে এবং সেই ঘটনার পর পঞ্চপান্ডব অনেক বেশি সাবধান হয়ে যায়। সেদিন ১৫ বছরের কিশোর দুর্যোধনকে গোপনে কালকুট যোগাড় করে দিয়েছিল কে?

 

আপনারা ডান্ডাগুলি বা ডাংগুলি খেলেছেন? আমি তো খেলেছি। ভারতের অতি প্রাচীন খেলা। কুরু বংশের ১০৬ ভাই এর কেউ কেউ তখন ডাংগুলি খেলছিল। গুলিটা এক শুকনো কুয়োয় পড়ে গেল। বাচ্চারা কি করে গুলি তুলবে ভেবে আকুল। সেই সময় এক
অজ্ঞাতপরিচয় কৃষ্ণবর্ণ কৃশকায় ব্রাহ্মণ একটা তীরে গুলি সামান্য বিদ্ধ করে তার পিছনে আর একটা তীর, দ্বিতীয় তীরের পিছনে আর একটা তীর, এইভাবে বিদ্ধ করতে করতে সবগুলো তীর সমেত গুলিটা কুয়োর বাইরে এনে বাচ্চাদের দিলেন। কেউ ভাবতেই পারে নি কুয়োর বাইরে দাঁড়িয়ে এইভাবে গুলিটা তুলে আনা যায়। রাজকুমাররা সসম্মানে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের পিতামহ ভীষ্মকে আমার এই কাজের কথা জানাও, তিনি'ই আমার গুণের কদর বুঝবেন।

১০১ ভাই এর জায়গায় ১০৬ ভাই এ যে নতুন আন্তঃক্রিয়া তার ঠিক সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছিলেন না কুলগুরু কৃপাচার্য। ভীষ্ম চাইছিলেন একজন প্রকৃত আচার্য --- যে বাচ্চাদের রুলার হবে, ট্রেনার হবে, গাইড হবে। ছেলারা আহত হচ্ছে, কোনও ছেলে সাত দিন নিখোঁজ থাকছে, কি হয়েছিল পরিষ্কার নয়, এমন সব কান্ড ঘটছে, প্রমাণের অভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়া যাচ্ছে না। না বকা যাচ্ছে বাইরে থেকে সদ্য আসা, বাপ-মরা ছেলেদেরকে। অযথা মনোমালিন্য বাড়ছে। এমন সময় ব্রাহ্মণ দ্রোণ এসে সেইসব দুঃখের কথা জানালেন যা আগের ১ নং পর্বে বলেছি। নাতিদের উপযুক্ত আচার্য পেয়ে ভীষ্ম ধন্য হলেন। উভয়ে উভয়ের প্রয়োজন পূরণ করলেন । গুণগ্রাহী ভীষ্ম সাদরে বরণ করে নিলেন নতুন রাজগুরু হিসাবে দ্রোণ'কে।


দ্রোণাচার্য মহামতি ভীষ্মকে বলছেন, "আমার পুত্র অশ্বথামা অতিশয় তেজস্বী। একদা বালক অশ্বথামা ধনীপুত্রদের দুধ খেতে দেখে আমার কাছে এসে কাঁদতে লাগল, তাতে আমি দুঃখে দিশাহারা হলাম । বহুস্থানে চেষ্টা করে কোথাও ধর্ম সঙ্গত উপায়ে পয়স্বিনী গাভী পেলাম না। অশ্বথামা'র সঙ্গী বালকেরা তাকে পিটুলিগোলা খেতে দিলে, দুধ খাচ্ছি মনে করে সে আনন্দে নাচতে লাগল। বালকেরা আমাকে উপহাস করে বললে দ্রোণকে ধিক, যার পুত্র পিটুলিগোলা খেয়ে আনন্দ করে।" (অনুবাদ- রাজশেখর বসু)।

তখন দ্রোণ যায় বাল্যের সতীর্থ দ্রুপদের সঙ্গে দেখা করতে। দ্রুপদ তখন রাজা। বহু কষ্টে বহু অপমান সয়ে মলিনবস্ত্র দরিদ্র তাঁর সামনে পৌঁছাতে পেরে সেখানে আবার অপমানিত হল। বাল্যবন্ধু রাজার কাছে দুঃখের কথা জানিয়ে পেল না একটা দুগ্ধবতী গাই।


ভীষ্মসকাশে দ্রোণ বলছেন,
"আমি তাকে সখা বলে সম্বোধন করলে দ্রুপদ বলেন, ব্রাহ্মণ তোমার বুদ্ধি অমার্জিত তাই আমাকে সখা বলছ, সমানে সমানে বন্ধুত্ব হয়। ব্রাহ্মন আর অব্রাহ্মন, রথী আর অরথী, প্রবল প্রতাপ রাজা আর শ্রীহীন দরিত্র --- এদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না"। ভ্রপদের শেষ বাক্যটি লক্ষ্য
করুন --- এইভাবে ব্রাহ্মণ এর নিত্য অসম্মান আর দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার চিরকাল চলছে। এ যুগেও যেমন চলে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এর পর দ্রোণ কুরুদেশে ভাগ্যান্বেষণে এসেছিলেন এবং অশ্বথামার দুঃখই তাকে সে তাড়ণা দিয়েছিল। (মহাভারত, আদিপর্ব, অনুবাদ- রাজশেখর বসু)।

নাতিদের উপযুক্ত আচার্য পেয়ে ভীষ্ম ধন্য হলেন। উভয়ে উভয়ের প্রয়োজন পূরণ করলেন। কৃপ যথেষ্ট দক্ষ অস্ত্রবিদ এবং অস্ত্রাচার্য তিনি যা পরে মহাযুদ্ধে প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু বিচক্ষণ ভীষ্মের বুঝতে অসুবিধা হয় নি, গুরু হিসাবে দ্রোণ হবেন কিংবদন্তীসম। কাজেই উভয় গুরুই রইলেন। ভীষ্ম জানালেন, "হে বিপ্রর্ষি, অনুগ্রহপূর্বক এখানেই অবস্থিতি করুন। আমাদের ভাগ্যবলে আপনি এ সময় উপস্থিত হইয়াছেন। এ রাজ্যের সমস্ত ভোগ্যবস্ত অতঃপর আপনারই অধীন জানিবেন"। (কুরুপান্ডব--রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

দারিদ্র্য দ্রোণকে অজস্র অপমান দিয়েছে। একমাত্র ছেলে না খেয়ে থেকেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অপমান তিনি পেয়েছেন পাঞ্চাল রাজসভায় বাল্যবন্ধু দ্রপদ এর কাছে। একমাত্র ভীষ্ম জানতেন, কুরুরাজপুত্রদের শিক্ষাশেষে দক্ষিনা হিসাবে দ্রোণ চাইবেন, অর্ধেক পাঞ্চাল রাজ্য ও বন্দী জীবিত দ্রুপদ! পাঞ্চাল অতি শক্তিশালী রাজ্য। এর সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও সামরিক অভিঘাত ভীষ্মের অজানা নয়। তবু দ্রোণ এর মত মহাপুরুষ আচার্যকে পেয়ে হারানো তাঁর অকল্পনীয় । কারণ-


দুর্লভং এয়মেবৈত দৈবানুগ্রহহেতুকম
মনুষ্যত্বং মুমুক্ষুত্বং মহাপুরুষংশ্রয়ঃ।


মনুষ্যত্ব, নির্বাণ প্রচেষ্টা, মহাপুরুষের আশ্রয় এই তিনটি জগতে সর্বাধিক দুর্লভ। শেষেরটি তিনি হারাবেন না। দ্রোণকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব দিয়ে মেনে নিলেন। তবে আচার্য সান্দিপণি'র গুরুকুল ছিল ধনী দরিদ্র সকলের জন্য, দ্রোণ এর এই গুরুকুল হল অভিজাতদের জন্য।

 

কুরুরাজ এর অভিভাবক ভীষ্মের পৃষ্ঠপোষকতায় পালিত, দ্রোণের সেই গুরুকুলে ধৃতরাষ্ট্রের সারথী অধিরথ এর পুত্র কর্ণ এল। বৃষ্ণি, ভোজ, অন্ধক, কুকুর, চেদী ইত্যাদি প্রজাতন্ত্রের গণমুখ্য-পুত্র এবং প্যাঁচাল, কেকয়, রাজপুত্ররা এলেন। রাজপুত্রদের যার যা সামর্থ্য সেইমত দ্রোণ তাদের বিকাশ ঘটালেন। রাজপুত্রদের মধ্যে দুঃশাসন, বিকর্ণ, দুর্মর্যণ, ভীম, দুর্যোধন, অর্জুন, নকুল, চেকিতান, সাত্যকি, শিশুপাল ইত্যাদি এক একজন এক এক ক্ষেত্রে প্রকট হলেন। সেইমত সেই বিষয়ে তাদের বিশেষ শিক্ষা দেওয়া হল। ভীম হল সর্বাত্মক
যোদ্ধা। কিন্তু সবার বেশি সময় নিত অতি আগ্রহী অতি নিষ্ঠাবান শিষ্য অর্জুন। সে সর্বগ্রাসী প্রতিভা।

 

দ্রোণ এর নিজের তেজস্বী প্রতিভাবান ছেলে অশ্বথামাকে তার উপযুক্ত বিশেষ ট্রেনিং দেওয়ার সময় হত না। দ্রোণ নিজের বিশ্রাম এর সময় বন্ধ করে সেই সময়ে অশ্ব্থামাকে শিক্ষা দেওয়া শুরু করলেন। অর্জুন সেই সময়েও এসে গেল। কোথায় যাচ্ছ গোপাল? সঙ্গে যাচ্ছে কপাল। দ্রোণ নিজের ও ছেলের রাতের ঘুম বন্ধ করে তাকে শিক্ষা দিলেন। আগে ছেলে ভাল খেতে পেত না। এখন খেতে পেল, কিন্তু ঘুম কমে গেল। প্রতিভা তার অর্জুনের থেকে বেশিই ছিল। প্রতিভার তাড়নায় অশ্বথামা ঘুমানো ছেড়ে অনুশীলন করতে লাগল। তার বেশির ভাগ অনুশীলন রাতে। রাতের অনুশীলন, কালে অশ্বথামাকে নিশাভেদী দৃষ্টিসম্পন্ন ও নৈশযুদ্ধে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অপরাজেয় করেছিল।

সেকালে শাসনব্যবস্থা ছিল সচিবায়ত্ব। যদিও বিচার-বিমর্ষে শেষ সিদ্ধান্ত নিতেন রাজা। ভীষ্ম, দ্রোণ উভয়ে আত্মস্বার্থে কিছু করতেন না। করতেন পরার্থে। সেকালে রাজা সীমাহীণ ক্ষমতার অধিকারী ছিল না। ভীষ্ম, দ্রোণ, বিদুর ইত্যাদি অমাত্যদের সীমিত স্বাধীন ক্ষমতা ছিল। তারা আইনগত ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হলেও নিজ ক্ষমতার স্বার্থে কোনোদিন কিছু করেন নি। ভীষ্ম গুপ্তচরের মাধ্যমে আগেই জেনেছিলেন যে শিখন্ডী ভীষ্মের মৃত্যুর জন্য ও ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণ এর মৃত্যুর জন্য তৈরী হচ্ছেন। দ্রোণও এই সংবাদ জানতেন। উদ্যোগপর্বে ভীষ্ম এটা উল্লেখ করেছেন। তাঁরা সব জেনেশুনে শিখন্ডী ও ধৃষ্টদ্যুম্নকে গুরুকুলে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

 

চলবে বাঁধা গত এর বাইরে মহাভারতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ণ। এই দ্রোণ এর গুরুকুলে একলব্য নিয়ে যে অপপ্রচার তার জবাব পরের পর্বে।

 পরিচ্ছেদ ৪ 

জরাসন্ধের ভয় ও একলব্য

 

এই সময় এলেন অস্ত্রশিক্ষা চাইতে জরাসন্ধ-পক্ষীয় সামন্ত নিষধ'রাজ হিরণ্যধনূর ছেলে একলব্য (মনে রাখবেন, নিষাদ নয়, নিষধ। মানচিত্র দ্রষ্টব্য)।


কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে উভয়পক্ষ মিলিয়ে ছিল ১৮ অক্ষৌহিনী সেনা। আর জরাসন্ধের একার ছিল ২৩ অক্ষৌহিনী সেনা। জরাসন্ধ সেই সময়ে ভারতের সকল রাজার ত্রাস। কৃষ্ণ কংসকে মেরে সাময়িকভাবে মথুরা অধিকার করলেও রাখতে পারেন নি। জরাসন্ধের সামরিক চাপে সমগ্র যদুকুল মথুরা ছেড়ে দ্বারকায় চলে যায়।

 

হস্তীনাপুরে রাজা অন্ধ, রাজপুত্র বালক। হস্তীনাপুরকে অতিকষ্টে মগধের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য রেখে চলতে হত। পান্ডুর মৃত্যুসংবাদে শত্রুদের স্পর্ধা বেড়েছিল নিশ্চয়। সেই জরাসন্ধের লোককে মহাবীর তৈরী করা মানে সম্মান দাতা অন্নদাতা হস্তীনাপুরকে বিপন্ন করা। Political এবং strategic pawn লেলিয়ে দেওয়া ছিল জরাসন্ধের স্বভাব। জরাসন্ধের গুপ্তচর হয়ে এসে কুরুরাজ্যের অনিষ্ট করা একলব্যের অভিসন্ধি হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এইসব কারণে দ্রোণাচার্য বাধ্য ছিলেন একলব্যকে ফিরিয়ে দিতে।


এর পর হঠাৎ একদিন চোখে পড়লো একলব্যের untrained skill। এটি একটি মোক্ষম ব্যাসকুট। রাজপুত্রদের সঙ্গে থাকা একটি কুকুর তার অস্ত্রাভ্যাসের সময় বিরক্ত করলে সে সাতটি তীর মেরে কুকুরের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাঁর technique কিছুটা সন্দেহজনক (আর হয়তো খুব keen sense of archery উদাহরণ নাও হতে পারে - দ্রোণাচার্য স্বয়ং তীর দিয়ে কুয়ো থেকে গুলি উদ্ধার করেছিলেন। গুরু দ্রোণ এক মহাপুরুষ। কুমীরের গ্রাসে প্রাণ সংশয়, তখনো শিষ্যকে অনুশীলন করাচ্ছেন, "অর্জুন, অর্জুন, কুমীরটার কোনো ক্ষতি না করে আমাকে কুমীরের মুখ থেকে বার কর তো দেখি"। অর্জুন তীর দিয়ে কুমীরের চোয়াল ফাঁক রেখে গুরুকে উদ্ধার করেছিলেন। ) একটা কুকুরকে না মেরে চুপ করাতে, যেখানে একটি তীর যথেষ্ট, একলব্য সেখানে সাতটি তীর মারে। এতে প্রমাণ হয়েছে সে ক্রোধ সামলাতে পারে না অথবা অর্জনের সমান দক্ষ নয়।


অনুশীলন এর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া: তবু সে দ্রোণকে গুরু মেনে নিয়েছে তখন তাকে রক্ষার একটা দায় দ্রোণ এর থাকে। আবার বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা শরক্ষেপন খুব দক্ষতার পরিচয় না হতে পারে, দ্রোণ চাইছিলেন সে যেন শরক্ষেপনে তর্জনীর ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হয়। বলা হয় যে দ্রোণ একলব্যের ডানহাতের অঙ্গুষ্ঠ দক্ষিণা নিয়েছিলেন। এটা হয়তো অঙ্গুলি নয়, অঙ্গুলিত্রাণ, যেটা আঙুলে বেধে অনুশীলন করা হয়। গুরু দ্রোণ দেখেছিলেন যে সে অভ্যাসের সময় বুড়ো আঙুলের উপর জোর দিচ্ছে। দ্রোণ তাকে সংশোধন করার জন্যই ডানহাতের বুড়ো আঙুলের অঙ্গুলিত্র'টি গুরুদক্ষিনা হিসাবে দান করতে বলেন। অঙ্গুলিত্র পরা প্রথার প্রমাণ আছে, "অনন্তর মাহাবীর্য রাজপুত্রগণ অঙ্গুলিতে অঙ্গুলিত্র বন্ধনপূর্বক বদ্ধতূণ ও বদ্ধপরিকর হইয়া যুধিষ্ঠিরকে অগ্রে করিয়া জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠক্রমে হস্তে ধনুর্ধারণপূর্বক রঙ্গস্থলে প্রবেশ করিলেন" (কুরুপান্ডব- সম্পাদনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। মহাভারতে এটাও উল্লেখ আছে যে, গুরুদক্ষিনার পরে তখনই দ্রোণ একলব্যকে দিয়ে দুবার শরনিক্ষেপ করান। বুড়ো আঙুল কর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরনিক্ষেপ করানো তো হতে পারে না। আসলে বুড়ো আঙুলের অঙ্গুলিত্র কেড়ে নিয়ে শরনিক্ষেপ করানো হল। স্বাভাবিক যে এতদিনকার অভ্যস্ত বুড়ো আঙুল এড়িয়ে হঠাৎ করে তর্জনীতে শরনিক্ষেপ প্রথম দুবার ভাল হয় নি। দ্রোণ জানতেন, একলব্যের উপর ভীষ্মের রোষ গোপনে নেমে আসতে পারে। ভীষ্মের দেওয়া আসন্ন শাস্তি আটকাতেই ঐ বুড়ো আঙুল গুরুদক্ষিণা গ্রহণের ছল। এতে করে কুরুরাজ অথবা ভীষ্মের রোষ থেকে তাকে বাঁচানো হল। আবার তার অনুশীলণ এর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হল। প্রতিভাবান গুরু প্রতিভাবান শিষ্যের সংশোধন এর জন্য এরকম শাস্তি দিয়েছেন তার আরো নজির আছে। কথিত আছে, একলব্য ডান হাতেই শরনিক্ষেপ করতেন এবং অসিচালনা করতেন বাঁ-হাতে।

 

এখানে অন্ধের মত শিষ্যের জাত হাতড়াবেন না। ব্রাহ্মণ শিষ্যকে তাড়ানোর নজির আছে। খষি বৈশম্পায়ন তাঁর ভাগিনেয় তথা শ্রেষ্ঠ শিষ্য ব্রাহ্মণ যাজ্ঞবল্ক্যকে আশ্রম থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। তাতে পরিণামে শিষ্যের উন্নতি হয়েছিল।

 

আর একটা কথা। আর্য, প্রাক-আর্য, অনার্য, এইসব মিথ্যা বুলি আওড়াবেন না। ব্রাহ্মণ গুরু দ্রোণ নিজেই কৃষ্ণবর্ণ কৃশকায় ছিলেন। বৈজ্ঞানিক অর্থে নৃতত্ত্বে আর্য অনার্য বলে কিছু নেই। দেব-দৈত্যের একই পিতা পিতামহ মাতামহী।

 পরিচ্ছেদ ৫ 

কর্ণের রঙ্গভূমিতে প্রবেশ, অঙ্গদেশের সমস্যা ও জতুগৃহ

 

একটা জোরালো প্রোপাগান্ডা হচ্ছে দুর্যোধনের যাবতীয় কুকর্মের মূল মন্ত্রণাদাতা হচ্ছে শকুনি। চলুন একবার অন্ততঃ কালোকে কালো বলি।

ভীমকে বিষ খাওয়ানোটা বসুসেন কর্ণেরই মন্ত্রণা। এখানে শকুনি নেই। ১৫ বছরের দুর্যোধনকে কালকুট বিষ এনে দিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে দিয়েছিল ২৩ বছরের কর্ণ। কর্ণ কুন্তীর কিশোরী কালের সন্তান। মহাভারতের ঘটনাবলী থেকে অনুমান করা যায় সে দুর্যোধন অপেক্ষা ৭ থেকে ৯ বছরের বড়। দ্রোণের গুরুকুল প্রতিষ্ঠার আগেই কর্ণের সঙ্গে দুর্যোধনের সখ্য। ভুলে যাবেন না, দুর্যোধনের পিতার সারথির সন্তান কর্ণ। শুধু তাই নয়, দুর্যোধনের সারথি সত্যসেনের ভগিনী হল বৃষালী। আর এই বৃষালীর সঙ্গেই কর্ণের পরিচয় --> প্রণয় --> পরিণয় : সব বাল্যকালে। পরে কর্ণ আরো বিয়ে করে।

 

বস্তত শকুনি এই সময় প্রায় পুরোটাই গান্ধারে ছিল। ১৫ বছরে দুর্যোধনের সঙ্গে ছিল কেবল কর্ণ- ২৩ বছরের কর্ণ। পরবর্তীতে ভূমিগ্রস্ত রথে মরার আগে ধর্মের দোহাই পাড়া রক্তাক্ত কর্ণকে একথা স্মরণ করালেন পার্থসারথী। বিষ তো কর্ণ নিজের হাতে ভীমকে দেয় নি, দুর্নাম হয়েছে দুর্যোধনের। দুর্যোধনের মত ছোট ছেলেরা ভীমের বিশাল বপু নদীর ভিতরে ফেলতে পারে নি। বেশি সময় নিলে লোকের চোখে পড়ত। নদীর ধারে জলে ফেলে এসেছিল। ছোট ছেলের অভিজ্ঞতা আর কতটুকু। জলের সংস্পর্শে বিষ লঘু হয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। মনে করে দেখুন জলের সংস্পর্শে বিষ লঘু হয় বলে ব্রিটিশ আমলে সাপে কাটা দেহ জলে ভাসিয়ে দেওয়া হত। আর যদি এই ব্যাখ্যা অবৈজ্ঞানিক হয়, তাহলেও কপালে বাঁচা ছিল, ভীম বেঁচে গেছে। কর্ণের মন্ত্রণায় দুর্যোধন দোষী হয়েছে। হতে পারে শত্রুতা বাড়ানোর জন্যই কর্ণ এই মন্ত্রণা দিয়েছিল।

 

যাহোক, এখনো অবধি কর্ণের জীবনকাহিনী এরকম-- কর্ণ দুর্যোধনের মাধ্যমে ভীমকে বিষ দিল, কর্ণ দ্রোনের কাছে চার বছর পড়াশোনা করল, তার পর বিয়ে করে পড়াশুনা ছেড়ে দিল, মুনি পরশুরামের কাছে গেল নতুন পরিচয়ে নতুন করে অস্ত্রশিক্ষা করতে, দু বছর সেখানে শিখল। ইতিমধ্যে ৮ বছরে দ্রোণ তার শিক্ষাক্রম সমাপ্ত করে রাজপুত্রদের শিক্ষা-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছেন রঙ্গভূমিতে। এই শিক্ষাপ্রদর্শনীতে কর্ণ এল চালাকি করার উপযুক্ত একটা সময়ে। রঙ্গভূমির বিচিত্রানুষ্ঠান যখন সবে শেষ তখন কর্ণ সশব্দে সেখানে ঢুকে হল্লা করল, অর্জুনের দেখানো প্রদর্শনীগুলো দেখালো ও অর্জুনের সঙ্গে সমান হওয়ার স্পর্ধা ঘোষণা করল। যদিও কর্ণ অর্জুনের থেকে প্রায় ৯ বছরের বড়, এটা তখন কেউ খেয়াল করল না। আর সেটা নিছক কুরুরাজপুত্রদের শিক্ষায় কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য রঙ্গমঞ্চ, এ যুক্তি পান্ডবরা এবং আচার্য কৃপ (ইনিই দুর্যোধনকে রাজনীতি শিক্ষা দিয়েছেন) দেখিয়েছিলেন বটে, সেটা মিথ্যাও নয়।

 

মহাভারতে আছে দুর্যোধন এই সময় রঙ্গভূমিতে অঙ্গদেশের রাজা হিসাবে কর্ণের অভিষেক করান। এই মহাভারতে আবার আছে, আরো প্রায় ১৮ বছর পরে, সেটা যুধিষ্ঠিরের রাজ্যাভিষেকের ১৩ বছর পর ভীম, রাজসুয় যজ্ঞের আগে, অঙ্গদেশ জয় করে কর নেন। আরো প্রায় ১২ বছর পরে দুর্যোধনের বৈষ্ণব যজ্ঞের আগে কর্ণের দিগ্বিজয় যাত্রায় কর্ণ অঙ্গদেশ জয় করেন। তাহলে? কোনটা ঠিক? কর্ণের অভিষেকের সময় দুর্যোধন একটা রাজকুমার, যুবরাজও নয়। আইনত তার কুরুরাজ্যের কোনো ভূমির উপর কোনো দখল বা অধিকার ছিল না। অঙ্গদেশ ভারতবর্ষের পূর্বপ্রান্তে, ভারতবর্ষের পশ্চিম দিকে হস্তিনাপুর, মাঝে শক্তিশালী পাঞ্চাল ও অতি শক্তিশালী জরাসন্ধের অধিকার ডিঙিয়ে অঙ্গে কৌরব রাজপুত্রের কোনো অধিকার থাকা সম্ভব না। রাজপুত্রদের শিক্ষা-কৃতিত্ব-প্রদর্শনের রঙ্গভূমিতে কর্ণের অঙ্গরাজ হিসাবে অভিষেক নিছক -- একটা পুতুল খেলা, হস্তিনাপুরের ঘরোয়া কূটনীতি যা ভীমার্জুনের ওপর দুর্যোধনের খবরদারি, কর্ণের জন্য post-dated cheque এবং কর্ণকে একটা উপাধিদান, অর্জুনের প্রতিস্পর্ধী একজন মিত্র যোগাড় করে নেওয়া। ইত্যাদি। 'অঙ্গরাজ' উপাধিটা কর্ণের দরকার ছিল, রাজ্যটা নয়। এর জন্য সে ভবিষ্যতে কৌরব রাজসভায় উপস্থিত থাকতে পারবে। ঘোষিত হল অঙ্গরাজ কর্ণ। এর মধ্যে বৃষালীর কোল আলো করে একজন দুজন করে নতুন অতিথি আসছে। সুখী জীবন। তবে এই সফল গৃহস্থ জীবনে অঙ্গরাজ্য বা রাজ্যের সেনাবাহিনীর কোন স্থান নেই।

রঙ্গভূমিতে দ্রোণ যখন ঘোষণা করেছেন তার কারিকুলাম কমপ্লিট, তখন গুরুদক্ষিণা দিতে কুরু পাঞ্চাল যুদ্ধটা করতে হয়। স্বঘোষিত বড়যোদ্ধা সহজাত কবচকুগুলধারী কর্ণ দুর্যোধনকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুপদের বাণবর্ষণের সামনে টিকতে না পেরে পালাল বাহিনীর পিছনে।দ্রুপদকে এর পর বন্দী করল অর্জুন। এই যদি শুরু হয় তাহলে আপাতত কর্ণার্জুন = ০-১।

 

এর পরে, মহাভারতকার জানিয়েছেন জতুগৃহে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পান্ডবদের পুড়িয়ে মারার মন্ত্রণা শকুনি ও কর্ণ উভয়ের। লোকের মুখে বারণাবত তীর্থের খুব প্রশংসা শুনে যুধিষ্ঠিরের যাওয়া ইচ্ছা হয়। আসলে সেই উদ্দেশ্যেই তাকে শোনান হয়। বারণাবত নামক শিব তীর্থে কুন্তী পঞ্চপুত্রসহ একবছর বাস করেছিল। বিদুর জানতে পেরেছিল পান্ডবদের প্ররোচনা দিয়ে ইচ্ছাকৃত বারণাবতে পাঠান হয়-- তাদের বসবাসের জন্য জতুগৃহ নির্মাণ করে। বিদুর ও যুধিষ্ঠির উভয়ে সাংকেতিক লিপি লিখতে ও পড়তে পারতেন। অভিজ্ঞ হিতাকাঙ্ক্ষী বিদুর, একজন বিশ্বাসী 'খনক'এর হাতে, সাংকেতিক লিপিতে যুধিষ্ঠিরকে কিছু পরামর্শ দিয়েছিলেন। "জঙ্গলে আগুন লাগলে গর্তবাসী ইঁদুর নিরাপদে পলায়ণ করে" এই জাতীয়।


আগে নিশ্চিন্তে বাস করছে-- দুর্যোধনের এই রকম বিশ্বাস উৎপাদন করতে হবে। তার মধ্যে গোপন সুড়ঙ্গপথ তৈরী করতে হবে এবং পালাতে হবে। সুড়ঙ্গ গিয়ে শেষ হবে যমুনার কিনারে। নৌকা করে যমুনা পার হলেই দুর্যোধনের গুপ্তঘাতকদের আওতার বাইরে।মধ্যরাত্রে নৌকা নিয়ে গোপনে অপেক্ষা করবে মাঝি যে বিদুরের বিশ্বস্ত দূত। (সে যুগে ছিল যন্ত্রচালিত নৌকা !!-- "সর্ববাতসহাং নাবং যন্ত্রযুক্তাং পতাকীনিম")!

 

সেখানে হবু রাজমাতা কুন্তী কি করল? পঞ্চপুত্রসহ এক নিষাদবধূকে পুড়তে রেখে দিয়ে এসেছিল। পালালে তো শুধু নিজেদের প্রাণ বাঁচানো হত, দুর্যোধনকে ধোকা দেওয়া হত না। কাজেই এই নিরপরাধ ৬ জনকে পুড়িয়ে মারতে হল।

 

কুন্তী সেদিন গোটা গ্রাম ডেকে পানভোজন করালেন। রাজশেখর বসু তার অনুবাদে জানাচ্ছেন, "এক নিষাদ স্ত্রী তার পাঁচ পুত্রকে নিয়ে খেতে এসেছিল, সে পুত্রদের সঙ্গে প্রচুর মদ্যপান করে মৃতপ্রায় হয়ে গৃহমধ্যেই নিদ্রা মগ্ন হল। সকলে সুষুপ্ত হলে ভীম পুরোচনের শয়নগৃহে, জতুগৃহের দ্বারে এবং চতুর্দিকে আগুন লাগিয়ে দিলেন। পঞ্চপাপ্তব ও কুন্তী সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলেন"!


উপরের লেখাটা চোখ কচলে পড়ুন -- "প্রচুর মদ্যপান করে মৃতপ্রায়" লোকে যে কোনো বাড়ীতে শুয়ে আগুনে পুড়ে মারা যেতে পারে। এর জন্য লাক্ষা দিয়ে তৈরি জতুগৃহ অপরিহার্য নয়। আরো মিলিয়ে দেখুন "সকলে সুষুপ্ত হলে... আগুণ লাগিয়ে দিলেন"! কি ঠান্ডা মাথায় কি ভয়ংকর খুনী পরিকল্পনা, কত নিখুঁত কাজ!!!

 

আর একটা ব্যাপার ভীমকে যুধিষ্ঠির ও কুন্তী যা করতে আদেশ দিয়েছেন, ভীম তা করেছেন। এই নিরপরাধ গণ-হত্যার পরিকল্পনাকার কুন্তী ও যুধিষ্ঠির। সেই যুধিষ্ঠির, তাঁকে ধর্ম, আর ধর্মরাজ বলে ডাকা হয়।

 

পঞ্চপান্ডব জতুগৃহ থেকে আত্মরক্ষার জন্য ইঁদুরের মত পালিয়েছিল। কিন্তু এর অতিরিক্ত, তারা দুর্যোধনকে ফাঁকি দিতে পাঁচটি শিশুপুত্রসহ এক নিষাদজননীকে ভুরিভোজ ও অতিরিক্ত মাদক খাইয়ে সেখানে ঘুমন্ত রেখে পুড়িয়ে মেরেছিল। সে কথা মহাভারতকার জানিয়েছেন। কেটে গেল সম্পূর্ণ উপেক্ষিত সার্থক সৌপ্তিক রাত (ঘুমন্তদের রাত)। সে রাতের ঘুমন্ত গোটা গ্রামের সবাই ছিল চূড়ান্ত মাদকাচ্ছন্ন। সে রাতের ঘুমন্তদের রথ-বর্ম-শস্ত্র-অস্ত্র ছিল না, অসামরিক লোকজন, আর হ্যাঁ, সহানুভূতির দৃষ্টিতে শিশু।

 

কিন্তু ভারতীয় কাব্য রসিক জনতা? এরা কেন কুন্তী-যুধিষ্টিরকে ধিক্কার দিলেন না? কেন এদের কোনো অভিশাপ প্রাপ্য নয়? হ্যাঁ, পুরোচন, ৫ টা শিশু আর তার মা'কে মাদকাচ্ছন্ন ঘুমন্ত পুড়িয়ে মারলে কুন্তী-যুধিষ্টির এর কোনো দোষ আজকাল কেউ আলোচনা করে না।

 

এযুগেরই এক শিক্ষিত বাঙালীর কাছে শুনেছি, এটা আনুষঙ্গিক অপঘাত (co-lateral damage)। বড় মানুষের জন্য ছোটলোকের বলি চড়ানো! এ তো করতেই হয়। হায় রে! ভারতীয় জনতার মূল্যবোধ!! সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে।


বহুবছর পরে, কুরুক্ষেত্র মহাসমর পার করার পরে নেমে এলো বিধাতার দন্ড, কাব্যিক ন্যায়বিচার --> সৌপ্তিক পর্ব।

 

মহাভারত মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাসের লেখা বলে লোকের ধারণা। সে আমলে গাথা-সংকলক সকলকেই ব্যাস বলা হত। কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস মূল আখ্যানের একটি চরিত্র। মূল মহাভারতকে ইতিহাস বলা হয়। এটা রাজাদের বংশক্রম নয়, সাধারণ মানুষের ইতিকথা। মহাভারতের রচনাকাল বঙ্কিমচন্দ্রের মতে খৃষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতক, কোলব্রুকের মতে চতুর্দশ শতক। মহাভারতের আধুনিক ক্রিটিক্যাল এডিশনে স্পষ্ট বলা না হলেও মোটামুটি আরও দু'শ বছর পিছিয়ে ধরা হয়েছে রচনাকাল। যে ইতিহাস সকল জ্ঞাতব্য বিষয়কে অঙ্গীভূত করে, এই অর্থে একে পঞ্চম বেদও বলা হত। সেহেতু অলৌকিক কোনো কিছু এই বইতে না থাকার কথা, কিন্তু আছে। বহুধা সম্প্রসারিত অবস্থায় যে মহাভারত আমরা পেয়েছি তাতে কতটুকু মূল, কতটুকু প্রক্ষেপ, নির্ণয় করা অসম্ভব না হলেও ভীষণ শ্রমসাধ্য। কিন্ত কিছু অসঙ্গতি (অলৌকিকতা) দেখে তাকে অনৈতিহাসিক বলে সন্দেহ করা নিতান্ত একপেশে মনোভাব। ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে তেমনই একটি "ইতিহাস এর উপেক্ষিত উপাদান"।

 পরিচ্ছেদ ৬ 

ইতিহাসের উপেক্ষিত উপাদান

 

দ্রোণ ও একলব্যের মধ্যে যা হয়েছিল তা রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক আঙ্গিকে উভয়ে তখন পরিস্থিতির শিকার। একলব্য কখনো দ্রোণের প্রতি শ্রদ্ধা হারান নি। কিন্তু তার ভাইবন্ধুদের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা প্রবল হয়েছিল। দৃঢ়চেতা একলব্য রাজী হয়নি দ্রোণ এর বিরুদ্ধে যেতে। দ্রোণের গুরুদক্ষিণায় হেয় হয়ে দ্রুপদও দ্রোণবধে সমর্থ অপত্য চাইলেন। সত্যজিৎ ও শিখন্ডী আছে, কিন্তু তাদের উপর ভরসা হল না। "নাস্তি শ্রেষ্ঠমপত্যং মে অপি নিত্যমচিন্তয়েৎ"! দ্রোণ তাকে অর্ধেক রাজত্ব ও প্রাণ দান করেছে। কিন্তু আমার সন্তানরা শ্রেষ্ঠ নয়, এই চিন্তায় তিনি মরে যাচ্ছেন।

 

দ্রুপদ রাজার আমন্ত্রণে পুত্রেষ্টি যজ্ঞে একলব্য হাজির ছিলেন। যজ্ঞকালে আবির্ভূত কুমারকে দেখে একলব্য চমকে উঠেছিলেন সেদিন। সে যে তার অনুজ। বরাবরই জেদি প্রকৃতির। প্রতিশোধের শপথ নিয়ে সে নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছিল, তখন তিনি তাকে অযথা ঝুঁকি না নেওয়ার শপথটাও করিয়েছিলেন। দ্রোণকে যুদ্ধে হারানো অসম্ভব। জানতেন প্রগলভ সহোদর একদিন প্রীতির টানে সতর্ক হয়ে ফিরে আসবে। সেই প্রথম দ্রুপদের যজ্ঞে টের পেয়েছিলেন, ফিরে আসবে না বুদ্ধিমান ভাই।


কিন্তু সঙ্গে ওটা কে? কে? কি আশ্চর্য সেই হারিয়ে যাওয়া বাল্যবন্ধু কৃষ্ণা। তাদের জাতির সবাই কালো, কিন্তু এ যেন পালিশ করা কালো, তাই সবাই বলতো কৃষ্ণা, আসল নামটাই তার ভুলে গেছে সবাই। সেও এসেছে প্রতিশোধ নিতে! আজন্ম মন্ত্রগুপ্তিতে অভ্যস্ত একলব্যের কোনো আবেগ নেই। কিন্তু এই মেয়েটি, এ তো অতি উগ্র। মুখরা। তবে যুক্তিপরায়ণ। কি করবে কে জানে। ভাবুক হয়ে নিঃশব্দে সরে গেলেন একলব্য।


পাঠকের নতুন মনে হচ্ছে এই বর্ণনা? হ্যাঁ। আমি জানি এ প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ। কারণ কি জানেন- যজ্ঞকুন্ডের আগুন থেকে মহাপুরোহিত যাজ-উপযাজ একেবারে শিখন্ডীর সমবয়স্ক পরিপূর্ণ যুবক-যুবতী দুজনকে জন্ম দিলেন। অসম্ভব। আসলে যজ্ঞে পূর্ণাহুতির একটু আগে পুরোহিত যাজ দ্রুপদের রাণীকে ডাকছেন, "পৃষতি! মিথুনং ত্বামুপস্থিতম"- জন্ম নয়, হে পৃষত-কুলবধূ, উপস্থিত হয়েছে যুগলে।


কিন্তু যজ্ঞ তো কয়েকঘন্টা ধরে আগুন জ্বালানো, ক্রমাগত নানাপ্রকার সমিধ (বহু জাতের শুকনো কাঠ, মাংস, ঘৃত ইত্যাদি) দিয়ে অজস্র রকমের ধোঁয়া ও অজস্র শিখা উৎপন্ন করা। তার সাথে অবিরত মনমুগ্ধকর মন্ত্রোচ্চারণ, ছন্দোবদ্ধ আবৃত্তি। স্বাভাবিক যে সকলে স্থির দৃষ্টিতে তা নিখুঁতভাবে দেখে নি। দ্রুপদ-পরিবারের সবার চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল, নানাপ্রকার সুবিস্তৃত ধূমকুন্ডলীমালায় তখন চতুর্দিক আচ্ছন্ন। ঠিক এইভাষায় যজ্ঞের বর্ণনা আমি প্রচুর পড়েছি। রাজার পুত্রেষ্টি যজ্ঞ বলে কথা। এইসবের আড়ালে যজ্ঞের ভাঁড়ার থেকে আগুনের চোখ ধাঁধানো শিখা ও ধোঁয়া'র মধ্য দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এলেন ধৃতিলব্য ও কৃষ্ণা।


ধৃতিলব্য দাদার মত ভালমানুষ ছিলেন না। দাদার অবিচারের প্রতিশোধ নিতে তিনি চাইছিলেন নতুন কোনো রাজপরিচয়ে দ্রোণের বিদ্যা শিখে দ্রোণকে মাৎ করা। যাজ-উপযাজ তাকে পাঞ্চালরাজের অগ্নিসম্ভব পুত্র হওয়ার গৌরব দিয়ে দ্রুপদের কাছ থেকে অজস্র গোধন উপহার পেল। আর রাজপুত্র চাইলেন দ্রুপদের বাল্যসখার পুত্র হিসাবে দ্রোণের কাছ থেকে যুদ্ধবিদ্যার উচ্চশিক্ষা। দ্রোণ ব্রাহ্মণ, এবার দ্রুপদের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারলেন না, ব্রাহ্মণের যা কাজ। উচ্চশিক্ষা পেল ধৃষ্টদ্যুম্ন।


সেকালে যজ্ঞাগ্নিকে সাক্ষী রেখে সন্তান বা কোনোকিছু আপন বলে গ্রহন করার নিয়ম ছিল। তাতে সাক্ষ্য হিসাবে কুটুম্ব-বান্ধবাদি নিমন্ত্রিত হত। এ যুগেও যেমন যজ্ঞাগ্নিকে সাক্ষী রেখে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে বরণ করে। যাবতীয় পুত্রেষ্টি যজ্ঞ আসলে এইরকমই। মনে রাখা দরকার, মহাপ্রাচীন এই ঘটনাগুলোর সময় লিখিত হওয়ার বহু পূর্বের। জীবন তখন অনেক সহজ সারল্যে ভরা, বিশ্বাস অনেক গভীর। পরবর্তী কালে কবিরা অলৌকিকত্ব আরোপ করার জন্য রহস্য তৈরী করেন। ভারতকথার এই উপেক্ষিত উপাদান খেয়াল না করে "বাবার হল আবার জ্বর সারবে ঔষুধে" এইটুকু সকলে মুখস্থ করেছেন।


ছোটতে যাদের ভাগ্য ভাল থাকে তাদের বরাবরই ভাল হয়। বিষ খাওয়ালে শতগুণ শক্তিমান হয়। বারণাবত থেকে গোপনে পালিয়ে পান্ডবরা বিভিন্ন রাজ্যে গ্রামে গ্রামে ঘুরছিল। তখন খোঁজ পায় পাঞ্চাল রাজকুমারীর সয়ম্বর হচ্ছে। রাজকুলে ক্ষত্রিয় শিক্ষা তারা পেয়েছেন। স্পর্ধা তো তাদেরও আছে। দরিদ্র ব্রাহ্মণ বেশেই তারা সয়ম্বর সভায় গেলেন।


সেখানে অর্জুন অত্যন্ত মহৎ। কোনো "এলাম, দেখলাম, জিতলাম" ভঙ্গী তার নেই। প্রথমে বরপ্রদ মহাদেবকে প্রণাম, বেদী প্রদক্ষিণ করে লক্ষ্য দেখে নেওয়া, খালি হাতে এক মিনিট মনঃস্হির করে, ধনুর্বাণ হাতে কয়েক মিনিট অভিনিবেশ, তারপর নিশ্চিত লক্ষ্যভেদ।


প্রত্যক্ষ জ্ঞানে কে কে জানত, যে পান্ডবরা বেচে? ইতিমধ্যে সবিজ্ঞাপনে তাদের অন্ত্যেষ্টি ও শ্রাদ্ধ ক্রিয়া হয়ে গেছে। কৌরবরা জানে না। মৎস্য, ত্রিগর্ত, কীচক এদের জানার কথা নয়। "ইতিহাসের উপেক্ষিত সেই উপাদান" নিয়ে আসব পরের পর্বে- ৭ম পরিচ্ছেদ।

 পরিচ্ছেদ ৭ 

কে কে জানেন?

 

একটি ষড়যন্ত্র হতে কম করে ৬টি বা তার বেশি হাত (৩ জোড়া কান), ৩টি বা তার বেশি লোক দরকার। বারণাবতে একপক্ষে ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধন, কর্ণ, পুরোচন, শকুনি এবং হয়তো আরো কেউ।

 

Sambarita Brahmashir 2.png

বারণাবতে ইতিমধ্যে পুরোচন ও আরো ৬জন, মোট ৭ জনকে পুড়িয়ে মেরেছে পান্ডবরা। এই পাল্টা ষড়যন্ত্রের রচয়িতা প্রধানমন্ত্রী বিদুর। এতে ছিল সংকেতলিপিলেখক বিদুর, খনক, মাঝি, সংকেত লিপিপারদর্শী যুধিষ্ঠির, ভীম এবং অন্যান্যরা।

 

পান্ডবরা তখন ছদ্মবেশে মৎস্য, ত্রিগর্ত, কীচক, পাঞ্চাল ইত্যাদি দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পথে ব্যাসদেবের সঙ্গে দেখা হলে ব্যাসদেব স্বীকার করেছেন তিনি সব জানেন। তিনি হয়তো বিদুরের ষড়যন্ত্রে ছিলেন না, পরে বিদুরের কাছে শুনেছেন। দ্বিতীয় বার তিনি দেখা করে দ্রোপদীর স্বয়ম্বরে যেতে বললেন। ( আমার তো মনে হচ্ছে অলক্ষ্যে নিয়ন্তা তিনি। ) তারা যে বেঁচে তা কে কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানে জানতেন? ৪জন- বিদুর, খনক, মাঝি এবং ব্যাসদেব।


কর্ণের অনেক দিনের ঘোষণা--- অর্জুনের সঙ্গে দ্বৈরথে কর্ণের শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ হবে। দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে তা হল। লক্ষ্যভেদী অর্জুনের দিকে যখন ঈর্ষাপরায়ণ রাজপুরুষেরা ছুটে গেল হল্লা করে, তখন কর্ণার্জুন দ্বন্দ হয়। অর্জুনের শরে কর্ণের ধনুক বারবার হাতেই ভেঙে যায়। কর্ণের সব অস্ত্র নিম্ষল হলে কর্ণ 'ব্রহ্মতেজ অজেয়' বলে পিছিয়ে গেলেন। এই হল কর্ণের দ্বিতীয় বার পালানো। আর ২ নম্বর গেম এর পর কর্ণার্জুন ০-২।

 

দ্বৈরথ অবশ্য নয়। কর্ণ রথে, অর্জুন মাটিতে। অর্জুনের গান্ডীব তখন ছিল না। তাহলে এবার কর্ণও জানলেন যে, পান্ডবরা জীবিত।


এইবার আসি অমিত প্রতিভাধর সেই মানুষটির কথায়। ব্যাস হয়তো তার সঙ্গে দেখা হলেও তাকে বলেন নি, কিন্তু তিনি কি অনুমান করেন নি? যিনি হ বললে হাওড়া, না, হনলুলু বুঝতে পারেন। যাকে আজকাল অনেকেই বিচক্ষণ না বলে চতুর বলেন। আমি কিন্তু বিচক্ষণ কথাটা বেশি পছন্দ করি। যিনি ক্ষনে বিচরণ করেন, একটা কোনো সত্যের সুত্র তার কাছে ফাঁস হলে তিনি সেই সত্যের অতীত ও ভবিষ্যৎ সঠিক অনুমান করেন। অতএব দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে তিনি যাবেন আর পঞ্চপাণ্ডবকে খুঁজে নেবেন। পিসতুতো ভাই হলেও তাদের সঙ্গে তাকে রাখতে হয়, কারণ ভবিষ্যৎ তাকে ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ বলবে। আশা করি নাম বলতে হবে না। মহাকাব্যে এই প্রথম কবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন তাকে টেনে নামালেন পাঞ্চালের ভূমিতে।

 

ব্রাহ্মণবেশীরা সহজ লোক ভেবে যারা আক্রমণ করেছিল, তারা সবাই ভীমার্জুনের হাতে নাকাল হচ্ছে। এই প্রথম তিনি কথা বললেন ব্রাহ্মণবেশী লক্ষ্যভেদজয়ী'র হয়ে বুঝালেন পাঞ্চাল দেশে আগত রাজগণকে--- "শান্ত হয়ে, হল্লা না করে, স্বয়ম্বরের ফলাফল মেনে নিন মাননীয়গণ, আসুন আমরা ধর্মানুসারে চলি।" তারপর নিঃশব্দে অনুসরণ করে তাদের ডেরায় এসে কৃষ্ণ-বলরাম, পিসি কুন্তী ও দাদা যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম করে নিজেদের পরিচয় দিলেন, সকলের সঙ্গে পরিচিত হলেন। সখ্য স্থাপন করে দুয়েক দিন এর মধ্যে দ্বারকা থেকে আবার ফিরে আসবেন কথা দিয়ে গোপনে চলে গেলেন।


কিন্তু তাদেরও অনুসরণ করছিল সানুচর ধৃষ্টদ্যুম্ন। ভারতময় রাষ্ট্র হয়ে গেল, জানাজানি হতে আর কিছু বাকি রইল না। ভাইদের মধ্যে মিলমিশ ও সমন্বয় বজায় রাখতে যুধিষ্ঠিরের ইচ্ছা, দ্রৌপদীকে পাঁচ ভাইই বিয়ে করবেন। ব্যাপারটা আজকের যুগে যে যেমন খুশী নিন। ব্যাসদেব তৃতীয়বার এলেন, প্রকাশ্যে পান্ডবদের সঙ্গে দেখা করে, যুধিষ্ঠিরের ইচ্ছাকে সমর্থন করে, দ্রুপদকে জানালেন যে, একে একে পাঁচ পান্ডবের সঙ্গেই কৃষ্ণা'র বিয়ে হবে, পরপর পাঁচদিনে এক একটা বিয়ে। নিজে প্রতিদিন বিয়ের সময় উপস্থিত হলেন। ফিরে আসার পর বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে পাণ্ডব ও পাঞ্চালের খবর জানালে, তিনিও তখনকার মত সন্তুষ্ট হলেন।

 

কিন্তু তৎক্ষণাৎ তাকে অসন্তুষ্ট করল কে? মহাভারতে দেখছি - সেই কর্ণ ও দুর্যোধন। এখানেও শকুনির নাম নেই। শকুনি তার আগেই গান্ধারে ফিরে গেছেন। খবর পেয়ে আবার আসবেন।

কর্ণ দিল পান্ডব ও পাঞ্চালের বিরুদ্ধে আত্মধ্বংসকারী যুদ্ধের প্ররোচনা ! স্বয়ম্বরে সবার সামনে ব্রাহ্মণবেশী'র কাছে গো-হারান হেরে আসার পরেও। 'মুখেন মারিতং জগত' ইহারেই কয়। কৌরবপক্ষে কর্ণ ছাড়া আর কেউ কখনো দুর্যোধনের জ্ঞাতিযুদ্ধ সমর্থন করে নি। কর্ণের ভীষণ ইচ্ছা ছিল ভীষ্ম-দ্রোণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্যোধন যেন বড়সড় যুদ্ধ বাঁধায়। লক্ষ্য করুন, সে দুর্যোধনকে বলেছিল রাজার আদেশে ভীষ্ম-দ্রোণকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধ করতে। সে একা কৃতিত্ব নেবে যে সবার বড় যোদ্ধা, কিন্তু একা যুদ্ধের দায়িত্ব নেবে না। দুর্যোধন ততদিনে পুরো কর্ণের কবলে। কিন্তু তাদের কিছু করার ক্ষমতা হয় নি।

 পরিচ্ছেদ ৮ 

উত্তরাধিকার সমবন্টন

 

ধৃতরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ভীষ্ম-দ্রোণ এর পরামর্শ মেনে পাণ্ডববধূ বরণ করে অর্ধেক রাজ্য তাদের ভাগ করে দিলেন। উত্তরাধিকার মীমাংসা'য় এটাই ছিল ভীষ্মের দ্বার্থ্যহীণ সিদ্ধান্ত। শকুনিও এতে বাধা দেয় নি। যদিও শকুনির অশেষ দুর্নাম। প্রথম তের বছর রাজা যুধিষ্ঠির ও যুবরাজ দুর্যোধন উভয়েই শান্তিতে রাজত্ব করে।


আমার ব্যক্তিগত মত, অর্জুন বেশি ধার্মিক। ফাঁকি দিয়ে ধর্মপালন নয়, অসীম সংযম ও দৃঢ়তা নিয়ে ধার্মিক। সম্পূর্ণ নিজের কৃতিত্বে দ্রৌপদী জয় করেও অর্জুন যুধিষ্ঠিরকে আগে বিয়ে করার জন্য দ্রৌপদীর দাবী ছেড়ে দিয়েছিল। এ মহত্ব ধর্ম রক্ষার জন্যই। একবার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে অর্জুন আইন ভাঙে, যার শাস্তি নির্বাসন। নিয়ম স্থির হয়েছিল প্রতি এক বছরে দ্রৌপদী একজন পান্ডবের বৌ থাকবে। সে সময় তাদের একান্ত কক্ষে অন্য পান্ডব প্রবেশ করলে তার ১২ বছর নির্বাসন হবে। একবার অস্ত্র আনতে অর্জুনকে যুধিষ্ঠিরের কক্ষের মধ্য দিয়ে অস্ত্রাগারে যেতে হয়। কিছু নিরীহ মানুষকে দস্যুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে এ প্রয়োজন হয়েছিল। শাস্তি নির্বাসন। রাজা যুধিষ্ঠির অজুহাত দিলেন, দাদা-বৌদির ঘরে কনিষ্ঠ আসতে পারে স্নেহের দাবীতে। নিয়মটা জ্যোষ্ঠের জন্য। রাজা যুধিষ্ঠির আদেশ না দিলেও অর্জুন যেচে ১২ বছর নির্বাসন মেনে নিলেন। ধর্মে ফাঁকিবাজি হয় না। বিয়ের পর দ্রৌপদীর সুখ ভোগ করা হল না। নিজে মহাশক্তিশালী হলেও আজীবন পুজ্য আত্মীয়-পরিজন ও গুরুর কাছে নত হয়ে সম্মান জানিয়েছেন, এমন কি যুদ্ধক্ষেত্রেও কখনো এই মর্যাদা বিস্মৃত হন নি।


১২ বছরে অর্জুন এর অনেক অর্জন--


১. কৃষ্ণকে একান্ত বিশ্বস্ত অনুগত বন্ধু করে নেওয়া
২. সাত্যকিকে শিক্ষা দিয়ে মহাবীর তৈরী করে সাত্যকি ও তার বাহিনীর চির আনুগত্য
৩. পথিমধ্যে নারী তান্ত্রিক দেশের উলুপী ও চিত্রাঙ্গদা'র সঙ্গলাভ।
৪. সুভদ্রার মত রমণী রত্ন যিনি রথের রশিও ধরতে পারেন।


ফিরে আসার ১ বছর পরে স্টিয়ারিং কমিটির বিশেষ বৈঠক।

 

  • আলোচ্য - রাজসুয় যজ্ঞের বাসনা।

  • প্রস্তাব স্বয়ং যুধিষ্টিরের।


কৃষ্ণ নিজে কখনো যুদ্ধ চাইতেন না। মগধরাজ জরাসন্ধ অপরাজেয় অমিত বল। তারপরেই ইন্দ্রতুল্য পরাক্রম ইন্দ্রসখা ভগদত্ত। পরে কর্ণ, শিশুপাল, শল্য, মাহিষ্মতী কোথাও নয়, সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা হয়েছিল ভগদত্তের রাজ্যসীমায়। সেই বৈঠকে পরম বন্ধুর মত কৃষ্ণ বহু অগ্রপশ্চাৎ আলোচনা করেন। কিন্তু সকলের ইচ্ছা যুদ্ধ।

 

এবার দেখুন, ঝুঁকি নেওয়ার কি দুরন্ত সাহস, কি আত্মবিশ্বাস, কি নির্ভুল বিচক্ষণতা কৃষ্ণের!! সবার ইচ্ছা জেনে নিয়ে বলছেন,
"আমি কৌশলজ্ঞ, ভীম বলবান, আর অর্জুন আমাদের রক্ষক, আমরা তিনজনে যদি নির্জন স্থানে জরাসন্ধকে আহ্বান করি তবে তিনি নিশ্চয় আমাদের একজনের সঙ্গে যুদ্ধ করবেন। তিনি বাহুবলে দর্পিত সেজন্য আমার বা অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করা অপমানজনক মনে করবেন। মহাবলী ভীম নিশ্চয় তাকে বধ করতে পারবেন। যদি আমার উপর বিশ্বাস থাকে ভীমার্জুনকে আমার সঙ্গে যেতে দিন" ।

 

অবিরত ১৪ দিন কুস্তি করে ভীমের জরাসন্ধবধের ফল--- প্রায় বিনা যুদ্ধে একসঙ্গে মগধ ও আরো ৮৬জন ছোটো ছোটো রাজার আনুগত্য পাওয়া গেল। এরপর শুরু হল চার ভাই এর বিভিন্ন দিকে দিগ্বিজয় যাত্রা।

 

রাজসুয় যজ্ঞ হল। বিচক্ষণ ভীষ্ম সেখানে যজ্ঞের প্রধান পুরুষ মনোনীত করলেন কৃষ্ণকে। রতনে রতন চেনে। উভয়ে বিচক্ষণ। উভয়ে উভয়কে চরম শ্রদ্ধা ও সম্মান করেছেন চিরকাল। শিশুপাল বধ হল। কৃষ্ণ যজ্ঞ সম্পন্ন করিয়ে দেশে ফিরে গেলেন।

 

যজ্ঞের জন্য নির্মিত মায়াপুরীতে রাজা দুর্যোধন দৈবাৎ বার বার অপদস্থ হলেন, আক্ষরিক ও সম্মানগত উভয় অর্থে। জলাশয়কে মেঝে মনে করে পড়ে যাওয়া, দেওয়ালকে ফাঁকা করিডোর মনে করা, এবং উল্টোটা, মেঝেকে জলাশয় মনে করে ঘুরে যাওয়া এবং করিডোরকে দেওয়াল মনে করে এড়িয়ে যাওয়া। ভীম-অর্জুন তথা ভৃত্যদের হাসি। একবার মাথায় আঘাত লেগে পড়ে যাওয়ার আগেই ভীম অবশ্য ছুটে এসে ধরে বাঁচায়। আজব জায়গায় আজব ভুল।


আমার সাদা মনে প্রশ্নঃ

 

  • একা দুর্যোধন কেন ফাঁদে পড়ল বারবার?

  • আর কেউ অপদস্থ হন নি কি করে?

  • যেখানে মাননীয় রাজপুরুষদের ডাকা হল, সেখানে রাজবাড়ীতে এমন ফাঁদ কেন?

 

বিস্তারিত বলবো পরে ১৯ তম পরিচ্ছেদে। এখন উপযুক্ত সময় নয়।

 ক্রমশঃ