সাহিত্য পত্র

গল্প - যে খেলার খবর ICC রাখে না


শাশ্বত পুরকায়স্থ 
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

Shaswata Purkayastha_edited.jpg

আনোয়ার পারভেজ, এস ডি ও (সিভিল)। খস খস করে প্রথম নামটা লিখে নিজেই পড়ে শোনালেন রমাপতি। আগের দু'বছরও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। আন্তঃজেলা ক্রিকেটে 'সতীশ চন্দ্র পাল ট্রফি'র জন্য দল বাছাইয়ের সভা চলছে। রমাপতি অনেকবছর ধরেই ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট নির্বাচকমন্ডলীর প্রধান। নির্বাচকদের মধ্যে তিনিই জেলা পর্যায়ের ক্রিকেট খেলেছেন। তাই পাঁচজনের মধ্যে উনিই প্রতাপশালী হবেন এটাই তো স্বাভাবিক। বাকী চারজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এবার বাকীদের নাম শোনা যাক... সুশীল কিছু বলবে মনে হচ্ছে , বলে ফেলো।" সুশীল কমিটিতে নতুন ঢুকেছে, বেশ কিছুদিন ক্লাব ক্রিকেট খেলে এসেছে। দল নির্বাচনী  সভায় এই প্রথম। বলল,"বলছিলাম কী, টিমলিস্টে নামের পেছনে এস ডি ও লেখার দরকার আছে কী?" রমাপতি একটু জোর দিয়েই বললেন, "বলো কী হে? চেয়ারের একটা দাম দিতে হবে না বুঝি?" সুশীল বাকী তিনজনের ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে দমে গেল। আনোয়ার পারভেজ স্থানীয় ক্লাব লিগে সময় সুযোগ পেলে খেলে থাকেন। আর এই নির্ঝঞ্ঝাট মহকুমা সদরে সিভিল এস ডি ও'দের সময় সুযোগেরও অভাব হয় না বটে। তবে ওঁর আগে অন্য কেউই নিজে ব্যাট হাতে মাঠে নেমেছেন বলে জানা যায় নি। কিন্তু ওই ব্যাট হাতে নামা পর্যন্তই। ব্যাটিংয়ের সময় তিনি শুধু ননস্ট্রাইকার নয় কারো সাথেই কোনও কথা বলেন না, নো বাক্যবিনিময়।  ফিল্ডিংটা সবসময়ই দ্বাদশ ব্যাক্তিকেই করতে হয়। নিজের ব্যাটিং শেষ হলে পর বেশির ভাগ সময় উনি মাঠ ছেড়ে অফিসে চলে যান, কদাচিৎ বসে দলের ইনিংসটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেন। এস ডি ও অফিসের গোপীনাথের অবশ্য এমন সৌভাগ্য হয় না। তবে গোপীনাথ বোলার, আর ফিল্ডিংয়েও তুখোড়। তাই আটকা পড়ে যায়, ওকে মাঠে থাকতেই হয়। 


ফোনটা গোপীনাথই রিসিভ করেছিল। ফোনের ও-প্রান্ত থেকে ম্যাডাম কথা বলছিলেন। ব্যাপারটা হচ্ছে, স্যারের শ্বশুরমশাই আজই প্রথমবার এই শহরে আসছেন। স্যারকে স্টেশনে গাড়ি পাঠাতে হবে। আসলে গোপীনাথের অফিসে অল্প কাজ ছিল, সকালেই স্যার জানিয়েছেন শহরের রেশন-শপের মালিকদের জন্য একটা চিঠি লিখে ফেলতে। পরে স্যার সই করে দেবেন। গোপীনাথ একটু পরের দিকে ব্যাট করে, তাই অসুবিধে নেই। কিন্তু আজ উইকেটগুলো ঝটপট পড়তে থাকায় গোপীনাথকে খবর পেয়ে মাঠে চলে আসতে হয়েছে। আর মাঠে গিয়ে জিরিয়ে নেবার আগেই ব্যাট হাতে নেমে পড়তে হয়েছে। এদিকে স্যারের নিষেধ থাকে, তাই ম্যাডামকে বলা হয়নি উনি খেলার মাঠে। বানিয়ে বলতে হয়েছে উনি কাজে বেরিয়েছেন। এখন ম্যাডামের ফোনের ব্যাপারটা কী করে জানাবে সেই ভাবনা মাথায় নিয়েই ওকে ব্যাট করতে হচ্ছে। এদিকে স্যারের শরীরটাও কি সুবিধের লাগছে না আজ? সিঙ্গলস টিঙ্গলসে আজ একদমই উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। বেশ কিছুক্ষন ভেবে গোপীনাথ একটা রাস্তা খুঁজে পেল। আচ্ছা, ওদের উইকেটকীপারকে দিয়ে একবার চেষ্টা করে দেখা যাক। ব্যাট করার সময় প্রতিপক্ষ দলের উইকেটকীপার ছেলেটার কাছে গোপীনাথ ব্যাপারটা পেড়েই ফেলল। ও সামান্য হেসে বলল, "ঠিক আছে,নেক্সট চান্সেই"। মনে মনে বলল এমন সু্যোগ কেউ ছাড়ে বুঝি!  পরের ওভারের প্রথম আর চতুর্থ ডেলিভারির আগে দু'দুবার আনোয়ারকে বলে বসল, "কাকু, চটপট বাড়ি যান, আপনার শ্বশুরমশাই আসছেন। মাছ মাংস মিষ্টি কিনে নিয়ে যান।" আনোয়ার জানেন ব্যাটসম্যানের মনোসংযোগ নষ্ট করার জন্যে উইকেটকীপাররা এসব করেই থাকে। পরের কয়েকটা ওভারে প্রতিপক্ষের আরো দুয়েকজন এসে একই কথা শুনিয়ে গেল। আনোয়ার সাহেবের ভ্রূক্ষেপ নেই এসবে। এসব শুনতে নেই। এদিকে গোপীনাথ  নিজে কেবল বল ঠেকিয়েই যাচ্ছে। আরো দুয়েক ওভার এভাবেই গেল। হঠাৎ স্যার "রান" বলে ছুট শুরু করলেন। গোপীনাথ এই সুযোগেই ছিল। অন্য কোনোদিকে নয়, গোপীনাথের দৃষ্টি স্থির স্যারের দিকেই। একটু কাছাকাছি আসতেই বলে উঠল, "স্যার...ম্যাডাম"। আনোয়ার সাহেব গম্ভীর মুখে "মাঝখানে অবলিক বসবে" বলে অপরপ্রান্তে  পৌঁছে গেলেন। সেরেছে ! গোপীনাথ বুঝল স্যারের মাথায় রেশন-মালিকদের চিঠিটা! একটু পরে নন স্ট্রাইকিং এন্ডে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা আম্পায়ারকেও বলে ফেলল। খবরটা যথাসময়ে আম্পায়ার টু আনোয়ারও হলো। এবার আনোয়ার একটু অবাক হলেন। ওরা কি আজ আম্পায়ারকেও ম্যানেজ করে ফেলল নাকি? দিনকয়েক আগেই নবীন লাইব্রেরী থেকে "মনোরমা ক্রিকেট বুক"টা কিনেছেন। এতে ল'জ অব ক্রিকেট নিয়ে একটা বেশ বড় চ্যাপ্টারই রয়েছে। বাড়ি ফিরেই দেখতে হবে আম্পায়ার ব্যাটসম্যানের মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটালে সেটার শাস্তি কী তা নিয়ে ল' কিছু বলেছে কি না।  ৫০-এ পৌঁছোতে স্যার বল সিলি মিড অফে ঠেলেই তীব্র গতিতে নন স্ট্রাইকিং এন্ডে যেতে যেতে বলে গেলেন, "নেক্সট প্যারা"! জানুয়ারীর শীতেও গোপীনাথের কপালে ঘামের রেখা। 
 

আনোয়ার পারভেজ হাত খুলে মেরে  ষাটের  ঘরে। গোপীনাথ ভাবছে স্যার সেঞ্চুরি  টার্গেট করে ফেললে বিপদ। মনোসংযোগে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটে গিয়ে যদি সেঞ্চুরি মিস হয় তাহলে কী হবে ও মনেও আনতে চাইছে না। এদিকে গোপীনাথ  নিজে ক'বার যে আউট হতে হতে বেঁচে যাচ্ছে  আজ।  দু'রান নিয়ে ৬৫ থেকে ৬৭ তে যেতে যেতে স্যার গোপীনাথকে এক বার "অ্যাজ ডিসাইডেড ইন", আর দ্বিতীয় বার "আওয়ার লাস্ট মিটিং" শুনিয়ে গেলেন! গোপীনাথ দেখছে এভাবেই স্যারের স্কোর আর চিঠির বয়ান বেড়েই যাচ্ছে। ৯৩!  আরেকটু অপেক্ষা করে সেঞ্চুরি হয়ে গেলে খোলসা করবে কী? আর যদি স্যার নার্ভাস নাইন্টিতে? না আর ভাবতে পারল না গোপীনাথ। হঠাৎ দেখল আনোয়ার পারভেজ আর ও প্রায় একই ক্রিজে। কখন কল করেছেন খেয়ালই করেনি। ক্রিজ ছাড়ার আগে কেবল কানে এল "ইয়োরস ফেইথফুলি"। গোপীনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করেও অপরপ্রান্তে পৌঁছুতে পারল না। নবম উইকেটের পতন। এই ওভারের আরো চারটে বল বাকী। আম্পায়ারের কাছ থেকে রান আউটের সংকেত পেয়ে ননস্ট্রাইকারের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে ও প্যাভিলিয়নের দিকে রওয়ানা দিচ্ছিল। দেখতে পেল আনোয়ার পারভেজ একবার ওর দিকে  অগ্নি দৃষ্টি হেনে পরক্ষণেই  "এস ডি ও, সিভিল, সুহৃদগঞ্জ" বলে হাঁটু গেড়ে বসে বুটের ফিতেটা টাইট করে নিচ্ছেন।