সাহিত্য পত্র

বিজয় কুমার ভট্টাচার্যের একগুচ্ছ কবিতা


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

মাতৃভাষা নিয়ে কবির এক গুচ্ছ কবিতা নিবেদন করলো ঈশান কথা

Bijoy Bhattacharjee_edited.jpg

১৯ শে মে

আমার চেতনায় তুমি সাগর সেনের রবীন্দ্রসঙ্গীত
কন্ঠে ফিরোজা বেগমের নজরুল
আমার ভুবনে তুমি অঘ্রানের প্রলম্বিত শীত
'সুবাসমালির ঘরে কাননের সরোবরে' 
ফোঁটা পদ্মফুল

 

তুমিই আমার আঠাশ বছর বয়সের যৌবন
বর্ষায় প্রবল স্ফীত
বরাকের সুস্বাস্থ্যের মতো
সাগরের অভিসারে প্রবল গর্জন
তুমিই আমার গনতন্ত্রে উদয়াস্ত নামসংকীর্তন
অনর্গল অর্গল ভাঙার খেলা
তুমিই আমার অসময়ের প্রেম
আর সময়ের বড় অবহেলা

 

তুমিই আমার মে মাসের কৃষ্ণচূড়া
ফেব্রুয়ারির ঝড়
তুমিই আমার অগ্নিবীনার তার
গিঁটছেড়াঁ ঈশান খুঁটির ঘর

 

তুমিই আমার সতেরো আগষ্ট আর একুশে জুলাই
আমার সমগ্র ভুবন তোমার একাদশ হৃদপিন্ডে পেয়েছে ঠাঁই
তুমি আমার ডাকঘরে পোস্ট করা চিঠি
ভুল ঠিকানায় লেখা
তুমিই আমার অশনিসংকেত আর বিদ্যুতচমকে এক পলকের দেখা
অসবর্ণ তুমি প্রেম চিরকাল চিরপরকীয়া
তোমার জন্য শার্টের বোতাম খুলে মেলে রেখেছি রবীন্দ্রনাথের একটি বিরাট হিয়া

 

জীবনানন্দের চোখে তুমি বনলতা সেন
আমার চৈতন্যে তোমার নাম 
রক্তের শুধু লেনদেন

তুমিই আমার বরাকপারের জনজীবনের গান
জীবন মৃত্যুর এপার ওপারে
তুমি সেতুর নির্মাণ
আমার বৈতরণী
তুমিই আমার হীরা জহরত মনি মানিক্যের খনি
তুমিই আমার বাংলাভাষা
মায়ের দুধের ফোটায় মিশেছো তুমি আমার পিপাসা
ভরা জোয়ারের পূর্ণিমা তুমি কখনো বা ঘোর অমাবস্যা
তোমার জন্যই আমি লিখে তাই বেহুলার বারমাস্যা

তোমার জন্যই কাস্তের মুখে শান দেই সুখে
তুমিই শষ্যের বীজ
দেশে দেশে,
বাংলাদেশের স্বাধীনতা তুমি,পশ্চিমের মুক্ত বেলিজ
উপনিবেশের দাসত্ব তোমার নয়,
তোমার জন্যই হার-না-মানা মানুষের সর্বকালের জয়
তোমার জন্যই আধুনিক কবিতার প্রয়োজন,ছন্দের শেকল ভাঙার কাব্য
সুকান্ত তার বয়স একুশে লিখেছে চিঠির গদ্য

 

তুমিই আমার প্রথম বিষাদ,বিস্মরণের ভুল
তুমিই আমার প্রেমে পড়বার,চিঠি লিখবার, বর্ণমালার স্কুল
তুমিই আমার 'অ' অক্ষরের অজগরের প্রথম বয়সে ভয়
তুমিই আমার 
মেঘে ঢাকা সূর্যের অপরাহ্ন
গর্বের পরাজয়

আমার রক্তে আজন্ম লালিত তুমি, দাঁড় কেটে চলে যাওয়া মাঝি
তোমাকে পাবার জন্যই আমি,জলতরঙ্গে,নুপুরের মতো বাজি
আমার সমর্পণে
তুমি জেগে ওঠো প্রেম,জেগে ওঠো তুমি 'ধ'- এর ধনুর্গুনে
 

তুমিই আমার উনিশ-একুশ, জন্মের পরিচয়
শত কোলাহলেও তোমাকে কখনও ভুলবার নয়।

উনিশ, একুশ

একুশের ফুল বাসি হয়না কখনো
মাতৃগর্ভে জন্ম নেয় নিয়ত  উনিশ
বিশ্বাস নাহয় যদি তো জিজ্ঞেস করো
বলবে ভারত, বাংলাদেশের পুলিশ।

 

উনিশ,একুশ দ্যাখে গাঙ্গেয় জোয়ার
উনিশ,একুশ স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদ
উনিশ একুশ বাংলা ভাষার অহংকার
উনিশ, একুশ যুদ্ধজয়ের সংবাদ

 

ফেব্রুয়ারি,মে- মাসের রক্তসূর্যোদয়
যে আলো ছড়ালো তার দীপ্তি নিয়ে পরে
জুলাই,আগষ্ট দ্রুত হল স্বপ্নময়
সময়েরা শহীদের জয়ধ্বনি করে

 

সালাম,জব্বার আর কুমুদ রফিক
শচীন,কমলা,যীশু,জগন,হিতেশ
বাচ্চুর দুঃসাহস যথার্থ নির্ভীক
ভাষা শহীদের নেই দেশ ও বিদেশ

 

পৃথিবীর যে যেখানে লড়েছে এখন,
পিপাসা মেটাতে চায় নিজস্ব ভাষায়
একুশ, উনিশ তার পূর্ণ সমর্থন
ভাষা স্রোতস্বিনী বয়ে যায় মোহনায় .....

উত্তরাধিকার

এপার বাংলা ওপার বাংলা মধ্যিখানে চর
তারই মাঝে শহীদ মিনার শিলচর শহর
ওপার বাংলা জীবনানন্দ এপারে রবিঠাকুর
এক আকাশে রোদবৃষ্টি বাংলা গানের সুর

 

ভাগ হয়েছে কুশিয়ারা,সুরমা টানা চোখ
ভাগ হয়নি জলের ধারা বাস্তুহারা শোক

 

বরাক পারে শক্তিপদ ঢাকাতে সামসুর
কলকাতা রয় জয় গোস্বামী সে কি অনেক দুর
পূর্ব- পশ্চিম ঈশান বঙ্গে একই নাড়ির টান
গঙ্গা পদ্মা নদীর মাঝি চাতলাতে গায় গান

 

রিফিউজি লতার মতো অবহেলার দিন
রাত্রি নামে বঙ্গদেশে, সাপুড়ে বাজায় বীণ
করতালি দিয়ে শুরু ভানুমতির খেলা
সর্পদষ্ট স্বাধীনতার স্বর্গগামী ভেলা

 

ছুঁয়ে দেখি ছিন্নভিন্ন ধর্ষিতা এক নারী
আমর্মমূল গেঁথে আছে তীক্ষ্ণ তরবারি

 

সে নারীটির খুঁজে আজও পদ্য লেখা হয়
লালন ফকির তাঁকে বুঝি অচিন পাখি কয়
অচিন পাখির জন্য কিছু শষ্য রাখা ভালো
এপার বাংলা ওপার বাংলায় একই ভোরের আলো।

উনিশের পদ্য চতুর্দশী

'ক' অক্ষরে তিনটি নামের রংমশাল
কুমুদরঞ্জন,কমলা আর কানাইলাল।

 

চেনো নাকি চন্ডীচরণ 'চ' অক্ষরে
বাংলাভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে।

উনিশে মে-র কৃষ্ণচূড়া, ভোরের আলো
বীরেন্দ্র সে বীরের মতো রেলস্টেশনে
মাটি কামড়ে রইল পড়ে আপন মনে।

শচীন্দ্র পাল ,দুঃসাহসে ধরেছে হাল
শহিদেরা ছিনিয়ে আনে সূর্যসকাল।

 

দন্ত্য 'স' এর ইতিহাসে তিনটি তরুণ
সুকোমল, সত্যেন্দ্র, সুনীল জেনে রাখুন।

 

এক সাগর বুকের রক্ত ভালোবাসায় 
হিতেশ বিশ্বাস মুক্তো খুঁজে বর্ণমালায়।

'ক' অক্ষরে কাব্য আমার পদ্য চতুর্দশী,
উনিশ একুশ শেখায় ভাষা বাংলা গরিয়সী।