সাহিত্য পত্র

রেশম পথের যাত্রী


বড় গল্প

গোবিন্দ ভট্টাচার্য
০১ - ২৯ আগস্ট ২০২১

 

গোবিন্দ ভট্টাচার্যের পাঁচ পর্বের এই ঐতিহাসিক বড় গল্পের সব পর্ব একসাথে ... 

 পর্ব ১ 

তাং রাজবংশের সপ্তম সম্রাট জুয়ান-জংয়ের রাজ্যাভিষেকটি আমি কখনই ভুলতে পারি না। আমি যতদিন সেখানে ছিলাম, রাজধানী চাংগানের রাস্তাগুলোকে আমি এর থেকে বেশি সজ্জিত হতে আর কখনো দেখিনি। হুয়াং-হে নদীর তীর থেকে শুরু করে পুরো শহর পর্যন্ত প্রতিটি ইঞ্চি খালি জায়গা হাজার হাজার তাঁবুতে ছেয়ে গিয়েছিল, সেখানে সারা মহাদেশের সুদূর প্রান্ত থেকে  - পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্য এশিয়া এমনকি মহাদেশের পশ্চিম সীমান্ত থেকেও  লোকজন এসেছিল। ব্যবসায়ীরা এসেছিলো দুনহুয়াং থেকে তেজীয়ান ঘোড়া নিয়ে, লুয়াং থেকে রেশম, চীনামাটির বাসন, শস্য, ভেষজ ও ওষুধের পণ্য নিয়ে। মরুভূমির লোকেরা এসেছিল তাকলামাকান পেরিয়ে দুই-কুঁজওয়ালা ব্যাকট্রিয়ার উটের পাল নিয়ে, কাশগড় থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছিলো খেজুর এবং কিসমিস নিয়ে । এসেছিল তাশখন্দ থেকে  বিখ্যাত ধাতব এবং কাচের জিনিসপত্র, হেরাট ও দামাস্কাস থেকে বিভিন্ন আকারের বাদ্যযন্ত্র; বাগদাদ থেকে কার্পেট এবং সুতির বোনা অত্যুৎকৃষ্ট পোশাক - এছাড়াও ছিল মুক্তো, সোনার ও হাতির দাঁতের অনুপম অলঙ্কার। সমরকন্দ থেকে এসেছিল আশ্চর্য্যজনক জেডের অলংকার । টিরে থেকে এসেছিলো অসংখ্য নৌকা আর জাহাজ বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য বহন করে, সেগুলো সব হুয়াং-হে নদীর প্রশস্ত বন্দরে নোঙ্গর করা ছিল। শহর ও তার আশপাশের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা লোকে ছেয়ে গিয়েছিল - কে না ছিল তাদের মধ্যে - সরকারী কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বণিক, কৃষক, রেশমচাষি, বৌদ্ধ ভিক্ষু, যাযাবর এবং সম্ভবত কিছু দস্যুও। তারা খোরাসান, তুর্কমেনিস্তান, বালতিস্তান, তাজিকিস্তান, লাদাখ এবং পারস্য, আরব, আফ্রিকিয়া, বাইজান্টিয়াম এবং রাশিয়ার মতো দূর-দূরান্ত থেকেও এসেছিল। সেখানে স্থানীয় হ্যানরা ছাড়াও ছিল তিব্বতি, তাতার, ইহুদি, নেস্টোরিয়ান খ্রিস্টান, জাপানি, তুর্কি, হিন্দু এবং আরব জাতির লোকেরা। চাংগানের পূর্ব থেকে পশ্চিমে ছুটে যাওয়া এগারোটা রাজপথ আর উত্তর থেকে দক্ষিণে ছড়ানো চৌদ্দটা রাজপথ মানুষে মানুষে আর পণ্যদ্রব্য এবং বিপণিতে ছেয়ে গিয়েছিল। উৎসবের কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানীর উত্তর সীমানার ঠিক মাঝখানে দাঁড়ানো বিশাল রাজপ্রাসাদ - তার প্রতাপ এবং মহিমা যেন ছড়িয়ে পড়ছিলো শহরের প্রবেশদ্বার পেরিয়ে, উত্তরের  সমভূমি ছাড়িয়ে সুদূর নীল পর্বতশ্রেণীর ওপারে। সেখানে উৎসবটি যেন আর শেষ হতে চাইছিল না। উৎসব চলাকালীন প্রাসাদের চারপাশে প্রতিদিন প্রচুর জনসমাগম হত - শহরের ত্রিশ বর্গ মাইল অঞ্চলে  এমন কেউ ছিল না যে সেই আনন্দময় এবং কিছুটা অবাধ্য, নিয়ম-না-মানা  জনতার স্রোতে যোগ দেয় নি । মদিরা আর সংগীতের প্রবাহ ছিল অবারিত - সাথে সাথে খাদ্যদ্রব্যও ছিল  অপরিমিত, সুস্বাদু এবং বৈচিত্র্যময় । উৎসবের আনন্দে বিভোর নাগরিক আর বহিরাগতরা ভিড় করছিল বিশেষ করে মদিরার দোকানগুলোতে - যেখানে সুন্দর সুন্দর তামার মদিরাপাত্রে সুন্দরী তরুণীরা সুগন্ধি মদ ঢেলে দিচ্ছিলো। উৎসবমুখর জনতাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না কোনটি সেখানে তাদের বেশি আকৃষ্ট করছে - সুগন্ধি মদিরা না মদিরা পরিবেশনকারী দীর্ঘ আঁখিপল্লবের অধিকারিণী মোহময়ী তরুণীরা।


তখন কেই বা জানত যে তাং রাজবংশের সর্বাধিক শক্তিশালী সম্রাট যার রাজত্বকালও ছিল তাং রাজবংশের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিনের, সেই সম্রাট জুয়াং-জং নিজেরই ছেলের সুন্দরী স্ত্রী ইয়াং ইউহুয়ানের প্রেমে পড়বেন এবং এতটাই মোহিত হবেন যে তাকে শেষ অবধি বিবাহবিচ্ছেদে বাধ্য করবেন? তখন তাঁর নিজেরই বয়স ষাট বছর। তারপরে তাকে তিনি গুই-ফি - প্রধানতম সহধর্মিনী - হিসাবে গ্রহণ করেন। সুন্দরী  ইয়াং গুই-ফির প্রতি সম্রাটের আবেগ এতটাই প্রবল ও নিয়ন্ত্রনহীন ছিল যে বেশিরভাগ সময়ই তিনি তার সাথে কাটাতেন - সাম্রাজ্য পরিচালনার ভার অন্যদের ওপর ছেড়ে দিয়ে। ফলে যা হবার তাই হয়েছিল - উচ্চাভিলাষী সেনানায়ক আন-লুশনের নেতৃত্বে তাঁর বিরোধীরা যারা ইয়াং গুই-ফিকে কোনোদিনই ভাল চোখে দেখে নি তারা ষড়যন্ত্র করে সম্রাটকে ক্ষমতাচ্যুত করে। সম্রাট বাধ্য হন সিংহাসন ত্যাগ করে রাজধানী থেকে পালিয়ে অবশেষে সেচুয়ানে গিয়ে আশ্রয় নিতে। সবচেয়ে দুঃখজনক এটাই হয়েছিল যে সম্রাটের বিশ্বস্ত এবং একান্ত অনুগত রাজকীয় প্রহরীরাই অবশেষে ইয়াং গুই-ফিকে হত্যা করে । ভাগ্যের লিখন ছাড়া এটাকে আর কীই বা বলা যায়? অবশ্য আমি এইসমস্ত ঘটনা জেনেছি অনেক অনেক পরে - আমার মাতৃভূমি থেকে আসা পর্যটকদের কাছ থেকে।

 
এতদিন পরে আজ ওই উৎসব আর এইসমস্ত ঘটনা আমার কাছে কিছু নিস্তেজ পুরোনো স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়, যা আর আমার মনে কোন রেখাপাত করতে পারে না, পারে না কোন আবেগ জাগাতেও। এমন অনেক স্মৃতির সূঁতোই যা এককালে আমাকে অতীতের সাথে বাঁধনে বেঁধে রেখেছিল এখন ছিঁড়ে গেছে  - সেগুলোর সাথে যে আবেগ জড়িয়ে ছিল তাও হয়তো ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। তবুও সেই স্মৃতিগুলো - যে দেশে আমি আর যেতে পারি না আমার সেই মাতৃভূমির স্মৃতি - হঠাৎ হঠাৎ কোনো আপাত কারণ ছাড়াই আমার মনে ঘুরে ফিরে আসে। তাতে আবেগ হয়তো নেই, তবু ইতিহাস তো ইতিহাসই, তাকে কখনো পুরোপুরি ভোলা যায় কি?


সেই দিনগুলোকে আমি কতদূর পেছনে ফেলে এসেছি - মনে হয় যেন শতাব্দীপুর্বের ঘটনা যেদিন আমি  চাংগান  থেকে রেশম পথে যাত্রা শুরু করেছিলাম - বাইজানটিয়ামগামী  কাফেলার অংশ হিসাবে। সম্রাট আমাকে আদেশ দিয়েছিলেন তাঁর পক্ষ থেকে কিছু ব্যক্তিগত উপহার এবং বাইজেন্টাইন সম্রাটকে লেখা একটি চিঠি কাশগড় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার জন্যে - সেখানে আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমি চীনা সম্রাটের সেবারত একজন সরকারী কর্মচারী ছিলাম এবং আমার কাজ ছিল আমদানি এবং রপ্তানি পণ্যদ্রব্য থেকে আদায় করা করের হিসেব রাখা। প্রতি মাসের কর আদায়ের হিসেব আমাকে ব্যক্তিগতভাবে সম্রাটকে জানাতে হত। আমার জন্ম হয়েছিল খুব নীচু জাতির ছুতোর পরিবারে, কিন্তু আমার জন্ম আমাকে নিজের যোগ্যতার সাহায্যে সরকারী আমলাতন্ত্রের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে নিজের স্থান করে নিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। চীনা আমলাতন্ত্র সত্যি সত্যিই একটি মেধাতন্ত্র ছিল যার মধ্যে ঢোকার একমাত্র রাস্তা ছিল এক কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে। আমিও সেভাবেই তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম - এবং শেষ পর্যন্ত নিজের মেধায় সম্রাটের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছিলাম। যেহেতু শিক্ষার অধিকার সবারই ছিল তাই আমার মতো নীচু জাতির ছেলের পক্ষেও উচ্চাভিলাষী হতে কোন বাধা ছিল না। আমি বরাবরই পড়াশুনায় ভাল ছিলাম এবং শিক্ষকদের সাহায্য ও প্রেরণায় আমি আঠারো বছরের অল্প বয়সেই একজন সরকারী কর্মকর্তা হতে পেরেছিলাম এবং তারপর খুব তাড়াতাড়িই পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠেছি । কিন্তু আমার জীবন যে খুব সুখের ছিল তা মোটেই নয়, সরকারে যোগ দেবার খুব অল্পদিনের মধ্যেই একটি মহামারীতে আমি বাবা-মা দু'জনকেই হারাই।  আত্মীয় স্বজনদের সাথেও আমার বিশেষ কোন সম্পর্ক ছিল না, আর  আমার খুব কাছের আত্মীয়স্বজন  বেশি ছিলও না। আমি নীচু জাতির বলে কর্মস্থলে আমার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যাও ছিল নগণ্য। সম্রাটের চাকরিতে যোগদানের দশ বছর পরে আমাকে রেশম পথে যাত্রা করতে হয়েছিল। রেশম পথে যাত্রা ছিল যতখানি বিপদজনক ঠিক ততখানিই অনিশ্চিত।


প্রত্যুষের আলো আঁধারির  মধ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার সেই দিনটি আমি কখনই ভুলতে পারি না। আগের দিন আমরা সকল যাত্রী একসাথে গিয়েছিলাম চাংগানের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মঠে - সেটা ছিল গোটা চাংগানের তিনশটি মঠের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ  - ভগবান পদ্মসম্ভবের আশীর্বাদ নিতে। যদিও বহুযুগ আগের ঘটনা, তবুও সেই নির্মল উজ্জ্বল সকালটি আমি চোখ বুঁজলেই ঠিক চোখের সামনে দেখতে পাই আর শুনতে পাই ত্রিশরণ মহামন্ত্রের পবিত্র আওয়াজ যা মঠের অগুন্তি কালচক্রের ঘূর্ণায়নের মিঠে মৃদু আওয়াজের সাথে মিশে এক অনাবিল বাতাবরণ তৈরী করেছিল। মনে হয় ঠিক যেন গতকালের কথা। সেই দিনই সন্ধ্যায় মন্দিরে  জুয়ান-জুয়ের সাথে আমার দেখা হওয়ার কথা ছিল - জানতাম না সেটাই হবে এরকমের শেষ দেখা। ওর অশ্রুভরা সুন্দর চোখের স্মৃতি আমার মনে চিরতরে আঁকা রয়েছে। জুয়ান-জু মানে চন্দ্রমল্লিকার সৌরভ, কিন্তু ফুলের সৌরভ তার মৃদু প্রেমময় কোমলতার তুলনায় কিছুই ছিল না। জুয়ান-জু ছিল ফুলের মতো কোমল এবং যেন ফুলের সৌরভের মতোই পলকা। সে আমার মতো অত গরিব ও নীচু জাতির ছিল না। খুব অল্প বয়সে সে মাকে হারিয়েছিল। মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো তখনকার সামাজিক রেওয়াজ ছিল না কিন্তু তার বাবা তাকে বাড়িতেই পড়তে ও লিখতে শিখিয়েছিলেন এবং খুব কম শেখান নি। তার বাবা আমার মতোই একজন সরকারী আমলা ছিলেন এবং আমি তাঁরই অধীনে আমার কাজ শুরু করেছিলাম। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন এবং এই সূত্রেই জুয়ান-জুর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। জুয়ান-জুর অদ্ভুত পারদর্শিতা ছিল গণিতে এবং খুব সহজেই সে জটিল গাণিতিক সমস্যাগুলি সমাধান করতে পারত। সত্যি কথা বলতে কি এভাবেই আমাদের বন্ধুত্বের সূত্রপাত হয় - ও আমার কর আদায়ের হিসেব মেলাত, আর সেই সময়ে আমি আমার একমাত্র প্রিয় শখ - যা তখন শখ ছাড়া আর কিছুই ছিল না - লিপিলেখা অভ্যাস করতাম। জুয়ান-জুর চেহারা ছিল ছোটখাট সুন্দর, পাতলা হাত-পা, গোল মুখায়বব, কিন্তু তার পুরো চেহারার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিল তার গভীর কালো চোখদুটি যা সবসময় শান্তি বিকিরণ করতো  - তার চোখে চেয়ে আমি তার মনকে পুরো দেখতে পেতাম। তার চোখগুলো ছিল একটি হ্রদের স্ফটিক-স্বচ্ছ জলের মতো নির্মল যার তলদেশে আমি এক নিঃশ্বাসে পৌঁছতে পারতাম। সে আনুষ্ঠানিকভাবে আমার বাগদত্তা না হলেও  আমাদের সম্পর্ক কারো কাছে গোপন ছিল না।


আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম - আর কখনো বা নীরবে কেবল পাশাপাশি বসে থাকতাম - তবে সে বেশিক্ষন চুপচাপ কোনোদিনই থাকতে পারতো না। তবে সেদিন সন্ধ্যায় তার মুখেও মৌনতা বাসা বেঁধেছিল। হয়তো সেও অনুভব করছিল, আমারই  মত, যে আমাদের আর কখনও দেখা নাও হতে পারে। সবাই জানত যে রেশম পথের প্রতি বাঁকে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর বিপদ তার ওপর ছিল পদে পদে দস্যুর ভয় - আর দস্যুদের নির্দয়তার কোন সীমা ছিল না। তাদের জন্যেই মূলতঃ ব্যবসায়ী যাত্রীরা সবসময় দল বেঁধে একসাথে বড় কাফেলায় চলত, তবু ঐসব সশস্ত্র এবং অস্ত্রচালনায় সুদক্ষ ডাকাত দলের - যাদের কাছে মানুষ খুন করা ছিল জলভাতের মতই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার - তাদের কাছ থেকে সত্যি বলতে কি কোন রেহাই ছিল না। ওই দীর্ঘ পথের সমস্ত খুঁটিনাটি ছিল তাদের নখদর্পণে - তাই তারা যখন ইচ্ছে তাদের সুবিধামত জায়গায় হামলা চালাত এবং লুঠের মাল নিয়ে অনায়াসে পালিয়ে যেতে পারত। পথচারীদের মধ্যে যারা দস্যুদের হাত থেকে রক্ষা পেত, তাদের অনেকেই প্রকৃতির খামখেয়ালীতে প্রাণ দিত।


সেই রাতে আমরা যখন মন্দিরের চত্বর থেকে উঠে বাইরে বেরিয়েছিলাম তখন চাঁদ প্রায় আমাদের মাথার উপরে উঠেছে। আমাদের দুজনের ছায়া এক সাথে মন্দিরের চত্বরে গাছের ছায়ার সাথে মিশে আলো-আঁধারির এক অপরূপ মায়াজাল তৈরী করেছিল, অনেকটা এক গোলকধাঁধার মতো যার সমাধান আমাদের কারোরই জানা ছিল না। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জুয়ান-জু জানতে চেয়েছিল যে আমার অনুপস্থিতিতে প্রতি মুহূর্তে এক  আশা-হতাশার দোলার মাঝে সে কীভাবে বেঁচে থাকবে। মাথার ওপরে ত্রয়োদশীর চাঁদের দিকে চেয়ে একটা প্রাচীন কবিতার কয়েকটি লাইন বলেছিল, "ওগো মরুভূমির আকাশের চাঁদ, শূন্যতার মধ্যে কিসের ওপরে তুমি তোমার আলো বিকিরণ করছো?...ওগো মেয়ে, তোমার প্রিয় মানুষটি ফিরতে যে এখনো অনেক অনেক দিন বাকী। ওগো যুবতী, এখনই দীর্ঘশ্বাস ফেলো না, তোমাকে যে অনেক দিন ধরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর শ্বাস ফেলতে হবে।"


তার চোখে জল ঝরছিল। নীরবে আমরা পথে বেরিয়ে ছিলাম, হাতে হাত নিয়ে। ওর বাড়ীর দরজায় পৌঁছে শেষবারের  মতো তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, তারপর একবারও পিছনে না তাকিয়ে দ্রুতপদে প্রায় পালিয়ে এসেছিলাম যাতে সে আমার চোখ থেকে ঝরতে থাকা জল না দেখতে  পায়। সারা রাত আর  আমার চেখে ঘুম ছিল না । ভোর হওয়ার আগে যখন শিঙ্গার শব্দ যাত্রা শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল, বাইরে তখনো অন্ধকার। উটদের গলার ঘন্টার শব্দ যখন আমার বাড়ির কাছাকাছি এলো, তখন আমি ভোরের সেই অস্ফুট আলোয় রাস্তায় বেরিয়ে এলাম আমার ঝুলি কাঁধে। পশ্চিম আকাশে তখনও চাঁদ জ্বলজ্বল করছে - সেই চাঁদ যা মাত্র কয়েক ঘন্টা আগেও আমাদের অশ্রুর সাক্ষী ছিল। 

 অন্তটীকা 

চাংগান : বর্তমান Xi’an
খোরাসান : বর্তমান আফগানিস্তান
ব্যাকট্রিয়া : হিন্দুকুশ পর্বতমালার উত্তরদিক থেকে অক্সাস (আমু দরিয়া) নদীর দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল যা এখন আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত
বালতিস্থান : কারাকোরাম পর্বতের দক্ষিণে শিনজিয়াং ও লাদাখের মধ্যবর্তী অঞ্চল। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ, এখন পাকিস্তান-অধিকৃত-কাশ্মীরে।
লিপিলেখা, লিপিবিদ্যা : Calligraphy

 পর্ব ২ 

চাংগান  থেকে যে রাজকীয় সড়ক সোজা পশ্চিম দিকে গেছে, আমাদের কাফেলার যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই পথে। আমাদের কাফেলায় শুরুতে ছিল প্রায় দু'শোটি সবল দু'কুঁজ বিশিষ্ট ব্যাক্ট্রিয়ার উট, তাদের ছাড়া গোবি ও তাকলামাকান মরুভূমির কঠিন পথ অতিক্রম করা নিতান্তই অসম্ভব ছিল। এক একটি উট পিঠে দু'শো জিনের বোঝা নিয়ে অনায়াসে প্রতিদিন একশো লি পর্যন্ত পথ অতিক্রম করতে পারত। তাদের পিঠের বোঝায় থাকত বিভিন্ন রকমের রেশমবস্ত্র, চীনামাটির বাসন, চা, কাগজ এবং হাতে তৈরী ব্রোঞ্জের শিল্পকাজ; আরো থাকত চাল, গম ইত্যাদি শস্যের ভার যেগুলি ছিল যাত্রীদের পথের রসদ, তাছাড়া ছিল সওদার জন্যে বাদাম, পেস্তা, খুবানি এবং বাদাম, নুডল, মশলা এবং আরও অনেক পণ্যদ্রব্যাদি। উট ছাড়া ছিল কারিগর, শ্রমিক এবং পশুচিকিৎসক ও বৈদ্যেরা তাদের ওষুধপত্র নিয়ে ।পথে লুঠেরা ডাকাতদের মোকাবিলা করার জন্যে থাকত সশস্ত্র কিছু সৈন্যও, যদিও সুরক্ষার জন্যে তারা কখনই যথেষ্ট ছিল না। কাফেলা যতই এগোতে থাকত, ততই পথের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট উটের দল তাদের দ্রব্যসম্ভার নিয়ে কাফেলায় যোগ দিত। এভাবে বাড়তে বাড়তে কাফেলাটিতে কখনো এক হাজারেরও বেশি উট হয়ে যেত,  আর যখন সেই বিশাল কাফেলা চলা শুরু করত, তখন তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েক লি লম্বা হয়ে যেত। এই দীর্ঘ কাফেলার প্রতিটি অংশ সবসময় রক্ষা করা মুষ্টিমেয় কিছু সৈন্যের পক্ষে কখনই সম্ভব ছিল না।

 
রেশম পথের যাত্রীদের  দীর্ঘপথে  বিরাম নেবার জন্য আর রসদ ফুরিয়ে গেলে সেগুলো পরিপূরণের জন্যে কয়েকটি শহরে থামতে হত - সেখানে তাদের থাকা-খাওয়া আর বিশ্রামের  ব্যবস্থা থাকত। চাংগান  থেকে চলার এক সপ্তাহ পরে আমরা পৌঁছাই এই পথের প্রথম বিরামস্থল কিনজু শহরে। আমি আমার জীবনে আগে এতদূর কখনো ভ্রমণ করি নি। অভিযানের উত্তেজনা আর  আকর্ষণ এবং অজানাকে জানার নেশা আমার মনেও ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হচ্ছিল, তবে তা আমার প্রিয়তমার ভাবনা থেকে আমার মনকে বিক্ষিপ্ত করতে সমর্থ হয় নি - সে তো সবসময়ই আমার সমস্ত ভাবনা-চিন্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কিনজু শহরের চারপাশে টিসিনলিং পর্বতমালার কোলে অনেকগুলো গুহা ছিল যেখানে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা পর্বতের নিস্তব্ধতার মাঝে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। কিছু কিছু গুহার দেয়ালে অপরূপ সুন্দর দেয়ালচিত্র আঁকা ছিল বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার ওপর ভিত্তি করে। মাজিশনের গুহায় এইসমস্ত চিত্রকলা আমাকে এতই অভিভূত করেছিল যে এই সুন্দর গুহাগুলো দেখাতে জুয়ান-জুকে সাথে নিয়ে আসার জন্য বাড়ি ফিরে যাওয়ার এক অপ্রতিরোধ্য তাগিদ আমি মনের মধ্যে অনুভব করছিলাম। আমাদের দীর্ঘ যাত্রাপথে যখন যেখানেই সুন্দর বা বিস্ময়কর কোনোকিছুর সম্মুখীন হয়েছি, তখনি বারবার এই তাগিদ আমাকে তাড়া করেছে - প্রতিবার মনে হয়েছে ও কেন এসব আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্যাবলী দেখার জন্য আমার সাথে নেই। তার স্মৃতি এমনি সদাসর্বদা  আমাকে পিছনে টানতে থাকত - এমনভাবে যে মনে হত যেন সময়ের চলার গতিও স্তব্ধ হয়ে এসেছে। স্মৃতি টানে পেছনের দিকে আর সময় চলে সামনের দিকে - এই টানাপোড়েনে মনও  কেমনজানি বিবশ হয়ে আসে।


কয়েক দিন পরে আমরা পৌঁছালাম বৌদ্ধ শিক্ষার জন্যে বিখ্যাত প্রাচীন শহর লানজুতে। চাংগানের মত এই শহরেরও পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পীত নদী - সেই ভয়ঙ্কর হুয়াং-হে যার গল্প যে কত শুনেছি। প্রতি বছর তার বন্যায় কতশত গ্রাম যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কত যে ফসল নষ্ট হয়েছে,  আর কত মানুষ আর প্রাণী যে ভেসে গেছে, তার ইয়ত্তা নেই; সে সব দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। কিন্তু এটাও সত্যি যে ওই বন্যা বয়ে নিয়ে আসত ফসলের জন্যে উপকারী পলিমাটি, যা জমিকে  উর্বর করত - কাজেই অভিশাপের সঙ্গে কিছু আশীর্বাদও হয়তো জড়িয়ে ছিল। জীবনে তো তাই সচরাচর ঘটে থাকে, অন্ধকারের সাথে আলো, নিরাশার সাথে আশা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে থাকে, যেমন রয়েছে আমার মনে - জুয়ান-জুকে ঘিরে। পলিমাটির জন্যে পীত নদীর জলের রং সাধারণতঃ হলুদ দেখায়, তাকে দেখে কিছুটা ভয়ের উদ্রেক হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় - তবে এখানে এটি শান্ত দেখাচ্ছিল, আর স্রোতও কম ছিল। লানজু ছিল নদীর দক্ষিণ তীরে, তাই নদী পার না হলে আমরা আর এগোতে পারতাম না। আমাদের অনেক দিন সময় লেগেছিল নদীটি পেরোতে, কারণ সেখানে কয়েক শ' নৌকা জুড়ে নদী পারাপারের জন্য ভাসমান সেতু তৈরী করা হয়েছিল। নদী পেরিয়ে শহরকে পেছনে ফেলে আসার ঠিক পরে পরেই আমরা আমরা দেখতে পেলাম চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং-এর নির্মিত সেই বিস্ময়কর কীর্তি চ্যাং চেং - চীনের সেই বিখ্যাত দেয়াল যা নির্মিত হয়েছিল বর্বর এবং নিষ্ঠূর উত্তরাঞ্চলীয় উপজাতিদের নিয়মিত উৎপাত ও আক্রমণ থেকে - বিশেষতঃ নিষ্ঠূর যাযাবর শিওংনু-দের হাত থেকে - সদ্যস্থাপিত সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার জন্য। চেংকে ডানদিকে রেখে আমাদের যাত্রা এখন চলবে পরবর্তী বেশ পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে - চেং-এর সাথে সাথে প্রায় সমান্তরাল পথে। যতক্ষণ চেংকে আমাদের ডানদিকে দেখা যাচ্ছিল, ততক্ষণই আমাদের মনে একটা নিরাপত্তার আশ্বাস ছিল - এটা তো সত্যি যে এখনো পর্যন্ত কোনোদিন চেং এর আশেপাশে কোনো লুঠপাটের ঘটনা ঘটে নি, এমনকি  দস্যুরাও এখানে হামলা চালাতে ভয় পেত। তার আসল কারণটি ছিল এই যে আমরা পৌঁছেছিলাম তাং সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমানার প্রায় কাছাকাছি - যেখানে ছিল এক বড়সড় সৈন্যদের ছাউনি।সম্রাটের কঠোর নির্দেশ ছিল যে কোন দস্যু যেন পথযাত্রীদের ওপর হামলা চালাতে না পারে। দস্যুরা ধরা পড়লে মৃত্যু ছিল অনিবার্য্য। তারা তাই সযত্নে এই অঞ্চল পরিহার করে চলত।


এর পরের যাত্রাবিরতির জায়গা ছিল উয়েই। অত্যন্ত প্রাচীন শহর - এখানে আমরা তিনশ' বছরের পুরানো গুহা মন্দিরে করুণাময় তথাগত বুদ্ধের বিশাল মূর্তি দর্শন করলাম। মূর্তিটি এতই প্রাণময় যে তার সামনে বসতেই মন শান্ত হয়ে এলো - বাড়ি ছাড়ার পর এই প্রথমবার মতো মনে এরকম শান্তি পেলাম। আমাদের রওনা হবার পর প্রায় মাসখানেক পরে আমরা পোছালাম ঝাংইয়ে - অনেকগুলো বৌদ্ধ গুহা পরিবেষ্টিত ছোট এবং শান্ত স্নিগ্ধ এক মরুদ্যান - এরকম মরুদ্যান রেশম পথের আনাচে-কানাচে অগুনতি ছড়িয়ে আছে। বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকা কাঠের তৈরী অগুনতি মন্দিরের সারি পাহাড়ের কোলে মাকড়সার জালের মতো পাথুরে প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে ছিল। কিন্তু এখানকার যে প্রায় অতিপ্রাকৃত দৃশ্য আমি এখনো চোখ বুজলেই চোখের সামনে দেখতে পাই তা হল এখানকার বিখ্যাত রামধনু পর্বত - লাল, সাদা, গোলাপী এবং সোনালি রঙের এক অপরূপ বর্ণালী শত শত লি জুড়ে পাহাড়ের পর পাহাড়ের ঢালে আর চূড়ায় এমন এক মায়াজাল ছড়িয়ে দিয়েছে, যেন স্বয়ং ঈশ্বর এই পর্বতমালার ওপরে তাঁর রঙের পাত্রকে অকৃপণ হাতে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছেন। সূর্যাস্তের মায়ালোকে সেই স্বর্গীয় দৃশ্য অনিবার্যভাবেই আমার মনকে আমার প্রিয়তমার স্মৃতিতে ভরিয়ে দিয়েছিল। আমরা যেন রংধনুর রঙে রাঙানো স্বপ্নের এক দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। রামধনু পর্বতমালা তার পরে প্রায়ই আমার স্বপ্নে হাজির হত, কখনো এখনও আসে আমাকে এই স্বপ্নের দেশে আবার নিয়ে যেতে।


এক সপ্তাহ পরে আমরা চেংয়ের আরও অনেক কাছাকাছি চলে আসি - বলতে গেলে প্রায় তার ওপরে, যখন আমরা গোবি মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তে প্রাচীন শহর জিয়ুগুয়ান থেকে প্রায় বার লি দূরে জিয়াউ পর্বতের পাদদেশে জিয়াউ গিরিবর্ত্নে পৌঁছাই। আমি এই গিরিবর্ত্ন সম্পর্কে এত গল্প শুনেছি যে এটা দেখে মোটেই অপরিচিত বলে মনে হয় নি। চেং বরাবর বিস্তৃত ছিল এক বিশাল দুর্গ ও সেনানিবাস - চেং দ্বারা সুরক্ষিত এবং প্রায় দুর্ভেদ্য এই দুর্গ তাং সাম্রাজ্যের সীমানার পশ্চিম প্রান্ত চিহ্নিত করত। এটি ছিল রেশম যাত্রাপথের একটি প্রধান ঘাঁটি - তা ছাড়াও এটিই সেই ছিল জায়গা যেখানে সরকারের বিরাগভাজন কর্মকর্তা, বিদ্রোহী আর অপরাধীদের চীন সাম্রাজ্য থেকে নির্বাসিত করা হতো - এখানেই তাদেরকে দুর্গের বাইরের কুখ্যাত “রাক্ষস দরজা”থেকে চিরকালের জন্য চীন সাম্রাজ্য়ের  বাইরে বহিস্কার করা হত - ক্ষমাহীন গোবি মরুভূমির ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতার মধ্যে সীমাহীন তপ্ত বালির সমুদ্রের বুকে। বেশির ভাগই অনিবার্য্য মৃত্যুর কবলে পড়তো - যদি কোনো ভাগ্যবান কোনোক্রমে বেঁচে যেত, তাকে অন্য দেশে বাস করতে হত, কারণ তার আর কখনও দেশে ফেরার অনুমতি ছিল না। জিয়াউ গিরিবর্ত্নের মধ্যেকার সেই ধনুকাকৃতি খিলানের দরজাকে লোকে নাম দিয়েছিল "দীর্ঘশ্বাসের দ্বার"- শত শত নির্বাসিতের দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী ছিল এই দরজা যা ছিল সভ্য জগতের অন্তিম সীমায়। এর দেওয়ালের গায়ে গায়ে সেই হতভাগা মানুষদের হস্তাক্ষর তাদের অজস্র দীর্ঘশ্বাস ব্যথা বেদনাকে ধরে রেখেছিল, যারা মরুভূমির অজানা নির্জন প্রান্তরে জীবন বিসর্জন দেবে এবং জীবনে আর কখনো তাদের প্রিয় দেশটিতে প্রিয়জনের কাছে ফিরতে পারবে  না। তখন কি আর জানতাম যে আমার ভাগ্যও এই দীর্ঘশ্বাসের দ্বারের সাথে কিভাবে জড়িত আছে?  যখন এই দরজা দিয়ে সাম্রাজ্যের সীমানার বাইরে পদক্ষেপ করছিলাম তখন আমার অন্তরের অন্তঃস্থল হতে এক সুগভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল - এটা ভেবে যে আমি আমার প্রিয়তমার কাছ থেকে কত দূরে চলে এসেছি - এতই দূরে যে আবার কখনো দেখা হওয়ার আশা করার মতো ভরসাও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল।


শীতের শুরুতে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল - কিন্তু এখনো যথেষ্ট শীত ছিল।  মরুভূমির মধ্যে রাতের বেলা শীতের হিমেল হওয়ায় আমাদের হাড়  কাঁপত কিন্তু আমাদের সাথের  উটগুলোর সেসব কোন সমস্যা ছিল না। তারা মরুভূমির গরম এবং শীত দুটোতেই অভ্যস্ত  ছিল। দুই সপ্তাহেরও বেশি পরে, আমরা যখন গোবি মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকারাশির মধ্য দিয়ে চলতে চলতে ক্লান্তির প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছেছি তখন হঠাৎ একটা বাঁক পেরোতেই আমাদের ক্লান্ত চোখের সামনে প্রকাশিত হল এক অনাবিল সৌন্দর্য্যের দৃশ্য - সামনে ছড়িয়ে থাকা এক অর্ধচন্দ্রাকৃতি হ্রদ তার স্ফটিকস্বচ্ছ নীল জলের সম্ভার নিয়ে। মরুবালুর শূন্যতার মাঝে এই দৃশ্য এতই অবাস্তব ছিল যে আমরা সবাই ভেবেছিলাম এটি একটি মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু এটা মরীচিকা ছিল না, এটা ছিল সত্যি সত্যিই এক মিষ্টি জলের হ্রদ। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে উটেরাও আকণ্ঠ সেই জল পান করেছিল। একজন সহযাত্রীর কাছ থেকে আমি শুনেছিলাম যে ওই হ্রদের জলের মধ্যে একধরণের লোহার পিঠওয়ালা মাছ এবং সাত-তারার আকারবিশিষ্ট ঘাস জন্মায় - তাদেরকে খেতে পারলে মানুষ নাকি অমর হয়ে যায়। হ্রদের তীরে ছিল বুদ্ধের একটি ছোট মন্দির। আমরা বুদ্ধের মূর্তির সামনে আগামী দিনগুলোতে ভয়াবহ তাকলামাকান মরুভূমির মধ্য দিয়ে নিরাপদে যাত্রার জন্য প্রার্থনা করলাম। তাকলামাকান নামের অর্থ হল "যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না" - সুদূর অতীত কাল থেকেই এটা হাজার হাজার ভ্রমণকারীদের পক্ষে সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। আমি বুদ্ধের কাছে আমার প্রিয়তমার জন্যও প্রার্থনা করলাম - যেন সে ভাল থাকে আর আমি যেন আবার তার কাছে ফিরে আসতে পারি। 


এরপরে আমরা পৌঁছাব তাকলামাকান মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তে এবং গোবির পশ্চিম প্রান্তের শহর দুনহুয়াংয়ে। আসলে এটি ছিল একটি বিশাল মরুদ্যান - এর পরেই আমাদের প্রবেশ করতে হবে তাকলামাকানের ধু ধু বালুর সমুদ্রে। জিয়াউ পাস থেকে দুনহুয়াং পৌঁছতে আমাদের প্রায় একমাস লেগেছিল।  শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল, তাই তাড়াতাড়ি কোনরকমে তাঁবু খাটিয়ে রাতের খাওয়া সেরে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে হঠাৎ অদ্ভুত ভূতুড়ে শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। আমাদের দলে যারা আগে এই পথে এসেছে সেই সব অভিজ্ঞ যাত্রীদের কাছ থেকে শুনি যে ওই সব ভূতুড়ে আওয়াজ আমাদের দক্ষিণে মিংশা নামক বালুস্তূপের দিক থেকে আসছে - ভূতেরা যখন বালুর ঢিবিগুলোর মধ্যে শ্বাস নেয় তখনি ওই বালুস্তূপগুলোর মধ্যে মরুভূমির বাতাস বইতে শুরু করে আর তাতেই ওই শব্দের উৎপত্তি হয়। তারা আমাদেরকে বারবার সাবধান করে দেয় যেন ভুলেও কখনো আমরা দক্ষিণ দিকে না যাই । ভয়ে আমরা তখন সবাই ত্রিশরন মন্ত্রটি আবৃত্তি করে চলেছি, আর কি আশ্চর্য্য কিছুক্ষণ পরেই সমস্ত আওয়াজ শান্ত হয়ে গিয়েছিল। মন্ত্রের সত্যিই শক্তি আছে। আমরা কখনই মিংশার দিকে যাইনি, তবে নগরীর দক্ষিণদিকে পাহাড়ের ঢালে কিয়ানফোডং গুহাগুলোয় অবশ্যই ঘুরেছিলাম - তাদের সংখ্যা নাকি ছিল এক হাজারেরও বেশি । দুনহুয়াং বৌদ্ধ শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল - শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এখানে এইসব গুহায় বসে ধ্যান করতেন। আমরা আরো দেখেছিলাম ইউগুয়ান বা দুনহুয়াং-এর "জেড দরজা" । দুনহুয়াং ছিল জেড পাথরের ব্যবসায়ের একটি প্রধান কেন্দ্র আর জেড দরজা ঘিরে  যে বিশাল জেড পাথরের সামগ্রীর বাজার গড়ে উঠেছিল তা ছিল যেমন চমকপ্রদ তেমনি বিস্ময়কর। 

 অন্তটীকা 

1 লি = 0.5 কিমি 
1 জিন = 0.5 কেজি
কিনজু : আধুনিক তিয়ানশুই
টিসিনলিং পর্বত : কুইলিং পর্বত
চ্যাং চেং : চীনের মহাপ্রাচীর
কিয়ানফোডং : হাজার বুদ্ধের গুহা, বর্তমানে মোগাও গুহা নামে পরিচিত

 পর্ব ৩ 

রেশম পথে কেবল পণ্যই চলাচল করত না, এটা ছিল নতুন নতুন ভাবনা ও আধ্যাত্মিকতারও আদানপ্রদানের পথ। কেবল ব্যবসায়ীরাই নয়, ভিক্ষু এবং তীর্থযাত্রীরাও এই পথে চলাচল করতেন, বৌদ্ধধর্ম প্রথম এই পথেই ভারত থেকে চীনে এসেছিল। আমি সুয়ান জ্যাংয়ের কথা জানতাম যিনি এক শতাব্দীরও বেশি আগে বৌদ্ধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করার জন্যে ভারতে গিয়েছিলেন -   চাংগানে তাঁর স্মারক সেই বিশাল পঞ্চতলবিশষ্ট "দয়ান প্যাগোডা" কেই বা না দেখেছে? তাঁর ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের পরে তাং সম্রাট এই "মহান রাজহাঁসের প্যাগোডা" তৈরী করিয়েছিলেন - পরিযায়ী পাখির সাথে সুয়ানজ্যাংয়ের ঘরে ফেরার তুলনা করে। তিনিও  দুনহুয়াং হয়েই  গিয়েছিলেন এবং এখানকার 'গ্রন্থাগার গুহায়' অনেক সময় অতিবাহিত করেছিলেন। এই গুহায় কয়েক হাজার পুস্তক ছিল যা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা অনেক যত্নসহকারে সুরক্ষিত রাখতেন - যে কেউ সেগুলো পড়তে পারত । আমিও এই গ্রন্থাগার গুহায় গিয়েছিলাম বেশ কিছু সময় নিয়ে। এতে যে কেবল ধর্মশাস্ত্রীয় পুস্তক ছিল তাই নয় - সোগডিয়ান এবং উইঘুর ভাষায় রচিত অন্যান্য পুস্তকও ছিল  বাণিজ্য ও সংস্কৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে।  আমি একটি বই হাতে নিয়ে দেখছিলাম যার ভাষা পড়তে পারি নি -  একজন সন্ন্যাসী আমাকে বলেছিলেন যে এটি পালি নামক একটি ভারতীয় ভাষায় রচিত। বারবার আমার জুয়ান-জুর কথা মনে হচ্ছিল  - এইসব জ্ঞানের ধন অন্বেষণ করতে ও যে কি ভীষণ ভালবাসে তা তো জানি। আমার অনুরোধে একজন সন্ন্যাসী আমায় উইগুর ভাষায় লেখা একটা পান্ডুলিপির  কিছুটা অনুবাদ করে শুনিয়েছিলেন। তার থেকে জানতে পেরেছিলাম যে রেশম পথে চীনদেশে যে সব পণ্যসামগ্রী আসত সেগুলির মধ্যে ছিল জরির কাপড়, ধাতব জিনিসপত্র, সুগন্ধি ধূপ এবং পারস্যের আতর, খোরাসানের নীলকান্তমণি, হিন্দুস্তান থেকে বিভিন্ন মূল্যবান পাথর, রোম থেকে স্ফটিক, এবং সেরেন্দিব থেকে প্রবাল এবং মুক্তো। রেশম পথের কল্যাণে দুনহুয়াং বিকশিত হয়েছিল  একটি বৃহত্তর বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে - পাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে রফতানির জন্য নিয়ে আসত পশম ও সুতির কাপড়, চা, চীনামাটির বাসনপত্র, ওষুধ, জেডপাথর, উট, ভেড়া, রং, শুকনো ফল, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এখানে আমাদের কাফেলায় প্রায় দু'শ উটের সংযোজন হল। আমাদের পুরো কাফেলায় এখন উটের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।


দুনহুয়াং ছিল রেশম পথের বিভিন্ন রাস্তার প্রথম সংযোগস্থল, পরেরটা ছিল কাশগড়। রেশম পথ কোনো একটি বিশেষ স্থায়ী রাস্তা ছিল না - অন্তর্জালের মতো তার বিভিন্ন রাস্তা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে রয়েছিল। অবশ্য রেশম পথের রাস্তাগুলো কখনোই স্থিতিশীল ছিল না - মরুভূমিতে জলের  উৎস, মরুদ্যানের অবস্থিতি এবং তাদের অন্তর্ধান অনুসারে রাস্তাগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হতে থাকত।  দুনহুয়াং অবস্থিত ছিল উত্তর এবং দক্ষিণের এমনি দুটি প্রধান বাণিজ্যিক রাস্তার মোড়ে। উত্তরের রাস্তাটি গিয়েছিল তাকলামাকান মরুভূমির  উত্তর প্রান্ত দিয়ে তুরফান ও আকসু শহর হয়ে, আর দক্ষিণ পথটি গিয়েছিল এই মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে খোটান হয়ে। উভয় রাস্তাই কাশগড়ে গিয়ে একসাথে মিলিত হত, তারপর সেখান থেকে কাফেলার পশ্চিম দিকের সুদীর্ঘ যাত্রা শুরু হত পামির পেরিয়ে, ব্যাকট্রিয়া, মধ্য এশিয়া ও ইরান পেরিয়ে ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীর ধরে লেভান্টে; তারপরে সেখান থেকে পণ্যদ্রব্য জাহাজে করে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে চলে যেত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে। সাম্রাজ্যের রাজধানী বাইজান্টিয়াম বা কনস্ট্যান্টিনোপল ছিল অনধিক দুই বৎসরব্যাপী সুদীর্ঘ এই যাত্রাপথের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল। আমি অবশ্য অতদূর যাব না - আমার যাত্রা শেষ হবে রেশম পথের বৃহত্তম কেন্দ্র কাশগড় পৌঁছে -  সেখানে সম্রাটের প্রতিনিধি আমার কাছ থেকে বাকি পথের দায়িত্ব নেবেন। দুনহুয়াং থেকে আমাদের কাফেলাটি যাবে দক্ষিণের পথে - লোপ নুর হ্রদ হয়ে । এটি উত্তরের পথের চেয়ে দীর্ঘ, কিন্তু সেটার মত অত বিপজ্জনক নয়; এছাড়াও এই পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক বেশি মরুদ্যান আর বিশ্রামের জায়গা, যেমন খোটান ছাড়াও কিয়েমো, কারান, নিয়া এবং ইয়ারকন্দ। আমাদের অনেকগুলি নদী অতিক্রম করতে হবে - কারকান, কেরিয়া, হোতান এবং ইয়ারকন্দ। এই সমস্ত নদী উত্তরদিকের আকসু নদীকে নিয়ে  তরীম অববাহিকার অংশ ছিল - এই নদী ব্যবস্থা থেকেই লোপ নূরের বিশালায়তন হ্রদ তার জলের যোগান পেত।


উত্তরের পথযাত্রীরা সত্যিই ভাগ্যবান, কারণ তারা স্বর্গীয় পর্বতমালা তিয়েন শানকে প্রত্যক্ষ করবেন তাদের ডানদিকে। এই পর্বতমালা স্বর্গের সাথে সরাসরি যুক্ত, কোন মানুষ সেখানে যেতে পারে না। বরফের স্ফটিক এই পর্বতমালার শৃঙ্গে সূর্যরশ্মিকে প্রতিবিম্বিত করে - এই পর্বত মেঘলোকের ওপারে তারকা, সূর্য ও চন্দ্রকে স্পর্শ করে রয়েছে। অসীম ভাগ্যবান ছাড়া কেউ এই স্বর্গীয় পর্বতমালা দেখতে পায় না। তবে আমরাও অবশ্য কম ভাগ্যবান নই, কারণ আমাদের চলার পথের বরাবরও  বাঁদিকে থাকবে কুনলুন পর্বতমালা। অতি পবিত্র এই কুনলুন, যা জেড পর্বতমালা নামেও বিখ্যাত যেহেতু এই পর্বতের ভেতরে আছে জেড পাথরের খনি।  সুপ্রাচীন এই পর্বতমালাকে বলা হয় "দশ হাজার পর্বতের পূর্বপুরুষ"; চীনারা একে দেবতাদের বাসস্থান বলে মানে। এতে আছে পবিত্র বৃক্ষরাজি এবং রূশুই নদী যেখানে কোন পাখির পালকও ভাসতে পারে না। এই পর্বতের পেছনে রয়েছে দেবদেবী ও প্রেতাত্মাদের বাসস্থান তিব্বতের রহস্যময় ভূমি। কুনলুন পর্বত একেবারে পামির পর্যন্ত বিস্তৃত। হায় রে  - এই সব বিরল সুন্দর জায়গায় যদি জুয়ান-জু আমার সাথে থাকতো -  এই কথাটা মনে এলেই বিষণ্ণতায় মন ছেয়ে যায়।


দুনহুয়াং ছিল আমাদের সভ্যজগতের শেষ সীমানায়  - এর পরেই আমরা শহরের ইয়ুমেন দ্বার পেরিয়ে তাকলামাকান মরুভূমিতে প্রবেশ করব যেখান থেকে কেউ ফিরে আসে না। আমাদের যেতে হবে লোপ নুর হ্রদের পশ্চিম প্রান্তের প্রাচীন শহর লুলান হয়ে। সেখানে চীন সম্রাটের একটা সেনানিবাস আছে, সেখান থেকে কয়েকজন সৈন্যকে আমাদের সাথে নিতে হবে, কারণ যে সব সৈন্যরা চাংগান  থেকে আমাদের সাথে এসেছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থও হয়ে পড়েছিল এবং তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। তবে লুলানের রাস্তাটি খুব বিপজ্জনক, সত্যি বলতে কি রাস্তা বলতে যা বোঝায় সেরকম কিছুই ছিল না।  উট এবং তাদের অভিজ্ঞ মাহুতরা না থাকলে আমরা ওই জনমানবহীন প্রাণের চিহ্নবিহীন উন্মুক্ত বালুকাময় প্রান্তরে কবেই হারিয়ে যেতাম।

 
তাকলামাকান! নামটা মনে পড়লে এখনও সেই যাত্রাপথের ভয়বক স্মৃতি আমার মনে ত্রাসের শিহরণ জাগায়। ভাবতে আশ্চর্য্য লাগে যে আমি দু'দুবার এই ভয়াবহ মরুপথ অতিক্রম করেও বেঁচে আছি। যতদূর চোখ যায় এবং যে কোনোদিকে চাওয়া যাক না কেন, শুধু ধু ধু বালুর সমুদ্র ছাড়া আর কিছই  চোখে পড়ে না। হাজার হাজার পথযাত্রী এখানে পথ হারিয়ে রুক্ষ মরুপ্রান্তরে প্রাণ দিয়েছে - সেই সব হতভাগ্যদের কঙ্কালে ছাওয়া এই মরুর পথ। জল নেই তাই নেই কোন গাছ বা গাছের ছায়া। দিনের বেলা যখন আগুনের হল্কার মতো উত্তপ্ত জ্বলন্ত বাতাস বইতে থাকে, তখন তার থেকে কোনো পরিত্রাণ নেই। গলার ভেতর তখন অসহ্য জ্বলতে থাকে - মরুপথে সেই জ্বলন হয়ে গিয়েছিল আমাদের চিরসাথী। গায়ের চামড়া ফেটে গিয়ে তা থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হতে থাকে - তার ওপরে আছে আগ্রাসী বালির ঝড়। সেই ঝড় ওঠার ঠিক আগে হঠাৎ আকাশ কালো অন্ধকারে ঢেকে যেত, দিগন্তে দেখা যেত অদ্ভুত সব রঙের ঝলকানি আর তারপরেই নেমে আসত ভয়াবহ বালুর ঝড়। রাত্রিবেলা হঠাৎ চারপাশ থেকে উঠে আসা এক ভয়ঙ্কর হাহাকার আমাদের শিরদাঁড়ায় ভয়ের শিহরণ জাগাত - কিন্তু তার কারণ অনুসন্ধান করার মতো সাহস আমাদের ছিল না। আমাদের সাথে প্রবীণ অভিজ্ঞ  যাত্রীদের ধারণা ছিল যে এই সব আওয়াজ হল যাদের কঙ্কালগুলো আমরা পেছনে ফেলে এসেছি, তাদেরই প্রেতাত্মাদের সম্মিলত চিৎকার। মৃত্যুর হাতছানি দেওয়া এই মরুভূমিতে বারবার আমরা এইসবের সম্মুখীন হয়েছি - অপ্রাকৃত দৃশ্য, নিস্ফলা, বন্ধ্যা পৃথিবী, ধূসর দিগন্ত, কোথাও বা হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার চিহ্ন এবং মানুষ ও পশুর কঙ্কাল। দীর্ঘ পথযাত্রায় এইগুলোই ছিল আমাদের সাথী। প্রায়ই আমাদের মনে হত যে আমাদের আগে যারা গেছে তাদের অনেকের মতোই এই মরুভূমিতে বুভুক্ষু মৃত আত্মাদের প্রেতনৃত্যে আমরাও প্রাণ হারাব। আমাদের অনেক সাথীই তো তাদের প্রাণ হারিয়েছিল।


কিংবদন্তিতে লোপ নূরকে বলে মৃত্যুর সমুদ্র - সেই পথে আমাদের প্রায়ই মনে হত হয়তো বা জীবনে আমাদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ নাও হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, কেউ কেউ ভয়েও। দু -দু'বার ডাকাতরা আমাদের আক্রমণ করেছিল এবং সেই আক্রমণে আমাদের বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু আমার কখনো গুরুতর কিছুই হয়নি - আমি অনেকবার প্রায় অলৌকিক ভাবেই  রক্ষা পেয়েছিলাম। আমি নিশ্চিত যে বুদ্ধের কাছে জুয়ান-জু-র নিয়মিত প্রার্থনা যা আমাকে রক্ষাকবচের মত ঘিরে রেখেছিল, তাই আমাকে বারবার অমঙ্গলের হাত থেকে রক্ষা করেছে। সেই প্রাণহীন বন্ধ্যা মরুপ্রান্তরে চলতে চলতে আমরা দিন এবং সপ্তাহের হিসেব হারিয়ে ফেলেছিলাম। সময় যেন গতিহীন অশুভ এক স্তব্ধতার মধ্যে আমাদের বন্দী করে রেখেছিল। আমরা ধীরে ধীরে ভয়ভীত হয়ে পড়ছিলাম, কিন্তু অবশেষে একদিন যখন লোপের নীল জলের প্রায় অসীম বিস্তার আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠল তখন সবাই আমরা যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম। আমাদের জয়ধ্বনিতে হ্রদের তীর মুখর হয়ে উঠেছিল। হ্রদের জল নোনতা, তবে উটদের কোন অসুবিধে হয়েছিল বলে মনে হয়নি, তারা পরমানন্দে সেই জল প্রাণভরে খেল। এর পরে লুলান পর্যন্ত আমরা কোনও মানুষের দেখা পাই নি। এই প্রাচীন শহরটি এককালে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত ছিল, কিন্তু এখন তার চারদিক ছিল ধ্বংসস্তুপে ভরা। সেনানিবাসটি ছাড়া আর কোথাও জীবনের কোনো চিহ্ন ছিল না। আমরা সেখানে কেবল একদিন মাত্রই ছিলাম, তাদের রসদের দুর্লভ সরবরাহের ওপর বিশেষ চাপ না দিতে। সেখান থেকে সৈন্যদের বদলে নিয়ে আমরা এবার দক্ষিণদিকে মরুর আরো গভীরের পথে চলতে শুরু করলাম। অবশ্য সরাসরি মরুভূমির মাঝখান দিয়ে নয়, তার দক্ষিণ কিনারা ধরে। 


তাকলামাকানের কিনারায়  ছোট ছোট অনেক মরুদ্যানকেন্দ্রিক জনপদ ছিল, যেমন মিরান, চার্কিলিক, কারকান, চেরচেন, এন্দের, নিয়া কেরিয়া ইত্যাদি। এদেরই মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে আমরা এগোচ্ছিলাম এই পথের বড় জনপদ খোটানের দিকে । এই সব শহরগুলোর বেশিরভাগই ছিল স্বাধীন শহর-রাজ্য, রেশম পথের যাত্রীরা আর বাণিজ্যই ছিল তাদের জীবনধারণের একমাত্র  উপায়। পথে আমাদের অনেকগুলো ছোট ছোট নদীও পেরোতে হয়েছিল, তাদের মধ্যে কোনো কোনোটার উপর ঝুলন্ত সেতু ছিল এবং সেগুলি পেরোতে আমাদের কোনও সমস্যা হয়নি। অন্যগুলোর জন্য নৌকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না - সেগুলো পেরোতে তাই অনেক বেশি সময় লেগেছিল। ভাগ্যিস এই সব পারাপারের জায়গাগুলো জনপদের কাছাকাছি ছিল, নইলে কোথায় আমরা নৌকা পেতাম? পথে কত মাস যে এর মধ্যে কেটে গেছে  আমাদের কোনও হিসেব ছিল না। উদরাময় এবং নিরুদন আমাকে বেশ কয়েকবার অসুস্থ করেছিল, তবে সাথে আসা ডাক্তারের ওষুধ এবং অবশ্যই আমার জুয়ান-জুর প্রার্থনা আমাকে প্রতিবারই তাড়াতাড়ি ভালো করে তুলেছে। অনেক জায়গায় আমরা রেশম পথ ধরে দীর্ঘ-দূরত্বের বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের নিদর্শন ও অভিজ্ঞান দেখেছি তার বেশিরভাগই হিমালয়ের দক্ষিণে বিস্তৃত বিশাল ভূমি ভারতের সাথে সম্পর্কিত। পথের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোয় আমরা ভারত থেকে আনা ধম্মপদের প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, বুদ্ধের জীবনের ওপর আধারিত পাথরের এবং পোড়ামাটির ভাস্কর্য ইত্যাদি দেখতে পেয়েছি। ভারতবর্ষের পাশাপাশি মধ্য এশিয়া থেকেও আসা বহু প্রত্নসম্পদ আমরা দেখতে পেয়েছিলাম।


এইসব ছোট ছোট শহর রাজ্য পেরিয়ে অবশেষে আমরা খোটানে পৌঁছালাম। খোটান হল চীন, ভারত এবং পশ্চিম ও মধ্য-এশিয়ার সংযোগস্থল। শতাব্দীর ঐতিহ্যময় এখানকার জেড পাথরের বাজারটি রীতিমত বিস্ময়কর - যেমন তার বৈচিত্র তেমনি তার বিস্তার। বাজারের সমস্ত জেডই নাকি আসে কুনলুন পর্বতমালা থেকে। এই বাজার থেকে জুয়ান-জুয়ের জন্য আমি এক জোড়া জেডপাথরের ভারী সুন্দর কানের দুল, একটি গলার হার এবং পায়ের একজোড়া নূপুর কিনেছিলাম - এই সবগুলো অলঙ্কারই অবশ্য ফেরার পথে এক ভয়ঙ্কর বালুর ঝড়ে আমার কাছ হেকে হারিয়ে যায়। খোটান গত পাঁচ শতাব্দী ধরে বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল - বাস্তবে এটার পরিচিতি ছিল "খোটান বৌদ্ধ রাজ্য" নামে। আমাদের পরের এবং আমার শেষ গন্তব্য কাশগড় পৌঁছানোর আগের সর্বশেষ শহরটি ছিল ইয়ারকন্দ, কাশগঢ়ের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এক মরুদ্যানের মধ্যে, ইয়ারকন্দ নদীর তীরে।  কাশগড় এখান থেকে প্রায় চারশ' লি দূরে, কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখান থেকে কাশগড় পৌঁছাতে আমাদের প্রায় এক মাস লেগে গিয়েছিল -একটি প্রধান কারণ ছিল যাত্রীদের অসুস্থতা। রেশম পথে যাত্রীরা পেছন ফিরে তাকায় না - ইতিমধ্যেই আমাদের দলের শতাধিক সহযাত্রী এবং প্রায় সমসংখ্যক প্রাণী - রোগ এবং দস্যুদের কবলে প্রাণ দিয়েছিল।


অবশেষে আমরা তাকলামাকান মরুভূমির একেবারে পশ্চিমপ্রান্তের বড় শহর কাশগড় পৌঁছালাম। যদিও এটা ঠিক তাং সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তবু তাং সাম্রাজ্যের  জন্য এই শহর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল - প্রধানতঃ রেশম পথের বাণিজ্যের নিরাপত্তার কারণে। কাশগড়ে চীন সম্রাটের একটি সামরিক দুর্গ ছিল, আর সম্রাটের বাণিজ্যিক প্রতিনিধির কার্যালয়ও ছিল এই শহরে । তারিম অববাহিকার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এই বিশাল শহরের জলের যোগান ছিল কাশগড় নদী এবং আশেপাশের বিভিন্ন ঝর্ণা থেকে । কাশগড় ছিল চীনে রেশম পথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রস্থল। হান রাজবংশের সময় থেকেই রেশম পথের সমস্ত রাস্তা, তা উত্তর, দক্ষিণ বা অন্য যে কোনো দিকেই যাক না কেন, এই শহর না হয়ে তাদের যাবার কোন উপায় হিল না। এই শহর থেকেই সবাইকে আগামী দীর্ঘ পথের রসদ নিয়ে যেতে হত। পামিরের পাদদেশে একদিকে ক্ষমাহীন এক বিশাল মরুভূমি আর অন্যদিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত  কাশগঢ়ের বিচ্ছিন্নতা আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল জুয়ান-জুর থেকে আমার নিজের বিচ্ছিন্নতার কথা। সে তো এখন আমার থেকে কয়েক হাজার লি দূরে। কাশগড়ে এসে আমরা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে চাংগান  থেকে যাত্রা করার পর প্রায় এক বছর সময় পেরিয়ে গেছে - শুধু  তাকলামাকান মরুভূমির প্রায় সাড়ে চার হাজার লি পথ পেরোতেই আমাদের প্রায় সাতমাস সময় লেগেছিল। এক শীতের শুরুতে আমরা চাংগান  ছেড়েছিলাম, আর এখন কাশগড়েও শীতের হিমেল হাওয়া ধীরে ধীরে বইতে শুরু করেছে।  বার বার মনে হচ্ছিল জুয়ান-জু এখন কি করছে, কেমন আছে? একাকীত্বের বিষাদ এই এক বছরে তাকে আরো কত সুন্দর করে তুলেছে?

 অন্তটীকা 

সুয়ান জ্যাং : আমরা জানি হিউয়েন-সাং নামে
খোরাসান : বর্তমান আফগানিস্তান
সেরেন্দিব : বর্তমান শ্রীলংকা
ইয়ুমেন দ্বার : জেড গেট

 পর্ব ৪ 

 

কাশগড়ে সম্রাটের প্রতিনিধির সাথে দেখা করে আমি তাঁকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলাম এবং সম্রাটের কাছ থেকে যে সব জিনিসপত্র নিয়ে নিয়ে এসেছিলাম সে সবও তাঁর কাছে হস্তান্তরিত করলাম। এখন থেকে  বাইজেন্টাইন সম্রাটের কাছে সেগুলো পৌঁছে দেওয়া তাঁর দায়িত্ব হবে। তিনি আমার থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা হয়েছে কি না তার খোঁজ নিলেন এবং যথেষ্ট  বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিলেন যাতে আমি আবার ফিরে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক শক্তি তাড়াতাড়ি পুনরুদ্ধার করতে পারি। তিনি এও খবর দিলেন যে অন্য একটি কাফেলা দুই সপ্তাহ  পরে চাংগানের দিকে যাত্রা শুরু করবে - তাদের সঙ্গে ফেরার জন্য আমি যেন প্রস্তুত থাকি। অবশ্য যাত্রা শুরু হতে হতে প্রায় এক মাস লেগে গিয়েছিল। আবার এই একই পথ - আবারো সেই  তাকলামাকান মরুভূমির নীরবতা, আবার সেই মরু-শহরগুলো ভেতর দিয়ে প্রত্যাবর্তন সে সব শহর-রাজ্যগুলো কয়েক মাস আগেই পেরিয়ে গিয়েছিলাম। আবারো সেই একই সমস্ত অভিজ্ঞতা - দস্যুদের উৎপাত, মৃত্যু, অসুস্থতা এবং মানসিক বিষণ্ণতা। কোনদিন কি আর সত্যি সত্যি ঘরে ফেরা হবে?


দুনহুয়াং পৌঁছানোর আগেই আমাদের ওপরে ভাগ্যের আরো এক নির্মম আঘাত এক ভয়ানক বালুঝড়ের আকারে নেমে এসেছিল। তাকলামাকানের পথে আমরা আগেও অনেকবার বালুঝড়ের কবলে পড়েছি  কিন্তু এত হিংস্র বালুঝড় আমরা আগে কখনও দেখিনি। তখন পুরো গ্রীষ্মকাল, দিনের উত্তপ্ত দাবদাহ এড়াবার জন্যে আমরা কেবল রাতের বেলাই  ভ্রমণ করতাম, আর সারা দিন তাঁবুতে বিশ্রাম নিতাম। ঝড়টা তখনই এল ঠিক যখন বিকেলে আমরা যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করেছি আর তাঁবুগুলি গোটাতে শুরু করেছি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেখতে দেখতে নীল আকাশ কালো অন্ধকার হয়ে গেল। আমাদের সাথের উটেরাও হঠাৎ  ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল, তারপরে তারা সবাই একে একে বসে তাদের মাথাটি বালির মধ্যে গুঁজে দিল যেন ভাগ্যের হাতে নীরবে আত্মসমর্পণ করে, একটিবারের জন্যও  বালু থেকে মুখ না তুলে। দেখতে না দেখতে আমরা কোনোকিছু বোঝার আগেই  প্রচন্ড বেগে উত্তপ্ত বালুরাশির ঝড় আমাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে তাঁবু উপড়ে ফেলে দিয়ে জিনিসপত্র উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগল -  তাদের কাছ থেকে পালাবার কোনো উপায় ছিল না। মানুষ আর পশু সবাই সেই বালুর নীচে  ধীরে ধীরে চাপা পড়তে লাগলো, ঝড়ের শব্দে তাদের আর্তচীৎকারও শোনা যাচ্ছিলো না । আমার এখনো ভাবতে আশ্চর্য্য় লাগে কি করে আমি সেই মহাবিপর্যয় থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। ধ্বংসের এই তাণ্ডবলীলার পরে সেই আগ্রাসী বালুঝড় যেমন আচমকা এসেছিল তেমনি আচমকাই হঠাৎ থেমে গেল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা পঞ্চাশেরও বেশি লোককে হারিয়েছি এবং আমাদের অর্ধেক জিনিসপত্র, রসদ এবং এই পথের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জলের সম্ভার  সম্পূর্ণ হারিয়েছি।  আমার একটি ঝুলি যাতে জুয়ান জুর জন্যে কেনা অলংকারগুলো সযত্নে রেখেছিলাম কোথায় উড়ে গেছে।  কিন্তু আশ্চর্য্যের কথা - একমাত্র উটগুলিরই গায়ে আঁচড়টি পর্য্যন্ত  লাগে নি। ঝড়ের সময় তারা সবাই বালুর নীচে চাপা পড়ে গিয়েছিল, ঝড় শেষ হওয়ার পরে তারা একে একে একে গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে লাগল - তাদের দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই যে তাদের ওপর দিয়ে একটু আগেই এরকম এক বিদ্ধংসী  ঝড় বয়ে গেছে।


রেশম পথে সাথী যারা প্রাণ হারিয়েছে তাদেরকে কবর দেওয়ার রেওয়াজ নেই, আর তা সম্ভবও নয়, এইরকম পরিস্থিতিতে যা করা হয়, আমরাও কেবল তাদের আত্মার জন্য প্রার্থনা করে আগে এগিয়ে গেলাম। আমাদের তাঁবুগুলি সমস্ত উড়ে গিয়েছিল, কাজেই আমাদের থাকার কোনো জায়গা ছিল না - না ছিল কোন খাবার আর জল। তবে ভাগ্যক্রমে দুনহুয়াং খুব বেশি দূরে ছিল না তাই দেড়দিন পরে প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় আমরা কোনরকমে সেখানে পৌঁছে যেতে পেরেছিলাম। স্থানীয় প্রশাসন সঙ্গে সঙ্গে আমাদের থাকাখাওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা করেছিল। সভ্য জগতে ফিরে পর্যাপ্ত বিশ্রামের পর আমরা আবার যাত্রা করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তার প্রায় তিন সপ্তাহ পরে যখন জিয়ুগুয়ান দুর্গ শহরে প্রবেশ করলাম তখনি মনে হল যে আমি আমার ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে খুব বেশি দূরে নই, আর এতদিন পরে এই প্রথম মনে হল যে সত্যি সত্যিই তার কাছে ফিরে চলেছি। শিগগীরই তার সাথে আবার আমার দেখা হবে, আর জীবনে কখনও তাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।


শহরটিতে একটি আনন্দময় আমেজ ছিল - দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো একটি বড় উৎসবের আনন্দে মেতে হয়েছে। বাড়িঘর থেকে রংবেরঙের পতাকা ঝুলছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাদকদের  ছোট ছোট দল বিভিন্ন বাজনা বাজাচ্ছে, লোকজন অলস মেজাজে সুন্দর পোশাকে সেজেগুজে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে,  কোথাও কোনো ব্যস্ততা নেই। তাদের জিজ্ঞেস করে জানলাম যে গানঝৌ প্রদেশের প্রশাসক তাঁর সম্প্রতি বিবাহিত স্ত্রীর সাথে এই শহরে বেড়াতে এসেছেন এবং পুরো শহরের সবাইকে মধ্যাহ্নভোজে সেদিন নিমন্ত্রন করেছেন। রেশম পথের বাণিজ্যের কল্যাণে গানঝৌ হয়ে উঠেছিল চীনের সচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশগুলির অন্যতম - তার প্রশাসকও তাই ছিলেন চীনের রাজকীয় তন্ত্রের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি ছিলেন জিয়েদুশি - একজন সামরিক প্রসাশক যার অধীনে  ছিল একটি নিজস্ব সেনাদল। যেহেতু আমরা সেদিন শহরে প্রবেশ করেছিলাম, শহরের লোকেরা আমাদের সাদর আমন্ত্রণ যে আমরাও মধ্যাহ্নভোজে যোগ দিতে পারি। আমাদের খুব ভাল লেগেছিল - ঘরে আপনজনের কাছে ফেরার আগে পথশ্রমে ক্লান্ত দেহ মনকে চাঙ্গা করে তুলতে এর থেকে উপযুক্ত স্বাগত আর কি হতে পারে? রাত্রিবাসের জায়গায় গিয়ে আমরা ভাল করে স্নান করলাম, তারপরে সবচেয়ে ভাল পোশাক যা ছিল তা পরে রাস্তায় এসে দুর্গের পথে চলমান জনস্রোতে মিশে গেলাম। দুর্গের ভেতরেই মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল।


হলুদ-ধূসর পলিমাটির ইঁট দিয়ে তৈরি দুর্গটি ছিল শহরের একপ্রান্তে জিয়াউ গিরিবর্ত্নের ঠিক মুখে। তার সামনে প্রসারিত ছিল নির্জন গোবির অসীম বালুকাসমুদ্র  যার ভেতর দিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বণিক, সন্ন্যাসী, অভিযাত্রী এবং পরিব্রাজকরা পরিক্রমণ করেছেন, অনেকে হয়তো বা প্রাণও হারিয়েছেন। মরুভুমির তপ্ত বুকে হয়তো এখনো তাদের কঙ্কাল পড়ে রয়েছে, তার বাতাসে তাদের শেষ নিঃশ্বাসের রেশ হয়তো এখনো কান পাতলে শোনা যাবে। দুর্গের প্রবেশপথের কাছে একটি সুউচ্চ মিনারের মাথায় লেখা ছিল: "স্বর্গের নীচের প্রথম এবং বৃহত্তম গিরিবর্ত্ন”। সেনানিবাসটি ছিল দুর্গের ভেতরে আরেকটি পরিবেষ্টনীর মধ্যে, তার  কেন্দ্রস্থলে একটি সুবৃহৎ দ্বিতল প্রাসাদ ছিল যেখানে সেনাধ্যক্ষ থাকতেন। এই প্রাসাদেই জিয়েদুশির মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল তার  একতলার  সভাঘরের চারদিকে ঘেরা বিশাল বাগানের মধ্যে - জায়গাটা এত বড় যে সেনানিবাসের প্রায় সবাই সেখানে একসাথে বসে খেতে পারে। জনতার ভিড় সেনানিবাসের মধ্যেকার ঘুরে যাওয়া রাস্তা দিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ধীরে ধীরে সেই প্রাসাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। জনতার মধ্যে আলোচনার বিষয় ছিল প্রধানতঃ জিয়েদুশির প্রশানিক এবং সামরিক সফলতা, তাঁর নববিবাহিত বধূর অপরূপ সৌন্দর্য এবং ভোজনের পদগুলির সংখ্যা, স্বাদ ও বৈচিত্র্য। প্রায় পুরো শহরটিই সেখানে ভিড় করেছিল - আর সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল সভাঘরের সামনে - সেখানেই জিয়েদুশি তাঁর স্ত্রীর সাথে বসে ছিলেন। সভাঘরের মুখে সৈন্যরা ভিড় নিয়ন্ত্রণ করছিল। আমরা যখন প্রবেশপথে পৌঁছালাম, তখন লোকের ভিড়ে সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সৈন্যরা জনতার ভিড়কে সুশৃঙ্খলভাবে ধীরে ধীরে সভাঘরের মধ্যে পরিচালিত করছিল যাতে লোকজন হলের শেষে বসা জিয়েদুশি ও তাঁর স্ত্রীকে অভিবাদন জানিয়ে বাইরের বাগানে বেরিয়ে যেতে পারে যেখানে খাবার ও পানীয় পরিবেশিত হচ্ছিল। 


আমাদের সামনে জনতার ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসছিল এবং আমরাও ধীরে ধীরে সভাঘরের মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত জিয়েদুশি এবং তাঁর স্ত্রীকে দেখতে পেলাম। মুহূর্তের মধ্যে আমার হৃদস্পন্দন থেমে গেল, আমার চোখের সামনে থেকে সমস্ত স্মৃতি-সত্তা-অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেল আর সাথে সাথে সময়ের চলাও স্তব্ধ হয়ে এলো। আমার সত্তার গভীরতা থেকে একটি আর্তচিৎকার উঠে এলো - "জুয়ান-জু"। আমি আমার পারিপার্শ্বিক বিস্মৃত হয়ে আমার আমার চারপাশে যারা ছিল সবাইকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, প্রহরারত সৈন্যরাও আমাকে আটকাতে পারছিল না। আমার শরীরে যে এত শক্তি হতে পারে তা আমার নিজেরই জানা ছিল না। জুয়ান-জু চমকে উঠে সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল - সেই দৃষ্টি আমি জীবনে কোনোদিনও ভুলতে পারব না - তাতে ছিল হাজার বছরের না বলা কথা। তার মুখ ফ্যাকাশে রক্তশূন্য এলো আর সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গেল। ততক্ষনে বেশ কয়েকজন সৈন্য আমাকে মাটিতে পেড়ে ফেলে নিষ্ঠূর ভাবে মারতে শুরু করেছে। সভাঘরের চারদিকে তুমুল বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোল -  জিয়েদুশি চিৎকার করে কোন আদেশ দিচ্ছেন আর সৈন্যরা আমাকে সমস্ত শরীরে আঘাত করে চলেছে। আমার নাক-মুখ থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, মুখের ভেতর রক্তে ভরে উঠেছে, চোখের সামনে দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে আসছে, কিন্তু সমস্ত চেতনা হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত শব্দহীন কণ্ঠে অন্তঃস্থল বিদীর্ণ করা একটাই আওয়াজ উঠছিল - "জুয়ান-জু"।


চেতনা ফিরে পাওয়ার আগে কতটা সময় কেটে গিয়েছিল জানি না। এখনও মুখে রক্তের স্বাদ ছিল কিন্তু কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, এক নিশ্ছেদ অন্ধকার আমাকে চারপাশে ঘিরে রেখেছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম আমি বোধহয় মৃত্যুলোকে রয়েছি , কিন্তু না - আমার সারা শরীরে অসহ্য ব্যাথা, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে এসেছে - এক ফোঁটা জলের জন্য প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি ডাকছে। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না, এবং তখনই বুঝলাম যে আমার মুখটি বাঁধা এবং হাত পাও বাঁধা। অন্ধকার এবং শারীরিক ব্যাথায় আমি বারবার চেতন অচেতনের মধ্যে যাতায়াত করতে থাকলাম - মনে হচ্ছিল যে এই চক্রটি অনন্তকাল ধরে পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। অবশেষে আমার চারপাশে অন্ধকার যেন একটু হালকা হয়ে এল - মনে হলো মানুষের গলার আওয়াজ পাচ্ছি , যদিও তা আসল অথবা কাল্পনিক তা বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু তারপর সত্যি সত্যি কেউ আমার মুখ আর হাত পায়ের বাঁধনগুলো খুলে দিল এবং আমার হাতে একটি গেলাস ধরিয়ে দিল আর তাতে একটি জলপাত্র থেকে জল ঢেলে দিল। আজন্ম তৃষ্ণার্তের মত সঙ্গে সঙ্গে সেই জল পান করলাম। সে আবার তাতে জল ঢেলে দিল এবং এভাবে আমি বারবার গেলাসটি খালি করতে থাকলাম। ততক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি যে সেখানে দুজন লোক রয়েছে। এবারে একজন আমাকে একটি থালায় কিছু খাবার আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম কিন্তু ততোক্ষণে আমার স্মৃতি ফিরে এসেছে এবং তার আগে আমার সাথে কি কি ঘটেছিল তা মনে পড়ে গেছে । আমি প্রচন্ড ক্রোধে খাবারের থালাটি ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। কিন্তু আশ্চর্য - লোকটি রেগে উঠল না, বরং সদয় কণ্ঠে বলল , "খাবার ফেলে দিতে নেই, কে জানে হয়তো দীর্ঘদিন কোন খাবার নাও পাওয়া যেতে পারে।" এই বলে সে বাইরে গেল এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই আরেকটি থালায় খাবার নিয়ে এসে আমাকে বলল খেয়ে নিতে। তার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে এবারে আমি খেতে শুরু করলাম আর ওই দু'জন আমাকে নিঃশব্দে দেখতে থাকল। খাওয়া শেষ হলে পর তারা আমাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এল - তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমাকে একটি একটি ভূগর্ভস্থ অন্ধকার ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। কারাকক্ষের দরজার বাইরে সর্পিল সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে ওপরে উঠেছে - কিছুদূর যাবার পর দিনের আলো, তারপরে দুর্গের দেয়াল এবং অবশেষে নীল আকাশ দেখতে পেলাম। আমার মন তখন ভাবনা-চিন্তাশূন্য হয়ে এসেছিল এবং আমার সাথে কি হবে তা নিয়ে তাতে ভয়ের লেশমাত্রও ছিল না। এখন কিছুতেই আমার আর কিছু এসে যায় না।


আমার দু'জন সহচরের মধ্যে একজনের পোশাক ও ভাবেভঙ্গিতে তাকে সাধারণ সৈনিক বলে বুঝতে পারছিলাম - কিন্তু অন্যজন নিশ্চিতভাবেই এক উচ্চতর আধিকারিক। দুর্গের প্রবেশপথ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে তারা আমাকে বাইরের রাস্তায় নিয়ে এল। আমরা কেউ এতক্ষন একটা কথাও বলিনি। অবশেষে গিরিবর্ত্নের খিলানটি দৃশ্যমান হল এবং তারপরে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রাক্ষস দরজায় এসে পৌছালাম । ততক্ষনে আমি বুঝতে পেরে গেছি যে আমার সাথে কি হতে যাচ্ছে - কিন্তু আমার মন সম্পূর্ণভাবে অনুভূতিশূন্য - শুধু  যে তাতে কোন ভয় নেই তাই নয়, বেঁচে থাকার কোন ইচ্ছেও নেই । রাক্ষস দরজায় আসার পর উটে  চড়ে আরেকজন সৈনিক একটি বিশাল ঝুলি সাথে আমাদের সাথে যোগ দিল। তারপরে সেই আধিকারিক তার পোশাকের ভেতর থেকে একটি কাগজ বের করে তা পড়তে শুরু করলেন। এটি ছিল  জিয়েদুশি কর্তৃক অনুমোদিত একজন বিচারকের আদেশ, আমার উদ্দেশ্যে। তার মর্মার্থ - নৈতিক অবক্ষয় এবং ঘৃণ্য পাপাচারিতার অভিযোগে সমস্ত নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আমাকে চীন সাম্রাজ্য থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হল। আমার জীবিতকালে সাম্রাজ্যে পুনঃপ্রবেশের  আমার আর কোন অধিকার থাকবে না।


দীর্ঘশ্বাসের দরজায় সেই সৈনিকের পিছনে আমাকে উটের পিঠে বসিয়ে দেয়া হলো। কত শি ধরে আমরা চলেছি আমার কোন বোধ  নেই, এক আগ্রাসী শূন্যতার অনুভূতি ছাড়া আমার মনে তখন আর কিছুই নেই, তবু হঠাৎ দেড় বছর পূর্বে চাংগান  থেকে রেশম পথে প্রস্থানের আগের সন্ধ্যায় জুয়ান-জুর আবৃত্তি করা  কবিতাটি আমার মনে পড়ল,"ওগো তরুণী, এখনই এত দীর্ঘশ্বাস ফেলো না, কারণ তোমাকে এখনো অনেক অনেক দিন ধরে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর শ্বাস ফেলতে হবে।" সেই মহাপ্রস্থানের দরজা পেরিয়ে আমরা নিঃশব্দে চলেছিলাম - সময়ের এবং দূরত্বের কোন হিসেব ছাড়া। বিকেলের সূর্য যখন দিগন্তের নীচে ঝুঁকে এল, তখন সৈনিকটি উট থামিয়ে আমাকে গোবির মহাশূন্যতায় নামিয়ে দিল। দরদভরা কণ্ঠে বললো, “আমাকে এখান থেকেই  ফিরে যেতে হবে। করুণাময় বুদ্ধ তোমাকে রক্ষা করুন ”, তারপরে তার সাথে নিয়ে আসা সেই মস্ত বড় ঝুলিটি  আমার হাতে তুলে দিল - তাতে ছিল কযেকদিন চলার মত জল এবং শুকনো খাবার।  পিছনে ফিরে সে ধীরে ধীরে গোবির বালুকারাশি মধ্যে মিলিয়ে গেল। মরুভূমির নিস্তব্ধতা আর নির্জন বালুর সমুদ্রে অনন্ত আকাশের নীচে রাত্রির নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ধীরে ধীরে আমার চারপাশে বন্ধুর মত ঘন হয়ে এলো। আমি উত্তপ্ত বালির উপরে বসে রইলাম কোন কিছুর দিকে না চেয়ে, কোনকিছু না দেখে, কোনকিছু না ভেবে। তারপরে যখন অন্ধকার চরাচরে বালুঢিপিগুলোর মধ্যে দিয়ে মরুভূমির বাতাস বইতে শুরু করল তখন রেশম পথের যাত্রার হাজারো স্মৃতি আমার মনে হতে লাগল - অন্য কোন দেশকালের স্মৃতি যাতে আমি সম্পৃক্ত নই। সেই অন্ধকার ও নির্জনতার মধ্যে আমি কিন্তু একটুও ভয় পাচ্ছিলাম না । সৈনিকটি আমাকে যে ঝুলি দিয়ে গিয়েছিল তা খুলে আমি সমস্ত খাবার দূরে ছুড়ে ফেলে দিলাম আর মরুভূমির বালির উপরে পুরো জলপাত্র উপুড় করে ঢেলে দিলাম। বহুযুগের তৃষিত বালু মুহূর্তের মধ্যে তার শেষ বিন্দুটুকুও শুষে নিল। মৃত্যু এখন আসুক আমার কাছে মুক্তির দূত হয়ে। মরুভূমির রাত শেষ হয়ে আবার একটি নতুন দিনের উদয় হল, কিন্তু আমি উঠলাম না। সূর্য আকাশপথ বেয়ে উপরে উঠে আমার ওপর অগ্নিবৃষ্টি শুরু করল, আমি উঠলাম না। সন্ধ্যা এলো তার অন্ধকারের কালো চাদর নিয়ে, আমি বসেই রইলাম। এমনিভাবেই অনন্তকাল কেটে গেল আর আমি ক্ষুধা ও তৃষ্ণায়, ব্যাথা ও বেদনায় জর্জরিত শরীরে, দেহ ও মনের সমস্ত যন্ত্রণা থেকে আমাকে চিরতরে মুক্তি দেওয়ার জন্য করুণাময় বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করতে করতে চেতনা হারিয়ে ফেললাম। 

 অন্তটীকা 

 

1 শি = 2 ঘন্টা
গানঝৌ : আধুনিক গানসু

 পর্ব ৫ 

পরম কারুণিক তথাগত আমার প্রার্থনায় সাড়া দিয়েছেন, কারণ আমি সত্যি সত্যিই জেগে উঠলাম স্বর্গে। চোখ খুলতে দেখলাম যে একটি কুটিরের মধ্যে শুয়ে রয়েছি এবং কানে আসছে কাছে কোথাও বয়ে যাওয়া নদীর বা ঝর্ণার জলের কুলুকুলু শব্দ। কুটিরের মধ্যে এক সন্ন্যাসী ধ্যানে মগ্ন রয়েছেন । জলের মৃদুমন্দ আওয়াজ ছাড়া এক অপরূপ শান্ত নিস্তব্ধতা চারদিকে বিরাজ করছে। এটি যে সত্যি সত্যি স্বর্গ, তাতে আর আমার কোন সন্দেহ রইল না। এক অনাবিল  শান্তি আমার সারা মন ছেয়ে আছে, এরকম শান্তি আমি আগে কখনো অনুভব করি নি। হিংসা-দ্বেষ যন্ত্রনায় ভরা পৃথিবীর বাইরেই একমাত্র এরকম উদ্বেগরহিত শান্তি পাওয়া সম্ভব। কেবল যা বুঝতে পারছিলাম না সেটা হল যে স্বর্গে আমার দেহ এত দুর্বল হয়ে আছে কেন যে আমি ওঠার চেষ্টা করেও উঠতে পারছি না। স্বর্গ তো জানি সমস্ত শারীরিক বোধের বাইরে।


যখন এইসব ভাবনায় আমার মন বিচলিত হয়ে আছে, ঠিক তখনই সন্ন্যাসী চোখ খুললেন, তারপর আমায় জেগে উঠতে দেখে বললেন, "যাক এত দিন পরে তোমার জ্ঞান ফিরে এসেছে। কিন্তু এখন ওঠার চেষ্টা করো না। প্রথমে তোমার কিছু খাবার প্রয়োজন।" তিনি উঠে বাইরে গেলেন আর অল্পক্ষণ পরেই ফিরে এলেন এক ধূমায়িত পাত্র হাতে - তাতে ছিল আমার অজানা কিছু সবজি। তিনি আমাকে খাবার জন্যে উঠে বসতে এবং খেতে সাহায্য করলেন - আমি আগে কখনো এত স্বাদিষ্ট খাবার খেয়েছি বলে মনে পড়ল না। তারপরে তিনি একটি বাটিতে কিছু তরলপদার্থ এনে আমাকে তা পান করতে বললেন - সেটা নাকি আমার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে। আমি এতক্ষণ যেন এক ঘোরের মধ্যে ছিলাম - অবশেষে বুঝতে পারলাম যে আমি সম্ভবত মৃত নই, জীবিত, এবং স্বর্গে নয়, পৃথিবীতেই কোন জায়গায় রয়েছি।


আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আমি কোথায়?"


-“তুমি শাম্ভালায় আছ”, সন্ন্যাসী বললেন।


-“শাম্ভালা কোথায়? আমি এর নাম আগে কখনও শুনিনি।"


-“শাম্ভালা এমন এক স্থান যা আমাদের দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তুজগত ও আধ্যাত্মিক জগতের মিলনস্থল ।পৃথিবীতে এরকম বেশ কয়েকটি জায়গা রয়েছে। এটি আলতাই পাহাড়ে।


-“আলতাই পাহাড়? কিন্তু সে তো আমি যেখানে ছিলাম সেখান থেকে অনেক দূরে। আমি এখানে এলাম কিভাবে?"


-“মরুভূমি অতিক্রম করার পথে আরেকটি দল তোমাকে অচেতন, প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। তারাই তোমাকে তুলে এনে এখানে দিয়ে গেছে। তুমি এক মাসেরও বেশি সময় অজ্ঞান হয়ে ছিলে - তবে তোমার দেহ তরল খাবার আর ওষুধ নিতে পারছিল। এভাবেই তুমি আবার করুনাময় বুদ্ধের কৃপায় বেঁচে উঠেছ।”


আমার এখন ঝাপসা মনে হতে লাগলো যে আমি অনেক লোকের কন্ঠস্বর শুনেছি, কিছু কিছু অস্পষ্ট ঘোলাটে ছবিও যেন দেখেছিলাম সেগুলোও মনে আসছে - বুঝতে পারলাম আমি যখন আমি জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে দুলছিলাম - এগুলো সেই সময়কার আর সাথে সাথে মনে পড়ে গেলো আগের সমস্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। হায় বুদ্ধ, আমি কেন মরে গেলাম না? জুয়ান-জু ছাড়া এই জীবনের উদ্দেশ্য কী? মনের ভাবনার ছায়া হয়তো আমার মুখেও প্রতিফলিত হচ্ছিল এবং সন্ন্যাসী বোধহয় তা বুঝতে পারছিলেন।  তিনি বললেন, “এখন আর বেশি কথা বলো না, তাতে কেবল মানসিক চাপ বাড়বে যেটা তোমার স্বাস্থ্যের জন্য এখন মোটেই ভাল নয়। বরং তুমি ঘুমোতে চেষ্টা কর। জেনো যে এই পৃথিবীতে যাই ঘটে তার পেছনে কোন না কোন উদ্দেশ্য থাকে - উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কিছু কখনই ঘটে না। আমাদের প্রতিটি কাজ, জীবনের প্রতিটি ঘটনা এই মহাবিশ্বের সাথে কোনো সূত্রে বাঁধা আছে এবং তার পেছনে একটি বৃহত্তর অর্থ রয়েছে। ধীরে ধীরে তুমি বুঝতে পারবে", এই বলে তিনি চোখ বন্ধ করে আবার ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন। আর আশ্চর্য্য, আমিও সব ভুলে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লাম।


সন্ন্যাসীর সেবায় এবং উপদেশে সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আমি অনেক সুস্থ হয়ে উঠলাম - এখন আমি পাহাড়ের চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে পারি। অঞ্চলটি মূলতঃ ঝোপঝাড় এবং তৃণভূমি দ্বারা আচ্ছাদিত, কিন্তু পাহাড়ের উঁচুতে বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও ফার, পাইন, বার্চ ইত্যাদি গাছও ছিল। পাহাড়ের কোল দিয়ে একটি ছোট নদী বয়ে যাচ্ছিল - পর্বতের ঢালেও অনেক ঝর্ণা ছিল। আমরা যে কুটিরে থাকতাম তার চারপাশে প্রচুর পরিমাণে শাকসব্জী ফলত এবং ভেষজ ঔষুধির গাছগাছড়াও ছিল - কাজেই আমাদের নিত্যপ্রয়োজনের খাবার ওষুধ ইত্যাদির কোন অভাব ছিল না। কয়েকমাস পরে পরে  সমতল থেকে কিছু লোকজন সন্ন্যাসীর আশীর্বাদ ও উপদেশ নিতে আসতেন, তারাও কিছু কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস উপহার দিয়ে যেতেন। সত্যি বলতে কি আমাদের প্রয়োজন যে এত সামান্য তা আমি আগে কখনো বুঝিনি। আমি প্রায়ই নদীর ধারে বসে জলের সাথে সাথে সময়ের প্রবাহ লক্ষ্য করতাম। জীবনে অনুসরণ করার মতো আমার কাছে আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না, নিজেকে কোনও কাজে লাগানোর কোন প্রেরণাও ছিল না। অনন্ত অবসরে বসে আমি আমার অতীত জীবন নিয়ে অনেক ভেবেছিলাম। জুয়ান-জুর কথা প্রথম প্রথম প্রায়ই আমার মনে আসত - বিশেষ করে চেতনা হারিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে শেষবারের জন্য যখন সে আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল,  সেই  দৃষ্টি তো আমি কোনোদিনই ভুলতে পারব না । সেই দৃষ্টির অব্যক্ত ভাষা ধীরে ধীরে আমার সমস্ত রাগ আর তিক্ততার বরফকে গলিয়ে দিয়ে মনকে তার জন্য এক অসীম সহানুভূতি আর মমতায় ভরে তুলেছিল। আমি দেড় বছর তাকে ছেড়ে দূরে চলে গিয়েছিলাম, আমার কোন খবর পাবার কোন উপায় তার কাছে ছিল না । তার তখনকার পরিস্থিতি এবং বিয়ের জন্য বাধ্যবাধকতা এসব কিছুই তো আমার জানা ছিল না, এবং কিছু না জেনে তাকে কঠোরভাবে বিচার করা সত্যি অন্যায় হত। তার বা অন্য কারো ওপরেই আমার আর কোন অভিযোগ ছিল না, আমি  শুধু আমার  বাঁচার তাগিদ হারিয়ে ফেলেছিলাম। জুয়ান-জুর সাথে সাথে আমার জীবনের সমস্ত অর্থও যেন চলে গিয়েছিল। কোন উদ্দেশ্য অথবা প্রত্যাশা ছাড়াই আমি যেন কেবল আমার অস্তিত্বকে একদিন থেকে পরের দিনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম। 


কিন্তু তারপরে ধীরে ধীরে আমার হতাশা এবং নেতিবাচকতা একটু একটু করে কমতে শুরু করে। তার একটি কারণ ওই জায়গাটি যার নাম সন্ন্যাসী আমাকে বলেছিলেন শাম্ভালা । তিনি আমাকে আরো বলেছিলেন যে পৃথিবীতে এমন মুষ্টিমেয় কয়েকটি পবিত্র স্থান রয়েছে যা স্বাভাবিকভাবেই প্রকৃতি থেকে শক্তি এবং চেতনা আহরণ করতে পারে। তিনি বলেছিলেন যে সাধারণতঃ উঁচু স্থানে যেমন পাহাড়ের ওপরে সমতল থেকে কম ধুলোবালি থাকে আর চেতনার  শক্তিও বেশি থাকে, তাই পাহাড়ে এলে লোকে মনে শান্তি পায়। মানুষ নিজের আত্মাকে পুনর্নবীন করে তুলতে, মনের অশান্তি দূর করতে আর প্রকৃতির সাথে একাত্ম অনুভব করতে শাম্ভালায় আসে। শাম্ভালা এমন এক জায়গা যা কিভাবে দুঃখকষ্ট উপেক্ষা করে এক পরিচ্ছন্ন মূল্যবোধ নিয়ে জীবনের পথে চলা যায় তা শেখাতে আমাদের সাহায্য করে। লোভ, ক্রোধ এবং স্বার্থপরতা - মনের এই সব নেতিবাচক প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের সহায়তা করার জন্য শাম্ভালার মত জায়গা তৈরী করা হয়েছে জাগতিক এবং আধ্যাত্মিকের  সংযোগস্থলে। আসক্তি সংসারে আমাদের সমস্ত দুঃখের মূল, কিন্তু শাম্ভালায় যেহেতু আসক্ত বা সম্পৃক্ত হওয়ার মতো কিছুই নেই, তাই সেখানে কোন অভাববোধ নেই আর তাই নেই কোন দুঃখ বা কষ্ট। শাম্ভালা বাস্তব পৃথিবীর প্রাত্যহিক দ্বন্দ্ব, আঘাত ও হতাশার কারণ অনুধাবন করে আমাদের অন্তর্নিহিত স্বরূপ উপলব্ধি করতে আমাদেরকে সাহায্য করে। জীবনে প্রতিটি মানুষের আসল উদ্দেশ্য হল নিজের আত্মস্বরূপ জানা  - একেই বলে চৈতন্যলাভ করা। পৃথিবীতে কেন এসেছি এটা যদি নিজে একবার উপলব্ধি করা যায়, তাহলেই একমাত্র সম্ভব অন্যদেরও তাদের অন্তর্জগতের যাত্রায় সাহায্য করা। সাধারণতঃ স্বার্থপর প্রবণতা আমাদের চালিত করে এবং এর শক্তি প্রচন্ড - তা আমাদের সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, আর এই অভ্যাসের অন্তহীন চক্রে আমরা উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে থাকি। উপলব্ধির যাত্রায় আমরা সবাই শাম্ভালার যোদ্ধা - এই চক্রকে অতিক্রম করে অহেতুক আসক্তি আর বিভ্রান্তি মুক্ত হওয়াই এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য। 


আসল শাম্ভালা তো আছে আমাদের মনোজগতে, সেখানে যা আমাদেরকে জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে - তা সম্পর্ক বা আসক্তি যাই হোক না কেন - তার রাশ আলগা না করলে সেই উপলব্ধিতে উপনীত হওয়া যায় না। একমাত্র যে সম্পূর্ণ অনাসক্ত অথচ অনলস ও সক্রিয়, সেই পারে নিজের সবকিছু ছেড়ে দিয়েও নিজের অস্তিত্বের ওপরে নিজেকে উত্তরণ করতে। তার একটা সহজ উপায় সন্ন্যাসী আমাকে শিখিয়েছিলেন ধ্যান করা, ধ্যান করার অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে মনের সূক্ষ্মতর স্তরে পৌঁছে এক চিরস্থায়ী শান্তির মধ্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া। এই শান্ত, আকাঙ্খ্যাশূন্য ও আসক্তিরহিত মনই ছিল শাম্ভালার যোদ্ধাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। শাম্ভালার যোদ্ধারা লোভ এবং আগ্রাসন কাটিয়ে উঠে দয়া, উদারতা এবং সাহস ও  আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে সত্যের ভিত্তিতে জীবনযাপন করেন।


আমি সন্ন্যাসীর কাছে আমার জীবনের কোন কথাই গোপন করিনি। ধ্যানের সাথে সাথে তিনি আমাকে মননশীলতারও  শিক্ষা দিয়েছিলেন। দিনের পর দিন  ধ্যান ও মননশীলতা অনুশীলন করতে করতে আমার মনও  ধীরে ধীরে শান্ত সমাহিত হতে শুরু করল - অশান্তি  আর বিক্ষোভ আস্তে আস্তে দূরে যেতে থাকল। বছরখানেক পরে আমি সন্ন্যাসীকে বললাম যে বাকী দিনগুলো আমি অন্য কোন জায়গায় কাটাতে চাই না। "উদ্দেশ্য ছাড়া এই মহাবিশ্বে কিছুই ঘটে না", সন্ন্যাসী বললেন। "কিন্তু তোমার কাজ রয়েছে  অন্য কোন জায়গায়। নিজের বিভ্রান্তিগুলো বুঝে নিজেকে জানতে তোমাকে এখানে আসতে হয়েছিল। সেই উদ্দেশ্য এখন পূর্ণ হয়েছে। এবারে এই জায়গা ছেড়ে তোমার নিজের জায়গা খোঁজার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সময় এসেছে।" কোথায় আমার জায়গা এই জিজ্ঞাসার তিনি কোন জবাব দেন নি - শুধু বলেছিলেন যে এটি আমাকে নিজেই খুঁজে পেতে হবে।


আমি এখন শিনজিয়াংয়ের উরুমচিতে থাকি। আমার জীবিকা লিপিবিদ্যা - যা শিখতে জুয়ান-জু আমাকে সাহায্য করেছিল। লোকে আমাকে  উরুমচির  অন্যতম প্রধান লিপিকার হিসাবে চেনে। কখনও কখনও তুরফান থেকে রেশম পথের ব্যবসায়ীরা আমার কাছ থেকে লিপি কিনতে  আসে - তারা আমাকে ভাল দামই দেয়। আমি স্থানীয় একটি মেয়েকে বিয়ে করেছি। সে আমাকে ভালবাসে এবং আমার তিনটি সন্তানের মা। আমরা সুখী এবং এক সরল অনাড়ম্বর  জীবন যাপন করি। জুয়ান-জুর কথা বলতে গেলে সে তো আমার সত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে। তার জন্যে আমার মনে ক্ষীণতম ক্ষোভও নেই, যেমন নেই আমার নিজের জীবনের প্রতিও কোন অভিযোগ। তার স্মৃতি আমাকে এক শুদ্ধ পবিত্র আনন্দ দেয়।  সে যেখানেই থাক না কেন, আমি যখনই মন্দিরে যাই, তার শান্তি ও সুখের জন্য আন্তরিক প্রার্থনা করি - এই প্রার্থনা আমার নিজের মনে সবসময় এক অনির্বচনীয় শান্তি বয়ে আনে। তার স্মৃতিকে আমি গভীর মমতা এবং ভালোবাসা দিয়ে ঘিরে রেখেছি, যেমন রেখেছি আমার অন্য সব সম্পর্কগুলোকেও। সর্বপ্লাবী এক অসীম মমতা আর ভালোবাসায় উত্তরণই তো জীবনের যাত্রার অন্তিম উদ্দেশ্য -  তাই নয় কি?

 লেখশেষ 

যে সব বইয়ের সাহায্য নিয়েছি: 

Colin Thubron, Shadow of the Silk Road, Vintage books, 2006


Peter Frankopan, The Silk Roads: A New History of the World, Bloomsbury, 2015


Susan Whitfield, Life along the Silk Road, University of California Press, 1999


Sun Shuyun, Ten Thousand Miles Without a Cloud, Flamingo, 2003


Chögyam Trungpa, Shambhala: The Sacred Path of the Warrior, Shambhala Publications, 1984