সাহিত্য পত্র

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস - "সেই চোখ"
পর্ব ১০
হিমু লস্কর 
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১
(প্রকাশিত হচ্ছে প্রতি শুক্রবার রাতে)

পর্ব ১

চৈত্র সেল প্রায় শেষের দিকে। সারা শহর যেন সেন্ট্রাল রোডের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বিচিত্র ভঙ্গিমায় সুর কেটে কেটে জিনিসপত্রের দরদাম হাঁকছে  বিক্রেতারা। হরেক-রকমের সামগ্রী। লোভনীয় অফার। বিছানার চাদর থেকে সেলাইয়ের সূঁচ এমনকি স্নানের সাবান--সব বিক্রি হচ্ছে জলের দামে। 
 

কে কার আগে কতটা কিনবে, এনিয়ে চলমান ঠেলা-ধাক্কার প্রতিযোগিতায় না পেরে আপাতত ফুটপাতের এক কোণে আশ্রয় নিয়েছে সৌম্য। ভিড়বাট্টা তার কোনও কালেই পছন্দ নয়। ধুর...তার চে বরং একটু এগিয়ে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালে মন্দ হয় না------ভাবতে ভাবতে সামনে পান-সিগারেটের দোকানটা লক্ষ্য করে এগোতে থাকে সে। 
 

ভিড় কেটে কোনও মতে এগোচ্ছে, এমন সময় অপরিচিত একটা লোক হ্যাঁচকা টানে তাকে পাশের ঘুপচি গলিতে ঢুকিয়ে দিল।

 

দিনের আলো শহরের আকাশ থেকে বিদায় নিয়েছে অনেক্ষণ। তবে দোকানপাটের লাইটের আলো এবং মানুষজনের হাঁকডাকে এতক্ষণ সেটা বোঝা যায়নি। কিন্তু গভর্ণমেন্ট গার্লস স্কুলের এই নির্জন গলিটা বেশ অন্ধকার। সৌম্য দেখে, তার সামনে লম্বা একটা ছায়ামূর্তি।

 

দিনকাল ভাল নয়। বিশেষকরে ব্রডগেজে যুক্ত হওয়ার পর শহরে ক্রাইম অনেকটা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে খানিকটা অসুরক্ষিত মনে হয় সৌম্য'র। কি করণীয় সেটা বুঝে ওঠার আগেই ছায়ামূর্তিটা জিজ্ঞেস করে, 'এত আনমনা হয়ে কোথায় যাচ্ছিস রে সৌম্য। পেছন থেকে তোকে এতবার ডাকলাম। কিন্তু শুনতেই পাচ্ছিস না।'

 

গলার স্বরটা বেশ পরিচিত।  কিন্তু কার,ঠিক ধরতে পারছে না সৌম্য। অন্ধকারে লোকটার মুখও দেখা যাচ্ছে না। বিড়ম্বনায় পড়ে গেল সে। বলল, 'মাপ করবেন, আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না।'
 

-'সে কি রে! শেষপর্যন্ত আমাকেই ভুলে গেলি! আমি সুমন রে সৌম্য। এবার মনে করতে পারছিস?'
 

মূহুর্তে কয়েকবছর পিছনে চলে যায় সৌম্য। সুমন ও সে--দুজনেই গান গাইত। সেই সুবাদে কলেজের সহপাঠীদের মধ্যে সুমনের সঙ্গে তার আলগা একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। যাকে বলে গভীর বন্ধুত্ব। ডিগ্রি ফাইনালের পরও বহুদিন তাদের এই সম্পর্কটা ছিল অটুট। কিন্তু মাঝখানে সুমনটা হঠাৎ চাকরি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায় তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

 

||||||

 

বহুদিন পর বন্ধুকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে সৌম্য। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর জিগ্যেস করে, 'কবে এসেছিস তুই?'

-'জরুরি কাজে কলকাতা থেকে আজ সকালের ফ্লাইটে এসেই চলে গিয়েছিলাম করিমগঞ্জের মর্জাৎ কান্দি। সেখান থেকে এইমাত্র ফিরলাম।  জানিস,এ-ই মূহুর্তে মনেমনে আমি তোকেই খুঁজছিলাম।'

-' আর দেখ, কেমন পেয়েও গেলি! একেই বলে বন্ধুত্বের টান।' , বলে সৌম্য। 


সুমন বলল, ' চল, তোকে নিয়ে এখনই একটা জায়গায় যেতে হবে। '

-'সে-কি রে, এইমাত্র দুই বন্ধুর দেখা। আর এখনই চলে যাব! আগে শঙ্করীতে গিয়ে দু'কাপ চা হয়ে যাক। তারপর যাওয়ার কথা ভাবা যাবে।'


-'চল তাহলে...।' বলে সুমন।

||||||||

একটু পরে। শঙ্করী হোটেলের ভিতরের রেস্তোরাঁয় বসে চা খেতে-খেতে সুমনের মুখে এক অদ্ভুত ঘটনা জানতে পারে সৌম্য। 
 

বহুপুরোনো একটা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছবি ও তালাচাবির সন্ধানে শিলচর এসেছে সুমন। ছবিটা একটা অদ্ভুত সুন্দর ফিরিঙ্গি মহিলার। তালাচাবিটার বয়স কমেও পাঁচশো বছর। ছবিটাও তা-ই। এগুলোর সঙ্গে আবার দুর্ধর্ষ পর্তুগিজদের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। 
 

প্রায় আড়াইশো বছর আগে পর্তুগিজরা বরাক উপত্যকার বদরপুরে এসে বসতি স্থাপন করে। সেই সময়কার দিনে মোজার্ট নামে জনৈক পর্তুগিজ পত্তনিদার তার সিন্দুকে তালাচাবিটা ব্যবহার করতেন। ছবিটা থাকত তার শোবার ঘরে টাঙানো। জিনিস দু'টো তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সুদূর পর্তুগাল থেকে নিয়ে এসেছিলেন। 
 

এই তালার একটা  বৈশিষ্ট্য হচ্ছে,এটাকে তার নিজস্ব চাবি ছাড়া খোলা যায় না। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এত বছর আগে বানানো হলেও তালাচাবিটায় আজ-অব্দি মরচে ধরেনি।  তাছাড়া বংশানুক্রমিক ভাবে মোজার্টের পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ছবি ও তালাচাবিটা না-কি সৌভাগ্যের প্রতীক। যার বাড়িতে থাকবে তার ভাগ্যে জুটবে অঢেল ধনসম্পত্তি। তবে ছবি ও তালা--দু'টো আলাদা হয়ে গেলেই বিপদ। গৃহস্থের অমঙ্গল হয়। তখন ছবিটা নানা অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা শুরু করে।

||||||

 

-'উরিব্বাস! এমন একটা অ্যান্টিক পিস শিলচরে আছে, আর আমরা তার খবরই জানি না!' -- সৌম্যর গলায় একরাশ বিস্ময়!

-'নে, এবার চটজলদি উঠে পড়।', তাড়া লাগায় সুমন। 

 

এক চুমুকে কাপের শেষ চা-টুকু  গলাধঃকরণ করে উঠে দাঁড়ায় সৌম্য। জিগ্যেস করে, 'কোথায় যেতে হবে, বল।'


-'আপাতত চেংকুড়ি রোড হয়ে ভকতপুর-সিঙ্গারির মধ্যবর্তী কোনও একটা জায়গায়। আমার কাছে পাকা খবর আছে, ওখানের ব্রজবল্লভ সিনহা নামে এক ভদ্রলোককে হালে ছবি সহ ওই তালাচাবিটা বিক্রি করেছে এক বাংলাদেশী নাগরিক। এমনিতে  ব্রজবল্লভবাবু পুরনো জিনিসের শৌখিন। তবে যদ্দূর জেনেছি, মোটা দাম পেলে তিনি তার সংগ্রহ থেকে কিছুকিছু জিনিস বেচেও দেন।'


সুমনের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে সৌম্য। বলে, 'সে নাহয় বোঝা গেল। কিন্তু সিঙ্গারি এলাকায় গিয়ে শুধু নামের উপর ভরসা করে ব্রজবল্লভ সিনহাকে খুঁজে বের করা আর খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা- একই কথা।'

-'ব্রজবল্লভবাবুর ঠিকানাটা আমার কাছে  আছে।', ছোট্ট করে উত্তর দেয় সুমন।

||||||||

একটু বাদে। সেন্ট্রাল রোড থেকে একটা প্যাডেল রিকশায় চড়ে দুই বন্ধু সিঙ্গারির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। অনেক বছর পর নিজের শহরে পা রেখেছে সুমন। ছেড়ে যাওয়া শহরে সে তার সোনালি অতীতকে খুঁজবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই হয়তো অটোরিকশায় চড়তে রাজি হয়নি সে। মূলত তার দাবিকে সম্মান জানাতেই প্যাডেল রিকশা ডাকা হয়েছে। নইলে শিলচরে এখন প্যাডেল রিকশার চল প্রায় নেই বললেই চলে।

ভিড়ের মধ্যে টুংটাং বেল বাজাতে বাজাতে নাজিরপট্টি হয়ে প্রেমতলা যেতেই বিস্মিত সুমন জিগ্যেস করে, 'এ-কি রে সৌম্য! বাঁ দিকের গোলদিঘিটা বেমালুম গায়েব হয়ে গেল কখন ?

-' ওহ্! তুই জানিস না বুঝি! দিঘি ভরাট করে এখানে এখন মাল্টিস্টোরেড শপিং কমপ্লেক্স। যার পোশাকি নাম গোলদিঘি মল। '

-' তাইতো দেখছি! দেবদূত সিনেমা হলটাও উঠে গিয়ে সেখানে একটা মল চালু হয়েছে! সবদিকে মলের ছড়াছড়ি! সত্যি,এই ক'বছরে চেনা শহরটা  এভাবে পাল্টে যাবে, ভাবিনি। '

সুমনের কথাগুলো যেন বিষন্নতায় মাখা। তার মনের অবস্থা বুঝে আর কথা বাড়ায় না সৌম্য। হালকা ঝাঁকুনি দিতে-দিতে  দু'জনকে নিয়ে এগিয়ে চলে রিকশা। অল্প এগিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে ত্রি-চক্রযানটা অম্বিকাপট্টি হয়ে কলেজ রোডের দিকে এগোয়। মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে জরুরি আলাপ সেরে নেয় সুমন।  পিছনদিক থেকে ভেসে আসা   কোলাহল ক্রমশ পাতলা হয়ে আসে...

 

পর্ব ২

আধঘন্টা পরে চেংকুড়ি রোড ধরে সৌম্যরা যেখানে গিয়ে পৌঁছালো, আলো-আঁধারি ঘেরা জায়গাটা সিঙ্গারি কবি'রগ্রাম।

খুব একটা রাত হয়নি। তারপরও রাস্তায় লোকজন নেই। তবে সামনের তেমাথায় একটা পানের দোকানের ঝাঁপ তখনও খোলা। একটু দূরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দু'টো লোক ফিসফিস করে কথা বলছে। দোকানির কাছে ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ির রাস্তাটা জেনে নেয় সৌম্য। কেন জানি তার মনে হয় লোক দু'টো কান খাড়া করে তার কথা-ই শুনছিল।

ভদ্রলোক থাকেন ডানদিকের গলির একেবারে শেষপ্রান্তে একটা বাড়িতে।  রিক্সাটাকে গলির মুখে রেখে সেদিকে এগিয়ে যায় দু'জন।গলিতে লাইটের ব্যবস্থা নেই।  তার ওপর দু'ধারে বাঁশঝাড় থাকায় জায়গাটা ঘন অন্ধকার। রাস্তায় সাপখোপ থাকতে পারে ভেবে পকেট থেকে মোবাইল বের করে আলো জ্বালায় সৌম্য। 

 

একটু বাদে দেড়তলা সমান উঁচু একটা সাবেকি আমলের বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ায় তারা। বারান্দায় কম ওয়াটের একটা বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে। এদিকটায় লাইনে সম্ভবত ভোল্টেজ অনেক কম। কাঠের দরজায় কড়া নাড়তে সুঠাম দেহের একটা লোক এসে দরজা খুলে তাদের আগমনের কারণ জানতে চাইল। নিজেদের পরিচয় দিয়ে সৌম্য তাদের আসার কারণ বর্ণনা করে। দু'জনকে বৈঠকখানায় বসিয়ে লোকটা বাড়ির ভিতরে চলে যায়।

 

বৈঠকখানার এককোনায় একটা বড় কাঠের দেরাজ। কোনও এক কালে এটা হয়ত কফি কালারের ছিল। কিন্তু সময়ের আস্তরণ পড়ে পুরোটাই এখন কালচে। বসবার জন্য বেতের সোফাসেট রাখা। মাথার উপর বার্মা কাঠের সিলিঙে ঝুলে আছে বাল্ব। আলো কম, সারা ঘরময় আলকাতরার মত কেমন একটা পুরনো পুরনো গন্ধ।
 

একটু বাদে দীর্ঘদেহী গৌরবর্ণ এক ভদ্রলোক  বৈঠকখানায় প্রবেশ করলেন। তাঁর মুখের গড়ন দেখে বয়স আন্দাজ করা মুস্কিল। চল্লিশ -পঞ্চাশ, যা-কিছু একটা হতে পারে। কিন্তু তিনি যে ভীষণ চিন্তিত, সেটা তার চেহারাতেই স্পষ্ট।

 

-'নমস্কার, আমিই ব্রজবল্লভ সিনহা। কিন্তু আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না।'

 

ভদ্রলোকের কথার ঢঙে ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। তাঁকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় সুমন। বলে,

--নমস্কার, আমি সুমন দাসচৌধুরী। কলকাতায় চাকরি করি। আর ইনি হচ্ছেন সৌম্য মানে সৌম্যেন্দ্রনাথ সরকার, লেখালেখি করেন এবং আমার বন্ধু। একটা বিশেষ কাজে আমরা আপনার সাহায্যপ্রার্থী। তাই এতদূর ছুটে আসা।

 

-বলুন, কীভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি।

 

কথাটা বেশ আন্তরিকতার সঙ্গেই বললেন ব্রজবল্লভবাবু।
 

সময় নষ্ট না করে সরাসরি কাজের কথায় চলে যায় সুমন। বলে,

-আমরা পর্তুগিজ আমলের একটা বহুপুরোনো  ছবি ও তালাচাবির খোঁজ করছি। জানতে পারলাম,  জিনিস দু'টো এখন আপনার কাছে। কথাটা কি সত্যি?

 

সুমনের কথায় গম্ভীর হয়ে গেলেন ব্রজবল্লভ। বললেন,

-আশ্চর্য! এই খবর আপনারা জানলেন কীভাবে?

 

-এই দেখুন, কথায় কথায় আপনাকে বলাই হয়নি। আমি কলকাতায় এক বেসরকারি জাদুঘরে কিউরেটর। বুঝতেই পারছেন, পেশার তাগিদে এসব খবরাখবর আমাকে রাখতেই হয়। তাছাড়া আমি যেখানে থাকি, জায়গাটার নাম চন্দন নগর। আর জানেনই তো, একটা সময় গোটা কলকাতা ইংরেজদের দখলে থাকলেও চন্দন নগরে কর্তৃত্ব ছিল ফরাসিদের। সেসময় হুগলি থেকে বিতাড়িত কিছু পর্তুগিজ চন্দন নগরে এসে আশ্রয় নেয়। একটা সময় ইংরেজরা দেশ ছেড়ে চলে গেলেও  ফরাসি ও পর্তুগিজদের একটা বড় অংশ কিন্তু সেখানেই থেকে যায়। স্বাধীনতার পরেও বদরপুরের মত ওখানে এখনো অনেক পর্তুগিজ পরিবার আছে। যদিও সময়ের বিবর্তনে তারা এখন সকলেই বাঙালিয়ানায় অভ্যস্ত। তা কয়েকবছর আগে তাদেরই একজনের কাছে তার পূর্বপুরুষ মোজার্ট সাহেব কীভাবে বদরপুরে এসে জমিদারি প্রতিষ্ঠা  করেছিলেন, সেকথা জানতে পারি। তার মুখেই তালাচাবি ও ছবিটার অনেক চমকপ্রদ কাহিনী শুনেছি।

 

প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে এবার একটু থামল সুমন। দু-তিনমিনিট নীরবতার মধ্যদিয়ে কেটে গেল। 
 

ব্রজবল্লভবাবু বললেন,

-সুমনবাবু, আপনারা আসতে একটু দেরি করে ফেলেছেন। তালাচাবিটা আর আমার হাতে নেই। 

 

-নেই মানে ! 

 

-সেটা গতরাতেই চুরি গেছে।

 

- এ কি ! ঘটনাটা কীভাবে ঘটল?

 

সুমনের প্রশ্নে ব্রজবল্লভ বলেন,
-গতকাল বিকেলে এক ভদ্রলোক এসে ছবি ও  তালাচাবিটা তাঁকে বিক্রি করে দেওয়ার  জন্য প্রথমে অনুরোধ পরে জোরাজোরি আরম্ভ করেন। মোটা টাকার অফারও দেন। কিন্তু কেন জানি লোকটাকে পছন্দ না হওয়ায় আমি তার প্রস্তাবে রাজি হইনি। হতাশ হয়ে চলে যান তিনি। কিন্তু সেই রাতেই বাড়িতে চোর ঢুকে তালাচাবিটা হাতিয়ে নেয়।

 

-আর ছবিটা?
 

প্রশ্নটা করে উৎকণ্ঠিত সুমন অধীর আগ্রহ নিয়ে ব্রজবল্লভবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। ব্রজবল্লভ বলেন,

-ওটা এখনো আমার কাছেই। গোপন জায়গায় সুরক্ষিত থাকায় এটাকে আর নিয়ে যেতে পারেনি।

 

-আচ্ছা ব্রজবল্লভবাবু, লোকটা কি আপনাকে তার নাম-ঠিকানা কিছু বলেছে?

 

এই প্রথম নীরবতা ভাঙ্গে সৌম্য। ব্রজবল্লভ জানান, লোকটার বয়ান অনুযায়ী তার নাম মিন্টু গনজালভেস। বাড়ি হাইলাকান্দি জেলার ফিরিঙ্গি বাজারে। তবে কর্মসূত্রে বহুদিন ধরে সে না-কি মায়ানমারে রয়েছে।

 

-আচ্ছা, আপনি কি পুলিশ কেস করেছেন?,ফের প্রশ্ন করে সৌম্য।

 

-দেখুন, এসব জিনিস সংগ্রহ করা আমার বহুদিনের শখ। কিন্তু জানেনই তো, এই কাজে কিছু আইনি সমস্যা রয়েছে। তাই পুলিশকে আর জানানো হয়নি।

 

মনেমনে ঘটনা গুলো পরপর সাজিয়ে নেয় সৌম্য। বহুপুরোনো পর্তুগিজ আমলের একটা ছবি ও তালাচাবি। যার সন্ধানে কলকাতা থেকে শুধু সুমনই নয়, সুদূর মায়ানমার থেকেও আরেকটা লোক ছুটে এসেছে। তা-ও সুমন আসার একদিন আগেই! আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ওই লোকটা  আসার পর কাকতালীয় ভাবে ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ি থেকে তালাচাবিটাও চুরি  গিয়েছে। কে এই রহস্যময় মিন্টু গনজালভেস? চুরির ঘটনার পেছনে কি তার হাত রয়েছে, নাকি অন্য কোনও গভীর ষড়যন্ত্র? 
 

বিপদের কথা আঁচ করে ব্রজবল্লভবাবুকে কিছু পরামর্শ দেয় সৌম্য। ফিসফিস করে বলে, 
-আজ রাতটা আপনি একটু সাবধানে থাকবেন ব্রজবল্লভবাবু। মনে হচ্ছে এই বাড়িতে আরও কিছু একটা ঘটতে চলেছে।

 

পর্ব ৩

সৌম্যর গলায় এমন একটা কিছু ছিল, যা শুনে ব্রজবল্লভ সিনহা ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, 

--আমি আগেই আন্দাজ করেছিলাম মিন্টু গনজালভেস লোকটা সুবিধের নয়। কিন্তু এতটা খারাপ হবে , ভাবিনি। সে আমার বাড়িতে চোর পাঠিয়েছে। তাকে আমি...

  
উত্তেজনার চোটে  বাকিটা আর বলতে পারলেন না ব্রজবল্লভ।

সৌম্য বলল, 

--এখনই কাউকে দোষারোপ করাটা বোধহয় উচিৎ হবে না ব্রজবল্লভবাবু। আপনার বাড়িতে চুরির ঘটনার সঙ্গে গনজালভেসের কোনও সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। আবার বিপরীতটাও হতে পারে। তবে ঘটনা যা-ই-হোক না কেন , কোনও কিছু প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে যেমন সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না, তেমনি দোষারোপ করাও যায় না। আপনি বরং পুলিশে খবরটা দিয়েই দিন।

আঁতকে ওঠেন ব্রজবল্লভ। বলেন, 

-না, না... এটা করতে গেলে অনেক সমস্যা। তার-চাইতে কোনও বিকল্প রাস্তা ভাবতে হবে। 

কথা বলতে বলতে একটু সময় কি যেন ভাবলেন, তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন ব্রজবল্লভ। সৌম্য-সুমনের কাছে গিয়ে বললেন, 

-বুঝতেই পারছেন, পুলিশ ডাকলে কত হ্যাপা। এরচেয়ে আপনারা দু'জনে মিলে একটু তত্ত্বতালাশ করে দেখুন না। যদি কোনও সুরাহা হয়। পারিশ্রমিক যা লাগে, আমি দিতে প্রস্তুত।'

ব্রজবল্লভ সিনহার প্রস্তাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল সুমন। কিন্তু তাকে মাঝপথে থামিয়ে সৌম্য বলল, 

-দেখুন, এই বিপদকালে আপনার পাশে দাঁড়াতে আমাদের কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু পারিশ্রমিক নিয়ে আমাদের দুজনের-ই একটা প্রস্তাব আছে।

-বলুন, কি আপনাদের প্রস্তাব।

-না মানে...বলছিলাম কি, আমরা যদি আপনার তালাচাবিটা উদ্ধার করতে পারি, আপনি ওটা ছবি সমেত  আমাদের দিয়ে দেবেন। অবশ্য এর বিনিময়ে আপনার যা প্রাপ্য, আমরা তা কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে দেব। এমন নয় যে, বিপদের সুযোগ নিয়ে আমরা আপনাকে ঠকাবো।

সৌম্যর প্রস্তাব শুনে যেন হাতে চাঁদ পেলেন ব্রজবল্লভ সিনহা। বললেন, 

--ওহ্...এই কথা ! এ নিয়ে আপনারা ভাববেন না। তালাচাবিটা উদ্ধার হয়ে গেলে সেটা আপনাদের দিয়ে দেওয়া হবে। ছবিটা আছে। সেটা এখনই  নিয়ে যান।

ব্রজবল্লভ যে এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন, সেটা সৌম্য-সুমনরা ভাবতেই পারেনি। বরং তারা এর উল্টোটা আশা করছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, জিনিসগুলো দিয়ে দিতে পারলেই যেন বাঁচেন ব্রজবল্লভবাবু।

সৌম্য বলে, 

-আগে তালাচাবিটা উদ্ধার হোক, ছবিটা নাহয় তখনই দেবেন।'

-না, না… আপনারা এটাকে এখনই নিয়ে যান। ছবিটা আমার কাছে মোটেই সুরক্ষিত নয়।

ব্রজবল্লভ সিনহার কথা শেষ হতে না-হতেই সৌম্য হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। বেড়ালের মত পা টিপেটিপে জানালার কাছে যায়। কাপড়ের পর্দাটা হাল্কা হাতে একটু সরাতেই জানালার কাঁচে একটা মানুষের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুমনকে হাতের ইশারায় দরজা খুলে লোকটাকে পেছন থেকে ঝাঁপটে ধরার সঙ্কেত দেয় সৌম্য। 


কিন্তু লোকটা-ও কম সেয়ানা নয়। কেউ কিছু করে ওঠার আগেই বাইরে ধপ করে একটা শব্দ হয়। জানালা খোলার পর দূরে  সিঙ্গারির আবছা অন্ধকার রাস্তায় একটা ছায়ামূর্তিকে মিলিয়ে যেতে দেখা যায় ।

চিন্তিত মুখে সোফায় এসে বসে সৌম্য। জিগ্যেস করে, 
--আপনার ঘরে আর কে কে আছেন ব্রজবল্লভবাবু?'

-স্ত্রী রাধারাণী, ভ্রাতুষ্পুত্র শশীকান্ত এবং আমার সর্বক্ষণের সহায়ক সুবল ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই। আমার বড়দাদা রাধাবল্লভ সিনহা ও তার পত্নী পুষ্পবালা কয়েকবছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন।'

-আর আপনার ছেলেমেয়ে?

-আমার একমাত্র সন্তান কামিনীপ্রসাদ মুম্বাইয়ে ইঞ্জিনিয়ার। ছুটিছাটা কম। তাই  শিলচরের বাড়িতে সে আসে কালেভদ্রে।'

-আচ্ছা বলুনতো, সুবল লোকটা আপনার এখানে কবে থেকে কাজ করছে?

-প্রায় কুড়ি বছর। তখন ওর বয়স দশ কি বারো। ত্রিপুরার বিশালগড়ের রাস্তায় অনাথ ছেলেটাকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে নিয়ে এসেছিলাম। সেই থেকে আমার সঙ্গেই আছে।

ঝানু গোয়েন্দা-র মত আরও কিছু প্রশ্ন করে সৌম্য। ব্রজবল্লভবাবুকে তার ফোন নম্বরটা দিয়ে বলে, 

-আমরা এখন উঠব। তবে রাতে সুবলকে চোখকান খোলা রাখতে বলবেন। পারলে আপনিও সজাগ থাকবেন। একটা রাত না ঘুমোলে এমন কিচ্ছু হবে না। কোনও অসুবিধা হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ফোন করবেন।


বলতে বলতে উঠে দাঁড়ায় সৌম্য। তার দেখাদেখি সুমনও উঠে পড়ে। অসহায়ের মত ব্রজবল্লভ বলেন, 

-একটু দাঁড়ান। আমি চট-করে ছবিটা নিয়ে আসছি।

সুমনদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই পাশের ঘরে চলে গেলেন ব্রজবল্লভ। অল্প কিছুক্ষণ পরে বাদামি রঙের শক্ত কাগজের মোড়কে ঢাকা একটা ফটো-ফ্রেম এনে তাদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, 

-এটাই সেই পর্তুগিজ আমলের ছবি।

||||||

বাইরে ভ্যাপসা গরম। আকাশে মেঘ জমে আছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। অবশ্য চৈত্রমাসের এইসময় প্রায়ই ঝড়বৃষ্টি হয়। ছবিটা নিয়ে গলির মুখে অপেক্ষারত রিকশায় গিয়ে বসে সৌম্য ও সুমন। 

হাতের বিড়িটা ফেলে প্যাডেলে চাপ দেয় রিকশাওয়ালা। সামান্য এগোতেই হঠাৎ তাকে থামিয়ে নোয়ারাজ-বোয়ালজুর রাস্তাটা ধরে কলেজ রোড যাওয়ার নির্দেশ দেয় সৌম্য। বলে, 

--ভাই, তুমি আমাদের বোয়ালজুরের রাস্তা ধরে কলেজ রোড নিয়ে চল। ঘুরপথ হলেও ভাড়া নিয়ে ভাববে না।
 
কথা না বলে ত্রিচক্রযানের মুখ ঘুরিয়ে নেয় রিকশাচালক। সুমন জিগ্যেস করে, 

--কি রে সৌম্য,  সোজা গেলে তো কলেজ রোড মাত্র দেড়-দু কিলোমিটার। তা হঠাৎ এই ঘুরপথে কেন?

-আমি কোনও রিস্ক নিতে রাজি নই, তাই। কেন জানি আমার মন বলছে সামনের রাস্তায় বিপদ! 


গম্ভীর হয়ে উত্তর দেয় সৌম্য। সুমনকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে কার সঙ্গে খাটো গলায় কথা বলতে শুরু করে সে। পাশে বসেও  তার সবটা বুঝতে পারে না সুমন। 


ফোনের এপার থেকে  শুধু  হু-হা -ই করে চলছে সৌম্য। একটু পরে বলল,
-ঠিক আছে তাহলে । আজ রাতটা আমি তোর ওখানেই কাটিয়ে দেব।

এদিকের রাস্তাঘাট তেমন সুবিধের নয়। প্রবল ঝাঁকুনিতে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এরইমধ্যে এগিয়ে চলেছে রিকশা-টা। সুমন জিগ্যেস করে, 

--কার সঙ্গে কথা বলছিসরে সৌম্য?

--আমার তুতো-ভাই মামনকে মনে আছে তোর? কলেজে আমাদের দুই ক্লাস নিচে পড়ত।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ। ফেসবুকে তার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা হয়। আচ্ছা মামন এখন কি করে রে সৌম্য?

-তার এখন ওষুধের ব্যবসা। তবে উদ্বৃত্ত সময়টুকু সে আমাকে সত্যানুসন্ধানে সাহায্য করে। ভাবছি এই কেসে তাকেও ইনভলভ করব।

-সে কিরে! তুই ডিটেকটিভ! সেটা তো একবারও বলিসনি !

সুমনের গলায় একরাশ বিস্ময়! কিছুটা উত্তেজিতও! তাকে শান্ত করতে গিয়ে সৌম্য বলে, 

--আমি যা নই তা বলে নিজেকে জাহির করবো কেন? 

-কিন্তু এইযে বললি তুই সত্যানুসন্ধান করিস।

--ওহ! এই কথা! আচ্ছা তুই-ই বল, সাংবাদিকতায় সত্য না জেনে কী লেখালেখি করা যায়? কোনও রিপোর্ট দাখিল করার আগে সত্য জেনে নেয়াটা ভীষণ জরুরি। তাই আমাকে প্রতিনিয়ত সত্যের অনুসন্ধান করতে হয়। 

--হুম...


আর কথা বাড়ালো না সুমন। 


বোয়ালজুর, আঠালিকান্দি-দেবপাড়া ঘুরে  চিরুকান্দি, সৎসঙ্গ আশ্রম রোড হয়ে সৌম্যরা যখন কলেজ রোডে পৌছল, ততক্ষণে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। 


ভাগ্যিস, কাকুর চায়ের দোকানের একটা পাট তখনও খোলা। ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নেমে একদৌড়ে কাকুর দোকানে গিয়ে আশ্রয় নেয় দু'জনে।

অনেক বছর বাদে কাকুর দোকানে এসেছে সুমন। সৌম্য যদিও শিলচরেই থাকে, তারপরও ব্যস্ততার দরুন কাকুর দোকানে আসা হয় না তারও। অথচ কলেজের দিনগুলোতে এই কাকুর দোকানই ছিল তাদের কফি হাউস। 
 

কত স্মৃতি।  নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় দু'জনই।

কাকু মারা যাওয়ার পর দোকান সামলায় কাকুর ছেলে। সুমন ও সৌম্যকে চিনতে পেরে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে সে-ও। কর্মচারীকে ডেকে দু'জনকে চা করে দিতে বলে।

 
ঘন্টাখানেক প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাসের পর শান্ত হয় প্রকৃতি। ছবি নিয়ে অম্বিকাপট্টির বাড়ির পথ ধরে সুমন। সৌম্য চলে যায় বিবেকানন্দ রোডে, মামনদের বাড়ির উদ্দেশ্য।

পরদিন সাতসকালে ঘুম ভাঙ্গে সুমনের ফোনে।  নানা অদ্ভুতুড়ে ঘটনায় গতরাত সে না-কি দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। সৌম্যকে তাড়াতাড়ি তার বাড়িতে যেতে বলে সুমন।

দ্বিতীয় ফোনটা আসে এর একটু পরে। একটা অপরিচিত নম্বর থেকে। ওপার থেকে কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে একটা লোক নিজেকে সুবল পরিচয় দিয়ে  বলে, 

-সর্বনাশ হয়ে গেছে দাদা। আপনি তাড়াতাড়ি একবার কবিরগ্রামে আসুন।

উৎকণ্ঠিত সৌম্য জিগ্যেস করে,
-কি হয়েছে সুবল, ব্রজবল্লভবাবু ঠিকঠাক আছেন তো?


-বাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না দাদাবাবু । এদিকে তার ঘরের মেঝেয় এবং বিছানার চাদরে রক্তের দাগ লেগে থাকায় বাড়ির সবাই যারপরনাই শঙ্কিত।


-' ঠিক আছে তুমি শশীকান্তবাবুকে ফোনটা দাও।'

শশীকান্তকে সময় নষ্ট না করে  পুলিশে খবর দেওয়ার কথা বলে মামনকে ধাক্কা দিয়ে জাগায় সৌম্য। বলে, 
-চটপট ফ্রেশ হয়ে নে মামন।  এক্ষুনি আমাদের ছুটতে হবে।

 

 

পর্ব ৪

ফ্রেশ হয়ে  কোনওমতে এককাপ চা গলাধঃকরণ করেই মামনের মারুতিটা  নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সৌম্য। ড্রাইভ সে নিজেই করছে। পাশের সিটে বসে আছে মামন। 


গলির মুখে মেন রাস্তার পাশে একটা কালো কাঁচ ওঠানো ছাই রঙের বলেরো। সৌম্যর নজরে পড়ে, সামান্য দূরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোক হাতের ইশারায় তার মারুতিটাকে দেখিয়ে বলেরোর লোকগুলিকে ইশারায় কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে।

 

ঘটনাটি লক্ষ্য করে মামন। বলে,

-সৌম্যদা, কিছু দেখতে পেলে?


-হুম দেখেছি। 

সৌম্যকে বেশ চিন্তিত দেখায়। তবে এনিয়ে দুজনের মধ্যে আর কোনও কথা হয় না। মিনিট পাঁচেক পর সুমনদের অম্বিকাপট্টির বাড়িতে পৌঁছে যায় তাঁরা।

||||||

ড্রইংরুমে উদভ্রান্তের মত বসে আছে সুমন। উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ দু'টো ভাটার আগুনের মত লাল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সারারাত ঘুম হয়নি। সৌম্য জিজ্ঞেস করে, 

-এ-কি-রে সুমন, কি হয়েছে তোর।


সৌম্যকে দেখে যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে এল সুমনের। সঙ্গে মামনকে দেখে একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে বলল,  

-আমাকে বাঁচা সৌম্য, ছবিটা তুই নিয়ে যা।


-কেন রে, ছবিটা আবার কি দোষ করল?


-এটা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর গতরাত থেকে এমনসব অদ্ভুতুড়ে ঘটনা ঘটছে, যুক্তিতে যার ব্যাখ্যা মেলা ভার। আমার জায়গায় অন্যকেউ হলে এতক্ষণে হার্টফেল করত।

সুমনের কথা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল সৌম্য। বলল, 

-আচ্ছা শোন, তুই আগে চট করে চোখেমুখে জল দিয়ে আয়। আমাদের এক্ষুনি একবার সিঙ্গারি কবিরগ্রামে যেতে হবে। তোর কথা যেতে যেতে শোনা যাবে খন।

-কেন, এত সকাল সকাল আবার সিঙ্গারি কেন?

-আমরা চলে আসার পর গতরাতেই ব্রজবল্লভ সিনহাকে অপহরণ করা  হয়েছে।

সৌম্য'র কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায় সুমন। বলে, 

--সর্বনাশ! দাঁড়া, আমি চট করে রেডি হয়ে আসছি।

 

||||||

একটু বাদে।

 
সৌম্যরা যখন কলেজ রোড থেকে বাঁয়ে চেংকুড়ি রোড ধরছে, ব্রিজের ওপারে একটু আগে দেখা সেই বলেরোটাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠল মামন। 


-এ্যাই সৌম্যদা, কিছু দেখলে?


-আমি সব দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তুই এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন! যতটা পারিস নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা কর।

বলতে বলতে ডানদিকের পানের দোকানের সামনে গিয়ে গাড়িটাকে দাঁড় করায় সৌম্য। বলেরোর ব্যাপারে সুমন কিছুই জানে না। ফলে সৌম্য এবং মামনের কথোপকথনের মাথামুণ্ডু ধরতে পারেনি সে। বলে,

-গাড়ি থামালে কেন সৌম্য, আর তোরা দু'জনে কি দেখে এতটা উত্তেজিত হয়ে উঠেছিস?

-ও কিছু না।  চল, আগে একেকটা পান হয়ে যাক। তোর কি পানের অভ্যেসটা আছে, না কলকাতায় গিয়ে সব ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে বাবু হয়ে বসে আছিস?

অনেকবছর পর নিজের শহরে এসেছে সুমন। শিলচরে থাকতে দিনে বেশ কয়েকটা পান না হলে চলতেই পারতো না। কিন্তু কলকাতায় গিয়ে অভ্যেসটা বদলাতে হয়েছে। অনেকটা অবস্থার চাপে। এমন নয় যে, কলকাতায় পান পাওয়া যায় না। কিন্তু গুণ-বিচারে সেগুলো শিলচরের ধারেকাছেও যায় না। তবে সুমনকে পান ছাড়তে হয়েছে অন্য কারণে। কোম্পানিতে সে যে  পদে চাকরি করে, সেখানে পান একেবারেই বেমানান। 
 

আজ অনেক দিন বাদে ফের ভাল পান খাওয়ার একটা সুযোগ এসেছে। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায় না সুমন। বলে, 

-মিঠেপাতা দিয়ে দোকানদারকে জম্পেশ করে একটা ১২০ জর্দা পান বানাতে বল ।


বন্ধুর আবদারে হেসে ওঠে সৌম্য। বলে,

 -বাব্বা! বাবুর নোলাটা দেখি সেই আগের মতই আছে।

তিনজনে মিলে হোহো করে হেসে ওঠে।

 

||||||||


গতরাতের অভিজ্ঞতার পর এতক্ষণ একটা মানসিক অবসাদের মধ্যে ছিল সুমন। খোলা হাওয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে নিজেকে এবার অনেকটাই হালকা বোধ করে। পান মুখে দিয়ে মেজাজটা আরও ফুরফুরে হয়ে যায়।

গাড়ি স্টার্ট দেয় সৌম্য। ফজলশাহ'র মোকামের পাশে বলেরোটা তখনও দাঁড় করানো। আড়চোখে সেদিকে তাকালে মামনের নজরে পড়ে, গাড়ির ভিতরে বেশ কয়েকটা লোক। এদের মধ্যে ড্রাইভারের সিটে বসা ঝাকড়া-চুলো ষণ্ডামার্কা একটা লোক মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলছে।

  
সৌম্যদা কি লোকগুলোকে  দেখতে পেয়েছে?  কে জানে বাবা, সুমনদার সঙ্গে যেভাবে গল্প জুড়ে দিয়েছে তাতে তো মনে হয়, এসবে তার  কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই! ভাবনাটা মাথায় এলেে- ও চুপচাপ বসে রইল মামন।

 

|||||


গতরাতে ঝড়বৃষ্টির পর আকাশ আলো করে উঁকি দিয়েছে সূর্য। আড়মোড়া ভেঙে ধীরেধীরে ব্যস্ততার ছন্দে ফিরছে শহর। কয়েকজন মাছ বিক্রেতা সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছে। ঠেলাগাড়িতে সব্জি ফেরি করছে এক সব্জি ব্যবসায়ী। চেংকুড়ির রাস্তায় দু'একটা অটোরিকশা ও টুকটুক যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসা করছে। গলির মোড়ে স্কুলবাসের জন্য অপেক্ষারত বাচ্চারা মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

 

গাড়ি চালাতে চালাতে সৌম্য জিগ্যেস করে,  

-গতরাতে কি এমন ঘটল যে তুই এত ভয় পেয়ে গেলি সুমন!


-'উফ! সেকথা মনে করলে এই দিনের বেলায়ও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে!

-একটু খুলে বল তো। 

 সৌম্য 'র কথায় সুমন বলে,

--হয়েছে কি, গতরাতে খাওয়াদাওয়ার পর শুতে যাব, হঠাৎ এক অদম্য কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে ছবির মোড়কটা খুলে ফেললাম ! বোঝাই যাচ্ছে বহুপুরোনো ছবি। দেখি, ছবিটা এক বিদেশিনী তরুণীর। অপূর্ব সুন্দরী ওই বিদেশিনী হাসি মুখ করে আমার দিকেই চেয়ে আছে। যেন জীবন্ত! বিশেষকরে তার পিঙ্গলবর্ণ চোখ দু'টো যেন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে। অবাক হয়ে গেলাম। তরুণীর চোখে কি রয়েছে জানি না, কিন্তু মনে হতে লাগল, তার চোখের সম্মোহনী শক্তি আমার সমস্ত সত্ত্বাকে ধীরেধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। নিজেকে সামলে নিয়ে ছবিটা বিছানার পাশে টেবিলের উপর রেখে শুয়ে পড়লাম। দেখতে দেখতে দুচোখের পাতা ভারি হয়ে এল।


এপর্যন্ত বলে দম নেওয়ার জন্য একটু থামে সুমন। 


-তারপর কি হল সুমনদা?-- 


মামনের যেন আর তর সইছে না। প্রশ্নটা আসে তার দিক থেকেই। বলতে শুরু করল সুমন
--রাত তখন ক'টা হবে কে জানে, হঠাৎ এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল। ডিমলাইটের আলোয় ঘরের ভিতর ততটা দৃশ্যমান নয়। চারিদিক চুপচাপ। মনে হল, শিয়রে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তার শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। 


চোর নয়তো! ঘাবড়ে গেলাম! কোনও মতে মাথাটা বালিশের সমান্তরালে নিয়ে দেখলাম, গাউনের মত লম্বা কাপড়ে আপাদমস্তক ঢাকা এক নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। ভয়ে চিৎকার করাও ভুলে গিয়েছি। নিজের অজান্তেই হয়ত গলা দিয়ে গোঁগোঁ শব্দ বেরিয়েছে। পাশের ঘর থেকে মেজদা ছুটে এল। কিন্তু আলো জ্বালতেই সব ভোঁভাঁ। ভাবলুম, পেট গরম হয়ে দুঃস্বপ্ন দেখেছি। মেজদাও তাই ভাবল। ঘাড়-মাথায় ভাল করে জল দিয়ে মুছে ফের শুয়ে পড়লাম। চোখটা সবে লেগেছে, হঠাৎ একটা টুংটাং শব্দে ফের জেগে উঠলাম। দেখি, মশারির বাইরে সেই নারীমূর্তিটা। এবার ঘরের ঠিক মাঝখানে। তার চোখ থেকে যেন আগুন ঝরছে। মনে হচ্ছে কোনও কারণে সে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।

 

বিপদের সময় মানুষ বোধহয় প্রচণ্ড রকমের সাহসী হয়ে ওঠে। যা হয় হবে মনে করে আমিও তড়াক করে বিছানার উপর উঠে বসলাম। অবাক হয়ে দেখলাম নারীমূর্তিটা দ্রুতগতিতে ছবিটার দিকে এগোচ্ছে। বিছানার পাশেই স্যুইচবোর্ড। এক লাফে লাইট-টা  জ্বালাতে গিয়ে কার সঙ্গে জোর ধাক্কা লাগল। তারপরও কোনওমতে স্যুইচটা অন করে দিলাম। নিমিষে আলোকিত হয়ে উঠল গোটা কক্ষ। তাজ্জব! কেউ কোথাও নেই! নারীমূর্তিটাও গায়েব! কি মনে হল, ছবিটাকে ভাল করে পরীক্ষা করলাম। দেখি, ফিরিঙ্গি তরুণীটি আগের মতই হাসছে। তবে তার চোখ দু'টো বড্ড বেশি উজ্জ্বল। যেন জ্যান্ত! হঠাৎ কি মনে হল জানি না, চোখ দু'টো ছুঁয়ে দেখতে গেলাম। এ কি! মনে হল, ছবিটার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এল! আর পারা গেল না। মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। সম্বিত ফিরে এল জলের ঝাপটায়। দেখি মেজদা-রা চোখেমুখে জল ছিটিয়ে আমার জ্ঞান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। এরপর বাকি রাতটুকু আর ওঘরে ঘুমোইনি। ড্রইং রুমে বসে বসেই কাটিয়ে দিয়েছি।

সুমনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেল সৌম্য-রা। গলির মুখে কিছু মানুষের জটলা,পুলিশের গাড়ি। মারুতিটা রাস্তার পাশে রেখে দিল সৌম্য। বলল,

-আশ্চর্য! একদিকে ব্রজবল্লভ বাবু নিখোঁজ। তার ওপর তোর এই ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা! সঙ্গে সুদূর বার্মা মুলুক থেকে মিন্টু গনজালভেসের আবির্ভাব, ব্রজবল্লভবাবুর বাড়িতে চুরি। নাহ্! মনে হচ্ছে, পর্তুগিজ আমলের ছবি ও তালাচাবিটা  ভোগাবে! 

কপাল কুঁচকে গেল সৌম্যর। মামন জানে, সৌম্যর কপাল কুঁচকে যাওয়া মানে রহস্য ক্রমশঃ জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। 

পর্ব ৫

ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ির গেটে দুই পুলিশকর্মী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খৈনি ডলছে। তারা সম্ভবত সৌম্যকে চেনে। তাই পথ আটকালো না।বৈঠকখানায় গম্ভীর হয়ে বসে আছেন পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রতুল হাজরিকা। মেদহীন শরীর। দেখেই বোঝা যায়, একসময় প্রচুর খেলাধূলা করেছেন। প্রতুল ডিব্রুগড়ের বাসিন্দা হলেও বাংলাটা ভালই বোঝেন। তবে বলতে গেলে উচ্চারণে একটু সমস্যা হয়। অসমীয়া ও বাংলা'র মিশেলে এক অদ্ভুত এ্যাকসেন্ট-এ কথা বলেন ভদ্রলোক। এখানে বদলি হয়ে আসার কিছুদিন পর থেকেই সৌম্যর সঙ্গে তাঁর পরিচয়।

 

||||||

 

সৌম্যকে দেখে প্রতুল হাজরিকা বললেন, 

--আহক আহক ডাঙরিয়া (আসুন আসুন মহাশয়), খবর পেলাম আপনি আসছেন, তাই বসে আছি।

-ধন্যবাদ প্রতুলবাবু। আপনি কি ব্রজবল্লভবাবুর ঘরটা সার্চ করেছেন?

-হ্যাঁ, আপনি আসার আগে ওই কাজটা সেরে নিয়েছি।

-ঘটনাটা কি বলে মনে হয় আপনার?

-দেখুন, ঘরের একটা বস্তুও চুরি যায়নি। এর মানে অপরাধীরা একটা-ই  উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল। কিডন্যাপিং। এতে কোনও সন্দেহ নেই। 

-ব্রজবল্লভবাবুর ঘরে কি আর কোনও অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ল? মুক্তিপণ চেয়ে কারোর  ফোন-টোন? 

জিজ্ঞেস করে সৌম্য।

প্রতুল হাজরিকা জানান, এখন পর্যন্ত  কোনও ফোন আসেনি।  এছাড়া ঘরে ধ্বস্তাধস্তির চিহ্ন ছাড়া তেমন আর অস্বাভাবিক কিছু  নজরে পড়েনি। তার ধারণা, রক্তপাত সম্ভবত আততায়ীর সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তির জেরেই হয়েছে। তবে এই রক্ত ব্রজবল্লভ না আততায়ীর   ---- শনাক্ত করতে স্যাম্পল পাঠানো হয়েছে ল্যাবে।

প্রতুলের সব কথা মন দিয়ে শুনল সৌম্য। বলল, 

-চলুন, একবার ব্রজবল্লভবাবুর বেড রুম-টা  দেখে আসি।

 
সৌম্য, সুমন এবং মামনকে  ব্রজবল্লভবাবুর শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন প্রতুল হাজরিকা। 
ঘরে ঢুকতেই একধরনের পারফিউমের উগ্র গন্ধ নাকে এসে লাগলো সৌম্য'র। গন্ধটা তার চেনা। বার্মিজ উড ওয়েল। বস্তুটা এই অঞ্চলে আগর তেল নামে প্রসিদ্ধ।

 

ইন্টারেস্টিং! ব্রজবল্লভবাবু কি তবে বার্মিজ সুগন্ধিতেও রুচি রাখতেন, জানতে হচ্ছে তো... ভাবতে ভাবতে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় সৌম্য।

বেডরুমটা বেশ বড়। দু'টো জানালার একটা তুলনামূলক অনেক ছোট। পালঙ্ক রয়েছে ছোট জানালাটার একেবারে পাশে। এর ঠিক উপরে একটা  আধখোলা ভেন্টিলেটর। ঘরের ভিতরে একটা পড়ার টেবিল ও সাবেকি আমলের আলমারি। দেয়ালে সামান্য ব্যবধানে ভুবনেশ্বর সাধুঠাকুর ও কবিগুরুর ছবি টাঙানো। এরই পাশে একটা ছোট্ট গ্রামের ছবি। গ্রামটা নদীর পাড় ঘেঁষে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বিকেলের অস্তমিত সূর্য ধীরেধীরে পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশব্দ পদসঞ্চারে পাহাড়ের উপর থেকে একদলা অন্ধকার নেমে আসছে গ্রামের উপর। বাড়িঘর ছাপিয়ে একটা চার্চ আধো-অন্ধকারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। 

 

ছবিটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সৌম্য। জলরঙ ব্যবহার করে অসাধারণ ছবি এঁকেছেন চিত্রশিল্পী। ভাল করে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, কেমন যেন একটা ভয়ভয় ব্যাপার ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ছবির পরতে পরতে।

 

|||||||

ছবি থেকে চোখ সরিয়ে ঘরের অন্যান্য জিনিসপত্রের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সৌম্য।
 

ব্রজবল্লভবাবুর বিছানার চাদরটা সামান্য কোঁচকানো। এক কোনায় রক্তের দাগ। তবে ঘরের বাকি আসবাবপত্র পরিপাটি করে সাজানো। আলমারিতেও হাত লাগানো হয়নি। শুধু বন্ধ জানালাটার পাশে মেঝের উপর কয়েক ফোঁটা রক্ত জমে কালো হয়ে আছে।

 

-আচ্ছা প্রতুলবাবু, জানালাটা কি আগে থেকেই বন্ধ ছিল, না আপনারা বন্ধ করেছেন?

 

প্রশ্নটা করে সন্তর্পণে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সৌম্য। প্রতুল জানালেন, দু'টো জানালাই ছিল বন্ধ। শুধু শোবার ঘরের সদর দরজাটা ভেজানো অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।

-হুম...তারমানে ব্রজবল্লভবাবুকে অপহরণ করে মেন দরজা দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছে! আশ্চর্য!

বলতে বলতে ছিটকিনি খুলে জানালার বাইরে ঝুঁকে কিছু একটা নিরীক্ষণ করতে লাগলো সৌম্য। রাতে বৃষ্টি হওয়ায় বাইরে জানালার নিচে মাটি নরম হয়ে আছে। তাতে কয়েকটা জুতোর ছাপ স্পষ্ট। সেগুলোকে বাঁচিয়ে জানালা দিয়েই সন্তর্পণে বাগানে নেমে গেল সৌম্য। তার দেখাদেখি পিছন পিছন প্রতুলবাবুও নামলেন। কুণ্ঠা মিশ্রিত স্বরে বললেন, তাজ্জব ব্যাপার! আপনি জানালাটা না খুললে এটা নজরেই পড়ত না!'
 
সৌম্যকে দেখে মনে হচ্ছে, এই মূহুর্তে প্রতুলবাবুর কোনও কথা কানে যাচ্ছে না তার। শিকারি বেড়ালের মত মাটির উপর উবু হতে হতে প্রায় শুয়েই পড়েছে সে। 


এই অবস্থায় আশপাশ এবং পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করতে করতে বলল,

--কি বুঝলেন প্রতুলবাবু, ব্রজবল্লভকে কারা অপহরণ করেছে বলে মনে হয় আপনার?

মাথা চুলকে প্রতুল হাজরিকা জানালেন, ব্যাপারটা তার কাছে এখনো পরিষ্কার নয়।

জায়গাটার খুটিনাটি দেখতে দেখতে স্বগতোক্তির মত সৌম্য বলল, 

-আততায়ী যে একা আসেনি, এটা পরিস্কার। সুযোগের অপেক্ষায় অন্তত তিনজন লোক জানালার নিচে ঘাপটি মেরে ছিল। এদের মধ্যে এক আততায়ীর উচ্চতা সাড়ে ছ'ফুটের কাছাকাছি। সে আবার চেন স্মোকার। রোগা ঠ্যাঙা এই লোকটার বাঁ পায়ে সমস্যা রয়েছে। তাই একটু খুঁড়িয়ে চলে।  লোকটার গায়ে ছিল কালো পোশাক। হুম... যা ভেবেছি! কাহিনিতে একটা নারীচরিত্রও আছে! তার উচ্চতা সাড়ে চার ফুটের কম নয়। কিন্তু তিন নম্বর লোকটা একটু চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

সৌম্যর কথা শুনে অবিশ্বাসের সুরে প্রতুল বললেন , 

-মানলাম, পায়ের ছাপগুলো আপনিই আবিষ্কার করেছেন। তাইবলে লোকগুলোর দৈহিক গড়ন এবং তাদের স্বভাব সম্পর্কে আপনি এতটা শিওর হচ্ছেন কি করে? একেবারে জেন্ডার ক্লাসিফিকেশনটাও সেরে নিয়েছেন দেখছি !

কথাটা গায়ে না মেখে উল্টো প্রতুলের কথায় মিটিমিটি হাসতে লাগল সৌম্য। বলল, 

-- একটু খেয়াল করলে আপনিও একই কথা বলতেন। এই দেখুন প্রতুলবাবু, এখানে তিন জোড়া জুতোর ছাপ। মানে তিনটে লোক। আরেকটু মনোযোগ দিয়ে দেখুন, একটা  জুতোর সাইজ  ৯ নম্বরের কাছাকাছি। তারমানে লোকটার উচ্চতা ছ'ফুটেরও বেশি। কারণ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের পায়ের মাপ তার দৈহিক উচ্চতার আনুপাতিক। এমন নয় যে, একজন চার ফুট উচ্চতার লোক ৯-১০ নম্বরের জুতো পায়ে দেবে। এছাড়া লোকটা  সিগারেটের অবশিষ্টাংশ গুলো যে দূরত্বে ছুঁড়ে ফেলেছে সেটা থেকেও তার উচ্চতা অনুমান করা যায়। একজন বেঁটে মানুষের পক্ষে সিগারেটের টুকরো অতদূর ছুঁড়ে ফেলা সম্ভব নয়। আরও লক্ষ্য করুন প্রতুলবাবু, এই ছাপটা দেখুন। এটা যে মেয়েদের জুতোর ছাপ, সেটা আপনার মত একজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসারকে নিশ্চয় বোঝাতে হবে না। তাছাড়া হাল ফ্যাশনের এই জুতো আজকাল কমবয়সী মেয়েরাই পরছে। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার। শুধু তৃতীয় ব্যক্তির পায়ের ছাপ'টা-ই চিন্তায় ফেলে দিয়েছে!

 

সৌম্যর কথাগুলো এতক্ষণ হা করে  গিলছিলেন  প্রতুল হাজরিকা। তিনি এতদিন শার্লক হোমসের গোয়েন্দা গল্পে এরকম অনেক ঘটনার বর্ণনা পড়েছেন। আজ চোখের সামনে জলজ্যান্ত শার্লক হোমসকে দেখতে পেয়ে একেবারে তাজ্জব বনে গেলেন! বললেন, 

--আপনার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ  সৌম্য ডাঙরিয়া! আপনাকে স্যালুট জানাতেই হচ্ছে। আচ্ছা কালো পোশাকে খুড়িয়ে চলা লোকটা যে চেন স্মোকার, সেটা কি ভাবে বুঝলেন? 


-ওই দেখুন, ওখানে  সিগারেটের প্রায় দশবারো'টা টুকরো পড়ে আছে। কিডন্যাপ করতে এসে রিস্ক নিয়ে কেউ সারারাত দাঁড়িয়ে থাকবে-- সেটা আশা করা যায় না। আততায়ীরা বড়জোর আধঘন্টা কি চল্লিশ মিনিটের মধ্যেই তাদের কাজ শেষ করে নিয়েছে। কিন্তু ওইটুকুন সময়ের মধ্যে যে লোক দশবারোটা সিগারেট খেতে পারে, তাকে চেন স্মোকার বললে আপনার কোনও আপত্তি থাকবে না বোধহয়। আরও দেখুন,  কাঁটাঝোপে এক টুকরো কালো কাপড় লেগে আছে। ওটা  শার্টের কাপড়। এর অর্থ, পুরুষ লোকটার গায়ে কালো কাপড়ই ছিল। এবার বড় জুতোর ছাপটা ভাল করে দেখুন। ডান পায়ের তুলনায় বাঁ পায়ের ছাপ ততটা গাঢ় নয়। তার মানে লোকটার বাঁ পায়ে সমস্যা আছে এবং সে খুড়িয়ে চলে।

নিজের মাথায় নিজেই চাঁটি মেরে প্রতুল বললেন, 

-আপনি যে আর দশটা মানুষের মতো  নন সেটা জানতাম। তাই বলে এতটা ভাবিনি। আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন গ্রহণ করুন। আচ্ছা, অপহরণ কিভাবে হয়েছে বলে আপনার ধারণা সৌম্য ডাঙরিয়া।'

-আগেই বলেছি, আততায়ী একা আসেনি। তবে কয়েকজন এখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকলেও একজন কিন্তু ব্রজবল্লভবাবুর ঘরে-ই গিয়েছিল। সেই লোকটাই তাঁকে কাবু করে জানালা দিয়ে নিচে পাচার করে দেয়। তারপর জানালাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে চুপচাপ সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে এই থিয়োরিতে একটা খটকা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে!

-কিসের খটকা সৌম্য ডাঙরিয়া?

প্রশ্ন করেন প্রতুল হাজরিকা। 


সৌম্য বলে, 

-কাল রাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে রাস্তায় এমনকি এই জানালার নিচেও জলকাদা। এই অবস্থায় কেউ বাইরে থেকে জলকাদা মাড়িয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকলে মেঝেয় তার পায়ের ছাপ পড়ত-ই। কিন্তু ব্রজবল্লভবাবুর ঘর তকতকে পরিস্কার। এর মানে আততায়ীদের একজন ছিল ঘরের ভিতরেই। কিন্তু কে সে! আচ্ছা প্রতুলবাবু, সুবলকে দেখছি না কেন? তাকে একটিবার ডাকুন তো...

বলতে বলতে একটু নুয়ে জানালার পাশের ঝোপ থেকে কি একটা চকচকে বস্তু তুলে পকেটে চালান করে দিল সৌম্য। পরিত্যক্ত সিগারেটের টুকরোগুলো একটা কৌটোয় ভরে সেটাও পকেটে পুরে নিল সে। 

 

ফের জানালা বেয়ে ঘরে ঢুকার আগে প্রতুল জিজ্ঞেস করলেন,

-তৃতীয় পায়ের ছাপটা পুরুষ না মহিলার, বললেন না তো! 

- মনে হচ্ছে ওটা কোনও মানুষের পায়ের ছাপ নয়, গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল সৌম্য।

- এ কি! এসব আপনি কি বলছেন ডাঙরিয়া!'

বিস্মিত প্রতুলবাবুর প্রশ্নে সৌম্য বলে, এটাকে একটা সাধারণ কিডন্যাপিং-এর কেস ভাবলে বিরাট ভুল করবেন দারোগা সাহেব। এর শেকড় অনেক গভীরে... 

পর্ব ৬

-সুবল... এ্যাই সুবল... কোথায় গিয়ে সেঁধিয়েছিস রে ব্যাটা...

ঘরে ঢুকেই বাজখাঁই গলায় হাঁক পাড়লেন প্রতুল দারোগা। 

ত্রস্ত পায়ে ছুটে এল সুবল। বলল,

-আপনাদের জন্য চা করতে রান্নাঘরে গিয়েছিলাম বাবু।

--ঠিক আছে, চা-ফা একটু পরে হলেও চলবে।  তার আগে এই বাবু তোমাকে কিছু প্রশ্ন করবেন। ঠিকঠাক উত্তর দেবে। বেচাল দেখলে কিন্তু সোজা থানায় উঠিয়ে নিয়ে যাব, বুঝলে।   

বেশ শক্ত গলায় বললেন প্রতুল দারোগা। তার কথা শুনে ঘাবড়ে গেল সুবল। 

সৌম্য জিগ্যেস করল,

--আচ্ছা সুবল, আমরা যাওয়ার পর গতকাল রাতে কি কেউ ব্রজবল্লভবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?

--না দাদাবাবু...কেউ তো আসেনি। 

--রাতে তোমার নজরে ব্রজবল্লভবাবুর আচরণে কি কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েছে?

-- ঠিক ততটা খেয়াল করিনি দাদাবাবু। আসলে হয়েছে কি, কাল রাতে গিন্নিমা ও শশীকান্ত দাদাবাবু একটু তাড়াতাড়িই খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়েছিলেন। বাকি ছিলেন শুধু বাবু। তা আপনারা যাওয়ার পর বাবুকে খেতে ডাকলাম। তিনি খাওয়া শেষ করার আগেই তেড়ে বৃষ্টি নামল। খেতে-খেতে বাবু বললেন, রাতে যেন তাকে ডিস্টার্ব না করা হয়। তারপর ঘুমোতে যাবার আগে আমাকে দরজা জানালাগুলো ভাল করে পরীক্ষা করে নিতেও বললেন। এদিকে সব কাজ শেষ করতে অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় বড্ড ঘুম পেয়েছিল। তাই নাকেমুখে দু'টো দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমিও।

-রাতে কোনও শব্দ শুনতে পেয়েছিলে?

-না দাদাবাবু।

-ব্রজবল্লভবাবুকে যে অপহরণ করা হয়েছে সেটা প্রথম কার নজরে পড়ে?

-আজ্ঞে আমিই প্রথম বিষয়টা দেখতে পাই। রোজ সকাল পাঁচটার আগেই বাবুকে চা করে দিই। কিন্তু আজ চা নিয়ে গিয়ে দেখি বাবু নেই। প্রথমটায় ভাবলাম, বোধহয় বাথরুমে গেছেন। কিন্তু হঠাৎ বিছানার চাদরে রক্তের দাগ দেখে ভয় পেয়ে যাই। আমার চিৎকারে বাড়ির অন্যরা ছুটে আসেন।

-আচ্ছা সুবল, তোমার গিন্নিমা কোথায়? শশীকান্তবাবুকেও তো দেখছি না!
 
সুবলের কথায় জানা যায়, আজকাল রাধারাণী দেবী নিজেকে সাংসারিক ঝামেলায় খুব একটা জড়াতে চান না। উপরের একটা ঘরে সারাক্ষণ ধর্মকর্ম নিয়েই পড়ে থাকেন। ব্রজবল্লভবাবু নিখোঁজ হবার পর সকাল থেকে ঠাকুর ঘরে হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন তিনি। আর শশীকান্ত একটু আগে একটা দরকারি জিনিস কিনতে বাজারে বেরিয়েছেন।
 
-আচ্ছা বলতো সুবল, এই বাড়িতে বার্মিজ পারফিউম কে ব্যবহার করেন?

আচমকাই প্রশ্নটা করে সৌম্য।

 

এরকম একটা প্রশ্নে প্রথমটায় থতমত খেলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেয় সুবল। বলে,

--বার্মিজ পারফিউম! না দাদাবাবু, এবাড়িতে এরকম কোনকিছুর নাম শুনিনি।

সুবলের হাবভাবে সৌম্যর মনে হল, লোকটা ইচ্ছে করেই অনেক কিছু চেপে গিয়েছে। তবে এনিয়ে সে তাকে কোনও প্রশ্ন না করে বলল
--ঠিক আছে তুমি এবার আমাদের সবাইকে তোমার গিন্নিমার কাছে নিয়ে চল।'


যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সুবল। বলল ---'আসুন...'

||||||||

সুবলের পিছন পিছন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরের ঘরে উঠে গেল সৌম্যরা। ঠাকুরঘরটা রাধারাণীদেবীর কক্ষের একেবারে পাশ ঘেঁষে। দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে রাধারাণীদেবীকে সৌম্যদের আগমনের সংবাদ দিল সুবল। এদেরকে ঘরে নিয়ে বসানোর নির্দেশ দিলেন রাধারাণী।

একটু বাদে। পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন রাধারাণী। তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল সৌম্য। মামন, সুমন এমনকি প্রতুলবাবু পর্যন্ত হা করে তাকিয়ে রইলেন।

বিষন্ন সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি এই মহিলার বয়স ত্রিশ-বত্রিশের বেশি নয়। লম্বা চুল,কপালে বড় টিপ। সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর। মহিলার শরীর থেকে সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়ছে।

ছোট্ট করে সবাইকে নমস্কার জানিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসলেন রাধারাণী। নীরবতায় কেটে গেল কয়েকটা মিনিট ।

গলা খাঁকারি দিয়ে ঘরের ভিতরের পরিবেশটাকে  স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে সৌম্য। বলে,

-বুঝতেই পারছি, এইসময়ে আপনি মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত। তবে কর্তব্যের খাতিরে আপনাকে একটু বিরক্ত করতে হচ্ছে।

-বলুন কি জানতে চান।-- সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলেন রাধারাণী।

-কাল রাতে ঠিক ক'টায় ঘুমিয়ে ছিলেন আপনি?

-ঘড়ি দেখিনি। তাই ঠিক বলতে পারব না। তবে মনে হয় একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

-হুম...আচ্ছা বলুনতো, ব্রজবল্লভবাবুর কী কারোর সঙ্গে শত্রুতা ছিল? মনোমালিন্য,  ঝগড়া, নিদেনপক্ষে বৈষয়িক বিবাদ---জানা আছে তেমন কিছু?

 

--না...তাঁর কোনও শত্রু আছে বলে মনে হয় না। থাকলে আমি অন্তত জানতাম।'

-তিনি যে পর্তুগিজ আমলের একটা দুষ্প্রাপ্য ছবি ও তালাচাবি সংগ্রহ করেছিলেন, সেটা কি আপনি জানতেন?'

--না... তার ওইসব হাবিজাবি সংগ্রহের প্রতি আমার কোনও আগ্রহ না থাকায় এনিয়ে আমি কোনও দিন প্রশ্ন করিনি। তবে বাড়িতে চোর পড়ার পর তিনি আমাকে ছবি ও তালাচাবিটার ব্যাপারে কিছুটা বলেছিলেন।

--আচ্ছা, আপনার কি কারোর উপর সন্দেহ হয়?

--সন্দেহ থাকলে সেটা আপনাদের আগেই জানিয়ে দিতাম। আসলে উনি বাইরে কোথায় যান, কাদের সঙ্গে মেলামেশা করেন  - এসব ব্যাপারে আমি খুব কম-ই জানি। বিশেষ করে গুরুদেবের কাছে দীক্ষা নেওয়ার পর এসব নিয়ে প্রশ্ন করা ছেড়েই দিয়েছি। 

-হুম... আপনার গুরুদেব মানে কার কাছে দীক্ষা নিলেন আপনি ? তাঁর আশ্রমটা কোন জায়গায় একটু বলবেন?

--আজ্ঞে আমার গুরুদেব হলেন শ্রীশ্রী জগদীশ্বরানন্দজি মহারাজ। 


কথা বলতে বলতে কপালে হাত ঠেকিয়ে ইষ্টগুরুকে প্রণাম জানালেন রাধারানি। বললেন, গুরুদেবের আশ্রম জিরিবামে।

---হুম... ঠিক আছে রাধারাণীদেবী, আপনি বরং বিশ্রাম নিন।  প্রয়োজনে আপনার সঙ্গে পরে কথা হবে।

ম্লান হাসি হাসলেন রাধারাণী। বললেন, উনি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার আর বিশ্রাম! আপনারা যে কোনও উপায়ে উনাকে উদ্ধার করুন প্লিজ।

--সেই চেষ্টা -ই তো করছি ম্যাডাম। দেখি কতটুকু কি করা যায়। 


বলতে বলতে উঠে পড়ল সৌম্য। তার দেখাদেখি প্রতুলবাবু সহ অন্যরাও উঠে পড়ল। সিঁড়ির দিকে কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল সৌম্য। বলল, বাদ্যযন্ত্র বাজানোটা এভাবে না ছাড়লেও পারতেন রাধারাণীদেবী। 


চমকে উঠলেন ভদ্রমহিলা। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন সৌম্যর দিকে। মনেহল ব্লটিংপেপার দিয়ে কেউ তার মুখের সব রক্ত শুষে নিয়েছে।

|||||

নিচে নেমে প্রতুল হাজরিকা বললেন,
-আপনি আবারও আমাকে অবাক করলেন সৌম্য ডাঙরিয়া। ভদ্রমহিলা যে বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, সেটা বুঝলেন কি করে?

রহস্যময় হাসি ফোটে ওঠে সৌম্যর মুখে। বলে,
-সময় আসুক। এক-এক করে সব জানতে পারবেন।'

সৌম্যর উত্তরে প্রতুল হাজরিকার যে মন ভরেনি, সেটা তাঁর মুখের অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট। তবে এ ব্যাপারে তিনি আর চাপাচাপিও করলেন না। বরং পর্তুগিজ আমলের ছবি ও তালাচাবির ব্যাপারে জানার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তৃতীয় পায়ের ছাপ নিয়েও প্রশ্ন করলেন।প্রতুলবাবুকে তালাচাবি ও ছবি বৃত্তান্ত বিস্তারিত বর্ণনা করল সৌম্য। গতকাল রাতে তাদের আগমন, ব্রজবল্লভবাবুর বাড়িতে চুরি কাণ্ড, মিন্টু গনজালভেস -- কোনও প্রসঙ্গই বাদ গেল না। পরিশেষে বলল,'ওই পায়ের ছাপটা কার, সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। তবে আমার যা মনে হচ্ছে,  সেটা কনফার্ম করতে গেলে আরও একটু খোঁজখবর নিতে হবে।'

প্রতুল হাজরিকা কি বুঝলেন কে জানে, হঠাৎ সৌম্যর একটা হাত ধরে বললেন, 

--এই কেসটার তদন্তের ভার আপনিই নিন সৌম্য ডাঙরিয়া। পুলিশের তরফে আমি আপনাকে সবধরনের সহযোগিতা করব। 

-না না, তদন্ত আপনিই করুন। আমি মানে আমরা এই তিনজন আপনার সঙ্গে থাকব।

সৌম্যর কথায় প্রতুল কতটা আশ্বস্ত হলেন বোঝা গেল না। ব্রজবল্লভবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বললেন, চলুন, আগে থানায় গিয়ে এক-এক কাপ চা হয়ে যাক।

|||||

সৌম্যরা যখন থানায় গিয়ে পৌঁছাল, ঘড়ির কাঁটা সকাল এগারোটার ঘরে। কনেস্টবলকে ডেকে বিহারির দোকান থেকে গরমাগরম চা-শিঙাড়া আনতে  বললেন প্রতুল হাজরিকা।

একটু পরে। গরম শিঙাড়ায় কামড় বসিয়ে প্রতুলবাবু গল্প জুড়ে দিলেন। একথা সে-কথার ফাঁকে সৌম্য প্রতুলবাবুকে হাইলাকান্দি থানায় যোগাযোগ করে ফিরিঙ্গি বাজার এলাকার মিন্টু গনজালভেসের ব্যাপারে বিস্তারিত খবর জোগাড় করার অনুরোধ জানাল। গল্প আরও কিছুক্ষণ চলত। কিন্তু হঠাৎ সৌম্যর মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

 

স্ক্রিনে নম্বরটা ভেসে উঠতে হুড়মুড় করে বাইরে চলে গেল সৌম্য।  ওপাশ থেকে কে কি বলছেন বোঝা গেল না। সৌম্য শুধু হু হা করে চলেছে। একসময় বলল, 'ঠিক আছে স্যার। আজ বিকেলের মধ্যে আমি আসছি।'

|||||

কথা শেষ করে প্রতুলবাবুকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়ল সৌম্য। গাড়িতে বসতে বসতে সুমন বলল, এখন কোথায় যেতে হবে?

ড্রাইভিং সিটে বসে একটা সিগারেট ধরাল সৌম্য। হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে বলল,এখন সাড়ে বারোটা। তারমানে বিকেল তিনটার আগে বদরপুর গিয়ে  পৌঁছাতে হলে আমাদের এখনই রওয়ানা হতে হবে। 

-এ কি! হঠাৎ এই অবেলায় বদরপুর কেন?

-যেতেই হচ্ছে। অনেক কষ্টে প্রফেসর প্রশান্তভূষণের নাগাল পেয়েছি। তিনি বিকেল তিনটেয়  দেখা করার কথা বলেছেন। 

আজ অনেক বছর পর প্রফেসর প্রশান্তভূষণ ভট্টাচার্যের নামটা শুনে ভদ্রলোকের চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল সুমনের। উষ্কখুষ্ক কাঁচাপাকা চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কালো দোহারা চেহারার পিবি স্যার কলেজে তাদের বাংলা পড়াতেন। তবে অন্যান্য বিষয়েও তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। বিশেষকরে এই অঞ্চলের লুপ্ত ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। তাঁকে চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া বললেও ভুল হবে না।

কিন্তু তিনি তো শিলচরের বাসিন্দা। বদরপুর গেলেন কবে? প্রশ্নটা করে আরও কিছু জিগ্যেস করতে  যাবে, তার আগেই সৌম্য বলল, সুমন, তুই চাইলে তোকে বাড়িতে নামিয়ে আমি না-হয় মামনকে নিয়েই চলে যাব।

-না না, আমি তোদের সঙ্গেই যাচ্ছি। আচ্ছা পিবি স্যারের বাড়ি তো তারাপুরে ছিল, তাই-না? আর তাঁর তো এতদিনে রিটায়ারে যাওয়ার কথা। তা তিনি  বাড়িঘর ছেড়ে বদরপুরে কি করছেন?

--যদ্দূর জানি, রিটায়ারের পর তিনি এখন বদরপুরের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন।  সম্ভবত  সেকারণেই  ঘর ভাড়া নিয়ে বদরপুরে আছেন।

সৌম্যর কথায় মামন সুমন দুজনেই হেসে উঠল। মামন বলল, সত্যি সুমনদা, পিবি স্যার পারেনও বটে। প্রচারবিমুখ এই ভদ্রলোক সারাটা জীবন শুধু গবেষণা করে গেলেন। রিটায়ারমেন্টের পরও বসে নেই।

-সত্যি রে মামন, স্যারের কাছে  এই উপত্যকার মানুষের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। অতীতের অন্ধকার খুঁড়ে উপত্যকায় আমাদের লিগ্যাসি প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি যে ভূমিকা পালন করে চলেছেন সেটাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। 


সুমনের কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয় সৌম্যও।

||||

এতক্ষণে চিরুকান্দি পেরিয়ে হাইওয়ে ধরে রামনগরের উপর দিয়ে মারুতি গাড়িটা বেশ গতিতে ছুটে চলেছে। এদিকটা আগে বেশ খোলামেলা ছিল। এখন রাস্তার দুপাশে ধাবা রেস্টুরেন্টের ছড়াছড়ি। ভাল দেখে একটা ধাবার সামনে গিয়ে ব্রেক কষল সৌম্য। বলল,
-চটপট নেমে পড়। দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সেরে নিতে হবে। 


|||||||

চৈত্রের দুপুর। বেশ গরম পড়েছে। ধাবায় তেমন লোকজন নেই। বাইরে পাতানো খাটিয়ার উপর দুএকজন বসে গল্পগুজব করতে করতে খাচ্ছে।  ভিতরেও একই দৃশ্য। আসলে এদিকটার ধাবায় ভিড় বাড়ে বিকেলের পর। 


সৌম্যদের দেখে ধাবার ম্যানেজার কর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে হাঁক পাড়লেন। কমবয়সী একটা ছেলে দৌড়ে এসে তাদের কোণের টেবিলটায় নিয়ে বসিয়ে দিল। সবার জন্য খাবারের অর্ডার দিল সৌম্য। ডাল, লেবু, পাঁপড়, পুদিনার চাটনি, কুঁচোনো আলু, ফিশ ফ্রাই। বেশ জমিয়ে লাঞ্চ করল সবাই। মামনের খাওয়া আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।  বাইরে পানের দোকানে গেল সে।

তপ্ত দুপুর। হাইওয়ের উপর দিয়ে হুস হাস করে দু'একটা গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। অর্ডার অনুযায়ী দোকানি পান বানাতে ব্যস্ত। হঠাৎ উল্টোদিকের ধাবায় চোখ আটকে গেল মামনের। গাছতলায় সকালের দেখা সেই ছাই-রঙা বলেরোটা ! তবে গাড়িতে কেউ নেই। বোঝাই যাচ্ছে, সবাই ভিতরে খেতে গিয়েছে। এতক্ষণে সৌম্য এবং সুমন বেরিয়ে এল। 

- কিরে, এখানে দাঁড়িয়ে হা করে কি দেখছিস? প্রশ্নের সঙ্গে সৌম্যর চোখটাও গিয়ে আটকে গেল রাস্তার ওপারে বলেরোটার উপর।

 

 

পর্ব ৭

গাড়িটাকে দেখে বেশ জোরে হেসে উঠল সৌম্য। বলল--

-কি-রে মামন, এত মনোযোগ দিয়ে দেখার কি আছে। শহরে বলেরো গাড়ি কি শুধু এই একটাই?

 

-তা হবে কেন, কিন্তু ছাই রঙের  বলেরো বেশ আনকমন! কোম্পানি এই রঙের কোনও মডেল বানিয়েছে বলে মনেহয় না। নিশ্চয় গাড়িটাকে মডিফাই করা হয়েছে।

 

-তোর কথায় লজিক আছে রে। নে চল, এবার তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠ্। আমাদের আবার সময়ে গিয়ে পৌঁছাতে হবে।
বলতে বলতে সৌম্য ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ল। মামন ও সুমনকে নিয়ে গাড়ি ছুটে চলল বদরপুরের দিকে।


||||

বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ দু'টো লেগে গিয়েছিল মামনের, বুঝতেই পারেনি। তন্দ্রা ভাঙল ঝাঁকুনি লেগে। চোখ কচলে বাইরে তাকাল সে।  সিদ্ধেশ্বর কপিলাশ্রমের সামনে গাড়িটাকে দাঁড় করিয়েছে সৌম্য। সামনে আরও দু-তিনটে সারিবদ্ধ গাড়ি। সবাই দানবাক্সে খুচরো পয়সা ফেলছে। এখান থেকে বদরপুর খুব-একটা দূর নয়।
 

মামনকে জেগে উঠতে দেখে সৌম্য বলে, সুমনকে ডেকে তোল মামন। আমরা প্রায় এসে গিয়েছি।
 

পিছনের সিট থেকে তখনও নাক ডাকার একটা হাল্কা আওয়াজ ভেসে আসছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল মামন। বেহুঁশের মত ঘুমোচ্ছে সুমন। বেচারা। গতরাত একফোঁটাও ঘুম হয়নি। কিন্তু না ডেকে উপায় নেই।

 

||||||


একটু বাদে। বদরপুর মিশন রোডে প্রফেসর প্রশান্তভূষণের ড্রইংরুমে বসে আছে সৌম্যরা। হাতে চায়ের কাপ। বোঝাই যাচ্ছে, কিছুক্ষণ আগেই তারা এখানে এসে পৌঁছেছে। 

 

গম্ভীরমুখে পায়চারি করতে করতে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন প্রফেসর প্রশান্তভূষণ। দৃষ্টি দূর আকাশের দিকে। নীরবতার মধ্যদিয়েই কেটে গেল কয়েকটা মূহুর্ত। এবার সৌম্যর দিকে  তাকিয়ে প্রশান্ত ভূষণ বললেন,
-তুমি এই অঞ্চলে বিদেশীদের আগমনের বিবরণ জানতে চেয়েছো তাই-না? কথা হচ্ছে কি, জলপথ ব্যবহার করে এই ভূখণ্ডে বহুবার বিদেশীদের আগমন ঘটেছে। ইংরেজ ছাড়াও এখানে পর্তুগিজ, ওলান্দাজ এমনকি বার্মার আরাকান প্রদেশ থেকে মগ জলদস্যুরাও এসেছে। এসেছিল বর্গী হানাদাররাও। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, এসবের কোনও লিপিবদ্ধ ইতিহাস আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এর একটা সম্ভাব্য কারণ হচ্ছে, এদেশীয় মানুষের কাছে সাদা চামড়ার লোক মানেই ফিরিঙ্গি। কারা ইংরেজ, কে ওলান্দাজ---আর কে-ই-বা পর্তুগিজ, এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। তাই লিখে রাখার প্রয়োজনও অনুভব করেনি। যা কিছু ছিল মুখেমুখে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে একদিন তা-ও ভুলে যেতে থাকে মানুষ। ক্রমে উপত্যকায় ইংরেজ বাদে অন্যান্য ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর আগমনের ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। শুধু কিছুকিছু প্রাচীন পুঁথি, লোকগাঁথা এবং দু'একটা জায়গার নামের সঙ্গে তাদের স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়ে যায়। ভাবলে অবাক হতে হয়, হাইলাকান্দিতে একসময় ফিরিঙ্গিরা বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিল। তা না হলে সেখানকার একটা জায়গার নাম ফিরিঙ্গি বাজার তো আরেকটি হার্বার্ট গঞ্জ হবে কেন! এগুলোর কোনোটাই তো এদেশীয় নাম নয়। এছাড়া শিলচর তারাপুরেও এডগারগঞ্জ নামে এরকম একটা বাজার ছিল। কিন্তু জায়গাটা নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার ফলে সেটার কথা এখন আর কেউ জানেই না। আর বদরপুরে পর্তুগিজদের বসতি স্থাপনের কথা তো তোমরা সকলেই জান। দেখতেই পাচ্ছ, মিশন রোডে এখনও অনেক পর্তুগিজ পরিবারের বাস। এই যে এখানে আসার পথে রাস্তার মোড়ে যে চার্চটা নজরে পড়ে, সেটাও তো পর্তুগিজরাই প্রতিষ্ঠা করেছিল। এছাড়া বদরপুর থেকে কয়েক কিলোমিটার এগোলে করিমগঞ্জ পাওয়ার আগে ভাঙ্গা এলাকায় মর্জাতকান্দির নাম হয়ত শুনে থাকবে তোমরাও। কথিত আছে, ওই জায়গাটার গোড়াপত্তন করেন এক পর্তুগিজ জমিদার। মোৎজার্ট বা মোজার্ত সাহেব। স্থানীয় উচ্চারণে মোৎজার্ট হয়ে যান মরজাত বা মর্জাৎ। জায়গাটাও সেই নামে পরিচিতি লাভ করে। তবে ভদ্রলোকের নাম শুনে আমার যা ধারণা, তিনি মোটেই পর্তুগিজ ছিলেন না। সম্ভবত তিনি ওলান্দাজ। কারণ, ওইসময় পর্তুগিজদের অনুকরণে বহু ওলান্দাজ এদেশে আসে। তবে এর কোনও সঠিক ইতিহাস না থাকায় এতবছর পর  আমার এই ধারণার সত্যতা নির্ণয় করা সম্ভব নয়।  

||||||

এতক্ষণ নাগাড়ে বলে একটু থামলেন প্রশান্তভূষন। ঘরে পিনপতন নীরবতা। সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছে। আসলে তাঁর বলার ঢঙটা বরাবরই আকর্ষণীয়। ক্লাসেও এরকম ভাবেই বলতেন। সবাই সম্মোহিত হয়ে যেত। সৌম্যদের মনে হল, অনেক বছর বাদে তারা যেন ফের একবার পিবি স্যারের ক্লাসে ফিরে গিয়েছে।

একটু জিরিয়ে নিয়ে প্রশান্তভূষণ বললেন, -এ-সব পুরোনো দিনের কথা শুনতে তোমাদের ভাল্লাগছে তো?'


সুমন বলল, হ্যাঁ স্যার, বিষয়টা দারুণ ইন্টারেস্টিং।

মনে হল এ-কথা শুনে প্রশান্তভূষণ বেশ উৎসাহিত হয়ে ওঠলেন । বললেন, 

-তোমরা জানলে আরও অবাক হবে, এই সাদাচামড়ার সাহেবদের অনেক খারাপ দিক থাকা সত্বেও আমাদের ভাষা-সাহিত্য সমৃদ্ধ হওয়ার পিছনে কিন্তু পর্তুগিজদের অবদান অনস্বীকার্য। সবাই জানে কি-না জানি না। কিন্তু এটা সত্যি, বাংলায় প্রথম ব্যাকরণের বই রচনা করেন এক পর্তুগিজ পাদ্রী। ম্যানুয়েল দ্যা আসসুম্পসাঁউ। বর্তমান বাংলাদেশের কালীগঞ্জ উপজেলায় ভাওয়াল বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে এক গির্জায় থাকতেন ওই সাহেব। তাঁর হাতেই বাংলায় এক দ্বিভাষিক অভিধান ও খণ্ডিত ব্যাকরণ রচিত হয়। ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেঙ্গেল্লা ই পর্তুগিজ (Vocabulario Em Edioma Bengalla E Portuguese)। প্রকাশকাল সম্ভবত ১৭৪৩ সাল। যা পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে রোমান হরফে ছাপা হয়। যদিও অভিধানটিতে ভাওয়াল অঞ্চলের প্রাত্যহিক শব্দ-ই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে ভারতবর্ষে এটাই ছিল প্রথম প্রকাশিত বাংলা অভিধান ও ব্যাকরণের বই। শুধু এ-ই নয়, কৃপা শাস্ত্রের অর্থভেদ নামে বাংলা ভাষার দ্বিতীয় গদ্যটি রচনা করেছিলেন ওই আসসুম্পসাঁউ সাহেব-ই। পুস্তিকাটি যিশু ও তাঁর শিষ্যদের কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে রচিত। এটিও ১৭৪৩ সালে লিসবন থেকে প্রকাশিত।

কথা শেষ করে কেমন যেন নিজের মধ্যেই হারিয়ে গেলেন প্রশান্তভূষণবাবু। নিস্তব্ধ ড্রইংরুম। জানালার বাইরে নারকোল গাছের ওপারে বিকেলের সূর্যটা হেলে পড়েছে। সবাই যেন কেমন একটা ঘোরের মধ্যে।

||||||

বেশ কিছুক্ষণ নীরবতার মধ্যদিয়ে কেটে যাওয়ার পর সৌম্য জিগ্যেস করল, 
-স্যার, শোনা যায় মোজার্ট সাহেবের কাছে একটা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছবি ও তালাচাবি ছিল। কথাটা কতদূর সত্যি?


সৌম্যর কথায় চমকে উঠতে গিয়েও সামলে নেন প্রশান্তভূষণ। বলেন, 
-- আশ্চর্য ! ছবি এবং ওই তালাচাবিটার কথা তুমি জানলে কোত্থেকে?

 

-- ঘটনাচক্রে কিছুটা জেনে ফেলেছি স্যার। এবার পুরোটা জানার আগ্রহ নিয়েই আপনার কাছে ছুটে আসা।

 

-- হুম...  আসলে এই সেদিনও আমি এব্যাপারে কিস্যুটি জানতাম না। কিন্তু একদিন কাকতালীয় ভাবে এই ঘটনা আমার গোচরে আসে। হয়েছে কি, দিনকয়েক আগে মর্জাতকান্দি এলাকায় অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে একটা প্রাচীন পুঁথির সন্ধান পাই। যেখানে ছবি ও তালাচাবিটার নানা অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা বর্ণিত হয়েছে। পুঁথির বয়ান অনুযায়ী, জিনিসগুলোর সঙ্গে এক রক্তাক্ত ইতিহাস জড়িত। প্রায় দু'শ বছর আগে ছবি ও তালাচাবিটার জন্য মোজার্ট সাহেবকে সপরিবারে খুন হতে হয়েছে।

||||||

উত্তেজনার এক অদ্ভুত ধরনের শব্দ করে বসল মামন। চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে সে বলল,
-এ কি স্যার, দু'শ বছর আগে খুন ! এসব কথা তো আগে কখনও শুনিনি!

প্রশান্তভূষণ বললেন, 

--দেখ, শুধুমাত্র একটা পুঁথির উপর ভরসা করে কোনও ঘটনার সত্যতা যাচাই করা মুস্কিল। কারণ, পুঁথি কোনও প্রামাণ্য দলিল নয়। তবে এটাও তো ঠিক, কবিয়ালরা প্রায়ই সমসাময়িক কোনও বড় ঘটনার উপর ভিত্তি করে  পুঁথি রচনা করে গিয়েছেন। সেই হিসেবে এই পুঁথিটারও একটা গ্রহণযোগ্যতা থাকার কথা। তাছাড়া এটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, জমিদার মোজার্টের নির্দেশেই এ পুঁথি রচনার কাজ শুরু হয়েছিল। তা না-হলে পর্তুগালের ইতিহাস এই ভূখণ্ডের কোনও কবিয়ালের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।


সৌম্য জিগ্যেস করল, তাহলে ছবি ও তালাচাবিটার মধ্যে কি সম্পর্ক-- এব্যাপারে কি পুঁথিতে কোনও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে?

প্রশান্তভূষণ বললেন, পুঁথির বয়ান কতটা নির্ভরযোগ্য জানি না। তবে এতে উল্লেখ রয়েছে, ছবিটা না-কি পর্তুগালের নিঃসন্তান রাজা হেনরি-র দত্তক কন্যা প্রিন্সেস মেরি-র। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে পর্তুগালের রাজা ছিলেন এই হেনরি।  সেসময় তাঁর রাজ্যে এক অজানা রোগের প্রকোপে হাজার হাজার মানুষ মরতে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রাণ হারায় রাজকন্যা মেরি-ও। শোকে  রাজা হেনরির তখন পাগল পাগল অবস্থা। যাই হোক, কিছুদিন পর শোক কিছুটা কাটিয়ে ওঠেন হেনরি। এরপর তার দরবারের সবচাইতে দক্ষ চিত্রশিল্পীকে দিয়ে প্রয়াত কন্যার একটা ছবি আঁকানোর বন্দোবস্ত করেন। সঙ্গে মেয়ের সম্মানার্থে কোষাগারের সবচেয়ে দামি রত্ন ছবিতে ব্যবহারের নির্দেশও দেন। শোনা যায়, ওই চিত্রকর রাজা হেনরিকে হতাশ করেননি। অসাধারণ দক্ষতায় ক্যানভাসে যেন জীবন্ত মেরিকেই বন্দী করেছিলেন তিনি। আর মূল্যবান পাথরগুলো ছবিতে এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যার হদিস তিনি ও রাজা হেনরি ছাড়া তৃতীয় কেউ জানত না। জানা যায়, আঁকা শেষ হওয়ার পর ছবিটাকে একমূহুর্তের জন্যও কাছ ছাড়া করেননি হেনরি। প্রিয় কন্যাকে বুকের কাছেই রাখতেন। কিন্তু একদিন পর্তুগালের উপর বিপদ ঘনিয়ে আসে। হেনরির রাজ্য আক্রমণ করে বসেন স্পেনের রাজা ফিলিপ। পরাজয় নিশ্চিত জেনে নিরুপায় হেনরি তখন ছবিটাকে একটা লোহার সিন্দুকে তালাবন্ধ করে সেটা তাঁর এক বিশ্বস্ত অনুচরকে সঁপে দেন। সেটাই হাতবদল হয়ে কোনও একসময় মোজার্ট পরিবারের হাতে আসে। ছবি ও তালাচাবির যোগসূত্রটা এখানেই।

-- তা এই ছবি ও তালাচাবিটার জন্য মোজার্টকে কেন সপরিবারে খুন হতে হল? আর কারা-ই বা খুন করল?---ফের প্রশ্ন করল সৌম্য। 


প্রশান্তভূষণ বলেন, সম্ভবত ছবির মধ্যে থাকা দুর্মূল্য রত্নের জন্যই একরাতে মোজার্টের কুঠিতে আরাকানী জলদস্যুরা অতর্কিতে এসে হানা দেয়। সেই আক্রমণে  মোজার্টকে সপরিবারে খুন হতে হয়। ব্যস, মোজার্ট খুনের ব্যাপারে পুঁথিতে এর বেশি আর উল্লেখ করা হয়নি। খুব সম্ভবত মগ হানার পর ওই কবিয়াল গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। পুঁথির শেষে ছোট্ট করে একটা পাদটীকায় এরই ইঙ্গিত রয়েছে। সেটা পড়ে আরও জানা যায়, প্রিন্সেস মেরি-র ওই ছবিটা নাকি অভিশপ্ত। মগ জলদস্যুরা এর থেকে রত্ন বের করতে তো পারেইনি, উল্টো নানা অসুখবিসুখ হয়ে মারা যায় সবাই। 

|||||

কথা শেষ করলেন প্রশান্তভূষণ। এতক্ষণে বাইরের আলো ফিকে হয়ে এসেছে। বাগানে ঝোপঝাড় ও গাছের নিচে দলা দলা অন্ধকার। ড্রইংরুমের ভিতরটাও অন্ধকার। 


পিবি স্যারকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়ল সৌম্যরা। যাওয়ার আগে সুমন বলল, 
--স্যার, মিউজিয়ামে চাকরি করার সুবাদে আমাকে অনেক কথাই জানতে হয়। কিন্তু আজ আপনার কাছে যেটুকু জানতে পারলাম, সেটা আমার আজীবন মনে থাকবে। ভাল থাকবেন স্যার। আমাদের প্রণাম নেবেন।

|||||||

এতক্ষণে মিশন রোডে স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলে ওঠেছে। সৌম্যদের মারুতিটা প্রশান্তভূষণ ভট্টাচার্যের বাড়ির ফটকের বাইরে রাস্তার পাশে রাখা। সেখানে আসতেই রাস্তার মোড়ের মন্দির থেকে কাঁসরঘণ্টার আওয়াজ ভেসে এল। হাতঘড়িটা দেখে নিয়ে সৌম্য বলল, 'স্যারের সান্নিধ্যে তিনঘন্টা সময় কোনদিক দিয়ে পার হয়ে গেল বোঝাই গেল না।  বুঝলি মামন-সুমন, এখানে না এলে এই কেসটা সলভ করা সত্যিই মুস্কিল হয়ে যেত।

একটা জনপ্রিয় গানের কলি শিস দিতে দিতে গাড়িতে গিয়ে বসল সৌম্য। পকেট হাতড়ে চাবিটা বের করে বলল,
জানিস সুমন, এই চাবি শব্দটাও কিন্তু পর্তুগিজ থেকে নেওয়া।

-নিকুচি করছে তোর পর্তুগিজের। গতকাল থেকে এই একটা শব্দ শুনে শুনে কান-মাথা ভোঁভোঁ করছে। মনে হচ্ছে নিজেই পর্তুগিজ হয়ে গিয়েছি।


সুমনের প্রতিক্রিয়ায় হোহো করে হেসে উঠল সৌম্য। তাকে দেখে মামনের মনে হল, এতক্ষণ অকূলপাথারে ভেসে বেড়ানোর পর অবশেষে আলোর সন্ধান পেয়েছে সে। দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করার সুবাদে সৌম্যর শরীরের ভাষা সে ভালই বুঝতে পারে। সঙ্গে এটাও জানে, এই মূহুর্তে তাকে কিছু জিগ্যেস করা আর পাথরে কপাল ঠুকে মরা একই কথা। কারণ, তার পেটে এখন বোমা ফাটালেও মুখ দিয়ে একটা কথা বেরোবে না।

গল্প করতে করতে বদরপুর বাজারে মিষ্টির দোকানের সামনে গাড়িটা নিয়ে দাঁড় করালো সৌম্য। বলল, 'চটজলদি নেমে পড়। পেটে এককাপ চা  না পড়লে এতটা পথ গাড়ি চালানো সম্ভব হবে না। '


গাড়ি থেকে নেমে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল সবাই। হঠাৎ সামনে স্টেশন রোডের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠল মামন। চোখ কচলে আবারও ভাল করে দেখার চেষ্টা করল। না, কোনও ভুল নেই। সেই বলেরোটাই। সৌম্যকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে গাড়িটা দেখানোর চেষ্টা করতে সে বলল, খবরদার, ওদিকে একদম তাকাবি না। আমি সব দেখতে পেয়েছি। কিন্তু ওদের সেটা বুঝতে দিলে চলবে না। বাছাধনেরা এখনও টের পায়নি, কার পিছনে টিকটিকিগিরি করছে।


কথা বলতে গিয়ে একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল সৌম্যর চোখেমুখে।  

পর্ব ৮

বদরপুরে কাকলি টি-স্টলের চা বেশ প্রসিদ্ধ। দোকান মালিক সৌম্যর পূর্বপরিচিত। তাই খাতিরযত্নে কোনও ত্রুটি হল না। আধঘন্টার মধ্যে চা পর্ব শেষ করে বেরিয়ে পড়ল সবাই।

 

স্টেশন রোডের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকাল মামন। নাহ্, বলেরোটা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো সে। 
 

কিছু সময়ের মধ্যে অন্ধকার চিরে হাইওয়ে ধরে সৌম্যদের মারুতি ছুটে চলল শিলচরের দিকে। মাঝেমধ্যে উল্টো দিক থেকে আসা লরি হেডলাইটের তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে হুস-হাস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। গাড়ির ভিতরে সবাই চুপচাপ। চলতে চলতে পাঁচগ্রামে পৌঁছে গেল সৌম্যরা। এদিকটার রাস্তা এবড়োখেবড়ো। পিচ উঠে জায়গায় জায়গায় গর্ত।  গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়েছে সৌম্য। জানালার বাইরে চোখ রাখল সুমন। ডান দিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া পেপার মিল। হিন্দুস্থান পেপার কর্পোরেশনের এই কাগজকলটি এ অঞ্চলের একমাত্র ভারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একসময় এটাকে ঘিরে কত স্বপ্ন বুনেছিলেন উপত্যকার মানুষ। কিন্তু একদিন সব মুখ থুবড়ে পড়ল।কাগজকলের টাউনশিপটা দূরে, পাহাড়ের পেটে। দু'একটা কোয়ার্টারে মিটমিট করে আলো জ্বললেও  বেশিরভাগ আবাসন ডুবে আছে অন্ধকারে। মিলটাও অন্ধকার। পথের দুই ধারে কয়েকটা দোকান তখনও খোলা। তবে লোকজন তেমন নেই। রাতের নির্জনতায় জায়গাটাকে প্রেতপুরীর মত লাগছে। অথচ কাগজকল চালু থাকতে রাতের পাঁচগ্রামে টাউনশিপের আলোকমালা শিলং কিংবা মিজোরামের কথাই মনে করিয়ে দিত।
 

সম্ভাবনার মৃত্যু বোধহয় একেই বলে! মনখারাপ হয়ে এল সুমনের। চিন্তার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে নীরবতা ভাঙলো সে।

-'আচ্ছা সৌম্য, ছবিটা নিয়ে আমাদের মধ্যে তো আর কোনও কথাই হল না। তুই কি কিছু ভেবেছিস?'

-'পর্তুগিজ রাজকন্যাকে আপাতত তোর কাছেই রেখে দে-না। '

-'উরিব্বাস! এই ভুতুড়ে ছবি আমার ঘরে আর একমূহুর্তও নয়। বাব্বা! গতকাল রাতে যা দেখেছি! আজ আবার সেরকম কিছু ঘটলে নির্ঘাত হার্টফেল করব।'

-'তাহলে তুই কি চাইছিস, সেটা বল।'

-'ছবিটা তুই তোর কাছে নিয়ে যা সৌম্য। ব্রজবল্লভবাবুকে উদ্ধার করার পর ওটা নাহয় ওকেই ফিরিয়ে দিস। উফফ! এখন বুঝতে পারছি, এত মূল্যবান হওয়া সত্ত্বেও  ব্রজবল্লভবাবু কেন ছবিটা একরকম জোরকরে গছিয়ে দিয়েছেন।'

-'ঠিক আছে। প্রিন্সেস ম্যারি না হয় ক'টা দিন আমার গরিবখানাতেই অতিথি হয়ে থাকবেন। দেখি, যদি এই ফাঁকে তাকে ভুজুংভাজুং দিয়ে লুকিয়ে রাখা রত্নের হদিশটা জেনে নেয়া যায়।'

কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠল সৌম্য।

 

তার বলার ঢঙে বেশ রেগে গেল সুমন। বলল, 'দ্যাখ সৌম্য, সব ব্যাপারে ফাজলামো একদম ভাল্লাগে না। তুই কি ভাবছিস গত রাতের ঘটনাটা আমি তোকে বানিয়ে বানিয়ে বলেছি।'

-' না রে, আমি সেটা মিন করিনি। আসলে ছবিটা আমাকেও ভাবাচ্ছে তো। তাই প্রিন্সেস ম্যারি-র ভূতের সঙ্গে মোলাকাতটা খুব জরুরি। '

||||||

কথা বলতে বলতে পাঁচগ্রাম এলাকা পিছনে ছেড়ে সৌম্যরা অনেকটা দূর এগিয়ে এসেছে। সোজা গেলে সামনে কাটাখাল নদীর উপর পুরনো রেলসেতু। তার সমান্তরালে নতুন সেতুটাও ওপার পর্যন্ত চলে গিয়েছে। সুমনের বেশ মনে আছে, একসময় নদী পারাপারে পুরনো ব্রিজটাই ছিল একমাত্র ভরসা। সম্ভবত এশিয়ার মধ্যে এটাই ছিল একমাত্র ব্রিজ, যার ওপর দিয়ে গরু, মানুষ, ট্রেন, যানবাহন -- সব যাতায়াত করতে পারতো। কিন্তু শতবর্ষ প্রাচীন শিলচর-লামডিং রুটে  মিটারগেজের পরিবর্তে ব্রডগেজ বসানো শুরু হলে পুরনো সেতুটি বাতিল হয়ে যায়। তার পাশে তৈরি হয় নতুন সেতু। একটু দূরে গৌরবময় অতীতের স্মৃতি বুকে আঁকড়ে পরাজিত সম্রাটের মত দাঁড়িয়ে আছে পুরনো কাটাখাল সেতুটা। এখন নতুন সেতুর উপর দিয়ে শুধু ট্রেন চলাচল করে। পুরনো রাস্তাটাও বদলে গিয়েছে। বদরপুর থেকে শিলচর যাওয়া-আসা করতে এখন আর সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করতে হয় না। বরং পুরনো সেতু পাওয়ার কয়েকশো মিটার আগেই রাস্তাটা ডানে বেঁকে বাইপাসের দিকে চলে গিয়েছে, যাতায়াত করতে হয় সেই পথ ধরে।


স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সে পথটাই ধরল সৌম্য। সামনের রেলক্রসিংটা পার হয়ে গেলেই কাটাখাল বাইপাস। রাস্তাটা নির্জন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এতক্ষণে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে।  মাঝেমধ্যে যা-ও বা  দু-একটা তারা দেখা যাচ্ছিল, এখন সেটাও দেখা যাচ্ছে না। তারমানে আকাশের বেশিরভাগ অংশই মেঘে ঢাকা। অন্ধকার।

গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল মামন। চরাচরে কেউ যেন কয়েক গামলা আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে। রাস্তার দুই ধারে মাইলের পর মাইল জলাভূমি।  অন্ধকার চিরে তিরের ফলার মত ছুটে চলেছে মারুতিটা।

এরকম একটা পাণ্ডববর্জিত জায়গায় কেউ কাউকে যদি মেরে পুঁতেও ফেলে, কাকপক্ষীতে টের পাবে না। কথাটা মাথায় আসতেই কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল মামন। গাড়ি চালাতে চালাতে সৌম্য হঠাৎ সুমনকে জিগ্যেস করল,

'তোর কাছে কি আত্মরক্ষার জন্য   কোনও হাতিয়ার-টাতিয়ার আছে,  সঙ্গে রাখিস এরকম কিছু? '

-'না... না, কেন বল তো?'

-'মনে হচ্ছে আরাকানী জলদস্যুর বংশধরেরা হামলা চালাবে।'

-'অ্যাঁ...কি বলছিস! এবার কি হবে?'

-'হাতিয়ার নেই তো কি, হাতপা তো আছে। প্রয়োজনে সেগুলোকেই হাতিয়ারের মত কাজে লাগাবি।'

সৌম্য'র কথায় অ্যাকশনের গন্ধ। উত্তেজনায় টানটান মামন পকেটে হাত ঢুকিয়ে লোডেড রিভলভারটা একবার পরখ করে নেয়। 


সেই 'পলাশপুরের পিশাচ' কাণ্ডের পর থেকে এটা তাঁর নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে এরকম কেসে সৌম্য'র সঙ্গী হয়ে কোথাও গেলে হাতিয়ারটা সবসময় সঙ্গেই রাখে মামন। সে জানে, এরকম আরেকটা যন্তর সৌম্যর পকেটেও আছে।

বাইপাস ধরে কিছু দূর এগিয়ে  যাওয়ার পর হেডলাইটে দেখা গেল, সামনের নির্জন রাস্তার মাঝ বরাবর একটু তেরছা করে একটা গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা। পাশে একটা লোক নীচু হয়ে খুব মন দিয়ে কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করছে। আরেকটু কাছাকাছি যেতে গাড়িটাকে এবার বেশ স্পষ্ট দেখা গেল।

-'একি ! এটা তো দেখছি সেই ছাই রঙের বলেরোটাই! তাই-না সৌম্যদা?'--উত্তেজিত গলায় বলে মামন।


সৌম্য কিছু বলবে, তার আগেই দেখা গেল বলেরোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা দু'হাত তুলে তাদের গাড়িটাকে থামানোর ইশারা করছে।


কোনও সন্দেহ নেই, আজ সকালে বলেরোয় এই লোকটাকেই দেখা গিয়েছিল। তারপর থেকে সারাদিন সঙ্গীসাথী নিয়ে সৌম্যদের পিছনে ঘুরঘুর করছে। এখন আবার এই নির্জন রাস্তায়!


সতর্ক হয়ে উঠল সৌম্য।

এরইমধ্যে আরও কয়েকটা লোক আচমকা যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল। সকলের হাতে ধারালো অস্ত্র। এতক্ষণ ওরা গাড়ির ওপাশে অন্ধকারে মিশে ছিল। তাই নজরে পড়েনি।


কী ঘটতে চলেছে মূহুর্তের মধ্যে আন্দাজ করে নেয় সৌম্য।সবাইকে সিটে শক্ত হয়ে বসার কথা বলে আচমকা এক্সেলেটরে জোরে চাপ দেয় সে।

প্রাণপণে হাতল ঘুরিয়ে  জানালার কাঁচ তুলে দিল মামন। তাঁর দেখাদেখি সুমনও তা-ই করল।

 
গাড়িটা বুনোমহিষের মত গোঁগোঁ করে ছুটে আসছে দেখে সামনের লোকগুলো রাস্তার আশেপাশে ছিটকে পড়ল। এই সুযোগে বলেরোটাকে কোনওমতে পাশকাটিয়ে বেরিয়ে গেল সৌম্য। 


সেই সময় গাড়ির পিছনে  ঘটাং করে একটা ধাতব আওয়াজ শুনতে পেলো সুমন। আন্দাজ করে নিতে অসুবিধে হল না,কেউ একজন তাঁদের গাড়ি তাক করে হাতের ধারালো অস্ত্রটাই ছুঁড়ে মেরেছে।

স্টিয়ারিংটা শক্ত করে ধরে চালকের আসনে দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে সৌম্য। দৃষ্টি সামনের রাস্তায় স্থির। মারুতিটা তাঁর হাতে পড়ে যেন জেট গতিতে ছুটে চলেছে।

ঘাড় ঘুরিয়ে  পিছনে তাকায় মামন। দূরে বলেরোর হেডলাইট জ্বলে উঠতে দেখে বলে,

'সৌম্যদা, গাড়িটা স্টার্ট দিয়েছে দেখছি। আমাদের ধাওয়া করলে কি করব?'

-'দ্যাখ, এই গাড়ি নিয়ে বলেরোটাকে বেশিক্ষণ টেক্কা দেয়া যাবে না।' 

-'তাহলে কি করতে হবে?'

-'আমি গাড়ির গতি কমিয়ে দিচ্ছি। তুই পকেট থেকে যন্তরটা বের করে হাতে নিয়ে নে। তারপর কোনওমতে সামনের সিটটা টপকে পিছনের সিটে চলে যা। বলেরোটা কাছাকাছি এলে সামনের টায়ার লক্ষ্য করে গুলি করবি। দেখিস, গুলিটা যেন লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়।'

-'ঠিক আছে। আসুক ব্যাটারা।'

||||||||

কথা মাফিক গাড়ির গতি সত্যিই অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে সৌম্য। সামনের সিট টপকে পিছনের সিটে চলে গেল মামন।

বাইরে শোঁশোঁ করে বাতাস বইতে শুরু করেছে। জানালার কাঁচে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টিবিন্দু।

দেখতে দেখতে বলেরোটা কাছাকাছি চলে এসেছে। ডানদিকের জানালা দিয়ে শরীরের অর্ধেকটা বের করে পরপর তিন রাউন্ড ফায়ার করল মামন। 


টায়ার ফাটার বিকট শব্দ ভেসে এল। এলোমেলো ভাবে সামান্য এগিয়ে থেমে গেল বলেরোটা। গাড়ির গতি ফের বাড়িয়ে দিল সৌম্য।

 

|||||

মুষলধার বোধহয় একেই বলে। তার ওপর ঝড়তুফান। আকাশের এ-মাথা থেকে ও-মাথা, সাপের জিভের মত লকলকে আলোক শিখা দৌড়াদৌড়ি করছে। মাটি কাঁপিয়ে দূরে কোথাও বাজ পড়ল বোধহয়।

 
শালচাপড়া বাজারের সামনে এসে প্রতুল দারোগার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল সৌম্য। 


ঘটনাটা তাঁকে জানানো দরকার। তিনি চাইলে বদরপুর থানায় যোগাযোগ করে কাটাখাল বাইপাস থেকে লোকগুলোকে ধরার ব্যবস্থা করাতে পারেন।

দুএকবার চেষ্টা করতেই প্রতুলবাবুকে ফোনে পেয়ে গেল সৌম্য।

-'হ্যালো প্রতুলবাবু, আপনি এক্ষুনি একবার বদরপুর থানায় যোগাযোগ করে কাটাখাল বাইপাসে ফোর্স পাঠানোর ব্যবস্থা করুন...' ---- সংক্ষেপে ঘটনাটা বর্ণনা করে সৌম্য । বলে, 'পালের গোদাটাকে ধরতে পারলে রহস্যের জট অনেকটাই খুলে যাবে।'

--'সে কি! আপনার উপর হামলা! আমি পুলিশ ফোর্স পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। কিছুক্ষণ আগে এদিকেও একটা বড় ঘটনা ঘটে গিয়েছে। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, থানায় চলে আসুন।'

--'কি হয়েছে প্রতুলবাবু?'

--' মার্ডার...'

ওপাশ থেকে ছোট্ট করে উত্তর দিলেন প্রতুল দারোগা।

-'এ-কি! আপনি আমাকে জানাননি কেন?'

--' ডাঙরিয়া, আমি আধঘন্টা ধরে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনি নেটওয়ার্ক পরিষেবার বাইরে।'

-'হুম... কে খুন হয়েছে?'

-' ব্রজবল্লভ সিনহার পরিচারক সুবলকে কে বা কারা খুন করেছে। সন্ধ্যা রাতে ব্রজবল্লভ বাবুর বাড়ির পেছনের বাগানে তার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। আমি এখনও ঘটনাস্থলে যাইনি। তবে দুই কনেস্টবল দিয়ে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। এদের বিবরণ থেকে মনে হচ্ছে, সুবলকে নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছে। '

-'কি করবেন এবার?'

-' ফোনে যখন পেয়েই গেলাম, ভাবছি আপনি এলেই ঘটনাস্থলে যাব। তা শিলচর পৌঁছাতে আপনার আর কতক্ষণ?'

-'বড়জোর পয়তাল্লিশ মিনিট। আমি সোজা থানায় আসছি। '

খুট করে ফোনটা কেটে দিল সৌম্য। মামন ও সুমনের দিকে তাকিয়ে বলল, 'ঘটনার ঘনঘটায় মনে হচ্ছে কপালে আরও অনেক  ভোগান্তি বাকি। তোরা কি আমার সঙ্গে যাবি?'

-' বিলক্ষণ।'


এক সুরে বলে উঠল মামন- সুমন দু'জনেই। গাড়িটা তখন নির্জন সুরতারা এলাকার রাস্তা ধরে অন্ধকারে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলেছে ...

পর্ব ৯

রাস্তায় আর নতুন করে কিছু ঘটল না। ফলে বাকিটা পথ নির্বিবাদে পেরিয়ে সৌম্যরা যখন সদর থানায় গিয়ে পৌঁছাল, ঘড়িতে রাত ন'টা।

ততক্ষণে বৃষ্টি অনেকটা ধরে এসেছে। থানায় অপেক্ষা করছিলেন প্রতুল দারোগা। সৌম্যদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। হাতে লম্বা টর্চ।

কনস্টেবলকে ডেকে জিপসিটা বের করার নির্দেশ দিয়ে  বললেন,

'সৌম্য ডাঙরিয়া, আপনারা কি পুলিশের গাড়িতে যাবেন? '

-' না না, আপনি গাড়ি নিয়ে আগে আগে যান। আমরা আপনাকে অনুসরণ করব। '

-' ঠিক আছে,যে-রকমটা আপনি ভাল মনে করেন। '

কথা শেষ করে জিপসিতে গিয়ে  বসলেন প্রতুল দারোগা। গাড়ি ছুটে চলল ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ির দিকে।

|||||||||

বর্ষনমুখর রাত, পথঘাট ফাঁকা। ফলে সিঙ্গারি কবিরগ্রাম পৌঁছাতে  মিনিট পনেরোর বেশি লাগল না। পুলিশের গাড়িটাকে রাস্তার এক পাশে  দাঁড় করালেন প্রতুল। তার পিছনে মারুতিটাকে প্লেস করল সৌম্য। 

এদিকটায় লোডশেডিং। কিছুক্ষণ আগের ঝড়বৃষ্টিতে কোথাও হয়ত বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গিয়ে থাকবে। গোটা গ্রাম অন্ধকার। তার ওপর টিপটিপ বৃষ্টি। জিপসির সিটের তলা থেকে দু'টো ছাতা বের করে একটা নিজের মাথার উপর মেলে ধরে অন্যটা সুমনের দিকে এগিয়ে দিলেন প্রতুল। বললেন,

'সৌম্য ডাঙরিয়া, আপনি আমার ছাতায় চলে আসুন। এই ছাতাটি মামন ও সুমন বাবুরা ভাগাভাগি করে নেবেন।' 


তার কথামতো ছাতা ভাগাভাগি করে বৃষ্টির ছাঁট বাঁচিয়ে কোনওমতে  ব্রজবল্লভ বাবুর বাড়ির সামনে গিয়ে পৌঁছাল সৌম্যরা।

||||||

বন্ধ গেটের ওপাশে  কাঁকর বিছানো রাস্তা, এর ঠিক নাক বরাবর ব্রজবল্লভ বাবুর বাড়ি। দেড়তলা সমান উঁচু বাড়িটার ডানদিকে একটা ঝাঁকড়া মাথা ওয়ালা কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে। তার ঘন পল্লবিত শাখাপ্রশাখার নিচে জমা হয়ে আছে একরাশ অন্ধকার। বারান্দার এককোণে সাবেকি আমলের বাল্ব কোনওমতে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে। এদিকটায় পাওয়ার কাট। তারমানে , বাল্বটা জ্বলছে ইনভার্টারে। তবে ভোল্টেজের অবস্থা একেবারেই খারাপ। বোঝাই যায়, ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে এল বলে।  প্রায় নিবুনিবু সেই কাঁচের গোলক ভেদ করে যেটুকু আলো বেরিয়ে আসছে, সেটা অন্ধকারের পুরু চাদরে ধাক্কা খেয়ে একটা সীমিত পরিসরে আটকা পড়ে আছে। চারদিক চুপচাপ। শুধু ঝিল্লির ডাক, বৃষ্টির টুপটাপ-- মাঝেমধ্যে হাওয়ার শনশন শব্দ। সব মিলে কেমন একটা ভৌতিক ভৌতিক ভাব। 

 

এরকম একটা ঝড়বাদলের রাতে একজন মানুষের লাশ পড়ে আছে বাড়ির বাগানে , ভাবতেই গা শিরশির করে উঠল মামনের। 

 

গেটে দাঁড়িয়ে  হাঁক পাড়লেন প্রতুল দারোগা। তাঁর বাজখাঁই গলার আওয়াজ শুনে ভেতর থেকে একজন কনস্টেবল গোছের লোক দৌড়ে এসে গেট খুলে দিলেন। পিছন পিছন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টর।

|||||

সাব ইন্সপেক্টর ভদ্রলোক সৌম্যর পূর্বপরিচিত। ইনি ধুবড়ি'র বাসিন্দা। নাম তামিম ইকবাল। থানায় তার সঙ্গে  দুএকবার কথাও হয়েছে সৌম্যর। ইকবাল সাহেব বেশ রসিক লোক। মজাচ্ছলে তিনি নিজেকে বাঙ্গামিয়া বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। অবশ্য এমনটা বলার পিছনে বিশেষ কারণ-ও  রয়েছে।
 
মাত্র দু-এক পুরুষ আগেও তামিম ইকবালরা ছিলেন পুরোদস্তুর বাঙালি। কিন্তু অসম আন্দোলনের সময় পরিস্থিতির চাপে তারা হয়ে যান 'নও অহমিয়া' , মানে নব্য অসমিয়া। 

 

তবে আগ্রাসন যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, চরুয়া মানুষগুলোর জাত্যভিমান কিংবা মাতৃভাষা--কোনটাই পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া যায়নি। তাদের মনের কোনও এক নিভৃত গহীনে বাংলার প্রতি সুপ্ত টানটা অবিকৃতই রয়ে গিয়েছে। আর সেকারণেই বাঙালি-অসমিয়ার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিজেকে বাঙ্গামিয়া পরিচয় দিয়ে তৃপ্তি লাভ করেন তামিম। বলেন, বাংলাভাষার প্রতি তার এই টান মজ্জাগত। হয়ত সেই টানেই পুলিশের চাকরি করা সত্ত্বেও সময় পেলে সাহিত্যচর্চা করেন তামিম ইকবাল। তার লেখা দু'একটা বাংলা কবিতাও পড়েছে সৌম্য। যদিও সে কবিতা টবিতা ততটা বোঝে-টোঝে না , তবে এই কবিতাগুলো বেশ উঁচুমানের বলেই মনে হয়েছে তার।

||||||

তামিমকে প্রতুল জিগ্যেস করলেন, 'সুবলের বডিটা কীরকম পজিশনে পাওয়া গেছে এসআই? মার্ডার ওয়েপন টয়েপন কিছু পেয়েছেন?'

' না স্যার, এখন অব্দি মার্ডার ওয়েপন পাওয়া যায়নি। আর আপনিই তো বললেন, সৌম্যবাবু  না আসা পর্যন্ত  ডেড বডিতে হাত লাগানো যাবে না। ফলে দূর থেকে যেটুকু দেখেছি, তাতে মনে হল, খুনি কোনও ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার করেনি। ভিক্টিমের চোখদুটো যেভাবে ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে, তাতে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঈঙ্গিত স্পষ্ট।  উফ! কি বীভৎস সে চাহনি...।'

তামিম ইকবালকে মাঝপথে থামিয়ে সৌম্য বলল, 'প্রতুলবাবু, কষ্ট করে এতটা দূর যখন এসেই পড়েছি, তখন  আরেকটু কষ্ট করে ডেড বডিটা একবার নিজের চোখে দেখে নিলেই তো সব ল্যাটা চুকে যায় । এখানে দাঁড়িয়ে  সবকিছু কি বোঝা যাবে? '

সৌম্যর কথায় অপ্রস্তুত বোধ করলেন প্রতুল দারোগা। খাটো গলায় বললেন, 'আপনার কথাই ঠিক। কিন্তু জানেনই তো, পুলিশের চাকরি আর ভাগাড়ে ডিউটি----এ দুটির  মধ্যে তেমন কোনও তফাত নেই। সারাদিন চোরছ্যাঁচড় আর মড়া ঘাটাঘাটি-- এই করে করে ঘেন্না ধরে গেছে মশাই। তাই ভেবেছিলাম, রাত-বিরেতে মড়া-ফড়া নাড়াঘাঁটা না করে এখান থেকেই যদি কোনও ক্লু বের করে নেয়া যায়। কেননা, আমাদের তামিম ইকবালও তো একজন দক্ষ অফিসার। তার পর্যবেক্ষণের উপর ভরসা করা যায় বইকি। '

-'সে ঠিক আছে। কিন্তু নিজের চোখে না দেখে সবকিছু কী আন্দাজ করা যায় প্রতুলবাবু? '

'একদম হককথা। চলুন, ডেডবডিটা দেখে নেয়া যাক। '

এই বলে প্রতুল দারোগা  বললেন, 'বডিটা যে জায়গায় পাওয়া গ্যাছে আমাদের সেখানে নিয়ে চলুন এসআই। আসুন সৌম্য ডাঙরিয়া।'


'চলুন...।' মুচকি হেসে বলল সৌম্য।

|||||||

বাগানটা বাড়ির পিছনের দিকে। এদিকটায় বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা নেই। জায়গাটা গাছগাছালি আর আগাছায় পরিপূর্ণ।

 

অন্ধকারে ঝোপঝাড়,সাপখোপ বাঁচিয়ে সৌম্যদের নিয়ে টর্চের আলোয় সন্তর্পণে পা ফেলে এগোতে লাগলেন প্রতুল।

 

কিছুটা যাওয়ার পর দেখা গেল, বড় শিরিশ গাছের নিচে চিৎ হয়ে একটা মানুষ পড়ে আছে। বুঝতে অসুবিধে হল না, ওইটাই সুবলের লাশ। 

 

ডেডবডির উপর সরাসরি টর্চের আলো ফেলে প্রতুল দারোগার মত পোড়খাওয়া পুলিশ অফিসারও সভয়ে দু'হাত পিছিয়ে এলেন। সুবলের চোখের মণি দু'টো প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে। আর সেই বেরিয়ে আসা চোখ দিয়েই যেন প্রতুলদের দিকে  নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।

 

দিনের বেলা এই দৃশ্য কতটা ভয়ানক লাগত, বলা মুস্কিল। কিন্তু রাতের কথা আলাদা। রাতে দড়িকেও সাপ বলে ভ্রম হয়।  তার ওপর অন্ধকারে টর্চের সাদা আলোয় দৃশ্যপটের পরতে পরতে ফুটে ওঠেছে মৃত্যুর বীভৎসতা।

 

মামন বা সুমনরাও বোধহয় এরকম একটা কিছুর জন্য  প্রস্তুত ছিলো না। সুমনের গলা দিয়ে একটা ভয়সূচক আওয়াজ বেরিয়ে এল।

-'ওহ্ মাই গড! চাকরি জীবনে কত মার্ডার কেস ঘেটেছি। কিন্তু এরচেয়ে বীভৎস মুখ আগে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না! ', বলেই ফেলেন  প্রতুল দারোগা। তাকে কেমন যেন বিচলিত দেখায়।

 

তবে এ সবের মাঝখানে সৌম্য একেবারেই নির্বিকার। মৃত্যুর বীভৎসতা যেন তাকে স্পর্শই করতে পারেনি। কিছুই ঘটেনি এরকম একটা ভাব করে প্রতুলবাবুর হাত থেকে টর্চটা নিয়ে নিল সে। একফাঁকে তামিম ইকবালকে একটা চার্জার লাইট জোগাড় করার কথাও বলে ফেলল।

 

চার্জার লাইট আনতে তামিম ইকবাল ব্রজবল্লভবাবুর বাড়ির দিকে চলে গেলে টর্চের আলোয় নিবিষ্ট মনে লাশ পর্যবেক্ষণ করা শুরু করে দিল সৌম্য। 

হতভম্ব প্রতুল দারোগা সুমন ও মামনকে নিয়ে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। জড়তা কাটিয়ে এগিয়ে এলেন তিনিও।

||||||

সুবলের হা-মুখ ঠেলে জিহ্বাটা সামান্য বেরিয়ে আছে। থুতনির কাছে টুথপেস্টের সাদা ফেনার মত গ্যাঁজলা। তীব্র যন্ত্রণায় বেঁকেচুরে যাওয়া দেহটা ডানদিকে সামান্য কাঁত হয়ে পড়ে আছে। চোখমুখের অভিব্যক্তিতে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। মনেহয় মৃত্যুর আগে কিছু একটা দেখে প্রচণ্ড রকমের ভয় পেয়েছে সুবল।

 

এতক্ষণে একটা চার্জার লাইট জোগাড় করে ফিরে এলেন তামিম ইকবাল। সঙ্গে দু'জন কনস্টেবল। তাকে আলোটা ভাল করে দেখাতে বলে সুবলের লাশের উপর ঝুঁকে আরও ভাল করে নিরীক্ষণ করতে করতে পকেট থেকে একজোড়া গ্লাভস বের করে সেটা হাতে গলিয়ে নিল সৌম্য। তার নাক ডেডবডির নাকের একদম কাছাকাছি। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, নাকে নাক লাগিয়ে গন্ধ শুঁকছে সে।

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কীসব দেখাদেখি করে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। প্রতুলকে বলল, 'বডিটাকে একটু তুলতে হবে। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ঘাড়, গলা,  পিঠটা একবার দেখতে হচ্ছে।'

-'ঠিক আছে। আপনাকে সাহায্য করার জন্য আমি শান্তনু ও কৃপারঞ্জনকে বলে দিচ্ছি ', এই বলে দুই কনস্টেবলকে ডেডবডিটা উপুড় করে শুইয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন প্রতুল।

দেহের কোথাও আঘাতের চিহ্ন নেই। শুধু পায়ের গোড়ালির  কাছে লালচে দানার মতো  ছোট্ট একটা দাগ। সাধারণত সূঁচ ফোটালে শরীরে এরকম দাগের সৃষ্টি হয়। 


সুবলের লাশটাকে আরও কিছুক্ষণ খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়াল সৌম্য।

-'কিছু অনুমান করা গেল?'

জিগ্যেস করলেন প্রতুল দারোগা।


চিন্তিত সৌম্য বলল, 'আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মৃত্যুর কারণ তীব্র বিষক্রিয়া।  বিষটা সুবলের দেহে কোনও ভাবে প্রবেশ করানো হয়েছে।'

-' লোকটা কত ঘন্টা আগে মারা গেছে বলে আপনার ধারণা '

-'যে করেই হোক, চার ঘন্টা তো হবেই।'

 
-' তারমানে সন্ধে সাতটার আশেপাশে লোকটাকে খুন করা হয়েছে।'


-'হুম, দেখে তো তা-ই মনে হচ্ছে। বাকিটা পোস্টমর্টেম করলে বোঝা যাবে।'


কথা বলতে বলতে টর্চ ঘুরিয়ে চারপাশটা লক্ষ্য করতে লাগল সৌম্য।


'আমরা আসার আগে আপনারা কি কেউ ডেডবডিটা নাড়াচাড়া করেছেন?' __এদিকওদিক দেখতে দেখতে সাব ইন্সপেক্টর তামিম ইকবালকে লক্ষ্য করে প্রশ্নটা করল সৌম্য।

-'না না সৌম্যবাবু। স্যারের নির্দেশ ছিল, আপনি না আসা পর্যন্ত ডেডবডি ছোঁয়া যাবে না। তাই যা করার, কনস্টেবল দু'জনকে নিয়ে আমি দূর থেকেই করেছি। '

-' হুম '---তামিম ইকবালের কথায় ছোট্ট করে উত্তর দিল সৌম্য। তার সন্ধানী দৃষ্টি কী  যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। 


টর্চের আলোয় পাশের ঝোপের মধ্য কিছু একটা চিকচিক করে উঠল। লাইটের ফোকাসটা সেদিকে স্থির রেখে এগিয়ে গেল সে।

ঝোপের ভিতর ঘাসের মাঝখানে ছোট্ট অথচ সুতীক্ষ্ণ ফলাওয়ালা একটা ধাতব শলাকা পড়ে আছে। 

প্রতুলবাবু হুড়মুড়িয়ে সেটা তুলতে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু  ধাতব বস্তুটায় তিনি হাত লাগাবার আগেই তাকে একধাক্কায় সরিয়ে দিল সৌম্য। বলল, 'খবরদার প্রতুলবাবু। হুড়োহুড়ি করে বিপদ ডেকে আনবেন না।'

থতমত খেয়ে বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলেন প্রতুল দারোগা। আমতাআমতা করে বললেন, 'কী আছে এটাতে?"

-'অনেক কিছুই থাকতে পারে। হয়ত এমন একটা বিষ, যেটা খালি হাতে ছুঁলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। '

বলতে বলতে গ্লাভস হাতে স্টিলের শলাকাটি অতি সাবধানে তুলে সেটাকে পলিথিনে মুড়ে প্রতুলবাবুর হাতে তুলে দিয়ে বলল, 'এটাকে সর্বাগ্রে ল্যাবে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন প্রতুলবাবু। যদি এতক্ষণের বৃষ্টিতে সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে না গিয়ে থাকে, তাহলে এর ডগায়ই মিলবে সেই বিষের সন্ধান, যেটা দিয়ে সুবলকে খুন করা হয়েছে। আরও একটা কাজ করুন। বডিটাকেও মর্গে পাঠিয়ে দিন। পোস্টমর্টেমটা খুবই জরুরি। আমি একটু ওদিকটায় ঘুরে আসি।'


মামনকে নিয়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল সৌম্য।

প্রতুল দারোগা সাব ইন্সপেক্টর তামিম ইকবালকে ডেকে বডিটাকে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বললেন। 


মোবাইল ফোনে তামিম ইকবাল কার সঙ্গে কথা বললেন বোঝা গেল না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ির গলি রাস্তার মুখে দাঁড়াতে দেখা গেল। অ্যাম্বুলেন্স থেকে চারজন স্বাস্থ্যকর্মী নেমে এল। বাগান থেকে স্ট্রেচারে করে সুবলের দেহটা অ্যাম্বুলেন্সে এনে তুলতে খুব একটা সময় লাগল না।

এর দু'এক মিনিটের ব্যবধানে যেভাবে গিয়েছিল, মামনকে নিয়ে সে ভাবেই উদয় হল সৌম্য'র।

 
গাছের নিচে ছাতা মাথায় ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রতুল দারোগা। তখনও সমানে বৃষ্টি পড়ছে। সৌম্য বলল, 'এখানকার কাজ মোটামুটি শেষ। চলুন এখন একবার ব্রজবল্লভ বাবুর পত্নী রাধারানিদেবী  ও ভ্রাতুষ্পুত্র শশীকান্ত সিনহাকে দু'একটা প্রশ্ন করতে হবে।

|||||

ডেডবডি মর্গে পাঠানোর পর ব্রজবল্লভবাবুর পত্নী ও ভ্রাতুষ্পুত্রকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রতুলবাবুর সঙ্গে সৌম্যরা যখন থানায় ফিরে এল, তখন মধ্যরাত। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপে ক্লান্ত অবসন্ন সুমনের দুচোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে। বেচারা গত রাতেও  ঘুমোতে পারেনি।অবসাদ কাটিয়ে উঠতে কনস্টেবল স্বপনকে ডেকে কয়েক কাপ চা করতে বললেন প্রতুল হাজরিকা। দূরে কোথাও পেটা ঘড়ি বেজে ওঠল। 


রাত একটা। 

একটু পরে। গরম ধোঁয়া ওড়া চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রতুল জিগ্যেস করলেন, 'আচ্ছা সৌম্য ডাঙরিয়া। কি ধরনের বিষক্রিয়ায় সুবলের মৃত্যু হয়েছে, কিছু কী অনুমান করলেন? 

-' এটা তো পরিষ্কার, তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে ভিক্টিমকে টার্গেট করা হয়েছে। ধাতব শলাকাই তার প্রমাণ। কিন্তু মনে হয়, পোস্টমর্টেমে বিষের উপস্থিতি পাওয়া যাবে না। আমার অনুমান যদি ভুল না হয়, দেখবেন রিপোর্টে হৃদযন্ত্র ও শ্বসনতন্ত্রের পক্ষাঘাতের ফলে মৃত্যুর কথা উল্লেখ থাকবে। '

-'মানে!'---অবাক হয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন প্রতুল। সৌম্য বলল, 'মানেটা একেবারেই সহজ। হত্যাকারী নিজেকে আপনার আমার চাইতে দু'কদম বেশি স্মার্ট ভাবছে । তবে আমার বিশ্বাস,  শয়তান একদিন তার নিজের চালাকিতেই  বিপদে পড়বে।' 


চা শেষ করে উঠে দাঁড়াল সৌম্য। বলল, 'আচ্ছা চলি প্রতুলবাবু।' 


বাইরে তখনও অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে....

পর্ব ১০

 

সেই কোন সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে ঝড়বৃষ্টি । এখন গভীর রাত। এতক্ষণে ঝড় থেমে গিয়েছে ঠিকই। কিন্তু অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি। থানা থেকে বেরিয়ে  মামন-সুমনরা সোজা সৌম্য'র সঙ্গে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল।

সৌম্যর ওখানে রাত কাটানোর প্রস্তাবটা ছিল সুমনের। আসলে গত রাতের ঘটনার পর ভুতুড়ে ছবিটাকে নিয়ে একলা ঘরে রাত কাটানোর সাহস জোটাতে পারছিল না সে। আর সেটা অনুমান করেই হয়ত তার কথায় আপত্তি করেনি মামনও।


|||||


সৌম্যর বাড়িটা শিলচর শহরের দক্ষিণ প্রান্তে , আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে মেডিক্যাল রোডে দুর্গাপল্লির শেষপ্রান্তে। জায়গাটা নিরিবিলি, চারদিকে গাছগাছালি। হঠাৎ দেখলে মনে হবে শহুরে এলাকার মাঝখানে একটুকরো গ্রাম বোধহয় ভুল করেই রয়ে গিয়েছে।

 

সৌম্যর বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই হলেও এখনও সে বিয়ে থা করেনি। বছর পাঁচেক আগে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছে। বর্তমানে উপত্যকার একটি প্রথম সারির দৈনিকের সঙ্গে যুক্ত। ইদানীং তার মাথায় সত্যানুসন্ধানের নেশাটাও বেশ চেপে বসেছে। দুয়ে মিলে মাসকাবারে আয় মন্দ হয় না। কিন্তু সৌম্যর বাবা-মা কেউই ছেলের এইসব ঝুট-ঝামেলা-যুক্ত  কাজে সন্তুষ্ট নন। তাঁরা চান, একটা সরকারি চাকরি নিয়ে ছেলেটা থিতু হয়ে বসুক। আর সত্যিই তো, সৌম্যর মত চৌকস ছেলে চাইলে কীনা হতে পারত। নিদেনপক্ষে কোনও কলেজ কিংবা ভার্সিটিতে মাস্টারমশাইয়ের একটা চাকরি জুটিয়ে নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না। কিন্তু এর কোনটাই সে করেনি। অগত্যা...

|||||||

এক সহদেব বাদে এই বিশাল বাড়িতে বলতে গেলে একাই থাকে সৌম্য। তার মা-বাবা দুজনই থাকেন গ্রামের বাড়িতে। রান্নাবাড়া থেকে বাজারহাট-- সৌম্যর সবকাজ দেখাশোনা করে  সহদেব।

 

বারকয়েক হর্ণ বাজাতে দৌড়ে এসে গেট খুলে দিল সহদেব। গাড়িটাকে গ্যারেজে রেখে সবাইকে নিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকল সৌম্য। সকলেই যারপরনাই ক্লান্ত। 


সহদেব বলল, 'দা'বাবু, চানঘরে জল রাখা আছে। আপনারা সবাই হাতমুখ ধুয়ে আসুন। ততক্ষণে আমি খাবারের বন্দোবস্তটা করে ফেলি।'

-'তোর ভাঁড়ারে কি তিনজনের খাবার হবে রে সহদেব?'

'ডাল,আলুভাজা যেটুকুন আছে সেটা দিয়ে মনেহয় তিনজনের পুষিয়ে যাবে। মাছের ঝোল একটু কম পড়তে পারে। তবে এনিয়ে তুমি ভেবোনা দা'বাবু।  রেফ্রিজারেটরে মাছ রাখা আছে। পেঁয়াজকুচি ছিটিয়ে কয়েক টুকরো ভাজা করে দিচ্ছি।'

-'যা করার তাড়াতাড়ি কর সহদেব। খিদের চোটে সবাই চোখে অন্ধকার দেখছি।'


বলতে বলতে কাপড় চেঞ্জ করে বাথরুমের দিকে চলে গেল সৌম্য।

একটু বাদে। সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

||||||

পরদিন বেশ বেলা করেই ঘুম ভাঙল মামনের। ঘুম জড়ানো চোখে দেখল, সুমন তখনও ঘুমোচ্ছে। সৌম্যর বিছানাটা খালি। বাথরুমে গেছে হয়ত--এই মনে করে পাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করল সে। হঠাৎ সামনের দেয়ালঘড়িটায় চোখ পড়তে ঘুম ছুটে গেল তার।

ঘড়ির কাঁটা দশটার ঘরে। নাহ...আর শুয়ে থাকা যায় না।

চোখ কচলে উঠে বসল মামন। আর ঠিক তখনই বালিশের পাশে রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠল।

সৌম্যর ফোন।


কল রিসিভ করতেই ওপার থেকে তার কথা ভেসে এল। 

-'কি রে, ঘুম ভাঙলো?'

-'হুম...',

-'গুড। আচ্ছা শোন, একটা জরুরি কাজে আমাকে একটু বেরোতে হয়েছে। ফিরতে দেরি হবে। তুই সুমনকে নিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নে।'

-'সে ঠিক আছে। কিন্তু এত সকাল সকাল তুমি গেলে কোথায় সৌম্যদা?'

-'আমি এখন আছি সার্কিট হাউস রোডে। এখানের কাজ শেষ করে আরও দু'একটা জায়গায় যাব। ফেরার পথে থানায়ও একবার ঢুঁ মারতে হবে।'

-'তদন্ত কতদূর এগোল সৌম্যদা?'

-'সেই কাজেই লেগে আছি । আচ্ছা, তুই ফোন রাখ। ফিরে এলে কথা হবে। ও হ্যাঁ, সুমনকে বলবি, আমি  না আসা পর্যন্ত ও যেন বাড়িতেই থাকে।'

-'হুম... '

ফোনের লাইনটা খুট করে কেটে গেল।


|||||||||


সৌম্যর এভাবে একা-একা বেরিয়ে পড়ায় বড্ড মন খারাপ হয়ে গেল মামনের। রাগও ওঠছে। কিন্তু যে যাওয়ার সে তো গেছেই। এখন একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে তার অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই।

এতক্ষণে জেগে ওঠেছে সুমন। জিজ্ঞেস করল, ' কার সঙ্গে কথা বলছিলে মামন।'

-'সৌম্যদা ফোন করেছিল । জরুরি কাজে বেরিয়েছে। ও ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমাকে থাকতে বলেছে সুমনদা।'

কথা বলতে বলতে মামন বাথরুমের দিকে চলে গেল। রান্নাঘর থেকে কষা মাংসের সুন্দর একটা গন্ধ ভেসে আসছে। এ-র মানে দুপুরের রান্না এখন থেকেই শুরু করে দিয়েছে সহদেব।

 

মামনের সাড়া পেয়ে সে বলল, 

--' আপনারা চটপট ফ্রেশ হয়ে আসুন মামনদাদা। আমি জলখাবার নিয়ে আসছি।'


|||||||||

নামেই জলখাবার। ব্রেকফাস্টে এলাহি আয়োজন করেছে সহদেব। কয়েক মিনিটের মধ্যে খান সাতেক ঘিয়েভাজা তপ্ত লুচি, সঙ্গে প্রমান সাইজের একবাটি ছোলার ঘুগনি  ও ডাবল ডিমের অমলেট সাবাড় করে এবার বাটার টোস্টে কামড় বসিয়ে মনকষ্টটা লাঘব করার চেষ্টা করছে মামন। টেবিলে রাখা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওড়ছে। সুমন এতবড় খাইয়ে না হলেও সহদেবের জোরাজোরিতে তিনখানা লুচি উদরস্থ করতে হয়েছে তাকেও।

খাওয়াদাওয়ার পর্ব প্রায় শেষ, আচমকা মামনের ফোনটা আবার বেজে ওঠল।

-' হ্যাঁ, বল সৌম্যদা... কি বললে... এক্ষুনি যেতে হবে... ঠিক আছে, আমরা আসছি।'

ফোনটা রেখে মামন বলল, 'সুমনদা, আমাদের এক্ষুনি একবার সদর থানায় যেতে হচ্ছে।'

-'কেন?'

-'অত বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। সৌম্যদা শুধু বলল, আধঘন্টার মধ্যে সেও নাকি থানায় গিয়ে পৌছাবে। প্রতুলবাবু ডেকেছেন। '

-' চল তাহলে।'

||||||

সৌম্যর ফোন পেয়ে চকিতে বিমর্ষভাব কেটে গিয়েছে মামনের। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল দু'জনে।

মামনের মারুতিটা সৌম্যর কাছে। তাই দুর্গাপল্লি গলির মোড় থেকেই একটা অটোরিকশা নিতে হল।

বাইরে ভ্যাপসা গরম। তার ওপর রাস্তায় যানবাহন গিজগিজ করছে। তাদের সম্মিলিত হর্নের আওয়াজে কান ঝালাপালা হবার জোগাড়।
মেডিক্যাল রোডের জ্যাম কাটিয়ে থানায় পৌছুতে আধঘন্টা থেকে আরেকটু বেশি সময় নিল ত্রিচক্রযানটা। 


প্রতুল দারোগার চেম্বারে ঢুকে তারা দেখল, সৌম্য আগে থেকেই সেখানে বসে আছে। সামনে প্রতুলবাবুর আসনটা ফাঁকা।

পাশের  খালি চেয়ারে বসতে বসতে সৌম্যর দিকে তাকিয়ে মামন জিগ্যেস করল, 'কখন এলে?'

-'এই মিনিট পাঁচেক হবে। কিন্তু প্রতুলবাবু এখনও পৌঁছাতে পারেননি।'

-'তিনি কোথায়?' প্রশ্নটা করল সুমন।

-'তোরা আসার আগে ফোনে কথা হয়েছে। ভদ্রলোক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে রওনা হয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে এখানে এসে পৌঁছাবেন।' --জানাল সৌম্য।

||||||||

সত্যিসত্যি অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে থানায় এসে হাজির হলেন প্রতুল দারোগা। সৌম্যর দিকে তাকিয়ে বললেন, 'দুঃখিত, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল ডাঙরিয়া। তবে আপনাদের জন্য দু'টো জব্বর খবর আছে।'

-'শোনা যাক তাহলে ...'

-'গতকাল রাতেই কাটাখাল বাইপাস থেকে বলেরোটা উদ্ধার করেছে বদরপুর থানার পুলিশ। সঙ্গে দুই হামলাকারীকেও আটক করা হয়েছে।'

-'এরা কারা,কিছু কি জানতে পেরেছেন?'

-'দুটোই পাঁড় বদমাশ। কাটাখাল রেল ইয়ার্ডে ওয়াগন ব্রেকার। ইদানীং ডাকাতিতেও হাত পাকাচ্ছে।'

-'ওদের সঙ্গীদের সম্পর্কে কি কিছু জানা গেল?'

-'এব্যাপারে ওরা এখনও মুখ খোলেনি। তবে ব্যাটাদের জামাই আদর দিলে বিকেল পর্যন্ত হড়হড় করে সব বমি করে দেবে। ততক্ষণ আপনাকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে ডাঙরিয়া।'

-' হুম..., অন্য খবরটা কি ', জিগ্যেস করে সৌম্য। 


প্রতুল বলেন, 'সুবলের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বিষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছে, সে মারা গিয়েছে হার্টফেল করে। এদিকে, ফরেনসিক ল্যাবে ফোন করে জানতে পারলাম, উদ্ধার হওয়া ধাতব শলাকাটির ডগায় না-কি একধরনের মারাত্মক বিষের সন্ধান মিলেছে! আশ্চর্য! '

-'দেখুন, আমার অনুমান কেমন মিলে গেল! আমি তো আগেই বলেছিলাম, পোস্টমর্টেমে হয়তো বিষের হদিশ পাওয়া যাবে না। ওটি একেবারে পাকা মাথার কাজ।'

-'আপনি কি কিছু আন্দাজ করছেন, সুবল হত্যায় কোন ধরনের বিষ প্রয়োগ হয়েছে।'

-'হুম....  সুবলের লাশ পরীক্ষা করে গতকাল রাতেই একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছিলাম। এবার আজ সকালে আমার খোঁজখবর আর আপনার এখনের কথায় আমি একরকম শিওর, সুবলকে মারতে বিষের রানিকে কাজে লাগানো হয়েছে।'

-'অ্যাঁ... কি বললেন, বিষের রানি! এই নামের কোনও অপরাধী তো পুলিশের রেকর্ডে নেই। ঠিকানাটা দিন, এক্ষুনি তাকে ধরে এনে.... "

 যুগপৎ বিস্মিত, ক্ষুব্ধ প্রতুল দারোগা কথাটা আর শেষ করতে পারলেন না। নীরবতার মধ্যদিয়ে কেটে গেল কয়েকটা মূহুর্ত । একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন,
' উফফ! শেষ পর্যন্ত কি-না বাড়ির বউ-ঝিরাও অপরাধের অন্ধকার দুনিয়ায় পা রাখতে শুরু করল! নাহ্! এবার চাকরিটা সত্যি সত্যিই ছাড়তে হবে দেখছি।'

এতক্ষণ চোখেমুখে একটা দুষ্টু হাসি নিয়ে প্রতুল দারোগার কথা শুনছিল সৌম্য। সেই কথার রেশ ধরে বলল, 'অত উতলা হবেন না প্রতুলবাবু। অপরাধের দুনিয়ায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও আছেন। এটা আপনিও জানেন। তবে এক্ষেত্রে  বিষের রানি বলতে আপনি যেটা অনুমান করছেন, এ কিন্তু সে রকমের কিছু নয়। '

-' অ্যাঁ... তাহলে?'

-'একটু ধৈর্য ধরুন। সব জানতে পারবেন। ও-হ্যাঁ, আপনাকে জিগ্যেস করা হয়নি, ব্রজবল্লভ বাবুর বিছানার চাদরে যে রক্তের দাগ লেগেছিল, তার কি কোনও রিপোর্ট এসেছে?'

-'অ্যাই দেখুন, আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলেই গিয়েছিলাম। আপনি মনে করিয়ে দিলেন। রিপোর্ট বলছে, রক্তটা কোনও মানুষের নয়। কাপড়ে সম্ভবত মুরগি বা অন্য কোনও প্রাণীর রক্ত লাগানো ছিল। '

প্রতুল দারোগার কথায় চোখদুটো চকচক করে উঠল সৌম্যর। তবে এনিয়ে মুখে কিছু প্রকাশ করল না সে। বলল, 'মিন্টু গনজালভেসের কোনও খবর জোগাড় করতে পেরেছেন?'

-'আপনি জানলে অবাক হবেন, হাইলাকান্দি ফিরিঙ্গি বাজারের আশপাশের তিনগাঁয়ে মিন্টু গনজালভেস নামে কাউকে পাওয়া যায়নি।'

- 'হ্যাঁ... আমি নিজেও সেখানকার দু'একটা পরিচিত জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি। মিন্টু গনজালভেসকে কেউ চেনে না।'

-'তবে কি লোকটা হাওয়ায় উবে গেল, না-কি  ব্রজবল্লভ সিনহা আপনাকে মিথ্যে বলেছেন?'

-'সেটা জানতে গেলে সর্বাগ্রে ব্রজবল্লভ বাবুকে খুঁজে বের করতে হবে।'

-'এ দেখছি আচ্ছা ফ্যাসাদ! একদিকে ব্রজবল্লভ বাবু নিখোঁজ তো অন্যদিকে তার পরিচারক খুন হয়ে বসে আছে! কোনদিকটা যে সামলাই... '---দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রতুল দারোগা।

বার্তালাপ শেষ করে বিদায় নিল সৌম্য। থানা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠার আগে সে বলল, 'একটু সময়ের জন্য তুই ড্রাইভ  কর মামন।'

||||||

সোজা ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল মামন। গাড়িতে উঠেই এসিটা ফুল করে দিল সৌম্য।

চৈত্র সেলের বাজার। রাস্তায় থিকথিক করছে মানুষ। রকমারি পশরা সাজিয়ে বসে আছে  দোকানিরা। কিন্তু এসবের দিকে নজর নেই সৌম্যর। গভীর চিন্তায় ডুবে আছে সে। হুঁশ ফিরল মামনের প্রশ্নে।

প্রেমতলা মোড়ে এসে মামন জিগ্যেস করল, 'বাড়ির রাস্তা ধরব সৌম্যদা?'

-'অ্যাঁ... না...না..., সামনের মোড় থেকে কলেজ রোডের রাস্তাটা নে। এক্ষুনি একবার ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়ি যেতে হচ্ছে। ফেরার পথে সুমনের বাড়ি থেকে ছবিটাও নিতে হবে।'

দ্বিরুক্তি না করে হাসপাতাল রোড-অম্বিকাপট্টি মোড় থেকে ডানের রাস্তাটা ধরল সৌম্য।

এদিকটায় ভিড়বাট্টা অনেক কম। কিছুক্ষণের মধ্যে সিঙ্গারি কবিরগ্রামে পৌঁছে গেল সৌম্যরা।

ব্রজবল্লভ সিনহার বাড়িতে থমথমে পরিবেশ। সৌম্যদের দেখে দৌড়ে এল শশীকান্ত। পিছনে রাধারাণী সিনহা। 

সৌম্য বলল , 'আপনাদের একটু কষ্ট দেব। দিনের আলোয় আমি একবার বাগানটা ঘুরে দেখতে চাই।'

-'এটা কোনও সমস্যা -ই নয়। শশীকান্ত আপনাদের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাবে।'---- বললেন রাধারাণী।

|||||||

গতরাতে জায়গাটাকে যতটা ভয়ঙ্কর লাগছিল, দিনের আলোয় এর ঠিক বিপরীত দৃশ্য। পেছনের দিকে বাগানের উত্তর পূর্ব কোণে নাম না জানা লতানো গাছ। তাতে অসংখ্য ফুল ফোটে আছে। অসম্ভব সুন্দর উজ্জ্বল নীল বর্ণের ফুলগুলো অদ্ভুত আকৃতির । অনেকটা ঘোমটা দেওয়া মহিলার মত। একটা ফুল তুলতে গেল মামন। তাকে বারন করল সৌম্য। বলল, 'ওটাতে হাত লাগাবি না মামন।'

-'কেন?'

-'হতেপারে এই প্রজাতির ফুল বিছুটির মত বিষাক্ত।'

একথা বলে সৌম্য শশীকান্তকে জিগ্যেস করল, 'আপনাদের বাগানে এই ফুলের গাছগুলো কতদিন থেকে?'

-'জানি না, আমিও প্রথম দেখলাম। ব্যাপার হচ্ছে, বাগানটাগান নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ নেই।'

-'হুম..., আচ্ছা একটা কথা বলুনতো শশীকান্ত। আপনার কাকু কি বাগানে রুচি রাখতেন?'

-'আগে সেরকম কিছু দেখা যায়নি। তবে বছর দুয়েক হল, সুবলকে নিয়ে বাগানে কীসব খোঁড়াখুঁড়ি করতেন। শুনেছিলাম, বাইরে থেকে একটা বিশেষ ধরনের ফুলের চারা এনে লাগাচ্ছেন। এটা কি সেই গাছের ফুল?'

-'হতে পারে। কারণ, এধরণের ফুল আমাদের এই অঞ্চলে সচরাচর চোখে পড়ে না। আচ্ছা, একটা কথা মন দিয়ে শুনে রাখুন। আমরা না বলা পর্যন্ত এই গাছের পাতা,ফলফুল --কোনটাই ছোঁবেন না। '

-'ঠিক আছে।'

সম্মতি সূচক উত্তর দিলেন শশীকান্ত সিনহা। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে চটপট ফুল সমেত গাছের কয়েকটা ছবি তুলে নিল সৌম্য।

এরপর ব্রজবল্লভবাবুর পত্নী রাধারাণী সিনহাকে কয়েকটা প্রশ্ন করে সৌম্যরা যখন সুমনদের অম্বিকাপট্টির বাড়িতে গিয়ে পৌঁছাল, সুপোরি গাছের আড়ালে সূর্য তখনও লটকে আছে। পশ্চিমের আকাশে যেন গামলা গামলা আবির রঙ ছড়িয়ে দিয়েছে কেউ। 


গাড়িটাকে দাঁড় করিয়ে সৌম্য জিগ্যেস করল, 'কি রে সুমন ছবিটা দিয়ে দেওয়ার পর তুই কি বাড়িতে থাকবি, না আমার সঙ্গে যাবি?'

-'আজকের দিনটা বাড়িতেই কাটিয়ে দিই। কাল কিছু একটা চিন্তা করা যাবে। '

-'ঠিক আছে তবে।' 


বলল সৌম্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে ছবিটা এনে গাড়িতে রেখে দিল সুমন। 


সৌম্য এবার মামনকে জিগ্যেস করল, 'কি ঠিক করলি তুইও কি বাড়ি চলে যাবি?'

-'ইচ্ছে তো সেরকমই। কিন্তু... আচ্ছা চল, তোমাকে আগে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।'

-'চল তবে...'

|||||

একটু এগিয়ে মেডিক্যাল রোড ধরল সৌম্যরা। লাঞ্চে সহদেবের হাতের মুরগির মাংসটা মিস করায় বারবার আক্ষেপ করতে লাগল মামন। কথায়-কথায় এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা প্রশ্নটা করেই ফেলল সে।

-'আচ্ছা সৌম্যদা, এতো সুন্দর একটা ফুল বাড়ির সামনে না লাগিয়ে সেটাকে একেবারে  পিছনের বাগানের এককোনায় লাগাতে গেলেন কেন ব্রজবল্লভ বাবু? কাজটা একটু অদ্ভুত বলে মনে হচ্ছে না তোমার?'

-'বাহ্, দিনদিন তোর মগজটা বেশ খোলতাই হচ্ছে দেখছি। প্রশ্নটা বেশ ভালই করেছিস। আসলে এই দুনিয়ায় কারণ ছাড়া কোনকিছুই ঘটে না।'

-' কী সেটা?'

-'সময় আসুক। সব জানতে পারবি।'

কথাটা বলে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে সৌম্য। এরপর আর হাজার অনুনয় করেও যে তার পেট থেকে  এর বেশিকিছু বের করা যাবে না, সেটা ভাল করেই জানে মামন। তাই প্রশ্ন না করে তাকে দুর্গাপল্লির বাড়ির গেটে নামিয়ে দেয় সে। সৌম্য বলে, 'সুমনকে নিয়ে কাল সকাল সকাল চলে আসিস।'


মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় মামন।

 

||||||

একটু বাদে। 


রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে সারাদিনের ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিয়েছে সৌম্য। দেখতে দেখতে দুচোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। 
ঘুমটা ভাঙলো গভীররাতে। 
অজানা একটা অস্বস্তি নিয়ে জেগে ওঠে সৌম্য দেখে, ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি। ঘরের ভিতর পর্যন্ত বাতাসের শনশন শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। চোখ কচলে বাইরে দেখার চেষ্টা করল সৌম্য।

হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা একটা পাতলা আওয়াজ তার কানকে ফাঁকি দিতে পারল না। ছবিটা তো ওই ঘরেই রাখা। সন্তর্পণে বিছানা থেকে নেমে বিড়ালের মত পা টিপেটিপে মাঝের পার্টিশানের দেয়ালে গিয়ে কান পাতল সে। 
 

নাহ্। কোনও ভুল নেই। ওঘরে কেউ পায়চারি করছে। সতর্ক হয়ে ওঠল সৌম্য।

 

(ক্রমশঃ)

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions