সাহিত্য পত্র

গল্পের পাতা ৫ - " আঘোনি দিদি "
বীণা বরুয়া
(অনুবাদ - সুশান্ত কর)
১৬ মার্চ ২০২১
 

১৬ অক্টোবর ১৯০৮-এ নগাঁও জেলার পুরণিগুদামে জন্ম হয় শিক্ষাবিদ, লেখক, ইতিহাসবিদ, ভাষাবিদ এবং

লোক-সাংস্কৃতিক গবেষক বিরিঞ্চি কুমার বরুয়ার। বীণা বরুয়া তাঁরই ছদ্মনাম।

১৯৩৮-এ বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন অসমিয়া ভাষার শিক্ষকতা করেন।  

সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুথির জন্যে বেশকিছু বই রচনা করেন।

এর পরে অসমে এসে  কটন কলেজে অসমিয়া ভাষার অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৪৮ সনের কাছাকাছি সময়ে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পর্বে গোপীনাথ বরদলৈকে সম্পাদক এবং

বিরিঞ্চি কুমার বরুয়াকে সহ-সম্পাদক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

সেই বছরেই নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অসমিয়া বিভাগে রিডার হিসেবে তিনি যোগ দেন।

এর পরে ১৯৫০-এর ১লা ফেব্রুয়ারিতে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণিসমূহের সচিব’ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

পরে তিনি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

তাঁর প্রধান সাহিত্য কর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম :  ‘জীবনর বাটত’ (বীণা বরুয়া ছদ্ম নামে),

সেউজী পাতর কাহিনী (রাস্না বরুয়া ছদ্ম নামে), জাতকের মালা, অসমর লোক-সংস্কৃতি, পুরণি অসমীয়া কথা সাহিত্য,

চুইজারলেণ্ড ভ্রমণ, এবেলার নাট, বৈষ্ণব গুরু শঙ্করদেব, প্রফেচর বরুয়ার চিঠি, ভারত বুরঞ্জী, পট পরিবর্তন, আঘোণী বাই,

বৌদ্ধ ধরম আরু সাহিত্য, দেশ বিদেশর সাধু, অসমর সংস্কৃতির ইতিহাস।

১৯৬৪-তে ‘অসমর লোক-সংস্কৃতি’ বইটির জন্যে সাহিত্য একাডেমি পুরষ্কারে ভূষিত হন বীণা বরুয়া তথা বিরিঞ্চি কুমার বরুয়া।

সে বছরেই ৩০ মার্চে গুয়াহাটিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর ‘আঘোণী বাই’ সংকলন থেকে বর্তমান গল্পটি অনূদিত হল ...

‘কে রে ভুবন? সবজিবাগানের বেড়াটা খুলেছে কে?” এই বলে হাতের থেকে চায়ের জগটা নামিয়ে রেখে উকিলনি সকাল সকাল চায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে উঠে এসে সবজি বাগানের দিকে উঁকি দিয়ে আবার চেঁচিয়ে বললেন, “ ওহ! কে আর হবে? এই বুড়ির থেকে বাগানের শাক-সবজি একটাও যে ফলিয়ে খাব তার উপায় রইল না। ভোর হতে না হতেই বাগানে খুঁটাখুঁটি করতে ঢুকলই। যা তো ভুবন, বুড়িকে বাগান থেকে বেরিয়ে আসতে বল!” কাজের ছেলেটিকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে উকিলনি আবার চায়ের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

    

সাত সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছেলে মেয়েগুলো প্যানপেনাতে শুরু করেছে। উকিলনি তাড়াতাড়ি কয়েকটি সেদ্ধপিঠা ভেজে সবাইকে ভাগ করে দিয়েছেন। এদের সামাল দেয়া বড়ই কঠিন। মইনি মাখনির পিঠা এক টুকরো নিজের মুখে ভরে দিয়েছে। মাখনির উঠল রাগ। সব পিঠা দিল ছড়িয়ে। ছোট ভাইর চোখে জল,ওর ভাগে মাত্র পাঁচটি পিঠা। ছেলেমেয়েগুলোর এহেন উৎশৃংখলতাতে উকিলনির রাগ মাথাতে চড়ল। এই অবুঝ ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে তিনি মরেন গিয়ে কই? ওদের বাবারও যদি এদিকে সামান্য নজর থাকত। লাই দিয়ে দিয়ে ছেলেমেয়েগুলোকে মাথাতে তুলেছেন। উকিলনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, “ এই মুখ পোড়ারা! খাচ্ছিস না কেন? বাঁশ নিয়ে এসে মার বসাতে হবে? এখনই বুড়ি এসে পড়বে। খেয়ে নে তাড়াতাড়ি। সে এসে দেখলেই নজর দেবে, আর পেট খারাপ করবে।”

           

এতোক্ষণ ধরে নাকিকান্নাতে ব্যস্ত ভাইটির আওয়াজ শুনা গেল, “ আমাকে আরো একটা দে মা।”

           

ভাইয়ের কথা শেষ হতেই মাখনি সরিয়ে রাখা বাটিটি  টেনে কাছে এনে মায়ের সামনে এগিয়ে দিয়ে কান্নার সুরে বলল, “আমার ভাগের একটা মইনি খেয়েছে—আমাকেও একটা দিতে হবে।”

             

মা চেঁচিয়ে উঠলেন,“ এই রাক্ষুসীটার অন্যের পাত থেকে নিয়ে না খেলে পেট ভরে না। বড় হচ্ছে,যেন খাই খাই বেড়েই চলেছে।”

           

মায়ের বকুনি খেয়ে মইনি প্যানপেনালো,“একটু ছুঁয়ে দেখতেই ওর ভাগের পিঠা খাওয়া হয়ে গেল?” সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকা করে মইনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কথা সামান্য গুরুতর হচ্ছে দেখে মাখনি আর ভাইটি মচ মচ করে নিজের নিজের ভাগের পিঠা চিবোতে শুরু করল। ইতিমধ্যে ভুবন কুয়োর পাড় থেকে বাসি থাল বাটি ধুয়ে ভেতরে এসে ঢুকল।

 

--- “ কী রে  ভুবন! বুড়ি বাগানে কী খুঁজছিল? বেরিয়ে এসেছে কি না?”

 

--- “ কী খুঁজবে আর? নিচে ঝরে পড়া পাকা সুপারি বেঁধে নিচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলে বলে , সুপারি নেয়ই নি।”

 

--- “ এতো মিথ্যুক বুড়ি! বুড়ির এই চুরির স্বভাবটি যে কবে যাবে! নিজে ওদিকে খেতেই পারে না, তবু নিয়ে যাওয়া ছাড়ে না।”

           

উকিলনির কথার সঙ্গে সঙ্গে বুড়ি এসে রান্নাঘরের কাছে পৌঁছে গেল। ভাঙা পিঁড়ি একটা টেনে নিয়ে বসে বুড়ি কথা বলতে শুরু করল, “ দে মা দে, চা এক কাপই খেয়ে যাই। আজ দু’দিন আসব আসব করেও আসতে পারিনি।”

           

উকিলনি তাড়াতাড়ি করে চুলোর আগুন থেকে পিঠা ভাজার কড়াইটা নামাচ্ছিলেন। কড়াই নামিয়েই বুড়িকে একেবারে চুলোর কাছে চাপতে দেখে, চোখ বাঁকা করে ঝ্যাংটি মেরে বললেন, “ অল্প সরে বসতে পারো না? পুরো  দুনিয়া ঘুরে আসা শরীর নিয়ে চুলোর কাছে গিয়ে চেপে বসেছ?” 

 

গায়ে না মেখেই পিঁড়িটি সামান্য সরিয়ে জবাব দিল, “ কই আর দুনিয়া ঘুরে এলাম গো মা, গায়ে জল ঢেলে তবেই এক কাপ চায়ের আশাতে তোদের এখানে দৌড়ে এসেছি। দে মা, এক গ্লাস জল তো দে; কাল রাতেও কিছু খাই নি। নাজিরের মাকে বলে কয়ে আঁটি কলা এক কাঁদি নিয়ে গেছিলাম। তারই দুই তিনটা খেয়ে রাতে পড়ে রইলাম। যা কলা! গুটিই গুটি।” বুড়ি নিজের মনে মনেই কথাগুলো বলে যাচ্ছিল।

 

উকিলনির ওর কথাতে মন দেবার অবসর নেই। গরম জলের সঙ্গে মিশিয়ে উকিলনি এক বাটি চা আর গোটা কয়েক আধাভেজা পিঠা দিলেন। বুড়ি কাছে পড়ে থাকা তুলা পাতা একটাতে পিঠাগুলো বেঁধে ফেলল। এটা উকিলনির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াল না,“এই কটা আবার কার জন্যে পোটলা বেঁধে নিয়ে যাচ্ছ?”

 

বুড়ি বিষাদ স্বরে বলল,“ও মা,কার জন্যে বাঁধব গো?ওই লেঙড়িটা আছে না?ও বাড়ি থেকে বেরুতেই বলে দিয়েছিল।”

 

উকিলনির হৃদয় নরম হল। তেকোনা বাঁশের সাজি থেকে পিঠা কটা নিয়ে হাতে দিয়ে বললেন,“ঠিক আছে নাও। এগুলোই লেঙড়ির জন্যে নিয়ে যাও। তোমার ভাগের গুলো এখানেই খেয়ে যাও। ঘরে নিয়ে গেলে নাতনি কাড়াকাড়ি করবে।” কথাগুলো বলে উকিলনি বাইরে বেরিয়ে গেলেন।

বুড়ি একটা মুখে দিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে বাকিগুলোও পোটলাতে বেঁধে নিল। কাছেই বসে বসে পিঠা চিবোতে চিবোতে ভুবন বুড়ির কাণ্ড দেখে খল খল করে হেসে ফেলল। নিজের অসতর্কতাতে লজ্জা পেয়ে বুড়ি বলল,“বড় শক্ত। চিবোতেই পারি না।” তারপরে চায়ের বাটিতে চুমুক দিয়ে মুখ বাঁকিয়ে ভুবনের দিকে তাকিয়ে বলল,“ চা-টাও সেরকম । পানসে । স্বাদ বলতে কিছুই নেই।

 

সকালবেলার জীবনটুকু এভাবেই গেল।

                                                           

***  *** ***

 

নতুন শহর। মানুষের সংখ্যা খুবই কম। শহরে আঘোনি বুড়ির মতো মহিলা আর নেই বললেই চলে। ছেলেবুড়ো সবারই বুড়ি চির পরিচিত। ঘরোয়া কথার জীবন্ত ‘গ্যাজেট’ এই আঘোনি বুড়ি। কোন বাড়িতে কার অসুখ হয়েছে, কার বাড়িতে অতিথি এসেছে, কার ঘরে কখন ‘আই-নাম’(১), ‘বর সবাহ’(২) সব কিছুর খবর  না নিয়ে থাকে না। সেরেস্তাদারের নতুন বৌয়ের কথা বার্তা, দেনা-পাওনাতে কেমন? হাজরিকার বড় জামাইর দম্ভ---ইত্যাদি সবকিছু কোনো আড়াল না রেখে বুড়ি পাঁচকান করতে পারে। মহাফেজের বাগানের থৈকর গাছে এবারে কেমন ডাল ভরে ফল ধরেছে; ফুকনের চালতা গাছে লোকে কীভাবে আঁকশি লাগিয়ে থাকে; গোঁসাইর বাগানের বেল গাছে রাখাল ছেলেরা ঢিল মেরে মেরে কীভাবে শেষ করল; বরুয়াদের বাড়ির লিচু গাছকে জালে ঢেকে ছেলেরা কীভাবে পাকা লিচুগুলো বাদুড়ের মুখ থেকে বাঁচিয়ে রাখছে; কার বাগানে এবারে কী কী শাক-সবজি হয়েছে?--- এই সব সংবাদই বুড়ির মুখে। বুড়ির কাজ গোটা দিন ধরে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। দরকার পড়লে মাঝে মধ্যে তাদের কাজে কর্মে সাহায্য করা। কারোবার বাড়িতে চিঁড়া কুটে দিয়েছে, কারো বাড়িতে চালের খুদগুলোই ঝেড়ে বের করছে। রোগা বলে যা পারে তাই করতে কখনো বুড়ি পিছিয়ে যায় না। শহরের বেশ কিছু বাড়ির মেয়ে-বৌদের বুড়ি হচ্ছে ডান হাত। সেরেস্তাদারের নতুন বউমার কচু শাক খেতে ইচ্ছে হয়েছে, বরুয়ার বউর ঢেঁকি শাক চাই, ফুকনের বউর তেতো খেতে চেয়ে একমুঠো নালিতা গুড়োর অভাবে এতো দিন খেতে পারে নি, গোঁসাইর মেয়েটি বগুলি খাবে খাবে বলে কারো হাত দিয়ে আঁটি কলার চারা একটাও আনাতে পারে নি---এদের সবার আশা পূরণের বড় ঠাঁই হচ্ছে এই আঘোনি দিদি। আঘোনি দিদির কানে কেবল কথাটা দিতে হয়—পরদিনই জিনিস এসে হাজির। এই বাড়ির জিনিস এনে ঐ বাড়িতে যোগান দিতে বুড়ি সিদ্ধহস্ত। হাত নড়ে বলে বুড়ির কুখ্যাতি আছে। বুড়ি কিন্তু সেসব শুনেও না শোনার ভান ধরে। লজ্জা, অপমান, গালি-গালাজ বুড়িকে টলাতে পারে না। এর মাত্রা বেশি হলে বুড়ি করে কী, “কান ভারি হয়েছে,কিছু শুনতে পাচ্ছি না।”--- বলে তাড়াতাড়ি সরে পড়ে।

 

বরুয়াদের বাড়ির লিচু গাছ থেকে চুপেচাপে কয়েকটা লিচু নিয়ে বুড়ি পোটলা বেঁধেছে। বরুয়ার ছেলে এসে বুড়িকে চোরনি বলে গালি পাড়ল কি, “জানি না,বাবা কী বলছে!” --- বলে তাড়াতাড়ি সরে ফুকনের বাড়ি  গিয়ে পৌঁছুলো।

 

ফুকনের ছেলেটির সামনে গিয়ে লিচু কটা মেলে ধরল। রান্নাঘরের ধোঁয়ার থেকে বেরিয়ে এসে ফুকনের বউ ছেলের মুখে লিচু দেখে, “কে এই সব দিয়েছে”--- বলে প্রশ্ন করেন।

 

প্রশ্নের উত্তরে বুড়ির দিকে তাকিয়ে রাগে জ্বলে বলছেন, “ ছে! কে তোমাকে এই সব নিয়ে আসতে বলেছে? কচি লিচুগুলো খাইয়ে ছেলেটাকে মারতে চাইছ?”

           

--- “ইস! এখন বড় হয়ে গেছে, কচি হয়ে আছে বুঝি? লোকে ওদিকে খেয়ে শেষ করে ফেলছেই!”

           

বুড়ির কথাতে ফুকনের বউর রাগ দ্বিগুণ চড়ল, “ঠিক আছে, লোকে খেয়ে শেষ করুক। আমার ছেলেকে আদর দেখাতে হবে না এসে।” বলে ছেলের মুখ থেকে চুষতে থাকা লিচুটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আবার রান্নাঘরে ঢুকলেন।

 

বুড়ির মুখে কিন্তু কোনো রাগ টাগ প্রকাশ পেল না। ওর জীবনটাই গেছে এমন উপেক্ষা আর অবমাননার মধ্য দিয়ে। দুবেলা দুমুঠোর জন্যে যাকে পরের কাছে হাত পাততে হয়---তার আত্মসম্মানই কই? মায়ের নিষ্ঠুর ব্যবহারে ছেলেটি বেশ চাপা কান্নাকাটি করল। লিচুটিতে বেশ ফল ধরেছিল। বুড়ি ছেলের দুঃখ বুঝে সান্ত্বনা দিয়ে বলে গেল, “হবে সোনা,ভালো করে পাকলে আমি তোর জন্যে আরো নিয়ে আসব। আজকাল আবার চোখে আগের মতো দেখিনা না।”

           

ভোগাইর সেদিন খুব রাগ। ভোগাই বুড়ির প্রতিবেশী। এক পাল ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোক্রমে ঘর সামাল দিচ্ছে। নিজেরই মাটি বাড়ি, হাল গরুর জোরে ছোট সংসারটি টুকটাক করে চালাচ্ছে। লোকজনের কোনো এক ঝামেলা মেটাতে ভোগাইকে সেদিন যেতে হয়েছিল ন-নৈর কুমারদের গ্রামে। সন্ধেবেলা ফিরে আসতে কুমারদের থেকে চেয়ে চিতে একটি ভালো সিলিম নিয়ে এসেছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠে তামাক খেতে সিলিমের সন্ধান করতে দেখে--- নতুন সিলিম নেই। এ আর কারো কাজ নয়। সন্ধেবেলা বুড়ি এদিকে এসেছিল, হাতের চালে সিলিমটা নিয়ে গেছে।

           

সকালেই বুড়ির ঘরে তালাসি হল। ভোগাইর হাবাগোবা ছেলে আধান গিয়ে বুড়ির ঘরের ভেতরে পুরোনো কেটলি একটার থেকে সিলিমটা বের করে নিয়ে এল--- বুড়ি আর নাতনি তখন বাড়িতে ছিল না।

           

বুড়ির ঘর বলতে আর আছেই কী? একটি ছোট্ট ঝুপড়ি। চালে আজ বহুদিন হল নতুন খড় পরে নি। এবারের বর্ষার দিনগুলো এর নিচে কাটানোই কঠিন হবে। অবশ্য গাঁয়ের লোকে যা পারে সাহায্য করবে বলেছে। কিন্তু ঠিক সময়ে কী বা করে? দেওয়ালও প্রায় ভেঙেই পড়েছে। জায়গায় জায়গায় লোকের বাড়ি থেকে মনে মনে তুলে নিয়ে আসা কেরোসিনের টিনের টুকরো, ভাঙা পিঁড়ি, কোনো জায়গাতে বা কাগজ গুঁজে জোড়াতালি দিয়ে রেখেছে। এত সব কিছুর পরেও বুড়ির ঘরে একটি দরজা আছে আর এর আনুষঙ্গিক অবয়ব পূরণ করতে লাগানো আছে একটি পুরোনো দিনের তালা। এর চাবিটি খেতে ঘুমোতে বুড়ির কোমরে ঝুলে নাচতে থাকে। ঘরে কোঠা দুটি।একটিতে রান্না বাড়া করে। আর অন্যটিতে ভাঙা বাঁশের চাংটির উপরে নাতনিকে নিয়ে রাতে ঘুমিয়ে কাটায়। কিন্তু সেই ঘরের ভেতরটাতেই কিন্তু বুড়ির জিনিস পত্রে ঠাসা। মাটির হাঁড়ি, কড়াই, কেটলি, ছোটো বড় টিনের কৌটা, নারকেলের ঠালি চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। হাঁড়ি কড়াই মানুষ ছুঁড়ে ফেলে দেবে দেখে বুড়ির কিছুতেই সহ্য হয় না। সেই না দেখে আশ্রয়হীন মাটির পদার্থগুলো তুলে এনে বুড়ি নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।

           

বুড়ির অতীত জীবনের সঙ্গে বর্তমানের অবশ্য কোনো সামঞ্জস্য নেই। জীবনের সিঁড়ির শেষ ধাপে পা দিয়ে ছেড়ে আসা দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে আজ বুড়ি ভয় পায়। বয়সও প্রায় চার কুড়ির কাছ চেপেছে --- সিঁড়ির যে ধাপে পা সেখানে স্থির হয়ে আর দাঁড়াতেও পারে না। তেমন অবস্থাতে পেছন দিকে তাকায়  কী করে? এত শত ভাবার  অবকাশ নেই বুড়ির। লেঙড়ি নাতনিটি বুড়িকে সারাক্ষণ পেছনে টেনে ধরে।

           

ল্যাঙরই বুড়ির নাতনি। মেয়েটির অন্য কোনো নাম আছে যদিও বা ওর দিদিমার বাইরে আর কেউ জানে না। জন্ম থেকেই বেচারি খোঁড়া। দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারে না। হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে পুরো শহর দিদিমার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। ওর মা মারা যাবারও আজ হয়েছে অনেক দিন। তখন থেকেই দিদিমার সঙ্গেই আছে। আঘোনির প্রথম সন্তান লয়নির বয়স চারবছর হবার আগেই বর মারা যায়। সেদিন থেকেই আঘোনির নতুন জীবনের আরম্ভ। গ্রামের সেই হাসিখুশি আঘোনির হাসি মুখখানা সেই থেকে আর কেউ দেখে নি। কলং থেকে জল আনতে যাওয়া যুবতিদের রঙ্গ-রসিকতাও কমে এল। এতো দিনে যেন আঘোনিই সবার মধ্যে সজীব হাসির সাজি মেলে দিয়েছিল।

           

তখন থেকেই কী কষ্টেই যে আঘোনির দিনগুলো যাচ্ছে। বর ছিল একা মানুষ। বাকি পরিবার ছেড়ে এসে শহরের কাছে বাস করতে শুরু করে। লোকের বাড়ি এটা ওটা করে যা সামান্য রোজগার করছিল তাতেই বেশ স্ফূর্তিতে খেয়েপরে দিন কাটছিল। ভর জোয়ান বয়স। সঞ্চয়ের কথা মনেই আসে নি। তরুণ বয়সেই যদি মনের ইচ্ছে দুই চারটা পয়সা খরচা করতে না পারে তবে জীবন আছেই বা কী করতে? শরীরের যখন শক্তি আছে তবে ভয় কীসের? আর কিছু না হলেও দিন হাজিরা করেও দুটি প্রাণীর চাল দুই কাঠা বের করে নিতে পারবে। আঘোনির বর রতনেরও সুযোগ মিলেছিল ভালোই। গোঁসাইর বাড়ির কাজে কম্মে সেই সকলের আগেভাগে ছিল। এদিকে ওদিকে কোথাও কোনো কাজে পাঠাতে হলে গোঁসাইর নজর রতনের উপরেই পড়ত। গোঁসাইর ছেলেদেরও সে অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার জন হয়ে উঠেছিল। সমবয়সী গোঁসাইর ছেলেদের সঙ্গে সে ভালো করেই মিশে যেতে পেরেছিল। গোঁসাইর বড় ছেলে সাব ডেপুটি কালেক্টর। শিকারে তার বড় উৎসাহ। বাড়িতে এলেই বুড়িয়ে যাওয়া হস্তিনীটিকে নিয়ে শিকারে বেরোয়। তার সঙ্গে সারথি রতন। রতন না হলে বড়বাবার শিকার করাই হয় না। রতনকে সে বন্দুক মারতেও শিখিয়েছিল। বড়বাবা রতনের সঙ্গে নিজের ভাই-দাদার মত ব্যবহার করত, আদরও করেছিল সেরকম। আঘোনি কিন্তু রতনের এই শিকার করবার কাজটি ভালো মনে নেয় নি। রতন যেদিন গর্ভবতী এক হরিণীকে মারবার কথা এসে বউকে বলেছিল আঘোনি সেদিন বরকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিল যে আর কোনোদিন শিকারে যাবে না। তরুণ রক্তে বলীয়ান রতন স্ত্রীর কথা যুক্তি তর্কে খণ্ডন করতে চেষ্টা করল, “আমাদের জন্যেই ঈশ্বর এইসব জীব-জন্তু সৃষ্টি করেছেন, আমরাই যদি না খাই তবে খাবে কে?” গোঁসাইর বড় ছেলে বাড়ি এসে থাকবার দিনগুলোতে রতনের শরীর আর স্থির থাকতে পারে না। ওর যেন নিজের ভাই একটাই সাব ডেপুটি হাকিম হয়ে বাড়ি ফিরেছে। হাকিম বাড়ি আসছে বলে শুনলেই রতন শিকারের জায়গা খোঁজে দিশাহীন হয়ে পড়ে। ভোরবেলা উঠেই গুরগুরিয়া বিলে বন্য হাঁস পড়েছে কি পড়েনি,‘বঙাল’(৩) জেলেরা সেখানে নৌকা বেঁধেছে কি বাঁধে নি, লাওখোআর রিজার্ভে হরিণের ঝাঁক চরতে বেরিয়েছে কি বেরোয় নি--- তারও সংবাদ সংগ্রহ করে রাখে।

           

রতনের মতো মনে মেলা সহচরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বড়বাবা সত্যিই খুব কষ্ট পায়। আঘোনিকে সর্বতোভাবে সহায় সাহায্য করতে বাড়িতে খুব করে লিখেছিল। শুরুর দিকে অবশ্য গোঁসাই বাড়ি থেকে আঘোনি অনেক সাহায্য পেয়েছিল। টাকা পয়সা যা চেয়েছিল হাকিমের মা দিয়েছিলেন। কিন্তু সবসময় গ্রহণ করলে দয়ার মতো মহৎ গুণেরও মহত্বও হ্রাস পায়। সংসারটি হচ্ছে বেচা-কেনার ঠাঁই। যেখানে দু পয়সা পাবার আশা আছে মানুষ সেখানে মানুষ নিজের মূলধন জমা রাখে। দেউলিয়াকে ধন দিয়ে পুণ্য অর্জনের ইচ্ছে কম মানুষেরই থাকে। বিশেষত দেনা পাওনা আর সাংসারিক কাজ চালাতে মেয়েদের বুদ্ধি ছেলেদের বুদ্ধি থেকে প্রখর হয়। বাইরের দুনিয়াতে ঘুরে বেড়ানোর ফলে পুরুষের নজর বড় হয়। বড় বড় বিষয়েই পুরুষের নজর পড়ে। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢুকে থাকবার জন্যে নারীর নজর বড় হবার সুযোগ পায় নি। সেই জন্যেই তাদের নজরে ছোট ছোট বিষয়গুলো সহজেই ধরা পড়ে। আঘোনিকে দেবার জন্যে হাকিম মাসে মাসে টাকা পাঠালেও, মা সেই টাকা ওকে দেওয়া বন্ধ করলেন। শুধু শুধু এক রক্ষিতাকে পোষার মানেই বা কী? আরো একটা কথা, আঘোনির প্রতি বড়বাবার এত টান কেন? যুবতি নারী একজনের এত খবরই বা করে কেন? নাহ! গোঁসাই বংশে এমন কথা হতেই পারে না। আঘোনিকে যে করেই হোক বাড়ি ছাড়া করতেই হবে। বলা কি যায়—জোয়ান ছেলে কখন কী করে বসে! আঘোনিই বা কখন কবে বড়বাবা এসে পৌঁছুবে এত খবর নেয় কেন?

           

রতনের মৃত্যুর পরেও আঘোনি যেমন ভেবেছিল, দিনগুলো সহজে যাবে তত সহজে আর গেল না। একটা বিপদকে কোনোমতে সরিয়ে রাখলে, আর একটা এসে সেই জায়গা পূরণ করে। এমনিতে ঘর চালাতে আঘোনি দিদিকে বেশি ভাবতে হয় নি! কেননা তাদের মা-মেয়ের দুটি আধা আধা পেট। লোকের বাড়িতে ধান ভেনে চাল বের করে যা পাচ্ছিল, তাতেই কোনোভাবে চলে যাচ্ছিল। ধান ভানবার কাজে  আঘোনি অতি পাকা। একদিনে তিন পুরা(৪) ধানের চাল বের করতে তার মতো আর কেই বা পারে। দূর থেকে ঢেঁকির শব্দ শুনলে সে যে আঘোনির পাড় সে আর অন্যে বলে দিতে হয় না। ঢেঁকি পাড় দেবার সময় থেকেই আঘোনির দুই কলা ফুল গোল সুডৌল হয়ে পড়ল। দেহের গঠনও চোখে পড়বার মতো হয়ে গেছিল। রতন মারা যাবার পরে সেই দেহকে নিয়ে আঘোনি বিপদে পড়ল। পথে ঘাটে বেরুলেই জোয়ান ছেলেদের নজর ওর পিছু ছাড়তে চাইত না। মাঝে মধ্যে সুযোগ সুবিধা পালে ওর সঙ্গে ঠাট্টা ইয়ার্কি মারতেও কোনো কোনো যুবক এগিয়ে আসে। যতটা পারে তাদের এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে আঘোনি। কিন্তু অসম্ভব। ছেলেরা যেচে এসে ওর সঙ্গে কথা বলবেই, টান দিয়ে ওর কাছ থেকে লয়নিকে নিয়ে যায়। লয়নির সঙ্গে ঢং করবার ছলেই এরা ওর কাছে চাপে। ছেলেদের গালি দিয়ে যে দূরে পাঠাবে সেই সাহস তার নেই। বোলতার বাসাতে আগুন দেওয়া সাধারণ কথা নয়। কিন্তু যেদিন ও কলঙে গিয়ে কলসিটা ডুবাতেই হাতবরের বড় ছেলে ভেদো কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আঘোনি তুই আমার ঘরে আসবি?”—সেদিনই ওর মাথাতে  স্বর্গ ভেঙে পড়ল যেন। কিচ্ছুটি না বলে কলসিটি আধা ডুবিয়েই সেদিন সে দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ি ফিরে এল।

           

এই সেই ভেদো ! একে কি রতন কম আদর করত? শিকার থেকে ফিরলে নিজের জন্যে না রেখেও ভেদোর জন্যে একভাগ মাংস না পাঠিয়ে থাকতে পারে নি। ভালো জিনিস একটা পেলেও ভেদোকে না দিয়ে মুখে দেয় নি। গ্রামের সর্বজনীন ভাওনাতে(৫) অংশ নেবে ভেদো—কিন্তু তার জন্যে পোশাক আসাকের সন্ধানে ফেরার ভার ছিল রতনের। ভেদোকে পরাবার জন্যে গোঁসাইর মেজো ছেলের থেকে মুগা পাঞ্জাবিটা চেয়ে এনে রং লাগিয়ে নষ্ট করে রতন কত গালি খেয়েছিল। সেবারে হাতবর পুরণিগুদামে বারখেলের ভাওনা দেখতে ভেদোকে কিছুতেই পাঠাবেন না। গ্রামের সব ছেলেরা রওয়ানা দিল, বাদ পড়ল কেবল ভেদো। তার মনমরা মুখ দেখে সইতে পারল না রতন, হাতবরকে বলে কয়ে নিজের অসুস্থ শরীরেই শেষে ভেদোকে ভাওনা দেখতে নিয়ে গেছিল। এক এক করে সেই সব কিছু আঘোনির মনে আসতে শুরু করল। রতন যাকে আদর করে ভাই বলে ডেকেছিল, সেই ভেদো আজ রতন মারা যাবার তিন বছর না হতেই তার বিধবা স্ত্রীর উপর নজর দেয়? আঘোনিকে নিয়ে সে ঘর করবার স্বপ্ন দেখে?

           

সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেল আঘোনির। সকাল থেকে রাত অব্দি ওর উপরে এই একই মানুষটির একই নজর। ওর শরীরের মাংসের উপরে যেন সবারই লোভ চড়েছে। ওর এই ফুলে উঠা যৌবন বৃথাই যাবে বলে সবাই চিন্তিত। তার উপায় সন্ধান করে জোয়ান ছেলেদের অবসর নেই। আঘোনির পক্ষে একা রাত কাটানো কঠিন হল। রোজই রাতে কেউ এসে ওকে নাম ধরে ডাকে। লয়নিকে বুকে টেনে নিয়ে সে কাঁদতে শুরু করে। লয়নিকে ঘুম থেকে জাগাবার চেষ্টা করে। যেন লয়নিই এই কালরাত্রে ওকে অত্যাচারীর হাত থেকে বাঁচাতে পারবে। আঘোনির বিশ্বাস যে কোনো পুরুষই সন্তানের সামনে মাকে অপমান করতে এগুতে পারবে না। পরদিন জল আনতে যাবার পথে ভোগাইর বউ আঘোনিকে ঘাটে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই আঘোনি! কাল মাঝ রাতে মেয়েকে এতো চেঁচিয়ে ডাকছিলি কেন? আমাদের এখান থেকে চীৎকার শুনা গেছে।”

           

আঘোনি ধীরে জবাব দিল, “এহ! কোনও চোর এসেছিল বলে যেন মনে হচ্ছিল।”  কথাটা বলা ঠিক হল কি না ভেবে আঘোনি থতমত খেয়ে গেল ।

           

কলসি কাঁখে নিয়ে যেতে গিয়ে ভোগাইর বাড়ির বউ বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “ইস! তোর ঘরে আবার চোর আসে! সোনা দানাতে ভরে আছে তো, না?” আঘোনি ভাবে—সত্যিই তো ওর ঘরে চোর আসবে কেন? পর মুহূর্তে কিছু একটা মনে পড়তেই যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে জলে নেমে গেল।

           

আঘোনি ঠিক করল,একা এভাবে থাকা যাবে না--- কারও বাড়িতে গিয়ে উঠতে হবে। মেয়েটি গলাতে না ঝুলে থাকলে সে কবেই কলঙে ডুবে মরে যেত। অবশ্যে অন্যের বাড়িতে এমনি এমনি বেগার খাটতে গেলে সমাজে সে নিন্দের পাত্র হবে। সমাজে ওর আগের সম্মান আর থাকবে না। হোক গে! তবু এত শত্রুর মধ্যে থাকা অসম্ভব। কখন কী হয়—কে বলতে পারে! গোঁসাইর মা-ই ওকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবেন, তাঁকেই একবার বলে দেখবে বলে ভাবল। কিন্তু আজ কিছুদিন থেকে গোঁসাইর মায়ের থেকেও সে ভালো ব্যবহার পায় নি। কিছু একটা চাইলেও, ‘এখন নেই, পরে আসবি’---বলে বিদেয় করেন। তবে এবারে কথাটা বলে দেখবার উপায় সন্ধান করতে শুরু করল আঘোনি।

           

অঘ্রান মাসের রোদ, দুপুরের ভাত খেয়ে উঠতেই বেলা ঢলে পড়ে। গোঁসাইর মা ভাত খেয়ে উঠে ধারা বিছিয়ে বাটা নিয়ে তামোল(৬) কাটছেন। এমন সময়ে লয়নিকে নিয়ে আঘোনি গিয়ে সেখানে পৌঁছুল। গোঁসাইর মা আঘোনিকে তামোল একটা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“ আজ ভাত কী দিয়ে খেলি?”

           

--“ এহ! আর কী দিয়ে খাব মা? সেদিন আপনার এখান থেকে কলাই ডাল কিছু নিয়ে গেছিলাম যে, তারই সামান্য ছিল। তাতেই খার রান্না করলাম।” মেয়ের দিকে আঙুলে দেখিয়ে বলল, “ এ আবার টক না হলে মুখে তুলে না কিছু।”

           

ধীরে ধীরে এটা ওটা কথার পরে গোঁসাইর মা বললেন,“ঠিক আছে। কথা বলছি। আমার চুলগুলো মেল তো। উকুনে পিল পিল করতে শুরু করেছে।” কথাটা শেষ হতে না হতেই আঘোনি গোঁসাইর মায়ের চুল মেলে দিল। খানিকক্ষণ নখ ঘুরাতে ফেরাতেই বড় উকুন একটা বেরুল। আঘোনি উকুনটি নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,“ও মা!রক্ত খেতে পেয়ে এটা দেখো, গোলগাল হয়ে পড়েছে।” এই বলে মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে উকুনটি মারাল। উকুন দেখতে দেখতে দুয়ের মধ্যে কথাও চলতে থাকল।

           

গোঁসাইর মা বললেন,“এই, এবারে ফাগুন মাসে তোর ঘরটা ছেয়ে নে। বাঁশ যে দুই একটা লাগবে আমাদের বাগান থেকে নিয়ে যাবি।”

           

--- “মা, ঘর ছেলে দেবে কে? লোক লাগাতে টাকা-কড়ি কই পাব?”

           

--- “ কিন্তু বর্ষার দিনগুলো কাটাবি কী করে?”

           

---“সে জানি না, বলতে পারব না।” কিছু থেমে বলল, “ আচ্ছা, মা আমি এসে আপনাদের ঢেঁকিশালাতে থাকতে পারি না?” ভয়ে ভয়ে আঘোনি গোঁসাইর মায়ের মুখের দিকে তাকাল।

           

---“ ঢেঁকিশালাতে জায়গা কই আছে? জায়গা থাকতে তোকে এসে থাকতে বলি না বুঝি?”

           

আঘোনির প্রাণে অল্প আশার সঞ্চার হল। নিজের সকল দুঃখের কথা বললে কে জানে, ঢেঁকিশালাতে থাকবার একটুকু জায়গা পেয়ে যেতেই পারে। সেই ভেবেই সরল বিশ্বাসে বলল,“মা,একা একা বাড়িতে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাতে এসে লোকে উৎপাত করে। তাই আপনাদের এখানে উঠে আসতে চাইছিলাম।” এক শ্বাসে কথাগুলো বলে আঘোনি থামল।

           

গোঁসাইর মা বহুদর্শীর সুরে জবাব দিলেন,“আমি তোকে আগেই বলেছিলাম,কাউকে একজনকে ধরে বিয়ে করে ফেল। তুই এক মেয়েরই মা। মেদেউর মেয়ে জেতুকি কী করল দেখ! বড় বড় তিনটা ছেলে মেয়ে নিয়ে পরে বাড়ি গিয়ে ঢুকে নি?” গোঁসাইর মায়ের উপদেশে আঘোনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ মেরে গেল। উকুন দেখা সেখানেই শেষ হল। ওর ইচ্ছে করছিল বুক চিরে ভেতরের শোক দেখায়। পারে নি—এমন কি চোখ দিয়েও এক ফোটা জল বেরুল না।তাড়াতাড়ি করে গোঁসাইর মায়ের খোঁপাটা বেঁধে দিয়ে যাবার জন্যে তৈরি হল।

           

--- “মা, আজকের জন্যে উঠছি। সন্ধ্যার জন্যে শাক-সবজি দুই চারটা জোগাড় করতে হবে।”

           

আঘোনি নাখুশ হয়েছে বুঝতে পেরে গোঁসাইর মা বললেন,--- “ ঠিক আছে, যা। কাল যদি পারিস এক পাক আসবি তো। আমার কথাতে খারাপ পাবি না, আমি ভালোর জন্যেই বলেছি। তোরা এখন জোয়ান মেয়েমানুষ। সব সময়  আর মনকে বেঁধে রাখতে পারবি না।” গোঁসাইর মায়ের কথা শেষ হবার আগেই আঘোনি যেমন বাগানে ঢোকা গরু গৃহস্থের মার খেয়ে পালায় তেমনি করে পা চালাল। উঠানের ফটক বন্ধের কের-কের শব্দে ঘুরে তাকিয়ে গোঁসাইর মা বলে উঠলেন,“ ইস! কথাটা বলতেই পালাল। নিচ জাতিকে সৎ উপদেশ দিয়ে কীই বা লাভ?” বাটা হাতে তিনি ঘরের ভেতরে গেলেন।

           

শাক-সবজির দরকারই নেই,সেদিন আঘোনির ভাত রাঁধাই হল না। গিয়েই বিছানাতে পড়ল। সন্ধেবেলা গোঁসাই বাড়িতে ডবা(৭)-কাঁসি বাজানো শুনেও মাথা তুলে নি। লয়নি বার কয়েক ভাত খাই খাই বলে চেঁচালে, মায়ের চড় খেয়ে শেষে পাটিতে পড়ে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেল। পুরো রাত পাটিতে পড়ে আঘোনি কাঁদল। গরিবের ঘরে জন্ম নিল বলেই কি ওর ধর্ম- ভালোবাসা বলে কিছু থাকতে নেই? মেয়েবেলার কথা, রতনের সঙ্গে বিয়ে, ---রতনের অসীম ভালোবাসার কথা---থেকে থেকে আঘোনির মনে আসতে শুরু করল। ছোটবেলা থেকে ওর স্বভাব চরিত্র জেনেও গোঁসাইর মা আজ এমন অপমান করবেন বলে সে স্বপ্নেও ভাবে নি। অবশ্য অনেকেই এমন কথা বলাবলি করছিল আঘোনি দূর থেকে শুনে আসছিল। কিন্তু মুখের সামনে কেউ আজ অব্দি এমনটি বলতে সাহস করেনি। কান্না-কাটি, ভাবনা-চিন্তার শেষে শেষরাতে কখন ঘুমিয়ে পড়ল সে বলতেই পারেনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে যে ঘরের দরজা খুলা— বিছানাতে লয়নি নেই। ধড়মড় করে পাটি থেকে উঠে বাইরে বেরুল। বাইরে বেরিয়ে দেখে লয়নি উঠোনে ভেদোর সঙ্গে ঠাট্টা তামাসা করছে। ভেদোকে দেখেই রাগ মাথাতে চড়ল। ঝড়ের মতো গত রাতের কথাগুলো আবার ওর মনে এল। কিচ্ছু না ভেবে আঘোনি মেয়ের চুল মুঠোতে ধরে ধুম ধাম পীঠে কিল বসিয়ে দিল। দোষ কী হল কিছুই না বুঝতে পেরে লয়নি কাঁদতেও ভয় পেল। মেয়েকে যথোপযুক্ত পুরস্কার দিয়ে সে উগ্রমূর্তি ধরে ভেদোর দিকে তাকিয়ে বলল, “সকাল সকাল আমার উঠোনে পা ফেলতে তোদের ডেকে এনেছে কে? আজ থেকে যদি তোরা আমার উঠোনে যদি পা ফেলবি তবে গোঁসাইর শাপ লাগবে বলে দিলাম!” সকাল বেলাতে এতো সব গরম কথা আওড়ে আঘোনির নিজেরই বুক কেঁপে উঠল।

           

ভেদোও সকাল সকাল আঘোনির এই রণচণ্ডীর গর্জন শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে ধপ করে আঘোনির পায়ে পড়ে বলতে শুরু করল, “দিদি! আমার সেদিনের দোষ ক্ষমা কর। আজ থেকে আমি তোমার সেই আগের মতো ভাই ভেদো। এখন থেকে গ্রামের কেউ তোমাকে কিচ্ছু বলতে পারবে না।” আঘোনির মাথা ঘুরতে শুরু করল। সে আর দাঁড়িয়ে  থাকতে না পেরে পিঁড়িতে বসে কাঁদতে শুরু করল। ইতিমধ্যে ভেদো উঠে লয়নিকে কোলে নিয়ে পথে বেরিয়ে গেল। আঘোনি পিঁড়িতে বসেই কান্না চেপে চেপে বসে রইল। এমন সময় উকিলের বাড়ির কাজের ছেলেটি এসে বলল, “দিদি, আজ গরু দুইতে যাবে না? বাছুরটি ডেকেই যাচ্ছে।”  আঘোনির তখন তন্দ্রা ভাঙল।

           

--- “আজ আমার শরীরটি ভালো যাচ্ছে না। আচ্ছা, এখুনি দরজা বন্ধ করে যাচ্ছি। তুই যা।”—বলে দীর্ঘশ্বাস একটা ফেলে আঘোনি ভেতরে ঢুকল।

             

ভেদো ছেলেটি সত্যিই ভালো। কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু দুর্বল মুহূর্ত আসে—তেমন সময়ে অনেকের পক্ষেই নিজেকে সংযত করে রাখা কঠিন হয়। ইন্দ্রিয়গুলো এতটাই ভয়ঙ্কর হয় যে এদের শাসন করতে মনের শক্তি অক্ষম হয়ে পড়ে। তখন হিতাহিত বা ভালোমন্দের বিবেচনা করবার জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। চোখের সামনে থেকে ধর্ম, সমাজনীতি সব সরে পড়ে। পাগল হাতির মতো যেমন ইচ্ছে তেমনি ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন করবার ইচ্ছে জন্মে। প্রবল ঝড়ের মতো সব ভেঙে চুরমার করতে চায়। কিছু ঝড়ের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত সৌম্য মূর্তি ধরে আবার, মানুষেরও তেমনি এক প্রকৃতিস্থ অবস্থা ফিরে আসে। সেই অবস্থাতে মানুষ দেবতা। অনুশোচনা আর অনুতাপে দগ্ধ হয়ে মানুষ আগেকার সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে এগিয়ে যায়। সমস্ত অপমান ও অবমাননা মাথা পেতে নিতে সমর্থ হয়। ভেদোর আজ সেই অবস্থা। জীবনের এক বড়সড় বিপদ থেকে রক্ষা পেল আঘোনি। আত্মীয় কুটুম্ব বিহীনা আঘোনি আজ নতুন করে একটি ভাই পেল।

           

গরিবের জীবনের বিশেষত্ব বলতে কিছুই নেই। কোনোভাবে দিন যেতে থাকল। আঘোনির রূপের জমক আজ গ্রামের ছেলেদের চমক লাগাতে পারে না। আঘোনি বলতে আর কেউ চঞ্চলা যুবতি মেয়ে বলে ভাবতে পারে না কেউ। আজকের আঘোনি এক প্রৌঢ়া, গম্ভীর, রূপহীন গরিব বিধবা। শক্তির ক্ষয় নেই বলে একটি কথা আছে। কিন্তু রূপের ক্ষয় হয় কি না হয় সেই নিয়ে মনে হয় পণ্ডিতেরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নি। আঘোনির রূপের জ্যোতি হ্রাস পেতে না পেতে লয়নিকে সেই আলোতে ছেয়ে ফেলল। সেদিনের ঠুনুক ঠানাক কথা বলিয়ে লয়নি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে উঠল। এটা ওটা করে লয়নি এখন মাকেও বেশ সাহায্য করতে পারে।  বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে সে মাকে ছেড়ে একাই পুরো গ্রামে টো টো করে ঘুরে বেড়াতে সমর্থ হল। গ্রামের কার বাড়িতে কী আছে, কোন ছাড়া বাগিচাতে কী মেলে, দেখতে দেখতে সবই ও আবিষ্কার করে ফেলেছে। মা ওকে ঘর দেখতে বলে লোকের বাড়ি ধান ভানতে বা জল তুলতে যায়—ওদিকে সে তখন টই টই করে গ্রামের কোথায় কী আছে খুঁজে ফেরে। ছাড়া বাগান বলে সেরেস্তাদারদের বাগানে ভরা বয়সের জোয়ান ছেলেরাও যেতে সাহস করে না। সেই বাগানে বুঝি সেরেস্তাদার আর তার দুই ছেলের সৎকার করা হয়েছিল। সেরেস্তাদারের নিঃসঙ্গ বিধবা স্ত্রী এখন একাই এতো বড় বাগানটিকে প্রবল জেদে ধরে রেখেছেন। বাগান থেকে কোনো একটা জিনিস কারো নিয়ে যাবার সাহস নেই। গাছের পাতা একটা পড়লেই সেরাস্তাদারনি টের পেয়ে যান। ভুবি, লুকলুকি, ডুমুর পেকে পেকে নিচে ঝরে পচে পড়ে থাকে। লোকে ভাবে বাগানটিতে ভূত আছে... সেরেস্তাদারনি মারা গেলেও থৈকর গাছে ডাইনি যক্ষিণী হয়ে থাকবে। ভর দুপুরে কোথাও কোনো সাড়া শব্দ নেই। সেরেস্তাদারনি দুপুরের খাবার খেয়ে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। মাঝে মধ্যে বাগিচাতে কীসের বা শব্দ শুনে ‘কে রে!’ বলে হুঙ্কার ছাড়ছিলেন। ঠিক সেই সময় লয়নি হাতে একটি টুকরি নিয়ে চুপ চাপ সেরেস্তাদারনির বাগিচাতে গিয়ে ঢুকল। মনে অপার আনন্দ—এতগুলো থৈকর, ডুমুর পেকে মাটিতে পড়ে আছে --- এগুলো তুলে নিয়ে যেতে কেউ আসে না কেন? ছোট্ট মাথাতে এর মানে কিছুই ঢুকে না, লয়নি থৈকর মুখে পুরে চুষতে থাকল। কত খায় আর কতটা গোটায়? আজকেই সব পারবে না, কালকেও নিয়ে যেতে হবে। কাল মাণিকি আর ছোটো মেয়েদেরও নিয়ে আসতে হবে সঙ্গে। লয়নি ভেবেছিল এই এক টুকরি থৈকর আর ডুমুর দেখে মা বড় খুশি হবে। সন্ধে বেলা মা কখন ফিরে আসবে সেই অপেক্ষাতে থেকে থেকে ওর তর সইছিল না। মাঝে মধ্যে পথে বেরিয়ে মাকে না দেখে ফিরে এসে থৈকর কটা হ’ল, কটা বা ডুমুর হল গুনে দেখে গিয়ে। কয়েকটা গুনবার পরে ভুল হয়। আবার সবগুলো টুকরিতে ভরিয়ে রাখে। সন্ধেবেলা মা এসে টুকরিটা দেখে মেয়েকে জিজ্ঞেস করল,“এই লয়নি! এগুলো তোকে কে দিল?” নিজের গৌরবে উৎফুল্লিত হয়ে লয়নি হেসে বলল,“তুমিই বল তো,কে দিয়েছে?”

           

--- “ কী জানি! আমি কি সর্বজ্ঞ?”

           

মা যথোচিত জবাব দিতে না পারলে প্রবল উৎসাহে লয়নি বলল, --- “ কে দেবে আর? তোমার মেয়েই খুঁজে এনেছে!”

           

অবাক হয়ে আঘোনি জিজ্ঞেস করল, “ তুই এগুলো কার বাগানে পেয়েছিস?”

           

--- “ কার বাগানে আছে আর? সেরেস্তাদারনির বাগান থেকে দুপুরে এনেছি! ইস! সেখানে যে আরো কত আছে--” লয়নির মুখের কথা মুখেই থাকল। মা তার ঘাড়ে ধরে ঝাঁকার দিতে শুরু করল।

           

--- “ পোড়ারমুখি! মরতে যাবার আর জায়গা পেলি না? ভর দুপুরে সেই বাগিচাতে গিয়ে ঢুকলি! জানিস না সেই বাগানে দেওলা আছে!” মেয়েকে ছেড়ে আঘোনি টুকরির সঙ্গে সবগুলো ফল ঘরের বাইরে ছড়িয়ে ফেলে দিল। লয়নির খুব খারাপ লাগল। কিন্তু সেটি মায়ের মার খেয়ে নয়। এতো কষ্টে গুটিয়ে আনা ডুমুরগুলো ফেলে দেবার জন্যেই। মা যদি একটাও ডুমুর মুখে দিত তবে স্বাদ বুঝতে পারত।

           

আর একদিনের কথা। গোঁসাই বাড়ির পেছনটাতে একটা ঝোপ-জঙ্গল আছে। সেখানে খুব করে বন্য করলার গাছ লতিয়ে উঠেছে, তাতে করলা ধরেছেও অনেক। বাজে জায়গা দেখে ছেলে মেয়েরা সেই মুখো হয় না। সেদিন সন্ধেবেলা ভেদোর হালের লাল গরুটি ঘরে আসছে না দেখে সেদিকেই খুঁজতে গেছিল। জটা বাঁধা চুলে এক ছোট্ট মেয়েকে দেখে ভেদোর পুরো শরীর ঝিম ধরে আসছিল। সে এক পা দুই পা করে পিছিয়ে গেল। এমন সময় শুনল লয়নির গলা—“ ও মামা! দাঁড়াও তো, আমিও যাই!”

           

ভেদো চমকে গিয়ে ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, --- “ তুই এই সন্ধ্যাতে এখানে কীসের খোঁজে এসেছিস?”

           

লয়নি কাছে গিয়ে কোচ ভরা করলা দেখিয়ে বলল, “এরকম করলা খুব করে লেগেছে মামা! আজ ছিঁড়ে শেষ করতে পারিনি।  কাল গিয়ে আরো এনে তোমাদেরকেও দেব। কিন্তু ,এদিকে কেন এসেছিলে?”

           

---  “ লাল হালের গরুটি আজ গোয়ালে ফেরেনি। কালকে হাল বাইতে হবে।”

           

--- “হ্যাঁ,তোমাদের লাল গরুটি এদিকেই এসেছিল। আমি আবার যাবার সময় তাড়া দিয়ে নিয়ে যাব বলে ভাবছিলাম।” এইটুকুন বলেই লয়নি জোরে পা চালিয়ে কাছেরই একটা কাঁঠাল গাছের গুড়ির দিকে গেল। ভেদোর ভয় তখনও ভাঙেনি।

           

সে চেঁচিয়ে উঠল, --- “ কই গেল রে লয়নি?”

           

লয়নি গাছের তলা থেকে বলল,“লাল গরুটা এদিকেই এসেছিল। নিয়ে আসছি দাঁড়াও।” ভেদো তাড়া দিয়ে বলল, “এহ! রাত হয়েছে। এখন থাকতে দে! আমি দরজা মেলে রাখব, নিজে গিয়েই ঢুকবে।” ভেদোর কথা শেষ না হতেই লয়নি গরুটিকে তাড়া দিয়ে নিয়ে এল।

           

--- “ কই ছিল?”

           

--- “ আজ কেউ কাঁঠালের ডাল কেটেছিল। তারই পড়ে থাকা পাতাগুলো খাচ্ছিল গিয়ে।”

           

--- “ কাঁঠাল পাতা পড়ে আছে বলে তুই কী করে জানলি?”

           

--- “ আমি আজ দুপুরে আমাদের সাদা ছাগলির জন্যে কিছু নিয়ে গেছিলাম তো।”

           

ভেদো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “দুপুরে তুই এখানে একা এসেছিলি!”

           

---“ আর কার সঙ্গে আসব?” বলে লয়নি পথ ছেড়ে বিপথে যাওয়া গরু ঘুরিয়ে আনল।

           

--- “ কম মেয়ে না তো তুই!”

                                                             *

** *** ***

লয়নিকে যে বিয়ে দেবার সময় এসে গেছে এতদিনে আঘোনির সেই খবরই ছিল না। অবশ্য মা বহুদিন ধরেই আশা করে রেখেছিল লয়নি ভালো দেখে একটি ছেলে নিজেই পছন্দ করে নেবে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে ঘটনাটি ঘটে যাবে ভাবে নি। এই আষাঢ় গিয়ে শ্রাবণে পড়লেই লয়নি মাত্র পনেরো বছরে পা দেবে। এখনই কি ওর বিয়ের বয়স হল? ওর থেকে তিনবছরের বড় ভোলার মেয়েরই দেখি এখন অব্দি কোনো যোগাড়যন্ত্রই নেই। ওর আগেও নেই, পেছনেও নেই---সে একটিই মেয়ে। ওর বিয়ের জন্যে এখনই ব্যস্ত হবার কীই বা আছে? কিন্তু সেদিন সন্ধেবেলা কলঙে জল আনতে গিয়ে ভোগাইর ছেলেবউ জিজ্ঞেস করল, “তাই কি আঘোনি, তোর মেয়ে বুঝি পদোকে বিয়ে করতে চাইছে?”—সেদিনই আঘোনির চমক ভাঙল। পদো যদিও গ্রামের ছেলে, থাকে যোরহাট না গোলাঘাটে। কোনো এক হাকিমের পেয়াদা। এক মাস বা কত মাসের কী জানি ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে। বাড়িতে বাবা-সৎমায়ের সঙ্গে তার সেরকম সদ্ভাব নেই। পদো এসেছে থেকে লয়নির সঙ্গে মেলামেশা সে দেখেছে। সেই বলেই লয়নি পদোকে বিয়ে করতে যাবে, সে মা হয়েও আঘোনি বিশ্বাসই করতে পারে নি। অনেকক্ষণ পরেও ভোগাইর ছেলেবউ উত্তর না পেয়ে বিদ্রূপের স্বরে বলল, “আমাদের সামনে লুকোতে হবে কেন মা? পদো যোরহাট থেকে টাকা পয়সা অনেক এনেছে, সেগুলো কি আর আমরা খুঁজতে যাব? এভাবে চোরের মতো ওর বাড়ি না চলে গিয়ে মাথাতে এক কলসি জল ঢেলে গেলে গ্রামের লোকও খুশি হত।”

 

আঘোনি হঠাৎ কী বলবে ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “ তুই এই কথা কই শুনলি?”

 

ভোগাইর ছেলেবউ ঝ্যাৎ করে জবাব দিল, “ ইস! আমাদের চোখ কান নেই আর কি!”—বলেই কলসি কাঁখে নিজের মুখেই কিছু বিড়বিড় করতে করতে গজগজ করে চলে গেল। যাবার সময় আঘোনিকে সঙ্গ দিতেও বলল না বা নিজেও দিল না।

 

লয়নি যখন পদোর সঙ্গে চলে গেল গ্রামের দশ জনে দশ কথা বলতে শুরু করল। কেউ ভাবল লয়নি বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ের কাজ করেছে। প্রতিবেশীরা বলল,“কাই আর এই কচি মেয়েটি এত ভেবেচিন্তে কিছু করেছে? এই সবই ওর মায়ের কারসাজি। পদো কাজকর্ম করে দুই পয়সা রোজগার করেছে, আঘোনি তাকে যাদু করে মেয়ে গুছিয়ে দিয়েছে।”  পদোর ঘরেও প্রথম কদিন এই নিয়ে খুব হুলস্থূল হল। পদোর বাবা ভেবেছিলেন, -- এই পাখির বাসার মালকিন আঘোনির অবস্থা বেশ ভালো। দুই একপদ গয়নাগাটিও মেয়ের সঙ্গে ঘরে আসবে। যেদিন সন্ধেবেলা লয়নি গিয়ে পদোর বাড়িতে ঢুকল, সেদিন পদোর সৎ মা ওকে ছুঁয়ে কেবল কিল মারতে বাকি রেখেছিলেন। গ্রামের রঙাই মহাজনের মেয়ে মালতীকে পদোর বউ করে আনবেন বলে ভেবেই রেখেছিলেন। মহাজনের বউয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ করে এটা ওটা জিনিস পত্রও আনা নেওয়া করেছিলেন। কিন্তু মাঝ পথে এই যে কাজটি পদো করল---খেতে না পাওয়া, মাথা গুঁজবার ঠাঁই একটুকরো না থাকা আঘোনির মেয়েকে নিয়ে এসে বাড়ি ঢুকল---দেখেই তাঁর রাগ মাথাতে চড়ল। দাঁত কিড়মিড় করে লয়নিকে গালি দিতে শুরু করলেন, “ কোথাকার এই কাল শঙ্খিনী আমার বাড়িতে এসে ঢুকল গো। এমন লজ্জা শরম না থাকা নটেশ্বরী মেয়ে কই দেখেছে কেউ! ভালোয় ভালোয় আমার বাড়ি থেকে না বেরিয়ে গেলে চুলের মুঠি ধরে ঝাড়ু মেরে বের করে দেব, বলে দিলাম। তখন চিনবি এই বুড়ি শাশুড়ি কেমন বেটি।”

 

যাই হোক, পদোর বাবা মানুষটি শান্ত। কোনোভাবে স্ত্রীকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বললেন, “ কী করবে আর? নিজেই যখন এসে পড়ল, এখন গালিগালাজ করতে নেই। ভালোই হল। বিয়ে করিয়ে নিয়ে এলে খরচাপাতির চাপ আমাদের ঘাড়েই পড়ত।”

 

গ্রামের সবাই ভেবেছিল যে আর যাই হোক না কেন, আঘোনি নিশ্চয় পদোর মতো জামাই পেয়ে বেশ খুশিই হয়েছে। কিন্তু কার্যত ঘটল এর উল্টো। বাড়ি ছাড়বার পর থেকে মেয়ের সঙ্গে আঘোনির কোনো সম্পর্কই নেই। একবার উঁকি দিয়ে হলেও মেয়ে আর জামাইকে দেখে আসতে পদোদের বাড়িতে গেল না। লয়নি নিজে দেখে চলে গেল সেই নিয়ে আঘোনির দুঃখ নেই। কিন্তু সে পদোর সঙ্গে না গিয়ে আর কারো সঙ্গে গেল না কেন? পদোকে পছন্দ না করবার অনেকগুলো কারণ আছে। সে বুঝি জেলা শহরে থাকতে মদ ভাং খায়। স্বভাব চরিত্রও মন্দ। গ্রামেই ওর বেশ কিছু বদনাম শুনা যাচ্ছে। শহরে থেকে আচার ব্যবহার একেবারেই বিজাতীয় হয়ে পড়েছে। আঘোনির সবচাইতে বেশি দুঃখ হচ্ছে যে পদো পরের বাড়ির চাকর---যোরহাটে এক হাকিমের বাড়িতে কাজ করে। যে গুণের জন্যে গ্রামে পদো নিজেকে সম্মানিত বলে ভেবেছিল, গ্রামের লোকে যে কারণে তার খাতির করছিল---সেই গুণটিই আঘোনির কাছে পদোকে হীন নিকৃষ্ট করে তুলল। আঘোনি স্বপ্নেও ভাবে নি যে লয়নি এভাবে তাকে কিছু বা বলে কয়ে চলে যাবে। প্রতিবেশীরা লক্ষ করল লয়নি যাবার পরে থেকেই আঘোনির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আঘোনির চুল পাকল। সে বুড়ি হল। আঘোনির অন্তর খুঁড়তে ব্যস্ত শোক শরীর দিয়ে এভাবেই বাইরে বেরিয়ে এল।

 

লয়নি বাড়ি থেকে গেছে এক বছর হবে হচ্ছে করছে। তবু সে একদিনও মায়ের বাড়িমুখো হয় নি। আসবেই বা কোন মুখে? বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সে তো মাকে মুখের একটা কথা বলেও বেরোয় নি। আঘোনি এর ওর মুখ থেকে মেয়ের সংবাদ শুনে। পদো বুঝি আজ অনেকদিন হল বাড়ি আসে নি। টাকা পয়সাও পাঠানো বন্ধ করেছে। গোয়াল ঘর থেকে কুশিয়ার ক্ষেত পরিষ্কারের কাজ সবই লয়নিকে করতে হয়। তারউপরে দিনে রাতে সৎমায়ের গালিগালাজ আছেই। তায় এখন তার শরীর ভার। তাতে কি কাজকর্ম থেকে ছাড়ান পেল? লোকের মুখে কথাগুলো শুনে আর আঘোনি ঘরে বসে নীরবে কাঁদে। ওর লয়নি যাকে খড় একটা ছিঁড়ে দুটি করতে হলে হাহাকার করে উঠত, যে লয়নি শখ করে ঢেঁকিতে পাড় দিতে গেলে মায়ের সহ্য হত না! সেই লয়নি মা বেঁচে থাকতেই পরের বাড়িতে বেগার খেটে হা হুতাশ করে জীবন কাটাচ্ছে। কতটুকুই বা দূর? সে মায়ের বাড়িতে ঘুরে আসতে পারে না? ইস! ওর খবর নিতে আঘোনি যাবে পদোর বাড়ি! হলই বা নিজের বুকের সন্তান। সম্মান না থাকলেও আছে মাতৃত্বের অভিমান।

 

বরুয়ার বাড়িতে ধান ঝেড়ে মাথাতে এক টুকরি নিয়ে সন্ধ্যাবেলা আঘোনি বাড়ি ফিরে এল। আশ্চর্য! ঘরের দরজা খুলেছে কে? ভেতরে ঢুকেই টুকরি নামিয়ে এদিকে ওদিকে নজর ফিরিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। ভাঙা মাচাঙের কিড়মিড় শব্দ শুনে সেদিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে মাথাতে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। এ যে তারই আদরের প্রজাপতি লয়নি!  এতো মানুষের শরীর নয়—এক জীবন্ত কঙ্কাল। নিজের উপরেই খুব রাগ উঠল আঘোনির --- কেন সে এতদিনে মেয়েকে গিয়ে ডেকে আনে নি? এমন কঠোর মা কখনো হয়? লয়নি পাটির থেকে নেমে এসে মায়ের গায়ে পড়ে কাঁদতে শুরু করল। মা-মেয়ে দুজনেই গলা জড়াজড়ি করে চোখের জল ঝরাতে শুরু করলেন। সেই রাতে আঘোনির কুটিরে বাতি জ্বালানো হল না। কেঁদে কেঁদেই মা-মেয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে আঘোনি মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরল। সেই বেষ্টনেই সে মেয়ের সব কলঙ্ক সব অপযশ ভুলে গেল। শিশু কন্যার মত লয়নিও মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দিল।

সবাই জেনেছিল লয়নি বেশিদিন বাঁচবে না। কোনোমতে যদি সন্তানের জন্ম পর্যন্ত বেঁচে থাকে তবেই রক্ষা। আঘোনির কিন্তু মন মানল না। সে মেয়েকে নতুন প্রাণ দিতে উঠে পড়ে লাগল। শহরের বহু চেনা ফুকন কবিরাজের পায়ে পড়ে গিয়ে হুহু করে কাঁদল আঘোনি। ফুকন কবিরাজ নিজের আয়ত্তে যা করবার ছিল সবই করে দেখলেন। কিন্তু যার চাল ফুরিয়ে আসছে তাঁকে ওঝা বৈদ্যের ঔষধে বাঁচাবে কী করে? রিকেটাক্রান্ত শিশু কন্যা একটি জন্ম দিয়ে প্রবল রক্তস্রাবে ভোগে এক মাসের মধ্যে লয়নি যখন চোখ বুজল তখন সেই সংবাদে গ্রামের লোক খুব একটা অবাক হল না। গরিবের ব্যথার কোনো সমব্যথী নেই। মানুষের সহানুভূতি না পেলে বুকের শোক বুকের ভেতরেই গুমরে গুমরে তোলপাড় লাগায়। এত শোকের ঘায়েও আঘোনি বেঁচে থাকল --- খোঁড়া নাতনিকে মানুষ করবে বলে। আশ পাশের লোকজনে বলাবলি করল, “ লয়নি মরল ভালোই হল। কিন্তু এই খোঁড়া মেয়েটিকে ছেড়ে গিয়ে আঘোনির গলাতে ফাঁস লাগাল কেন?”

 

আজকের আঘোনি আগের মতো আর রূপসী নয়। কেউ আজ আর পথে পথে দাঁড়িয়ে ওর লাস্যময় ভঙ্গিমাতে নজর দেয় না। আঘোনি আজ দিদিমা --- ওর এক নাতনি আছে। নাতনির খাওয়া পরার কথা ভাবতে ভাবতেই ও পুরো দিন ব্যস্ত থাকে। লোকের বাড়ি বাড়ি, বাগানে বাগিচাতে ও খুঁজে ফেরে -- নাতনির মুখে দেবার জন্যে ভালো কিছু যদি পায়। লয়নিও একদিন এভাবে পরের বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরে মায়ের পরিতৃপ্তির জন্যে ফল-মূল গুটিয়েছিল। আঘোনি আজ তারই ঋণশোধ করছে।

 

*** *** ***

সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে খা-খবর নিয়ে দুপুর বেলা আঘোনি বুড়ি এসে বাড়ি ঢুকল। বাইরে  ল্যাংড়া নাতনি তখন একা ‘ফুলগুটি’ খেলছিল। দিদিমাকে আসতে দেখে সেও ভেতরে গেল। রিহার(৮) আঁচল থেকে বরুয়ানির দেওয়া সেদ্ধ পিঠার পোটলাটা দিদিমা নাতনির সামনে মেলে ধরল। নাতনি তাড়াতাড়ি সেই আধা ভাজা পিঠা একটা মুখে দিয়ে বলল, “ যা স্বাদ দিদিমা! উকিল দিদিমা আমার জন্যে পাঠিয়েছেন, তাই না? আমি তবে কালকে ওদের ওখানে যাবই যাব।” ওর মুখে তৃপ্তির হাসি ঝিলিক দিল। নাতনির আনন্দ দেখে বুড়ি মনে মনে ভাবল, “ ল্যাংড়া হয়ে জন্মাল ভালোই হল। লয়নির মতো আমাকে আর ছেড়ে যেতে পারবি না।”

 

 

শব্দার্থ

১।আইনাম : লোকদেবীর সম্মানে মেয়েলি লোকগান। বাঙালির ব্রতগানেরই মতো।

২।বরসভা : নামঘরে (বৈষ্ণব আখড়া) অনুষ্ঠিত এক বিশেষ ধরণের কীর্তন গান।

৩। বঙাল : বিদেশি। সাধারণত অভিভক্ত বাংলাদেশ থেকে প্রব্রজিত মানুষ।

৪। পুরা : ধান মাপবার স্থানীয় একক।

৫। ভাওনা: লোকঅভিনয়কলা। ধর্মীয় যাত্রা পালার অনুষ্ঠান

৬। তামোল : তাম্বুল। সুপারি। কিন্তু ভেজা সুপারি।

৭। ডবা : নামঘরে ব্যবহৃত এক বিশেষ ধরণের বাদ্য। অনেকটাই তবলার বাঁয়ার মতো। কিন্তু বাজাতে কাঠের কাঠি ব্যবহৃত হয়।

৮। রিহা: অসমিয়া মহিলার পোশাকের অংশ বিশেষ। ওড়না বা উত্তরীয়ের মতো গলায় পরা হয়। বাংলাতে একে কাঁচলি