সাহিত্য পত্র - ৩

গল্প - মোহর
শর্বরী পাল (করিমগঞ্জ, আসাম) 
২২ নভেম্বর ২০২০

মাস্টার বিনয় ভূষন মুখার্জী, মেট্রিক পাশ৷ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাগুরু৷ যিনি রোজ রাতে ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এক টাকার টিউশন পড়াতেন৷ আর দিনে ছাত্ররা স্কুলে না গেলে ছাত্র পাঠিয়ে ধরে স্কুলে নিয়ে যেতেন৷ উনার পাঠশালার পড়ার জন্য বহু দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসত ছাত্রছাত্রীরা৷ ছাত্র ছাত্রীদের স্কুলে টানতে কখনো নৃত্যের তালে আবার কখনো বা আনন্দদায়ক কবিতার ছন্দে নেচে পড়াতেন৷ মূখার্জী বাবুর ছেলে বিদেশে চাকরি করে৷ বছরে একবার আসে৷ কখনও আবার কাজের চাপে আসেও না৷ মা-বাবাকে দেখার সময় পায়না৷ ভালো চাকরি করে বলে কথা! উনাদের দেখার সময় কই? বিনয় বাবুর ওকে নিয়ে খুব গর্ব!
               

পাড়ার মোড়ের রকে বসে আড্ডা জমতো একদল যুবকের৷ এক দাদুর টঙ্গী দোকানের সন্মুখে৷ সে সময়ে স্কুলে বিনয়বাবুর টিফিন চুরি করে খাওয়া মোহর আজ সেই আড্ডাবাজদের সর্দার৷ কত কিছু না বিষয়, তাদের আড্ডার৷ রাজনীতি থেকে ক্রিকেট, ফুটবল, কৈশরের প্রেম থেকে সিনেমার গল্প, ও সমাজসেবা৷ সাথে মাটির ভাঁড়ের গরম চা আর তেলে ভাজা মুড়ির সাথে পকোড়া৷ সেই স্বাদের তুলনা নেই৷ ধূমপানও যে সাথে যোগ ছিলনা এমনটা কিন্তু নয়৷ বিনয় বাবু প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘর থেকে বেরোলেই ওদের দিকে আড়চোখে দেখতেন আর বিড়বিড় করতেন৷ এই বখাটে হতচ্ছাড়া গুলোকে নিয়ে আর পারা যায় না৷ শনির মতো গেঁড়ে থাকে৷ ননসেন্স!
               

মোহর সোশ্যাল ওয়ার্ক এর স্নাতক৷ পরিবার নিম্নবিত্ত, তাই আর মাস্টার্স টা করতে পারেনি৷ বর্তমানে মাঝেমাঝে সরকারি প্রকল্পের ছোট ছোট কাজগুলো করে৷ দেশ ও দশের সেবা ও পরিবারের যোগান দেয়৷ আর বাকি সময় নিজের দলবল নিয়ে সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া লোকদের মধ্যে সজাগতা সৃষ্টি করে হাসি ফোটানোর দায়ভার যেন সম্পূর্ণ ওর৷ আর এই অতিমারীর সময়কালটা যেন ওর কাছে "মুক্তহস্তে ভগবানের দান৷" সমাজের প্রতিটা লোকের ছোট থেকে বড় সবার যেন ও প্রাণপ্রিয়৷ শুধুমাত্র আপন করতে ব্যর্থ হলো বাবাতুল্য মুখার্জি স্যারকে৷ কারণ উনার কাছে ও হচ্ছে পাড়া ঘুরে বেড়ানো মা-বাবার বেকার সন্তান৷ 
               

পুরো বিশ্বজুড়ে মহামারি করোনা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, পুরো দেশে লকডাউন, তখন অনেকেই রোজগারহীন৷ এই সংকটকালে, রোজগারহীন, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন জোগাতে মোহর এক পায়ে দাঁড়িয়েছিল দলবলসহ৷ লোকেরা ভালোবেসে ওদের দলের নাম দিয়েছিল "দেবদূত" ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে ওষুধপত্র, প্রয়োজনীয় জিনিসের যোগান দেওয়ার জন্য ওরা দিনের ২৪ ঘন্টাই তৈরি থাকতো৷ সংকট কালের জন্য একটি ফ্রি সার্ভিস সেন্টার ও খুলেছিল ১০৩ নম্বরের৷ অন্ধকারে আশার আলো হয়ে মোহর ও তার টিম নিজের জীবনকে বাজি রেখে সমাজ ও দশের স্বার্থে এগিয়ে আসতে সর্বদা তৎপর ছিল৷ যখন করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া লোকদের অন্তিম যাত্রায় কেউ এগিয়ে আসেনি, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওরা এগিয়ে এসেছিল বারবার অন্তোষ্টিক্রিয়া কাজ সম্পাদন করতে৷ সত্যিই, দেবতার মত দাঁড়িয়ে সকলের হয়ে লড়াই করে চলেছিল অবিরত এক অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে৷
               

একদিন রাত দশটা নাগাদ হঠাৎ ফোন এল মোহরের ১০৩ (জরুরী কালীন) নম্বরে৷ মোহর কথা বলে জানতে পারল মুখার্জীবাবুর স্ত্রীর ফোন৷ লক ডাউন এর জন্য উনার ছেলে বিদেশে আটকে আছে৷ আর ও জানিয়ে দিয়েছে যে করোনা না সাড়া পর্যন্ত ওর আসা সম্ভব হবে না৷ এখানে মুখার্জিবাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ তাঁকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না৷ কারন উনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে হয়তো উনি করোনা আক্রান্ত আর তাই পরিবারের লোকেরাও এগিয়ে আসছে না৷ এই বিপদের সময় যখন উনি কাউকে পাচ্ছিলেন না, তখন খবরের কাগজ ঘেঁটে বার করলেন জরুরিকালীন নম্বরটা৷
               

মোহর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল খুবই ভালো করেছেন ম্যাডাম৷ আমাদের তো কাজই এটাই৷ আপনি অপেক্ষা করুন আমি এখনই আসছি৷ 
             

ঠিক আধাঘন্টা পর মোহর মুখার্জী স্যারকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে টেস্ট করালো এবং ম্যাডামকে বলল, যদি টেস্ট রিপোর্ট পজেটিভ আসে তবে আমাকে কল করবেন আমি আবার এসে নিয়ে যাব৷ শুধু এটাই নয় ও আরও বললো যে, যদি আশেপাশে এমন রোগী থাকে তবে ওকে খবর দিতে৷ ও যথাসম্ভব উপস্থিত থাকার চেষ্টা করবে৷ 
               

তিন/চারদিন পর মুখার্জী স্যার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেন যদিও ওনার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল আর মোহর মাঝখানে এসে একদিন উনার খোজ-খবর ও নিয়েছিল৷
               

এ'কদিনে মুখার্জী স্যার মোহরকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন এবং একদিন তাকে ডেকে পাঠালেন৷ মোহর আসার পর ওর হাতে একটি ডায়রী ও তার প্রিয় কলমটি তুলে দিয়ে বললেন-----
               

আমি আগে তোকে অপদার্থ ভাবতাম৷ তুই ভালো চাকরি করিস না বলে৷ আজ তোকে দেখে গর্বে বুক ভরে যাচ্ছে এই ভেবে যে তুই আমার ছাত্র কেন হলি? আমার ছেলে হয়ে জন্মালি না কেন? যে এমন এক পরিস্থিতিতে পাশে দাঁড়াতে পারে, মানুষকে সাহায্য করতে পারে, সে দেবদূত ছাড়া আর কিছু হতে পারে না৷ তোর নামটা কে রেখেছিলো জানিস? তো বাবাকে জিজ্ঞেস করবি৷
             

মোহর খুশি খুশি  বলে উঠলো, মা বলেছে আপনি রেখেছিলেন স্যার৷ 
             

হ্যাঁ রে বাবা, সেদিন রাত আটটা৷ চারদিক কালো করে কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডব৷ তোর বাবা বৃষ্টিভেজা গায়ে কাঁপতে কাঁপতে এসে হাজির আমার বারান্দায়৷ ঠাঁই হয়ে দাঁড়াতে পারছিলো না৷ খুশিতে কাঁদতে কাঁদতে বললো আমার ছেলে হয়েছে মাস্টারমশাই৷ আমার ছেলে হয়েছে৷ আপনিই এর একটা নামকরণ করুন৷ ঘন্টাখানেক অভিধান ঘেঁটে বের করে দিয়েছিলাম তোর নামটা৷ "মোহর অর্থাৎ দামি স্বর্ণ মুদ্রা"৷
               

কলমটা তুলে রেখেছিলাম ভেবেছিলাম আমার ছেলেকে দেবো কিন্তু আজ তার সম্মুখে ওকে আমার নগণ্য বলে মনে হচ্ছে৷ তাই তার হাতে তুলে দিলাম৷ এই পৃথিবীতে তোর মতো লোকের অনেক আবশ্যক রে৷ দীর্ঘজীবী হয়ে বেঁচে থাক বাবা এই সমাজের তরে লক্ষ কোটি বছর৷ ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করি৷

Marble Surface

ঈশানের যোগাযোগ

Marble Surface

ঈশান কথার ঠিকানা

BANIPARA

SILCHAR - 788001

ASSAM , INDIA

PHONE : +91 6002483374, 7002482943, 9957196871

EMAIL : ishankotha@gmail.com

Facebook Page : 

https://www.facebook.com/ishankotha

Marble Surface

ঈশান কথায় লেখা পাঠাতে হলে

  1. Whatsapp your Writeup (in Bengali or English) in any of our phone numbers

  2. Email your Article written in MS Word (no pdf file / no image file) in our email id

  3. For Bengali Articles, write with AVRO Software or use any Bengali Unicode Font for Writing in MS Word (No STM software)

  4. You can send the Articles in Bengali or English in Facebook Messenger also to any one the IDs of - Joydeep Bhattacharjee / Krishanu Bhattacharjee / Chinmoy Bhattacharjee /  Page of Ishan Kotha "m.me/ishankotha"

  • Facebook
  • Twitter
  • YouTube
  • Pinterest
  • Instagram
Give Us Your Feedback
Rate UsPretty badNot so goodGoodVery goodAwesomeRate Us

© 2020-21 Ishan Kotha. Site Developed by Krishanu's Solutions