সাহিত্য পত্র

গল্পের পাতা ৭ - স্বাধীনতার সুর


শর্বরী পাল
১৫ আগস্ট ২০২১

 

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমাদের গল্পের পাতার ৭ নম্বর গল্প হিসেবে প্রকাশিত হল

করিমগঞ্জের গল্পকার শর্বরী পালের ছোট গল্প "স্বাধীনতার সুর" 

Shorbori Paul.jpeg

বছর তেরোর মেধাবী বর্ণীল দাদুকে বায়না ধরলো স্বাধীনতার উপর একটি নাটক তৈরী করে দিতে৷ কারন, স্কুল থেকে টাস্ক দিয়েছে ভিডিও করে অনলাইন পাঠাতে হবে৷ না করলেই নয়৷

 

রিটায়ার্ড কর্ণেল দাদু এবারে পুরো ফেঁসে গেলেন৷ স্বাধীনতার আগের দিন দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়া সেরে বসলেন ওকে নিয়ে৷ বর্ণীলকে জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা বলতো আমরা প্রতিবছর কেনো স্বাধীনতা দিবস পালন করি?

 

বর্ণীল গর্বের সহিত বললো বাঃ.. রে সেই যে তুমি ছোটোবেলা বলেছিলে আমার পুরোটা মনে আছে তো ....

ভারতমায়ের বীর সন্তানদের অনেক লড়াই-যুদ্ধ-শ্রম-পরিশ্রমের পর, ভারতের বহু মায়ের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য দেওয়া বহু বীরের বহু আত্মবলিদানের ফলস্বরূপ আমরা ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট ইংরেজদের পরাধীনতার সেকল থেকে মুক্তি পেয়েছি। সেদিন থেকেই পুরো দেশ প্রতিবছর ১৫ ই আগস্ট তারিখে স্বাধীনতা দিবস হিসাবে উদযাপন করে৷ 

দাদু : বাঃ...বেশ বলেছো৷

বর্ণীল : তবে জানো দাদুভাই বড় হওয়ার সাথে সাথে আমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগে৷এই যে আমরা প্রত্যেকে বলি "আমরা স্বাধীন"৷ এই মুখে বলা স্বাধীন কথাটির মধ্যে "স্বাধীনতাটা কার ??" এই পরাধীন ভারতে আমরা আদৌ কি স্বাধীন?? আরও অনেক প্রশ্ন....


দাদু : তাহলে তোমার মনে অনেক প্রশ্ন, অনেক জিজ্ঞাসা৷ আচ্ছা শুনো দাদুভাই আমরা তবে দৈত নাটক করতে পারি৷ তোমার বাবুকে বলবো ভিডিও করতে৷ বাবু রেডি করে স্কুলে পাঠিয়ে দেবে৷

বর্ণীল : আচ্ছা, হবে৷ আমাকে এখন কি করতে হবে বলো ??

দাদু : তাহলে আমি সাজবো স্বাধীনতা আর তুমি সেই ছোট্ট খোকা যার মনে হাজার হাজার প্রশ্ন৷ তুমি আমাকে প্রশ্ন করবে আর আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো৷ চলবে তো ??

বর্ণীল : (হেসে)চলবে বৈকি আলবাৎ চলবে৷

             🌼নাটক🌼

( দুজন দৈত নাটক পরিবেশনার জন্য তৈরী হলো )

খোকা : আচ্ছা স্বাধীনতা! তুমি কেমন আছো? তোমার তো অনেক বয়স হয়েছে মনে হচ্ছে!

স্বাধীনতা : হ্যাঁ, এবার যে ৭৫ এ পড়তে চললাম৷ কিন্তু...

খোকা : কিন্তু কি??

স্বাধীনতা : না, এটাই ভাবছি, প্রতি বছর পুরো ভারতের লোক কত ধূমধাম করে আমার জন্মদিন পালন করে৷ কিন্তু এবারও করোনা মহামারির জন্য সব ই তো ভেস্তে গেলো৷ এবার কেউ আমায় মনে রাখবে কি না তাও জানি না৷ তবে তুমি আমার বয়স কেনো জিজ্ঞেস করছো খোকা??

খোকা : কেনো জিজ্ঞেস করছি? না, তোমার দেখে মনে হচ্ছে যে তুমি কানে শুনতে পাও না, চোখে ও দেখতে পাও না, চেহারা তো পুরো শীর্ণ হয়ে গেছে,পুরো শরীর কাঁপছে ঠকঠক করে৷

স্বাধীনতা : তুমি আমাকে কি বলতে চাইছো খোকা ?

খোকা : কেন! তুমি ‌কি এতটাই বোকা যে বুঝতে পারবে না?

ঐ যে তোমার হাজার হাজার সন্তান প্রতি বছর অনেক টাকা-পয়সা খরচা করে তোমার জন্ম দিন পালন করে খাবার নষ্ট করে অপরদিকে তোমার আরোও কত ছেলেমেয়ে শিক্ষিত, শরীরে সামর্থ থাকা সত্ত্বেও না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় চাকরীর অভাবে! এমনটা কেনো??

তোমার কয়েক হাজার মেয়ে বিবাহ যোগ্যা, শুধুমাত্র জাত-পাতের দোহাই দিয়ে কোনো সুপাত্র ই যে ওদের বিয়ে করতে চায় না! আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বর্ণ বৈষম্য ও জাতিভেদ বিদ্বেষ টা এখনো বজায় আছে তাহলে ??


দেখো দাঁড়িয়ে তোমার ফুটপাতে থাকা খুদে শিশুরা প্রবল বর্ষায় মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, পেটে ভাত নেই৷ বাসস্থান এর অভাব আর পেটের খুদা ওদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে দিন-রাত৷ এরা তো আজও ফুটপাতে পড়ে আছে৷ এরা কি তাহলে স্বাধীন হতে পেরেছে??

আরে, আরে, এ কি স্বাধীনতা তোমার চোখে জল!

তুমি কিন্তু আমার উপর রাগ করো না৷ আমার জন্য কি তোমার মন খারাপ হয়ে?? আমি কি অবাস্তব কিছু বলেছি??

স্বাধীনতা : না, মানে তোমার কথা শুনে বুক ফেটে যাচ্ছে৷ তুমি যে শুধু ওদের কথাই বলে যাচ্ছ, মন খারাপ হবে না আমার ?? কেউ আমার মনের কথা ভাবে ??

তাহলে শোনো, তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না
আমার শহীদ সন্তানরা ও আজ কাঁদছে, সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী যারা দেশের জন্য নিজের জীবনকে বলিদান করেছে, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি তারা কি ভাবে , দিনের পর দিন অত্যাচারিত হয়ে জেল খেটে , ফাঁসির দড়িতে ঝুলে, জীবন দিয়ে আজ চিৎকার করছে আর বলছে এই স্বাধীনতা আমরা চাই নি ,এই স্বাধীনতা আমরা চাই নি!!

 

আরে খোকা, কাঁদিস নে, শোন, তবুও আজ আমি আশাবাদী, বর্তমানের দিকে তাকিয়ে, আমি সৃষ্টি কর্তা কে বলবো ওদের তুমি মানুষ করে তুলো, আমার নেতাজির মতো সৎ, সাহসী ও বুদ্ধিমান, বিবেকানন্দ মতো নির্ভীক, দয়ালু ও তেজস্বী, খুদিরামের মতো আত্মবলিদানি, গান্ধীর মতো অহিংসাবাদী, রবি, নজরুলের মতো গুনী৷

রবি ঠাকুর বলতেন------

""যদি প্রেম দিলে না প্রাণে 
  কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে
  এমন গানে গানে""

যারা প্রতিবছর জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে আমার জন্মদিন ঘটা করে পালন করে তাদের মনে যদি একটুখানি ভালোবাসা থাকতো, তবে আজ আমার আর আমার সন্তানদের কি এই অবস্থা হতো??

খোকা : তবে তুমি মানলে তো আজও আমরা শোষিত আমাদের দেশের ই কিছু অমানুষ শোষক দলের ঘোরপাকে বন্দী হয়ে৷

স্বাধীনতা : (হতাশা হয়ে) হ্যাঁ,রে খোকা এই মুক্তির স্বাদ আমাকে যে আজও কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে ...

তবে আমি তোমাকে এটা বলবো তুমি স্বাধীনতা দিবস হোক আর নাই বা হোক একজন মানুষ হিসেবে তোমার কর্তব্য পালন করে যেও৷ তুমি তো ছোটো, তোমার সাধ্য মতো যা করতে পারো৷ যেমনটা তোমার বাবা প্রতি বছর এ অঞ্চলের গরীব-দুঃখীর পাশে দাড়ায়৷

খোকা : ঠিক আছে৷ আমি কথা দিলাম৷ আমি যতটা পারি ওদের পাশে দাড়ানোর অবশ্যই চেষ্টা করবো৷ 

স্বাধীনতা : আমার আশীর্বাদ তোমাদের সাথে আছে৷

বর্ণীল : প্রণাম স্বাধীনতা৷

    🌼 (নাটক সমাপ্ত)🌼


দাদু : খুশি হলে তো এবার৷ 

বর্ণীল : হ্যাঁ ,দাদুভাই খুব খুশি৷ বাবা কে লক্ষ্য করে "বাবা তুমি আমার ভিডিও টা রেডি করে স্কুলে মিস্ এর কাছে একটু পাঠিয়ে দিও প্লিজ৷

পরদিন সকাল সকাল উঠে বর্ণীল সহ পরিবারের সবাই তাদের এলাকায় জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে পতাকা উওলোন করলেন৷ কর্ণেল দাদুর মুখে স্বাধীনতার কাহিনী তথা ভাষন শুনে পুরো এলাকা বাসীর গা কাটা দিয়ে উঠলো৷ বক্তৃতা শেষে উনি ও উনার পরিবার ১০০ টি পথশিশু দের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করলেন৷ সবকিছু শেষে বর্ণীল খুব খুশি হয়ে দাদুর হাত ধরে টানতে টানতে বাড়ীর পথে রওয়ানা হলো৷