সাহিত্য পত্র

কবিতার খাতা - ১
১৩ জুন ২০২১
 

ঈশানের ১৯ নম্বর কবিতার খাতায় এবারে আমরা নিয়ে এসেছি কবি চিরশ্রী দেবনাথ-এর এক গুচ্ছ কবিতা...

চিরশ্রী দেবনাথের জন্ম ত্রিপুরা রাজ্যের কৈলাসহর নামের একটি ছোট শহরে।

বাবা রাধাগোবিন্দ মজুমদার সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন এবং মা মায়ারাণী মজুমদার। দুজনেই প্রয়াত।

তিনি আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্হান অধিকার করেন।

বর্তমানে শিক্ষকতা করেন। ছোটবেলা থেকেই লিখতে ভালবাসেন, ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি।

বিভিন্ন লিটিল ম্যাগাজিনে ও দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেন।

পেয়েছেন ত্রিপুরা সরকারের অদ্বৈত মল্লবর্মণ ছোট গল্প প্রথম পুরস্কার,

স্রোত সাহিত্য প্রকাশনার ছোটগল্প পুরস্কার,

ত্রিপুরা সরকার তথ্য আয়োগ দপ্তর কর্তৃক আয়োজিত প্রবন্ধ  প্রতিযোগিতায় প্রথম  পুরস্কার।

২০১৯এ, সুমিত্রা কর তরুণ লেখক সম্মান পেয়েছেন।

তার লেখা ছোটগল্প, "ব্যারনফিল্ড" অবলম্বনে শর্ট ফিল্ম তৈরি করেছেন কলকাতার রত্নদীপ রায়।

যা নাইজেরিয়ার ইন শর্ট চলচিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

এছাড়া  "কীর্ণকাল" নামে একটি লিটিল ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করছেন চারবছর ধরে।

তিনি বিশ্বাস করেন কবিতা আত্মার সঙ্গে মিশে গেলে আর ফেরা যায় না ...

অন্তরা

পৃথিবীর বুক থেকে চলে গেছে বিষণ্ণ উৎসবের পরিক্রমা

ঘাসের মুখে জমে আছে শিশির, কুয়াশার ফেস্টুন,

দু একটি বিলুপ্ত প্রায় কাঁচপোকার ভাঙা পিঠ 

সকলের মনের বিষাদ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো জেগে উঠেছে

মৃত্যুর মিছিল তাকে ফাঁসের মতো চেপে ধরে

ভেতর থেকে টেনে আনছে অহং, 

আমাদের অসহায়তা থেকে কবিতা হচ্ছে, গানের ধুন।

বলিনি একবারো কবিতা শুনতে হবে,

গান শুনে দিতে হবে হাততালি

ব্যথায় নীরব হয়ে থাকাকে অক্ষরের রূপ দিলাম 

ধুলো হয়ে উড়ে যাবে বলে তারা সংগ্রহ করেছে

ঘর ফেরত পাখির গান, 

মাছরাঙার ঠোঁট থেকে চুরি গেছে অপেক্ষার রোদ

এই অসময়ে যারা ভালোবেসেছে, প্রলাপ লিখেছে 

তাদের উষ্ণতম সংলাপে,

মোমবাতি জ্বলে উঠছে, নীলাভ আবহ

কোথাও প্রদীপের তেল গড়িয়ে আঠালো করে দিয়েছে

সম্পর্কের ধোঁয়াশা

আমাদের কান্নার ভেতরে যে আলো আছে, 

সেই আলো দিয়ে জ্বালিয়ে দিও কেউ বেঁচে থাকার রঙ, 

উদ্ভাস আনো, আনো সমৃদ্ধির দরখাস্ত

মানুষীর হৃদয়ে আসন পাতা আছে ,

কুশ থেকে ঝরছে রক্তধারা,

নদীপ্রান্তরের কাদামাটিস্তূপে জননের প্রস্তুতি, 

তার করতলেই তোমার প্রিয় সুবাস,

স্বার্থপর আকুতি, হরিয়াল পাখির ঠিকানা। 

বাবা

হাফ হাতা সাদা ঘেঁষা শার্ট, বগলে ব্যাগ, ছাতা

আমাদের কারো কারো  বাবা এমনিই  ছিলেন

কালো অথবা ফর্সার কাছ থেকে ফিরে আসা 

বাবার খুলে রাখা চশমা খাপে মেলাতে গিয়ে দেখি

কাচে লেগে আছে আস্ত এক নদী অববাহিকা,

স্বপ্নের ঘরবাড়ি আঁকা সেখানে, আমার গন্ধে ভরা।
 

 

 
কাল্পনিক

ইংরেজী সে জানে ভালো

তুখোড় একদম, যেন সহজাত

শুধু কাঁদতে এলেই, বাংলায় কাঁদে

আমাকে সে বাংলায় ভালোবাসে


হিন্দিতে তার খিস্তি খুব

শুধু অভিমান হলে নীচের দিকে চোখ 

আমাকে দেয় হলদেটে লাইন

ঋতুময় বিষাদ আর শান্ত চোখ 

 

তার সঙ্গে সংঘাত হয়, ইংরেজিতে গালি,

তারপরই মুখ চেপে ধরা আর নীলচে জামদানি,

চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে রাঙা ধুলো বালি 

আমরা বাংলায় মুছে দিই আমাদের জেদ 

ঘনিয়ে আসে বিকেলবেলা, গোধূলির ছাই

তার সঙ্গে পাগলামো হয়, বিষাক্ত শর্তাবলী

সবকিছুই লেখা হয় যেন অন্য ভাষায়

যে ভাষায় তাকে চিনি না আমি

তারপর জল কাদায় মাখামাখি 

বাজে বর্ষা, গরম, মশা মাছি

পলাশের মতো আলো জ্বলে ওঠে

বাংলায় আলপনা দিতে বসি, 

ঠারেঠোরে অপরাধ ভুলি

জানান দিই আমি তাকে

বাংলায় ভালোবাসি,

বাংলাতেই এই মাখামাখি। 
 

 

 
 
বিনীত

পৃথিবী শান্ত হয়ে যাক, বাজুক মুগ্ধ দোতারা

তুমিও চিনেছো আমাকে, আমিও তোমাকে

জেগে উঠেছে বিস্ময়, সবুজ সন্ধ্যা ও শহর

তুমিও কি বিশ্বাসপ্রবণ, ভালোবাসার মতো

যারা ঠকে গেছে বলে আফসোস করে

তাদের দিলাম বাগান, আগাছা আর জলের কুঠার

রক্ত থেকে উষ্ণতা চলে গেলে মানুষ নীচু হয়

কুড়োতে শেখে, দেখে পথে পড়ে রয়েছে তার ঔদ্ধত্য

যারা যারা চলে গেছে ধুলোপথে, রেখে গেছে ঝিনুক

তাতে পা কেটে গেলে, ভেতরে সূর্যাস্ত শুধু নীরব, কাতর

 
 
 
অভিমান নেই

যে কথা গুলো বলা হয়েছে, সেগুলো না বললেও চলত

আমি যা বলেছি, গিলে ফেলা ভালো ছিল

তবুও বলেছি কম, সাহস ছেড়ে গেছে কবে আমাকে

এখন ভঙ্গুর সময়, সব সংঘর্ষ থাক অপঠিত,

ধুলোমাখা বিকেলের ভীতু ইতিবৃত্ত 

হয়তো কিছু গুমরাহ, কিছু মাথা নীচু

আত্মসম্মানই তো শেষপর্যন্ত সবচেয়ে বড়

আর যা কিছু পোড়ামাটির মন্দির, অনাদৃতা কেউ

কখনো মুছে দিয়েছি পর পর সেতারের শব্দ

তারপর আর মুছিনি, ছড়ে যাওয়ার কষ্ট ভালো লাগে

যাবতীয় লিংক, কপিরাইট দু এক টুকরো অঙ্গারের মতো

কোনো হিংসে হয় না আমার, 

চলে যাওয়ার সময় হলে নীরব থাকা ভালো 

গ্রামের পাশের নিরীহ ধানক্ষেত এমনই হয়

দূর থেকে দেখে...

একান্ন পীঠের অভিমান তার জন্মগত, 

যজ্ঞসমিধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, উন্মুক্ত হয়েছে ঠোঁট, 

জ্বালিয়ে রেখেছি কিছু ক্ষুধা আর আলো ...

ভেবে নিতে পারো এটাই দীর্ঘতম

 

 
 
বয়ঃসন্ধির ত্রিপুরা

....................... (শনিবার, 2/04/2016, ভেলোর )


বেটলিং শিবের চুড়োয় দাঁড়িয়ে

আমার পুরুষ ধনুকে ছুঁড়েছিল তির, 

এ তির বর্ষণোন্মাদ, অভ্রখাদক

ঝরে ঝরে পড়ছে কাচঝর্ণা, শামুকবাহার, 

ক্ষীণতনু শরীরী আহ্বানে জেগে যাওয়া জুমপ্রেম

সঙ্গমে সঙ্গমে মুছে দিতে চায় জাতির আগে 'উপ '

একটি জারজ অশরীরী ছায়া অর্কিড

নাগকেশরের স্বর্ণালী খোপে সম্ভুত বিরল প্রাণ, 

ধীরে..ধীরে...ধীরে... ছড়িয়ে পড়ছে 

আঠারোমুড়া, দেবতামুড়া, 

লংতরাই আর ঊনকোটির... ছায়াপাথরে, 

কষ ঢেলে ঢেলে বড় হওয়া 

রাবারের জারিত রূপবাহারে 


বুদ্ধপূর্ণিমায় ভেসে যাওয়া অবলোকিতেশ্বরে, 

তোমার সঙ্গে আমার বাঁশবন বিকেল, চংপ্রেং সুর,

কলাপাতায় গলানো বিরন ভাত, লাল লঙ্কা 

একটি মনখারাপ পরিযায়ী পাখি

বাস্তু খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনে 

ডম্বুরের মেঘমন্দ্র ডুবন্ত কান্না,

ছবিমুড়ার উদাসী জেগে থাকা ঝুলনপূর্ণিমা 

রিয়ার সুতোয় সুতোয় বুনতে থাকি

রুদ্রসাগরের রাজকুমারী জলপোশাক 

একক রাতে নীরমহলে হজাগিরি পায়ের খেলা,

আমায় দিও তুমি চূর্ণ খারচি মন্ত্র, একটু দেবীরং

পৌষের ব্রহ্মচারী সকালে 

কিছু রোদ রেখো শিবকুন্ডলে 

পিতলের পাত্রে জমুক

তোমার আমার পবিত্র তীর্থমুখ

জঙ্ঘায় বাজতে থাক মনিপুরী মাদল, 

বাঁশীতে রাখাল নাচ...মাছের সরসরে অনুভবে

আমার শরীরে চা গন্ধ, পাহাড়ি হরিণের অম্লপ্রেম 


রাজমালার শ্বেতপাথরে...আমার প্রেমিক

ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেয় তির,

ভেসে ভেসে তারা ঊনিশ রঙা মেঘবালিকা

সবুজ পাড়ের একটি গোমতী শাড়ি 


রাজন্য ত্রিপুরা বহুদিন হেঁটে গেছে বারুদপথে,

রেশমগুটির গর্ভাশয়ে উষ্ণতায় দহনযন্ত্রণায়


কাঁঠালবীচির সারিপথে আলস্য মেখে আজ

একটুখানি ঘুমিয়ে নিচ্ছে জানকি ত্রিপুরা, 


স্তনভারে ফুটে আছে জম্পুইের কমলা ভোর, 

মনুনদীর শীতচরে, পা মেলাচ্ছে মামিতাং দুপুর 


উষ্ণ ঝর্ণায় গা ভিজিয়ে মা গো আমিই তোমার

বয়ঃসন্ধির গনতান্ত্রিক জুমিয়া মেয়েটি 

 
সন্ধ্যা 

এই তো আমি খুলে দিলাম সন্ধ্যা /

নক্ষত্ররা এসো, এখানেই হোক তবে আড্ডা/

প্লেটের ঢালে ক্লান্ত পাপড়, একটুখানি ঠান্ডা চা/

তোমার মতোই কিনেছে সে একমুঠো বিষন্নতা/

এমন করে তাকাও যেন আটলান্টিকে ডুবছে জাহাজ/

রাস্তা হারানো সাইকেল এক, দেয়াল জোড়া তুচ্ছতা /

তোমার ছায়ায় লেপ্টে আছে ক্লাসফাঁকি অন্যমনস্কতা/

আমিও যুবক এক, পকেট ভর্তি হতাশ জিজ্ঞাসা/ 

তবু জানি ভাঙা মাস্তুলেই থাকে চোরাবালি, ফিরে আসার ঠিকানা। /