সাহিত্য পত্র

"বাগান কুঠির রহস্য"
ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব ২)
হিমু লস্কর 
২৫ জুলাই ২০২১

এখন পর্যন্ত 
-------------------

প্রবল ঝড়জলের রাত। শহরময় জল। বাড়িতে মনখারাপ করে বসে আছে সৌম্য। হঠাৎ একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এল তার মোবাইলে। ফোন করেছেন বিক্রমপুর চাবাগানের ম্যানেজার কিংশুক রায়। রাতেই তিনি সৌম্যর সঙ্গে দেখা করতে চান। কারণ জিগ্যেস করতে জানা গেল, বাগানে পরপর তিনটে খুন হয়েছে। এরমধ্যে আবার বিকেল থেকে শ্রমিক সর্দার শম্ভু বাগদি নিখোঁজ। সবমিলিয়ে বাগানে ছড়িয়েছে প্রচণ্ড আতঙ্ক। এসবের মাঝখানে বাগান মালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরী এমন কিছু জানতে পেরেছেন যে, নিজেকে প্রচণ্ড অসুরক্ষিত মনে করছেন তিনি। সৌম্যর সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন তাঁরাচাদবাবু। তাঁর চিঠি নিয়ে দুর্যোগপূর্ণ রাতে বিক্রমপুর থেকে শিলচরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন কিংশুক ...

 

 

পড়তে থাকুন ঈশান কথা'র ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস "বাগান কুঠির রহস্য"

লিখছেন বরাকের পরিচিত লেখক, সাংবাদিক হিমু লস্কর

প্রকাশিত হল পর্ব ২ ...

Himu Laskar_edited.jpg

 পর্ব ১ 

 

বঙ্গোপসাগরে হয়তো ফের নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। তা না হলে ভাদ্দর মাসের শেষে সচরাচর এমন বৃষ্টি হয় না। সেই সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। সঙ্গে দমকা হাওয়ার ঝাপটা। মনে হয় শহরটা ভেসে না যাওয়া পর্যন্ত এই বৃষ্টি আর থামবে না।

 

খুব দরকার না থাকলে এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বাড়ি থেকে কেউ বেরোবার কথা নয়। রাস্তাঘাটেও তাই লোকজন কম। চারদিক কেমন সুনসান।

 

এরকম একটা দিনে কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল তারপর ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এল, বোঝাই গেল না। বৃষ্টিতে আটকা পড়ে বাড়ির বৈঠকখানায় মনমরা হয়ে বসে আছে সৌম্য। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। টিভি সেট-টা অন করে ফের সোফাতে গিয়ে বসল সে।

 

হটাৎ ও-ঘরে চার্জে বসিয়ে রাখা মুঠোফোনটা বেজে উঠল। মামন নয়তো?

পাশের ঘরে দৌড়ে গেল সে। কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়ে হতাশ হতে হল। মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠেছে অচেনা নম্বর।

--হ্যালো...

--হ্যালো, আমি কি সৌম্যবাবু...ইয়ে...মানে  সৌমেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে কথা বলছি ?

--হ্যা, আমিই সৌমেন্দ্রনাথ সরকার, আপনি?

--নমস্কার সৌম্যবাবু। আমি বিক্রমপুর টি-এস্টেটের ম্যানেজার কিংশুক রায়। একটা দরকারি কাজে ফোন করতে হল। আমি আজই একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। বিষয়টা খুবই জরুরি।

--আপনি কি এখন শিলচরে?

-- না, আমি বিক্রমপুর থেকেই বলছি।

--এ কি ! এই ঝড়জলের রাতে এতদূর আসবেন কি করে ! সারা শহরে জল। আপনি বরং টেলিফোনেই কথাটা সেরে নিন

-- না না সৌম্যবাবু! টেলিফোনে এসব কথা বলা যাবে না।

-- হুম...আচ্ছা... ব্যাপারটা কী, একটু হিন্টস দিতে পারবেন?

--মালিকপক্ষ আমাকে এভাবে বলার অনুমতি দেয়নি। তবে আপনি যখন জিজ্ঞেস করছেন, একটু হলেও বলতে আমাকে হবেই। ঘটনা হচ্ছে , গত ১৫ দিনে বাগানে পরপর তিনজন শ্রমিক মার্ডার হয়েছে। এদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়েছে ফ্যাক্টরি থেকে প্রায় দু'কিলোমিটার দূর, পরিত্যক্ত বাগান কুঠির পিছনের জঙ্গল থেকে। এরমধ্যে আজ বিকেল থেকে আবার শ্রমিক সর্দার শম্ভু বাগদিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গোটা বাগানে আতঙ্ক ! এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকরাও আর বাড়ি থেকে বেরোতে চাইছে না। এরকম চলতে থাকলে বাগানের কোটি টাকা লোকসান হয়ে যাবে। খুবই সিরিয়াস ম্যাটার। তাই জল-ফল নিয়ে ভাবছি না। তাছাড়া  ঘন্টা দুয়েক আগে এমন একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে যে, বিষয়টির সঙ্গে আমাদের বাগানমালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর জীবন-মরণ জড়িয়ে গিয়েছে। রায়চৌধুরী স্যার আপনাকে একটা চিঠি দিয়েছেন। সেটা নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমি আপনার ওখানে পৌঁছাচ্ছি। ও হ্যাঁ, আপনার বাড়িটা মেডিক্যাল রোডেই তো?

এতক্ষণ নাগাড়ে বলে একটু দম নিলেন কিংশুকবাবু।

সৌম্য বলল-- হ্যা, দুর্গাপল্লি লেন, ১৬/১২৩।

-- এখন সন্ধ্যে ৭টা। বিক্রমপুর থেকে গাড়ি নিয়ে রওয়ানা দিলে আশা করি দেড়ঘন্টার মধ্যে আপনার ওখানে গিয়ে পৌঁছে যাব।

-তা পৌঁছে যাবেন। কিন্তু এই ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাতে কী না এলেই নয়?

- না..., আপনার কাছে যেতে আমাকে হবেই।

-ঠিক আছে, চলে আসুন তাহলে। তবে এই দুর্যোগের রাতে পাহাড়ি পথে সাবধানে গাড়ি চালাবেন কিন্তু।

--ধন্যবাদ সৌম্যবাবু। চিন্তা করবেন না, আমি সাবধানেই আসবো...।

কথা শেষ হতে না হতেই ফোনটা কেটে গেল। থানায় খবর দেওয়া হয়েছে কী না, সেকথা আর জিজ্ঞেস করা হল না  সৌম্যর ...

||||||||||

বিক্রমপুরের কথা ভাবতেই সৌম্যর  চোখের সামনে  ভেসে ওঠে বড়াইল পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছবির মতো সুন্দর একটা চা-বাগানের ছবি। যে বাগানের গোড়াপত্তন  ব্রিটিশদের হাতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় এক দশক পর্যন্ত  বাগানের মালিক ছিল সাহেবরাই। পরে নানা কারণে ব্রিটিশরা বাগানের মালিকানা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। সে-ও প্রায় ষাট বছর আগের কথা। তখন  বাগানের ম্যানেজার ছিলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর বাবা গোরাচাঁদ ওরফে জিসি রায়চৌধুরী। পরে সাহেবরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় একরকম  জলের দরে বাগানটি তাঁকে বেচে দেয়।  জিসি চৌধুরীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে বাগানের মালিকানা বর্তায় তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর ওপর। 

 

কিছুদিন আগে একটা অপহরণ কেসের তদন্ত করতে গিয়ে বিক্রমপুর টি এস্টেটের ব্যাপারে এটুকু জেনেছে সৌম্য। ঘটনাচক্রে তখন আরেকটা ব্যাপারও জানতে পারে। যদি সে খবরটা ঠিক হয়, তাহলে তারাচাঁদবাবুর সত্যিই বিপদ। কপালে চিন্তার  ভাঁজ পড়ল সৌম্যর...

 

নাহ্ ! এই মূহুর্তে আগাম কোনও চাপ নিয়ে মনটাকে অশান্ত করতে চাইছে না সে। নিজেকে হালকা রাখার জন্য টিভিতে লোক্যাল চ্যানেল চালিয়ে দেয় সৌম্য। বাইরে তখনও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে।

||||||||||

লোক্যাল চ্যানেলে গোটা শহর জমা জলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, ন্যাশনাল হাইওয়ে মোড়, লিঙ্করোড, রাঙ্গিরখাঁড়ি, সোনাইরোড, শিলংপট্টি, চার্চরোড--- সবখানেই শুধু জল আর জল। কোনটা রাস্তা আর কোনটা-ই বা নালা, টেলিভিশনের পর্দায় ঠাহর করা মুস্কিল। নিউজ স্ক্রলিঙে দেখাচ্ছে, বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে বইছে বরাক। শ্রীকোণার পাশে কোনও একটা জায়গায় রেললাইনে জল উঠে যাওয়ায় শিলচর-গুয়াহাটি এক্সপ্রেস বাতিল হয়ে গেছে। মিনি বন্যায় অটো-বাস পরিষেবাও স্তব্ধ। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় বহু লোক আটকা পড়ে আছে। গ্রাউন্ড জিরো রিপোর্টিঙে এদের প্রতিক্রিয়া নিচ্ছেন ফিল্ড সংবাদদাতা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী দু'দিনের মধ্যে বৃষ্টি থামার কোনও সম্ভাবনা নেই।

দুর্যোগের এই খবরে মামনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল সৌম্যর।

|||||||||

দুদিন হল, মামন গিয়েছে গাঁয়ের বাড়িতে। আজ তার  ফিরে আসার কথা। যদি ফিরে আসে, তাহলে নির্ঘাত রাস্তায় আটকা পড়েছে সে-ও। এক্ষুনি ওকে একটা ফোন করা দরকার। কিন্তু ফোনই যে লাগছে না! মেজাজটা খাপ্পা হয়ে ওঠে সৌম্যর...

||||||||||

মাঝখানে মিনিট দশেকের বিরতি নিয়ে ফের মুষলধার শুরু হয়েছে। সহদেবকে এককাপ চায়ের কথা বলে বারান্দায়  গিয়ে  বসল সোম্য। এক শলা সিগারেট ধরিয়ে  সুখটান দিতে দিতে কিংশুকবাবুর কথাগুলো পরপর সাজাতে লাগল সে ...

মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাগানে তিনজন শ্রমিক রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছে। কিংশুকবাবুর কথায় খুন হয়েছে। এখন আবার শ্রমিক সর্দার নিখোঁজ।

 

এর পিছনে কারা? 


এই ঘটনায় বাগানমালিক তারাচাঁদবাবুর জীবন-মরণই বা জড়াল কেন? 


তবে কী সেই ব্যাপারটা-ই...?


না-কি ঘটনার পিছনে রয়েছে অন্য-কোনও গভীর ষড়যন্ত্র?

মাথায় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে সৌম্যর। বাল্বের ক্ষয়াটে আলোয় চেয়ারে বসে সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং ছাড়তে ছাড়তে গভীর চিন্তায় তলিয়ে গেল সে।

||||||||

সৌম্য আর মামন তুতো-ভাই। দুজনেই প্রায় সমবয়সী। ফলে সম্পর্কটা ভাই কম, বন্ধুত্বের বেশি। এদের এই সম্পর্কের বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে সে-ই  স্কুলবেলার দিনগুলোতে। দুজনের গলায় গলায় ভাব। বলতে গেলে মামনকে ছাড়া একটা মূহুর্ত চলে না সৌম্যর। একই কথা প্রযোজ্য মামনের বেলায়ও। তাই পড়াশোনার পাট চুকে যাওয়ার পরও দু'জনে মিলে একটা অ্যাড এজেন্সি চালাচ্ছে। মামনের আবার ওষুধের পাইকারি ব্যবসাও আছে। স্বভাবের দিক থেকে দু'জনই ডাকাবুকো, রহস্য রোমাঞ্চ ভালবাসে। ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযানে সফল হয়েছে তারা। 

 

এছাড়াও সৌম্য-র আরেকটা পরিচয় হল, সে একজন  নামকরা  ক্রাইম ফ্রিল্যান্সার। তার সাংবাদিকতার ধরনটা-ই আলাদা। অধিকাংশ কেসে অপরাধী শনাক্ত করতে নিজস্ব পদ্ধতি ধরে এগোয় সে। তার সাংবাদিকতা পুলিশের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ-ই তার সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এগোয়। যেকারণে পুলিশের ওপরতলায় সৌম্যর কদরটা একটু বেশি।

 

কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। মাঝারি মাপের কিছু পুলিশ অফিসার সৌম্যকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। কিন্তু  আড়ালে আবডালে এটা অবশ্যই স্বীকার করেন, তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় সৌম্যর জুড়ি মেলা ভার। তার বিচক্ষণতা দেখে মনেহয় তাকে পুলিশেই মানাত বেশি।

||||||||||

রাত বাড়ার সঙ্গে বৃষ্টির জোর আরও বাড়ছে। বেশ কিছুক্ষন হল লোডশেডিং। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শনশন করে বইছে হাওয়া।ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে দশটা। কিংশুকবাবু এখনও এসে পৌঁছননি। সৌম্যর মনটা কু গাইতে শুরু করেছে। বারান্দায় বসে-বসে গভীর চিন্তায় তলিয়ে গিয়েছে সে।

 

এমন সময় ঝুপ করে একটা শব্দ হল। বড় শিরিশ গাছটা কোলাপ্সেবেল গেটের পাশে। গাছের ডাল বেয়ে সামনের বাগানে আপাদমস্তক বর্ষাতিতে ঢাকা একটা ছায়ামূর্তি লাফ দিয়ে নামল। রহস্যময় ছায়ামূর্তিটা একবার এদিক-ওদিক দেখল। যেন কিছু একটা জরিপ করে নিচ্ছে। 


এবার বারান্দা লক্ষ্য করে নিঃশব্দে এগিয়ে আসতে লাগল লোকটা...

 

 পর্ব ২ 

 

হাজার হোক, সৌম্য'র কাজকারবার অপরাধজগত নিয়ে। এই কাজে ঝুঁকিও অনেক। তাই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সবসময়ই সজাগ। ঝোড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে রহস্যময় আগন্তুকের পায়ের হাল্কা শব্দটা তার কানে ঠিক পৌঁছে গিয়েছে। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল সে।

--কে, কে ওখানে?
বলতে বলতে শিকারী বাঘের মত পজিশন নিয়ে নিল সৌম্য। নিয়মিত শরীর চর্চা করা মেদহীন দেহটা ক্যারাটের বিশেষ পোজে স্প্রিং’য়ের মত বেঁকে গিয়েছে।

সৌম্যর বাজখাঁই গলার আওয়াজ শুনে মূহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল ছায়ামূর্তিটা। তারপর হোহো করে হেসে ওঠল।

--এখনও জেগে আছ দেখছি সৌম্যদা !

--ওমা, মামন তুই ! আমি আরও ভাবলাম কে না কে। তা তুই এভাবে পাঁচিল টপকে কেন? গঙ্গানগর থেকে ফিরে বাড়ি  যাসনি বুঝি?

-যাব কি করে সৌম্যদা ! নাগাটিলা পর্যন্ত এসে ট্র‍্যাভেলারটি যে আর একচুলও এগোল না। ড্রাইভার বলল, সোনাই রোডের কোনও-কোনও  জায়গায় নাকি কোমর-জল ! অগত্যা আউলিয়া বাজারের ভেতর-রাস্তাটা ধরে সটান এখানে চলে এলাম। এসে দেখি গেটটা ভেতর থেকে তালাবন্ধ। ভাবলুম, বৃষ্টির রাত, খেয়েদেয়ে হয়তো এতক্ষণে  ঘুমিয়ে-ই পড়েছ। ডাকাডাকি করতে মন চাইল না। তাই পাঁচিল টপকে....

মামনের কথা শেষ হবার আগেই সৌম্য বললো, 

- এসে ভালোই করেছিস। যা, এবার বাথরুমে গিয়ে তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে আয়। জরুরি কথা আছে। 


||||||||||


বাথরুম যাওয়ার পথে রান্নাঘরে উঁকি দিল মামন। গ্যাস-স্টোভে রান্না চাপিয়েছে সহদেব। চারদিকে একটা সুন্দর উপাদেয় গন্ধ। সেই গন্ধে খিদেটা আরও চাগাড় দিয়ে উঠল তার। জিজ্ঞেস করল,

-এত মনযোগ দিয়ে কি রাঁধছ গো সহদেবদা...

- ওমা ! মামনদাবুও এইসে পড়ছো দ্যাইখছি ! ভালই হইল ! আমি আইজকা খিচুড়ি বসেয়েছি গো। সঙ্গে ইলিশ ভাজা, সিদল চাটনি, গন্ধলেবু , কাঁচা-লঙ্কা,পাঁপড় আর আলুভাজিও থাইকবো।

বৃষ্টিবাদলের দিনে এরচেয়ে উপাদেয় মেনু আর কি-ই-বা হতে পারে ! সহদেবকে বারান্দায় এক-কাপ বাড়তি চায়ের কথা বলে বাথরুমের দিকে চলে গেল মামন।

 

|||||||||

 

একটু বাদে। 

 

ভিজে কাপড়-চোপড় চেঞ্জ করে বারান্দায় গিয়ে  সৌম্যর পাশের চেয়ারটায় বসল মামন।

চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মাঝেমধ্যে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসা ব্যাঙের ডাক, গাছের পাতায় ঝিরঝির বৃষ্টি'র শব্দ ---সব মিলে  তৈরি  হয়েছে এক রহস্যময় পরিবেশ। জলো বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ। দূরে কোথাও হয়তো হাস্নাহেনা ফুটে থাকবে।

আচ্ছা, হাস্নাহেনার সৌরভে সাপেরা নাকি ভীষণ আকৃষ্ট হয় ! কে জানে, কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে এখানেও দু'একটা এসে লুকিয়ে থাকতে পারে ! 

ভাবনাটা উঁকি দিতেই শঙ্কিত হয়ে ওঠল মামন। হঠাৎ মনে পড়ে গেল , সর্প বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাপের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত দুর্বল। অথচ এ  নিয়ে সমাজে কত গল্প যে প্রচলিত। মনেমনে হেসে ওঠল সে।

ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটায় গাটা শিরশির করে ওঠল মামনের। জিজ্ঞেস করল,

-কি হল সৌম্যদা, বললে যে--কি একটা জরুরি কথা আছে !

মামনের প্রশ্নে যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে সৌম্য। আড়মোড়া ভেঙে কিংশুকবাবুর ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে সে। বলে,

-বিক্রমপুর থেকে এখানে এসে পৌঁছাতে বড়জোর দেড়-দুঘন্টা লাগার কথা। সেই জায়গায় প্রায় তিনঘণ্টা অতিক্রান্ত, কিংশুক বাবুর পাত্তা নেই। ভদ্রলোক কোনও বিপদে পড়েননি তো !

- কোথায় রয়েছেন সেটা ফোন করে জেনে নিলেই তো পারো।

 

-সে আর করিনি ভেবেছিস। কিন্তু প্রতিবারই যে নট রিচেবেল দেখাচ্ছে। 
 
- তাহলে তো চিন্তার কথা। 

সৌম্যদে'র কথাবার্তা শেষ হবার আগেই গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে  দাঁড়াল। পার্কিং লাইটের স্তিমিত আলোয় দেখা গেল, ছাতা মেলতে মেলতে এক ভদ্রলোক গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। এবার একহাতে মোবাইলের আলো ফেলে গেটের গায়ে লেগে থাকা নম্বর প্লেট দেখতে লাগলেন।

 

লোকটা যে কিংশুক রায়, সেটা আন্দাজ করতে অসুবিধা হল না কারোরই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সৌম্য বলল, 
-কিংশুকবাবু, একটু দাঁড়ান। আমার লোক গিয়ে গেট খুলে দিচ্ছে।

 

কথা শেষ করে সহদেবকে ডাক দেবে সৌম্য, এর আগেই দৌড়ে গিয়ে গেটটা খুলে দিল সহদেব।

 

 

 

||||||||||||

 

কিছুক্ষণ পর। 


ড্রইংরুমে বসে আছে তিনজন। একটু আগে চা দিয়ে গেছে সহদেব। সৌম্য মামনকে দেখিয়ে বলল,

-কিংশুকবাবু, ইনি মামন--সত্যানুসন্ধানে আমার সহযোগী। একে ছাড়া আমার একটি মূহুর্তও চলে না। আপনি তার সামনে সবকথা নিঃসংকোচে বলতে পারেন। 


মামনকে নমস্কার জানিয়ে ধূমায়িত চায়ের কাপে চুমুক দিলেন কিংশুক। বললেন, 

--ইনি-ই যে মামন, সে আমি আগেই আন্দাজ করে নিয়েছি। এখন কথা হচ্ছে, শ্রমিক খুন সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার কিছু নেই। টেলিফোনে যা বলেছি, সেটুকুই। শুধু আমাদের বাগানমালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরী'র চিঠিতে কি উল্লেখ রয়েছে, সেটা বলতে পারছি না। তবে পরপর খুনের ঘটনায় তিনি যে ভীষণ টেনসড, সে-ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। তার ওপর আজ সকাল থেকে তাঁকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সন্ধের পর সেই উদ্বেগটা বেড়েছে কয়েকগুণ। কারণ জিজ্ঞেস করাতে বিশেষ কিছু বলেননি। শুধু এটুকুই জানিয়েছেন, বিক্রমপুরের উপর নাকি ঘোরতর বিপদ ঘনিয়ে আসছে।  

বলতে বলতে একটা বন্ধ খাম সৌম্য 'র হাতে তুলে দিলেন কিংশুক।

 
হলদেটে খামের মুখটা ছিড়ে  চিঠিটা  চোখের সামনে মেলে ধরল সৌম্য। 

গুটিগুটি হরফে লেখা চিঠি। বয়ানে কোনও ভনিতা নেই। সরাসরি কাজের কথায় চলে গিয়েছেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী।


সৌম্যেন্দ্রনাথ সরকার, 
মান্যবরেষু, 
বড় বিপদে পড়ে চিঠি পাঠালুম। এতক্ষণে কিছুটা হয়ত কিংশুকবাবু'র মুখ থেকে শুনেছেন। কিন্তু এটাই শেষ নয়। আরও অনেক কথা আছে। বিশেষ কারণে সে-সব কথা চিঠিতে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। শুধু এটুকু জেনে রাখুন, বাগানে যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে আমি বা আমার পরিবারের সদস্যরাই শুধু নন, গোটা বিক্রমপুরের ওপর ঘনিয়ে আসছে বড় বিপদ। এক অদৃশ্য শয়তান তার জালে ধীরেধীরে সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে। তাই আপনি দয়া করে একটিবার এখানে আসুন। বাকি কথা হবে সামনা-সামনি বসে। আশা করছি এই চরম বিপদে আপনি আমাকে বিমুখ করবেন না। আরেকটি কথা, ফি নিয়ে একেবারেই ভাববেন না। আপনি যা চাইবেন, দিয়ে দেওয়া হবে। 
             

ইতি, আপনার 
টি.সি.আর.সি 
(তারাচাঁদ রায়চৌধুরী)

পুনশ্চ : আপনার অনেক অসাধ্য সাধনের কথা শুনেছি। আপনার মতো লোকের বাড়িতে যাওয়াটা গৌরবের ব্যাপার। কিন্তু প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এ যাত্রায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। বরং আপনাকেই কষ্ট করে গরিবের বাগানে পদার্পণ করতে হচ্ছে। এখানে এলে আপনার খাতির-যত্নে যে কোনও ত্রুটি থাকবে না, সে নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি। 

||||||||||||

চিঠিটা মনযোগ দিয়ে পড়ে সেটা মামনকে চালান করে দেয় সৌম্য। বলে, 

--ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা কিংশুকবাবু, আপনি কি জানেন, শয়তানের জাল বলতে তারাচাঁদ রায়চৌধুরী কি বোঝাতে চেয়েছেন। 

--শয়তানের জাল ! না, এব্যাপারে কিছু শুনিনি তো। অবশ্য আমি মাত্র দু'বছর আগে বাগানে জয়েন করেছি। সবকথা জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। 


--হুম... ঘটনাটা আমাকে টানছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের যে রকম কাজের চাপ, তাতে মনে হয় আগামী...

সৌম্য 'র কথা শেষ হবার আগেই একরকম আর্তনাদ করে ওঠলেন কিংশুকবাবু। বললেন, 

--প্লিজ, ওরকম বলবেন না স্যার। বাগানের পরিস্থিতি যে কি, সেটা তো বুঝতেই পারছেন। তার ওপর নানা ঘটনায় আমাদের মালিকও আর পুলিশে আস্থা রাখতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে আপনিই একমাত্র ভরসা। আমি বলছি কি, আপনারা একবার বিক্রমপুর এসেই দেখুন, ব্যাপারখানা কী। যদি মনে হয় এটা কোনও সাধারণ কেস, ফিরে আসবেন। কথা দিচ্ছি, আপনাদের ফিরে আসার বন্দোবস্তোটুকু করে দেব আমি-ই। 

মামনের দিকে তাকিয়ে সৌম্য বলল, 

-কি রে, চিঠিটা তো পড়লি। তোর কি মনে হয়, যাওয়া যায়? 

-চলোই না, একবার দেখে আসি। পরপর তিনটে খুন, একটা অপহরণের ঘটনা তো আর হেলাফেলার বিষয় নয়। তাছাড়া অদৃশ্য শয়তানটাও বেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার বলে মনে হচ্ছে। 

মামনের কথায় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন কিংশুক। তাঁর দিকে কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 

-- এবার দয়া করে যদি কখন যাবেন জানিয়ে দেন, সে অনুযায়ী গাড়ি'র বন্দোবস্ত করে রাখব।

সৌম্য বলে, 

--বললেই তো আর হুট করে বেরোনো যায় না। কাল যদি একান্ত যেতেই হয়, বিকেলের আগে হবে না। কারণ, সকালে আমাকে এদিকের কয়েকটা জরুরি কাজ সেরে নিতে হবে।

 

সৌম্য 'র জবাব শুনে মূহুর্তের মধ্যে কিছু ভেবে নিলেন কিংশুক। বললেন, 

--ঠিক আছে তাহলে, আজ রাতটা আমিও শিলচরের বাড়িতে কাটিয়ে দিচ্ছি। কাল শহরে আমারও কিছু কেনাকাটা করার আছে। সেটা সেরে বিকেলেই সবাইকে নিয়ে বিক্রমপুরের উদ্দেশে রওনা দেব। তা ক'টায় এলে আপনাদের সুবিধে? 

সৌম্য বলল, 

--আপনি তিনটের দিকে আসুন। 

--তবে এই কথাই রইল, কাল তিনটের পর আমাদের দেখা হচ্ছে।

|||||||||

সৌম্যদের আরও একপ্রস্ত ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কিংশুক।

তিনি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মেডিক্যালের ওদিকে একটা পেটা ঘড়ি ঢংঢং করে বেজে উঠল। 
রাত ১২টা। 


রান্নাবান্না শেষ হয়ে যাওয়ায় খেতে যাওয়ার তাগাদা দিয়ে গেল সহদেব। গভীর চিন্তায় বুঁদ সৌম্যকে তাড়া লাগালো মামন। 

--ওঠো সৌম্যদা, শয়তানের জাল কেটে তুমি পরে-ও বেরোতে পারবে। কিন্তু খিচুড়ি একবার ঠাণ্ডা হয়ে গেলে-ই  সব মাটি... 

মামনের কথায় হো হো করে হেসে ওঠে সৌম্য। বলে, 
--ঠিক বলেছিস রে মামন। ঠাণ্ডা খিচুড়ি আর গোবর----একই কথা।

 

 ক্রমশঃ