সাহিত্য পত্র

"বাগান কুঠির রহস্য"

ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস (পর্ব ১১)

হিমু লস্কর 

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

এখন পর্যন্ত 
-------------------

বিক্রমপুর চাবাগানে পরপর তিনটে খুন হয়েছে। এরমধ্যে শ্রমিক সর্দার শম্ভু বাগদি নিখোঁজ। সবমিলিয়ে বাগানে ছড়িয়েছে প্রচণ্ড আতঙ্ক। এসবের মাঝখানে বাগান মালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরী এমন কিছু জানতে পেরেছেন যে, নিজেকে প্রচণ্ড অসুরক্ষিত মনে করছেন তিনি। সৌম্যর সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন তাঁরাচাদবাবু। তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর কাছে তারা শুনলেন একটি ভয়ঙ্কর রহস্যের কথা এবং এরমধ্যেই পাওয়া গেল শ্রমিক সর্দার শম্ভু বাগদির ক্ষত বিক্ষত লাশ। শুরু হয়েছে জোরদার তদন্ত। লাশ যেখানে পাওয়া গেছে, তাঁর পাশেই পরিত্যক্ত বাগান কুঠি। সেখানে পৌছনোর পর সৌম্যর মনে হয় কেউ তাঁদের ওপর নজর রাখছে। হটাৎ সেখানে আবির্ভাব এক পাগলের। কে সে? এদিকে সৌম্য এবং মামন অধ্যাপক প্রশান্ত ভূষণের কাছ থেকে জানতে পারলো একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক সুত্র এবং সেখান থেকেই তাঁদের তদন্তের সঙ্গী অধ্যাপক ভূষণের মেয়ে তুতুল। বিক্রমপুর ফেরার পথে হটাৎ রাস্তায় তাঁদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা সত্তেও সৌম্য এবং তাঁর সঙ্গীরা আবার হাজির বিক্রমপুর চা বাগানে। রাতে সৌম্য এবং তুতুল বাগান কুঠি তে পৌঁছে শুনল ৩ জনের কথা। চলছে গভীর ষড়যন্ত্র...   

পড়তে থাকুন ঈশান কথা'র ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস "বাগান কুঠির রহস্য"। লিখছেন বরাকের পরিচিত লেখক, সাংবাদিক হিমু লস্কর।

প্রকাশিত হল পর্ব ১১...

Himu Laskar_edited.jpg

 পর্ব ১ 

 

বঙ্গোপসাগরে হয়তো ফের নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছে। তা না হলে ভাদ্দর মাসের শেষে সচরাচর এমন বৃষ্টি হয় না। সেই সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। সঙ্গে দমকা হাওয়ার ঝাপটা। মনে হয় শহরটা ভেসে না যাওয়া পর্যন্ত এই বৃষ্টি আর থামবে না।

 

খুব দরকার না থাকলে এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বাড়ি থেকে কেউ বেরোবার কথা নয়। রাস্তাঘাটেও তাই লোকজন কম। চারদিক কেমন সুনসান।

 

এরকম একটা দিনে কখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল তারপর ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে এল, বোঝাই গেল না। বৃষ্টিতে আটকা পড়ে বাড়ির বৈঠকখানায় মনমরা হয়ে বসে আছে সৌম্য। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। টিভি সেট-টা অন করে ফের সোফাতে গিয়ে বসল সে।

 

হটাৎ ও-ঘরে চার্জে বসিয়ে রাখা মুঠোফোনটা বেজে উঠল। মামন নয়তো?

পাশের ঘরে দৌড়ে গেল সে। কিন্তু ফোনটা হাতে নিয়ে হতাশ হতে হল। মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠেছে অচেনা নম্বর।

--হ্যালো...

--হ্যালো, আমি কি সৌম্যবাবু...ইয়ে...মানে  সৌমেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে কথা বলছি ?

--হ্যা, আমিই সৌমেন্দ্রনাথ সরকার, আপনি?

--নমস্কার সৌম্যবাবু। আমি বিক্রমপুর টি-এস্টেটের ম্যানেজার কিংশুক রায়। একটা দরকারি কাজে ফোন করতে হল। আমি আজই একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। বিষয়টা খুবই জরুরি।

--আপনি কি এখন শিলচরে?

-- না, আমি বিক্রমপুর থেকেই বলছি।

--এ কি ! এই ঝড়জলের রাতে এতদূর আসবেন কি করে ! সারা শহরে জল। আপনি বরং টেলিফোনেই কথাটা সেরে নিন

-- না না সৌম্যবাবু! টেলিফোনে এসব কথা বলা যাবে না।

-- হুম...আচ্ছা... ব্যাপারটা কী, একটু হিন্টস দিতে পারবেন?

--মালিকপক্ষ আমাকে এভাবে বলার অনুমতি দেয়নি। তবে আপনি যখন জিজ্ঞেস করছেন, একটু হলেও বলতে আমাকে হবেই। ঘটনা হচ্ছে , গত ১৫ দিনে বাগানে পরপর তিনজন শ্রমিক মার্ডার হয়েছে। এদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার হয়েছে ফ্যাক্টরি থেকে প্রায় দু'কিলোমিটার দূর, পরিত্যক্ত বাগান কুঠির পিছনের জঙ্গল থেকে। এরমধ্যে আজ বিকেল থেকে আবার শ্রমিক সর্দার শম্ভু বাগদিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গোটা বাগানে আতঙ্ক ! এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকরাও আর বাড়ি থেকে বেরোতে চাইছে না। এরকম চলতে থাকলে বাগানের কোটি টাকা লোকসান হয়ে যাবে। খুবই সিরিয়াস ম্যাটার। তাই জল-ফল নিয়ে ভাবছি না। তাছাড়া  ঘন্টা দুয়েক আগে এমন একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে যে, বিষয়টির সঙ্গে আমাদের বাগানমালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর জীবন-মরণ জড়িয়ে গিয়েছে। রায়চৌধুরী স্যার আপনাকে একটা চিঠি দিয়েছেন। সেটা নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমি আপনার ওখানে পৌঁছাচ্ছি। ও হ্যাঁ, আপনার বাড়িটা মেডিক্যাল রোডেই তো?

এতক্ষণ নাগাড়ে বলে একটু দম নিলেন কিংশুকবাবু।

সৌম্য বলল-- হ্যা, দুর্গাপল্লি লেন, ১৬/১২৩।

-- এখন সন্ধ্যে ৭টা। বিক্রমপুর থেকে গাড়ি নিয়ে রওয়ানা দিলে আশা করি দেড়ঘন্টার মধ্যে আপনার ওখানে গিয়ে পৌঁছে যাব।

-তা পৌঁছে যাবেন। কিন্তু এই ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাতে কী না এলেই নয়?

- না..., আপনার কাছে যেতে আমাকে হবেই।

-ঠিক আছে, চলে আসুন তাহলে। তবে এই দুর্যোগের রাতে পাহাড়ি পথে সাবধানে গাড়ি চালাবেন কিন্তু।

--ধন্যবাদ সৌম্যবাবু। চিন্তা করবেন না, আমি সাবধানেই আসবো...।

কথা শেষ হতে না হতেই ফোনটা কেটে গেল। থানায় খবর দেওয়া হয়েছে কী না, সেকথা আর জিজ্ঞেস করা হল না  সৌম্যর ...

||||||||||

বিক্রমপুরের কথা ভাবতেই সৌম্যর  চোখের সামনে  ভেসে ওঠে বড়াইল পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছবির মতো সুন্দর একটা চা-বাগানের ছবি। যে বাগানের গোড়াপত্তন  ব্রিটিশদের হাতে। স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রায় এক দশক পর্যন্ত  বাগানের মালিক ছিল সাহেবরাই। পরে নানা কারণে ব্রিটিশরা বাগানের মালিকানা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়। সে-ও প্রায় ষাট বছর আগের কথা। তখন  বাগানের ম্যানেজার ছিলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর বাবা গোরাচাঁদ ওরফে জিসি রায়চৌধুরী। পরে সাহেবরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় একরকম  জলের দরে বাগানটি তাঁকে বেচে দেয়।  জিসি চৌধুরীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে বাগানের মালিকানা বর্তায় তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর ওপর। 

 

কিছুদিন আগে একটা অপহরণ কেসের তদন্ত করতে গিয়ে বিক্রমপুর টি এস্টেটের ব্যাপারে এটুকু জেনেছে সৌম্য। ঘটনাচক্রে তখন আরেকটা ব্যাপারও জানতে পারে। যদি সে খবরটা ঠিক হয়, তাহলে তারাচাঁদবাবুর সত্যিই বিপদ। কপালে চিন্তার  ভাঁজ পড়ল সৌম্যর...

 

নাহ্ ! এই মূহুর্তে আগাম কোনও চাপ নিয়ে মনটাকে অশান্ত করতে চাইছে না সে। নিজেকে হালকা রাখার জন্য টিভিতে লোক্যাল চ্যানেল চালিয়ে দেয় সৌম্য। বাইরে তখনও ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে।

||||||||||

লোক্যাল চ্যানেলে গোটা শহর জমা জলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য। চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, ন্যাশনাল হাইওয়ে মোড়, লিঙ্করোড, রাঙ্গিরখাঁড়ি, সোনাইরোড, শিলংপট্টি, চার্চরোড--- সবখানেই শুধু জল আর জল। কোনটা রাস্তা আর কোনটা-ই বা নালা, টেলিভিশনের পর্দায় ঠাহর করা মুস্কিল। নিউজ স্ক্রলিঙে দেখাচ্ছে, বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে বইছে বরাক। শ্রীকোণার পাশে কোনও একটা জায়গায় রেললাইনে জল উঠে যাওয়ায় শিলচর-গুয়াহাটি এক্সপ্রেস বাতিল হয়ে গেছে। মিনি বন্যায় অটো-বাস পরিষেবাও স্তব্ধ। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। শহরের বিভিন্ন জায়গায় বহু লোক আটকা পড়ে আছে। গ্রাউন্ড জিরো রিপোর্টিঙে এদের প্রতিক্রিয়া নিচ্ছেন ফিল্ড সংবাদদাতা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আগামী দু'দিনের মধ্যে বৃষ্টি থামার কোনও সম্ভাবনা নেই।

দুর্যোগের এই খবরে মামনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল সৌম্যর।

|||||||||

দুদিন হল, মামন গিয়েছে গাঁয়ের বাড়িতে। আজ তার  ফিরে আসার কথা। যদি ফিরে আসে, তাহলে নির্ঘাত রাস্তায় আটকা পড়েছে সে-ও। এক্ষুনি ওকে একটা ফোন করা দরকার। কিন্তু ফোনই যে লাগছে না! মেজাজটা খাপ্পা হয়ে ওঠে সৌম্যর...

||||||||||

মাঝখানে মিনিট দশেকের বিরতি নিয়ে ফের মুষলধার শুরু হয়েছে। সহদেবকে এককাপ চায়ের কথা বলে বারান্দায়  গিয়ে  বসল সোম্য। এক শলা সিগারেট ধরিয়ে  সুখটান দিতে দিতে কিংশুকবাবুর কথাগুলো পরপর সাজাতে লাগল সে ...

মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাগানে তিনজন শ্রমিক রহস্যজনকভাবে মারা গিয়েছে। কিংশুকবাবুর কথায় খুন হয়েছে। এখন আবার শ্রমিক সর্দার নিখোঁজ।

 

এর পিছনে কারা? 


এই ঘটনায় বাগানমালিক তারাচাঁদবাবুর জীবন-মরণই বা জড়াল কেন? 


তবে কী সেই ব্যাপারটা-ই...?


না-কি ঘটনার পিছনে রয়েছে অন্য-কোনও গভীর ষড়যন্ত্র?

মাথায় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে সৌম্যর। বাল্বের ক্ষয়াটে আলোয় চেয়ারে বসে সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং ছাড়তে ছাড়তে গভীর চিন্তায় তলিয়ে গেল সে।

||||||||

সৌম্য আর মামন তুতো-ভাই। দুজনেই প্রায় সমবয়সী। ফলে সম্পর্কটা ভাই কম, বন্ধুত্বের বেশি। এদের এই সম্পর্কের বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে সে-ই  স্কুলবেলার দিনগুলোতে। দুজনের গলায় গলায় ভাব। বলতে গেলে মামনকে ছাড়া একটা মূহুর্ত চলে না সৌম্যর। একই কথা প্রযোজ্য মামনের বেলায়ও। তাই পড়াশোনার পাট চুকে যাওয়ার পরও দু'জনে মিলে একটা অ্যাড এজেন্সি চালাচ্ছে। মামনের আবার ওষুধের পাইকারি ব্যবসাও আছে। স্বভাবের দিক থেকে দু'জনই ডাকাবুকো, রহস্য রোমাঞ্চ ভালবাসে। ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযানে সফল হয়েছে তারা। 

 

এছাড়াও সৌম্য-র আরেকটা পরিচয় হল, সে একজন  নামকরা  ক্রাইম ফ্রিল্যান্সার। তার সাংবাদিকতার ধরনটা-ই আলাদা। অধিকাংশ কেসে অপরাধী শনাক্ত করতে নিজস্ব পদ্ধতি ধরে এগোয় সে। তার সাংবাদিকতা পুলিশের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ-ই তার সংবাদের ওপর ভিত্তি করে এগোয়। যেকারণে পুলিশের ওপরতলায় সৌম্যর কদরটা একটু বেশি।

 

কিন্তু এর উল্টোটাও আছে। মাঝারি মাপের কিছু পুলিশ অফিসার সৌম্যকে একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। কিন্তু  আড়ালে আবডালে এটা অবশ্যই স্বীকার করেন, তদন্তমূলক সাংবাদিকতায় সৌম্যর জুড়ি মেলা ভার। তার বিচক্ষণতা দেখে মনেহয় তাকে পুলিশেই মানাত বেশি।

||||||||||

রাত বাড়ার সঙ্গে বৃষ্টির জোর আরও বাড়ছে। বেশ কিছুক্ষন হল লোডশেডিং। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শনশন করে বইছে হাওয়া।ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে দশটা। কিংশুকবাবু এখনও এসে পৌঁছননি। সৌম্যর মনটা কু গাইতে শুরু করেছে। বারান্দায় বসে-বসে গভীর চিন্তায় তলিয়ে গিয়েছে সে।

 

এমন সময় ঝুপ করে একটা শব্দ হল। বড় শিরিশ গাছটা কোলাপ্সেবেল গেটের পাশে। গাছের ডাল বেয়ে সামনের বাগানে আপাদমস্তক বর্ষাতিতে ঢাকা একটা ছায়ামূর্তি লাফ দিয়ে নামল। রহস্যময় ছায়ামূর্তিটা একবার এদিক-ওদিক দেখল। যেন কিছু একটা জরিপ করে নিচ্ছে। 


এবার বারান্দা লক্ষ্য করে নিঃশব্দে এগিয়ে আসতে লাগল লোকটা...

 

 পর্ব ২ 

 

হাজার হোক, সৌম্য'র কাজকারবার অপরাধজগত নিয়ে। এই কাজে ঝুঁকিও অনেক। তাই তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সবসময়ই সজাগ। ঝোড়ো হাওয়া এবং বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে রহস্যময় আগন্তুকের পায়ের হাল্কা শব্দটা তার কানে ঠিক পৌঁছে গিয়েছে। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল সে।

--কে, কে ওখানে?
বলতে বলতে শিকারী বাঘের মত পজিশন নিয়ে নিল সৌম্য। নিয়মিত শরীর চর্চা করা মেদহীন দেহটা ক্যারাটের বিশেষ পোজে স্প্রিং’য়ের মত বেঁকে গিয়েছে।

সৌম্যর বাজখাঁই গলার আওয়াজ শুনে মূহুর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল ছায়ামূর্তিটা। তারপর হোহো করে হেসে ওঠল।

--এখনও জেগে আছ দেখছি সৌম্যদা !

--ওমা, মামন তুই ! আমি আরও ভাবলাম কে না কে। তা তুই এভাবে পাঁচিল টপকে কেন? গঙ্গানগর থেকে ফিরে বাড়ি  যাসনি বুঝি?

-যাব কি করে সৌম্যদা ! নাগাটিলা পর্যন্ত এসে ট্র‍্যাভেলারটি যে আর একচুলও এগোল না। ড্রাইভার বলল, সোনাই রোডের কোনও-কোনও  জায়গায় নাকি কোমর-জল ! অগত্যা আউলিয়া বাজারের ভেতর-রাস্তাটা ধরে সটান এখানে চলে এলাম। এসে দেখি গেটটা ভেতর থেকে তালাবন্ধ। ভাবলুম, বৃষ্টির রাত, খেয়েদেয়ে হয়তো এতক্ষণে  ঘুমিয়ে-ই পড়েছ। ডাকাডাকি করতে মন চাইল না। তাই পাঁচিল টপকে....

মামনের কথা শেষ হবার আগেই সৌম্য বললো, 

- এসে ভালোই করেছিস। যা, এবার বাথরুমে গিয়ে তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে আয়। জরুরি কথা আছে। 


||||||||||


বাথরুম যাওয়ার পথে রান্নাঘরে উঁকি দিল মামন। গ্যাস-স্টোভে রান্না চাপিয়েছে সহদেব। চারদিকে একটা সুন্দর উপাদেয় গন্ধ। সেই গন্ধে খিদেটা আরও চাগাড় দিয়ে উঠল তার। জিজ্ঞেস করল,

-এত মনযোগ দিয়ে কি রাঁধছ গো সহদেবদা...

- ওমা ! মামনদাবুও এইসে পড়ছো দ্যাইখছি ! ভালই হইল ! আমি আইজকা খিচুড়ি বসেয়েছি গো। সঙ্গে ইলিশ ভাজা, সিদল চাটনি, গন্ধলেবু , কাঁচা-লঙ্কা,পাঁপড় আর আলুভাজিও থাইকবো।

বৃষ্টিবাদলের দিনে এরচেয়ে উপাদেয় মেনু আর কি-ই-বা হতে পারে ! সহদেবকে বারান্দায় এক-কাপ বাড়তি চায়ের কথা বলে বাথরুমের দিকে চলে গেল মামন।

 

|||||||||

 

একটু বাদে। 

 

ভিজে কাপড়-চোপড় চেঞ্জ করে বারান্দায় গিয়ে  সৌম্যর পাশের চেয়ারটায় বসল মামন।

চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মাঝেমধ্যে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূর থেকে ভেসে আসা ব্যাঙের ডাক, গাছের পাতায় ঝিরঝির বৃষ্টি'র শব্দ ---সব মিলে  তৈরি  হয়েছে এক রহস্যময় পরিবেশ। জলো বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ। দূরে কোথাও হয়তো হাস্নাহেনা ফুটে থাকবে।

আচ্ছা, হাস্নাহেনার সৌরভে সাপেরা নাকি ভীষণ আকৃষ্ট হয় ! কে জানে, কথাটা যদি সত্যি হয়, তাহলে এখানেও দু'একটা এসে লুকিয়ে থাকতে পারে ! 

ভাবনাটা উঁকি দিতেই শঙ্কিত হয়ে ওঠল মামন। হঠাৎ মনে পড়ে গেল , সর্প বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সাপের ঘ্রাণশক্তি অত্যন্ত দুর্বল। অথচ এ  নিয়ে সমাজে কত গল্প যে প্রচলিত। মনেমনে হেসে ওঠল সে।

ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটায় গাটা শিরশির করে ওঠল মামনের। জিজ্ঞেস করল,

-কি হল সৌম্যদা, বললে যে--কি একটা জরুরি কথা আছে !

মামনের প্রশ্নে যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে সৌম্য। আড়মোড়া ভেঙে কিংশুকবাবুর ঘটনাটা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে সে। বলে,

-বিক্রমপুর থেকে এখানে এসে পৌঁছাতে বড়জোর দেড়-দুঘন্টা লাগার কথা। সেই জায়গায় প্রায় তিনঘণ্টা অতিক্রান্ত, কিংশুক বাবুর পাত্তা নেই। ভদ্রলোক কোনও বিপদে পড়েননি তো !

- কোথায় রয়েছেন সেটা ফোন করে জেনে নিলেই তো পারো।

 

-সে আর করিনি ভেবেছিস। কিন্তু প্রতিবারই যে নট রিচেবেল দেখাচ্ছে। 
 
- তাহলে তো চিন্তার কথা। 

সৌম্যদে'র কথাবার্তা শেষ হবার আগেই গেটের সামনে একটা গাড়ি এসে  দাঁড়াল। পার্কিং লাইটের স্তিমিত আলোয় দেখা গেল, ছাতা মেলতে মেলতে এক ভদ্রলোক গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। এবার একহাতে মোবাইলের আলো ফেলে গেটের গায়ে লেগে থাকা নম্বর প্লেট দেখতে লাগলেন।

 

লোকটা যে কিংশুক রায়, সেটা আন্দাজ করতে অসুবিধা হল না কারোরই। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সৌম্য বলল, 
-কিংশুকবাবু, একটু দাঁড়ান। আমার লোক গিয়ে গেট খুলে দিচ্ছে।

 

কথা শেষ করে সহদেবকে ডাক দেবে সৌম্য, এর আগেই দৌড়ে গিয়ে গেটটা খুলে দিল সহদেব।

 

 

 

||||||||||||

 

কিছুক্ষণ পর। 


ড্রইংরুমে বসে আছে তিনজন। একটু আগে চা দিয়ে গেছে সহদেব। সৌম্য মামনকে দেখিয়ে বলল,

-কিংশুকবাবু, ইনি মামন--সত্যানুসন্ধানে আমার সহযোগী। একে ছাড়া আমার একটি মূহুর্তও চলে না। আপনি তার সামনে সবকথা নিঃসংকোচে বলতে পারেন। 


মামনকে নমস্কার জানিয়ে ধূমায়িত চায়ের কাপে চুমুক দিলেন কিংশুক। বললেন, 

--ইনি-ই যে মামন, সে আমি আগেই আন্দাজ করে নিয়েছি। এখন কথা হচ্ছে, শ্রমিক খুন সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার কিছু নেই। টেলিফোনে যা বলেছি, সেটুকুই। শুধু আমাদের বাগানমালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরী'র চিঠিতে কি উল্লেখ রয়েছে, সেটা বলতে পারছি না। তবে পরপর খুনের ঘটনায় তিনি যে ভীষণ টেনসড, সে-ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। তার ওপর আজ সকাল থেকে তাঁকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। সন্ধের পর সেই উদ্বেগটা বেড়েছে কয়েকগুণ। কারণ জিজ্ঞেস করাতে বিশেষ কিছু বলেননি। শুধু এটুকুই জানিয়েছেন, বিক্রমপুরের উপর নাকি ঘোরতর বিপদ ঘনিয়ে আসছে।  

বলতে বলতে একটা বন্ধ খাম সৌম্য 'র হাতে তুলে দিলেন কিংশুক।

 
হলদেটে খামের মুখটা ছিড়ে  চিঠিটা  চোখের সামনে মেলে ধরল সৌম্য। 

গুটিগুটি হরফে লেখা চিঠি। বয়ানে কোনও ভনিতা নেই। সরাসরি কাজের কথায় চলে গিয়েছেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী।


সৌম্যেন্দ্রনাথ সরকার, 
মান্যবরেষু, 
বড় বিপদে পড়ে চিঠি পাঠালুম। এতক্ষণে কিছুটা হয়ত কিংশুকবাবু'র মুখ থেকে শুনেছেন। কিন্তু এটাই শেষ নয়। আরও অনেক কথা আছে। বিশেষ কারণে সে-সব কথা চিঠিতে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। শুধু এটুকু জেনে রাখুন, বাগানে যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে আমি বা আমার পরিবারের সদস্যরাই শুধু নন, গোটা বিক্রমপুরের ওপর ঘনিয়ে আসছে বড় বিপদ। এক অদৃশ্য শয়তান তার জালে ধীরেধীরে সবকিছু গ্রাস করে নিচ্ছে। তাই আপনি দয়া করে একটিবার এখানে আসুন। বাকি কথা হবে সামনা-সামনি বসে। আশা করছি এই চরম বিপদে আপনি আমাকে বিমুখ করবেন না। আরেকটি কথা, ফি নিয়ে একেবারেই ভাববেন না। আপনি যা চাইবেন, দিয়ে দেওয়া হবে। 
             

ইতি, আপনার 
টি.সি.আর.সি 
(তারাচাঁদ রায়চৌধুরী)

পুনশ্চ : আপনার অনেক অসাধ্য সাধনের কথা শুনেছি। আপনার মতো লোকের বাড়িতে যাওয়াটা গৌরবের ব্যাপার। কিন্তু প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এ যাত্রায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। বরং আপনাকেই কষ্ট করে গরিবের বাগানে পদার্পণ করতে হচ্ছে। এখানে এলে আপনার খাতির-যত্নে যে কোনও ত্রুটি থাকবে না, সে নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি। 

||||||||||||

চিঠিটা মনযোগ দিয়ে পড়ে সেটা মামনকে চালান করে দেয় সৌম্য। বলে, 

--ইন্টারেস্টিং। আচ্ছা কিংশুকবাবু, আপনি কি জানেন, শয়তানের জাল বলতে তারাচাঁদ রায়চৌধুরী কি বোঝাতে চেয়েছেন। 

--শয়তানের জাল ! না, এব্যাপারে কিছু শুনিনি তো। অবশ্য আমি মাত্র দু'বছর আগে বাগানে জয়েন করেছি। সবকথা জানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। 


--হুম... ঘটনাটা আমাকে টানছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের যে রকম কাজের চাপ, তাতে মনে হয় আগামী...

সৌম্য 'র কথা শেষ হবার আগেই একরকম আর্তনাদ করে ওঠলেন কিংশুকবাবু। বললেন, 

--প্লিজ, ওরকম বলবেন না স্যার। বাগানের পরিস্থিতি যে কি, সেটা তো বুঝতেই পারছেন। তার ওপর নানা ঘটনায় আমাদের মালিকও আর পুলিশে আস্থা রাখতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিতে আপনিই একমাত্র ভরসা। আমি বলছি কি, আপনারা একবার বিক্রমপুর এসেই দেখুন, ব্যাপারখানা কী। যদি মনে হয় এটা কোনও সাধারণ কেস, ফিরে আসবেন। কথা দিচ্ছি, আপনাদের ফিরে আসার বন্দোবস্তোটুকু করে দেব আমি-ই। 

মামনের দিকে তাকিয়ে সৌম্য বলল, 

-কি রে, চিঠিটা তো পড়লি। তোর কি মনে হয়, যাওয়া যায়? 

-চলোই না, একবার দেখে আসি। পরপর তিনটে খুন, একটা অপহরণের ঘটনা তো আর হেলাফেলার বিষয় নয়। তাছাড়া অদৃশ্য শয়তানটাও বেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার বলে মনে হচ্ছে। 

মামনের কথায় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন কিংশুক। তাঁর দিকে কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, 

-- এবার দয়া করে যদি কখন যাবেন জানিয়ে দেন, সে অনুযায়ী গাড়ি'র বন্দোবস্ত করে রাখব।

সৌম্য বলে, 

--বললেই তো আর হুট করে বেরোনো যায় না। কাল যদি একান্ত যেতেই হয়, বিকেলের আগে হবে না। কারণ, সকালে আমাকে এদিকের কয়েকটা জরুরি কাজ সেরে নিতে হবে।

 

সৌম্য 'র জবাব শুনে মূহুর্তের মধ্যে কিছু ভেবে নিলেন কিংশুক। বললেন, 

--ঠিক আছে তাহলে, আজ রাতটা আমিও শিলচরের বাড়িতে কাটিয়ে দিচ্ছি। কাল শহরে আমারও কিছু কেনাকাটা করার আছে। সেটা সেরে বিকেলেই সবাইকে নিয়ে বিক্রমপুরের উদ্দেশে রওনা দেব। তা ক'টায় এলে আপনাদের সুবিধে? 

সৌম্য বলল, 

--আপনি তিনটের দিকে আসুন। 

--তবে এই কথাই রইল, কাল তিনটের পর আমাদের দেখা হচ্ছে।

|||||||||

সৌম্যদের আরও একপ্রস্ত ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন কিংশুক।

তিনি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর মেডিক্যালের ওদিকে একটা পেটা ঘড়ি ঢংঢং করে বেজে উঠল। 
রাত ১২টা। 


রান্নাবান্না শেষ হয়ে যাওয়ায় খেতে যাওয়ার তাগাদা দিয়ে গেল সহদেব। গভীর চিন্তায় বুঁদ সৌম্যকে তাড়া লাগালো মামন। 

--ওঠো সৌম্যদা, শয়তানের জাল কেটে তুমি পরে-ও বেরোতে পারবে। কিন্তু খিচুড়ি একবার ঠাণ্ডা হয়ে গেলে-ই  সব মাটি... 

মামনের কথায় হো হো করে হেসে ওঠে সৌম্য। বলে, 
--ঠিক বলেছিস রে মামন। ঠাণ্ডা খিচুড়ি আর গোবর----একই কথা।

 

 পর্ব ৩ 

পরদিন। 


সৌম্যদের বেরোতে বেরোতে একটু দেরিই হয়ে গেল। সদরঘাট বরাক সেতু পেরিয়ে রংপুর মধুরামুখ পয়েন্ট হয়ে কিংশুকবাবুর বলেরোটা যখন মহাসড়কে গিয়ে পড়ল, ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে গিয়েছে চারটের ঘর।
 
গতকালের আকাশছেঁচা বৃষ্টি'র পর আজ মাথার উপরের দৃশ্যপট একেবারেই আলাদা। দিগন্তব্যাপী শুধু নীল আর নীল। দু'পাশে ধানক্ষেত। মাঝেমধ্যে টিলা। এসবের মাঝখান দিয়ে মহাসড়কটা তিরের মতো সোজা মিলিয়ে গিয়েছে দূরে।

 

সৌম্য ও কিংশুকের সঙ্গে এটা-ওটা গল্প করতে করতে কখন যে ডলু, তারপর বড়খলা বাজার পেরিয়ে এসেছে--বুঝতে পারেনি মামন। যখন খেয়াল করল, দ্যাখে সামনে চন্দ্রনাথপুর রেলক্রসিং। দূরে রহস্যময় বড়াইল। সাদা মেঘ ছেয়ে আছে পাহাড়ের গায়ে। তার উপর সূর্যের আলো পড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অদ্ভুত বর্ণচ্ছটা। এরকম স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত মনোমুগ্ধকর পরিবেশের মাঝখানে খুনখারাপি----ভাবতেই মন কেমন করে ওঠল মামনের।


গাড়ির ভেতর হঠাৎ দমবন্ধ লাগছে বলে জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল সে। বেলা গড়িয়ে এলেও সূর্য অস্তমিত হতে এখনও ঢের বাকি। ঘড়ি দেখল মামন। সোয়া পাঁচটা। সেপ্টেম্বর মাসে এটাই হয়। সূর্যাস্ত হতে হতে ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে যায় ৬টা'র ঘর। 

||||||||


রেললাইন অতিক্রম করে বাঁদিকের ছোট রাস্তাটা ধরলেন কিংশুক। 

 

খানিকটা এগিয়ে বাগান গেট। গেটের পাশে সাইনবোর্ড । তাতে বড়-বড় হরফে লেখা, 'বিক্রমপুর টি-এস্টেট'।

 

সাধারণত গেট বলতে  যা বোঝায়, এটা কিন্তু সেরকম কিছু নয়। রাস্তার আড়া-আড়ি খানিকটা উঁচু করে ঢেঁকি'র আদলে একটা লম্বা শক্ত বাঁশ খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা। বাঁশের একমাথায় বস্তাবন্দি অনেকগুলো ইট দড়ি দিয়ে ঝুলানো। এদিকটা ভারি। উল্টোদিকের মাথায় রশি পরিয়ে বাঁশটাকে টেনে খুঁটির সঙ্গে প্যাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। এবার গাড়ি এলে হালকা দিকে থাকা রশি'র প্যাঁচ খুলে দিলেই হল। ভারি দিকটা নিচের দিকে নেমে গিয়ে স্যাঁৎ করে বাঁশের অন্যদিকটা উঠে যাবে উপরে। এখান থেকে বাগানের ফ্যাক্টরি-ঘর বড়জোর আধ-কিলোমিটার। 

ম্যানেজারের গাড়ি দেখে গেটম্যান দ্রুত ফটক খুলে দিয়ে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে রইল। 

 

এবড়োখেবড়ো রাস্তা ধরে কিছুটা দূর এগিয়ে যাওয়ার পর একটা সাবেকি আমলের সুসজ্জিত বাংলোর পোর্টিকো-য় নিয়ে গাড়িটাকে দাঁড় করালেন কিংশুক। 


||||||
 

সৌম্যরা যে আসবে, এব্যাপারে বোধহয় আগে থেকেই বলে রাখা হয়েছে। গাড়ির আওয়াজ শুনে খানসামা গোছের তিন-চারজন লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। 

সৌম্য ও মামনের সঙ্গে লাগেজ বলতে শুধু দু'টি ছোট ট্র‍্যাভেলব্যাগ। সেগুলো নিয়ে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল লোকগুলো। কিংশুক বললেন,

--এই বাড়িটা-ই  হচ্ছে আমাদের বাগান মালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরী'র বাংলো। চলুন, ভেতরে যাওয়া যাক। 

বলতে বলতে সবাইকে নিয়ে একটা সুবিশাল ড্রইংরুমে বসালেন কিংশুক। ঘরময় জুঁই ফুলের মিষ্টি সুবাস। 

 

নরম সোফায় বসে চারদিকে চোখ বোলাতে লাগল সৌম্য। এককোণে একটা বড় পাত্রে জল ভরে রাখা। তাতে ভাসছে তাজা জুঁই ফুলের পাঁপড়ি। ঘরের ভিতর দামি আসবাব। প্রায় অ্যান্টিক হয়ে ওঠা বহুপুরোনো দরজা-জানালা গুলো সব বার্মিজ সেগুন কাঠের। ঝকঝকে পালিশ ওঠানো কাঠের গায়ে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা কারুকাজ। দেয়ালে মুণ্ডুসমেত একটা বাঘছাল, হরিণের শিঙ, পাশে আড়া-আড়ি করে দু'টো বন্দুক সাঁটানো। এর ঠিক উপরে ইয়া গোঁফ ওয়ালা এক ভদ্রলোকের বিশাল পোট্রের্ট। গলাবন্ধ কোট, মাথায় হ্যাট, হাটু পর্যন্ত গামবুট পরিহিত ভদ্রলোকের চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। একটা অদ্ভুতদর্শন বন্দুকের উপর হাত দু'টি রেখে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। গলায় হীরের হার। ছবিতে হাতের আঙুলেও কয়েকটা হীরের আঙটি উঁকি দিচ্ছে। 


সৌম্য আন্দাজ করে, পোট্রের্ট-টা তারাচাঁদ রায়চৌধুরী'র বাবা গোরাচাঁদ রায়চৌধুরী'র। তবে দেয়ালের বাঘছালটা দেখে কিছুটা অবাকই হল সে। কেননা, সোম্য যতটুকু জানে, সেই তথ্য অনুযায়ী বড়াইল রেঞ্জে শেষবারের মতো বাঘের দেখা মিলেছে প্রায় ৬০ বছর আগে। তারমানে ঘরের শোভাবর্ধনে ব্যবহৃত ওই ব্যাঘ্রচর্মটি'র বয়স ৬০ বছরেরও বেশি। আর যদি এটা-ই হয়, তাহলে কোনও সন্দেহ নেই, ওইসময় পর্যন্ত বাগান মালিক ছিল শ্বেতাঙ্গরাই। এই হিসেবে গেলে তারাচাঁদবাবু'র বাবা গোরাচাঁদ রায়চৌধুরী তখনও বাগানে ম্যানেজারি করছেন। মালিক হয়ে ওঠার আগেও কী তাঁর  শিকারের শখ ছিল? খবর নিতে হচ্ছে তো।

বসেবসে নানা কথা ভাবছে সৌম্য। চুপচাপ বসে আছে মামন ও কিংশুক। এমন সময়। 

--রাস্তায় আপনাদের কোনও কষ্ট হয়নি তো?

 

পেছনদিক থেকে ভেসে আসা গুরুগম্ভীর আওয়াজে চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে যায় সৌম্য'র। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, দুই কক্ষের মাঝখানে দরজা'র চৌকাঠে হাত রেখে এক দীর্ঘকায় সুদর্শন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। উন্নত ললাট, টিকলো নাক, চোখেমুখে ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট। দেখলেই কেমন যেন সম্ভ্রম জাগে।

তাঁকে দেখে সসম্ভ্রমে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কিংশুক। ইনি-ই যে বাগান-মালিক তারাচাঁদ রায়চৌধুরী, সেটা কিংশুকের বডি ল্যাংগুয়েজ দেখেই আন্দাজ করে নিল সৌম্য। বললো,  

--না...না... , কষ্ট কেন হবে? এটুকুই তো মাত্র রাস্তা। 

--ধন্যবাদ সৌম্যবাবু। আপনারা এসেছেন দেখে আশ্বস্ত হলাম।

 

স্মিত হেসে সৌম্য বলে,

--আপনাকে আশ্বস্ত করার মতো এখনও কিছু করতে পারিনি। আগে সব শুনে নিই। তারপর দেখি, কিছু করা যায় কি-না।  তা ব্যাপারটা কী, একটু যদি বলেন? 

--সব বলবো বলেই তো আপনাদের  এতদূর ডেকে আনা  ...  

বলতে বলতে দরজায় গিয়ে মাথাটা বের করে উঁকি দিলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। আশপাশটা একবার ভাল করে দেখে নিয়ে  দরজা-জানালার পর্দা গুলো সরিয়ে দিলেন নিজের হাতে। 


সম্ভবত ঘরের ভিতরে বসে বাইরে নজর রাখার জন্যই এমনটা করেছেন তিনি। ব্যাপারটা গোপনীয় মনে করে কিংশুক চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন । তাঁকে আটকালেন তারাচাঁদবাবু। বললেন, 

--বসো কিংশুক। তুমি যেহেতু এখানে চাকরি  করছো, তা-ই তোমারও সবটা জেনে রাখা দরকার। 

তারপর সৌম্যদের লক্ষ্য করে খুব খাটো গলায় বলতে লাগলেন, 

-কথাটা কীভাবে শুরু করব ঠিক বুঝতে পারছি না। কারণ,  একবিংশ শতাব্দীতে এরকম একটা ঘটনা ক'জনের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে , সেব্যাপারে আমি নিজেও সন্দিহান। এমনও হতে পারে, পুরোটা শোনার পর আপনারা-ই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি যা বলতে যাচ্ছি, তার একটি বর্ণ-ও মিথ্যে নয়। 


এই পর্যন্ত বলে  দম নেওয়ার জন্য একটু থামলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। 

||||||||


জানালার কাঁচের ওপারে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। দূর বড়াইল পাহাড়ের বুকে জমে থাকা চাপচাপ অন্ধকার ধীরেধীরে নেমে আসছে বিক্রমপুরের উপর। চারদিক চুপচাপ। নির্জন। গলা খাঁকারি দিয়ে তারাচাঁদবাবু বলতে শুরু করলেন...

--বাগানে পরপর তিনটে খুন ও একটি অপহরণের ঘটনা ঘটছে, সেকথা আপনারা শুনেছেন। পুলিশের ধারণা , এগুলো কোনও হিংস্র জানোয়ারের কাণ্ড। কিন্তু আমি জানি, ওদের এই ধারণাটা ভ্রান্ত। 

-আপনি এতটা শিওর হচ্ছেন কি করে ? 
জিগ্যেস করে সৌম্য।

 

তারাচাঁদ বলেন, 

--কারণ, আমি জানি এসব কে করছে। 

--তাহলে তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছেন না কেন? উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে মামন।  

 

ম্লান হেসে তারাচাঁদ বলেন,
--সবকিছু যতটা সহজ বলে মনে হচ্ছে, আসলে ততটা সহজ নয়। কেননা , যে খুন করছে, পুলিশের সাধ্যি নেই তাকে ধরে।

--কেন , কেন? এসব কি কোনও উগ্রপন্থী দলের কাজ বলে মনে হচ্ছে আপনার? 


সৌম্য'র প্রশ্নে তারাচাঁদ বললেন, 

--সেটা হলে তো আর কথাই ছিল না। পুলিশ না পারুক,  সেনাবাহিনী ডেকে কবে ব্যাটাদের ধরিয়ে দিতাম।

 

--অপরাধী একের পর এক খুন করে যাচ্ছে, আর আপনি বলছেন, সেনা-পুলিশ কেউ-ই তাকে ধরতে পারবে না ! কেন, তার  কি মানুষের মতো হাত-পা নেই? 

 

--সৌম্যবাবু, ঠাট্টার ছলে হলেও আপনি কিন্তু আসল কথাটাই বলে ফেলেছেন। এ খুন মানুষের কাজ নয়। 

--মানে? 

--এই মানেটাই খুব গোলমেলে ব্যাপার সৌম্যবাবু। আসলে শহরের কোলাহল থেকে দূর বড়াইল রেঞ্জের কোল ঘেঁষে থাকা বিক্রমপুর হচ্ছে একটা রহস্যের খনি। এখানে জঙ্গলের মাঝখানে রয়েছে দেড়শ বছরেরও বেশি পুরনো সাহেবদের পরিত্যক্ত কুঠি। কুঠি'র পেছনে গা ছমছমে এক কবরস্থান। জায়গাটা সম্পর্কে নানা কথা শোনা যায়। বাগানের বেশিরভাগ লোকের বিশ্বাস, ওই গোরস্তানের কোনও এক কবরে না-কি সাহেবের পিশাচ শায়িত। কথাটায় কোনও কালেই পাত্তা দিইনি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমে মনে হচ্ছে, শতাব্দীর অন্ধকার থেকে পিশাচটাকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে।


পিশাচের কথা বলতে গিয়ে তারাচাঁদ রায়চৌধুরী'র মত দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাগানমালিকের গলা যেন কেঁপে গেল!  সন্দেহ নেই, প্রচণ্ড ভয় পেয়েছেন তিনি। এদিকে, তারাচাঁদবাবুর মতো মানুষের মুখে এরকম একটা কথা শুনে  তাজ্জব বনে গেল সৌম্য। বললো, 

--মাপ করবেন তারাচাঁদবাবু। আপনার মতো একজন লোক পিশাচের কথা বলছেন, এটা নিজের কানে-ই কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকছে। আমার মনে হয়, সত্যানুসন্ধানকারী নয়, আপনার দরকার একজন তন্ত্রসাধকের।


সৌম্য 'র খোঁচাটা  নীরবে হজম করে নিলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। বললেন, 

--সৌম্যবাবু, একটা কথা আপনাকে এখনও বলা হয়নি। তাই আপনি জানেন না, আমার পড়াশোনা এবং বেড়ে ওঠা---দু'টোই দিল্লিতে। বিজনেস ম্যানেজমেন্ট করেছি মার্কিন মুলুক থেকে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, আর যাই হোক অলৌকিকে পাত্তা দেয়ার বান্দা আমি নই। ফলে বাগানে যেদিন প্রথম খুনের ঘটনা ঘটল, আমাদের কুলপুরোহিত রুদ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের মুখে পিশাচের কথা শুনে আপনার মতো মনোভাব তৈরি হয়েছিল আমারও। ভেবেছিলাম, যত্তসব আজগুবি। হয়তো আমি আমার বিশ্বাসেই অনড় থাকতুম। কিন্তু গতকাল সন্ধেয় আমার আজন্ম লালিত বিশ্বাসের ভিতটাই নড়ে গিয়েছে। 

--হুম...গতকাল কী এমন ঘটল যে, একদিনেই আপনার বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেল !  

সৌম্য 'র প্রশ্নে তারাচাঁদবাবু বলতে লাগলেন, 

--হয়েছে কি, একটা বিশেষ দরকারে গতকাল সন্ধেবেলা সিন্দুক থেকে পুরনো কাগজপত্র বের করে নাড়াঘাঁটা করছি,  হঠাৎ একটা বহুপুরোনো ডায়েরি হাত লাগল। দেখি, ডায়েরিটা আমার স্বর্গবাসী পিতা গোরাচাঁদ রায়চৌধুরী'র। অদম্য কৌতূহল নিয়ে পড়তে শুরু করলাম সেটা। কয়েকটা পাতা ওলটানোর পর দেখতে পেলাম- বাবা লিখছেন, তিনি বাগানে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পর বিক্রমপুরে একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটতে থাকে। কিন্তু কে খুনি, সেটা ধরা যাচ্ছিল না কিছুতেই। এভাবে চলতে চলতে একসময় আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, দিনের বেলায়ও মানুষজন চলাফেরা বন্ধ করে দেয়। উপায়ন্তর না দেখে রহস্যের জট খুলতে ময়দানে অবতীর্ণ হন তিনি নিজে -ই। তত্ত্বতালাশ নিতে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন এক অদ্ভুত ঘটনা। সেসব কথার দীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে আপনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। মোদ্দা কথা হচ্ছে, বাগানের গোড়াপত্তনের কয়েকবছর আগে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল থেকে পালিয়ে বিক্রমপুরে এসে আত্মগোপন করেছিলেন এক স্বাধীনতা সংগ্রামী। ইংরেজদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সম্ভবত নেপালের দিকে  পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। কিন্তু দিগভ্রান্ত হয়ে তিনি এসে  পড়েন এদিকটায়। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, সাহেবদের বিরুদ্ধে অসী হাতে তুলে নিয়েছিলেন যিনি, জানা যায় তাঁর নামটাও নাকি ছিল সাহেব! 

 

--কি বললেন, সাহেব? 
সৌম্য'র প্রশ্নে ছেদ পড়ে কথায়।

 

তারাচাঁদ বাবু বলেন, 

-ডায়েরিতে তো এই নামটাই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় এটা তাঁর ছদ্মনাম-ই হবে। আসল নাম ছিল অন্যকিছু।  সে যাইহোক, এবার ডায়েরির পাতায় ফিরে যাই। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, পথশ্রান্ত ক্ষুধার্ত সাহেব নামের ওই বিদ্রোহী নেতা বিক্রমপুরে কিছুদিন বিশ্রাম নেন। দিনকয়েক থাকার  পর এখানকার জঙ্গল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই ভাল লেগে যায় যে, জীবনের বাকি সময়টা তিনি এখানেই কাটিয়ে দেওয়ার মনস্থির করে ফেলেন। কিন্তু আমার অনুমান, এই জায়গাটা বেছে নেওয়ার পেছনে অন্য একটা কারণও ছিল। কেননা, গভীর জঙ্গলে পরিবেষ্টিত থাকায় বড়খলা বিক্রমপুর ছিল বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটা জনপদ। সুতরাং আত্মগোপন করার পক্ষে জায়গাটা আদর্শ বলেই বিবেচিত হয়েছিল তাঁর কাছে। ফলে কিছুদিনের মধ্যে কুঠি তৈরি করে তিনি পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। আর এখানেই বড় ভুলটা করে ফেলেন ওই বিদ্রোহী সাহেব। এখানকার ভূগোল এবং ভাষাগত জ্ঞান কম থাকার কারণে তিনি জানতেন-ই  না, ইংরেজরা ততদিনে কাছাড়ে ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছে। একদম তাঁর পাশেই। শিলচরে। যখন জানলেন, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফলে  যা ঘটবার তা-ই ঘটল একদিন। গভীর রাতে দলবল নিয়ে কুঠি আক্রমণ করল ক্যাপ্টেন রবার্ট স্ট্যুয়ার্ট ও লেফটেন্যান্ট জো সেরার। বীরবিক্রমে লড়ে শেষপর্যন্ত সাহেবদের হাতে নিহত হলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী অশ্বেত সাহেব। তাঁকে খুন করে কুঠি'র জঙ্গলে পুঁতে রাখে স্ট্যুয়ার্ট বাহিনী। কিন্তু একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ সন্তানের শাস্ত্রানুসারে শেষকৃত্য না হওয়ায় তাঁর আত্মার মুক্তি ঘটেনি। পিশাচযোনি প্রাপ্ত হয়ে কবরের অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকে সাহেবের লাশ। প্রতি পঞ্চাশ বছর পরপর ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে কিছুদিনের জন্য জেগে উঠে সাহেবের অতৃপ্ত আত্মা। ঘুরে বেড়ায় বিক্রমপুরের বনেবাদাড়ে। সামনে যাকে পায় তাকে খুন করে। হিসেব মিলিয়ে দেখা যায়, সাহেবের দেড়শতম মৃত্যুদিন পেরিয়েছে গত ২২ আগস্ট। এর ঠিক একদিন পর বাগানে প্রথম খুনটা ঘটে। এসব কথা জানার পর আমার রাতের ঘুম উবে গিয়েছে সৌম্যবাবু। কারণ, আমার বাবা প্রয়াত জিসি রায়চৌধুরী একেবারেই ফালতু কথার মানুষ ছিলেন না। পঞ্চাশ বছর আগে পিশাচের মোকাবিলা করে এই বাগানের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর মতো বিচক্ষণতা এবং শক্তি কোনটাই আমার নেই। তাই আপনাদের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। 

 

|||||||||

 

 

বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গিয়েছে মামনের। কিংশুকের অবস্থাও তথৈবচ। ঘরের ভিতর বোধহয় একটা আলপিন পড়লেও শব্দ শোনা যাবে। শুধু সৌম্য 'র অভিব্যক্তিতে তেমন কোনও পরিবর্তন নেই। কেমন যেন নিরাসক্ত ভঙ্গিমায় বসে সবকিছু শুনছে সে। এবার জিগ্যেস করল, 

--আর কি কিছু জানতে পেরেছেন ডায়েরি পড়ে?

তারাচাঁদ রায়চৌধুরী বললেন, 

--ডায়েরিতে উল্লেখ রয়েছে, সাহেবের কাছে প্রচুর সোনাদানা ও হীরে-জহরতের ভাণ্ডার ছিল। শ্বেতাঙ্গদের আক্রমণের আগেই সেটা তিনি বাগান কুঠি'র কোনও এক গোপন স্থানে লুকিয়ে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে ইংরেজরা শত চেষ্টা করেও সেই রত্নভাণ্ডারের হদিস বের করতে পারেনি।

 

কথাবার্তার মাঝখানে একটা খানসামা গোছের লোক এসে চা দিয়ে গেল। তাকে দেখে কথা বন্ধ করে দিলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। বললেন,

--চা নিন প্লিজ।

চিন্তিত মুখে চায়ের কাপ তুলে নিল সৌম্য।

 
মামন আর কিংশুক তো একেবারে থ। তাদের মুখে কোনো কথাই সরছে না আর। চায়ের কাপে লম্বা সিপ নিয়ে সৌম্য বলল,

--তারাচাঁদবাবু, একটা সিগারেট ধরালে কী আপনার অসুবিধে হবে? 

-না না, আমিও সিগারেটের শৌখিন। 

--ধন্যবাদ। 

কথা বলতে বলতে পকেট থেকে উইলস ফিল্টারের প্যাকেটটা বের করল সৌম্য। হঠাৎ দূর জঙ্গলের দিক থেকে ভেসে এল সম্মিলিত মানুষের কোলাহল। খানসামা এসে জানাল, এইমাত্র বাগান কুঠি'র জঙ্গলে শম্ভু বাগদি'র লাশ উদ্ধার হয়েছে।

 পর্ব ৪ 

 

লাশ উদ্ধারের খবর শুনে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন তারাচাঁদবাবু। বললেন, 

-আমাকে এখনই একবার ঘটনাস্থলে যেতে হচ্ছে। আপনারা কি আমার সঙ্গে যাবেন সৌম্যবাবু?

--অবশ্যই। 

--ঠিক আছে তাহলে। আপনারা একটু বসুন। আমি চট করে তৈরি হয়ে আসছি। 


বড়জোর মিনিট পাঁচেক, এরমধ্যে তৈরি হয়ে সৌম্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন তারাচাঁদবাবু। হাঁটাপথে বাংলো থেকে বাগান কুঠি'র দূরত্ব খুব বেশি হলে মিনিট পনেরোর রাস্তা।

|||||||

কৃষ্ণপক্ষের ঝিঁঝি ডাকা রাত, চারদিকে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার! 


গতকালের বৃষ্টির পর রাস্তার দু-এক জায়গায় জল জমা হয়ে আছে। তবে বাঁচোয়া এটাই যে, এই অঞ্চলের মাটিতে বালুর পরিমাণ বেশি থাকায় রাস্তাটা কর্দমাক্ত হয়ে ওঠেনি। কিছুদূর যাওয়ার পর দূরে জঙ্গলের মাঝখানে একটা জায়গায় কয়েকটা মশাল দেখতে পেলো সৌম্যরা। সেই আলোর দিকেই হনহনিয়ে এগোতে লাগলেন তারাচাঁদ বাবু। 


কিংশুক বললেন, 

--স্যার, রাতে ক্ষত-বিক্ষত লাশ দেখলে আপনার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিগড়ে যেতে পারে। তারচে বরং আপনি বাংলোয় ফিরে যান। এদিকটা আমরা সামলে নেবো।

--সে হয় না কিংশুক। ভুলে যেওনা, শম্ভু আমার বাগানের শ্রমিক। সুতরাং আমাকে আমার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতেই হবে।

 

কথা বলতে বলতে কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেল সবাই। তারাচাঁদ বাবুকে দেখে কোলাহল থেমে গেল। 

একটু দূরে। গাছগাছালি ঘেরা অন্ধকার টিলার উপর কুঠিটাকে দেখতে দৈত্যের মতো লাগছে। বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর মাঝখানে চিৎ হয়ে পড়ে আছে শম্ভু বাগদির ক্ষত-বিক্ষত দেহ। মধ্যবয়সী লোকটার পরনে একটা ময়লা জিনস ও স্যান্ডো গেঞ্জি। গেঞ্জিটা ছিঁড়ে একেবারে ফালাফালা। এক পায়ে হাওয়াই চপ্পল, অন্য পায়ের চপ্পলটি গায়েব। মুখ এবং বুকের কয়েকটা জায়গা থেকে মাংস বিশ্রীভাবে খুবলে নেওয়া হয়েছে ! ভয়ার্ত চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে এসেছে বাইরের দিকে। বীভৎস চেহারা। লাশ দেখেই বোঝা যায়, নির্মম মৃত্যু হয়েছে শম্ভু বাগদি'র। আর মৃত্যুর আগে কোনো কারণে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে সে। 

 

|||||||

রাতের জঙ্গলে মশালের আলোয় দৃশ্যটা সত্যিই ভয়ঙ্কর। মুখ ফিরিয়ে নিলেন তারাচাঁদ বাবু। কিন্তু সৌম্য যেন নির্বিকার। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে লাশটাকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল সে।

 

সবুজ ঘাসের উপর দু-তিন জায়গায় ছোপ-ছোপ রক্ত। তবে পরিমাণে সেটা অতি সামান্যই। মরদেহটি নাড়াচাড়া করতে গিয়ে অভিজ্ঞ সৌম্য আন্দাজ করে নেয়, ডেড বডিতে রিগর মরটিস শুরু হয়েছে অন্তত ৮ থেকে ১০ ঘন্টা আগে। মোবাইল ঘড়িতে চোখ রেখে মনেমনে একটা হিসেব মিলিয়ে নেয় সৌম্য। চিন্তিত কণ্ঠে মামনকে বলে, 

--একটা কাজ কর মামন। চেষ্টা করে দ্যাখ, প্রতুল দারোগাকে ফোনে পাওয়া যায় কি-না। ধরতে পারলে আমাকে দিস। ততক্ষণে আমি এদিকটা আরও একটু ভাল করে দেখে নিই। 

কথা শেষ করে  ভিড়টাকে একটু তফাতে সরিয়ে দিল সৌম্য। বলল, 

--তারাচাঁদবাবু, আপনি কি লোকাল থানায় ফোন করেছেন?

 

--না সৌম্যবাবু, তাড়াহুড়োর কারণে ফোনটা আর করা হয়ে ওঠেনি। 

-- এখনই থানায় ফোন করুন । ভুলে যাবেন-না, এটা একটা অস্বাভাবিক মৃত্যু। তাই পুলিশে খবর দেয়াটা জরুরি।

 

||||||||||||


সৌম্য 'র কথামতো বড়খলা থানার নম্বরে রিং করলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। 


এদিকে, বার দুয়েক চেষ্টা করে প্রতুল দারোগাকে ফোনে পেয়ে গেল মামন। 

পর্তুগিজ আমলের তালাচাবি ও ছবি রহস্য উদঘাটনে সাফল্যের পর প্রতুলবাবু পদোন্নতি পেয়ে চলে গিয়েছিলেন আসাম-বেঙ্গল বর্ডার শ্রীরামপুর। হালে আবার সেখান থেকে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে তিনি কাছাড়ের ডেপুটি পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট। 

কল রিসিভ হতে না হতেই ফোনটা সৌম্যকে বাড়িয়ে দিল মামন। মোবাইল হাতে নিয়ে প্রতুলবাবুকে নিজের পরিচয়টা দিল সৌম্য। 

এতদিন বাদে সৌম্য 'র ফোন পেয়ে প্রতুলবাবু প্রচণ্ড রকমের উত্তেজিত। উত্তেজনার চোটে তিনি এতটা উচ্চগ্রামে কথা বলছেন যে, মোবাইলটা লাউডস্পিকার মোডে না থাকা সত্বেও নির্জন জঙ্গলে তাঁর বার্তালাপ বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মামন শুনতে পেল, প্রতুল হাজরিকা বলছেন,  

--একি সৌম্য ডাঙরিয়া, এতদিন আপনি কোথায় ছিলেন বলুন তো? কোনও ফোন নেই, যোগাযোগ নেই ! 

 
--আমি তো কোথাও যাইনি প্রতুলবাবু, এই শহরেই আছি। কিন্তু পদোন্নতি পেয়ে  শহর ছেড়ে চলে গেসলেন আপনি। দু'হপ্তা হল, সেখান থেকে ফিরেও এসেছেন, অথচ এই অধমকে তো একটিবার ফোনও করলেন না। 

--আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি ডাঙরিয়া। আসলে আমার আগের মোবাইলটি হঠাৎ বিকল হয়ে যাওয়ায় বহু ইম্পরট্যান্ট নাম্বার হারিয়ে গেছে। শিলচর আসা ইস্তক রোজ ভাবছি আপনার সঙ্গে দেখা করব। কিন্তু নানা ঝুট-ঝামেলায় সেটা আর হয়ে উঠছে না। বুঝতেই পারছেন পুলিশের চাকরি...তা আপনি এখন কোথায় আছেন বলুনতো, আমি নিজেই আসছি আপনার ওখানে। এতে দু'জনের মোলাকাতটাও হয়ে যাবে, আর আপনার রাগটাও কমবে।  

প্রতুলবাবুর কথায় হেসে উঠল সৌম্য। বলল, 

--আমি আর মামন এখন শহর থেকে কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার দূর একটা গভীর জঙ্গলে। আমাদের সামনে একটা ক্ষতবিক্ষত লাশ... 
 
--অ্যাঁ, কী বললেন! ক্ষতবিক্ষত লাশ?  

--হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, আমাদের সামনে একটা লাশ পড়ে আছে। 

-- ওহ্হ মাই গুডনেস! লোকেশানটা তাড়াতাড়ি বলুন, আমি এখনই ওখানে আসছি। 


হাজার হোক, প্রতুলবাবু পুলিশের লোক। তার ওপর অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ। সবমিলিয়ে তাঁর যেন আর তর সইছে না । তাঁকে নিরস্ত করল সৌম্য। বলল,

--শুনুন প্রতুলবাবু। আমরা এখন রয়েছি বিক্রমপুর চা-বাগানে। জায়গাটা বড়খলা থানা অ্যারিয়ায় এবং শিলচর থেকে অনেকটা দূর। তাই বলছিলাম কি, রাতের বেলা এতটা পথ না ভেঙে আপনি বরং ধীরেসুস্থে সকালেই আসুন।


একথা বলে খুব সংক্ষেপে ঘটনাটা বর্ণনা করে সৌম্য। বলে, 

--আপনি লোক্যাল থানার ইনচার্জকে বলে এখানে কাউকে তাড়াতাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।

 

--সে না-হয় আমি এক্ষুনি বলে দিচ্ছি। কিন্তু আপনি এমন একটা খবর শোনালেন যে, আজ রাতে আর আমার ঘুম আসবে না ডাঙরিয়া। একের পর এক খুন, বিদ্রোহী নেতা, ইংরেজ সেনার আক্রমণ, পিশাচ, গুপ্তধন--- উফফ ! এ্যাত্তো সব শোনার পর ঘরে থাকি কি করে বলুন! আমার তো মনে হচ্ছে, এখনই উড়ে যাই আপনাদের ওখানে... 


--না, না। আপনি এতো উতলা হবেন না। আর আমি জানি, আপনি কি নিয়ে এতো ভাবছেন। চিন্তা করবেন না, তদন্ত আপনি এলেই শুরু হবে।

সৌম্যর কথায় খানিকটা যেন আশ্বস্ত হলেন প্রতুল হাজরিকা। বললেন, 

--বলছেন?  ঠিক আছে তবে , এই কথাই রইলো। আমি সকাল ৮টার আগে বিক্রমপুর এসে পোঁছাচ্ছি।  

কথা শেষ করে ফোন কেটে দিলেন প্রতুল।


||||

লাশ ছেড়ে এবার আশপাশের ঝোপঝাড় ও গাছপালায় মনোনিবেশ করল সৌম্য। মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বেলে কিছুদূর যাওয়ার পর মাটি থেকে তুলে কী একটা যেন পকেটে চালান করে দিলো। এদিক-সেদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ পাশের ঝোপে হারিয়ে গেল সে। 

 

তাকে এভাবে ঝোপঝাড়ের ভেতর ঢুকতে দেখে তারাচাঁদ রায়চৌধুরী হাহা করে উঠলেন। বললেন, 

--ভদ্রলোক করছেনটা কী! এই জঙ্গলে প্রচুর সাপখোপ রয়েছে। তাছাড়া আরও কতকিছু থাকতে পারে। তিনি কী সেটা জানেন না! 

মামন বলল, 

--আপনি অযথাই চিন্তা করছেন। সাপখোপ, দত্যিদানো সৌম্যদার কিস্যু করতে পারবে না। 

--কেন? 

--কারণ সৌম্যদা ওঝারও ওঝা। 


মামনের উত্তরে খানিকটা অবাক হলেন তারাচাঁদবাবু। দাঁড়িয়ে রইলেন চুপচাপ। এভাবেই কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। 


হঠাৎ দূর থেকে গাড়ির ইঞ্জিনের গরগর আওয়াজ ভেসে এল। কান পেতে মামন আন্দাজ করে নেয়, শব্দটা আসছে মাইলটাক দূর বাগানের প্রবেশ গেটের ওদিক থেকে। সেদিকে তাকাতেই নজরে এল, একটা আলোর ফুটকি ক্রমশ বড় হয়ে আসছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেটা কাছে এসে একেবারে চোখ ধাঁধিয়ে দিল সবার।  চারজন কনস্টেবল নিয়ে জিপ থেকে নামলেন ইনচার্জ গোছের এক পুলিশ অফিসার। পুলিশের জিপের পেছনে একটা অ্যাম্বুলেন্স জাতীয় শববাহী শকটও রয়েছে। 
 

গাড়ির আওয়াজ পেয়ে ঝোপ থেকে গা ঝাড়তে ঝাড়তে বেরিয়ে এল সৌম্য। ইন্সপেক্টর জিগ্যেস করলেন, 

--আপনাদের মধ্যে সৌম্যেন্দ্রনাথ সরকার কে?

--আমিই সৌম্যেন্দ্রনাথ। 

--নমস্কার সৌম্যবাবু। আমি অসীম কর্মকার। বড়খলা থানার আইসি। ডিএসপি স্যার আপনার কথা বলেছেন। আপনি  কী কোনও ক্লু বের করতে পেরেছেন?  

প্রতি নমস্কার জানিয়ে সৌম্য বলল,

--না না, এখনও তেমন কিছু হাত লাগেনি। এবার আপনি দেখুন। 

--কী যে বলেন, আপনি থাকতে আমার আর কি দেখার থাকতে পারে বলুন। 

--দেখুন-না, যদি কোনও ক্লু বেরিয়ে আসে...

জিভ কেটে  কর্মকার বললেন 

--প্রতুল স্যারের কাছে যা শুনলাম , এরপর আমার আরকিছু দেখা মানে সে হবে ধৃষ্টতার সামিল। আপনি দেখে নিয়েছেন, ওতেই হয়ে যাবে। তবে নিয়মরক্ষার খাতিরে আমাকে শুধু দু'একটা কাজ করতে হবে। 

||||||||


ইন্সপেক্টর ভদ্রলোকের কথাবার্তা বেশ অমায়িক। মনে হল উপরওয়ালার ফোন পেয়ে তিনি সৌম্যকে কেষ্টবিষ্টু গোছের কেউ একজন ধরে নিয়েছেন। সমীহ মেশানো সুরে কথা বলছেন বেশ মেপে।


লাশটাকে দূর থেকে নিরীক্ষণ করার পর কয়েকজন শ্রমিকের জবানবন্দি নোট  করে নিলেন তিনি।  সৌম্যকে বললেন, 

--আপনার যদি আর কিছু দেখার না থাকে তবে লাশটাকে এবার মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। 

 

--আর কিছু দেখার নেই। আপনি আপনার কাজ করুন। 

সৌম্যর সবুজ সঙ্কেত পেয়ে শম্ভু বাগদির লাশটাকে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে লেগে গেলেন অসীম কর্মকার। 

ইতিমধ্যে শম্ভুর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাগানের বেশকিছু শ্রমিক ঘটনাস্থলে এসে জড়ো হয়েছে। 


স্বামীর মৃতদেহের পাশে বিলাপ করতে করতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো শম্ভুর পত্নী ফুলিয়া। 


মামন চেয়ে দেখল, শম্ভুর চার সন্তান। এরমধ্যে তিনটি-ই মেয়ে। ছেলেটি'র বয়স বড়জোর ১০ বছর। মেয়ে তিনটির বয়স আরও কম।  
ছোটছোট ছেলেমেয়েগুলোর কথা চিন্তা করে মন খারাপ হয়ে এল মামনের।

 

তারাচাঁদ রায়চৌধুরী বললেন, 

--যা হবার সেটা তো হয়েই গিয়েছে ফুলিয়া। এবার মনটাকে শক্ত কর। আর শোন, তোর ছেলেমেয়েরা বড় না হওয়া পর্যন্ত ওদের ভরণপোষণের সমস্ত দায়িত্ব আজ থেকে আমাদের কোম্পানির।


|||||||||||| 


কিছুক্ষণের মধ্যে ডেডবডি অ্যাম্বুলেন্সে  তুলে নিয়ে পুলিশের গাড়িটা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বাংলোয় ফিরে এল সৌম্যরা। 

 

মড়া নাড়াঘাঁটা করে এসেছে সবাই। তাই কাপড়চোপড় ধুয়ে স্নান সেরে নিতে বেশ রাত হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়ার পর তারাচাঁদবাবু বললেন,

--আপনাদের সঙ্গে আর সকালে দেখা হবে সৌম্যবাবু। এরজন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। তবে আমি না থাকলেও আপনাদের কোনও সমস্যা হবে না। কিংশুক আছেন, আজকের রাতটা তিনিই আপনাদের খেয়াল রাখবেন। বুঝতেই পারছেন আমার মানসিক অবস্থা। 

 

--এতে মনে করার কিছু নেই। আপনি গিয়ে নিশ্চিন্তমনে বিশ্রাম নিন। তবে যাবার আগে আপনার বাবার ডায়েরিটা দিয়ে গেলে  আমার একটু সুবিধে হয়। সেটা দিতে আপনার আপত্তি নেই তো? 


---কীসের আপত্তি আবার! দাঁড়ান, ওটা আমি নিজেই এনে দিচ্ছি। 

এই বলে পাশের কক্ষে চলে গেলেন তারাচাঁদ বাবু। একটু বাদে একটা বহু পুরোনো ডায়েরি এনে সৌম্যর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, 

--এই নিন ডায়েরিটা। আপনি নিজেই পড়ে দেখুন। 

ডায়েরি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল সৌম্য। শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন কিংশুক। বললেন, 

--চলুন, আপনাদের শোবার ঘরটা দেখিয়ে দিই।

 

|||||||||||

 

বাংলোতেই একটা বিশাল কক্ষে সৌম্যদের শোবার ব্যবস্থা হয়েছে। ঘরটা দেখিয়ে দিয়ে কিংশুকবাবু চলে গিয়েছেন তাঁর কোয়ার্টারে। 


দরজা বন্ধ করে সটান বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়েছে মামন। রাজ্যের ক্লান্তি তার শরীরে। দুচোখের পাতা ভারি হয়ে আসছে ক্রমশ। দেখতে দেখতে ঘুমের অতলে  হারিয়ে গেল সে। 

 

কিন্তু সৌম্যর চোখে ঘুম নেই। ডায়েরিটা নিয়ে টেবিলের সামনের চেয়ারটায় গিয়ে পা ছড়িয়ে বসল সে। ধীরেধীরে তলিয়ে গেল ডায়েরির পাতায়। 


|||||||||||


গভীর রাত। পাহাড়ঘেরা নিস্তব্ধ বিক্রমপুর। এই মূহুর্তে এই বিশ্বচরাচরে কেউ জেগে আছে বলে মনে হয় না। হঠাৎ দূরে কোথাও একপাল শেয়াল হেঁকে উঠল সমস্বরে। নির্জন রাতে তাদের এই ডাক শোনালো আর্তনাদের মতো। 

 

টেবিলে রাখা ডায়েরির পাতায় ডুবে থাকা  সৌম্য'র সম্বিত ফিরল শৃগালবাহিনির সম্মিলিত কোরাসে। ঘড়ি দেখলো, রাত ১টা। 

 

পকেট থেকে সিগারেটের কেসটা বের করে এক শলা নেভিকাট ধরালো সে। তাতে  সুখটান দিয়ে সে চিন্তা করতে লাগল। সত্যিই কী পিশাচের মোকাবিলা করেছিলেন গোরাচাঁদ রায়চৌধুরী। সাহেব নামের ওই বিদ্রোহী নেতার আসল পরিচয়টা কী। বাগানে কী তবে সত্যিসত্যি পিশাচের আবির্ভাব ঘটল। ধুর... এসব কি ভাবছি আমি। নিজেই নিজেকে তিরস্কার করে সৌম্য। দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। 

 

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিজের অজান্তেই সৌম্যর চোখ চলে গেল বাগান কুঠি'র টিলার দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ দেখা গেল, কুঠি'র ভেতর থেকে একটা তীব্র আলোর রেখা আকাশ ফুঁড়ে সোজা উপরের দিকে চলে গিয়েছে। 

 পর্ব ৫ 

 

ব্যাপারখানা কি, ভাল করে বুঝে ওঠার জন্য  কুঠি'র দিকে তাকিয়ে রইল সৌম্য। 

আলোটা বেশ জোরালো। লেজার বিমের মতো একটা তীব্র রশ্মি সোজা উপরের দিকে উঠে বিলীন হয়ে গিয়েছে মহাশূন্যে।

 

অবাক হয়ে গেল সৌম্য! কুঠিতে তো কেউ থাকে না!  তাহলে আলো জ্বলছে কীভাবে! তাছাড়া এরকম জোরালো রশ্মি তৈরি করতে গেলে তো ইলেক্ট্রিসিটি এবং প্রজেক্টার জাতীয় যন্ত্রপাতি আবশ্যক। প্রায় দুশো বছরের পুরনো ওই পরিত্যক্ত কুঠিতে বিদ্যুৎ এলো কোত্থেকে? কেউ কী তাহলে জেনারেটর সমেত এসব যন্ত্রপাতি নিয়ে ওখানে গেছে? কিন্তু কেন? কোনো কারণ ছাড়া গভীর রাতে এরকম একটা ভুতুড়ে কুঠিতে গিয়ে কেউ আকাশে তাক করে অদ্ভুত আলো জ্বালবেই বা কেন? 

প্রশ্নগুলো মগজে পোকার মতো কিলবিল করতে থাকে। হঠাৎ একটা সম্ভাবনার কথা উঁকি দেয় সৌম্যর মনে। আলো জ্বালিয়ে কাউকে সঙ্কেত পাঠানোর চেষ্টা করছে নাতো কেউ?

বড়জোর দু'মিনিট। সৌম্য'র ভাবনাচিন্তার মাঝখানে যে রকম দপ করে জ্বলে উঠেছিল, তেমনি ঝুপকরে নিভে গেল আলোটা! নিকষ অন্ধকারে ডুবে গেল কুঠি'র টিলা। 

অন্ধকারে গা মিশিয়ে দিয়ে বারান্দায় আরও কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইল সৌম্য। কিন্তু আলোটাকে আর জ্বলে উঠতে দেখা গেল না। 

এতক্ষণে হাওয়া বইতে শুরু করে দিয়েছে। গাছের পাতায় তার শনশন শব্দ। 

 

কুঠি'র টিলা থেকে চোখ সরিয়ে উপরের দিকে তাকাল সৌম্য। আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা তারাগুলো হারিয়ে গিয়েছে মেঘের আড়ালে।যেকোনও মূহুর্তে বৃষ্টি নামতে পারে। 

সৌম্য অনুমান করে, এখন রাত প্রায় দেড়টা। সকালে অনেক কাজ। আর দেরী করা ঠিক হবে না। 


চিন্তিত মনে ঘরে ঢুকে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল সে। দেখতে দেখতে দুচোখের পাতা ভারি হয়ে এলো। 


বাইরে ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে প্রবল বৃষ্টি। 

|||||||||

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ঠিক নেই, কিন্তু হঠাৎ এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল সৌম্য'র। 


শুরুতে আন্দাজ করা যায়নি, কিন্তু ঘুমের ঘোর কিছুটা কেটে যাওয়ার পর মনে হল, ঘরের ভিতরটা বেশ ঠাণ্ডা। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ধরা পড়ল, বিছানার ডানদিকের জানালাটা হাট করে খোলা। সেই জানালা দিয়ে হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। কিন্তু শোবার সময় তো জানালাগুলো বন্ধ-ই ছিল। তবে কী কোনও কারণে ওই জানালাটার ছিটকিনি  লাগানো হয়নি! কাজের লোকগুলো সব আচ্ছা ফাঁকিবাজ তো! মনেমনে বিরক্ত হয়ে ওঠল সৌম্য! 

 

উঠে জানালার পাল্লা দু'টো  বন্ধ করতে যাবে, হঠাৎ আরেকটা অদ্ভুত দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হল  তাকে।

খিড়কির কাঁচে একটা বীভৎস মুখ! সেটা আবার ঠায় তাকিয়ে আছে তার দিকে। এরকম বীভৎস কদাকার মুখ এর আগে কখনো দেখেনি সৌম্য। মূর্তিটার চোখ দু'টো যেন ধকধক করে জ্বলছে! 

এতকিছুর পর অন্য কেউ গভীর রাতে এরকম কিছু দেখলে কি করতো বলা মুশকিল-----তবে সৌম্য মানুষটা একেবারেই ভিন্ন ধাতের।শব্দ না করে বালিশের তলায় রাখা রিভলভারটা টেনে নিল সে। 

 

মূর্তিটাকে তাক করে গুলি ছুঁড়বে, তার আগেই ঝুপ করে একটা শব্দ হল। নিমিষে অন্ধকারে হারিয়ে গেল রহস্যময় ছায়ামূর্তি।

জানালার পাশে ছুটে গেল সৌম্য। এদিক-ওদিক ভাল করে দেখল। কেউ কোথাও নেই। শুধু গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দ।

জানালার কপাট বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সৌম্য। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। 


 

|||||||||

পরদিন। 

অন্যসময় ভোর ৫টার আগেই বিছানা ছাড়ে সৌম্য। সেই তুলনায় আজ একটু দেরি-ই হয়ে গেল। চোখ কচলে দেয়ালঘড়িতে চোখ রাখে সে। 

উরিব্বাস...! সাড়ে ছ'টা বাজে প্রায়। আর দেড় ঘন্টার মধ্যে প্রতুলবাবু এসে পড়বেন। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। চোখে পড়ল, পাশে মামনের বিছানাটা ফাঁকা। 

ঝটপট দাঁত ব্রাশ করে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এল সৌম্য। 

টেবিলে চা দিয়ে গেছে বেয়ারা। ধোঁয়া ওঠা কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসল সে।

 

এই রৌদ্রজ্বল সকাল দেখে কে বলবে, গতরাতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফর্সা আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। চারদিকে পাখির কলকাকলি। সামনের লনে বেশকিছু ফুল ফুটে আছে। মন ভাল হয়ে গেল সৌম্যর। 


পাশের চেয়ারটায় এসে বসলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। বললেন, 

--গুডমর্নিং সৌম্যবাবু। ঘুম কেমন হল? কোনও কষ্ট হয়নি তো? 

--না না, তোফা ঘুমিয়েছি। 
সৌম্য যেন ইচ্ছে করেই রাতে জানালায় দেখা বীভৎস মুখওয়ালা রহস্যময় ছায়ামূর্তির আগমনের কথাটা চেপে গেল।

 

তারাচাঁদবাবু বললেন, 

--বেশ বেশ। তা, বাবার ডায়েরি পড়ে কি মনে হল আপনার?

--ডায়েরিটা সত্যিই ইন্টারেস্টিং। তবে গতরাতে পুরোটা পড়ে উঠতে পারিনি। আজ রাতে ওটাকে নিয়ে আরও একবার বসতে হবে। 

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে সৌম্য। জিগ্যেস করে,

--আচ্ছা তারাচাঁদবাবু, গতকালের ডামাডোলে জিগ্যেস করা হয়নি। আপনার গিন্নি ছেলেমেয়েরা কোথায়? এখানে আসা ইস্তক কাউকে তো দেখলাম না ! 

---ওহ্, নানা ঝামেলায় সেকথা আর বলা হয়ে ওঠেনি। আমার একমাত্র ছেলে অর্ক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ফাইনাল ইয়ার। যে -কারণে ছেলেকে নিয়ে তার মা মানে আমার সহধর্মিণী সুচরিতা থাকেন কলকাতায়। পার্কস্ট্রিটে আমাদের একটা বিশাল বাড়ি রয়েছে। তাছাড়া আমার শ্বশুরবাড়িও কলকাতায়। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, পরিবার নিয়ে আমি ওখানেই থাকি। তবে ব্যবসার খাতিরে মাসে দু-মাসে এখানে আসতে হয়। বিমান পরিষেবা থাকায় আসা-যাওয়া নিয়ে তেমন সমস্যা হয় না। 

--হুম... আপনি কি মা-বাবার একমাত্র সন্তান? 

---একমাত্র সন্তান বলতে যা বুঝায়, ঠিক সেই অর্থে আমি তা নই। কেননা, আমার এক ছোটভাই রয়েছে। কিন্তু বাবার সঙ্গে বনিবনা হতো না বলে বহুবছর আগে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে সে। 

--- কী নাম আপনার ছোটভাইয়ের? কতো বছর আগে বাড়ি ছেড়েছেন তিনি? থাকেন-ই বা কোথায়? 

---তার নাম মলয়চাঁদ রায়চৌধুরী। রাগ করে সে বাড়ি ছেড়েছে  প্রায় ত্রিশ বছর আগে। বাবা ভেবেছিলেন, রাগ পড়ে গেলে দুচারদিন পর সে আপনা-আপনি-ই ফিরে আসবে। কিন্তু সেটা হয়নি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান মেলেনি। এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে একবছরের মাথায় মারা গেলেন বাবা। তিনি মারা যাওয়ার পরেও অনেক জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। কিন্তু সে যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে ! কোথায় আছে , বেঁচে আছে কি-না--- কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না। 

তারাচাঁদবাবু কথা শেষ করে চুপচাপ বসে রইলেন। নীরবতার মধ্যদিয়ে কেটে গেল কয়েকটা মূহুর্ত। প্রসঙ্গ পালটে সৌম্য জিগ্যেস করল, 
--আচ্ছা তারাচাঁদবাবু, বলুন তো রাতের বিক্রমপুরে কি কোনও অদ্ভুত আলো জ্বলতে দেখেছেন কখনও?

 

--না-তো ; আপনি কিছু দেখেছেন না-কি ? 

--না, মানে সেরকম কিছু নয়। আসলে গতরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর জানালা দিয়ে আকাশে যেন একটা আলো জ্বলতে দেখলাম। ঝড়বৃষ্টির রাত। ঘুমের ঘোরে হয়তো বিদ্যুৎচমককেই অন্য আলো ভেবে ভুল করে ফেলেছি। 

ইচ্ছে করেই গতরাতের সবকথা চেপে গেল সৌম্য। তারাচাঁদ বাবু বললেন, 

--হবে হয়তো। যা বৃষ্টি হয়েছে গতরাত। তবে শুধু আপনিই নন, এরকম একটা আলোর কথা আরও দু-একজনের মুখেও শুনেছি। কিন্তু আমি এখনও সেরকম কিছু দেখিনি।

--যারা ওই আলো দেখেছেন তাদের সঙ্গে আমাকে একটিবার কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন? 

--আলবাত পারব। তবে শুধু একজনের সঙ্গে। 

--কেন, শুধু একজন কেন? অন্যজনের কি হয়েছে?

 

--এই অন্যজন-টি হচ্ছে লেবার সর্দার শম্ভু বাগদি। বুঝতেই পারছেন, তার সঙ্গে এখন আর কথা বলা সম্ভব নয়। তবে আপনি আমাদের ম্যানেজার কিংশুক রায়ের সঙ্গে কথা বলে দেখুন। দিন পাঁচেক আগে গভীর রাতে সে-ও নাকি এরকম একটা আলোর দেখা পেয়েছে। 

--আশ্চর্য ! আলোটা জ্বালছে কে, কী তার উদ্দেশ্য? 

সৌম্যদের কথাবার্তা চলার মাঝখানেই ফিরে এল মামন। 

তাকে দেখে হাসি-হাসি মুখে সৌম্য বলল, 

-- কি-রে, আমাকে বাদ দিয়ে খুব তো একা-একা প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে পড়লি! এটা কিন্তু ঠিক হয়নি।

--তোমাকে ডিস্টার্ব করতে মন চায়নি, তাই আর ডাকাডাকি করিনি।

  

--সকাল সকাল বেরিয়ে কি কি দেখলি বল?  

--তেমন কিছু না। বাগানে তো একটা মনিষ্যি-ও চোখে পড়ল না। তবে চন্দ্রনাথপুর রেলস্টেশনের পাশে  উঁচু পাঁচিল ঘেরা একটা দোতলা বাড়ি দেখে বেশ অবাক হয়েছি। দালানবাড়িটা সত্যিই সুন্দর। কিন্তু এরকম একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে এত টাকা খরচ করে এই বাড়ি বানালো কে? তাছাড়া বাড়িতে কেউ থাকে বলেও তো মনে হলো না। 

মামনের কথা শুনে তারাচাঁদবাবু বললেন, 

--আরে ওটা তো রেলের এক কনট্রাকটরের বাড়ি। বালাসাহেব দেশাই। কাজের তদারকি করতে প্রায়ই এদিকে আসতেন। কিন্তু এই অঞ্চলে হোটেলের সুবিধা  না থাকায় কয়েকবছর আগে বাড়িটা বানিয়ে ছিলেন তিনি। শুনেছি, ব্রডগেজের কাজ শেষ হবার পর থেকে ওই বাড়িতে আর কেউ থাকে না। 

--মজার ব্যাপার তো। আচ্ছা, ওই বালাসাহেব কোন জায়গার লোক, জানেন কিছু? 

প্রশ্নটা করে সৌম্য।

 

তারাচাঁদবাবু বলেন 

--সঠিক করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে একবার শুনেছিলাম ভদ্রলোকের বাড়ি নাকি মহারাষ্ট্রে। 

||||||||

তারাচাঁদবাবুর কথা শুনে হঠাৎ সৌম্য 'র চোখদুটো চকচক করে ওঠে। 


তার এই ভাবান্তর মামনের চোখ এড়ায়নি। কিন্তু সে কিছু জিগ্যেস করার আগেই মোবাইলে কাকে যেন ফোন করতে করতে দূরে সরে গেল সৌম্য। 

--হ্যালো... কে... তুতুল? আমি সৌম্যদা...এটা আমার নতুন নাম্বার 

--এম্মা, সৌম্যদা! এতদিন পর মনে পড়ল বোনকে? আমি আরও ভেবেছিলাম , তুমি হয়তো ভুলেই গ্যাছো আমাদের। 

তুতুলের গলায় একরাশ অভিমান। 

আসলে হয়েছে কি, প্রফেসর প্রশান্তভূষণ ভট্টাচার্যের একমাত্র মেয়ে তুতুল বড্ড বেশি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। সেই সুবাদে সে সৌম্য'র অন্ধভক্ত। কিন্তু কাজের চাপে এ-ই ক'দিন তুতুলকে ফোন করতে পারেনি সৌম্য। খবর নেওয়া হয়নি প্রফেসর প্রশান্তভূষণেরও। 

তুতুলের অভিমানের বহরটা জানে সৌম্য। পরিস্থিতি সামাল দিতে গলার স্বর যথেষ্ট নরম করে সে বলে, 

--একদম রাগ করিস না বোন, ঘাট হয়ে গ্যাছে। তুই বললে না-হয় আজই তোর জন্য বাজার থেকে এক হাঁড়ি তেঁতুল আর খান-দশেক পুতুল নিয়ে আসবো খন। 

--এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না সৌম্যদা। আমি কিন্তু এবার সত্যিসত্যিই রেগে যাচ্ছি। 

হো হো করে হেসে ওঠে সৌম্য। সময়-সুযোগ পেলেই তুতুলকে সে তেঁতুল বলে ক্ষ্যাপায়। আজও সুযোগটা হাতছাড়া করেনি।  বলে, 

-- তারমানে এতক্ষণ তুই সত্যিসত্যি রাগ করিসনি। যাক বাঁচা গেল। আচ্ছা, স্যার কোথায় রে বোনু, ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? 

প্রসঙ্গ পাল্টে কাজের কথায় চলে যায় সৌম্য। তুতুল বলে, 

--বাবা তো একটু বাজারে বেরিয়েছেন। এক্ষুনি এসে পড়বেন হয়তো। কিছু বলতে হবে তাঁকে? 

--স্যারকে বলবি একটা জরুরি কাজে আমি বিকেলের দিকে বাড়ি আসছি। 

সৌম্য যে ফের কোনও নয়া অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়েছে, সেটা তার কথা থেকেই আন্দাজ করে নেয় তুতুল। কেননা, সে জানে, যখনই কোনও জটিল কেসের তদন্তে খটকা দেখা দেয়, বাবার কাছে ছুটে আসে সৌম্য। তাই উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে থাকে তুতুল। বলে, ---সে নাহয় বলবো, কিন্তু এর বিনিময়ে আমারও একটা শর্ত আছে... 

--নির্দ্বিধায় বলে ফ্যাল...

-- তোমার এই নতুন অভিযানে এবার কিন্তু আমাকেও সঙ্গে রাখতে হবে। 

--হুম... তা থাকতে পারিস। তবে সেটা পুরোপুরি নির্ভর করবে স্যারের অনুমতির উপর। 

--এনিয়ে তোমাকে অত ভাবতে হবে না। বাবাকে আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব। 

--ঠিক আছে তাহলে, ওই কথাই রইল। তুই শুধু স্যারকে বলে রাখিস--আমি বিকেলে বাড়ি আসছি। 

|||||||||

বার্তালাপ শেষ করে ফোনটা কেটে দেয় সৌম্য। 


এতক্ষণে তারাচাঁদবাবু উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, 

--আমাকে একটু ফ্যাক্টরি যেতে হচ্ছে সৌম্যবাবু। আপনাদের কোনও অসুবিধা হবে কী?

--না না, আপনি নিঃসন্দেহে যান। আমাদের কোনও অসুবিধা হবে না। 

সৌম্য'র কথায় কাজে চলে গেলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। 


তিনি চলে যাওয়ার মিনিট দশেক পর বিক্রমপুর এসে  পৌঁছালেন প্রতুল হাজরিকা।  এসেই সৌম্যকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, 

--ডেডবডিটা যেখানে পাওয়া গিয়েছে, সেখানে গেলে কেমন হয় ডাঙরিয়া? 

--সে তো যেতেই হবে। দিনের বেলায় জায়গাটা একবার ঘুরে দেখা জরুরি। 

বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো সৌম্য।

 

এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন কিংশুক। বললেন, 

--এখন কোথাও যাওয়া হবে না। ব্রেকফাস্ট রেডি। আগে সেটা সেরে নিন। তারপর যেখানে যাওয়ার যাবেন। 

প্রতুলবাবু বললেন, 

--যান সৌম্যবাবু, আহারটা সেরে নিন।

 

তাঁর কথা শুনে কিংশুক বললেন, 

-- একি কথা স্যার। আপনাকেও যে দু'টো মুখে দিতে হবে। 

||||||||||||

কিছুক্ষণ পর।  গতকাল রাতে যেখানে শম্ভু বাগদির ক্ষত-বিক্ষত লাশ পাওয়া গিয়েছিল, ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে সৌম্যরা।সেখান থেকে সামান্য দূরে জঙ্গলের মাঝখানে পরিত্যক্ত কুঠি, প্রতুলবাবুকে নিয়ে সেদিকেই এগিয়ে গেল সৌম্য। ভাঙ্গাচোরা নিচু পাঁচিলে ঘেরা কুঠির সম্মুখে একটা জরাজীর্ণ গেট। গতকাল রাতের অন্ধকারে সেটাকে ঠাহর করা যায়নি। জায়গাটা দেখে থ মেরে দিয়েছেন প্রতুল হাজরিকা। ঝােপঝাড়ে ঢাকা, পলেস্তরা খসা বাড়িটা দেখলে বােঝাযায় --- একসময় বেশ রুচিশীল সাজানাে বাড়ি ছিল এটি।

 

গেট খুলে ঝােপ জঙ্গল ডিঙিয়ে এগিয়ে যায় সৌম্যরা। বন্ধ দরজা ঠেলে কুঠির ভেতরে ঢােকার চেষ্টা করে। শতবছর পুরােনাে কুঠি। অনেক ঠেলাঠেলি করেও দরজা খােলা গেল না। বাধ্য হয়ে  বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেল সবাই। 

 

গাছগাছালিতে ঘেরা বাড়িটির ভাঙা জানলা, ছাদ বেয়ে নেমেছে লতানাে আগাছার দল। পেছনের জানালা থেকে প্রায় কুড়ি পঁচিশ  মিটার দূরে গাছের নিচে ঝোপজঙ্গলে ঢাকা বেশ বড়ো একটা কবরখানা। এই জায়গা এতটাই নির্জন যে, দিনের আলোতেও কেমন একটা গা শিরশিরে অনুভূতি নেমে যায় মামনের শিরদাঁড়া বেয়ে। 

 

কবরখানাটাকে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে সৌম্য। এরমধ্যে একটা কবর তুলনামূলক সাফসুতরো বলে মনে হয় তার। ধীরপায়ে সেদিকে এগিয়ে যায় সে। কেন জানি তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার তাকে সাবধান করতে থাকে, এই কুঠিতে শুধু তারা নয়, আরও একটা অদৃশ্য চোখ তাদের প্রতিটি কার্যকলাপের উপর সতর্ক নজর রেখে চলেছে। 

নিজের অজান্তেই পিছনে ঘুরে তাকাল সৌম্য। মনে হল, তার সঙ্গে চোখাচোখি হবার আগেই একটা মুখ জানালা থেকে সরে গেল সড়াৎ করে...

 পর্ব ৬ 

সত্যিই কি জানলায় কোনও মুখ দেখা গিয়েছে? না-কি সবটাই দৃষ্টিবিভ্রম? অবশ্য ঘরের ভিতরটা যেরকম অন্ধকার, তাতে দৃষ্টিবিভ্রম ঘটার সম্ভাবনা-ই বেশি। কিন্তু যদি সেটা না হয়ে থাকে, তাহলে তো চিন্তার ব্যাপার-----বিষয়টা ভাবিয়ে তুললো সৌম্যকে। তবে এব্যাপারে মামন বা প্রতুল হাজরিকাকে এখনই কিছু না বলা-ই শ্রেয় মনে হল তার। দেখাই যাক না, জল কদ্দূর গড়ায়-----ভাবতে ভাবতে এগোতে থাকে সে। 

এদিকটায় আগাছার জঙ্গল আরও ঘন। ঝিঝি পোকার সমগোত্রীয় কোনও এক পতঙ্গের বিরামহীন ডাক মগজের গভীরে গিয়ে হাতুড়ির মতো আঘাত করে চলেছে। পায়ে-পায়ে কবরটার একদম কাছাকাছি চলে গেল সবাই।

 

হঠাৎ পাশে শেয়ালকাঁটার ঝোপটা দেখিয়ে মামন বলল, 

--সৌম্যদা, দ্যাখো তো ওটা একটা সিগারেটের টুকরো কি-না! 
 
ঝোপে আটকে থাকা সিগারেটের টুকরোটা অবশ্য সৌম্যও দেখেছে। এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে একটা প্লাস্টিকের কৌটো বের করে আলগোছে সেটাকে কৌটোয় পুরে নিল সে।  কবরটাকে ভাল করে নিরীক্ষণ করে  বলল, 

--বুঝলেন প্রতুলবাবু, সম্ভবত রাতেই এখানে কেউ এসেছিল। মনে হচ্ছে, ক'দিন থেকে সে এখানে রোজই আসছে। লোকটা বেশ টাকাওয়ালা। 

--কী করে বুঝলেন?

 প্রতুল হাজরিকাকে সৌম্য বলে, 

--গোরস্থানের অন্য সমাধিগুলো দেখুন। তুলনায় এই সমাধিটা বেশ সাফসুতরো। অর্থাৎ কে বা কারা এটাকে পরিষ্কার করেছে। আর যারা এটা করেছে তারা যে মানুষ, সিগারেটের টুকরোটাই এর মোক্ষম প্রমাণ। কেননা, পিশাচ, ভূত দত্যি-দানো তো আর বিড়ি-সিগারেটের নেশা করে না। 


সৌম্যর সারা মুখে দুষ্টুমি ভাব।  সেই ভাবটা বজায় রেখেই সে বলে চলল, 
-- সিগারেটের ফিল্টার ক্যাপটা কি আপনি লক্ষ্য করেছেন? লন্ডন ট্রিপল ফাইভ ব্র্যান্ড। এই বিদেশি সিগারেটে যার নেশা, সে আর যা-ই হোক, গরীব হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে লোকটা ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুর মার্কা বিক্রমপুরের কবরস্থানে হাওয়া খেতে আসবে কেন! বিষয়টা বড়ই জটিল! 


প্রতুলবাবু বললেন, এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার জন্য-ই তো আমি আপনার ফ্যান। 


প্রশংসা গায়ে না মেখে সৌম্য বলে, 
-- মামন আর আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন প্রতুলবাবু। আমি ওদিকটা চট করে দেখে আসি। 

||||||

দু'হাতে ঝোপঝাড় আগাছার জঙ্গল ঠেলে আরও ভেতরের দিকে চলে যায় সে। সমাধিগুলো বহু পুরনো, বেশিরভাগই মাটির, তবে মাঝেমধ্যে একটা-দুটো পাকা সমাধিও আছে। 

দূরে সেরকমই একটা পাকা সমাধি। সেটার পাশে মাটি খুঁড়ে তার ওপর ঘাস, লতাপাতা ফেলে  জায়গাটা ঢেকে রাখা হয়েছে। 


দেখে সতর্ক হয়ে ওঠে সৌম্য। প্রশ্ন জাগে, এটাই কি সেই সমাধি, যেখানে অনন্তকাল ধরে ঘুমিয়ে আছে  বিদ্রোহী সাহেবের পিশাচ? 

কে জানে, কবরটা বিদ্রোহী সাহেবের হলে হতেও পারে। তবে পিশাচ-টিশাচে সৌম্য পাত্তা দিতে নারাজ।  তার খালি মনে হতে থাকে, আড়াল থেকে কেউ নজরদারি করে থাকলে এখনই কবরটার পাশে যাওয়া উচিত হবে না। 


এই ভেবে সে এমন একটা ভাব করে যেন কবরটা তার চোখেই পড়েনি। আশপাশটা আবারও ভাল করে দেখে নেওয়ার পর আগের জায়গায় ফিরে যায় সে । বলে, 

--এখানে আর দেখার কিছু নেই প্রতুলবাবু। তারচে বরং চলুন, কুঠি'র পেছনের দিকের কোনও  দরজা খোলা যায় কিনা, সেই চেষ্টা করি গিয়ে।  

--তা-ই চলুন, বলেন প্রতুল। 

||||||

বাড়ির পেছনে দক্ষিণ বরাবর কিছুটা যাওয়ার পর একটা সিঁড়ি দেওয়া ছােট খােলা বারান্দা নজরে পড়ল সৌম্যদের। বারান্দার সোজাসুজি একটা আধখোলা জরাজীর্ণ দরজা।

দরজাটা দেখে সেদিকে দ্রুত এগিয়ে যায় মামন। সিঁড়িতে একটা পা রেখেছে কি রাখেনি, ঘটনাটা ঘটে তখনই।

 

চুলদাড়িওয়ালা প্রায় ভূতের মতো দেখতে একটা লোক ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল সবেগে।

 

||||||||||||

কিম্ভূতকিমাকার লোকটাকে দেখে সভয়ে দু'পা পিছিয়ে এল মামন। উত্তেজনায় প্রতুল হাজরিকা লোকটার দিকে সার্ভিস রিভলবার তাক করে হিন্দি অসমীয়া আর বাংলার মিশেলে অদ্ভুত এক জগাখিচুড়ি ভাষায় চিৎকার করে উঠলেন। 

--অ্যাই রুক। নহলে ইয়াতেই গুলি করে মার দুঙ্গা।

 

প্রতুল হাজরিকা জাঁদরেল পুলিশ অফিসার। তাঁর গলার স্বরে এমন একটা কিছু রয়েছে, যা শুনে থমকে দাঁড়ায় লোকটা। কিন্তু কিছু বলে না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সৌম্যদের দিকে।

এবার লোকটাকে ভালভাবে লক্ষ্য করে  সৌম্য। 

উষ্কখুষ্ক চুল, মুখভর্তি দাড়ি। পরনে ছেঁড়া প্যান্ট। বুকখোলা শার্টের অবস্থাও তথৈবচ। অদ্ভুতদর্শন লোকটার চামড়ায় ময়লার পুরু আস্তরণ, পিঠে মুখখোলা বোঁচকা। তাতে রাজ্যের হাবিজাবি জিনিসপত্র। ছেঁড়া কাপড়, পুরনো খাতা, খবরের কাগজ, ভাঙ্গা ডটপেন---- কী নেই তাতে। 

লোকটা হাঁ না কোনও উত্তর দিচ্ছে না দেখে এবার বাজখাঁই হুঙ্কার ছাড়লেন প্রতুল হাজরিকা। সেই আওয়াজে পাশের তেঁতুল গাছে বসে থাকা কয়েকটা পাখি ডানা ঝটপট করে উড়ে পালালো। বাঘের মতো গর্জন করে প্রতুল বললেন, 

--কি-রে, ভালয় ভালয় নিজের পরিচয়টা দিবি, না গুলি চালাবো? 

লোকটা প্রতুলবাবুর কথা কতটুকু বুঝল কে জানে, হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। তারপর পায়ের গোড়ালিতে ভর করে এক জায়গায় চরকির মতো পাক খেলো তিন-চার বার। বিচিত্র সুরে সব শা...লা...শয়তান, সব শা...লা...শয়তান বলতে বলতে গেটের দিকে দৌড়ে চলে গেল সে। 

প্রতুলবাবু তার পেছনে ছুট লাগাবেন কি-না ভাবছেন, সৌম্য বলল, 

--ছেড়ে দিন প্রতুলবাবু। মনেহচ্ছে লোকটা পাগল। কুঠিতে এসে আস্তানা গেঁড়েছে। 

--হুম, দেখেশুনে তো তাই-ই লাগছে। তবে থানায় নিয়ে গিয়ে পাছায় দু ঘাঁ লাগালে ব্যাটার সব পাগলামি ছুটে যেত একদিনেই। আমাদের শয়তান বলা... 

প্রতুলবাবুর কথায় জোরে হেসে উঠল সৌম্য। বলল,

--চলুন, আগে ঘরের ভিতরটা দেখি। 

||||||||||

ভাঙা দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল সৌম্যরা।  


সবে সকাল সাড়ে দশটা। কিন্তু কুঠি'র ভেতরে অস্বাভাবিক অন্ধকার। মেঝেতে একপ্রস্থ ময়লা, ভাঙাচোরা কাঁচের টুকরাে ও কাঠ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই কক্ষের এককোনায় রয়েছে একটি কাঠের সিঁড়ি। দোতলায় ওঠার রাস্তা। 

নিচের কয়েকটা কোঠা দেখে নেওয়ার পর সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল সৌম্য। প্রতুলবাবু এবং মামন রয়েছে নিচেই। 

উপর-নিচে সবক'টি কোঠার একই দশা। ভাঙা জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি, ধুলোর আস্তরণ। তবে দক্ষিণের একটি কক্ষ বেশ পরিষ্কার। 

জানালাটার বন্ধ কপাট খুলে দিতেই সৌম্যর নজরে পড়ল, এখান থেকে তারাচাঁদ রায়চৌধুরীর বাংলোটা বেশ পরিষ্কার। মনেমনে সে জরিপ করে নেয়, এই জায়গা থেকে তারাচাঁদবাবুর বাংলোর অ্যারিয়াল ডিস্টেন্স খুব একটা বেশি নয়। 

নিচে থেকে প্রতুলবাবু জিগ্যেস করলেন, 
--কিছু দেখলেন সৌম্যবাবু? উপরে উঠতে হবে? 

--না তেমন কিছু নেই। আমি আসছি।


এই বলে জানালা বন্ধ করে নিচে নেমে যায় সৌম্য। বলে, 

--হাতে অনেক কাজ। একবার শিলচরেও যেতে হবে। চলুন প্রতুলবাবু, চলরে মামন।

  
|||||||||

কুঠি থেকে বেরিয়ে বাংলোর সামনে রাখা প্রতুলবাবু'র  স্কোরপিওতে গিয়ে বসল সবাই। 

কিংশুককে ফোন করে সৌম্য জানিয়ে দিল, একটা জরুরি কাজে তাকে শিলচর যেতে হচ্ছে। ফিরতে দেরি হবে। খুব বেশি দরকার পড়লে থেকেও যেতে পারে। তারাচাঁদবাবু যেন খামোকা টেনশন না করেন।

যাওয়ার পথে সৌম্যদের নিয়ে বড়খলা থানায় উঠলেন প্রতুল হাজরিকা। 

খোদ ডিএসপি থানায় এসেছেন শুনে ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে এলেন ইনচার্জ অসীম কর্মকার। লম্বা স্যালুট ঠুকে ডিএসপিকে নিয়ে গিয়ে বসালেন নিজের চেয়ারে। বললেন, 

--স্যার, আপনি আসছেন জানলে আমি নিজেই হাজির হয়ে যেতাম বিক্রমপুর বাগানে।

 

আইসি 'র কথাটা যেন গায়ে-ই মাখলেন না প্রতুল হাজরিকা। আধিকারিকসুলভ গাম্ভীর্য বজায় রেখে নিখাদ অসমীয়ায় বললেন 

-- ইনচার্জ, এটা কথা মনত রাখিবো, কেসটো ইম্পর্ট্যান্ট। যিটো কারণে মই নিজে ইয়াত ইনভলভ হইছু। ইয়াতকই ডাঙর কথাটো হল, আমার পুলিশ ডিপার্টমেন্টর হই ইনভেস্টিগেশনটো চলাবো সৌম্য ডাঙরিয়ায়। আপুনি তেঁওক সদায় হেল্প করিবো লাগিবো। ইটস অ্যান অর্ডার। 

--হয় স্যার...

সসম্ভ্রমে উত্তর দিলেন অসীম কর্মকার। 

তাদের কথাবার্তা শেষ হবার পর সৌম্য বলল, 

--অসীমবাবু, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কবে নাগাদ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় আপনার? 
 

--আরও ৩-৪ দিন লাগবে হয়তো। 

--হুম, আচ্ছা অসীমবাবু, বিক্রমপুরে কি কোনও পাগলের দেখা পেয়েছেন? 

--না, আমার নজরে পড়েনি। তবে এব্যাপারে আমার চেয়ে ভাল বলতে পারবেন থানার সেকেন্ড অফিসার নয়নমণি সিংহ। কেননা, তাঁর বাড়ি চন্দ্রনাথপুর গ্রামে। 

--তাকে একটু ডেকে পাঠান তো। 

একটু বাদে। 


খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন নয়নমণি সিংহ। ডিএসপিকে লম্বা স্যালুট ঠুকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন। সৌম্য জিগ্যেস করল, নয়নমণি বাবু, বিক্রমপুর চা-বাগান এলাকায় কি ইদানীং কোনও পাগলকে  ঘোরাফেরা করতে দেখেছেন? 

--হ্যাঁ, ক'দিন থেকে একটা পাগল বিক্রমপুর এবং চন্দ্রনাথপুর বাজারে ঘোরাফেরা করছে। তবে পাগল হলেও লোকটা বেশ নিরীহগোছের। এপর্যন্ত কাউকে উত্যক্ত করেনি। বেশিরভাগ সময়ই তাকে আপন খেয়ালে বিক্রমপুরের বনেবাদাড়ে ঘুরতে দেখা গেছে। 

--পাগলটা কি এই অঞ্চলের বাসিন্দা? জিগ্যেস করে সৌম্য।

 

নয়নমণি বলেন, 

--না..., না... এর আগে লোকটাকে এই তল্লাটে দেখা যায়নি। মাসদেড়েক আগে অকস্মাৎ চন্দ্রনাথপুর রেলস্টেশনে আবির্ভূত হয়েছে সে। সম্ভবত এখানে সে এসেছে ট্রেনে চড়ে। কিন্তু হঠাৎ একটা পাগল সম্পর্কে এত জিজ্ঞাসাবাদ করছেন কেন স্যার? 

--না, না...  জাস্ট কৌতূহল আরকি। 

মুখে একথা বললেও সৌম্য 'র চোখেমুখে গভীর চিন্তার ভাঁজ! পাগলটাকে খুঁজে বের করতে হবে। তবে এর আগে অনুমানগুলো ঝালিয়ে নিতে একবার প্রফেসর প্রশান্ত ভূষণের কাছে যাওয়াটা জরুরি। তাড়া লাগায় সে। বলে, উঠে পড়ুন প্রতুলবাবু। বেলা থাকতে শিলচর গিয়ে পৌঁছাতে হবে। 

 পর্ব ৭ 

বড়খলা থানা থেকে বেরিয়ে সৌম্যদের গাড়িটা যখন হাইওয়েতে গিয়ে পড়ল, ঘড়িতে দুপুর সাড়ে ১২টা।

 

সেপ্টেম্বরের তপ্ত দুপুর। রাস্তায় যানবাহন তেমন নেই। মাঝেমধ্যে দু'একটা লরি, যাত্রীবাহী ক্র‍্যুজার হুস-হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে। দক্ষ হাতে ড্রাইভ করছেন প্রতুল হাজরিকা।

 

মহাসড়ক ধরে গাড়ি ছুটছে দ্রুত গতিতে। মাঝেমধ্যেই লুকিং গ্লাসে চোখ চলে যাচ্ছে সৌম্য'র। মনে হচ্ছে, বড়খলা থেকে একটা কালো হোন্ডাই ক্রেটা তাদের গাড়ির পিছু নিয়েছে। 


পিশাচ কি তবে গাড়িও চালাতে পারে ! হতেও পারে ! এই যুগে মানুষ মঙ্গলে যান পাঠাচ্ছে, আর পিশাচ গাড়ি চালালেই যত দোষ ! মনেমনে হাসলো সৌম্য। লুকিং গ্লাসে নজর রেখেই প্রতুলবাবুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিল সে। 

সুবিশাল চওড়া মসৃণ রাস্তা। গল্পগুজব করতে করতে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শিলচরের কাছাকাছি পৌঁছে গেল সৌম্যরা। মধুরামুখ পয়েন্টে এসে সৌম্য কালো রঙের গাড়িটাকে আর দেখতে পেলো না। সেটা অন্য গাড়ির ভিড়ে মিশে গিয়েছে। 

রংপুর পেট্রোল পাম্পের কাছে সিগারেট কেনার অছিলায় একটা গুমটি দোকান দেখে প্রতুল হাজরিকাকে দাঁড় করাতে বলল সৌম্য। গাড়ি থেকে নেমে পিছন দিকটা ভাল করে দেখে নিল সে। 

নাহ্। ত্রিসীমানায় নেই কালো গাড়িটা। যেন ভোজবাজির মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

-'এত মন দিয়ে কি দেখছো সৌম্যদা?', জিগ্যেস করে মামন। 

-'না কিছু না। চল। একটা সিগারেট  না ধরালে মুড ফ্রেশ হবে না। তা তুই পান খাবি তো?' 

--'নিশ্চয় খাবো', বলে মামন। 

পান দোকানের দিকে এগিয়ে যায় সবাই। দু'টো সাঁচিপাতি ১২০ জর্দা পানের অর্ডার দিয়ে এক প্যাকেট নেভিকাট সিগারেট কিনল সৌম্য। প্রতুলবাবু নিলেন পান মশলা। পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে আশপাশটায় আরও একবার ভাল করে চোখ বুলিয়ে নিল সৌম্য। 

কোথাও নেই গাড়িটা !

আচ্ছা কেউ কি সত্যিই অনুসরণ করছিল, না-কি সবটাই মনের ভুল ! হতে পারে কালো গাড়িটা কাউকেই ফলো করেনি, রংপুরে কোথাও এসেছে। আবার এমনও হতে পারে, গাড়ি মালিক এই এলাকারই বাসিন্দা। কোনও কাজে বড়খলা গিয়েছিলেন ----এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে গাড়িতে গিয়ে বসল সৌম্য। সোজা সদরঘাট সেতুর দিকে এগোতে থাকলেন প্রতুল হাজরিকা।

|||||||||

হালে বরাক নদীর উপর পুরনো সেতুর পাশে একটি নতুন সেতু তৈরি হয়েছে। শহরমুখী গাড়িগুলোকে নতুন সেতুর উপর দিয়ে যেতে হয়। আর শহরের বাইরে যেতে হলে পুরনো সেতুই ভরসা। যানজট এড়াতেই এই নিয়ম চালু করেছে ট্রাফিক কন্ট্রোল বিভাগ।

গাড়িটা গিয়ে সেতুর উপর উঠতেই বাইরে চোখ রাখল সৌম্য। বাঁদিকে যুগশঙখ পত্রিকার পুরনো অফিস বিল্ডিং। পত্রিকা অফিসটা স্থানান্তরিত হবার পর আজকাল সেখানে একটা যোগ কলেজ চালু হয়েছে। 

ব্রিজের মাঝ বরাবর আসার পর বরাক নদীর পুরো অংশটা চোখে পড়ল সৌম্য 'র। ভরা নদী। সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে বরাকের জল। গঙ্গাপাড়ার দিকে নদীর ধারে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কয়েকজন মহিলা স্নান করতে ব্যস্ত। দু'একজন কাপড় কাচছে। একটা-দুটো জেলেনৌকা নদীর বুকে অলস ভাবে ভেসে রয়েছে। 


সেতুর উপর থেকে নিচের মানুষগুলোকে পুতুলের মতো লাগে সৌম্য 'র। মনে হয়, ব্রিজে এত যানচলাচল, হর্নের আওয়াজ, হইহট্টগোল। কিন্তু নিচে এর কোনটাই গিয়ে পৌছাতে পারছে না। দুপুরের আলস্যদোষ-গ্রাসিত নদীটা আফিমখোরের মতো ঝিম মেরে আছে। ওই পারে গাছগাছালির ফাঁকে কাছারি মসজিদের গম্বুজটা বেশ স্পষ্ট। বিসর্জন  ঘাটের ধার ঘেঁষে পিএইচই-র বার্জ। গোটা শহরের জন্য এই বার্জ থেকেই জল উত্তোলন করে পিএইচই। ব্রিজের ওমাথায়  পুরভবনের পর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বঙ্গভবন। 

সেতু পেরিয়ে সদরঘাট এসে সৌম্য বলল, প্রতুলবাবু, পুুুুলিশ সুপারের কার্যালয়ই তো এখন আপনার কর্মস্থল। সেখানেই যাচ্ছেন, তাই না?

--সেটাই ভাবছি। কারণ, এই অবেলায় বাড়ি যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তা আপনাদের কোথায় ছাড়তে হবে বলুন, ড্রপ করে অফিস চলে যাব।

--না... না... তার দরকার নেই। আপনি বরং আমাদের এসপি অফিসের গেটেই নামিয়ে দেবেন,  বলে সৌম্য। 

কিছুক্ষণ পর। প্রতুল হাজরিকাকে এসপি অফিসের বাইরে বিদায় জানিয়ে ইন্ডিয়া ক্লাব মোড়ের দিকে এগিয়ে যায় সৌম্য। সঙ্গে মামন। সেখান থেকে একটা শেয়ারের ই-রিকশায় উঠল দু'জন। 

নর্মাল স্কুল এবং শিশু উদ্যান  বাঁয়ে রেখে আসাম রাইফেলসের সামনে দিয়ে সিসি ব্লক বিছানো রাস্তায় ঝাঁকুনি দিতে দিতে ই-রিকশাটা মন্থর গতিতে এগিয়ে চলে। গন্তব্য বিবেকানন্দ রোড, প্রফেসর প্রশান্ত ভূষণের বাড়ি। 

||||| ||||| |||||

বিবেকানন্দ রোডে প্রফেসর প্রশান্ত ভূষণ ভট্টাচার্যের বাড়িটা ১৯ নম্বর লেনের প্রায় শেষ মাথায়। নিচের তলায় এক পরিবার ভাড়াটে। প্রশান্তবাবু থাকেন উপরে। 


সৌম্যরা দোতলায় উঠে কলিং বেল টিপতেই  দরজা খুলে দিল তুতুল। বলল, 
--এসো সৌম্যদা। আমি বসেবসে  তোমাদের অপেক্ষাই করছিলাম। 

সৌম্য বলে, সে-তো তোর দরজা খোলার তৎপরতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে! তা স্যার কি এখন ঘরে আছেন? 

--ইশশ... তুমি আগে ভেতরে ঢুকবে, নাকি বাইরে দাঁড়িয়েই গোয়েন্দাগিরি ফলাবে? কর্তৃত্বের সুরে বলে তুতুল। 

--বাব্বা, এই ক'দিনে তেঁতুল বেশ পেকে গ্যাছে দেখছি! 

জুতো খুলতে খুলতে তুতুলকে ক্ষ্যাপানোর সুযোগটা হাতছাড়া করে না সৌম্য। 

দু'জনের কথাবার্তা শুনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছিল মামন। তার দিকে তাকিয়ে তুতুল বলে, 

--তুমি ভেতরে এসো মামনদা। গোয়েন্দাগিরিতে সামান্য নামডাক হতেই কেউকেউ আজকাল নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবতে শুরু করে দিয়েছে। তারা আমার মতো একজন সাধারণ মানুষকে নিয়ে ইয়ার্কি ফাজলামো করতেই পারে। 

-- নিজেকে সেলিব্রিটি ভাবার মতো সিলি চিন্তা-ভাবনা আমার নেই মালিকায়ে জাঁহান...', যাত্রাপালায় ডায়লগের ঢঙে কথাটা বলে সৌম্য।

 

খিলখিল করে হেসে ওঠে তুতুল। বলে, 'ঢের হয়েছে, ভরদুপুরে আর অভিনয় কর্তে হবে না। এবার ভেতরে এসো।' 

জুতো খুলে ড্রইংরুমে প্রবেশ করে সৌম্য। পেছনে মামন। ভেতরের ঘর থেকে প্রশান্ত ভূষণ জিগ্যেস করেন, 

--'কে এসেছে রে তুতুল?'

--'সৌম্যদা এসেছে বাবা।' 

--'বসতে বল, আসছি'। 

--'জাঁহাপনা সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়েছেন হে দ্বিজগুরু', কথাটা তুতুল এত খাটো গলায় বলে  যে, পাশের ঘরে বসে প্রশান্তভূষণবাবু কেন, এঘরে বসে মামনও শুনতে পায়নি।

 

তবে সৌম্য লম্বকর্ণ। সে ঠিক শুনে নিয়েছে। বলে, 

--' তোকে তদন্তে সঙ্গে রাখার কথা বলছিলি, তাইনা তুতুল। কিন্তু মনে হচ্ছে এত রিস্ক-এর মধ্যে তোকে না জড়ানোই ভালো। কথাটা স্যারকে বুঝিয়ে বলতে হবে।'

সৌম্য 'র কথায় চোখমুখের রঙ উড়ে যায় অষ্টাদশী তুতুলের। বলে, 'তুমি এটা করতে পার না সৌম্যদা। আর যদি  কোরো, এই জীবনে তোমার সঙ্গে আর কথা বলব না, বলে দিলাম।'

তুতুলের কথার মাঝখানে ঘরে এসে ঢুকলেন প্রশান্তভূষণবাবু। কালো দোহারা চেহারা, মাথার চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। জ্ঞানতাপস এই ভদ্রলোকই সৌম্যদের কলেজ-বেলার পিবি স্যার। মেয়েকে জিগ্যেস করেন, 

--'কার সঙ্গে কথা বলবি না বলছিসরে তুতুল?' 

--'ও কিছু না বাবা। সৌম্যদার সঙ্গে অন্য একটা বিষয়ে কথা হচ্ছিল।'

 --'হুম... আচ্ছা একটা কাজ কর না মা। আমাদের জন্য চট করে চা করে নিয়ে আয় দেখি, বলেন প্রশান্ত ভূষণ। 

সৌম্যর দেখাদেখি স্যারকে দেখে আগেই উঠে দাঁড়িয়ে ছিল মামন। এক ফাঁকে টুক করে প্রণামটা সেরে নিল দু'জনে। 

|||||||||||||||

কিছুক্ষণ পর। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সোফায় বসে আছে সৌম্য। পাশে মামন। তাদের ঠিক সামনা-সামনি নিজের অতি প্রিয় বেতের চেয়ারে বসেছেন প্রশান্তভূষণবাবু। পাশে খাটের এক কোণে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে তুতুল। 

সরাসরি কাজের কথায় চলে যায় সৌম্য। জিগ্যেস করে, স্যার বিক্রমপুর চা-বাগান তো আপনি চেনেনই। জায়গাটার কি কোনও ঐতিহাসিক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে? 

--হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? 

--কারণ একটা আছে স্যার। হালে ওই বাগানে একের পর এক শ্রমিক খুন হয়ে যাচ্ছে, অথচ খুনি কে, সেটা ধরতে পারছে না পুলিশ। এদিকে, বাগান কর্তৃপক্ষ  থেকে শ্রমিকমহল----সবাই মনে করছে খুনটা করছে নানাসাহেবের পিশাচ...

এই বলে ঘটনাটি আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে সৌম্য। গোরাচাঁদ রায়ের ডায়েরি, বিদ্রোহী নানাসাহেব, পিশাচ, গুপ্তধন --বাদ যায় না কিছুই। 

সব শুনে প্রশান্তভূষণ বললেন, 
--আশ্চর্য ! বিক্রমপুরের এই ঘটনা আমার জানা নেই। অন্তত সরকারি রেকর্ডে এর কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়নি। গোরাচাঁদ রায়ের ডায়েরি এ অঞ্চলের ইতিহাসের একটা নতুন দিক উন্মুক্ত করলে করতেও পারে। কারণ, বিদ্রোহী নানাসাহেবকে শায়েস্তা করেছে বলে যে দুই ইংরেজ সেনা অফিসারের নাম তিনি তাঁর ডায়েরিতে উল্লেখ করেছেন, এরা কিন্তু কেউ-ই কাল্পনিক চরিত্র নন। ইতিহাস বলছে, ১৮৫৯ সালে কাছাড়ের ডেপুটি কমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ক্যাপ্টেন রবার্ট স্টুয়ার্ট। অ্যাসিস্ট্যান্ট ডেপুটি কমিশনার ছিলেন লেফটেন্যান্ট জোসেফ সেরার। দু'জনে মিলে বিশ্বের প্রথম পোলো ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন এই শিলচরে। এ গেল একটা দিক। আরেকটা দিক হচ্ছে, এই ক্যাপ্টেন রবার্ট স্টুয়ার্ট-ই কিন্তু এই ভূখণ্ডে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সিপাহি বিদ্রোহ দমনে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। 

কথা বলতে বলতে চায়ের কাপটা তুলে নিলেন প্রশান্ত ভূষণ। লম্বা চুমুক দিয়ে একটু সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করে নিলেন। নীরবতা'র মধ্যে কেটে গেল কয়েকটি মূহুর্ত। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললেন, 

--বিদ্রোহী সাহেবের নামটা যেন কি বলেছিলে সৌম্য, আরেকবার বলবে?
 
--নানাসাহেব স্যার। 

-- ওহ্ মাই গড ! ওহ্ মাই গড ! আমি যা অনুমান করছি, সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে তো এই ভূখণ্ডের ইতিহাস আবার নতুন করে লিখতে হবে ! 

উত্তেজনার বশে চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরেছেন প্রশান্ত ভূষণ।

--কেন স্যার, কি এমন হল? 

সৌম্য 'র প্রশ্নে প্রশান্ত ভূষণ বললেন 

--বিক্রমপুরে নানাসাহেবের আগমন এবং ক্যাপ্টেন রবার্ট স্টুয়ার্টের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষের সময়কালটা লক্ষ্য করো সৌম্য। স্টুয়ার্ট সাহেব কাছাড়ের ডেপুটি কমিশনার হয়েছেন ১৮৫৯ সালে। এর এক-দেড় বছর আগে বিক্রমপুর বাগানে আগমন হয়েছে নানাসাহেব নামে ওই রহস্যময় ব্যক্তি'র। লোকটা আবার প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী। ধনসম্পদ ছিল বলেই এখানে এসে সে একটা কুঠিও বানিয়ে নিয়েছিল। পকেটে টাকা না থাকলে এটা সম্ভব হতো না। আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করো, তখনকার দিনে আজকালকার মতো রাতারাতি পাকাবাড়ি বানানো সম্ভব ছিল না। সে যতই টাকাকড়ি থাক, একটা কুঠিবাড়ি বানাতে গেলে এক-দেড় বছর সময় লাগত-ই। নিশ্চয় এর ব্যতিক্রম ঘটেনি লোকটার বেলায়ও। ফলে বলা যায়, স্টুয়ার্ট সাহেব কালেক্টর হবার এক-দেড় বছর আগে-ই বিক্রমপুরে এসেছিলেন তোমার বিদ্রোহী সাহেব।

 

মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সৌম্য। প্রশান্ত ভূষণ বলে চলেছেন, এবার ঘটনাগুলো ক্রমবিন্যাস অনুযায়ী সাজালে পুরো ব্যাপারটা গিয়ে কি দাঁড়ায়? সব ঘটনা ই ঘটেছে সিপাহি বিদ্রোহের সময়কালে। অর্থাৎ ১৮৫৭ থেকে ১৮৫৯-৬০ এর মধ্যেবর্তী কোনও এক সময়ে। আর যদি তা-ই হয়, আমরা ধরে নিতে পারি, সম্ভবত ১৮৫৭তে শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এই নানাসাহেব। এরপর যুদ্ধে কাবু করতে না পেরে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বিক্রমপুরে এসে আত্মগোপন করেছিলেন। এবার দেখা যাক, নানাসাহেব নামের কোনও ব্যক্তি ইতিহাসের পাতায় আছে কি না? থাকলেও কী তার সঙ্গে সিপাহি বিদ্রোহের যোগসূত্রটা কী ? 

এ পর্যন্ত বলে উঠে দাঁড়ালেন প্রশান্ত ভূষণ। সৌম্যদের কিছু না বলেই চলে গেলেন পাশের ঘরে। একটু বাদে একটা মাঝারি সাইজের বই নিয়ে ফিরে এলেন এঘরে। পাতা উল্টে একটা বিশেষ পাতায় আঙুল রেখে বললেন, এই দ্যাখো সৌম্য, এখানে উল্লেখ রয়েছে ১৮৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারীদের অন্যতম হচ্ছেন নানা সাহেব (১৮২৪-১৮৫৯)। মূলত কানপুরে সংঘটিত সেনা অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।  মারাঠা পেশোয়া দ্বিতীয় বাজী রাওয়ের দত্তক সন্তান নানাসাহেবের আসল নাম ছিল ধন্দু পান্ত। ব্রিটিশদের কাছে তিনি পরাজিত হলেও ধরা পড়েননি। প্রচুর ধনসম্পদ এবং কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরকে সঙ্গে নিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। ইতিহাসবিদদের ধারণা, ইংরেজের চোখে ধুলো দিয়ে নানা সাহেব নেপালে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং ১৮৫৯ সালে সেখানে তিনি এক শিকার দুর্ঘটনায় মারা যান। আবার অনেকে মনে করেন, সম্পদের লোভে না-কি তাকে খুন করা হয়েছে। তবে সব-ই হাইপোথিসিস। প্রশান্ত ভূষণ বলেন, নানাসাহেবের অন্তর্ধান বা মৃত্যুর কোনও সঠিক তথ্যপ্রমাণ আজও মেলেনি। কিন্তু তার সম্পদ ভাণ্ডার নিয়ে প্রচলিত গল্পগাঁথা প্রায় লোককথার পর্যায়ে গিয়ে পৌছেছে। বলা হয়, অন্তর্ধানের পর নানাসাহেব তার বিপুল সম্পদ এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলেন, পরবর্তীতে যার কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। লোকমুখে এই গুপ্তধন 'নানাসাহেবের খাজানা’ নামে পরিচিত। 

এতক্ষণ নাগাড়ে বলে থামলেন প্রশান্ত ভূষণ। বাঁটা থেকে তুলে এক খিলি পান মুখে পুরলেন। আরেকটা কৌটো থেকে পানের ডাঁটায় সামান্য চুন তুলে নিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঘরে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। 

সেপ্টেম্বরের বিকেল। নীল আকাশে পেঁজা পেঁজা তুলোট মেঘ। তাতে সূর্যের আলো পড়ে এক অনন্যসুন্দর দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। অনেক উপরে প্রায় মেঘের সমান উচ্চতায় কয়েকটা চিল চক্রাকারে চক্কর কাটছে। সেদিকে তাকিয়ে রইলেন প্রশান্তভূষণ। এই শিকারী পাখি গুলো বড় অদ্ভুত। দলবেঁধে গোলগাল চক্কর কাটতে কাটতে উপরে উঠতে থাকে। একসময় হারিয়ে যায় দৃষ্টিসীমার বাইরে। চেয়ারে এসে বসেন প্রশান্তভূষণ। 


মুখ হাঁ করে বসে আছে মামন-তুতুল। সৌম্য জিগ্যেস করে, 

--স্যার, আমরা কি তাহলে ধরে নিতে পারি নানাসাহেবের শেষ পরিণতি নেপালে নয়, ঘটেছিল এই বিক্রমপুরেই। আর এখানেই কোথাও লুকিয়ে আছে তার গুপ্তধন। 

--সেটা খুঁজে দেখা'র ভার তোমার। আমি শুধু তোমার দেওয়া তথ্যগুলোকে ইতিহাসের নিক্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের চেষ্টা করেছি। তবে শেষকথা বলতে হলে এখনও অনেক অনুসন্ধান, অনেক পরিশ্রম করতে হবে।

-- ঠিক আছে স্যার। এই রহস্যের পর্দা সরাতে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব। তবে আপনারও সাহায্য লাগবে। 

এই বলে উঠার অনুমতি চায় সৌম্য। এতক্ষণ চুপচাপ বসে সবকিছু শুনছিল তুতুল। মুখ খুলল এই প্রথম। বলল, 

--একটা কথা বলব  বাবা? 

--বলে ফ্যাল। 

--না মানে ইয়ে বলছিলাম কি, সৌম্যদা'র সঙ্গে এই তদন্তে সামিল হতে চাই আমিও। অবশ্য সবটা নির্ভর করছে তোমার অনুমতির উপর। আমতাআমতা করে বলে তুতুল। মেয়ের এহেন বায়নায় খানিকটা যেন থমকে গেলেন প্রশান্তভূষণ। বললেন, 

--আজ পর্যন্ত তোর কোনো কিছুতেই বাধা দিইনি। কিন্তু এই কাজে যে প্রচণ্ড ঝুঁকি ! পদে-পদে বিপদ ! তাই বলছিলাম কি...

তাঁর কথা শেষ হবার আগেই তুতুল বলে, 

--আমি তো আর কচি খুকিটি নই বাবা। তাছাড়া সৌম্যদা মামনদা-রা তো আছেই। 

মেয়ের কথায় প্রশান্তভূষণ সৌম্যকে জিগ্যেস করেন, 
--এই ব্যাপারে তুতুলের কী জড়ান উচিৎ? কী মনেহয় তোমার? 

সৌম্য বলে, স্যার উচিত-অনুচিতের ব্যাপারটা পুরোপুরি নির্ভর করছে আপনার উপর। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, প্রাণ থাকতে বোনের কোনও ক্ষতি আমি হতে দেব না। 

অগত্যা মেয়ের চাপে এবং সৌম্য 'র প্রশ্রয়ে নিম রাজি হতে হল প্রশান্তভূষণকে। তুতুলকে একঘন্টার মধ্যে কাপড়চোপড় গুছিয়ে নেওয়ার কথা বলে সৌম্য বলল, 

--শোন তুতুল, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় বিক্রমপুর পৌঁছাতে গেলে আমাদের একদম দেরি করা চলবে না।

অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধে উৎফুল্ল  তুতুল জিজ্ঞেস করে, আমরা যাব কীসে সৌম্যদা? লাইন বাসে? 
 
--কেন, মামনের ঐতিহাসিক মারুতিটা কী এতোটাই খারাপ? 

-- না না, আমি মোটেই সে কথা বলিনি মামনদা, জিভ কেটে বলে তুতুল। 


গাড়ি আনতে মামন সৌম্য বেরিয়ে পড়ে। টিকরবস্তি, বিবেকানন্দ রোডের মাথার উপরটা তখন অস্তমিত সূর্যের আভায় লাল হয়ে আছে। সন্ধের হাত ধরে রহস্যময় অন্ধকার চরাচরে নেমে আসার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে।

 

 

 

 পর্ব ৮ 

দিনের আলো পুরোপুরি মরে যাওয়ার আগেই সৌম্যরা মারুতি নিয়ে প্রশান্তভূষণের গেটে পৌঁছে গেল। দু-তিনবার হর্ন বাজাতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল তুতুল। পেছনে প্রশান্তভূষণবাবু। 

ডার্ক-ব্লু জিনসের সঙ্গে সাদা টিশার্ট। উপরে রেড-ব্লু কম্বিনেশনে সামারকোটের আদলে একটি ডোরাকাটা রঙিন কটি। হাতে স্পোর্টস ঘড়ি, পায়ে স্নিকার্স, পিঠে রুকস্যাক ব্যাগ। ব্যস। এটুকুতেই দারুণ লাগছে তুতুলকে। মাঝারি সাইজের একটা ট্রলি ব্যাগ টানতে টানতে এগিয়ে আসছে গাড়ির দিকে। ড্রাইভিং সিটে সৌম্য। পাশে বসে আছে মামন। গাড়ি থেকে নেমে  তুতুলকে ট্রলি ব্যাগটা ডিকিতে রাখতে সাহায্য করল সে। 

ব্যাগট্যাগ রেখে তুতুল গিয়ে বসল পিছনের সিটে। সৌম্যকে মেয়ের খেয়াল রাখার কথা বলে তুতুলকেও সতর্ক হয়ে চলাফেরার পরামর্শ দিলেন প্রশান্তভূষণ। বললেন, 

--মনে রাখিস, একেবারে একটা নতুন জায়গায় যাচ্ছিস। সেখানে আমিও থাকব না। সুতরাং বিক্রমপুরে যে ক'দিন থাকবি, তোর সৌম্যদাদা'র কথা অক্ষরে-অক্ষরে মেনে চলবি। 

--ও নিয়ে তুমি একদম ভেবো-না বাবা। আশ্বস্ত করে তুতুল।

 

প্রশান্তভূষণের কাছে বিদায় নিয়ে অ্যাকসেলেটরে চাপ দেয় সৌম্য। সামান্য এগিয়ে হাতের বাঁদিকে আসাম রাইফেলসের ছাউনি। উল্টো দিকে ক্রিশ্চিয়ান গ্রেভইয়ার্ড। সামনের মোড় থেকে ডানদিকে সে ঝালুপাড়া'র রাস্তাটা ধরল। মামন জিগ্যেস করল, 

--হঠাৎ এদিকে কেন? 

--দুপুরে তো কিছু খাওয়া হল না। মধ্যপ্রদেশে ছুঁচোর ডনবৈঠক আর কাঁহাতক সহ্য করা যায় বল। তা-ই ভাবছি মোমো খেয়ে নিলে বাকিটা পথ স্বস্তিতে ড্রাইভ করা যাবে। 

সৌম্য'র কথা শুনে পেছন থেকে হাউমাউ করে উঠল তুতুল। বলল, 

--ইশশ... রোমাঞ্চকর গল্পে মজে গিয়ে তোমাদের খেতে দেবার কথাটা একদম মাথায় আসেনি। কিন্তু তুমি তো আমাকে মনে করিয়ে দিতে পারতে সৌম্যদা? এই তোমার আমাকে বোন বলে ভাবা? 

তুতুলের গলায় অভিমান। সেটা আঁচ করে সৌম্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। বলে, 

--আহ্ ! সেন্টিমেন্টাল হচ্ছিস কেন? উত্তেজনায় আমারও কী ছাই মনে ছিল খিদের কথা যে, তোকে বলব! 

কথা বলতে বলতে নেপালি মন্দির পেরিয়ে একটা মোমোর দোকান দেখে ব্রেক কষে সৌম্য। বলে, 

--নে, এবার ঝটপট নেমে পড়। আগে মোমো খেয়ে নিই। 

--না, আমার ভাল্লাগছে না। একথা বলে  বলে মুখ ঘুরিয়ে নেয় তুতুল।

 

তার কথা শুনে সৌম্য বলে, 

-- তাহলে আমাদেরও আর মোমো খেয়ে কাজ নেই, কী বলিস মামন? 


সৌম্য 'র কথায় সায় দেয় মামন। সারাদিনের অভুক্ত দু'টো মানুষ শুধু তার জন্য না খেয়ে থাকবে, এটা মেনে নিতে পারে না তুতুল। অগত্যা  গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য হয় সে। 

||||||||||||

সুস্বাদু মোমো'র জন্য ঝালুপাড়া আজকাল বিখ্যাত। ফলে নেপালি অধ্যুষিত এই এলাকাটি রোজ সন্ধেয় মোমোলোভী টিনএজারদের ভিড়ে গমগম করে। 


আজও একই ছবি। 


এটা দেখে সৌম্য 'র মনে পড়ে গেল পুরনো দিনের কথা। ঠিক এরকমটা না হলেও কয়েকবছর আগে ঝালুপাড়ায় সন্ধের ভিড় কিন্তু খুব একটা মন্দ ছিল না। এই পাড়া থেকে রাতের অন্ধকারে দোদুল্যমান কিছু মানুষ হেঁড়ে গলায় গান ধরে টলোমলো পায়ে ফিরে যেত বাড়ি। কোনও কোনও সময় আবার শোনা যেত তাদের বিচিত্র সব সংলাপ। কতদিন কতবার কতভাবে সেই উড়ে আসা সংলাপের রসাস্বাদন করেছে সৌম্য, হেসে কুটোপাটি হয়েছে, তার কোনও লেখাজোকা নেই। এরকমই একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল আজ।

তখন কলেজে পড়ে সৌম্য। থাকতো এই অঞ্চলেই। একরাতে। লোডশেডিংয়ের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে বিবেকানন্দ রোডের মসজিদের পাশে কালভার্টে বসে আছে। হঠাৎ শুনতে পেল, কে যেন গলাছেড়ে গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছে এদিকে। গানটা গুরুদক্ষিণা সিনেমার। কোথা আছো গুরুদেব আমি জানি না...। 

কান পেতে শোনার চেষ্টা করে সৌম্য। সুর মোটামুটি ঠিকঠাক থাকলেও গানের একটা জায়গায় লোকটা দিব্যি তার নিজের কথা বসিয়ে নিয়েছে। 

"কোথা আছোওওওও...গুরুদেবওওওও..., আঁটকুড়ারে দেখো না..." ------ শুনে হাসিও পাচ্ছে, আবার অবাকও লাগছে। কে গাইছে এরকম গান! 

কাছে আসার পর তাকে চিনতে পারে সৌম্য। ওপাড়ার নকুলদা। ওএনজিসিতে ভাল মাইনের চাকরি। কিন্তু হলে কী হবে। মনের দুঃখ ঘোচাতে নিঃসন্তান নকুলদা আজকাল ঝালুপাড়ার অতিথি। 

 

নকুলদার কথা মনে পড়াতে আরেকজনের ছবি ভেসে ওঠে সৌম্যর মানসপটে। সে ঝিকুদা। পেশায় রাজমিস্ত্রী। সারাদিন কাজের পর বাজারটাজার সেরে ঝালুপাড়াটা একপাক ঘুরে আসতেই হত ঝিকুদাকে। এ-ছিল তার  রোজকার অভ্যেস। সেখানে আরেকপ্রস্থ ঢোঁকঢাকের ডিউটি'র পর স্খলিত পায়ে বাজারের ঢাউস থলেটা টেনেহিঁচড়ে কোনওমতে পাড়ার দোকান পর্যন্ত নিয়ে আসার পর সংসারের প্রতি জেগে উঠত তার প্রবল বিতৃষ্ণা। তখন বিদ্রোহ ঘোষণা করত ঝিকুদা। আপাতনিরীহ গোবেচারা ব্যাগটাকে প্রতিপক্ষ ধরে নিয়ে জড়ানো গলায় টেনে টেনে বলতো, 'এ্যাই শ্লা হারামজাদা ব্যাগ, জীবনটা তো ঘাড়ে বসেই  কাটিয়ে দিলি! এবার একটু নিজে হাঁটাচলার চেষ্টা কর বাবা। তোকে বয়ে বয়ে ঘেন্না ধরে গেল মাইরি।' চরম ঘৃণাভরে ব্যাগটাকে প্রত্যাখ্যান করে টলতে টলতে বাড়িমুখো হাঁটা লাগাতো ঝিকুদা। পেছন থেকে দোকানদার, পাড়ার ছেলেদের কত ডাকাডাকি। কিন্তু কে শুনে কার কথা। শুধু আনাজ ভর্তি নির্জীব থলেটা নিতান্ত অসহায়ের মতো পড়ে থাকত পেছনে। পরে ঝিকুদার মেয়েরা কোনও কোনও দিন বউদি এসে সেই ব্যাগ উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে যেত। তাদের সেই কুণ্ঠিত করুণ মুখচ্ছবি সৌম্য'র স্মৃতিপটে আজও অমলিন।

এই ছিল ঝালুপাড়া এবং সেখানে যাওয়া-আসা করা কিছু মানুষের কাণ্ডকারখানা! তবে সময়ের বিবর্তনে সেসব এখন দূর অতীত। নকুলদা ঝিকুদা 'র মতো চরিত্ররা-ও আর নেই। আজকের ঝালু পাড়ায় এমাথা-ওমাথা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অনেকগুলো মোমো'র দোকান। সব দোকানেই মাছির মতো ভনভন করছে খদ্দের। রাস্তার পাশে বাইকের লম্বা সারি। 

||||||||||||

ভিড় ঠেলে কোনও মতে তিনটি ফুল প্লেট চিকেন-মোমো'র অর্ডার দেয় সৌম্য। হঠাৎ সামনের মোড়ে একটা দৃশ্য নজরে পড়ায় চোখ আটকে যায় সেখানে। সৌম্য দেখে, কলেজিয়েট স্কুলের সীমানাদেয়ালের পাশ ঘেঁষে থাকা দোকানটার বারান্দায় বিচিত্র পোশাকের দু'টো ষণ্ডামার্কা লোক হাতপা নাড়িয়ে কথা বলছে। আশ্চর্য, এই গরমেও লোক দুটোর  মাথায় তিব্বতি টুপি ! সেটা আবার তেরছা করে সামনের দিকে টেনে নামানো। এভাবে টুপি পরলে চট করে কারোর মুখ দেখা যায় না। 

 

এরা কেন নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চাইছে? কৌতূহল বাড়তে থাকে সৌম্য 'র। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে দূর থেকে রহস্যময় লোক দু'টো -কে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তবে কৌতূহলী সৌম্য এদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে থাকে। 

এবার এ'দিকেই এগিয়ে আসছে লোক দু'টো। সৌম্য কী একটু আড়ালে চলে যাবে? না, তার আর দরকার পড়ল না। লোক দু'টো নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে রাস্তার উল্টো দিকে রামকৃষ্ণ মিশনের গেটের সামান্য দূরে অন্ধকারে মিশে থাকা একটা বিলাসী গাড়িতে গিয়ে বসল। তারপর গাড়ি নিয়ে হুস করে বেরিয়ে গেল পুলিশ রিজার্ভের দিকে। সৌম্যর মনে হলো, এই গাড়িটাই দুপুরে দেখা সেই কালো হোন্ডাই ক্রেটা।  

|||||||||

মামন গাড়ির ব্যাপারে কিচ্ছু জানে না। কেননা, এব্যাপারে সৌম্য তাকে কিছু বলেনি। আর তুতুলের তো জানার প্রশ্নই ওঠে না। সে বেচারি সৌম্যদের সঙ্গী হয়েছে একটু আগে। 

রাতের অন্ধকারে প্রায় নির্জন পথ ধরে যেতে হবে বিক্রমপুর। সঙ্গে তুতুল। কথাটা মনে হতেই কালো রঙের হোন্ডাই ক্রেটা ও তিব্বতি টুপির রহস্যময় লোক দু'টোকে  নিয়ে মনেমনে চিন্তিত হয়ে ওঠে সৌম্য। তবে এব্যাপারে কাউকে কিছু বুঝতে দেয় না সে। 

দোকান মালিক সূরজ থাপা তার পূর্বপরিচিত। স্কুলবেলার বন্ধু। তাকে তাড়া লাগায় সৌম্য। 

কিছুক্ষণ পর। আগুনের মতো ঝাল চাটনিতে ডুবিয়ে  আস্ত একখানা মোমো মুখের ভেতর চালান করে দেয় মামন। তারপর হোসহাস করতে করতে জিগ্যেস করে,
--আচ্ছা সৌম্যদা, যদ্দূর মনে পড়ছে বিক্রমপুরে আগন্তুক  সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী'র নামটা বিদ্রোহী সাহেব বলেই উল্লেখ করেছিলেন তারাচাঁদ রায়চৌধুরী , তাই-না? কিন্তু স্যারের কাছে আজ তুমি তার নাম নানাসাহেব বলে উল্লেখ করলে!  কেন? 

-- বাহ্, মোক্ষম পয়েন্ট ধরেছিস তো। তা সেটা বলারও কারণ আছে বইকি মাই ডিয়ার, প্লাস্টিকের কাপ থেকে সামান্য পুদিনাপাতার চাটনি মুখে চালান করে দিয়ে সৌম্য বলতে থাকে, তোর নিশ্চয় মনে আছে, গতরাতে গোরাচাঁদ রায়চৌধুরীর ডায়েরিটা নিয়ে বসেছিলাম। পড়তে পড়তে একটা জায়গায় দেখতে পাই ডায়েরির ফুটনোটে লাল কালি দিয়ে নানাসাহেব নামটা উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষুদে হরফে'র লেখা, তাই হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে তারাচাঁদবাবুর। 

--ওহ্হ...  এই কথা! আচ্ছা ডায়েরিতে কী আরও..., নতুন করে কিছু জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল মামন।

 

তাকে মাঝপথে আটকে সৌম্য বলল, 

--নে, এবার কথা বন্ধ করে হাতের প্লেটে মন দে তো দেখি। তুইও হাত চালা তুতুল। তবে দেখিস, ঝালুপাড়ার ঝালটা যেন আবার ভেতরে বেশি করে চালান না হয়ে যায়।

শব্দ করে হেসে ওঠে তুতুল। বলে, ঝালুপাড়ার ঝাল! বেড়ে বলেছ তো সৌম্যদা। 

||||||||

খাওয়াদাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ল সবাই। মামনকে গাড়ি চালাতে বলে ড্রাইভিং সিটের পাশের আসনে গিয়ে বসল সৌম্য। তুতুল যথারীতি পিছনে। মিশন রোড, ঝালুপাড়া 'র রাস্তাঘাট অপ্রশস্ত, ঘিঞ্জি। তবে পুলিশ রিজার্ভের এদিকটা কোনও পাহাড়ি শহরের কথা মনে করিয়ে দেয়। গাছগাছালি ঘেরা সামনের নির্জন খাড়াইটা উঠতে উঠতে মামন জিগ্যেস করে, এবার কোন রাস্তাটা নেবো? চোখ বন্ধ করে সৌম্য বলে, ডানদিকে চার্চের রাস্তাটা ধর। 

তাই করল মামন। গাড়িটা শিলংপট্টি, ডিআইজি বাংলো, গান্ধীবাগ পেরিয়ে দেবদূত মোড়ে গিয়ে যখন পৌছাল, রাতের চাদরে আচ্ছাদিত হয়ে আছে শহরের আকাশ। রাস্তাঘাটে অফিস ফেরত মানুষের ব্যস্ততা দেখতে দেখতে সদরঘাটের পুরনো সেতুতে গিয়ে উঠল গাড়িটা। পাশে নতুন সেতুটায় বাহারি আলোকসজ্জা। ঝলমল করছে চারদিক। 

রংপুর পেরিয়ে সৌম্য বলল, শোন মামন। রাস্তায় যদি কেউ গাড়ি থামানোর চেষ্টা করে, ভয় পাবি না। আর বেশি ট্যাণ্ডাইম্যাণ্ডাই করলে সোজা উপর দিয়ে চালিয়ে দিবি। বাকিটা পরে দেখা যাবে।  

হঠাৎ একথা শুনে চিন্তায় পড়ে যায় মামন। উত্তেজিত তুতুল বলে, বিপদটা কি টুপি ওয়ালা লোক দু'টো থেকে আসতে পারে সৌম্যদা? 

এবার অবাক হবার পালা সৌম্য'র। বলল, সে কী! কোন লোক দু'টো? তাদের কথা তুই কীভাবে জানতে পারলি? 

তুতুল বলে, একটু চোখকান খোলা রাখলে সবই জানা সম্ভব। ঝালুপাড়ায় লোক দু'টো চোখে পড়েছে আমারও। তবে তুমি চিন্তা করোনা সৌম্যদা। আত্মরক্ষার একখানা জবরদস্ত হাতিয়ার আমি সবসময় সঙ্গেই রাখি। হাতিয়ারটার সামনে বুনো ষাঁড়-ও পোষা ছাগলটি বনে যেতে বাধ্য। তাছাড়া স্কুলে জুজুৎসুর প্রশিক্ষণটাও নিয়ে রেখেছি। সুতরাং...

--বাহ, তোর মধ্যে গোয়েন্দা হয়ে ওঠার সব গুণাবলি-ই রয়েছে দেখছি। অবশ্য চ্যালাটি কার সেটিও দেখতে হবে তো।  


সৌম্যর প্রশংসায় বুকের ছাতিটা চওড়া হয়ে যায় তুতুলের। 


মহাসড়ক ধরে লাঠিগ্রাম, ঝাঁপিরবন্দ পেরিয়ে অন্ধকার চিরে সাঁইসাঁই করে ছুটছে সৌম্যদের গাড়ি। রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল। চাপচাপ অন্ধকারে গাছপালা গুলো প্রাগৈতিহাসিক দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। দূরে হাতিছড়া বনদুর্গা মন্দির। জায়গাটা ভাল নয়। সেখানে হঠাৎ একটা আলোর ফুটকি দপ করে জ্বলে উঠে-ই ফের নিভে গেল। সতর্ক হয়ে উঠল সৌম্য।

 পর্ব ৯ 

আলোটা চোখে পড়েছে মামনেরও। খানিকটা অবাক হয়ে সে বলল, 

--ওটা কী দেখা গেল সৌম্যদা? 

--মনে হচ্ছে সামনে বিপদ। চিন্তিত স্বরে উত্তর দেয় সৌম্য। বলে, অস্ত্রটা বের করে হাতের কাছে রাখ। তুতুল তুইও তোর হাতিয়ারটা বের করে নে। 

সৌম্য নিজেও তার পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে নেয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাদের গাড়িটা বনদুর্গা মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। 

জনবসতিহীন শুনশান রাস্তার ধারে একটা বিশাল বটগাছ। তার নিচে মন্দির। জায়গাটা বেশ অন্ধকার ! চারদিকে ঝোপঝাড়ে জোনাকি জ্বলছে। ডান ধারে একটা জলা। তার ওপাশে টিলার উপর একটা মস্ত পোড়োবাড়ি। এক সময় কোনও এক সাহেব মস্ত বাড়িটা বানিয়েছিল চা-বাগান পরিচালনার জন্য। সেই বাড়ির এখন এই দশা !  শোনা যায়, রাত-বিরেতে ওই পোড়োবাড়ি থেকে নানা রকমের শব্দ ভেসে আসে। গভীররাতে অনেকেই সে শব্দ শুনেছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, রাতে যারা শব্দ করে, তারা মানুষ নয়। 

পাঁচকান ঘুরে কথাটা সৌম্য'র কানেও এসেছে। তবে  এ-সবে আমল দেয়নি সে। পরিত্যক্ত বাড়িটা সমাজবিরোধীদের আড্ডাখানা বলেই মনে হয়েছে তার।

 

 

গাছতলায় চটচটে আঠা'র মতো একদলা অন্ধকার লেপ্টে আছে রাতের গায়ে। হেডলাইটের ফোকাস সেই সূচীভেদ্য আঠালো অন্ধকার ঠেলে নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত গিয়ে মিলিয়ে গিয়েছে। পরের অংশটুকু আবছা। সেই আলো-আঁধারি'র মধ্যে একটা অপার্থিব দৃশ্য চোখে পড়াতে চমকে উঠে সৌম্য। 

হেডলাইটের ফোকাস যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, তার ওপারে আবছা অন্ধকারে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে আছে অস্বাভাবিক লম্বা একটা ছায়ামূর্তি ! নেই নেই করেও ছায়ামূর্তিটার উচ্চতা দুই মানুষের সমান ! মনুষ্য-সদৃশ ছায়ামানবের চোখদুটো ধকধক করে জ্বলছে। ঠোঁট ঠেলে বেরিয়ে এসেছে তীক্ষ্ণ সাদা দাঁত।

এই দৃশ্য দেখে মামনের হাতপা অবশ হওয়ার উপক্রম। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে  গাড়িতে সজোরে ব্রেক কষল সে। 

নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না সৌম্য'র। তবে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ব্যাপারটা যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করছে সে। একটা লোক এতটা লম্বা হয় কী করে ! তাছাড়া মানুষের ছেদক-দন্ত কি হিংস্র শ্বাপদের মতো হয়? স্বপ্ন দেখছে না তো ! গায়ে চিমটি কেটে নিজেকে একবার পরখ করে নেয় সে। 

দৈত্যাকৃতি'র লোকটা সৌম্যদের গাড়িটাকে যেন গ্রাহ্যই করছে না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার উপর। একটা লম্বা হাত ক্রমশ এগিয়ে আসছে গাড়ির দিকে। 


পেছনের সিট থেকে ভেসে এলো তুতুলের ভয়ার্ত চীৎকার, গাড়ি ছোটাও মামন'দা...

মামন গাড়ি ছোটাবে কী, এই অপার্থিব ঘটনার মুখোমুখি হয়ে গলা দিয়ে গাঁকগাঁক শব্দ ছাড়ছে। তুতুলের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে গাড়ি ছোটাতে গেল সে। কিন্তু তাড়াহুড়োয় ব্রেক প্যাডেল আর অ্যাকসিলারেটরে বোধহয় একসঙ্গে চাপ দিয়ে ফেলেছে। ফলে ঘড়ঘড় শব্দ করে গাড়ির ইঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে গেল। 

 

সঙ্গে-সঙ্গে চারপাশে ঝুপ করে নেমে এলো নিকষকালো অন্ধকার। সৌম্য'র  মনে হল, মহাশূন্যের এক অতলস্পর্শ কৃষ্ণগহ্বরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে তারা। 

অকস্মাৎ সেই ঘনঘোর অন্ধকার থেকে ভেসে এলো বজ্রনির্ঘোষ! 
'যদি নিজের ভালো চাস, এখনই ফিরে যা।  ফিরে যা। মনে রাখিস,  কুঠি'র সাহেবকে নিয়ে ঘাটাঘাটি করার শাস্তি  মৃত্যু।'

ভয়ঙ্কর সেই গলার স্বর! 


মনে হয়, ঘড়ঘড়ে আওয়াজটা কোনও এক মৃত্যু উপত্যকা থেকে প্রতিধ্বনিত হতে-হতে হাতিছড়া বাগানে এসে আছড়ে পড়ছে। 

কথাগুলো ভাল করে শোনার চেষ্টা করে সৌম্য। মনে হয়, আলকাতরা'র বড়ো ড্রামে মুখ ঢুকিয়ে কথা বললে যেরকম শব্দ হবে, এই আওয়াজ অনেকটা সেরকম-ই। 

অন্যকেউ এরকম একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কী হতো বলা মুশকিল। কিন্তু সৌম্য বরাবরের ডাকাবুকো। ভয়ডর তার অভিধানে কোনোকালেই নেই। 

হঠাৎ ভেতরের বুনো ষাঁড়টা জেগে উঠল সৌম্য'র। যা হয় হবে। গাড়ির উইন্ডো স্ক্রিন নামিয়ে শরীরের অর্ধাংশ বের করে মূর্তিটা যেদিকে রয়েছে, সেদিক  লক্ষ্য করে পরপর তিন রাউন্ড গুলি ছুঁড়ল সে। আশ্চর্য, বন্দুকের একটা গুলি-ও  ছায়ামূর্তিটার গায়ে লাগল বলে মনে হলো না !  উল্টে অন্ধকারে মিশে থাকা ছায়া-মানব বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। 

এতক্ষণে চোখে অন্ধকার অনেকটা সয়ে এসেছে। সৌম্য দেখল লম্বা লম্বা পা ফেলে জলা পেরিয়ে ছায়ামূর্তিটা পোড়োবাড়ি'র দিকে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। 

||||||||

মামনটা বোধহয় ভয়ে মূর্ছা গিয়েছে। তুতুলেরও সাড়াশব্দ নেই। গাড়ির ভিতরটা নিস্তব্ধ। হঠাৎ তুতুলের গলা শোনা গেল।

-- এটা কী হলো সৌম্য'দা? ছায়ামূর্তিটা কে ছিল?

--তুই ঠিক আছিস তুতুল? ভয় পাস না।  আগে এ জায়গাটা ছেড়ে বেরিয়ে যাই। তারপর ও নিয়ে কথা বলা যাবে খন। 

এই বলে মামনকে কোনওমতে ধাক্কা দিয়ে জাগায় সৌম্য।

 

সম্বিত ফিরে পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মামন। বলে, ছায়ামূর্তিটা কোথায় সৌম্য'দা?  

--এসব নিয়ে তোর আর মাথা ঘামানোর দরকার নেই।  বরং তুই কোনও মতে আমার সিটে চলে আয়। বাকিটা রাস্তা আমি ড্রাইভ করব।বলতে বলতে দরজা খুলে নেমে পড়ে সৌম্য। গাড়ির সামনের দিকটা ঘুরে ডানদিকে ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে সে। দ্বিরুক্তি না করে ঘষটে ঘষটে সৌম্য'র ছেড়ে যাওয়া সিটটায় গিয়ে বসে মামন। 

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অ্যাকসিলারেটরে চাপ দেয় সৌম্য। যেতে যেতে বনদুর্গা মন্দিরের ওপাশে গাছতলায় অন্ধকারে মিশে থাকা হোন্ডাই ক্রেটা নজর এড়িয়ে যায় না তার।

 

|||||||

হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটছে সাঁইসাঁই করে । সবদিক অন্ধকার। রাস্তার দু'ধারে ঝোপজঙ্গল। গাড়ির ভেতর সবাই চুপচাপ। ডলু বাজার পেরিয়ে ঘড়ি দেখল সৌম্য। রাত সাড়ে ৮টা। কিন্তু এরইমধ্যে দোকানপাটের ঝাপ পড়ে  গিয়েছে। কিংশুককে ফোন করে তুতুলের জন্য একটা আলাদা কক্ষ বন্দোবস্ত করার কথা বলল সে। 

রাত সোয়া ন'টা নাগাদ বিক্রমপুর বাগানে গিয়ে পৌছাল সৌম্যরা। গাড়ির আওয়াজ শুনে বাংলো থেকে বেরিয়ে এলেন খোদ তারাচাঁদ রায়চৌধুরী। পেছনে কিংশুক রায়। 

কিংশুকের মুখে তুতুলের আগমনের বার্তা আগেই শুনেছেন তারাচাঁদবাবু। ব্যস্ত হয়ে জিগ্যেস করলেন, এ কী সৌম্যবাবু ! রাতের বেলা এই নির্জন  রাস্তা ধরে মামণিকে নিয়ে এতদূর এলেন !  রাস্তায় কোনও সমস্যা হয়নি তো মামণি? 

তুতুল কিছু বলবে, এর আগেই তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সৌম্য বলে, 

--না...না। কী আবার হবে। আমরা তো আরামসে-ই এলাম। গপ্পো করতে করতে। 

তুতুল বুদ্ধিমতী। তাকে আর বলে দিতে হয় না, তারাচাঁদবাবুর কাছে বিষয়টা চেপে যেতে চাইছে সৌম্য। সুতরাং সৌম্য'র কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয় সে-ও। সৌম্য আচমকা জিগ্যেস করে, 

--তা হঠাৎ এ-ই প্রশ্ন কেন তারাচাঁদবাবু ? আপনি কি আমাদের সমস্যার কোনও খবর পেয়েছেন? 

সৌম্য'র পাল্টা প্রশ্নবাণে কেমন যেন থমকে গেলেন তারাচাঁদবাবু। বললেন, 

--বুঝলেন সৌম্যবাবু, ক'দিন ধরে বাগানে যা ঘটছে, তাতে মনের ভেতর সবসময় একটা ভয় কাজ করে। এ-ই বুঝি কিছু হয়ে গেল। তা-ই জিগ্যেস করা আরকি। 

-- তা ঠিক, এরকম খুনখারাপি ঘটলে তো ভয় পাওয়ার-ই কথা। 

আর কথা না বাড়িয়ে গ্যারেজটা কোনদিকে জেনে নেয় সৌম্য। তারপর গাড়িটাকে সেখানে রেখে বাংলোয় প্রবেশ করে সে। আগে আগে তারাচাঁদবাবু। পেছনে তুতুল, মামন ও কিংশুক। 

||||||||||

তুতুলের আপ্যায়নে কোনও ত্রুটি রাখলেন না তারাচাঁদ। সৌম্যদের কক্ষের পাশেই একটা বিশাল ঘরে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। 

কিছুক্ষণের মধ্যে গা হাতমুখ ধুয়ে সবাই ফ্রেশ হয়ে নিল। খাবারের টেবিলে গিয়ে দেখা গেল, এলাহি আয়োজন ! 

পেটপুরে খাওয়াদাওয়ার পর সৌম্য বলল,

-- সারাদিন শরীরের উপর দিয়ে যা ধকল গ্যাছে। এখন শুতে পারলে বাঁচোয়া। তুই-ও গিয়ে শুয়ে পড় তুতুল। বাকি কথা হবে সকালে। আর শোন, বাড়িতে একটা ফোন করতে ভুলে যাস-না যেন। নইলে স্যার চিন্তা করবেন। ও হ্যাঁ,  রাতে কোনও দরকার পড়লে আমাকে ফোন করিস। 

--ঠিক আছে সৌম্য'দা।  তবে বাড়িতে ফোন করার কাজটি আমি এখানে এসেই সেরে নিয়েছি। 

সৌম্যদের কথাবার্তা চলাকালে সবাইকে শুভরাত্রি জানিয়ে বিদায় নিলেন তারাচাঁদবাবু। তুতুলও শুতে চলে গেল। 

ঘরে ঢুকে দরজায় খিল তুলে দিয়ে সৌম্য বলল, 

-- দ্যাখ মামন,  এই মূহুর্তে একটা সিগারেট না হলে একেবারে-ই চলছে না। তা-ই পেছনের বারান্দায় যাচ্ছি। তুই বরং আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়। 

মামন জানে, সিগারেট আসলে একটা বাহানা। সৌম্য এখন একান্তে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চাইছে। তাই সে আর কথা বাড়ায় না। 

|||||||

কিছুক্ষণ বাদে। পেছনের বারান্দায় বসে আছে সৌম্য। চারপাশে নিকষকালো অন্ধকার। 


এ-ই মূহুর্তে চরাচরে আর কেউ জেগে আছে বলে মনে হয় না। বহুদূরে বড়াইল পাহাড়ের বুকে একটা লাল আলোর ফুটকি। আলোটা কী হারাঙ্গাজাওয়ে? কে জানে, হাফলংয়েও হতে পারে। অন্ধকারে কিছু ঠাহর করা মুশকিল। হাফলং শহরের কথা মনে পড়াতে আরও একটা কথা মনে পড়ে গেল সৌম্য'র। মনে করা হয় ডিমাসা শব্দ হাফ্লৌ বা হাঙখলং থেকে হাফলং নামের উৎপত্তি। সহজ বাংলায় এ-র মানে পিঁপড়ের পাহাড় ! সত্যিই কী তা-ই? আজকের এই শৈলশহর কী কোনও কালে পিঁপড়ের আবাসস্থল ছিল? 

 

অবশ্য হাফলংয়ের জেমি নাগারা এ-ই তত্ত্ব মানতে নারাজ। তারা মনে করে, একসময়  এই অঞ্চলে হামলং নামে জেমি নাগা সম্প্রদায়ভুক্ত এক ব্যক্তির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। পরবর্তীতে হামলং থেকেই হাফলং নামের উৎপত্তি। 

 

হলে হতেও পারে। তবে এই মূহুর্তে এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চাইছে না সৌম্য। ঘটনাগুলো পরপর সাজিয়ে কিছু প্রশ্নমালা তৈরি করতে শুরু করল সে। 

 

বিক্রমপুরের নানাসাহেব কী সেই পেশোয়া নানাসাহেব? যদি তা-ই হয়, তবে কী বাগানে পিশাচের আতঙ্ক ছড়িয়ে নানাসাহেবের গুপ্তধন খুঁজতে এসেছে কেউ? 

 

প্রশ্নগুলো মাথায় অনবরত  ঘুরপাক খেতে থাকে। সৌম্য'র মনে হয়, গুপ্তধনের খোঁজে কেউ যদি এসেই থাকে, তাহলে ভূতের আস্তানা বলে কুঠিবাড়িটার দীর্ঘকালের অখ্যাতি ওই হানাদারদের জন্য  শাপে বর হয়েছে ! 

 

কিন্তু এই ঘটনায় বেচারা শ্রমিকগুলোকে খুন করা হচ্ছে কেন? কুঠিতে আস্তানা গেঁড়ে থাকা  পাগলটাই বা কে? হাতিছড়া'র নির্জন রাস্তায় লম্বা ছায়ামূর্তিটাও বা কে ছিল? 

রহস্যের ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে যেতে-যেতে  মরীয়া সৌম্য একটা ক্ষীণ আলোকরেখা'র সন্ধান করছে। সে জানে, রহস্য যতই জটিল আর অসম্ভব লাগুক না কেন, আসলে গোটা বিষয়টাই একটা চেনের মতো। একটা গিঁট খুলে গেলেই বাকিগুলো আপনা-আপনি এসে ধরা দেবে।  

হঠাৎ সামনে শিরিশ গাছের ডালে একটা রাতপাখি বিকট স্বরে ডেকে ওঠাতে ভাবনার জাল ছিন্ন হয়ে গেল সৌম্য'র। অজান্তেই চোখ চলে গেল বাগান কুঠি'র দিকে। 


এ কী ! গতরাতের মতো আজও সেই তীব্র আলোকরশ্মি আকাশ ফুঁড়ে সোজা উপরে উঠে মিলিয়ে গিয়েছে মহাশূন্যে!

 

 

 

 পর্ব ১০ 

 

আশ্চর্য ! এত রাতে নিঝুম কুঠিতে আলো জ্বালছে কে? চারদিকে ভাল করে নজর করতে দেখা গেল, দূরে পাহাড়ের বুকেও একটা তীব্র আলো পরপর তিনবার জ্বলে নিভে গেল। না, এটা কিছুক্ষণ আগে দেখা সেই লাল আলোর ফুটকি নয়। এভাবে আলো জ্বেলে গোপন সঙ্কেত পাঠানো হয়। দুর্গম এলাকায় সামরিক বাহিনীর লোকেরা এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পের খবর নিতে আলোর সাহায্য নিয়ে থাকে। জঙ্গি এবং মাফিয়ারাও গোপন সঙ্কেত পাঠায়। কেউ কী তবে আলোর সঙ্কেত পাঠাচ্ছে? 


জায়গাটা খুব ভালো করে আন্দাজ করার চেষ্টা করে সৌম্য। যদিও অন্ধকারে তেমন কিচ্ছু ঠাহর হচ্ছে না, তবে বহুদিন এই অঞ্চলে ঘোরাঘুরির সুবাদে এলাকাটি তার হাতের তালুর মতো চেনা। সেই অভিজ্ঞতা থেকে সে অনুমান করে, আলোটা এসেছে বান্দরখাল পুঞ্জির দিক থেকে। 


আরে, ওদিকে তো এখন দিনরাত মহাসড়কের কাজ চলছে ! কথাটা মনে পড়তেই মাথায় ঝক করে একটা সম্ভাবনা ঝিলিক দিয়ে উঠল।সময় নষ্ট না করে ঝটপট উঠে দাঁড়ায় সৌম্য। ঘরে ঢুকে ড্রয়ারে রাখা রিভলবারটা পকেটে পুরে নেয়। বিচিত্র সব নাসিকাধ্বনি বের করে মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে মামন। তাকে না জাগিয়ে বালিশের কাছে রাখা পাঁচ ব্যাটারির টর্চটা আলগোছে তুলে নেয় সৌম্য। তারপর আস্তে করে দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ে সে। 

||||||||

 

কৃষ্ণপক্ষের রাত। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। বাংলোর সামনে রাস্তার ধারে শুধু চা গাছ। তার উপর অজস্র জোনাকির ওড়াওড়ি। 

 

খানাখন্দভরা কাঁকর বিছানো পথ ধরে এগিয়ে চলেছে সৌম্য। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে ক্যাম্বিসের জুতোটা পরে এসেছে, নইলে অন্ধকারে এই রাস্তায় চলাফেরা করাটা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ত। 

 

অল্প দূর এগোনোর পর  হাতের বাঁদিকে জঙ্গুলে রাস্তাটা নিতে হল তাকে। এদিকটায় বড়- বড় গাছ, ঝোপঝাড়, অন্ধকার আরও ঘন। সাপখোপ থাকাটাও বিচিত্র নয়। তাই দেখেশুনে হাঁটাচলা করা দরকার। কিন্তু আলো জ্বাললে পাছে কেউ টের পেয়ে যায়, তাই টর্চ জ্বালানো যাচ্ছে না। 

 

এতক্ষণে অন্ধকার অনেকটা সয়ে এসেছে। আসলে অন্ধকার যতই নিরেট হোক, তার একটা নিজস্ব আলো আছে। সেই আলোয় সন্তর্পণে এগিয়ে চলেছে সে। 

 

এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর কুঠি'র কাছাকাছি পৌঁছে গেল সৌম্য। একটু আগে আকাশ ফুঁড়ে যাওয়া আলোকরশ্মিটা আর নেই। মস্ত বাড়িটা অন্ধকারে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক নিস্তব্ধ। 

 

যথাসম্ভব হালকা হাতে লোহার ফটকটা খোলার চেষ্টা করতেই বহুদিনের জঙধরা পাল্লা ক্যাঁচ করে প্রতিবাদ করে উঠল। 

 

নিস্তব্ধতা'র মাঝখানে বিদঘুটে এই আওয়াজ নিজের কানেই কেমন বিসদৃশ ঠেকে সৌম্য 'র। চারদিকে একবার সতর্ক নজর  বুলিয়ে নেয় সে।

 
নাহ্, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। 

 

ফটক বন্ধ করতে গেলে ফের শব্দ  হতে পারে, তাই সেটা খোলা রেখে-ই কুঠির দিকে এগোতে লাগল সে। হঠাৎ পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল সৌম্য। 


এ কী ! অন্ধকারে একটা বেঁটেখাটো ছায়ামূর্তি না ! অবাক হয়ে গেল সে ! মূহুর্তের মধ্যে ছায়ামূর্তির দিকে রিভলবার উঁচিয়ে অনুচ্চস্বরে বলল, 

 

-- খবরদার । আর এক পা এগিয়েছ কী,  ওখানেই লাশ বিছিয়ে দেবো। মনে রেখো, তুমি আমার বন্দুকের নিশানায়। 

--ইশশশ সৌম্য'দা, করছটা কী ! বন্দুকটা নামাও, ফিসফিস করে বলে ছায়ামূর্তি। 

--একি, তুতুল তুই ! এত রাতে আমাকে ফলো করছিস ! কাজটা কিন্তু মোটেই উচিত হয়নি তোর। 

--উচিত-অনুচিত নিয়ে পরে ভাবা যাবে, এখন চলো দেখি, এগোই। কিন্তু আলোটা যে আর দেখা যাচ্ছে না। ততোধিক ফিসফিস করে বলে তুতুল। 

তার কথায় স্পষ্ট, ডাকাবুকো মেয়েটা না ঘুমিয়ে গোপনে সবকিছু লক্ষ্য করেছে ! তবে এসব নিয়ে বাদানুবাদের উপযুক্ত স্থান এটা নয়। অগত্যা তুতুলকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে থাকে সৌম্য।  বেড়াল পায়ে কুঠি'র পেছনদিকে বড় বটগাছের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ায়  দু'জনে। 

চুপচাপ বসে পরিস্থিতিটা আঁচ করার চেষ্টা করে সে। কুঠির নিচতলার কক্ষে খুব খাটো গলায় কথা বলছে কেউ। কিন্তু ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে বলে মনে হয় না। তুতুলকে ইশারায় গাছের আড়ালে বসে থাকার নির্দেশ দিয়ে নিঃশব্দে ঘরের দেয়ালে গিয়ে কানপাতে সৌম্য। 


ভিতরে কথাবার্তা এত অনুচ্চস্বরে চলছে যে, বাইরে থেকে তার বিন্দুবিসর্গ বোঝার উপায় নেই। জায়গাটা ভালো করে জরিপ করে নেয় সৌম্য। দেয়ালে কোনও জানালা দেখা যাচ্ছে না। উপরে শুধু একটা ঘুলঘুলি । 


হঠাৎ গাছের উপর নজর পড়তে একটা বুদ্ধি খেলে গেল তার মাথায়। ততোধিক সন্তর্পণে ফিরে এল তুতুলের পাশে। টর্চটা তার হাতে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, 

-- শোন, আমি গাছের ডাল বেয়ে ঘুলঘুলিটায় যাচ্ছি। এই ফাঁকে তুই ও-দিকের শিরিশ গাছটার আড়ালে চুপচাপ বসে থাক গিয়ে। 

--এ কী ! এই অন্ধকারে তুমি গাছ বাইবে সৌম্য'দা ! পা পিছলে যদি কোনও অঘটন ঘটে? 


--কিস্যু হবে না। আর শোন, এখানে যা-ই ঘটুক না কেন, টুঁশব্দ করবি না। আমার কাছে  বন্দুক আছে। সেরকম বিপদ দেখলে গুলি চালিয়ে দেবো। এছাড়া তোর হাতে পাঁচব্যাটারির টর্চটা তো রইলই। দরকারে এটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করবি। তবে সাবধান, আগ বাড়িয়ে কিছু করতে যাবি না। কথাটা মনে থাকে যেন। 

সৌম্যর গলা এতটাই খাদে যে, তার কথাগুলো বাতাসেরও শোনার সাধ্যি নেই।


বাধ্য মেয়ের মতো নির্দেশ পালন করে তুতুল। শিরিশ গাছের আড়াল থেকে সে দেখতে পায়, তরতর করে গাছ বেয়ে নিঃশব্দে উপরে উঠে গেছে সৌম্য। অন্ধকারে তার এই গাছ বাওয়ার দক্ষতা যেন বাঁদরকেও হার মানায়।

তুতুল যথেষ্ট সাহসী মেয়ে। কিন্তু সৌম্য'র এই দুঃসাহসিক কাণ্ডকারখানা দেখে বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল তারও। যদি ভেতরের লোকগুলো তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে যায় ! তাছাড়া বর্ষা এখনও ছেড়ে যায়নি। তার ওপর ঝুপসি বটগাছটাও বেশ পুরনো। তাতে মেলা পাখির বাসা থাকতে পারে। এরকম গাছের কোটরে সাপবিচ্ছু থাকাটা বিচিত্র নয়।


ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে তুতুল কতবার দেখেছে, পাখির ছানার লোভে গাছের ডালে প্যাঁচ খেয়ে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকে বিষধর সাপ। 

 

কথাটা মনে হতেই উৎকণ্ঠা মিশ্রিত উত্তেজনায় ভেতরটা ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। একেকটা মূহুর্ত যেন বছরের সমান মনে হয়।


এদিকে সৌম্যর সাড়াশব্দ নেই। সে যেন ডালপালায় অন্ধকারে মিশে গিয়েছে। 


|||||||||||


বটগাছের একটা বড় ডাল দেওয়ালের একদম পাশ দিয়ে গিয়ে বাঁকা হয়ে উপরের দিকে চলে গেছে। সেই ডাল বেয়ে ঘুলঘুলিটার কাছে চলে গেল সৌম্য। চোখ রাখল ভিতরে। 

ঘরে চোর-লণ্ঠন জ্বলছে। মিটিমিটি আলোয় দেখা গেল, মেঝের উপর শতরঞ্জি পেতে মুখোমুখি বসে আছে তিনটে লোক। তাদের মধ্যে কোনও একটা বিষয় নিয়ে খুব নীচু স্বরে আলোচনা চলছে। এদের মধ্যে মুশকো মতো গাঁট্টাগোট্টা লোকটার পরনে লালসালু, পেশিবহুল শরীর। কথা বলছে তর্জনী উঁচিয়ে, আদেশের ভঙ্গিমায়। এ-ই বোধহয় দলের সর্দার। 


এদের কথাবার্তা শোনা গেলে হয়ত অনেক কিছুই আন্দাজ করা যেত। কিন্তু এরা এত অনুচ্চস্বরে কথা বলছে যে, এত উপরে বসে কিছুই শোনা সম্ভব নয়।

 

পকেট থেকে একটা ছোট্ট যন্ত্র বের করে সেটা কানে ফিট করে নিল সৌম্য। স্পাই হিয়ারিং ডিভাইস। কাজের সুবিধের জন্য এরকম অনেক ছোটখাটো দরকারি জিনিস সৌম্য নিজের সঙ্গেই রাখে। ভাগ্যিস চারমাস আগে অনলাইনে আড়ি পাতার মেশিনটা আনিয়েছিল। এরজন্য  নিজেকে মনেমনে ধন্যবাদ দেয় সৌম্য। 


যন্ত্রটার সাহায্যে লোকগুলোর কথাবার্তা এবার এবার স্পষ্ট শুনতে পায় সৌম্য। সর্দারগোছের লোকটা বলছে, 
--হাতে মাত্র তিনদিন সময়। বসের হুকুম, যা করার এই তিনদিনের মধ্যে-ই  করতে হবে।  না হলে এক কানাকড়িও পাওয়া যাবে না। 

-- মানে ! মামদোবাজি নাকি ! জান লড়িয়ে কাজ করছি ওস্তাদ। বিনিময়ে মালকড়ি তো ফেলতেই হবে। না হলে আরও দু'একটা লাশ ফেলতে আমার হাত একটুও কাঁপবে না বলে দিলাম।

 

--আহ্... বঙ্কা ! জানিস তোর এসব কথা বসের কানে গেলে কী পরিনতি হতে পারে !

 

পাশে বসে থাকা লোকটা বঙ্কাকে বোঝানোর  চেষ্টা করে। কিন্তু লাভ হয় না। বরং সাপের মতো হিসহিসিয়ে ওঠে বঙ্কা। বলে, 

--তোর মতো অত বসের পা ধুয়ে জল আমি খাই না শিবু। তুই কি মনে করিস, বসের চাকু চললে রক্ত আর বঙ্কার চাকু চললে জল ঝরবে? শোন, আমি মেহনত করি রোজগারের আশায়। এবার কেউ যদি মেহনত করিয়ে পারিশ্রমিক দিতে না চায়, তাকে আমি ছেড়ে দেব কেন? সে যদি বসও হয়, কুছপরোয়া নেই। 

এদের বার্তালাপ থেকে সৌম্য আন্দাজ করে নেয়,  বঙ্কা লোকটা গোয়ার। বস কেন, প্রয়োজনে সে কাউকেই ছেড়ে কথা বলার পাত্র নয়। তাকে শান্ত করতে ওস্তাদকেই এবার মাঠে নামতে হয়। বলে, 

-- সবকিছুতেই তোর খালি মাথা গরম বঙ্কা। আগে পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা কর। দেখছিস না লাইন কিরকম গরম। দু'দিন থেকে বাগানে পুলিশের আনাগোনা, বাড়তি আপদ হিসেবে এসে জুটেছে টিকটিকিটা। ওকে নিয়েই তো বসের যত মাথাব্যথা। সে কিছু বুঝে উঠার আগে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করার তাড়া দিয়েছেন বস। 

ওস্তাদের কথায় মনে হয় কাজ দিয়েছে। বঙ্কা কিছুটা সুর নরম করে বলে, 

--সে তো আমিও বুঝতে পারছি ওস্তাদ । কিন্তু বস হুকুম দিলে ওই টিকটিকি না ফিকফিকিটার লাশ ফেলতে কতক্ষণ।

--খবরদার !  ওসব চিন্তা এখন মাথায় আনবি না। ঝুট-ঝামেলা নয়,  আমাদের কাজ হচ্ছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কফিনটা উদ্ধার করে হারেঙ্গাজাও পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া । 


--হুম, বুঝেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে কবরটাই... 

বঙ্কার কথা শেষ হবার আগেই তুতুলের মোবাইল ফোন বেশ শব্দ করেই বেজে উঠল ! নিমিষে চোর-লণ্ঠনটা নিভিয়ে দেয় লোকগুলো। আর সেইসঙ্গে একদলা অন্ধকার নেমে আসে ঘরের ভেতর। চট করে পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে পজিশন নেয় সৌম্য।

 পর্ব ১১  

বড় রকমের ভুল হয়ে গেছে বুঝতে পেরে তড়িঘড়ি মুঠোফোনটাকে সায়লেন্ট মোডে নিয়ে নেয় তুতুল। চারদিক ফের নিস্তব্ধ হয়ে আসে। কেটে যায় কয়েক মিনিট। 

অন্ধকারে গাছের ডালে বসে-ই পরবর্তী কর্মপন্থা স্থির করে নেয় সৌম্য।  সন্তর্পণে নিচে নেমে আসে সে। মোবাইলের আলোর ইশারায় তুতুলকেও ডেকে আনে। 

গাছতলায় দাঁড়িয়ে সে ভাবে, মেয়েটা সঙ্গে না থাকলে ভিতরে ঢুকে অনায়াসে তিনটে লোককে কাবু করা যেত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেকে সংযত রাখতে হচ্ছে। হিয়ারিং ডিভাইসটা ফের কানে ফিট্ করে নেয় সৌম্য।

 

নাহ্ ! কোনও সাড়াশব্দ নেই ! লোকগুলো কী তবে ঘরের ভেতরে-ই  গায়েব হয়ে গেল ! 


ব্যাপারটা যাচাই করে দেখতে আগ্নেয়াস্ত্রটা হাতে রেখে সন্তর্পণে এগিয়ে যায় সে। দরজায় হালকা ধাক্কা দিতে সেটা হাট করে খুলে গেল। সৌম্য 'র নির্দেশে টর্চ জ্বালে তুতুল। ঘরের ভিতর ফাঁকা ! 

এরমানে মানুষের সাড়া পেয়ে পাখি আগেই ফুড়ুৎ হয়ে গেছে ! শতরঞ্জি ও চোরলণ্ঠনটা পর্যন্ত গায়েব। তবে ঘরের কোণে পড়ে থাকা একটুকরো  দুমড়ানো কাগজ সৌম্যর দৃষ্টি এড়ায় না। সেটাকে তুলে পকেটে পুরে নেয় সে। মাঝখানের দরজা ঠেলে ওঘরে গিয়ে দেখে পেছনের দরজাটা হাট করে খোলা !

 

সৌম্য বলে, 

--চল তুতুল। এ ঘরে যারা ছিল, সবাই পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়েছে। এখন এই শূন্যপুরীতে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানে হয় না। তারচাইতে একটু ঘুমোই গিয়ে, চল। 


|||||||||

 

গোটা ঘটনায় যেন মরমে মরে যাচ্ছে তুতুল। বলে, 

---ইশশ...আমার একটু বোকামির জন্য সব প্ল্যান ভেস্তে গেল, তাই-না সৌম্য'দা? তোমাকে না জানিয়ে এভাবে আসাটা উচিত হয়নি আমার। 

কথা বলতে বলতে গলার স্বর ভারী হয়ে এল তুতুলের। তার মনের অবস্থা আঁচ করে সৌম্য বলে,

-- বোকার মতো কথা বলিস না রে। তুই তো আর জেনে-বুঝে কিছু করিসনি।  তাই অযথা কষ্ট পাওয়ারও কোনও মানে হয় না। 


সৌম্যর কথায় তুতুল কতটা আশ্বস্ত হলো, বোঝা গেল না। তবে এব্যাপারে আর কথা-ও বাড়াল না সে। অন্ধকারে জঙ্গুলে পথ ধরে বাংলোয় ফিরে গেল দু'জন। 

তুতুলকে তার ঘরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে সৌম্য যখন নিজের বিছানায় গিয়ে উঠল, বাগানের পেটা ঘড়িটা জানিয়ে দিল, রাত দু'টো। মামন তখনও মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে। 

সকালে প্রচুর কাজ। তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। একবার বান্দরখাল, হারেঙ্গাঝাওয়ের দিকেও যেতে হতে পারে। বালিশে মাথা রেখে ক্লান্ত শরীরটা নরম বিছানায় এলিয়ে দেয় সৌম্য। গভীর ঘুমে দুচোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। 


||||||||


সকালে ঘুম ভাঙল মামনের ডাকে। সৌম্য চোখ মেলে দেখে, সূর্য এখনও ওঠেনি। কিন্তু এরইমধ্যে দাঁত-টাত ব্রাশ করে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে মামন। তুতুল-ও তৈরি। 

--তোরা কি মর্নিং ওয়াকে বেরোচ্ছিস, জিগ্যেস করে সৌম্য।

 

মামন বলে, 

-- হ্যাঁ, ভাবছি রেলস্টেশনের দিকটা একবার চক্কর মেরে আসব। 

--দাঁড়া,  আমিও আসছি 
এই বলে বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে ঢুকল সৌম্য। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে মামদের সঙ্গে হাঁটা দিল চন্দ্রনাথপুর রেল স্টপেজের দিকে। 

ভোরের বাতাসে হালকা একটা শীতের আমেজ। হাঁটতে হাঁটতে সৌম্যরা রেললাইনের পাশে দালান বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। উঁচু গেট। রাস্তা থেকে ভিতরটা দেখা যায় না বললেই চলে। দেখে মনে হয়, বাড়িটা বানানোর খুব বেশিদিন হয়নি। গেটে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ল সৌম্য। 


গেট খুলে দারোয়ান গোছের একটা লোক হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, 

--কিস কো ঢুঁন্ড রহে হ্যায় বাবু? 

সৌম্য বলল, ইস ঘরকা মালিক বালাসাহেব দেশাই হ্যায় কিয়া? 

-- জি নহি বাবু। সাহাব তো পিছলে তিন মহিনো সে হারাঙ্গাঝাও মে রহ রহে হ্যায়। সুনা হ্যায়, আভি উধরমে উনকা কাম জোরো সে চল রহা হ্যায়। মহাসড়ক কা কাম ভি লে লিয়া হ্যায়। 

--য়হা তুমহারে ইলাওয়া ঔর কৌন কৌন রহ রহা হ্যায়? 

--ফিলহাল য়হা কই নহি রহ রহা হ্যায়। লেকিন বিচ বিচ মে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি কা লোগ আতে হ্যায়। দো-চার দিন রহনে কে বাদ ফির চলে যাতে। 

-- আচ্ছা ! আখরিবার কব আয়ে থে ইয়ে লোগ? 

--জি ১০-১৫ দিন পহলে। 

--- ওহ্, দেখো ইতনা বাতচিত হো গয়া, আওর আভি তক তুমহারা নাম হি নহি পুঁছা। কিয়া নাম হ্যায় তুমহারা? বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে প্রশ্ন করে সৌম্য। 

--লছমন পাশোয়ান হুজুর। 

---ঠিক হ্যায় লছমন তুম যাকে আপনা কাম করো। বহুত জলদি হি হাম ফির আয়েঙ্গে। 

কথা বলতে বলতে মামনদের দিকে ফিরে সৌম্য বলে, চল রে মামন-তুতুল। হাতে অনেক কাজ।

 

 

বাড়িটাকে পেছনে রেখে  সামান্য দূরে আসার পর সৌম্য বলে, 

--মামন, তুই এক্ষুনি একবার প্রতুল দারোগা থুড়ি ডিএসপিকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে দেখ তো। পাস কি-না। তাড়াহুড়োয় ফোনটা  আনতে ভুলে গিয়েছি। 

দু'বার রিং করার পর ফোন ধরলেন প্রতুলবাবু। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে মামনবাবু? 


মামন বলল, 

--গুডমর্নিং প্রতুলবাবু। নিন কথা বলুন সৌম্যদার সঙ্গে। 

ডিএসপির সঙ্গে সংক্ষেপে কথা সেরে নেয় সৌম্য। বলে, 

--শুনুন প্রতুলবাবু। তদন্তের খাতিরে আমাদের আজই একবার হারেঙ্গাঝাও যেতে হচ্ছে। যদি সম্ভব হয়, কথাটা সেখানকার লোক্যাল থানাকে একটু জানিয়ে রাখবেন। ওদের সাহায্য লাগতে পারে। 

---সে জানিয়ে দেব। আর যদি বলেন, আমিও সঙ্গে আসতে পারি। 

--- না, এখনই তার প্রয়োজন নেই। তবে দরকার পড়লে ফোনে ডেকে নেব আপনাকে। 

--ওকে ডাঙরিয়া, আপনি যেরকম বলবেন, ফোনের ওপাশ থেকে বললেন প্রতুলবাবু। খুট করে ফোন কেটে দিল সৌম্য। বলল, পা চালিয়ে চল রে মামন-তুতুল। একঘন্টার মধ্যে রেডি হয়ে আমাদের হারেঙ্গাঝাওয়ের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে হবে। 

 ক্রমশঃ