সাহিত্য পত্র

গল্প - প্রেম


আদিমা মজুমদার 
২১ মার্চ ২০২২

 

এই সংখ্যার প্রথম ছোটগল্প

Adima Mazumder_edited.jpg

চারদিকে মৃত্যু মিছিল। নাভিশ্বাসের পালাবদলে বেঁচে থাকার অপরিসীম প্রয়াস চলছে অবিরত। ২০২০ সালের পৃথিবী ব্যাপী মারণযজ্ঞ  মানুষকে লৌহ মানবে পরিনত করেছে। ২০২১ আবার লকডাউন। 

লকডাউন উচ্ছেদ বৃষ্টির অহেতুক উচ্ছাস দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ছুটতে হচ্ছে চক্রব্যুহ ভেদে।

শর্মিলী ভাবে প্রেমের গল্পটা এখনো শেষ হলো না, এটা শেষ হলেই এবার একটা উপন্যাসে হাত দেবে। লকডাউনের জড়তা কাটিয়ে সৃষ্টিশীল হওয়াই যে সাহিত্যের ধর্ম। রাতে চেয়ার নিয়ে ব্যালকনিতে বসে থাকে। আকাশে মেঘের খেলা দেখে। বর্ষা ঋতুকে এত ভালবাসে, নিজের মেয়ের নাম রাখে বর্ষা। মেয়েটি এবার ক্লাস নাইন। অনলাইন ক্লাস এর জন্য এন্ড্রয়েড মোবাইল কিনে দেয়।

   

নতুন মোবাইল পেয়ে বর্ষা যেমন আনন্দিত হবার কথা তা হয়নি কিন্তু। সব সময় মনমরা হয়ে বসে থাকে। শর্মিলী ভেবে পায় না তার কারণ কি।

___ কিরে মা আজ কিছু লিখা দেয়নি 

___দিয়েছে গো, ভাল্লাগেনা করতে

____ কেন এমন করিস মা। মেট্রিক পরীক্ষা এবার না হয় হলো না, সামনের বছর হয়তো হবে। তাছাড়া পড়াশুনা সব ঘরেই তো করতে হয়।

___ একটা কথা বলি মা। বকো না কিন্তু। 

শর্মিলার মন কেঁপে উঠে মেয়ের এই ডেঞ্জার বয়সটার জন্য, খারাপ চিন্তাই মায়ের মনে আগে আসে। তার কাছে এসে কাঁধে হাত দিয়ে বলে, বল মা সব কথা খুলে বল।

___ বলছিলাম আমার ফ্রেন্ড পাখিজার এন্ড্রয়েড মোবাইল নেই, খুব খারাপ লাগে। সকালে ভাইয়ের সাইকেলে এসেছিল, তুমি তখন ছাদে ফুলগাছে জল দিচ্ছিলে। কিছু নোট করে নেয়। তার বাবা বলছে আর পড়াশোনার দরকার নেই। মোবাইল কিনে দিতে পারবে না।

___ এরকম অনেক ছেলেমেয়ের পড়াশোনা হচ্ছে না। কি করি বল। কি যে একটা সময় আমাদের দেখতে হচ্ছে। আরাফাতের বাড়ির সবকটা মানুষের যে দিন কোভিদ পজেটিভ ধরা পড়ল, ৪৫ বছর বয়সি তার বড় বাবা মারা গেল। সেদিন হাতে যে ৭ হাজার টাকা ছিল সব দিয়ে দিয়েছি। মেডিকেলে রাখেনি, ঘরে অক্সিজেন থেকে শুরু করে দামী দামী এন্টিবায়োটিক কিনতে হল, আমার মত আরও অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। টাকা থাকলে একটা মোবাইল কিনে দিতাম পাখিজাকে। হাত একদম খালি। ঘরের লোনটা তো মারতে হবে। চিন্তা করিস না, আমার সংস্থার সাথে আলাপ করে দেখি, তারাও তো এই অতিমারিতে যে যা পারছে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

স্কুল বন্ধ, কী হবে এই চিন্তায় বর্ষা দিন দিন খাওয়া পরা ছেড়ে দিচ্ছে। মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তার কাউন্সিলিং করে তাকে অনলাইন নাচের ক্লাশে ভর্তি হতে আদেশ দেন।

               

' ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন ' পাশের মসজিদ থেকে ভোরের হাওয়ায় এই শব্দ ক'টি বর্ষার কানে লাগে। কি জানি এক অজানা আশঙ্কায় বর্ষা বিছানায় উঠে বসে।... খলিলুর রহমানের বড় মেয়ে পাখিজা বেগম গত রাত দুটোয় ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন, তার জানাজার নামাজের সময় পরে জানানো হবে। পাখিজাকে পোস্টমর্টেম এর জন্য মেডিকেলে নিয়ে গেছে। বর্ষা কি ঠিক শুনলো, না স্বপ্নে দেখলো বুঝতে পারে না।

দরজা খুলে ব্যলকনিতে বসে আকাশের দিকে তাকায়, কালো অন্ধকার করে পৃথিবী কাঁপিয়ে একটা ঝড় আসছে, দৌড়ে সে মায়ের বিছানায় যায়। আবার শুনতে পায়,ইন্নালিল্লাহি ও ইন্নাইলাইহি রাজিউন...