সাহিত্য পত্র

গল্প - রক্তহোলী


স্মৃতি দাস
২১ মার্চ ২০২২

 

এই সংখ্যার তৃতীয় ছোটগল্প

Smriti Das.jpg

পঞ্চাশে পা দিলেও দীপালি ছোটবেলার সেই দোল খেলাকে কখনো ভুলতে পারেনা। প্রতি বছরই বসন্ত উৎসবে নানান জায়গায় ফুল দিয়ে দোল খেলা, কিংবা সামান্য আবিরের ছোঁয়া কপালে লাগিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এগুলো করে  থাকে। কিন্তু "রং খেলা" নামে যে বর্বর অনুষ্ঠানে মানুষ ভূতের মতো হৈ হুল্লোর করে পাড়া মাতায়, সেদিন দীপালি ফটক, দরজা লাগিয়ে চুপটি করে ঘরে বসে থাকে।

       

তখন দীপালির বয়স দশ কি এগারো। পাড়ার সুমি, চৈতালী, বিদিশা ওরা আবীরের ঠোঙা নিয়ে রং খেলার দিন বেলা দশটায় এসে হাজির। বড়দের পায়ে আবীর দিয়ে প্রণাম করে দীপালি বলল.... "চল,বেড়িয়ে পড়ি, কিছুক্ষন রং খেলে নগর কীর্তনের সংগে সংগে গেলে মিষ্টি, লাড্ডু এসব খেতে পাব"। মাকে বলে দীপালি বন্ধুদের সংগে বেড়িয়ে পড়ল। মা চেঁচিয়ে বললেন... "বেশি দূর যেওনা, আশে পাশেই থেকো"। মেয়ে হলেও দীপালিকে বাড়ীতে কেউ তেমন শাসন করতনা। খেলাধুলা, পাড়া বেড়ানো সবই করত। মদন কাকুর স্ত্রী রুমা কাকিমা নিঃসন্তান থাকায় ওদের খুব আদর করতেন। আগেই বলে রেখেছিলেন " দোলের দিন আসিস তোরা, খিচুড়ি ভোগ রান্না করে ঠাকুরকে দেবো"। দীপালিরা রুমা কাকিমার বাড়ীতে গিয়ে যা দেখল তাতে সকলের হাত পা হিম! পাড়ার মস্তান হীরালাল পাণ্ডা রুমা কাকিমাকে মাটিতে ফেলে চোখে মুখে গাদা গাদা রং মাখিয়ে দিচ্ছে। রুমা কাকিমা "ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও" বলে গোঁঙাচ্ছে। হীরালাল মদ খেয়ে টাল সামলাতে পারছে না। একটানে রুমা কাকিমার শাড়ী খুলে দিয়েছে। কাকিমা সমানে হাত পা ছুঁড়ছে, কিন্তু হীরালালকে সরাতে পারছেনা। ঝাপটা ঝাপটিতে খিচুড়ির হাঁড়ি উলটে পড়ে গরম খিচুড়ি রুমা কাকিমার শরীরের দিকে বেয়ে আসতেই দীপালি পায়ের সামনে থাকা একটা আধলা ইঁট হীরালালের মাথা লক্ষ করে ছুঁড়ে মারবে, দেখল একটা চকচকে ছুরি রুমা কাকিমার পেট এফোঁড় ওফোঁড় করে রক্ত মাখিয়ে বেড়িয়ে এসেছে। দীপালি আর দেরী করল না। আধলা খানা ছুঁড়েই মারল। হীরালাল প্রস্তুত ছিলনা, ইঁটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। ততক্ষনে সবাই চিৎকার শুরু করে দিয়েছে। আশে পাশের মানুষ দৌঁড়ে এসে হীরালালকে বেঁধে ফেলল। কেউ একজন থানায় ফোন করল। পুলিশ আসলো, রুমা কাকিমাকে এম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। কাকিমাকে বাঁচানো যায়নি। খিচুড়ির গরম ভাপে পিঠের দিকে পুরো চামড়া খসে গিয়েছিল, তার উপর প্রচুর রক্ত ক্ষরণ। বিচারে হীরালালের যাবৎ জীবন হয় আর প্রশাসনের তরফে দীপালিকে পুরস্কৃত করা হয়। কিন্তু সেদিনের ঘটনায় দীপালির মনে যে ভয় ঢুকেছিল, আজও সেটা যায়নি। সে দিনটা দরজা বন্ধ করেই কাটিয়ে দেয় আর সে-ই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি রোমন্থন করে।