সাহিত্য পত্র

গল্প - লা নুই সৌমেন - সৌমেন তোমাকে ভুলিনি


দীপক সেনগুপ্ত
২১ মার্চ ২০২২

 

এই সংখ্যার চতুর্থ ছোটগল্প

Dipak Sengupta.jpeg

বাস্তবের রূঢ় আলোতে অনেক কিছু ঝলসে যায়, চেতনায় সঞ্চিত সব স্মৃতি জ্বলে পুড়ে ছাই হয় তারপর সময়ের স্রোতে সব ছাই ভেসে যায়। সব স্মৃতিই কি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়? না, অনেক স্মৃতি লুকানো থাকে অবচেতনের পরতে পরতে রাতের অন্ধকারের তারাদের মত অবচেতনের গাঢ় অন্ধকারে সেই সব স্মৃতি প্রতিভাসিত হয়। স্মৃতি গুলোর কোনটা বা শুকতারা কোনটা ধ্রুবতারার মত নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়। নমিতার রাতের আকাশে সৌমেন শুকতারা। মধ্যপঞ্চাশের অস্তমিত যৌবনের অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব নিকাশ তুচ্ছ মনে হয় স্মৃতিপটে উদ্ভাসিত স্মিত হাস্য সৌমেনের মুখের কাছে। সৌমেন সরকার তুখোড় ছাত্র নেতা দাড়িগোঁফের ভিতর থেকে উঁকি দিত স্মিত হাস্যময় রক্তিম অধর, যে অধরের উষ্ণতায় শিহরণ জাগত নমিতার প্রাক যৌবনের দেহ মনে। সূর্যাস্তের রক্তিম আভার আলোয় আজ ও রক্তিম নমিতার মনের দিগন্ত। সৌমেনের উদাস চোখের দীপ্তিতে কুটিল সংসারের সব হিসেব নিকাশ তুচ্ছ মনে হত। কিন্তু এই উদাসী চোখ বক্তৃতার মঞ্চে কোন মন্ত্রবলে আগুনের গোলা হয়ে নমিতার মত শত শত ছাত্র যুবকের বুকে বিদ্যুৎচমক দিত আজো ভাবলে অবাক লাগে। গৌহাটি মেডিকেল কলেজের ছাত্র অঞ্জন চক্রবর্তীকে যেদিন হত্যা করা হল তার পরের সকালে শিলচরের সব স্কুল কলেজের ছাত্র রাস্তায় নেমে এসেছিল গন্তব্য মেডিকেল কলেজ, উদ্দেশ্য খুন কা বদলা খুন। সমস্ত অসমীয়া ছাত্রকে খুন করা হবে, মুষ্টিবদ্ধ হাত আর শক্ত চোয়াল এই কথাই বলছিল। জমায়েত ছাত্রদের উষ্ণ রক্তস্রোত যখন গলিত লাভার মত চেতনাকে উত্তপ্ত করছে  তখন সৌমেন গম্ভীর গলায় বুঝাচ্ছে অঞ্জনের মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার প্রশ্নই উঠেনা কিন্তু শিলচরে একজন  শর্মা, বরকটকি, কিংবা গোস্বামীকে মেরে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার লক্ষাধিক মানুষের জীবন বিপন্ন করার কোন মানেই হয় না। কী অসাধারণ যুক্তি, যে যুক্তি হাজার তরুণের উষ্ণ আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে, ঔদ্ধত্যকে বশ করতে পারে। এত ক্ষুরধার যুক্তির কাছে যখন প্রত্যেকের আবেগ বিজিত তখন নমিতার চিত্ত বিজয়িনীর উল্লাসে উল্লসিত। সৌমেন উদাত্ত অথচ সুমিস্ট গলায় যখন বলত - হে মোর রাণি তোমার কাছেই হার মানি আজ শেষে, আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার চোখের জলে...............


তখন নমিতার গালে মোটা অশ্রু বিন্দু শরতের শিশরের মত টলটল করে। বিজ্ঞানের ছাত্র সৌমেন চোখ বন্ধ করে ইকোনমিক্সের ছাত্রী নমিতাকে বুঝিয়ে দেয় মার্ক্সের উদ্বৃত্ত মূল্যের সূত্র কেইন্সিও মতবাদ, এডাম স্মিথের সূত্র। শুধু কি অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অস্টিন থিওরি থেকে শুরু করে নির্জোট আন্দোলনের বর্তমান অবস্থা। জ্ঞানের এত বিস্তৃতি ব্যক্তিত্বের এত দীপ্তি, হৃদয়ের প্রসরাতা সব মিলিয়ে এক স্বপ্নপুরুষ যার পৌরুষের তেজে নিজেকে খুব পবিত্র ভাগ্যবতী মনে করত নিজেকে। নমিতাকে অনেকেই হিংসা করত। নমিতা এই হিংসাকে উপভোগ করত। ৮৬ র ভাষা আন্দোলনে সৌমেন ব্যস্ত, দেখা পাওয়াই মুস্কিল। ২১জুলাই যখন গুলি চলে সৌমেন করিমগঞ্জে। চোখের সামনেই দেখল জগন্ময় যীশুকে ঢলে পড়তে। এই দৃশ্য দেখার পর নিজেকে সামলাতে পারেনি প্রবল আক্রোশে এক পুলিশকে মেরে আধমরা করেছিল, কিন্তু নিজেকে বাঁচাতে পারেনি সৌমেন সি আর পি এফের লাঠির আঘাতে মেরুদণ্ড ভেঙ্গে যায়। টানা ছয়মাস হসপিটালের বিছানায় থেকে আজ সে হাড্ডি চর্মসার। ট্রমায় আচ্ছন্ন, মাঝেমধ্যে আমায় মের না আমায় মের না বলে চীৎকার করে উঠে। পাঠানো হল সাইক্রিয়াটিক বিভাগে। নমিতা খুব কেঁদেছে, রাতের পর রাত ঘুমায়নি। এক বছর হতে চলল এখনো কোন উন্নতি নেই, চোখের জলে ভাসতে ভাসতে নমিতা গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে গেল। এম এ পাশ করতেই এক কলেজে চাকরি পেয়ে গেল। নমিতার মনের নীলাকাশে সৌমেন এখন শরতের হাল্কা মেঘ। সময়ের প্রবল স্রোতে জীবন এগিয়ে যায়, দেখা হয়, কথা হয়, মন বিনিময় হয় তপেনের সাথে। তপেনের সাথে সংসার জীবনে নমিতা কতটা সুখী সেই হিসাব করা যায়নি কেননা প্রতিটি হিসাবে অবয়বহীন সৌমেন এসে ভেস্তে দিত। 


সৌমেন এখন এক বেসরকারি মোটর ট্রেন্সপোর্ট অফিসের গুদাম বাবু। কয়টা ট্রাক ঢুকল কতটা বেরিয়ে গেল সেই হিসাবেই সারাদিন ব্যস্ত। পৈতৃক বাড়ীর অগোছালো ঘরের একাকীত্ব ওর নিত্যসঙ্গী।


।।।।।। ২।।।।।।


প্রচন্ড গরম, বাইরে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে আছে সৌমেন, মলিন কোঁচকানো এক শার্ট গায়ে। একজন মহিলা কাস্টমার এগিয়ে আসছে ভেবে প্রস্তুত হল, কিন্তু ট্রান্সপোর্ট অফিসে সাধারণত মহিলারা আসেনা, অন্তত গত ২৫ বছরের চাকরীর জীবনে সৌমেন একজন মহিলাকে ও পায়নি। স্বাভাবিকভাবেই অপ্রস্তুত সৌমেন নড়েচড়ে বসে। যত কাছে আসছিল নমিতা চোখ জলে ঝাপসা হয়ে আসছিল।
---- কেমন আছ সৌমেন দা?


হতবাক, নিরুত্তর সৌমেন। বসতে দিল চেয়ার টেনে। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস আজ যেন অলক্ষ্যে অট্টহাসি হাসছে। নমিতা একটা এনভেলাপে মোড়া চিঠি দিয়ে বলল আগামী রোববার গান্ধীভবনে একটা সভা আছে, তোমাকে নিতে আসব। সকাল ১১ টায়, না বলবে না। এখনো সৌমেন নিরুত্তর, শুধু বলল আজকাল আমি আর সভা সমিতিতে যাই না। এই গুদাম আর বাসার মধ্যে বেডমিন্টনের শাটল ককের মত আসা যাওয়া এর বাইরের জগত আমি দেখিনা।


নমিতা নাছোড়বান্দা, এত দূর থেকে এত আশা নিয়ে এসেছি ফিরিয়ে দিও না, আর কষ্ট দিও না। বলেই চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। সৌমেন উদাস হয়ে নমিতার চলে যাওয়া দেখছিল। একটা সময় নমিতা দৃষ্টিসীমার বাইরে গেলে সৌমেন এনভেলাপটা নাড়াচাড়া করে আলস্যভরে খুলল, কোন কৌতুহল নেই, ব্যস্ততা নেই। চমকে উঠল, চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল চিঠিতে লেখা আগামী ২৫ মার্চ  রবিবার গান্ধীভবনে অধ্যাপিকা নমিতা গোস্বামীর লেখা বই "৮৬ র ভাষা আন্দোলন ও ছাত্র যুবনেতা সৌমেন সরকার"। উন্মোচক কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রধান। প্রকাশক আনন্দ প্রকাশনী কলকাতা।


হাতটাকে শক্ত করে উঠে দাঁড়াল। ফিরবার পথে সৌমেন রাঙিরখাড়ি পয়েন্টে দেখল এন আর সি নিয়ে সভা চলছে দেখে থমকে দাঁড়ালো, অন্যদিন হলে কিন্তু না দাঁড়িয়ে চলে যেত কিন্তু আজ আর বাসায় যাওয়ার তাড়া নেই। বসন্তের হাওয়ার ঝটকায় মনটা দোলে উঠলো।