সাহিত্য পত্র

আঞ্চলিক ইতিহাস - ইতিহাস না এক সফল সাহিত্য
গ্রন্থ আলোচনা (পর্ব ১ এবং ২ একসাথে)
গ্রন্থ : চরগোলা এক্সোডাস ১৯২১
লেখক : বিবেকানন্দ মোহন্ত
গ্রন্থ আলোচক : ডঃ শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য
২৫ জুলাই ২০২১

বরাক উপত্যকার নিজস্ব ইতিহাস চর্চার পরিধি খুব বিস্তৃত নয়। কিছু ভালো কাজ অবশ্যই হয়েছে তবে সংখ্যার দিক দিয়ে তা কমই। করিমগঞ্জ নিবাসী বিবেকানন্দ মোহান্তের এই উপত্যকার অন্যতম শিল্প চা বাগানের উপর রচিত "চরগোলা এক্সোডাস্" বইটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহিৃত হবার যোগ্য। সেই যুগে  শ্রমিকদের উপর সংগঠিত হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা, বরাকের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে চা শ্রমিকদের এই বিদ্রোহ ব্যাপারটি গল্পগাথার মতোই কৌতুহলদ্দীপক। এবং সেজন্যই হয়তো এই আখ্যান ইতিহাসের সীমানা ছাড়িয়ে পাঠকের অগোচরেই এক অনন্য সাহিত্য হওয়ার মহিমাও অর্জন করে নেয়। কয়েক বছর আগে এই বইটির একটি পর্যালোচনা করেছিলেন ড.শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য যা 'দৈনিক সাময়িক প্রসঙ্গ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই লেখাটিও শুধু একটি গ্রন্থ সমালোচনা হিসেবে নয় তথ্য ও লেখনীর প্রসাদগুনে অনন্য হয়ে পাঠকের মনোজগতে নাড়া দিতে সক্ষম।
ড.শ্যামানন্দ ভট্টাচার্যের শৈশব কেটেছে বরাকেরই এক চা বাগানে। কর্মজীবন শিলংয়ে কেটেছে। নর্থ ইস্টার্ণ কাউন্সিলের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগর এক বিজ্ঞান কর্মী হয়ে অবসরগ্রহন করলেও  বহু ঐতিহ্যমণ্ডিত শিলং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের একদা সম্পাদক তথা এখনও এক  সাংস্কৃতিক কর্মী। সমাজ-রাজনীতি এবং মাতৃ ভাষায় সমাজে বিজ্ঞান চেতনা বিস্তার সংক্রান্ত বিষয়ে অনেকদিন ধরে লেখালেখির সাথে ও যুক্ত রয়েছেন।প্রাসঙ্গিকতা বিচারে পুনর্মুদ্রিত এই লেখাটির দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হল এই সংখ্যায় 
...

Vivekananda Mohanta_edited.jpg
বিবেকানন্দ মোহন্ত
Shyamananda Bhattacharjee_edited.jpg
ডঃ শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য
Chargola Exodus_edited.jpg

 পর্ব ১ 

 

১৯৫৭ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাতে পলাশির প্রান্তরে সিরাজের পরাজয় যে একশো বছরের মধ্যেই সমস্ত ভারতবর্ষকে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে ওই পশ্চিমী দেশের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে, সেটা নিশ্চয়ই স্বয়ং লর্ড ক্লাইভেরও ধারণার মধ্যে ছিল না৷ একই সঙ্গে এটাও বলা যেতে পারে যে, মোগলদের ভারত-বিজয় নিশ্চয়ই এই দেশের ইতিহাসে এক বিশেষ ঘটনা৷ কিন্তু, মোগলরা এই দেশে ৬০০ বছর রাজত্ব করে অনেক অবদান রেখে শেষে এই দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিলেমিশে এই দেশেই থেকে গেল, তবু আমরা দেখলাম বৃটিশ শাসন এই দেশে মাত্র দু’শো বছর থাকল এবং ওই দেশাগত সবাই এই দেশে ছেড়ে চলেও গেল অথচ ওদের প্রভাব আমাদের এত গভীরে প্রোথিত হল যে আধুনিক ভারতবর্ষের সবটাই যেন পশ্চিমী রেনেশাঁসের আদলে গঠিত হতে থাকল এবং আধুনিকতার আদলে শর্ত যেন পশ্চিমী সভ্যতার প্রেরণার সঙ্গে সমর্থক হয়ে গেল৷ রবীন্দ্রনাথ অকপটে লিখে দিলেন—“পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার/সেথা হতে সবে আনে উপহার/দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে/এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে৷”

আমাদের আজ আর বলতে দ্বিধা নেই পশ্চিমী সভ্যতার সমস্ত শক্তির কেন্দ্রেই ছিল ওদের দেশে সংঘটিত আমূল পরিবর্তনের সূচক৷ আমাদের অতি পরিচিত “শিল্প বিপ্লব”৷ উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তনে অর্থাৎ শিল্প বিপ্লবের পর শিল্পের প্রয়োজনে যে আগ্রাসী কাঁচামাল এবং সস্তা শ্রমের চাহিদার জন্ম হল, তা মেটাতে ইউরোপের উৎপাদকদের সমস্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে উৎসাহ দিল বা বলতে গেলে বাধা করল, তা আমাদের এক জানা ইতিহাস৷

কী কারণে ইউরোপের মাত্র কয়েকটি দেশের উপনিবেশ বাকি দুইটি মহাদেশ অর্থাৎ এশিয়া এবং আফ্রিকায় গঠিত হল এমনকী আমেরিকা-আবিষ্কারও যে এই উপনিবেশ ছড়িয়ে দেওয়াতে আরো প্রেরণা হয়ে দাঁড়াল, তা তো এখন মানব সভ্যতার বিবর্তনের লিখিত ইতিহাস৷ শিল্প তার অবদমিত বিস্তারে খুব কম সময়ের মধ্যেই শুধু যে সম্পূর্ণ নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থারই জন্ম দিল তা-ই শুধু নয়, সেই সঙ্গে সে সমকালীন কৃষিজ উৎপাদন ব্যবস্থায়ও আনল বৈপ্লবিক পরিবর্তন৷ বৃটিশ উপনিবেশ আমাদের দেশে তার প্রতিষ্ঠাকালেই— ১৮২৬ সালে আসামের উত্তরপূর্ব কোণে অর্থাৎ মিয়ানমার সন্নিকটস্থ বর্তমান অরুণাচল প্রদেশের চাংলাং জেলার বনজ চা-গাছের (আদিবাসীদের কাছ থেকে) খবর পেয়ে দশ-বারো বছরের মধ্যেই সে অঞ্চলের সবুজ চা-পাতাকে খয়েরি চা-পাতার গুঁড়োয় পরিণত করে ১৮৩৯ সাল নাগাদ কয়েক বাক্সো চা লন্ডনের বাজারে পাঠিয়ে দিল৷ সে সময়কার আসামে তার বছর কয়েকের মধ্যে বনজ চা কৃষিজ চা-পাতায় রূপান্তরিত হয়ে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জন্ম দিল ভারতের শিল্পায়নের একদম প্রথম স্তরের কৃষিজ শিল্পের৷ সে খবর বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না এবং অল্প কয়েক বছরের মধ্যে এই শিল্পই জন্ম দিল ভূবনখ্যাত আসাম-চায়ের৷

তারপর অনেকদিন পেরলো৷ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসও সত্তর বছর অতিক্রম করল৷ এখনো উত্তরপূর্ব ভারতের শিল্পের জগতে এক নম্বরে আছে এই চা শিল্পই৷ ১৮২৬ সালে রবার্ট ব্রুস মারফত অরুণাচলের আদিবাসীদের কাছ থেকে এই অঞ্চলে প্রাপ্ত বনজ চায়ের খবরকেই যদি আমরা তৎকালীন আসামের জঙ্গলে চা-পাতার আবিষ্কারের কাল বলে ধরে নিই (আসলে তার আগেই বৃটিশদের কাছে এর খবর ছিল), তবুও সেটা একশো নব্বই বছর অতিক্রম করতে চলল৷ কিন্তু উত্তরপূর্বের চা-শিল্পের এই দীর্ঘ পরিক্রমার কতটুকু খবরই বা আমরা জানি? কী নিদারুণ শ্রমের বিনিময়ে তৎকালীন এই গভীর জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্য অঞ্চলে রাস্তাঘাটের প্রায় সম্পূর্ণ অবিহনে, বলতে গেলে—জলপথকেই একমাত্র আশ্রয় করে এই চূড়ান্ত শ্রমনির্ভর শিল্প তৎকালীন আসামে তার যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, তার আংশিক ইতিহাস ইংরেজি ভাষায় এবং অনেক পরে অসমিয়া বা বাংলা ভাষায় লিপিবদ্ধ হলেও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই অঞ্চলে শ্রমিকদের নিয়ে আসার নির্দয় অমানবিক প্রক্রিয়ার ইতিবৃত্ত বা প্রতিবাদ সম্বন্ধীয় কিছু কিছু প্রবন্ধ-সদৃশ রচনা থাকলেও শুধু এই বিষয়ের উপর ভারতীয় ভাষায় অর্থাৎ বাংলা, অসমিয়া, দক্ষিণী ভাষা এমনকী হিন্দিসহ অন্যান্য ভাষাগুলির মধ্যে প্রথম প্রামাণিক বইয়ের দাবিদার অবশ্যই ২০১৪ সালে শিলচর থেকে প্রকাশিত বিবেকানন্দ মোহন্ত রচিত বাংলা বই “চরগোলা এক্সোডাস ১৯২১”৷ এই গ্রন্থ পরিক্রমার বিনীত নির্যাসই এই রচনা৷

এই আসাধারণ মানবিক দলিলটি পড়ে বইটি সম্বন্ধ আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমেই ফিরে আসতে হল এই বইয়েরই ভূমিকায়৷ লিখেছেন শ্রীহট্ট করিমগঞ্জ নিবাসী উত্তর পূর্ব ভারতের ইতিহাসের অন্যতম গবেষক এবং মৌলিক চিন্তাবিদ অধ্যাপক সুজিৎ চৌধুরী৷ ২০০৮ সালে লিখিত আড়াই পৃষ্ঠার এই ভূমিকায় অধ্যাপক চৌধুরী শুধু বইটির মূলেরই আভাস দেননি, সেই সঙ্গে অত্যন্ত স্বল্প পরিসরে বইটির অনন্যতাকে আশ্চর্য সুন্দর ভাষায় যথাযথভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরেন৷ তারই অংশ বিশেষ এখানে যথার্থ বিবেচনায় পরিবেশিত হল৷

“আজকের করিমগঞ্জ জেলা ১৯২১ সালে ছিল সে সময়কার শ্রীহট্ট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার একটি অংশ বিশেষ৷ চরগোলা ভ্যালি বলতে কী বোঝায়, সে-সম্পর্কে আজকের পাঠকদের ধারণা হয়তো খুব স্পষ্ট নয়, রাতাবাড়ি থানার ওই অংশটির ভৌগোলিক অবস্থান বিবেকানন্দ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন৷ মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনে দেশের আবহ যখন উত্তাল, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিঘাত সর্বত্রই পড়েছিল৷ চারগোলা ভ্যালির চা-শ্রমিকরা কতখানি প্রভাবিত হয়েছিলেন তার সম্ভাব্য বিশ্লেষণ বিবেকানন্দ করেছেন৷ মোটের উপর ইংরেজ চা-বাগান মালিকদের নিপীড়ন সইতে না পেরে কয়েক সহস্র চা-শ্রমিক বাগান ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন৷ মালিকপক্ষের সহিংস বাধাপ্রদান, রাষ্ট্রশক্তির প্রতিকূলতা, শেষ পর্যন্ত সহস্র সৈন্যবাহিনীর জিঘাংসা, সমস্ত কিছুর মোকাবিলাই তাঁদের করতে হয়েছিল৷ আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন করিমগঞ্জের বিশিষ্ট জননেতারা৷ শেষ পর্যায়ে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এবং দীনবন্ধু এন্ড্রুজের মতো জাতীয় পর্যায়ের ব্যক্তিত্বরাও বিভিন্ন পর্যায়ে চরগোলা-শ্রমিকদের এই আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিলেন৷ চাঁদপুরের জাহাজঘাটে এদের ওপর গুর্খা সৈন্যরা ওপরওয়ালাদের আদেশ পালন করতে গিয়ে জঘন্য নিপীড়ন চালিয়েছিল, তার প্রতিবাদে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট করেছিলেন স্টিমার ও রেল কর্মচারীরা, অর্থাৎ চরগোলার শ্রমিকদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত একটা সর্বাত্মক শ্রমিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল৷ ভারতের ইতিহাসে এ ধরনের সম্মিলিত সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের এটাই বোধহয় প্রথম দৃষ্টান্ত৷’

কিন্তু এত বিশাল যার পরিপ্রেক্ষিত সে বিষয়ে কিছু জানতে গেলেই প্রশ্ন উপযাপিত হয়—তাহলে এর উপর রচনা এত সীমিত কেন? বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, গবেষক তথা লেখক যারা এই অঞ্চলের উপর বিভিন্ন ইতিহাসভিত্তিক ঘটনা প্রবাহের ওপর ইতিমধ্যে প্রায় আকরগ্রন্থই রচনা করে গেছেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি বলতে গেলে অবহেলিতই থেকে গেছে৷ কিন্ত কেন? সুজিৎ চৌধুরী বইটির একই মুখবন্ধে এই ব্যাপার লিখলেন—“বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে এতো বড় একটা শ্রমিক আন্দোলনের যথাযথ বিশ্লেষণ আজ পর্যন্ত হয়নি, বিস্তৃত বিবরণ পর্যন্ত সহজলভ্য নয়৷ অমলেন্দু গুহের “দ্য প্ল্যান্টার্স রাজ টু স্বরাজ’ বইতে ঘটনাপ্রবাহের যেটুকু বিবরণ পাওয়া যায়, তা আমাদের কৌতূহল নিবৃত্তি ঘটায় না৷ জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্যের “কাছাড় আন্ডার ব্রিটিশ রুল’ বইতে এই বিবরণ আরোও সংক্ষিপ্ত৷ সর্ব ভারতীয় শ্রমিক আন্দোলনের যেসব ইতিহাস রচিত হয়েছে, তাতে কোথাও দুই এক ছত্রে ঘটনাটি উল্লিখিত হয়েছে, কোথাও আদৌ জায়গা পায়নি৷ এই অনুল্লেখের এক সঠিক কারণ রয়েছে, তার কিছু কিছু আভাস বিবেকানন্দের রচনায় রয়েছে৷’

এই বইয়ের আলোচিত বিভিন্ন বিষয় এবং সন্নিবেশিত তথ্যের উৎসের মধ্যে নিখুঁত প্রণালীবদ্ধ সমন্বয় যে কোনও রীতিসিদ্ধ গবেষক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনও ইতিহাসবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীর জন্যও অনুসরণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে৷ গ্রন্থে তথ্য বহির্ভূত একপেশে মন্তব্য প্রায় অনুপস্থিত৷ তথ্যের বিষয়-নির্ভর নিরলস নিরপেক্ষ উপস্থাপনা বইটিকে এর যে কোনও সিদ্ধান্ত বা নিষ্পত্তিকে অত্যন্ত সফলভাবে এক সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণাত্মক ঐতিহাসিক দলিলে রূপান্তরিত করেছে৷

বইটির উপর মন্তব্য করতে গিয়ে সুজিৎ চৌধুরী আমাদের আরো জানালেন—“বিবেকানন্দের রচনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে যে সংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়ে পাঠকের কৌতূহল জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক, তার কোনটাকেই তিনি পরিহারযোগ্য মনে করেননি তাই তাঁর রচনায় স্থান পেয়েছে চা বাগানের পত্তনের কাহিনী, চা-শ্রমিক সংগ্রহের আইন ও চুক্তিপত্র, প্রশাসনের সঙ্গে ইংরেজ বাগান মালিকদের সম্পর্ক, শ্রমিকদের সামাজিক পটভূমি, স্থানীয় পরিস্থিতি ইত্যাদি৷ ফলে ঘটনা প্রবাহের পেছনকার সর্বাঙ্গীন পরিসরের সঙ্গেও পাঠকের পরিচয় ঘটে৷ সেই সঙ্গে বাংলার যেসব মনীষী আসামের বাগান শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে জনমনে চেতনা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন তাদের প্রয়াসের বিবরণও তিনি সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করেছেন৷

এই বইটির বিশেষত্ব হল—রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত তৎকালীন প্রখ্যাত জনপ্রিয় ইংরেজি মাসিক পত্র “মর্ডার্ন রিভিউ”-তে এই বিষয়ের উপর প্রকাশিত অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং জরুরি রচনা সামগ্রীকে তথ্য হিসাবে ব্যবহার করা৷ এই বিশেষ তথ্যের ব্যবহারের অনন্যতা বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সুজিৎ চৌধুরী বইটির ভূমিকাতে আরো লেখেন—“সমসাময়িক কালের এই বিবরণগুলি আজকের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও গবেষকই এ সম্পর্কে ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যগুলি ব্যবহার করেন নি৷ বিবেকানন্দ মোহন্তই সর্বপ্রথম ১৯২১ সালের ‘মডার্ন রিভিউ’-র ওই সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ আমাদের সামনে উপস্থাপিত করে সত্য নির্ণয়ের নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন...৷”

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শুধু নির্মম প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের উত্তরপূর্বে আনা হয়েছিল তা-ই নয়, এই অঞ্চলের বিভিন্ন চা-বাগানে তাদের অমানবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থার বাইরেও ওই শ্রমিকদের পলায়ন প্রচেষ্টা বা মনিবদের চোখে অন্য যে কোনও “বে আইনি আচরণের’’ যথার্থ শাস্তির জন্য বৃটিশ ভারতে আইনের অভাব ছিল না৷ মোহন্ত তাঁর এই বইয়ের “চা-শিল্প ক্ষেত্রে শ্রমিক শোষণ” নামক পঞ্চম অধ্যায়ে এই সমস্ত নির্মম শোষণ পন্থা-প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্পষ্ট তথ্য সহকারে তুলে ধরেছেন৷

“দেখা যায়, ১৮৯৯ সালে পুরুষ চা-শ্রমিকদের মাসিক বেতন ছিল ৫ টাকা, মহিলা শ্রমিকদের ৪ টাকা এবং ১২ বছরের কম বয়সী শ্রমিকের ক্ষেত্রে ৩টাকা৷ পক্ষান্তরে ১৮৭৩ সন থেকেই কৃষি এবং অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকরা পেতেন মাসে ৯.৩৭ টাকা, ওই সময় একজন অদক্ষ ও সাধারণ রেল শ্রমিকের মাসিক বেতন ছিল ১২ থেকে ১৬ টাকা৷ চা শ্রমিকের মাস-মাইনে একই থাকে ১৮৬৫ থেকে ১৯০৩ সাল অবিধি, অথচ এই সময়সীমার মধ্যে wagegood হিসাবে তাদের বণ্টন করে দেওয়া রেশনের মূল্য মন পিছু ১ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩ টাকা৷ এখানে উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে স্থিতাবস্থায় থাকা মাস-মাইনে থেকেই কেটে নেওয়া হত বর্ধিত হারে রেশনের মূল্য৷

এই বইয়েই আমরা পাই পলায়নপর শ্রমিকদের উপর আসামের লেফট্যানেন্ট গভর্নর ফুলারের সেই মর্মান্তিক উক্তি—

‘I came across notices posted at river ferries and Rly Stations describing run away coolies and offerings rewards for their apprehension that reminded one of ‘uncle Tom’s cabin.’

ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক শোষকের ক্ষেত্রে পরোক্ষ প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান উদ্যোগপতিদের৷ তাদের উদ্দেশ্যে সরাসরি দেওয়া বড়লাটের ওই নির্মমতম বাক্যগুলির (নিম্নে দেওয়া)উদ্ধৃতি দিতেও ভোলেননি অনন্য পর্যবেক্ষণক্ষম, বিশ্লেষণাত্মক রচনায় সিদ্ধহস্ত বিবেকানন্দ মোহন্ত :

‘Yours business and mine are one and the same yours is exploitation and mine is administration. Both are part and parcel of the same Government.’

এছাড়াও এইচ কে বরপুজারি এবং অন্যান্যদের সম্পাদিত “পলিটিক্যাল হিস্টরি অব আসাম, ভল্যুম-ওয়ান’ থেকে আসাম চা-কুলি কামিনদের উপর নির্মমতম নির্যাতনের উল্লেখ এই মহাগ্রন্থে রয়েছে৷ অমলেন্দু গুহের বক্তব্যেও যে অনুরূপ ‘স্লেভ ট্রেড’-এর কথাই ধ্বনিত হয়েছিল সেসব এসেছে মোহন্তের লেখায় এবং একইসঙ্গে শ্রমিকদের পলায়ণ রুদ্ধ করে দেওয়ার সেই নিদারুণ, নির্মম, অমানবিক ওপনিবেশিক আইন “ওয়ার্ক ম্যানস ব্রিচ অব কন্ট্রাক্ট” সহ শ্রমিকদের শোষণের জন্য রচিত আইনগুলিও একই সঙ্গে পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন বিবেকানন্দ৷ সভ্যতার ভেকধারী বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের লুণ্ঠনকারী চেহারাটি দিবালোকের মত স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন তিনি৷

এই পর্বের আগের চারটি অধ্যায়ের প্রথম দুটি অর্থাৎ প্রস্তাবনা এবং চা-শিল্প গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট সম্বন্ধীয় অধ্যায়গুলির বাইরে ‘চা-শিল্পের প্রয়োজনে ভূমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া’ এবং ‘শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থা’ শীর্ষক অন্য অধ্যায় দুটিতে সাম্রাজ্যবাদী সরকারের চা-মালিকদের খোলা হাতে দেওয়া মাত্রাধিক অবৈধ আইনসিদ্ধ সুবিধাগুলির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে৷

ওই অধ্যায়গুলিতে তথ্যের নিখুঁত উল্লেখে এবং বিশ্লেষণে মোহন্ত উত্তর আমেরিকার দাস প্রথার উপর লিখিত হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো-র সেই অসাধারণ বই “আংকল টম’স কেবিন” (১৮৫১-৫২) এর পুনরুল্লেখ না করে পারেননি৷ উত্তরপূর্বের চা-বাগান প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন যে একই অমানবিক নির্যাতন প্রক্রিয়ার অনুসরণ করেছে তাকেই মোহন্ত তাঁর এই অনন্যসাধারণ মানবিক দলিলে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন৷

“উত্তর আমেরিকার কেনটাকির পাশেই দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন হ্যারিয়েট এলিজাবেথ বিচার স্টো (১৮১১-১৮৯৬), যেখানে দাসপ্রথা ছিল৷ অসহায় বিপন্ন লোকগুলির দুঃসহ যন্ত্রণা প্রত্যক্ষ করে সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর অসাধারণ বই “আংকল টম’স কেবিন”৷ সেদিন সারা বিশ্ববাসী শিউরে উঠেছিল ক্রীতদাসদের উপর অমানবিক নির্যাতনের মর্মান্তিক চিত্র দেখে৷ কুড়িটিরও বেশি ভাষায় অনুদিত হয়েছিল স্টোর সেই অনন্য সৃষ্টি৷ একে একে কীভাবে পরিবার গুলি ক্রেতার হাত ঘুরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল একে অপরের থেকে, বাজারের পশু পাখি বিক্রি মতোই৷ “অংকল টম’স কেবিন” চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল সে রূঢ় বাস্তব সত্যটি৷ সেদিন চিরতরে বন্ধ হয়েছিল ক্রীতদাস প্রথা৷ কিন্তু এটির নৃশংস রূপকেই অপরিবর্তিত রেখে ক্ষেত্র বিশেষে শুধুমাত্র পোশাক বদলে চালান করে দেওয়া হয়েছিল উত্তর পূর্বাঞ্চলের স্নিগ্ধ-কোমল, উঁচু-নীচু সমতল ক্ষেত্রে, স্লেভ এর পরিবর্তে নামকরণ হল ‘Indentured Labour’৷ বিশ্ববাসীর কাছে মুখরক্ষাও হল৷ অলক্ষে দাস-প্রথাটিও টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা হল৷ (বইয়ের পৃ: ৪৫)৷

 পর্ব ২ 

আসামে চা-বাগানের এই নির্যাতনের তথ্য বা গল্প দিয়েই যদি এই বই সমাপ্ত হত তাহলে অতৃপ্তির অন্ত থাকত না৷ কারণ, পরিবহণ ব্যবস্থা যত অনুন্নতই হোক, ভৌগোলিকভাবে কলকাতা এই অঞ্চল থেকে মোটেই দূরে ছিল না এবং সর্বোপরি সেখানে তখন “ভারতের নবজাগরণের স্রষ্ঠা রাজা রামমোহন রায়ের অনুসরণে গড়ে উঠেছিল নব্য কলকাতা বা নব্য ভারত৷ তাই নীলকরদের দোসর আসামের প্ল্যান্টার্সদের অত্যাচারের কাহিনিও চাপা থাকল না৷ এই উন্মেষের তথ্য সমৃদ্ধ পর্যালোচনায়ই শ্রী মোহন্ত করলেন তাঁর এই বইয়ের পরবর্তী অর্থাৎ ষষ্ঠ অধ্যায়ে যাঁর শিরোনাম—“শ্রম জীবনে চেতনার উন্মেষ৷” সেই অধ্যায়ের শুরুতেই আমরা জানলাম ১৮৬১ সালের ৭ মার্চ আত্মপ্রকাশ করা ‘ঢাকা প্রকাশ’ সাপ্তাহিক পত্রিকাটিই মাতৃভাষায় প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা, যার পৃষ্ঠপোষকদের অধিকাংশ ছিলেন ব্রাহ্মধর্ম সমর্থক এবং এই পত্রিকাটি জন্ম লগ্ন থেকেই কাছাড়ের কোনও এক সংবাদদাতার মারফৎ ওই অঞ্চলের প্ল্যান্টার্সদের অমানুষিক নির্যাতনের ব্যাপারে সরব হয়ে উঠেছিল৷ তারই আক্ষরিক প্রমাণের নিদর্শনস্বরূপ Hindu Patriot পত্রিকার সম্পাদকের কাছে ‘xyz’ নামে এক পত্রলেখকের প্রেরিত চিঠির আংশিক উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু হল বইটির সেই বিশেষ অধ্যায় :

“You are perhaps aware that the regular correspondent of the ‘Dacca Prakash’ of Cachar who was hitheroto enlightening the world with the doing of the Tea planters in that part of the country, has been compelled to give up his correspondence, owing to the very broad and very unpleasant hints dropped by the interested parties that the correspondent stood in danger of his life if he persistes in his obnoxious communications.”

এই অধ্যায়েই আমরা পাই সাধারণ জনজীবনে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর ক্ষেত্রে ব্রাহ্ম-মিশনারিদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং অবদমিত প্রয়াস৷ ১৮৭৬ সালে কলকাতায় ব্রাহ্মদের প্রচেষ্টায় “ভারত সভাগঠন” এবং তার প্রতিনিধিদের দ্বারা উত্তর পূর্বাঞ্চলের চা-বাগানগুলিতে শ্রমিকদের উপর কর্তৃপক্ষের বহুমুখী নির্যাতনরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ ইত্যাদির তথ্যপূর্ণ বর্ণনা৷ এ সবই এই বইয়ের অমূল্য সম্পদ৷ রাজকুমার ভট্টাচার্যের কুলি সেজে আসামে আগমন, ভারত-সভার সহ-সম্পাদক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীর কুলিদের অবস্থা পরির্শনের জন্য স্বয়ং আসাম আগমন এবং সর্বোপরি শ্রীহট্টের কৃতি ব্রাহ্ম-সন্তান বিপিনচন্দ্র পালের কুলি নির্যাতনরোধে অসামান্য প্রয়াস৷ এই অধ্যায়ে তার বর্ণনা এই অঞ্চলের নতুন প্রজন্মের মনে শুধু বিস্ময় বা গভীর শ্রদ্ধারই উদ্রেক করে না, অবশ্যই তাদের জীবন সংগ্রামের এক জলন্ত প্রেরণা হয়ে থেকে যাবে৷ অসামান্য প্রতিভাধর, অনন্য ত্যাগী, স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিনচন্দ্র পালের কর্মপ্রতিভার যে আশ্চর্য পরিচয় এই বইয়ের স্বল্প পরিসরে বিবৃত হয়েছে তা এই অঞ্চলের যে কোনও সাধারণ পাঠককে লেখকের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ করে রাখবে৷

এই বিষয়ে চেতনার উন্মেষে সেই সময়ে কলকাতা থেকে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার সমস্ত সংবাদ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রায় প্রত্যেকটি জরুরি লেখাই যেন এই বইয়ে সংকলিত হয়েছে৷ লেখকের নিরপেক্ষ দৃষ্টি এই অঞ্চলের ইংরেজ চিফ্ কমিশনার হেনরি কটনের মানবিক অবদানকে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছে৷ Imperial Legislative Council-এর সদস্য হিসাবে আসামের চা-শ্রমিকদের মাসিক বেতনের অত্যন্ত সীমিত বৃদ্ধি—যেমন ৫ টাকা থেকে ৬ টাকা (পুরুষদের ক্ষেত্রে) এবং ৪ টাকা থেকে ৫ টাকা (মহিলাদের ক্ষেত্রে) করার প্রতিবাদের বিষয়টি বইটিতে যথা মর্যাদায় উল্লিখিত হয়েছে৷ বিপিনচন্দ্র পালের এত প্রচেষ্টায়ও আসামের প্ল্যান্টার্স কর্তৃক নিদারুণ কুলি নির্যাতন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়৷ ১৯২০ সালে All India Trade Union Congress রেলওয়ে, বস্ত্রশিল্প, জাহাজ পরিষেবা, পরিবহণ, রসায়ণ, কারিগরী, ডাক ও তার বিভাগ, ছাপাখানা ও কাগজ এবং সাধারণ হিসাবে ৬৪টি সংগঠনের ১,৪০,৮৫৬ জনকে নিয়ে গঠিত হলেও তৎকালীন আসামের ৭৭৯টি (১৯১৫ সাল) চা-বাগানের মোট শ্রমিক সংখ্যা ৭,৮০,০০০ জনকে কিন্তু AITUC-র অন্তর্ভুক্ত করা হল না৷ অর্থাৎ মেনল্যান্ড ইন্ডিয়া বা সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে আঞ্চলিক অবহেলার দিকটি আলাদাভাবে বইটিতে উল্লিখিত না হলেও অতীত থেকেই তা যে বেশ স্পষ্ট৷ স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষে বর্তমানেও যে বরাক উপত্যকার চা-বাগানের শ্রমিক ও অন্যান্য শ্রমিক-কর্মচারিরা আর্থিকভাবে উপেক্ষিত অর্থাৎ কম দিনমজুরিতে কর্মরত তাতে আশ্চর্য হবারই বা কী?

চা শ্রমিকদের প্রতি সর্বভারতীয় কংগ্রেসের অবহেলার বিষয়টি এই বইতে আমরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পাই৷ চরগোলা সম্পর্কিত চাঁদপুর ঘটনা প্রবাহ এক বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলন-পর্বেই মহাত্মা গান্ধী আসাম পরিক্রমায় বেরিয়েছিলেন৷ ১৮-২৬ আগস্ট ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, ২৭-২৮ আগস্ট শিলচর, ২৯-৩০ আগস্ট সিলেট এবং ৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম সফরে ছিলেন তিনি৷ ...‘শিলচর কিংবা সিলেট সফরকালে চা শ্রমিক বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কিনা সে ব্যপারে আমরা অবগত নই৷’ ‘গান্ধীজির শিলচর সফর নিয়ে আলোকপাত করেছেন অধ্যাপক জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত প্রমুখ ইতিহাসকার৷ উভয় ক্ষেত্রেই অনুল্লেখিত চা-শ্রমিক আন্দোলন৷’

এরপর পাঠকদের হাতে আর না ছেড়ে বিষয়টিসম্বন্ধে নিষ্পত্তিসূচক মন্তব্যটি লেখক বইটির সপ্তম অধ্যায়ে নিজেই জুড়ে দিলেন :

“মহাত্মা গান্ধীর আসাম ভ্রমণের পরও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলনের বিষয়টি সর্বভারতীয় কংগ্রেস সংগঠনের কতদূর নিকট সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হয়েছিল সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না ১৯২৪ কিংবা ১৯২৫-২৯ সালের AITUC-র সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের পরিসংখ্যান থেকে, যেখানে চা-শ্রমিক সংগঠনের কোনও উল্লেখ নেই৷”

সর্বভারতীয় কংগ্রেস বা অন্যান্য সংগঠনের কাছে “চরগোলা এক্সোডোস ১৯২১” কি স্বীকৃতি পেল সেটা না হয় তোলাই রইল৷ তবে বইটিতে ১৯২১ সালের করিমগঞ্জ ওয়েলস মিশন চার্চের বার্ষিক প্রতিবেদনের (প্রকাশকাল ১৯২১) আংশিক উদ্ধৃতি নিয়ে লেখক এই মহান শ্রমিক আন্দোলনের এক চরমপ্রাপ্তির কথা আমাদের সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিলেন৷ চার্চের বার্ষিক রিপোর্টে জানাচ্ছে:

‘At the request of the late Governor of Assam, Dr. Wolloams acted as a member of a commission on appointed to enquire into the labour conditions obtaining on the Tea Gardens of Assam. Much Good has come of the enquiry, especially in that the Government has promised within three years to abolish ‘Act XIII’. This is the Act which legalised a condition of a servitude in all the tea gardens.’

তারপরেই লেখকের চূড়ান্ত মন্তব্য—‘এখানে উল্লেখ্য যে Act XIII-ই হল বহু আলোচিত ও ‘গিরমিট’ আক্রান্ত ‘Workmen’s Breach of Contract Act XIII of 1859’ যা একজন চা শ্রমিককে ক্রীতদাস হিসাবে প্রতিপন্ন করে আসছিল দীর্ঘ বাষট্টি বছর ধরে (১৮৫৯-১৯২১)৷ ধরে নেওয়া যায় যে, সরকারের কাছ থেকে কুখ্যাত আইনটি তিন বছরের মধ্যে নির্মূল করার প্রতিজ্ঞা আদায় করাটি চরগোলা শ্রমিক আন্দোলনের এক চরম প্রাপ্তি৷’

উল্লেখ্য যে, ১৯২৬-এ এই ‘কুলি আইন’টি চির নির্বাসনে গেল৷ বলতে গেলে উনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে শিল্প হিসাবে চা-শিল্পই উত্তর-পূর্বের একমাত্র শিল্প যা এত বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এক বিশেষ পরিমাণ আর্থিক লগ্নির পরিমাপে এখনও একমেব-অদ্বিতীয়ম্৷ এর প্রতিষ্ঠা কাল থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তি পর্যন্ত দীর্ঘদিনের অবদান জুড়েই শ্রমিকদের অমানুষিক আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই শিল্প আজও তার অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখেছে৷ এই বইতে সেই নির্মম নির্দয়তার তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে শ্রী মোহন্ত যেভাবে এই অঞ্চলের আমাদের সবাইকে সচেতন তথা এক উন্নত জাতির অংশ হিসাবে পাপবোধ থেকে আমাদের খানিকটা হলেও মুক্ত করলেন, তারজন্য আমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি এক গভীর কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হলাম৷

এ বিষয়ে আমাদের একটি আন্তরিক অভিমত ব্যক্ত না করলে অপরাধবোধ আরও বেড়ে যায়৷ ভারতবর্ষের মতো তথাকথিত একটি বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এখনও যেন কৃষিশিল্প হিসেবে চা-শিল্পটি মর্যাদা পেল না৷ চা-বাগিচা, চা-শিল্প যেন কৃষি ও শিল্প বা এগ্রিকালচার অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি উভয়ের জন্যই ব্রাত্য, বঞ্চিত ‘other’৷ সম্পূর্ণ শ্রমিক-নির্ভর (যত প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণই হোক) এই চা-কৃষি শিল্পটিকে আলাদা করে সরিয়ে রাখা হয়েছে৷ অথচ বিনিয়োগ, উৎপাদনের উপাদান, জমি, মোট উৎপাদন নিয়োগ সৃষ্টি, মুনাফা, বাজার সমস্ত দিক দিয়েই চা-শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ দুশো বছর ধরে যত শ্রম ও সম্পদ চা-উৎপাদনে ব্যয় করা হয়েছে, আর তার ফলে  যে বিপুল সম্পদ ও মুনাফা সৃষ্টি হয়েছে তার সামান্য অংশও শ্রমিক কর্মচারীদের উন্নয়ন বা বিকাশে পুনর্বিনিয়োগ করা হয়নি৷ যত আন্দোলন, যত জ্ঞানচর্চা, যত প্রগতি ও গঠনমূলক চর্চা— অধিকাংশ ক্ষেত্রে চা-বাগিচার শ্রমশক্তিকে তথাকথিত ‘মেনস্ট্রিমে’ যুক্ত করার প্রেরণা পাওয়ার নজির প্রায় নেই৷ যেন এরা বিচ্ছিন্ন অ্যালিয়েন জনগোষ্ঠী৷ এতে মুনাফাবাজ মালিকদের শোষণ-শাসনের সুবিধা বেড়ে গেছে প্রাক-সামন্ততান্ত্রিক টি-ফার্ম হাউসের তখতে বসে বসে৷ উনিশ শতকের ব্রাহ্মসমাজের জনাকয়েক ব্যক্তি, বিপিনচন্দ্র পাল এবং কাছাড়ের শ্রদ্ধেয় অরুণকুমার চন্দে্র লিগ্যাসি বহন করার মতে সৎসাহস আমরা কেন পাইনা—মোহন্তের গ্রন্থ আমাদের মধ্যে সে প্রশ্নও উসকে দিয়ে গেল৷ কেন জানি মনে হয়, বইটির জন্য যে কোনও সাধুবাদও কৃপণতা দোষে দুষ্ট বলে বিবেচিত হবে৷

বইটিতে তথ্যসূত্র ও পাদটিকা অন্তিম পর্বের অন্তে একসাথে না দিয়ে প্রত্যেক অধ্যায়ের অন্তেই দিয়ে দেওয়ায় যে কোনও পাঠককেই যে কোন অংশ পড়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সূচিত তথ্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেবার অনায়াস সুযোগ করে দেওয়ার জন্য লেখক বিশেষভাবে সবার ধন্যবাদার্হ৷ তবে তথ্যসমৃদ্ধ যুক্তিসম্মত বিশ্লেষণ সহযোগে সরল সুন্দর ভাষায় বিষয়টিকে তুলে ধরার জন্য আমাদের মত সাধারণ পাঠকদেরও আরো পাওয়ার লোভ বেড়েছে৷ বইটির অনন্য পরিশিষ্টের জন্য যে কোনও সচেতন পাঠকই যারপরনাই প্রীত হবেন, তবে সেই সঙ্গে বইয়ে উল্লিখিত শ্রমিক নির্যাতনকারী সরকারি বিধান (Act) গুলির অতি আবশ্যিক-অংশগুলিও যদি ইংরেজি ভাষায়ই পরিশিষ্টের মধ্যে সংকলিত থাকত, তবে সভ্যতাগামী পাশ্চাত্যের মুখোশের আড়ালে যে মুনাফা প্রীতিই প্রধান ছিল তা আন্তর্জাতিক স্তরের পাঠকের কাছে আরো মূর্তভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠত৷ পরিশিষ্টে মানচিত্রগুলি যোগ করার জন্য লেখককে জানাই বিশেষ ধন্যবাদ৷ সেই সঙ্গে যদি চরগোলা থেকে প্রস্থানরত আন্দোলনকারীদের করিমগঞ্জ বা চাঁদপুরে সমবেত জমায়েতের খান কয়েক ছবি এতে সন্নিবিষ্ট হত, তাহলে দৃশ্যগত অবস্থানে তাঁরা আরো সমসাময়িক হয়ে বর্তমান প্রজন্মের আশু প্রেরণার কারণ হতে পারত৷

বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতিসিদ্ধ বা অনুশীলনপ্রাপ্ত গবেষকদের একজন না হলেও এত তথ্য সমৃদ্ধ বিদগ্ধ বিশ্লেষণী রচনার শেষের কয়েকটি আন্তরিক বিনীত লাইন দিয়ে সমস্ত দোষগুণের বাইরে গিয়ে লেখক সাধারণ পাঠকদেরও আপন করে নিয়েছেন৷ এই রচনার ইতি টানার সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য এবং এক আন্তরিক ইচ্ছা গবেষক বিবেকানন্দ মোহন্ত নিবেদন করেছেন:

‘চরগোলা এক্সোডাস সম্পর্কিত আমার আলোচনাটি নিতান্ত এক প্রাথমিক প্রয়াস মাত্র৷ এ বিষয়ে হয়তো আরও তথ্য রয়েছে যেগুলো আজও আবিষ্কৃত হয়নি৷ অনুসন্ধিৎসু গবেষকরা আশা করি এ ব্যাপারে আরও যথাযথ এবং বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে এগিয়ে আসবেন৷’

সন্দেহ হয়, ‘আরো কিছু তথ্য’ সত্যিই কি সংগ্রহ করা সম্ভব? সবার কাছে অধ্যাপক সুজিৎ চৌধুরীর মত বিনীত অনুরোধ, আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রায় আকরগ্রন্থ স্বরূপ এই অমূল্য বইটির একটি ইংরেজি সংস্করণ অবিলম্বের প্রকাশিত হওয়া জরুরি৷ শিলচরের সৃজন গ্রাফিকস প্রকাশন সংস্থা গ্রন্থটি প্রকাশ করে যুগান্তকারী কাজ করেছেন৷ এত বিশাল ব্যয় ভার যারা বয়েছেন, তাদের কাছেই বিনম্র আবেদন, এই মহামূল্যবান গ্রন্থের ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশের দায়িত্ব যদি তারা নেন৷ সমগ্র পৃথিবীর শ্রমিক আন্দোলন বিবেকানন্দ ও সৃজন গ্রাফিক্সের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকল৷

 সমাপ্ত