সাহিত্য পত্র

কবিতার খাতা - ১৮
২৪ এপ্রিল ২০২১
 

ঈশানের ১৮ নম্বর কবিতার খাতায় এবারে আমরা নিয়ে এসেছি কবি আদিমা মজুমদারের এক গুচ্ছ কবিতা...

পেশায় একজন স্বাস্থ্যকর্মী কিন্তু নেশায় একজন কবি, গল্পকার ও মানব সেবায় লীন একজন সমাজকর্মী আদিমা মজুমদার

অনেকদিন ধরেই কবিতা চর্চা করছেন, লিখেছেন অনেক পত্রিকায়, সংকলনে, আন্তর্জালে।

আগেই প্রকাশিত হয়েছে বেশ কয়েকটি গল্পের ও কবিতার বই।

এবারের কবিতা গুলো নেওয়া হয়েছে ওনার সব থেকে সাম্প্রতিক কবিতার বই "অস্ফুট দ্রোহ" থেকে

যে বইটি প্রকাশিত হয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০২১এ...

চলুন পড়ে নেই সেই বই থেকে কয়েকটি কবিতা ...

সুপ্রভাত

মোবাইলে এলারাম বাজিয়া উঠিল

বুঝিল সবাই রাত পোহাইল।

টাবের গোলাপ-গেন্ডা আধাটা ফুটিল

ঝি ওঠে চাবি দিয়ে গেটটা খুলিল।

“যাবে ভাই রাস্তায়”? কুকুরকে শুধায়

লেজ নেড়ে এ্যালশেসিয়ান মাথাটি ঝাঁকায়।

হাগা-মুতা শেষ হলে ঘরেতে ফিরিল

নরম গরম ব্রেকফাস্ট তাকে খেতে দিল।

বাচ্চারা সব ব্যাগ পিঠে করে দৌড়াদৌড়ি

কে আগে উঠবে গাড়িতে, পড়ে উড়াউড়ি।

চারদিক মুখরিত সেন্টের সৌরভে

রবিমামা দেয় হামা আপন গৌরবে।

ধুম্র বাতাস বয় বিষাক্ত ছোবল

সারারাত ফেসবুকে বাচ্চা বুড়ো সকল।

শরীরের নোনতা স্বাদ নিতে

ঘুম ভাঙে দেরিতে।

উঠে সবে মুখ ধোয় নেয় নিজ মোবাইল

মিস কল, ম্যাসেজ, দেখে ফ্রেন্ড প্রোফাইল।

পাখিরা সোনার খাচা ভেঙে করে চুরমার

বেঁচে আছে শুধু আমার, সোনার সংসার।

 
কেলেঙ্কারি

দুলাভাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন

বুবু পড়েন সাত ওয়াক্ত, ফজর জুহর আছর

মাগরিব এশা ছাড়া তাহজুদ এবং ইশাকহ

বুৰু দূলাভাইর ডানদিকে কখনও বসেন না । গোনাহ

বরকনে সাজে বুবু দুলাভাইর

একটা ফোটো আছে আমাদের ঘরে

সেটাতেও বুবু বাঁদিকে

বুবুর গলায় ছ'ভরি সোনার হার

বোরখার নিচে-সাবধানে।

পরকালের ভয়ে ভীরু।

আমি নামাজ পড়ি না বলে

আমার সাথে আড়ি।

বুবুর একটা গোপন সংস্থা আছে

সেখানে আরবী শব্দের উচ্চারণ ঠিক করা হয়

বাংলা ভাষার জন্য যেখানে এগারো

তাজা প্রাণ বলিদান হয়!

সেই বরাকে

বুবু বড় বেশি জাহান্নামের চিন্তা করে।

বুবু নিশ্চিত ---

দুলাভাইয়ের পায়ের তলায় বেহেস্ত!

আমি কিছুই করি না ---

যেখানে বসে মেয়েরা আড্ডা দেয়, কথা বলে,

কবিতা লেখে, গল্প লেখে, ছবি আঁকে

আমি সেখানে চুপি চুপি যাই

বুবুর বিপরীত স্বভাব আমার

অথচ বুবু আমি একই মায়ের গর্ভজাত।

আরশের ময়দানে আমার কি হবে জানি না

সেদিন পত্রিকায় দেখি

আমার দুলাভাই "মোস্ট ওয়ান্টেড" ।

সারদা কেলেঙ্কারির অন্যতম অভিযুক্ত।

হায় খোদা!

কেলেঙ্কারির জন্য

নামাজ পড়তে হয় বুঝি?

 

 
রং

রং যদি না সাদা হয় তবে তুমি

মরেছ মেয়ে,

নিশ্চয় জেনো, বাজারে তোমার দাম

গেছে কমে।

তোমার মেধা, গুণ আজকাল

চলে না।

রং যদি না কালো হয়

তবে বেঁচে গেছো তুমি,

বিকো বা না বিকো ---

ধর্ষিতা হবেই

কারণ তুমি মেয়ে

একান্তই মেয়ে।

 

 
 
বাজে মেয়েটা

কেমন আছেন?

'ভালো আছি'

একেবারে কমন উত্তর

আজ যে মানুষটাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম

কেমন আছো?

উত্তর দেয় ---

'গতকাল যেরকম ছিলাম'

একটু ব্যতিক্রমী উত্তরটা ---

শুনে খুশি হয়েছিলাম।

'ভালো আছি' --- ডাহা মিথ্যা কথা।

রোজই মানুষটা বলে --- 'ভালো আছি'

তাঁর বান্ধবী সীমা, আমাকে জিজ্ঞেস করে

ওর সাথে এত দহরম মহরম কেন?

একেবারে বাজে মেয়ে।

বাজে মেয়েদের

আমার খুব ভালো লাগে।

সীমাকে ধন্যবাদ দিই,

ও আমাকে পরিচয় করানোর জন্য।

বাজে মেয়েটির জীবনী শোনার জন্য

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি।

ওরই স্মৃতি রোমন্থন করি বারবার।

ময়লা লাল রঙের শাড়ি

গায়ে হয়তো বত্রিশ ইঞ্চি ব্লাউজ

পায়ে ফুটপাতের হাওয়াই

গায়ের রং সাদা।

মনটা বোঝার দায়িত্ব আমার

যা দেখলাম, অর্থের সৃষ্টি করা

ব্যক্তিত্ব ওর মাঝে নেই।

বাচ্চা, চাকুরি আর সংসারের ব্যস্ততায়

 দিন যাচ্ছিল ---

হঠাৎ একদিন দেখা হয় মেলায়

বাজে মেয়েটির সাথে

চলো চাট খাবো,

না দাদা আপনি খান

আপনার সাথে আমাকে দেখলে

লোকে আপনাকে...

চলো চলো বলুক লোকে

বিভোর আমি তোমার শোকে।

তুমিই আমার কবিতার নায়িকা হবে।

যে ক'জন পরিচিত লোক আমাকে দেখেছিল

সবাই জিজ্ঞেস করে--- 

বাজে মেয়েটির সাথে

কি করেছিলে চাট হাউসে?

কবিতা লিখছিলাম।

বলছিল --- 

মা বাবার একমাত্র মেয়ে

বাবা ইচ্ছে করে, শখ করে

হাল ফ্যাশনের কাপড় পরাতেন।

ফুলশয্যার রাতে উনি আমাকে

জিজ্ঞেস করেন ---

'তোমার বয়ফ্রেন্ড কতজন ।'

কার সাথে তেমার ইয়ে হয়েছিল?

প্রশ্ন শুনে অবাক হয়েছিলাম।

পরের দিন একটা মেয়েকে নিয়ে

এসে আমার বিছানায়...

তারপর আর একজন...

বাবা ফোন করেছিলেন 'কেমন আছিস?'

'ভাল আছি'

আমার নারীত্ব বহন করলো অন্যরা

স্বামীর ঔরসের দাবী আমি

করতে পারলাম না, কেননা

আমি অবলা

বাবা মারা যাবার পর, ভাইরা

সম্পত্তি নিয়ে লেগে যায়,

বড়দাকে বললাম তোমার কাজে

রাখবে কি আমায়?

বলে নিজের মানুষ ভালো না

ঘরের কথা বাইরে যায়।

আমার নারীত্ব রাখার জায়গা নেই।

নারীত্ব, সতীত্ব, ব্যক্তিত্ব, মাতৃত্ব

সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেড়াই।

আমার চোখের কোণে জল দেখে

বাজে মেয়েটি মাথা নিচু করে ফেলে ।

স্মৃতির আর্তনাদে ভেঙে পড়ে।

বাজে মেয়েটির সব বাজে কথা

সেদিন আমাকে ভীষণ

একা করে দিয়েছিল।

 
 
 
স্বাধীনতা হীনতার উপাখ্যান

তিনি আমাকে মোটেই দমিয়ে রাখেননি

আমি একেবারে স্বাধীন।

ভোরের আজান শুনে ঘুম থেকে উঠি

হিসি করতে করতে দাঁত মাজি

যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এঁটো বাসন নিয়ে

কলতলায় যাই।

শীতের সকাল, কনকনে হাওয়া

একটা শালিক দেখি

পাশের বাড়ির কুকুরটা বেড়ার ফাঁক দিয়ে

আমার বাসন মাজার ভঙ্গি দেখে।

চায়ের জন্য গলা হাঁকানো শুনে

আতঙ্কে শিউরে উঠি।

প্রথমে শাশুড়িকে 'চা'

কারণ বিয়ের প্রথম রাতেই তিনি

বলে দিয়েছেন ---

মা-কে খুশি রাখতে হবে।

চায়ের সাথে হাতে করা টা,

রেডিমেড চলবে না।

মৃত শ্বশুরের পেনশন পাওয়া

শাশুড়ি বলে কথা !

দুপুরে কম করেও একটা চাটনি

ঝাল ঝাল।

ডাল, বড় তরকারি, মাছ বা মাংস।

খেতে বসে ছেলে মাকে জিজ্ঞেস করবে

কেমন হয়েছে?

ভাত বেড়ে ডানদিকে লেবুর প্লেট,

বাঁদিকে জলের গ্লাস,

সামনে বাটি বাটি রাখা আইটেম

সাজিয়ে না রাখলে রুচির প্রশ্ন আসে।

ফল কেটে একটু দূরে

তবে হাতের নাগালে।

বিকেলের চা ঘন, টা ছাড়া

অফিস-ফেরৎ বাবু, হাতে মাছ সব্জি

ভুলে যাওয়া রোগ।

চুন বললে নুন

সাদাপাতা বললে চাপাতা

বন্ধের দিনে নির্ধাতিতা

নারীদের সাথে দেখা না করলেই নয়।

তারপর টলতে টলতে বাড়ি ফেরা

গভীর রাতে।

আমি কিছুই করি না

বেকার, স্বাধীন

শুয়ে যখন নাক ডাকান

আমি ক্যামেরাবন্দী করি।

দেবর ননদ কি ভালো গো

আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝে না।

বয়স যতই হোক

সবার ছোট,

এটা খাব, ওটা খাব

কত আবার।

আহা কি আনন্দ কি আনন্দ

দেবর আমার আংটিটা নিয়ে

বিক্রি করে দেয়,

ইস আমি কি খারাপ না?

দিয়ে আবার বলছি,

আসলে মুরগির ডিম

বিক্রি করে ---

মা আমাকে আংটিটি দিয়েছিলেন,

আমার হাতে মা মা গন্ধ ছিল।

সারাদিন ঘর গোছাই

অগোছালো আমার ভালো লাগে না।

আমার হাতটা না খুব অলক্ষ্মী

চুড়িগুলো ভেঙ্গে যায়।

একদিন চুড়িওয়ালার কাছ থেকে

একটা সাদা পলা ও লাল পলা

কিনে হাতে দিয়েছিলাম

সেদিন ঘরের কি অবস্থা ।

এটা নাকি হিন্দু বউরা পরে,

সত্যিই আমি খেয়াল করিনি

পলাগুলো শক্ত,

ভাঙবে না মনে করেছিলাম।

চুড়ি দুটোতেও যে এত বিভেদ

এত আক্রোশ!

সেদিনই আমাকে সোনার চুড়ি বানিয়ে দেন---

এত জেদ, বাব্বাঃ

তবু আমি স্বাধীন

 

 
 
আমি দুর্গা

বিশ্বকর্মা পূজার আগে থেকেই ফাঁকে ফাঁকে

শুরু আমার কাপড়ের বাজার,

ফিটিংস-এর ব্যাপার আছেনা?

ষষ্ঠী, সপ্তমী, নবমীর ড্রেস হয়ে গেছে।

অষ্টমীরটা দেবে ও।

উপহার পাবো কম করে পাঁচ ছয়;

চলবে কালীপুজা পর্যন্ত।

এখনও জুতো বাকি, মাসকারা! আ্যাই স্যাডো!

পারফিউম --- ক-ত কিছু, হয়ে যাবে

হাতে অনেক সময় ---

বাবা বলেন, দুধওয়ালা রফিকের জন্য

একটা লুঙ্গি আনতে।

এই গরিব গুবরোগুলো নিয়ে

আদিখ্যেতা আমার পোষায় না।

কাশবন, ঘাসবন পেরিয়ে স্বপ্নের রাজ্যে

উড়তে ইচ্ছে করে।

ভিড়ে বাজার করার, মজাই আলাদা,

ঠেলাঠেলি স্পর্শ! আহা!

ভিড়ের ফাঁক থেকে আবার একটি পঙ্গু হাত

মা, দুটো পয়সা!

এই আবার আমার সামনে পাগলিটা!

মিউনিসিপালিটির জঞ্জাল থেকে

কি খাচ্ছে! উফ!

আজকাল মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়

কেন এরা আমার সামনে ভেসে বেড়ায়

মা কেন আমার নাম রেখেছেন দুর্গা,

আমি দুর্গা? দুর্গা!!!

আমি কি ডুবে যাচ্ছি।

 
ম্যান্স

মাসের শেষ দিকে তুমি যখন আসতে ---

তিন চারদিন থেকে আবার ফিরে যেতে,

একদম সহ্য করতে পারতাম না তোমাকে

কথাটি বার বার বলতাম আমি মাকে।

তখন "প্যাড" স্বপ্ন আমার কাছে

মায়ের ছেঁড়া শাড়িতেই প্রাণ বাঁচে।

কতো কথা জমা হয়ে আছে স্মৃতির ভেতরে

হারিয়েছি তোমায় কোলাহল কুৎসিত মেডিকেলের ভিড়ে।

মনে পড়ে তোমাকে নিয়ে সাব উদ্দিনের বাসে

তুমি লেপটে থাকতে শাড়ি সায়া অন্তর্বাসে।

তুমি থাকলে এখনো লাল শাড়ি পরতাম

হাসতাম খেলতাম কতো মজা করতাম।

ম্যান্স থেকে তুমি হলে ম্যানোপোজ যেদিন

সেদিন তোমার প্রিয়তমা হয় সম্পূর্ণ স্বাধীন।

আজ আর দাও না দেখা করেছ দরজা বন্ধ

বিশ্বাস করো, এখনো গায়ে তুমি তুমি গন্ধ ।

 

 

দান

পেটে গর্ভথলি সৌদামিনীর

ভিক্ষার ঝুঁলি হাতে,

ঘুরে দুয়ারে দুয়ারে

যার তার কাছে হাত পাতে।

ভিক্ষা অন্নে পেট ভরে না যার

ভরে গর্ভথলি তার

বৎসরান্তে বাচ্চা প্রসবকরে

মেডিকেলের সস্তা বেডে পড়ে।

একদিন শুধায় কমলিনী নার্স ---

এটাই কি তোমার ভিক্ষার নির্যাস!

করুণ স্বরে জানায় সৌদামিনী

জিনিসের দাম বেড়েছে শুনি।

মানুষ দেয় না ভিক্ষা আজ

ছেড়েছি শরম লাজ।

তবে যেটা দান পেয়েছো বস্তা

সেটা কি এতই সস্তা?

হ্যাঁ দিদি, এখন পর্যন্ত যে জিনিস

সবচেয়ে মূল্যহীন

সেটা হল পুরুষের বীর্য

বীর্য ব্রাহ্মণ বীজ

নারী ক্ষেত্র স্বরূপ।

"দ্বৈধ"। 

 

 

দিদির বিয়ে

রোজ সকালে ১০৮ বার দুর্গানাম লিখতো দিদি

 আমি পড়তাম পদ্মাপুরাণ

দাদু শুনে বলতেন, আমার লক্ষ্মী-সরস্বতী 

নদী নালা খাল পুকুর স্নিগ্ধ মুক্ত শান্ত

পরিবেশে বড় হয়ে উঠি দিদি আর আমি।

দিদি বড় হয়, বিয়ে হয় স্বগোত্রে

বিয়ে নয় ইচ্ছে পুরণ করেছিল পরিবারের।

দিদিকে রান্নাঘর ছুঁতে দেয়নি ব্রাহ্মণ সন্তানেরা

কী ছিল না দিদির ---

 

রূপ ছিল গুণ ছিল মেধা ছিল

সব উজাড় করে টিকে থাকার লড়াই করেছিল।

 পারেনি যুদ্ধ করতে

কতকি ঘটতে থাকে ভেতরে ভেতরে

 শেষ পর্যন্ত ডিভোর্স

আমি শ্রদ্ধা করি দিদিকে

সতী সাধ্বীদের ট্র্যাডিশন ভেঙেছে

পাষণ্ডের সাথে বাকি জীবন নষ্ট করেনি।

এম.এ পাশ দিদি

জয়েন করে ছোট্ট একটা এনজিওতে

আজ দিদি অবাধে ঘুরে

রাত দশটা বারোটা বাড়ি ফেরে

ডিস-অ্যাবল বাচ্চাদের অ্যাবল বানায়

দিদির হাতের ঘড়িতে মোবাইল

বগলে মস্ত বড় ফাইল

আপনারা দিদিকে দেখেন,

হাসেন হয়তো

ফাইজলামি করেন

দিদি বলে--- 'মুর্খ এরা'

পাগলা কুকুরের দল।

দিদি আজকাল ভয় পায়

শাখা সিঁদুর

ভয় পায় লাল বেনারসী

বিয়ে বাড়ি দেখলে, আঁতকে ওঠে

দিদি এখন ১০৮ বার থুথু ফেলে

আকাশে, দুর্গার গায়ে।