সাহিত্য পত্র

গল্প - বসন্ত এসে গেছে


শৈলেন দাস
২১ মার্চ ২০২২

 

এই সংখ্যার ষষ্ঠ ছোটগল্প

Sailen Das_edited.jpg

টিডিসি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময়ই সঙ্গীতাকে ভালো লেগছিলো নিলেশের। মাখনের মত ফর্সা ত্বক, পাতলা ছিপছিপে গড়ন, এক মাথা কোমর ছাপানো চুল ও বড় বড় দুটি চোখ। সঙ্গীতা চৌধুরীর বাড়ি শিলচর আশ্রম রোডে। নিলেশ সেরকম ফর্সা না হলেও খুব একটা কালো নয়। গ্রামের আলো-বাতাসে বেড়ে উঠা পেটানো শরীর। ক্লাসে অথবা ক্লাসের বাইরে কোথাও সুযোগ হলেই দূর থেকে সে তাকিয়ে থাকত সঙ্গীতার দিকে। ব্যাপারটা এত কৌশলে করত যে একমাত্র অরিন্দম ছাড়া আর কেউ টের পায়নি কোনদিন। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ব্যাপারটা অনেকের জানাজানি হয়ে যায়। সঙ্গীতা জানতো কিনা তা অবশ্য জানা হয়নি নিলেশের। এর মধ্যে একটি দুর্যোগ নেমে আসে নিলেশের জীবনে। তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে শিলকুড়িতে নিজেদের মাছের আড়ত এর ব্যবসায় যোগ দিতে হয় তাকে।


পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা বাদ দিলেও নিলেশ বর্তমানে একজন সফল ব্যবসায়ী। ফাটক বাজারেও একটি মাছের আড়ত রয়েছে তার। প্রিয় বন্ধু অরিন্দম দাস বর্তমানে এম.ই স্কুলে কর্মরত একজন টেট শিক্ষক। সে শিলচর কালিবাড়িচরের বাসিন্দা। কলেজ জীবনের পড়ও নিলেশের সাথে বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে তার। আজ অরিন্দমের জন্য পাত্রী দেখতে পাঁচগ্রাম দাসকলোনিতে এসেছে তারা। কথা ছিল, পাত্রীর সাথে যা কথা বলার বা যা কিছু জিজ্ঞেস করার সব নিলেশই করবে অরিন্দমের কাজ হবে শুধু পাত্রীকে দেখার। কিন্তু বাধ সেধেছে ওই সঙ্গীতা চৌধুরী। পাত্রীর সাথে সেও এসে তাদের সামনে বসেছে। সঙ্গীতা এখানে কিভাবে এসে হাজির হয়েছে নিলেশ বুঝে উঠতে পারেনি। এত বছর পর সঙ্গীতাকে সরাসরি এত সামনে দেখতে পেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে সে। ভালো করে তাকানোর সাহস জোগাড় করতে পারছে না। এদিকে অরিন্দমও অবাক হয়েছে সঙ্গীতাকে দেখে। পরে অবশ্য জানা গেছে সঙ্গীতা পাত্রীর পিসতুতো বোন। সঙ্গীতাকে পেয়ে অরিন্দম কিছুটা সহজ হয়েছে, পাত্রীর সাথে কথাবার্তা সে নিজেই বলেছে কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও নিলেশের আড়ষ্ঠতা কাটাতে পারেনি।


পাত্রী দেখার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। অরিন্দমের খুব পছন্দ হয়েছে পাত্রীকে। তাদের সাথে অন্যান্য যারা এসেছে তারা ভিতরে আলাপ-আলোচনা করছে। দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষ করে সন্ধ্যার দিকে ফিরতে হবে তাদের। নিলেশ এই ফাঁকে একটু বাইরে যাওয়ার অজুহাতে বাড়ির পিছন দিকে বাঁশ ঝাড়ের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। বরাক নদীর পাড় ঘেঁষা এই এলাকা বেশ মনোরম এবং গোছানো। সবার বাড়ির পিছনে রয়েছে সব্জির ক্ষেত। বিন, ফরাস, খিরা, মিষ্টি কুমড়া এত সুন্দরভাবে ফলেছে, দেখে বেশ ভালো লেগেছে তার। কিন্তু বরাকের ভাঙ্গা তীরের মত একরাশ বিষণ্ণতায় ভরে আছে নিলেশের মন। পড়াশোনা বাদ না দিলে আজ হয়তো সরাসরি সঙ্গীতার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারতো সে। কলেজ জীবনেই হয়তো বন্ধু হতে পারত তারা। এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই পকেট থেকে একটি সিগারেট বের করতে যাচ্ছিল সে ঠিক এমন সময় পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল " কি ব্যাপার? এখানে একা দাঁড়িয়ে কেন? " ফিরে তাকাল নিলেশ। বড় বড়  দুটি চোখে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সঙ্গীতা। নদীর পারের দমকা হাওয়ায় কয়েকটি চুল এলোমেলোভাবে আঁচড়ে পড়ছে মুখের উপর।  অনেকদিন পর নিলেশকে দেখে যেন খুশির ঝিলিক তার চোখে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে নিলেশের, হাতের শিরাগুলিতে দ্রুত হয়েছে রক্ত চলাচল। সিগারেটটি কোন রকম ফেলে দিয়ে বলল " না, এমনি একটু চারপাশটা দেখছিলাম। " সঙ্গীতা বলল - যখন পরিচয় ছিলনা তখন লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হতো আর আজ কথা বলার সুযোগ পেয়েও গুম মেরে বসে থাকলে। এখন এখানে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখা হচ্ছে ! কেমন মানুষ গো তুমি? নিলেশ কিছু বলার আগেই স্মিত হাসল সঙ্গীতা। বলল - এখন ভেতরে চল। যাওয়ার সময় মোবাইল নম্বর দিয়ে যেও। বলেই, বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।


নিজেকে বেশ হালকা মনে করলো নিলেশ। খুশিতে লাফিয়ে একটি ছোট্ট বাঁশের আগা ছুতে চাইল সে কিন্তু পারল না। উল্টে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল তার। নিজেকে কোনমতে সামলে নিতে নিতে সে লক্ষ্য করলো সব্জি ক্ষেতের ভেতর একজোড়া মিষ্টি কুমড়ো ফুল তার এই অবস্থা দেখে যেন খিলখিল করে হাসছে।