সাহিত্য পত্র

গল্প - চোখের আলোয়


শর্মিলী দেব কানুনগো
২১ মার্চ ২০২২

এই সংখ্যার সপ্তম ছোটগল্প

Sharmilee Deb Kanungo_edited.jpg

ভালবাসা শব্দটা বড় মায়াময়। মন ভেজানো। পড়ন্ত বেলাতেও ভোরের অনুভূতি জাগানো শব্দ। ভালবাসা যেন একটা পাখি। হঠাৎ করে উড়ে এসে বসে মনের কোনে। আবার ঠিক তেমনি করেই উড়ে চলে যায়। বাঁধন হারা। ভালবাসা যেন শুধুই এক অনন্য অনুভূতি। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরের চলন্ত ছবিগুলো দেখতে দেখতে কথা গুলো আনাগোনা করছিল অহনার মনে। 

অহনা মেয়ের বাড়ি মাস তিনেক থেকে এখন নিজের বাড়িতে ফিরছিলেন। সলিলের শ্রাদ্ধ শান্তি সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর মেয়ে একা বাড়িতে মাকে রেখে গেল না। নিজের সাথে নিয়ে গেল মাস তিনেকের জন্য। কিন্তু এখন নিজের বাড়িতে নিজের ফেলে রেখে যাওয়া সংসারে আবার ফিরে আসছেন অহনা। ট্রেন আজ সারারাত সময় নেবে। আগামীকাল সকাল দশটার দিকে অহনা নিজের শহরে নিজের ঘরে ফিরবেন। কিন্তু মনটা বড্ড খারাপ লাগছে। সলিল চলে গেছেন তিনমাস আগে। শূন্য ঘরে অহনা এখন থেকে একাই থাকবেন। অন্তত যতদিন তার মন আবার মেয়ের কাছে যাবার জন্য টানবে না ঠিক ততদিন। 

যৌথ জীবনের তেত্রিশ বছরের মাথায় অহনা হঠাৎই একা হয়ে গেলেন। সলিল বিনা নোটিশে চলে গেলেন। হৃদ যন্ত্র বিকল। একটা মাত্র মেয়ে সেও বিয়ে হয়ে গেছে। অহনার এখন সাতান্ন চলছে। এখনও টানটান শরীর। মুখের ঔজ্জ্বল্যে এই বয়সেও তারুণ্যের হাল্কা  ছোঁয়া লেগে আছে। আর মন? ... সে এখনও  বুড়িয়ে যায় নি। কোন এক আশ্চর্য রহস্যে অহনা এখনও বড্ড যুবতী মনের। এখনও অহনার হঠাৎ করেই ছলকে ওঠে মন। হঠাৎ যদি আবার দেখা হয়ে যায় সেই চোখ দুটোর সাথে… একথা ভাবলে আজও বুকের ভেতর জল পড়ার শব্দ শুনতে পান তিনি। 

 

মনে পড়ে কোন অতীতে একবার তুতো ভাইবোনেরা সবাই শহরতলির কোথাও বেড়াতে গেছিলেন। খুব মজা করছিলেন সবাই মিলে। তখন তার কিশোরী বেলা। সেই উচ্ছ্বল বেলায় হঠাৎ করেই চোখ আটকে গেল তার... একজোড়া চোখে। সাদা শার্ট, ডেনিম ব্লু ট্রাউজার, ব্যাক ব্রাশ চুল... মিহি ফ্রেমের চশমা... সেই চশমার ভেতর দিয়ে একজোড়া মায়াবী চোখ...  অহনার দিকে তাকিয়ে। এমন চোখ এই প্রথম দেখলেন তিনি। আশ্চর্য গভীরতা সেই চোখ জোড়ায়। একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছিলেন তিনি। চারদিক হঠাৎ যেন শব্দহীন হয়ে গেল। বুকের ভেতরে তোলপাড়। অজানা অচেনা এক অনাস্বাদিত অনুভূতি তাকে গ্রাস করছিল। নির্বাক নিস্পন্দ। কতক্ষন এমন ছিলেন ঠিক বুঝতে পারলেন না। ছোট পিসির মেয়ে দিতি এসে তাকে জাগিয়ে তোলে। সবাই মিলে সেকি হাসাহাসি তাকে নিয়ে। তিনি খুব লজ্জা পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় বার তাকান নি ছেলেটির দিকে। 
 
ছেলেটা ওর বন্ধুদের সাথে বেড়াতে এসেছিল। একটু পরেই সে স্কুটার চালিয়ে সেখান থেকে চলে যায়। যাবার আগে আরেকবার চোখাচোখি হয় দুজনের। ছেলেটি  হাসে। সে হাসিতে জাদু ছিল। সেই হাসিতে  অহনা আচ্ছন্ন হলেন।

 

সেদিন বাড়ি ফিরে তো এলেন। কিন্তু এ যেন এক অন্য অহনা। সমস্ত হৃদয় জুড়ে আছে এক অন্য রকম ভালো লাগা। সেই ভালো লাগা বর্ষিত হল সবার উপর। এমনকি দোষীও তার কাছে আর শাস্তি পেত না। আকাশ বাতাস গাছ সব কিছু যেন অন্য রকমের ভালো  লাগতে লাগলো তার। 

তারপর থেকে কলেজ আসা যাওয়ার পথে রোজ অহনার দুচোখ খুঁজত তাকে। রোজ মনে হত আজ নিশ্চয়ই দেখা হবে। কিন্তু দিন শেষে মনে জাগত পরদিনের জন্য নতুন আশা। আশা অপূর্ণ ই রয়ে গেল। সেই চোখ জোড়ার সাথে একটা দিনও আর দেখা হলো না তার। তবু মনের কোনে দিব্যি রয়ে গেল সেই  অনন্য অনুভূতি... সারাজীবনের জন্য। 

 

কালের নিয়মে একদিন বিয়ে ঠিক হল অহনার। পাত্র হিসেবে সলিল ছিল অভিভাবক দের বড্ড পছন্দের। অবশ্য অহনার ও অমত হওয়ার কোনও কারণ ছিল না। সে দিনের সেই ব্যাপারটা ততদিনে শুধুই এক টুকরো স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে । 

 

বিয়ের বেনারসী শাড়ি কিনতে গেছেন অহনা বোনদের সাথে। পছন্দের তিনটি শাড়ি থেকে একটা বাছতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যায় আছেন। তিনটি শাড়ি গায়ে ফেলে দোকানের ঢাউস আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। বোনরা যে যার মতো করে নিজের মতামত জানাচ্ছে। কিন্তু তিনি কিছুতেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। ঠিক তখন সামনে দেখলেন  সেই চোখ... ছেলেদের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে কোট কিনছে। কিন্তু তাকিয়ে আছে অহনার দিকে। অহনার ভিতরে আবার সেই অনুভূতি .... এতদিন পর আবার সেই ঠিক আগের মতোই কেঁপে উঠলেন তিনি। নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সেও একদৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে। তবে তার চোখদুটি বড্ড উজ্জ্বল আজ। যেন হারানো কিছু খুঁজে পেয়েছে। মুখে মৃদু হাসি। অহনা যেন মরেই গেলেন। এইবার এগিয়ে আসছে সে। অহনার দিকে। তবে কি কিছু বলবে! যে কথা শোনার জন্য তিনি দশ বছর ধরে ওকে খুঁজলেন সেই কথা কি বলতে আসছে সে! কিন্তু   এখন যে বড্ড দেরি হয়ে গেল। গত সপ্তাহে সলিলের বাড়ি থেকে লোকজন এসে অহনা কে ভাবী পুত্রবধূ হিসেবে আশীর্বাদ করে গেছেন। এবার  কি করবে সে? 

 

হঠাৎ থমকে গেল সে। দেখল অহনার বেনারসীর দিকে। মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল তার। বুঝতে পেরেছে দেরি হয়ে গেছে। বড্ড দেরি। আবার হাসল। করুণ হাসি। শুধু আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল অহনার বাঁ হাতের শাড়িটা। সেটা  ছিল  রক্ত লাল  রঙের। 

 

অহনা সেদিন এক রকম পালিয়ে এলেন। পালিয়ে এলেন নিজের কাছ থেকেও। একবার শুধু পিছন ফিরে দেখলেন .. সে  তখনও আকুল চোখে তাকিয়ে ছিল। 

 

এর কদিন পর অগ্নি সাক্ষী রেখে অহনার বিয়ে হয় গেল সলিলের সাথে। সেই রক্ত লাল শাড়িতে অপূর্ব দেখাচ্ছিল তাকে। মুগ্ধ সলিল চোখ ফেরাতে পারছিলেন না। বিয়ের জন্য অবশ্য ভালবাসা খুব জরুরী নয়। যা দরকার তা হল পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান শ্রদ্ধা। ওসবের হাত ধরে ভালবাসা আসে। ব্যবহারিক ভালবাসা। দেওয়া নেওয়ার সম্পর্ক। ধীরে ধীরে  অহনা  ডুবে গেলেন সলিলের সংসারে।মানুষ হিসেবে সলিল বড্ড ভালো ছিলেন। একজন দায়িত্বশীল স্বামী এবং পিতা। অহনাও জীবনের কাছে খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করেন নি কোনোদিন। তাই জীবন যা দিল যেটুকু দিল তা নিয়েই কাটিয়ে দিলেন। অভাব, অভিযোগ, অনুযোগ এসব কিছুই তার ছিল না। সলিল কে নিজের সবটাই সমর্পণ করে দিলেন তিনি। তবে অতীতের তো সমর্পণ হয় না। তাই সেই প্রথম জীবনের এক মুহূর্তের অলৌকিক ভালো লাগাটুকু রয়ে গেল তার মনের কোনে ... সঙ্গোপনে। কিন্তু যাপনের পরতে পরতে জমে উঠা ধূলোর সাথে সেটুকুও কখন যে ধুলো চাপা পড়ে গেল... টেরই পেলেন না। 

   

একসময় অহনা কন্যা সন্তানের মা হলেন। আরো অনেক সম্পর্কে জড়ানো জীবন হলো তার। দীর্ঘ তেত্রিশ বছরের সাংসারিক জীবনে ভালবাসা শব্দটার উপস্থিতি খুব একটা টের পান নি তিনি। আসলে ঐ শব্দটা এক অলীক মায়া। জীবনের জন্য যাপনের জন্য জরুরী হলো তার কিছু প্রতিশব্দের মতো শব্দের। সলিলকে কি তিনি ভালবাসতেন? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি কখনও খুঁজতে যান নি। কিন্তু প্রতিটি প্রয়োজনে দুজনে দুজনের পাশে ছিলেন। অসুখে রাত জেগে তার শুশ্রূষা করতেন সলিল। তিনিও তো সলিলের অসুখে  মনখারাপে সর্বদা সঙ্গ দিতেন। যদি পাশে থাকা ভালবাসা হয় তবে তা ছিল দুজনের মধ্যে। কিন্তু তবু বসন্তের উদাস বিকেলে যখন অকারণ বাতাস বইত তখন কেমন যেন করে উঠত মনটা তার...। পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াতেন ছাদের ধারে। নীচের রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া লোকজনদের মধ্যে কাউকে কি খুঁজতেন তিনি? 

 

তখন তিনি মধ্য যৌবনে। হাঁটুতে সামান্য বাত। কোমরেও জানান দিচ্ছে বয়স। একদিন টুকটাক কিছু শপিং সেরে একাই হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। কেমন করে যেন রাস্তায় হঠাৎ পড়ে গেলেন। আশে পাশে কেউ নেই। উঠে দাঁড়াতেও পারছেন না। হঠাৎ একটা স্কুটার এসে দাঁড়ালো। কেউ একজন তাকে হাত ধরে টেনে তুলল। কোন রকমে দাঁড়িয়ে ধন্যবাদ বলতে গেলেন। একি!! সেই চোখ.... তবে চুল সব প্রায় সাদা। আশ্চর্য সেই অনুভূতি আবারো অহনা কে ঘিরে ফেলল। সেই মুহূর্তে তার সামনে ছিল শুধু দুটি চোখ... বড্ড  গভীর  আর মায়া জড়ানো। 

 

এবার ও কিছু বলল না সে। ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে চলে গেল। তার চলে যাওয়াটা যেন অপ্রতিরোধ্য। 

 

অহনা ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে ফিরলেন। কেমন যেন মনে হল সবটাই স্বপ্ন। মনে হলো ভালবাসারা বুঝি পাখি হয়ে ধরা দেয়। অহনা সেই পাখিকে ধরার চেষ্টা করেন নি কখনও। তবু সে উড়ে উড়ে আসে। বার বার। এমন করেই আসুক নাহয়....।

 

দীর্ঘদিন পর অহনা আজ নিজের ঘরে আসলেন। সেই ঘরে যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার আর সলিলের যৌথ জীবনের অসংখ্য স্মৃতি। কিন্তু সব আজ  শুধুই স্মৃতি। সুখ দুঃখ রাগ অনুরাগ হাসি কান্না জড়ানো তেত্রিশ বছর জমে আছে সেই ঘরের আনাচে কানাচে। কিন্তু আর একটা অপার্থিব অনুভূতি ও জড়িয়ে আছে ওসবের পাশাপাশি। দুটো চোখ। অসম্ভব রকমের মায়া জড়ানো দুটো চোখ। অহনা জানে এই চোখ জোড়ার অধিকারী এই শহরেই আছে কোথাও। যেখানেই থাকুক সে ঠিক দেখতে পায় অহনাকে। অহনার  প্রয়োজনে সেই চোখ দুটো ঠিক আসবে। আসতেই হবে  তাকে।  অহনার সাথে এই চোখের বন্ধন যে অবিচ্ছেদ্য...। 

 

সলিলহীন ঘরে প্রায় প্রতিদিনই এক আশ্চর্য চোখের উপস্থিতি অনুভব করেন অহনা। ভালবাসা পাখি হয়ে উড়াউড়ি করে তার চারপাশে।