সাহিত্য পত্র

অনন্তলোকে বুদ্ধদেব

 

রবিশঙ্কর ভট্টাচার্য

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

Rabi Sankar Bhattacharjee_edited.jpg
buddhadeb-6.jpg

না না কোন ব্যক্তিগত পরিচিতি নেই, নেই সামনা সামনি বসে কথা বলার মুহুর্তের কোন দুর্লভ অভিজ্ঞতা | কৈশোরকাল থেকে তাঁকে চিনি, জানি তাঁর রচিত সরস, মায়াময় শব্দাবলী ও বাক্যমালার মাধ্যমে | তিনি কথা সাহিত্যিক ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব গুহ | বাংলা সাহিত্যের পাঠক পাঠিকাদের কাছে বুদ্ধদেব গুহ অতি পরিচিত আপন জন | স্বনামধন্য এই সাহিত্যিকের রচিত গল্প, উপন্যাস পড়েননি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া মুশকিল | তিনি যখন সাহিত্যের জগতে আবির্ভূত হন তখন বহু দিকপাল লেখক লেখিকারা সাহিত্য কুশলতায় বাংলা সাহিত্যের আঙ্গিনায় সদর্পে বিচরণ করছিলেন | বিভিন্ন বয়সের পাঠক পাঠিকার জন্য তার কলমচারিতা চলছিল মুক্তহস্তে | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর জন্ম | 


গত দু’বছর ধরে বিষাক্ত জীবানুর কবলে আচ্ছন্ন সমস্ত জগৎ | তার পরিনামে হিসাবহীন কত প্রাণ হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে | প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে আছড়ে পড়ে সে জীবানু কেড়ে নিয়েছে বাংলা শিল্প সংস্কৃতির কত বিখ্যাত গুনীজনদের | অতি সম্প্রতি আমরা হারালাম বাংলা সাহিত্যের উল্লিখিত স্বনামধন্য বলিষ্ঠ গল্পকার, ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব গুহকে | জন্ম ও মৃত্যু প্রকৃতির অমোঘ বিধানে নিয়ন্ত্রিত, এর বাইরে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা কোন প্রাণীর পক্ষে সম্ভব নয় | কিন্তু যখন কোন প্রিয়জন বা পরিচিত বিখ্যাত আপনজনে জীবনাবসান হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই তার প্রিয় মানুষরা দু:খ কষ্টের আর্দ্রতায় নিমজ্জিত হয়ে আকুল হয়ে পড়েন | বুদ্ধদেবের  প্রয়াণে সেই অনুভুতি আজ বিরাজ করছে বাংলা সাহিত্যের আপামর পাঠক মহলে | তবে তিনি যে বিস্তর অমূল্য সম্পদ রেখে গেলেন তা পাঠক সমাজকে আদৃত করে রাখবে অনাদিকাল |


কলকাতায় জন্ম হলেও তাঁর ছোটবেলার কিছু সময় কেটেছিল বর্তমান বাংলাদেশের রংপুর ও বরিশাল অঞ্চলে | প্রতষ্ঠিত কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে স্নাতক হওয়ার পর সফল চাটার্ড একাউন্টটেন্ট হিসাবে সুনামের সঙ্গে কর্মজীবন শুরু করে ভারত এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন বহুদিন | আকাশবাণী থেকে শুরু করে বিশ্বভারতীর মত স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে তিনি নানা কমিটির সদস্য পদ অলংকৃত করেন |


অরণ্যচারী ও অরন্যপ্রেমী এই সাহিত্য স্রষ্টা আত্মপ্রকাশের পর থেকে সাহিত্য চর্চায়  তাঁর জয়যাত্রা অব্যাহত রেখে চলেন | অল্প সময়ের মধ্যে তিনি একজন কৃতী লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন | সাহিত্য রচনায় বুদ্ধদেব মেধাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে হৃদয়ের ভুমিকাকে বড় করে দেখতেন | ‘জঙ্গলমহল’ তাঁর লেখা প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ | তাঁর বিতর্কিত উপন্যাস ‘মাধুকরী’ দীর্ঘদিন ধরে বেস্টসেলার | ছোটদেরকেও তিনি নিরাশ করেননি, তাদের জন্য তাঁর প্রথম বই ‘ঋজুদার সঙ্গে জঙ্গলে’| শক্তিশালী এই লেখক নরনারীর প্রেমজীবনের অন্তরচিত্র এমন ভাবে এঁকেছেন যে এ বিষয়ে পাঠকের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পাল্টে যায় | যদিও তাঁর প্রথম পরিচয় একজন শিকার কাহিনী বা অরণ্যপ্রেমিক লেখক হিসাবে, কিন্তু অরণ্যানীর জীবন ছাপিয়ে তাঁর রচনা এক প্রেমিক সত্তাকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে | যে সত্তা একই সঙ্গে প্রকৃতি ও নারীকে অবিচ্ছিন্ন ভাবে ধারণ করে তার গল্প ও উপন্যাসে | সাহিত্য রচনায় যে ধারা তিনি অবলম্বন করেন তা বাংলা মূল ধারার পরিপ্রেক্ষিতে অভিনব | তাঁর কলমে তাই ফুটে ওঠে “মানুষের শরীরের বয়স বাড়ে একদিন | এই শরীর রেখে আনন্দধামে যাত্রা করতে হয় সব পুরুষ এবং নারীকেই | কিন্তু প্রেমের বয়স বাড়ে না | প্রকৃত প্রেম অমলিন, সুরভিত থাকে স্বর্গের পারিজাত ফুলের মতো, তা সত্তাকে স্নিগ্ধ এবং আবিষ্ট করে রাখে |” (তামাহাটের করচা) ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ পড়তে পড়তে বাঙালী কিশোর তার অন্তরে যৌবনের প্রথম আলোড়ন টের পায়, কিশোরী নিজের অজান্তে কখন যুবতী হয়ে ওঠে |


আবার শুধু এ জাতীয় উপন্যাসেই নয়, প্রতিকী উপন্যাস কিংবা গোয়েন্দা উপন্যাস রচনায় বুদ্ধদেব ছিলেন সিদ্ধহস্ত | তাঁর এ জাতীয় প্রতিটি উপন্যাসের পটভূমি, চরিত্র, জীবন তাঁর নিজের চোখে দেখা, অবিশ্বাস্য কল্পনা প্রসূত নয় | ভ্রমন পিপাসু বুদ্ধদেব সাহিত্য রচনার তাগিদে পৃথিবীর বহু দেশ পরিভ্রমন করেন | ইউরোপের প্রায় সকল দেশ, কানাডা, আমারিকা, হাওয়াই, জাপান, থাইল্যান্ড ও পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল বিচরণ করেছেন | সেখানকার বনাঞ্চল, জনজাতি মানুষের জীবন যাত্রা, তাদের সুখ দু:খ, প্রেম ভালোবাসার হুবহু ছবি এঁকে পাঠকদের মোহিত করেছেন | সেইসব কাহিনীতে মানুষের অন্তর্নিহিত জীবন বোধের যে আখ্যান উপস্থাপন করেছেন তা পড়ে পাঠককুল রোমাঞ্চিত, ব্যথিত বা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন | ভারতের বনভূমি, তরাই অঞ্চল চষে বেড়িয়ে একটার পর একটা উত্কৃষ্ট কাহিনী রচনা করে বাংলা সাহিত্যের খাজানায় অমূল্য সম্পদ চিরদিনের জন্য সঞ্চিত করে গেছেন | শিশু সাহিত্যিক হিসাবেও তিনি জনপ্রিয়, তাঁর রচনায় দুই জনপ্রিয় চরিত্র ঋজুদা ও ঋজুদার সহযোগী রুদ্র | এছাড়াও রুরু, পৃথু, টিটি. টুই, কুর্চিরা বিরাজ করছে বিভিন্ন গ্রন্থে বারবার | তাঁর অসংখ্য রচনার মধ্যে কিছু অনবদ্য সৃষ্টি যেমন, মাধুকরী,  কোজাগর, হলুদ বসন্ত, একটু উষ্ণতার জন্য, কুমুদিনী ও ঋজুদা বাংলা কথা সাহিত্যের জগতকে সমৃদ্ধ করেছে তুলনারহিত আঙ্গিকে | হলুদ বসন্ত গ্রন্থের জন্য তাঁকে আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়, এছাড়াও শিরোমন ও শরৎ পুরস্কারে তিনি সম্মানিত হন | 


বলা বাহুল্য, প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়িকা প্রয়াত ঋতু গুহ ছিলেন তাঁর সহধর্মিনী, প্রায় দশ বছর আগে যার মৃত্যু হয় | সুকন্ঠের অধিকারী বুদ্ধদেব ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন, ধ্রুপদী সঙ্গীত ও পুরাতনী টপ্পা গানেও তাঁর দখল ছিল অপরিসীম | সুন্দর ছবি আঁকতে পারতেন, নিজের লেখা একাধিক বই এর প্রচ্ছদ তিনি নিজেই এঁকেছেন |


এখানে উল্লেখ্যোগ্য যে নব্বই’র দশকের শেষার্ধে সাহিত্যের এই মহাপুরুষ পা রেখেছিলেন শিলচর শহরে, বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের অধিবেশনের প্রধান অতিথি হয়ে | দু’দিনের অবস্থান কালে তিনি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছেন, গান গেয়েছেন, আড্ডা মেরেছেন এবং সর্বোপরি রিকশায় চড়ে শহরের আনাচে কানাচে ঘুরে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন | দু:খিনী বর্ণমালার দেশ এই বরাকের শান্ত স্নিগ্ধ করুন মুখ প্রত্যক্ষ করেন যার ফলশ্রুতি হিসাবে রচনা করেন এক অভূতপূর্ব উপন্যাস ‘ভাল লাগে না’ | বরাক উপত্যকার নৈসর্গিক মায়াবী দৃশ্যের চিত্রায়ন, সমাজ জীবন, তার সংস্কৃতি ভাষা আন্দোলনের করুন কাহিনী, সাহিত্য চর্চার বিবরণ উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে বিবৃত হয়েছে | 


বুদ্ধদেব গুহের প্রয়াণ স্বাভাবিক ভাবে বাংলা সাহিত্য সাংস্কৃতিক জগতে এক বিরাট ধাক্কা, এর ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হল তা পূরণ করা অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ হয় | তাঁর প্রাণ ইহ জগৎ ছেড়ে অনন্তলোকে চলে গেলেও তাঁর অভূতপূর্ব সাহিত্য কীর্তি অগনিত পাঠক সমাজের অন্তর চিরদিন আলোকিত করে রাখবে | তাঁর কথা দিয়েই প্রতিবেদনের যতি টানছি, “জীবনে সবকিছুরই, সব ঘটনারই একটা নির্ধারিত সময় থাকে | কুঁড়ি ধরার, ফুল ফোটার, ফল হয়ে ওঠার, তারপর ঝরে পড়ারও | পাতা ঝরার দিনে কুসুম ফোটাতে চাইলে কি ফোটে ?” (মাধুকরী)