সাহিত্য পত্র

কবিতার খাতা - ২৩

কবি : রুপালী রায়

১২ সেপ্টেম্বর ২০২১

 

ঈশানের ২৩ নম্বর কবিতার খাতায় এবারে আমরা নিয়ে এসেছি নবীন কবি রুপালী রায়-এর কয়েকটি কবিতা...

রুপালী রায় এর জন্মস্থান - কমলপুর গ্রাম, ছোট দুধ পাতিল, কাছাড়, আসাম।

বর্তমানে শিলচর মহিলা কলেজে বাংলা অনার্স বিভাগের ছাত্রী। লেখালেখি শুরু অষ্টম শ্রেণী থেকেই।

স্কুল-কলেজ এর ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে বর্তমানে নানা পত্র পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা, গল্প ইত্যাদি লেখালেখি চলছে এবং ইতিমধ্যেই ১টি অনু গল্প সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে...

মৃন্ময়ী

শেষ বিকেলটা আজও আমার কাছে ভীষণ প্রিয় 

গোধূলি সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে আছি পাড়ার মোড়ে 

মুক্ত আকাশের নীচে 

সন্ধ্যার ঘন কালো রং ক্রমশ আমাকে ঘিরতে শুরু করেছে 

তুমি এসে কতটা সহজে বলে দিলে

এখানেই ইতি টানতে হবে মৃন্ময়ী

মায়ের অসুখ করেছে 

 দেশে ফিরতে হবে 

বোধহয় আর আসা হবে না ।

আমি সেদিন বারবার অপেক্ষার জন্য কাতরে ছিলাম 

তুমি রাজি হওনি

সেই মৃন্ময়ী ডাকটা আজও কানে বাজে 

কানে বাজে তোমার কথা, কবিতা 

তোমার লেখা প্রথম কবিতা আমার জন্য  

সেদিন রাজি না হওয়ায় কারণটা আজ বুঝতে পারছি ।

সকলে মিলে প্রায় জোর করে

আমায় বিয়ের পিড়িতে বসানোর চেষ্টা করেছিল বারবার ।

বাবার সাথে সম্পর্কটা ভালো নেই আর ।

যাওয়ার সময় ঠিকানাটাও দিয়ে যাওনি 

কিছু দিনের মধ্যে যোগাযোগটাও বন্ধ করে দিয়েছিলে একেবারে ।

মনে পড়ে আমাদের প্রথম দেখার কথা ?

নীলগিরী হাটের পাশেই কবিতার আসর বসত রোজ 

তুমি আমার কবিতা শুনে আমায় ভালোবেসে ছিলে 

আচ্ছা আমি কি দেখে ভালো বেসেছিলাম ?

তোমার প্রিয় নীল টি শার্টটা 

মনে পড়ে দুজনে মিলে কিনেছিলাম নিউ মার্কেট থেকে 

আজও পরো কিনা গায়ে জানি না 

তখন তোমার বয়স অল্প 

ফর্মাল ড্রেস পরতেই ভালো বাসতে বেশি ।

 হাতে ব্ল্যাক কালারের  হাত ঘড়ি 

অনেকে অনেকবার বলেছিল দেশে গিয়ে তুমি বিয়ে করেছ 

বিশ্বাস হয়নি 

যাকে ভালো বাসা যায়

তাকে কি করে এতটা অবিশ্বাস করতে পারি?

সব বিশ্বাস অবিশ্বাসের পালা শেষ হলো

আজ দেখলাম আবার তোমাকে নিউ মার্কেটে 

নতুন মানুষ খুব বায়না ধরেছিল মনে হয় 

না হয় তুমি যে কখনো এ পথে ফিরতে না

তা আমি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছি ।

ভয় পেয়ো না এই চিঠি তোমার ঠিকানায় পৌঁছাবে না ।

তবে বেশ মানিয়েছে দুজনকে ।

ভালো থেকো প্রিয় নীল ।

 

করোনা 

তুমি জেগে ওঠো শহর 

আবার আগের মতো করে 

এই নিঃস্তব্ধতা  তোমায়  আর মানায় না ।

মানায় না চুপ করে শুয়ে থাকা পৃথিবীকে

মৃত্যু সমুদ্রের তীরে 

জেগে ওঠো শহর 

আগের মতো করে ।

ভালো লাগে না এই গৃহবন্দি জীবন,

ভালো লাগে না বিশ্ব  জুড়ে নিঃস্তব্ধতার ঢেউ 

কবে ফিরবে তুমি কোলাহল?

কবে ফিরবে ভীড় জমানো স্কুল বাসটা 

জেগে ওঠো শহর 

আবার আগের মতো করে ।

কত কাজ পড়ে আছে, 

এখানে সেখানে -ছড়িয়ে ছিটিয়ে 

দেখতে কি পাও না তুমি?

মানুষেরা সব বন্দি আছে 

নিজের নিজের ঘরে ।

শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মন আতঙ্কিত 

এই নির্দয় করোনা মহামারীকে ঘিরে ।

জেগে ওঠো শহর 

আবার আগের মতো করে ।

অপ্রতিবাদী 

এই যে তুমি চুপ করে 

দাঁড়িয়ে আছো 

আমার কথাগুলোর ঠিক ওপারে ।

এই যে তুমি কোনো প্রতিবাদ করো না 

আমার উশৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে ।

এই যে তুমি কোনো কিছু না বলে 

গম্ভীর ভাবে

 আমাকে এড়িয়ে চলে যাও,

অবজ্ঞা করো 

আমি সেটা খুব বুঝতে পারি ।

বুঝতে পারি তুমি আর এ বাঁধনে

ধরা দিতে চাও না ।

অন্য একটা ঘর ,

অন্য একটা পৃথিবী 

তোমায় অনবরত ডেকে চলছে 

ঈশারা দিয়ে ।

আর তুমি সেই অন্য পৃথিবীটাকে ছুঁয়ে দেখবে বলে 

এক বিশাল অভিনন্দন অনুষ্ঠানের 

আয়োজন করতে চলেছো ।

আমি তোমার সেই নতুন পৃথিবীটাকে  

স্তম্ভিত করে দিতে চাই না 

চাই না একটা ভালোবাসাকে 

ভাগ হোক দুই ভাগে ।

চুপ কথা

এই সমস্তটাই একটা মেলোড্রামা,

আমি সেই মেলোড্রামার অংশবিশেষ হয়ে

তোমার ক্ষত বিক্ষত জায়গাগুলোতে

আমার কোমল হাতের ছোঁয়ায়

সারিয়ে তোলার মিথ্যে প্রয়াস মাত্র ।

তোমার রামধনুর মতো রঙিন জীবন আলোকে,

আমি থাকিয়ে থাকি ।

যদি একটিবার ভুলবশত ফিরে তাকাও ।

তোমার নিত্য নতুন তালে তাল মিলিয়ে,

আমি নিজেকে সাজিয়ে তুলি ।

জানি সমস্তটাই একটা মেলোড্রামা,

আমি সেই মেলোড্রামার অংশবিশেষ ।

তুমি না হয় তোমার ঈশ্বর,

আমাকে নিয়ে উপহাস করবে ।

আমি সেই উপহাসের পাত্রী হয়ে

তোমার মেলো ড্রামার অংশ হয়ে

চুপ হয়ে অজস্র রঙ ছড়াবো ।

তুমি না হয় সেই রঙ মিশানো দিনগুলোতে

আনন্দ উৎসব পালন করো ।

অভিমান

অভিমানের বাষ্প জমা শহর বড্ড বিষণ্ণ,

আজ বিকেলটাও পের হলাম বড্ড শান্তভাবে ।

টানা এক ঘণ্টা কোনো নড়াচড়া নেই ,

নেই কোনো অশ্রু পাতের চিহ্ন ।

অভিমান বাষ্প জমা বরফের মতো,

মুখোমুখি যেকটা মুখ

যেকটা চোখে চোখ সরাসরি রাখা যায়

প্রত্যেকটি ভীষণ ভয়ংকর, জ্বলন্ত অঙ্গার ।

কলমের কালিরও তেমন একটা জোর নেই

কোনোমতে রাত কাটাতে পারলেই তো রক্ষে ।

কিছুটা ভুল অজুহাত,

কিছুটা মিথ্যে বায়না,

সবকিছু মিলিয়ে যেটুকু সময় কাটালাম

বাড়তি পাওনা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

ভুল শুদ্ধের হিসেবটা আজ অনেকটা উর্ধ্বে ।

এতটা হিসেব মাফিক চললে কি আর

সৌন্দর্য বলে কোনো জিনিসের দাম থাকে!

তবে একে বারেই যে মাপজোক ত্যাগ করবো না,

না সে বড় নির্লজ্জতা ।

মানবিকতা বলে যে একটা কথা আছে

লজ্জাবোধ তাহার সরলরেখায় চলে ,

নচেৎ সমস্তই বালুচরে পরিণত হবে ।

কিছু কালজয়ী কথার রেশে রেশ মিলিয়ে চলতে হলে

তোমাকে না হয় আমাকে নতিস্বীকার করতে হবে

তবে আমি সেই নতিস্বীকারে সম্মত নই ।