স্মরণ কথা

শঙ্খ ঘোষের কোলাজ – ‘চুপ করো, শব্দহীন হও’
অভিজিৎ মিত্র
২১ এপ্রিল ২০২১
sankha1.jpg

প্রথমেই বলি যে আমি কিন্তু কোন অবিচুয়ারি লিখতে বসিনি, আমার প্রিয় এক কবিকে নিয়ে কিছু এলোমেলো শব্দ আর স্মৃতি লিখতে বসেছি।

যেদিন শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, ২০০৩ –এর বইমেলায়, তখন আমি নিতান্তই ছোঁড়া কবি। আগের বছর প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছে ‘প্রাসঙ্কেতমঘূর্ণ’, তখনো খড়্গপুরে রিসার্চ করছি, কবে শেষ হবে জানি না। বন্ধুদের সঙ্গে প্রতি উইক-এন্ডে দৌড়-ঝাঁপ করে বেড়াই, রাত্রে তুমুল আড্ডা, আর বারীনদাকে কবিতাচর্চায় গুরু হিসেবে মানি।

 

শঙ্খ ঘোষ বারীনদা (ঘোষাল) আর কমলদা (চক্রবর্ত্তী)-কে স্নেহ করতেন, অনুজ কবি হিসেবে। সেটা পরপর কয়েকবার বইমেলায় দেখেছিলাম। তো, ২০০৩ বইমেলায় প্রথম যখন শঙ্খ ঘোষকে দেখি, ওনার আশেপাশে প্রচুর উৎসাহী তরুন ও মধ্যবয়স্ক কবির মোর্চা। তার মাঝে কবি শঙ্খ ঘোষ, হাতে একগুচ্ছ নাম-না-জানা কবিতার বই আর মুখে স্মিত হাসি নিয়ে, সবার সঙ্গে এগিয়ে আসছেন। বারীনদাকে দেখে দাঁড়ালেন। বারীনদা কমলদা দুজনেই এগিয়ে গিয়ে খানিকক্ষণ আলাপ করলেন। তারপর বারীনদা আমাকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন। শঙ্খ ঘোষ-কে বললেন ‘এই হল অভিজিৎ। এখন কৌরব আর নতুন কবিতায় যত তরুন কবি লিখছে, ও তাদের একজন’। আমি হাত জোড় করে ওনাকে নমস্কার জানালাম। ‘যা, তোর কবিতা বই এক কপি এনে শঙ্খদাকে দে’। বারীনদার আদেশ পেয়েই দৌড়লাম। এক কপি এনে দিলাম। উনি হাতে নিয়ে বইয়ের নামটা পড়লেন। ‘আমার কবিতা পড়েছো?’ বললাম ‘হ্যাঁ, ‘নিহিত পাতালছায়া’, ‘বাবরের প্রার্থনা’ আর ‘ধূম লেগেছে হৃদকমলে’ পড়েছি’। উনি আবার একটু হেসে ‘চলি বারীন’ বলে সবার সঙ্গে এগিয়ে গেলেন।

সাল ১৯৯৯। তখন সবে খড়্গপুরে পি-এইচ-ডি করতে ঢুকেছি। তখনো ওখানকার কোন কবির সঙ্গে আলাপ হয় নি। কৌরব বা নতুন কবিতা গোষ্ঠীর বারীনদা বা স্বপনদাকে চিনি না। আমার সঙ্গে আরেকটা রিসার্চ প্রোজেক্টে একই ডিপার্টমেন্টে ঢুকেছিল অরিজিৎ মজুমদার নামক একজন (এখন সল্ট লেকে SAMEER–এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট), আমার প্রায় সমবয়সী এবং আমার মতই কবিতাপাগল। ও আই-আই-টির ভেতরে পুরনো ছোট এক কামরার একখানা হন্টেড হাউস পেয়েছিল থাকার জন্য। আমি মাঝে মাঝেই হস্টেল থেকে ওর কাছে চলে যেতাম রাত্রে ভূত দেখার লোভে। তারপর সারারাত আমাদের কবিতাচর্চা শুরু হত। সেই চর্চায় বশিরভাগ সময় আমাদের পাথেয় হতেন অরুণ মিত্র, শঙ্খ ঘোষ আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সেই প্রথম অরিজিতের থেকে নিয়ে ‘বাবরের প্রার্থনা’ পড়েছিলাম – ‘এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম / আজ বসন্তের শূন্য হাত - / ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও / আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’। এই লেখা পড়ে মনে হত এক অসহায় বাবাকে, বাবর, ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসে সন্তান হুমায়ুনের জন্য চোখের সামনে প্রার্থনা করতে দেখছি।

এরপর আবার দেখা হয়েছিল কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে, ২০০৫ সালে। তদ্দিনে আমি গুয়াহাটিতে, ওখানে পড়াচ্ছি প্রায় এক বছর। কলকাতা আসি বছরে তিন-চার বার। ২০০৪ সালে ‘কৌরব ১০০’ অনুষ্ঠানের জন্য ওনার আসার কথা ছিল, কিন্তু শেষ মুহুর্তের কোন এক ব্যস্ততায় আসতে পারেন নি। বারীনদা কমলদাকে সেই নিয়ে আক্ষেপ করতে দেখেছিলাম। এখন আর সেটা আমার স্মৃতিতে স্পষ্টভাবে নেই। যাইহোক, ২০০৫-এ জীবনানন্দ সভাগৃহে কোন এক কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে আমার কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে উনি অতিথি হিসেবে ছিলেন। সভাশেষে খানিক কথাও হয়েছিল। যদিও সাহস করে জিজ্ঞেস করতে পারিনি উনি আমার সেই কবিতার বই পড়েছিলেন কিনা।

এর পরেও আরো কয়েকবার বইমেলায় দূর থেকে ওনাকে দেখেছিলাম। সেই একই রকম তরুন কবি পরিবেষ্টিত। মুখে হাসি। কেউ না কেউ ওনার পাশে বকবক করে চলেছে। হাতভর্তি বিভিন্নজনের কবিতার বই। চুপচাপ মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই কোন কষ্ট বা ক্লান্তি আছে কিনা। বুঝতে হলে, আমার মতে, চুপচাপ ঢুকতে হবে ওনার কবিতার অক্ষরমালায়। উনি মুখে যা যা বলতে পারেন নি, স্বাভাবিক ভদ্রতাবশত চুপ থেকেছেন, সেই সমস্ত কিছুর উত্তর উনি দিয়েছেন কবিতার ছত্রে ছত্রে। ‘এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো / শব্দহীন হও’ বা ‘আজ ধ্বংস হয়ে যাবে সমস্ত যৌবন / আজ রাত্রে ধ্বংস হবে প্রেম’ বা ‘লোকে বলবে মূর্খ বড়ো, লোকে বলবে সামাজিক নয়’।

হ্যাঁ, কবি শঙ্খ ঘোষ এজন্যই প্রাসঙ্গিক, এজন্যই প্রতিবাদী, এজন্যই বলিষ্ঠ। একজন প্রফেসর হিসেবে ভদ্রতায় মুখে ওনার যা যা বলতে বাধত, যে কারনে উনি চুপ থাকতে পছন্দ করতেন, তার যোগ্য জবাব দিতেন লেখায়। উনি কোন দল দেখতেন না, শাসক-বিরোধী দেখতেন না। ওনার বিবেকের কাছে যা গ্রহনযোগ্য নয়, সেটা নিয়ে কবিতায় গর্জে উঠতেন। কয়েক দশক আগে যেমন শাসক দলের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন – ‘তারপর উঠলেন গিয়ে / বাবুদের মোটরে।/ এবার শিল্প হোক, এবার শিল্প হোক / বাবুরা মাতেন বনে / কোটরে’। তেমনি কয়েক বছর আগের পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে লিখেছিলেন - ‘দেখ্‌ খুলে তোর তিন নয়ন / রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে / দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন’। এই নিয়ে ওনাকে অনেক অপমান হজম করতে হয়েছিল, এমনকি নিজের নাম নিয়েও। কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উনি তার কোন উত্তর দেন নি। আবার কেন্দ্রের সরকারকেও বিঁধতে ছাড়েন নি – ‘আজ মনে হয় যেন সত্তর বছর পর / ঠিক ঠিক, সবাই স্বাধীন - / গরিবি কোথাও নেই, ভুখা নেই কোনখানে / সামনে শুধু স্বচ্ছ আচ্ছে দিন’।

  

২০০২ সালে এক বিজ্ঞান পরিষদের হয়ে গোধরা কান্ডের গনহত্যার প্রতীকি প্রতিবাদ হিসেবে কিছু পোস্টার তৈরি করে সাঁটতে হয়েছিল। আমি যেটা তৈরি করেছিলাম – ‘মুখের কথা একলা হয়ে / রইল পড়ে গলির কোণে / ক্লান্ত আমার মুখোশ শুধু / ঝুলতে থাকে বিজ্ঞাপনে’। ভাবুন, চারটে লাইনের ভেতর কত ব্যঙ্গ, কত শ্লেষ, কত পরিস্থিতির মূর্ছনা। এজন্যই শঙ্খ ঘোষের কলম এত শক্তিশালী। এবং বিভিন্ন সময় দেখেছি, কবি চুপচাপ হলেও প্রতিবাদ মিছিলে সবার সাথে পা মিলিয়েছেন। সেটা গোধরা কান্ডই হোক বা কামদুনির গণধর্ষন বা এন-আর-সি নিয়ে কেন্দ্রের মানুষের ওপর অত্যাচার। এমনকি ২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম গুলিচালনার প্রতিবাদে তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।

তবে কবি হিসেবে ওনার দুটো সত্বা আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। ওনার ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’ বা ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ যেমন সত্যি, তেমনি উল্টোদিকে ‘দিনগুলি রাতগুলি’ ও ‘নিহিত পাতালছায়া’-ও সত্যি। আর তাই কিন্তু এত কিছুর পরেও কবি শঙ্খ ঘোষ আমার কাছে একজন রোমান্টিক কবি। যিনি অক্লেশে উচ্চারণ করতে পারেন ‘স্মৃতি আমার শহর, আমার এলোমেলো হাতের খেলা, / তোমায় আমি বুকের ভেতর নিইনি কেন রাত্রিবেলা?’ বা ‘আমিও রাখিনি কিছু, তবু রাখে পিছুটান / মাটিতে বসানো জালা, ঠান্ডা বুক ভরে আছে জলে / এখনও বুঝিনি ভালো, কাকে ঠিক ভালবাসা বলে’। একমাত্র একজন কবি বুঝতে পারেন কবির এই দুটো আলাদা জগৎ। বাস্তব ও পরাবাস্তব। কখন পা ফেলতে গিয়ে এই দুই জগৎ ভ্যান গগের ব্রাশের মোটা স্ট্রোকে স্টারি নাইটের মত একাকার হয়ে যায় – ‘ওরা যে বনের পাশে বসেছিল আগুন জ্বালিয়ে / শরীরের সব পাতা একে একে খসে পুড়ে যায় / অথবা গোপন ঘরে দেয়ালে রেখেছে নীলা নারীদের শব / এইসব ক্ষতি সে তো আমারই দেহের ক্ষয়, আজ মনে হয়’। দেখুন তো, কিভাবে আলাদা করবেন সুররিয়েল কবির মন আর বাস্তবের দৃশ্যদের?

আমি কবির জীবন কাহিনী নিয়ে এরপর বিশেষ কিছু বলতে চাই না। কারন আমরা সবাই মোটামুটি জানি যে উনি অধ্যাপক ছিলেন। পড়িয়েছেন বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ, যাদবপুর ও দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতীতে। ৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’র জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমি, ৮৯ সালে ‘ধূম লেগেছে হৃদকমলে’র জন্য রবীন্দ্র পুরষ্কার, ৯৯ সালে বিশ্বভারতী প্রদত্ত দেশিকোত্তম, ২০১১-য় পদ্মভূষণ, ১৬-য় জ্ঞানপীঠ – এইসব পুরষ্কার নিয়ে বিশ্লেষণ আপনারা প্রচুর লেখায় পেয়ে যাবেন। তাই এগুলো থাক। আমি বরং একটা অন্য দিক উল্লেখ করি। আপনারা কি জানেন যে কবি শঙ্খ ঘোষ ছোটদের জন্য উপন্যাস লিখেছিলেন? আজ থেকে ৫৮ বছর আগে? দেশভাগের আবহে ছোটদের নিয়ে মনকাড়া এক উপন্যাস ‘সুপুরিবনের সারি’। আসলে কবি জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার চাঁদপুরে (বর্তমান বাংলাদেশে)। তারপর দেখেছিলেন দেশ কিভাবে ভাগ হয়ে গেছিল। হয়ত সেই ক্ষোভ থেকেই এই উপন্যাস। তেমনি বাংলা বানান ও ছন্দ নিয়েও ওনার অনেক কাজ আছে। সময় সুযোগ মত পড়ে দেখবেন।

শঙ্খ ঘোষ (৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২ – ২১ এপ্রিল ২০২১) চলে যাবেন এটা খুব একটা অপ্রত্যাশিত নয়। কারন ৮৯ বছর বয়স হয়েছিল, জানুয়ারি মাস থেকে মাঝে মাঝেই শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বাইরে আর বেরোতেন না। কথা বলতে পারতেন না, জিভে আড়ষ্টতা চলে এসেছিল। যেটা অপ্রত্যাশিত, সেটা হল, মানবসভ্যতা ও বিজ্ঞানকে আবারো হার মানতে হল সেই ছোট্ট করোনা ভাইরাসের কাছে। মন বলছে, কবি যাবার আগে হয়ত আমাদের সবার জন্য ভাইরাস মুক্তির প্রার্থনা করে গেছেন – ‘ধ্বংস করে দাও, আমাকে ঈশ্বর / আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’।

Shankha 2.jpeg