হাল্কাচ্ছলে

অম্ল মধুর : লাল চিঠি
১১ মে ২০২১
কল্যাণ দেশমুখ্য, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও লেখক
86738759_199264754522747_353792166302895

যথাবিহিত সম্মান পুর: সর নিবেদন এই যে, শ্রী শ্রী প্রজাপতির অশেষ কৃপায় আমার পুত্র শ্রীমান বলির পাঠা আগামী ২২ জ্যৈষ্ঠ অধুনা শিলচর নিবাসী শ্রীযুক্ত রাঘব বোয়াল মহাশয়ের কন্যা শ্রীমতি সর্ব গুণ সম্পন্নাকে নানা রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজাইয়া, আল্হাদে দশখানা হইয়া, প্রচুর বরযাত্রীর কলরবে পাড়া মাতাইয়া ধূমধামের সহিত আনিতে যাইতেছেন। সৌভাগ্য বশতঃ সর্ব গুণ সম্পন্নাকে আমার পছন্দ করিতে হয় নাই। তিনি স্বয়ংবরা হইয়া কন্যাদায় হইতে স্বীয় পিতাকে মুক্তি দিয়াছেন। আর দাবি দাওয়া নিয়া আমার শ্রীমান ও বাড়াবাড়ি না করিয়া তাহার সহায়তা করিয়াছেন।

যেভাবে আমার প্রপিতামহ, পিতামহ, পিতা ও আমি সর্ব গুণ সম্পন্নাকে আনয়ন করিয়াছিলাম, সেই একই পথের পথিক হইয়া আমার শ্রীমান ও খুশিতে গদগদ হইয়া তাহার সর্ব গুণ সম্পন্নাকে সাদরে বরণ করিতে যাইবে। ফল ও পূর্ববৎ হইবে।আহার জোগানের ভার থাকিবে শ্রীমানের উপর। আর আদেশ করিবার ভার থাকিবে শ্রীমতির উপর। যাহারা ইতিপূর্বে স্বগৃহে সর্ব গুণ সম্পন্নাকে আনয়ন করিয়াছেন, তাহারা এই বিষয়ে বিশেষ অবগত আছেন। কিন্তু যাহারা এখন ও আনয়ন করেন নাই, আনিব আনিব ভাবিতেছেন, তাহারা এই চিঠি পড়িয়া নিমন্ত্রণকারীকে বিলক্ষণ বৃদ্ধ বাতুল আখ্যায় আখ্যায়িত করিবেন জানি। করুন ক্ষতি নাই। তাহাদের কোন ও দোষ নাই। কারণ, তাহাদের চক্ষুতে এখন রঙিন চশমা। জগতের সব কিছুই রঙিন দেখিতেছেন। কুসুমে কীট আছে, চাদে কলঙ্ক আছে, নারী প্রবঞ্চনা জানে, এমন সব কথা পুস্তকে পড়িলেও মানিতে নারাজ। তবে যেইদিন বাদশা জাহাঙ্গীরের দল বেগম নূরজাহানদের গলায় মালা পরাইয়া খুশিতে ডগমগ হইয়া স্বগৃহে আনয়ন করিয়া সারাজীবনের ভরণপোষণের দায়িত্বভার কাধে নিয়া সংসার সমুদ্রের লবণাক্ত জলে সন্তরণ শুরু করিবেন ও বছরের পর বছর বিশাল এই সংসার সমুদ্রে কোনও ঠাই, কোন ও কূলকিনারা না পাইয়া অথৈ জলের উত্তাল তরঙ্গাঘাতে প্রানান্তকর অবস্থায় কেবলই হাবুডুবু খাইবেন ও ঘনঘন নূরজাহানদের নিজ মূর্তি ধারণ করিতে দেখিবেন তখন আমার কথা স্মরণ হইলে এই সব কথাকে বৃদ্ধ বাতুলের প্রলাপ না বলিয়া হয়তো বা জনৈক অযাচিত ব্যক্তির উপদেশ সম্বলিত পূর্ব সতর্কবাণী বলিয়া বিবেচনা করিবেন।

এদিকে আমার অবস্থা রামার বাবার মতো। সাহিত্য সম্রাট লিখিয়াছেন, 'রামার মা ঝুনো হইলে পর রামার বাপ ঝালের চোটে বাড়ি ছাড়িয়াছিল।ঝালের চোটে আমি ও দুরারোগ্য মৃগী রোগীর ন্যায় ছটফট করিতেছি। কিন্তু রামার বাবার কী ঐশী শক্তি ছিল জানিনা। আমি তো স্বেচ্ছাবৃত মায়ার বন্ধন ছিন্ন করিতে পারিতেছি না। মাঝে মাঝে শুধু মাইকেলের কবিতা আবৃত্তি করি--


' প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে সাধে
কি ফল লভিলি ?
জ্বলন্ত পাবক শিখা, লোভে তুই কাল ফাদে।
উড়িয়া পড়িলি
পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়, ধাইলি অবোধ হায়। না দেখিলি, না শুনিলি
এবেরে পরাণ কাঁদে '
   

আমি অমত করিলেও আমার শ্রীমান তাহার তোয়াক্কা না করিয়া প্রকাশ্যে আমাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়া উক্ত পুণ্য কর্মটি শীঘ্রই সমাধা করিবেন। আর যেহেতু ইহাতে আমার মান সম্মান জড়িত তাই আশীর্বাদ করিতেছি, যাও বৎস নরক কুন্ডে প্রবেশ করিয়া নিজ চোখে সারি সারি চুরাশি নম্বর কুন্ড পর্যন্ত দর্শন করিয়া আইসো। আর তাহা ছাড়া প্রবাদ আছে, ' বিবাহ প্রাচীর বেষ্টিত এক দুর্গ। ভিতরে যাহারা আছে দৌড়াইয়া বাহিরে আসিতে চায়। আর বাহিরে যাহারা আছে দৌড়াইয়া ভিতরে প্রবেশ করিতে চায় '। আমার শ্রীমান ও অন্যান্য শ্রীমানদের মতো দুর্গের ভিতরে যাইবার জন্য ব্যাকুল। তাই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন।

এতদ উপলক্ষ্যে নিমন্ত্রণ ক্রমে বাসনা যে, আপনারা সবান্ধব আগামী ২৫ জ্যৈষ্ঠ মমালয়ে শুভ চতুর্থ মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকিয়া বর কন্যাকে আশীর্বাদ দানে কৃতার্থ করিবেন। বিচিত্র এই লাল চিঠি দ্বারা নিমন্ত্রণ জনিত ত্রুটি অবশ্যই নিজগুণে মার্জনা করিবেন। ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে নিমন্ত্রণ পত্র পোস্ট করায়, আশা করিতেছি অনেকেই শুভ বিবাহের মাসখানেক পর এই লাল চিঠি পাইবেন। আর যাহারা অনতিদূরের নিমন্ত্রিত তাহারা কমপক্ষে পকেটে ৫০০ টাকা নিয়া আসিবেন। কারণ, এর কম মূল্যে অধুনা সাধারণ ভোজের আয়োজন করা ও অসম্ভব। খাদ্যের মান নিয়া আড়ালে আবডালে নিন্দা বন্দনা অর্থাৎ কুৎসা না রটাইয়া সরাসরি নিমন্ত্রণকারীকে জানাইলে পরবর্তী অনুষ্ঠানে খাদ্যের মান উৎকৃষ্ট করিবার প্রয়াস থাকিবে। 

বি: দ:-- সশরীরে হাজিরার পরিবর্তে ডাকযোগে প্রত্যেকে শিউলি পাঠাইয়া বাধিত করিবেন। অফেরৎযোগ্য সর্ব নিম্ন শিউলি ১০০০ টাকা মাত্র। 

           

ইতি
     

নিবেদক

গ.জ.মা (গভীর জলের মাছ)