হাল্কাচ্ছলে

ছাওয়াল বাওয়াল
সোমা চক্রবর্তী
২০ এপ্রিল ২০২১

আমার ছানাদের ভারতের গুজরাত প্রদেশেই শৈশব হইতে বয়োবৃদ্ধি ঘটিয়াছে। আমি নিজেকে বঙ্গ সংস্কৃতির জনৈক উত্তম উত্তরাধিকারিণী বলিয়া গণ্য করিয়া থাকি। মম পুত্রদ্বয়ের বঙ্গীয় সংস্কৃতির শিক্ষা যাহাতে পরিপূর্ণ হয় তাহার কারণে গৃহেতে পুত্রগণের সহিত কেবলমাত্র বঙ্গীয় ভাষাতেই বাক্যালাপ করিতাম। তাহাদের বিদ্যালয়ে ইংরেজি, পাড়াপড়শীর গৃহে গুজরাতি ও হিন্দি এবং উহাদের পিতামহী উহাদের সহিত অবশ্যই শ্রীহট্টীয় ভাষায় বাক্যালাপ করিতেন। ঈদৃশ কারণে আমার পোলাপানদের মুখনিঃসৃত ভাষা খিচুড়িসম হইয়া পড়ে যাহা আমা ব্যতিরেকে অন্য কাহারো অনুধাবন করিবার ক্ষমতা ছিল না।  

গুজরাতি সমুদায়কে অনুসরণ করত: মম গৃহে প্রতি বৎসর জানুয়ারি মাসে তণ্ডুল (চাউল) ক্রয় হইয়া থাকে। কেবলমাত্র ক্রয় করিলেই কার্য সম্পন্ন হয় না। উহার রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। এই চাউলের বস্তায় সাধারণত পঞ্চবিংশতি কিলোগ্রাম চাউল থাকিত। আমি দ্বিপ্রহরে নিত্য গৃহকার্য সম্পাদন করিয়া, কনিষ্ঠ পুত্রকে ঘুম পাড়াইয়া, তাহার ঠাকুরমার কাছে শোয়াইয়া রাখিয়া, সেই চাউল হইতে ধান বাছিয়া, তাহাতে তৈল মিশ্রিত করিয়া, এক কুইন্টাল ধারণক্ষমতাযুক্ত একটি বৃহৎ পাত্রে ভরিয়া রাখিতাম। একদিনে নহে , বেশ কিয়ৎ দিবস লাগিত, কার্য  সমাপ্ত হইতে। এই সময়ে আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র অনর্গল বকবক করিয়া আমার কার্যসম্পাদনে বাধাদান করিত। এইরূপ বকবক করিতে করিতে সে একদা যাহা বলিল তাহাতে আমি যুগপৎ বিস্মিত এবং আতঙ্কিত হইয়া পড়লাম। তিনি তখন জুনিয়র কেজিতে পাঠরত। পূর্ব দিবসে তাহাকে মধুসূদন দাদার কাহিনী শোনানো হইয়াছিল। এই কাহিনীতে একটি ছোট বালক বনের পথে একা একা পাঠশালা যাইতে ভয় পায়। তাহার ঠাম্মার কথা অনুযায়ী সে মধুসূদন দাদাকে ডাকে। তাহার এই ডাক শুনিয়া মধুসূদন দাদা তাহাকে সঙ্গদান করেন। শুধু তাহাই নহে, তাহার পন্ডিতমশাই’এর পিতার মৃত্যু হইলে মধুসূদন দাদা তাহাকে একটি ছোট ভাঁড়ে করিয়া দধি দান করেন, ইত্যাদি। আমার পুত্রটি তাহার ম্যামের সুইটহার্ট ছিল। তিনি ম্যামকে কিস করিয়া বলিয়া আসিয়াছেন যে ম্যামের পিতার মৃত্যু হইলে তিনি দধি সাপ্লাই করিবেন। এই কার্যে মধুসূদন দাদার পরিবর্তে তেনার মাতাই দধি সাপ্লাইয়ের দায়িত্ব লইবেন। পুত্রের এহেন বিবৃতির পূর্বে  আমি খুব হীনমন্যতায় ভুগিতাম। আমি ভাবিতাম পুত্রটির বাক্য কেহ অনুধাবন করিতে পারে না। সেদিন হইতে বিশ্বাস করি মধুসূদন দাদা যাহা করেন তাহা মঙ্গলের জন্যই করিয়া থাকেন।

পুত্রটি বড় হইতে হইতে ছোট খাট গুন্ডায় পরিণত হন। গাছে চড়িতে, পাঁচিল বাহিতে, বিশেষ পারঙ্গম। বিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন সর্ব ঘটে কাঁঠালি কলা। শিক্ষক দের সহিত তর্কে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। পাঠ্যপুস্তক ব্যতীত সকল পুস্তকের প্রতি তাহার আকর্ষণ।  বিদ্যালয়ে চেয়ার বহিতে, পীরামিড বনিতে বা প্রধান অতিথি কে গার্ড অব অনার দিতে তিনি সর্বাগ্রে।একদা দীর্ঘ কাল ধরিয়া মিউজিক ম্যাম রিহার্সাল করাইলে, বালকগণ আইসক্রিমের দাবি করেন। মিউজিক ম্যামের ক্ষুদ্র জুনিয়র কেজিতে পাঠরতা কন্যাটি অর্ঘ ভাইয়া কে বিশেষ পছন্দ করিতেন এবং রিহার্সালের ফাঁকে তাহার স্কন্ধে বসিয়া থাকিতেন। অর্ঘ ভাইয়া তাহাকে স্কন্ধে লইয়াই আইসক্রীম কিনিতে যান এবং ফেরৎ মুদ্রা ম্যামের মস্তকের চারিপাশে বারকতক ঘুরাইয়া ফেরৎ দেন। তিনি ম্যাম অপেক্ষা লম্বা চওড়া ছিলেন। ম্যাম তাহাকে সস্নেহে নীচু হইতে বলেন এবং তাহার পর উত্তম রূপে  তাহার কর্ণ মর্দন করেন।

আমার ছোট পুত্র বেশ বুদ্ধিমান। তিনি কুকুরকে হিপনোটাইজ করিতে গিয়া কুকুরের তাড়া খান, বিড়ালকে ভয় দেখাইতে যাইয়া বেড়ালের আঁচড় খান। তদবধি স্বীকার করিতেই হইবে পুত্রটি তাহার মাতাকে বড়ই ভালোবাসেন। পরীক্ষার খাতায় লিখিয়া আসেন তাহার মাতার নামে তিনি তাহার পোষ্য কুকুরের নামকরণ করিবেন। তিনি ভাবিয়াছেন ইহা তাহার মাতৃভক্তির প্রকাশমাত্র। ইহাতে শিক্ষিকা এবং মাতা উভয়ই পরম আনন্দিত হইবেন। এহেন পুত্রের মাতা একদা একটি পুত্রসম বালকের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হইয়াছিলেন। তিনি যখন বললেন, ‘কি সুন্দর ফুটফুটে ফর্সা ছেলে!’,তখন তাহার পুত্র ঈর্ষায় জ্বলিয়া পুড়িয়া তাহার মাতাকে কিল মারিয়া দেন‌। এবং বলিলেন তাহার মাতার গাত্রবর্ণ ঐ আন্টিরূপ গৌরবর্ণ নহে বলিয়াই তাহার গাত্রবর্ণ ঐ দাদার ন্যায় গৌরবর্ণ হইতে পারে নাই। সকলই মাতার অপরাধ মাত্র।
 
এইরূপ অনেক ঘটনা তাহাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করিতেছে। বর্তমানে তাহারা তাহাদের মাতা অপেক্ষা নিজেদের অধিক বুদ্ধিমত্তার অধিকারী বলিয়া গণ্য করেন এবং এমত কারণে মাতার অভিভাবক হইয়া মাতাকে সোহাগ ও শাসন সহযোগে কালাতিপাত করিয়া থাকেন।


অলমতি।