হাল্কাচ্ছলে

দোলায় গমন... তৃতীয় ঢেউ আসবে কি?? 

মধুমিতা ভট্টাচার্য

Madhumita Bhattacharjee_edited.jpg

মহাদেব যে এবার আগেই কৈলাস  থেকে বেরিয়ে পড়েছেন এ কেবল মা দূর্গা জানেন। দু দু'খানা ভ্যাকসিন নেওয়া হয়ে গেছে। খুব চিন্তায় ছিলেন পরে  ভ্যাকসিন হয়নি বলে ফেরত যাওয়া না আটকে যায়। 

কৈলাসের সুখ কি আর কোথাও আছে? গোটা করোনাকাল , দেবী ঢাল হয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাছাড়া কৈলাসে করোনা কই? ছুতমার্গ নেই, দূরে ঠেলে দেওয়া নেই। নেই হলুদ, আদা, লবঙ্গ, মধুর মিশ্রণ গেলা। ভ্যাকসিন নট সিন। আর মুখোশ বিন সব খুশ। একচালায় গোটা সংসার। নন্দী ভৃঙ্গি নিয়ে , ছাই ভস্ম মেখে জমজমাট দিন কাটে । আসলে বেশ আরামেই দিন কাটছে। বলতে পারেন VRS নিয়েছেন। অবশ্য এর কারণ মর্ত্যলোকে মানুষ। এ কথায় পরে আসছি। একটু কৈলাস ঘুরে নেওয়া যাক। 

গ্রীষ্মকাল থেকেই পার্বতী উশখুশ করেন। কবে আসবে শরৎকাল। বসন্তের চেয়েও শরতের আকর্ষণ অনেক বেশী। আর আশ্বিন তো আহা..আহা। 


 " আশ্বিনে নব আনন্দ ,উৎসব নব...। " 


নেচে ওঠে মন। ছন্দে পিছিয়ে নেই নটরাজও।  মানসচক্ষে দেখতে পাই চারদিকে বরফ, রূপোলী আভায় ঝলমল করেন শিব পার্বতী। স্বর্ণালংকার ও পুষ্পমাল্য আভূষিতা দেবী সঙ্গে রূপবান ,জ্ঞানী , নৃত্যকলা পারদর্শী  নটরাজ। এমনটাই কৈলাস। পরিবার, পরিজন নিয়ে দিনাতিপাত। কৈলাসের বাতাসে প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা। তাই করোনা থাবা বসায় না। এখানে আস্থা, ভরসা, বিশ্বাস এখনো বিদ্যমান। তবু মাত্র ক 'টি দিনের জন্য হলেও শরতের প্রত্যাশা থাকে তাদের বছরভর।

এমন কৈলাসে যদি ভ্যাকসিন বাধা হয়ে দাঁড়ায় ফিরতি পথে তবে কি হবে? তাহলে কি যাওয়াই বাদ দেবেন। কিন্তু তা কি করে হয়। পরিবার মানেই তো একসূত্রে বাঁধা অনেকগুলো মন। উমা যাবেন বাপের বাড়ী আর তিনি পড়ে রইবেন একা? সাকরেদরা ওস্কায়। বলে, গিয়ে কাজ নেই। মর্ত্যের মানুষ একচালায় বিশ্বাসী নয় বহুকাল। সারা পরিবারকে আলাদা করেছে। গণেশ, কার্তিক, লক্ষী, সরস্বতী নিজ নিজ বাহন নিয়ে এ কোণ ওকোণে পড়ে থাকেন। পরিবার ছিন্ন ।যেন দেশভাগের ছবি । দেবীর আবাহন হবে এ তো ঠিকই। কিন্তু মহাদেব কোনোরকমে জায়গা পান। কেউ তাকিয়েও দেখে না প্রায়। তার ওপর পুলিসের এত কড়া নজর। কোন নেশার ছলে কাকে কোথায় আটকে দেয় কে জানে। কিন্তু মর্ত্যের মানুষের মত মহাদেবের কান কাঁচা নয়। তিনি ঠিক বেরিয়ে পড়েন দেবীর রক্ষাকবচ হয়ে। সপ্তপদীর শপথ। জ্ঞানী তিনি। তাই অন্তরের ভাবনা বোঝেন। 

এবার আগেই বেরিয়েছেন। সব কাজ সারা। ডাক্তার,গবেষকরা যে আরো 'বুস্টার ডোজ'বার করবে এ তিনি জানেন। আগামী বছর সেই হ্যাপাও সামলাতে হবে। 

এদিকে আমাদের জগৎজননী মা তাঁর সন্তানসন্ততি নিয়ে তৈরি। দশভুজার অস্ত্রই ভ্যাকসিন। ভাবছেন শিব কি আলাদা নাকি? আরে ওখানেও ওই এক জায়গায় একটু সুড়সুড়ি। আসলে বছরে একবার মর্ত্যলোকে এসে এই রোগ একটু হলেও ধরেছে। মানুষের তো মুখের লাগাম নেই। ভীড় মণ্ডপেই হয়তো বলে বসলো জরু কা গুলাম। শিব, শিব। 

এবার শিবঠাকুরের  VRS নিয়ে বলি। জ্ঞানী তিনি। কিন্তু এখন জ্ঞান আহরণে সবাই নানা পথে হাঁটা দিয়েছে। আগে দুপুরের দিকে মণ্ডপগুলো একটু হলেও ফাঁকা হত। সেই সময়টা ছিল একান্ত তাঁর। কিছু মানুষজন সাথে বসতো। আলাপ আলোচনা হতো। একে অপরের কথা শুনতো। এখন সকলেই কেবল বলে, বলে আর বলে। শোনার পাট উঠেছে। এসব নাকি নিউজ চ্যানেলের শিক্ষা। খবর জোগাড় করে অনুচরগণ। শিব অবাক হয়ে ভাবেন তাহলে শোনে কে? আর শোনেই যদি না, তবে কি বোঝে আর কি শেখে আর কি জানে? তিনি এখন নির্বাক শ্রোতা। অবসরই ভালো।

মর্ত্যে ভ্রমণ আগে বড় সুখকর ছিল। তাঁর কাছে নৃত্যের তালিম নিতেও চাইতো মানুষ।  এখন কেবল তান্ডব নৃত্যে পারদর্শী হতে উৎসুক। মহাদেব হাসেন। মনে মনে বলেন ভিতটি শক্ত না হলে কি তান্ডব ঘটবে? এ যে অপচয়। তাই ছন্দ দিকশূন্যপুরে পৌঁছয়। 

মোট কথা, তিনি এখন কাজ খুঁজে পান না। তবে হ্যাঁ, ভ্যাকসিন এর সৌজন্যে এবার নতূন কিছু শিখলেন। নন্দী ভৃঙ্গি কেবল খারাপ দ্যাখে। মোটেও তা নয়।

 আজও ভালোয় ভালোয় আলোর বেণু বাজে। কি সুন্দর মহালয়ার ভোর হয়। পূর্বপুরুষকে উত্তরপুরুষ  পিতৃপক্ষে স্মরণ করে। কাশফুলে সবাই মা দূর্গার মুখ দেখে উতলা হয়। হাজার কষ্টে, অভাবেও বাবা, মা সন্তানের জন্য নতুন কাপড়  কিনে দূর্গাপুজো পালন করে। কোথাও নবরাত্রি, কোথাও গরবা, কোথাও দূর্গা পূজা। উৎসবে মেতে ওঠে মর্ত্যবাসী। শুভে অশুভে, সুখে দুঃখে, আনন্দে বেদনায় সবাই আকুল হয়ে ডাকে দেবীকে। এ যে পরম আনন্দ। আগে না এলে এই চমৎকার রূপ কি চোখে পড়তো? সকলে একজোট হয়ে নানাভাবে মায়ের আরাধনায় ব্যস্ত। 

তাঁত যন্ত্রে শব্দ চলে অবিরাম। কাপড়ের বুননে নকশার হাসি। মণ্ডপ সাজানোয় বাঁশের সাথে কত রকমারি জিনিসের মিল  হয়ে কত অপূর্ব শিল্প সৃষ্টি হয়। মাটির প্রলেপে কত রূপে দেবীর রূপ বর্ণনা হয়। ছোট থেকে বড়, উচ্চ থেকে নিম্ন সব স্তরে দেবী আবাহনের তোড়জোড় চলে। শিব স্তম্ভিত। এই মর্ত্যলোককে সব অশুভ থেকে যে বাঁচাতেই হবে। 

তৃতীয় ঢেউ থামাতে হবে। কিন্তু কিভাবে? দেবীর গমনের ফল বলছে মড়ক।  মানুষ সহযোগীতা করবে তো? অতিমারীর থাবা থেকে এই সুন্দর পৃথিবীকে বাঁচাতে তিনি কি আবার ধ্যানমগ্ন হবেন?  

কৈলাস পর্বতশৃঙ্গে আমরা কি দেখবো এই জ্ঞানী, সুপুরুষ, পার্বতীপ্রিয় মহাদেবকে ধ্যানমগ্ন রূপে?  বিশ্বের বিষপান করে তিনি কি আবার হয়ে উঠবেন নীলকন্ঠ। 

মনের এই দোলাচলে দেবীর দোলায় গমনের ফল শুভ হোক। 

শুভমস্তু।।