হাল্কাচ্ছলে - ২

"বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে" !  
আ. ফ. ম. ইকবাল
হাফলং

একসময় আমার ডানা বিস্তৃত ছিল আসামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। অর্থাৎ মেয়ের পোস্টিং একেবারে বাংলা বর্ডারে, আর ছেলে একেবারে পুর্ব প্রান্তে। 
   

তখনকার এক ভ্রমণকথা। প্রারম্ভিক স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়েছি। খানিকক্ষণ পরই পৌঁছে গেছে অন্য জেলা সদর জংশনে। লম্বা সময়ের স্টপেজ। উঠলেন এক পরিবার। বুড়ো বুড়ি, তিন বাচ্চা, যথেষ্ট লটবহর। একই স্লিপার খোপে। লটবহর দেখেই মনে হচ্ছে ট্রান্সফার কেস। অথবা পেনশন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার পঁয়ত্রিশ নম্বরও ওদের, মানে বাচ্চাদের দখলে। বুড়োবুড়ি আর আমি বসে আছি। জানা গেলো প্রায় পনেরো ঘণ্টার সহযাত্রী। তাই পরিচিতির পর গপসপ । 
   

ভদ্রলোকের নাম বাদল সাহা(পরিবর্তিত), অর্থাৎ বাঙালি। আত্মার কাছের জন!। হ্যাঁ, রিটায়ারই করেছেন। চাকরি থেকে অবসর নিয়েই ফিরছেন নিজ আস্তানায়। বড় বড় বয়বস্তু পাঠিয়ে দিয়েছেন ট্রাকে করে। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চাকরি করেছেন একই পদে। জেলা আদালতের পেশকার হিসেবে। দীর্ঘদিন আদালতের সাথে সম্পৃক্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এমন ব্যক্তিকে সামনে পেয়ে স্বভাবতই আদালত, বিচার ব্যবস্থা- এসব নিয়ে জানার আগ্রহ হওয়াই স্বাভাবিক। 
     

একে অপরের সাথে ব্যক্তিগত বিষয়াদি বিনিময়ের পর জানতে চাইলাম বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর কিছু অভিজ্ঞতা। অনেক বিচারপতির সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে সম্বন্ধ বহাল রেখে চলার সুবিধা অসুবিধার কথা। 
     

এক দীর্ঘশ্বাস! ধীরে ধীরে ঢাকনা খুলতে লাগলো। এই শর্তে যে তাঁর পরিচয় কখনো কোথায় তুলে ধরা যাবেনা। শর্ত মঞ্জুর- নিশ্চয়তা দেবার পর- 
     

- হ্যাঁ, জীবনে অনেক বিচারপতির সান্নিধ্য পেয়েছি। এমন কিছু বিচারক পেয়েছি, যারা সত্যিকার ন্যায় বিচারক। এক একটি ক্রিটিক্যাল কেসে সুগভীর বিচার বিবেচনা করে রায় দান করে থাকেন। আবার এমন কিছু বিচারপতি নামের কলঙ্ককেও দেখেছি কাছে থেকে, যারা বিচারপতির চাইতে বড় ব্যবসায়ী। এমনকি, বিশ্বাস করবেন- ব্যভিচারী বিচারপতি ও রয়েছেন এক-দুজন, যারা বিচার ব্যবস্থার কলঙ্ক বললেও কম বলা হবে! 
     

- ব্যভিচারী বিচারপতি ? 
     

- হ্যাঁ, এরাও রয়েছেন এই সমাজে। যাদের মুখোশের আড়ালে যে ঘৃণ্য মুখ বিরাজ করে, বাইরে থেকে কেউ তার ধারণাও করতে পারবেন না। এরকম একজনের কথা বলি। উনার স্ত্রী রাজধানী শহরের এক নামি কলেজের অধ্যাপক। তাই পরিবার সঙ্গে রাখার অবকাশ নেই। কিন্তু যেখানেই যান, একটি মধুচক্র গড়ে তোলেন- অত্যন্ত সচেতনভাবে। এই কুকর্মের জন্য ব্যবহার করেন নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষীদের। প্রথম যখন এখানে এলেন, তাঁর আচার আচরণ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এতো অমায়িক মানুষ। কত সুন্দর কথাবার্তা, আচার আচরণ। কিছুদিনের মধ্যেই লক্ষ্য করলাম কিছু প্রভাবশালী উকিলদের সাথে গড়ে উঠছে বোঝাপড়ার সম্পর্ক। নির্দিষ্ট কিছু উকিল কেস জিততে লাগলেন একেরপর এক। তখন আর বুঝতে বাকি রইলো না এর রহস্য কি! কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগতো- কেন, একজন ক্লাস ওয়ান ম্যাজিস্ট্রেট,যার পত্নীও কলেজ শিক্ষক, কি আবশ্যক তাঁর এভাবে অনৈতিক পথে টাকাপয়সা কামানোর? বছরখানেক পর একটি মার্ডার কেস এলো উনার আদালতে। সেই কেসের শুনানির সময় আমার মনে যে সন্দেহ দেখা দিয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু খবরাখবর নিতে শুরু করলাম। অত্যন্ত বিষ্ময়কর ভাবে যেসব তথ্য পেয়েছিলাম, আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। 
     

বিষয়টি সংক্ষেপে এরকম। সাহেবের মাঝে মাঝে চাই নতুন 'আনকোরা মাল' ! জনৈক ইনফরমার খবর দিলো .... গ্রামের অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তি ...… -এর সুন্দরী মেয়ের ব্যাপারে । বাপের সাথে বোঝাপড়া হয়েছে। স্ত্রী হারা ব্যক্তি চার সন্তানের লালন পালন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। তাই অবশেষে বিশাল পরিমাণের বিনিময়ে সম্মত হয়েছে। কিন্তু নিজ হাতে তো আর তুলে দিতে পারেনা। তাই পরিকল্পনা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে সে ঘরে থাকবে না। ছোটরা স্কুলে থাকবে যখন ...... ! 
     

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! পাশের গ্রামের এক জোয়ান ছেলের সঙ্গে মেয়েটির গড়ে উঠেছিলো এক গভীর প্রেমের সম্বন্ধ। বাবা জানতেন না সেসব। সময়টা ছিল বিহুর প্রাক্কাল। সেদিন ওই নির্দিষ্ট সময়ে ছেলেটি তার প্রেমিকার জন্য নিয়ে এসেছিল বিহুর উপহার সামগ্রী। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছেলেটি সামনে থাকায় যাদের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের সাথে মুখোমুখি মোকাবেলা করতে হয়েছিল ছেলেটিকে। ধস্তাধস্তি চলার সময় যে জোয়ানটি মেয়েটিকে গাড়িতে তুলতে যাচ্ছিল, চারজনের টিমকে পরাভূত করে একটি ডাণ্ডা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে যেই না মাথায় ঠুকেছে সেই জোয়ানটির, সঙ্গে সঙ্গে তার সকল বাহাদুরি সাঙ্গ! স্পট ডেড ! জন জমায়েতে মেয়েটি রেহাই পেলো বটে, কিন্তু ছেলেটি ভাগলো না, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো! পুলিশকে খবর দেওয়া হলো। আসামী পাকড়াও। আদালতে ছেলেটি হত্যার ঘটনা স্বীকার করে যা বলতে চেয়েছিল, তা আর শোনার আবশ্যকতা বোধ করলেন না মহামান্য আদালত। রায় ঘোষিত হলো- মৃত্যুদণ্ড। 
     

বছর দুয়েক পর সেই কেস দায়রা আদালতে উঠলো। আশ্চর্যজনকভাবে ততোদিনে সেই জজ সাহেব প্রমোশনে অন্যত্র না গিয়ে একই জেলায় নিযুক্ত। কেসটির শুনানি চলছে এখনও। আশাকরি তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাবেন যাতে ধৃষ্টতা সম্পন্ন এই হতদরিদ্র ছেলেটির মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়ে যায় ! 
     

- উফ, কি নিদারুন ভাগ্যের পরিহাস! এক বাপও বুঝি এমন নীচে নামতে পারে? আর পবিত্র প্রেমের সম্বন্ধকে পবিত্র রাখতে এভাবে ছেলেটি বলির পাঁঠা ... ! 
     

- আসল নীচটা কে, তার বিচার কি কোনো দিন হবে? 
     

অনেক্ষন দু'জনই চুপচাপ !       
     

-তারপর, আর কোনো অভিজ্ঞতা? 
     

-হ্যাঁ, আরেকটি চুরির ঘটনায় অপরাধী চোরের বিচারের যে রায় দেওয়া হয়েছিল, সেটিও নিদারুণ দাগ কেটেছিল আমার মনে। কিন্তু আদালতের অংশ হয়েও আমাদের যে কিছু করার উপায় নেই ! 
     

কেসটি ছিল এক মন্দির চত্বর থেকে মন্দিরের সামগ্রী চুরির ঘটনা। তা ও, সেই মন্দিরের এক প্রাক্তন কর্মচারীর দ্বারা। পুলিশ ডায়েরি অনুসারে রাতের আধারে বাগানের চোরাপথে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে চোর। মন্দিরের লঙ্গরখানায় প্রবেশ করে পরদিনের জন্য জমা করে রাখা খাবার সামগ্রী রসুই ঘরের বড় একটি থালায় ভর্তি করে নিয়ে যখন বেরোতে উদ্যত, তখনই পাহারাদার তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। মামলা আদালতে আসার পর উকিল নিয়োগের সামর্থ্য ছিলনা সেই বৃদ্ধ চোরের। অবশেষে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একজন উকিল বিনা পারিশ্রমিকে দাঁড়িয়েছিলেন তার পক্ষে। আর্গুমেন্ট বলে তেমন কিছু হয়নি। তবে এডভোকেট শইকিয়া আদালতের সামনে তুলে ধরেছিলেন সেই বৃদ্ধ চোরের করুন কাহিনি! 
     

নিতাই দাস(পরিবর্তিত নাম) ।যৌবনকাল থেকে সাতান্ন আটান্ন বছর বয়স পর্যন্ত নিতাই মালীর কাজ করতেন সেই মন্দিরে। পদে মালী, কিন্তু কাজে ছিলেন একাধারে মালী, দারোয়ান, সাফাই কর্মী, মার্কেটিং ম্যানেজার,পার্টটাইম কুক- ইত্যাদি। বছর দুয়েক থেকে নানা ধরনের রোগ ব্যাধিতে ভুগছিলেন। কিছুদিন থেকে নতুন ভোগান্তি শুরু হয়েছিল- হুক্কুরহুক্কুর কাশি ! কিন্তু কর্মস্থলে সময়মতো হাজির হতে এবং নিজ দায়িত্ব পালন করতে তাঁর ছিলনা বিরাম বা বিরতি। 
     

ভক্তদের অনেকের তাঁর রোগের লক্ষণ চোখে পড়লো। বিষয়টি তারা তুলে ধরলেন কর্তৃপক্ষের কাছে। লোকটি হয়তো টিবি এবং আরও কোনো সংক্রামক ব্যাধিতে ভুগছে। এভাবে পরিসরের মধ্যে একটি মারাত্মক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি ঘোরাঘুরি করতে থাকলে তারা আর বাচ্চাকাচ্চা পরিজনদের নিয়ে আসবেন না বলে প্রত্যাহ্বান আসতে যখন শুরু হলো, মন্দির কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে নিতাইকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিলেন। অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন নিতাই, একেবারে তাড়িয়ে না দেবার জন্য। অযৌবন দেবী মার সেবাযত্ন করে আজ বুড়ো হয়েছেন। ছোট ছোট তিনটি বাচ্চা। এই বয়সে নতুন করে আর কোথায় গিয়ে রোজগার সন্ধান করবেন? কিছু না করলে বাচ্চাদের মুখের দুটি গ্রাস জোগাড় হবে কিভাবে! কত অনুনয় বিনয়, কিচ্ছুতে কাজ হলোনা। অনেক সম্ভ্রান্ত ভক্তের হুমকি কি আর উপেক্ষা করা যায়?  অবশেষে দুই চোখের জলে মন্দির পরিসর থেকে যেদিন বিতাড়িত হয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন নিতাই, সেদিন থেকে আর সেই পথে পা মাড়ান নি! 
       

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস! রোজগারের অভাবে দিনের পর দিন অর্ধাহারে অনাহারে কাটতে লাগলো এক আজীবন ভক্তের দিনকাল। হাজিরা হাটে প্রতিদিন ভোরবেলা হাজির হন। কিন্তু সবাই খুঁজে তাগড়া জোয়ান কর্মী। মাঝেমধ্যে কারো দয়া হলে হালকা কিছু কাজের জন্য তাঁকে নিয়ে যায় বটে, কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তার বিনিময়ে পারিশ্রমিকটাও হয় অনেক হালকা। 
       

এভাবেই কোনোরকমে দিনাতিপাত করছিলেন নিতাই। কিন্তু মেজো সন্তান মেয়েটির এমন পোড়া জ্বর দেখা দিল, যা সরকারি হাসপাতালের বিনামূল্যের ওষুধে কমা তো দূরের কথা, দিনকে দিন বাড়তেই লাগলো ! মেয়েটি হলো ভদ্রলোকের সবচাইতে প্রিয় সন্তান। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে বাবা-মায়ের মুখের দিকে। সুচিকিৎসা দিতে না পারা পিতৃমাতৃর অন্তর ফেটে যায়, কিন্তু উপায়ান্তরহীন ! এদিকে মেয়েটিকে এভাবে রেখে হাজিরা বাজারে হাজির হবার মানসিকতাও নেই ভদ্রলোকের। এক সন্ধ্যায় মেয়েটি হঠাৎ মুখ ফুটে বললো- বাবা, খিঁচুড়ি খাবো। মন্দিরের খিচুড়ি খেলে আমি ঠিক ভালো হয়ে যাবো ! 
       

এক সপ্তাহ পর মেয়েটি কথা বলেছে, কিছু চেয়েছে বাবার কাছে। সেই বাবা কি তা যোগাড় না করে ঘরে বসে থাকতে পারে ! 
       

রাতেই রেরিয়ে পড়লেন নিতাই। গেট ছাড়াও কোনখান দিয়ে মন্দির পরিসরে প্রবেশ করা যায়, তা ওর চাইতে ভালো আর কে জানবে? রসুইঘরের চাবিটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে নিয়ে তালা খুলে একটা থালায় খানিকটা চাল,ডাল, সামান্য ঘি আর টুকটাক সব্জি নিয়ে যেই না বাগানের বেড়া টপকাতে গেছেন, অমনি দারোয়ানের নজরে পড়ে গেলেন! 'চোর,চোর' চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়ে চোরকে হাতেনাতে ধরে ফেললেন। পুলিশ এসে নিয়ে গেলো লক আপে। সে রাতেই মারা গিয়েছিল নিতাইয়ের মেয়েটি। 
       

আদালতের বিচারে মায়া মমতা দাক্ষিণ্য- এসব কিছুর ঠাঁই নেই। রায় দেয়া হয় সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে। তাতে যদি অপরাধী আদালতে অপরাধ স্বীকার করে নেয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। অবশেষে ধর্মীয় স্থানের সামগ্রী চুরির অপরাধে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয় আজীবন দেবালয়ের এক পরম ভক্ত নিতাই দাসের। 
       

চুড়ান্ত রায়ের দিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিতাইয়ের স্ত্রী এবং এগারো আর সাত বছরের দুই পুত্র। তাদের হাড় জিরজিরে চেহারা আর বিদীর্ণ পরনের পোশাকের দিকে মাত্র একবার তাকিয়ে আরেকবার চেয়ে দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি! 
     

 আরেক প্রস্থ নীরব নিশ্চুপতা !        
       

-আরোও একটি কেসে ... ! 
       

- মাফ করুন, আমি আর সইতে পারবোনা- আপনার এসব অভিজ্ঞতা শুনা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় ! 
       

সারা জীবন ধরে গল্প আর ঘটনাবলী শুনতে প্রবল আগ্রহী হয়েও সেদিন এতোটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে বাদল বাবুর সাথে আর কথা বলাই হয়ে উঠেনি ! বার্থের মধ্যে শুয়ে পড়ে বিপরীত দিক মুখ ফিরিয়ে অনেক্ষন ধরে .................. !